আর্টস

শেষ নিশ্বাসে আঁকা আফ্রিদার আলেয়াপ্রসূত গোলকধাঁধার আলেখ্য

ronni_ahmed | 18 Jan , 2018  

প্রায় এক সপ্তাহ আগে আমি আফ্রিদা তানজিমের প্রদর্শনীর জন্য এই ছোট্ট লেখা তার ক্যাটালগ এবং অনলাইন সমালোচনা বিভাগের জন্য লিখেছিলাম! ওতে লিখেছিলাম সে তার কালোত্তীর্ণ প্রতিভাধর মনটাকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলো, কিন্তু তার কাজ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবন একটি শক্তি, যে-শক্তির ধ্বংস নাই । আল্লাহ অনন্ত শান্তি বর্ষণ করুন ওর আত্মার উপর এবং ও জান্নাতবাসী হোক!

“আফ্রিদা তানজিম একটি বুদ্ধিমত্তার নাম; উজ্জ্বল মন এবং কল্পনাপ্রবণ অথচ জটিল একটি মস্তিষ্কের অধিকারী আফ্রিদা, নির্দিষ্ট একটি বিশ্বের কথা বলে। বলা যায়, একপ্রকার অন্ধকার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যদিয়ে তার শিল্পযাত্রা শুরু হয়েছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন আধুনিক বিশ্ব দ্বারা তৈরি পুঁজিবাদের ফাঁদে আটকে পড়ে থাকা কিছু বিভ্রান্তি আছে সেখানে–আপাতদৃষ্টিতে যারা অব্যাহতির পথ খুঁজে ফিরছে! আফ্রিদা মনুষ্য মনের মধ্যে শয়তানের সত্ত্বা অনুসন্ধান করতে সক্ষম হয়েছে। এমন দানব যা সমস্ত মন্দ ও বৈষম্য সৃষ্টি করে! যা অবিরাম দুঃখের জন্ম দেয়। মানুষের, মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকারাচ্ছন্ন যে সত্তাকে আফ্রিদা উন্মোচন করেছে তা শয়তান দ্বারা আবৃত মানুষের মনের অন্ধকার দিক। শয়তান বা ইবলিস আমাদের জীবনে প্রতিটি ধাপে আমাদেরকে বিভ্রমে ফেলে। যুদ্ধ, রাগ, ঘৃণা, বিষণ্নতা– এইসব মৃত্যু ও ধ্বংস অনুবন্ধী ঘটনা, যা বিয়োগাত্মক, মুনাফার অনুসন্ধানকারী পুঁজিবাদী সংগঠনসমূহ, তাদের বিরুদ্ধে আফ্রিদা সংগ্রামী ভূমিকা গ্রহণ করেছে, সে মৃত্যু ও ধ্বংস অনুবন্ধী প্রতিচ্ছবিসমূহ শিল্পকর্মের মধ্যে দিয়ে সমস্ত বিশ্বের কাছে প্রদর্শন করতে ইচ্ছুক! তার ছবির ফিগারসমূহ কখনো কখনো বাস্তবতার ব্যাকরণ মেনে চলে, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে অন্য জগৎকে নিয়ে আসতে চায়। রং ও কম্পোজিশনে এক ধরণের বিষন্ন মায়াময় পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়, যার অন্তরালে মৃত্যুর হাতছানি সহজেই লক্ষ্যণীয়। এ যেন মানুষের অবদমিত কামনা বাসনা, মৃত্যুপ্রসূত এক গোলকধাঁধার বিশ্ব!













যেখানে সব পথ শেষ হয়ে যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আফ্রিদা আমাদের বলতে চায়, দেখো, বিশ্বের এ অন্ধকারের জন্য তোমরা সবাই দায়ী! তার মৃত্যুর জন্য সমাজের সবাই; আমরা কোনো না কোনো ভাবে দায়ী ও যুক্ত সে কথাটি বলে দেয়। আফ্রিদার প্রত্যেকটি ছবি মূলত একটি চিৎকার। এই চিৎকার আধুনিক সমাজের চাপে পিষ্ট হয়ে যাওয়া বন্দি মানুষের কান্না ও আহাজারি। যেখানে মানুষ পরিচয়হীন, রাষ্ট্রহীন, ধর্মহীন, যেন অস্তিত্বহীন এক জীব। অথচ ক্ষমতার কণ্ঠস্বর তাকে বার বার বলছে তোমার রাষ্ট্র আছে, অস্তিত্ব আছে, পরিচয় আছে, যদিও সে আশ্বাস মূলত সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং মুনাফা লাভের ধূর্ত স্লোগান। তার ছবিতে দেখা যায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস, সাইবার ওয়ার্ল্ড, সাইকেডেলিয়া, জার্মান এক্সপ্রেসার্নিজম, ব্রুট আর্ট, পোস্ট এপল্যটিক পৃথিবীর বয়ান, বিদ্রুপ, এলিয়েনেশন, হতাশার অনন্ত গান! এ সবই যেন তার চিত্রপটকে এক দুঃস্বপ্নময় পৃথিবীর প্রতীকে পরিণত করেছে এবং এই দুঃস্বপ্ন তার অসাধারণ মনের বিন্যাসে শিল্পের শক্তিকে যেমন প্রমাণ করেছে, তেমনি আলোর বিরুদ্ধে ইবলিশের ফন্দি ফিকিরকে উন্মোচন করেছে। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের যন্ত্রনা ও চিৎকারকে প্রকাশ করতে গিয়ে আফ্রিদা ইবলিশের মুখোশ খুলে ফেলে দিয়েছে।
এবং কিভাবে ঐশ্বরিক আলো আমাদের জন্য এই সব পুঁজিবাদী চুম্বকত্ব এবং আলেয়াপ্রসূত সুখী জীবনের মারাত্মক বিভ্রম অতিক্রম করতে সাহায্য করবে তার গুরুত্ব আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। আফ্রিদা মানবতার এই অসহ্য যন্ত্রণা নিরাময় করার জন্য ওর কাজের মধ্যে দিয়ে, আল্লাহর আলোকে ডাকছে। তার ছিল যাত্রা কঠিন এবং শেষঅব্দি ঐশরিক আলো দ্বারা আবৃত হতে চায় ওর শিল্পী সত্তা।

Flag Counter


1 Response

  1. Lovely, very expressionism inspired. A relief from the eternal boats, fields and women of BD paintings. Know nothing of her though. Should have published a bio. Thanks

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.