গল্প

আমি কেন দেশান্তরী

এম এল গনি | 9 Mar , 2018  

ভিক্টর আমার নাম, বয়স ছাব্বিশ। ইউরোপের দেশ মলডোভা আমার জন্মভূমি। মলডোভা নদীর নামেই দেশটির নাম। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে রোমানিয়া আর ইউক্রেনের মাঝে লুকিয়ে থাকা মলডোভা ইউরোপের সবচেয়ে গরিব দেশগুলোর একটি; অনেকটা বাংলাদেশের মতোই। সবুজ গাছপালায় ভরা চমৎকার আবহাওয়া সত্ত্বেও নানা কারণে মলডোভায় পর্যটকরা তেমন আসেন না। অথচ, এই কিছুকাল আগেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকতে কত ধনীই না ছিল এ দেশ। মলডোভার বাস্তবতা যাই হউক, সে যে আমার জন্মভূমি, আমার নিঃশ্বাস, আমার প্রাণ। কারণ, মলডোভার আলো বাতাসেই যে আমার বেড়ে উঠা! এ দেশের রাজধানী কিসিনাও শহরেই আমি বড়ো হয়েছি। মলডোভার সিংহভাগ মানুষ রক্ষণশীল খ্রিস্টান। আমাদের পরিবারও তাই।

আপনাদের যে কারো ভ্রাতা বা সন্তানের মতোই আমি রক্তমাংসে গড়া এক সাধারণ যুবক। সমাজের আর দশটি মানুষের মতো সুখ-দুঃখের অনুভূতি, ভালোবাসা, ঘৃণা, ক্রোধ আমাকেও সমান স্পর্শ করে – হাসায়, কাঁদায়। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাসে ফড়িংয়ের মুক্ত বিচরণ, কিংবা, সবুজ শ্যামল বনে বাস করা চেনা-অচেনা পাখির কলকাকলি সাধারণের মতো আমারও মন ছুঁয়ে যায়। ভোরের আলোতে নতুন দিনের স্বপ্ন আমিও দেখি। তারপরও, আমি ঠিক অন্য সবার মতো নই; আমি এক ব্যতিক্রমী মানুষ। টগবগে যুবক হয়েও নারীর প্রতি আমার মোহ বা আকর্ষণ নেই একটুও। পুরুষই আমার প্রেম। সোজা কথা, আমি একজন গে, বা, সমকামী পুরুষ। আমার আসল পরিচয় জেনে অনেকেই চমকে উঠে। কারণ, খুব কম সমকামী মানুষই সাহস করে তার এ গোপন পরিচয়টা অন্যের কাছে প্রকাশ করে। সমকামীরা নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখে লজ্জায়, অপমানে, সমাজের ভয়ে।

সমকামী হবার কারণে আমাকে অনেক অত্যাচার, নিপীড়ন আর যন্ত্রনা সইতে হয়েছে রক্ষণশীল মলডোভায়। মলডোভা আমার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সত্যি বলতে কি, সে দেশের যারা আমাকে রক্ষা করার কথা তারাই উল্টো আমাকে নির্যাতন করেছে। কারণ, আমি অন্যদের চেয়ে আলাদা। সে দেশে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় তারা কোনমাত্রায়ই সমকাম মেনে নিতে নারাজ। সমকামিতা এক ধরণের মানসিক রোগ বিবেচনা করা হয় মলডোভায়। সমকামীদের মনে করা হয় পথভ্রষ্ট, অনৈতিক, ক্ষতিকর কীট, কুলাঙ্গার। মলডোভায় নিপীড়ন আমি আর সইতে পারছিলাম না। আমার জীবন ছিল ভয়ানক বিপদের মুখোমুখি যে কারণে মলডোভা ছেড়ে আমি কানাডা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। কোনো কারণে আমাকে আবারো যদি মলডোভা ফিরে যেতে হয় তবে আমার বাকি জীবন কাটবে সীমাহীন অস্থিরতা, ভয়, আর অনিশ্চয়তায়। পলায়নপর খরগোশের মতোই আমাকে খানিক পরপর পেছন ফিরে দেখতে হবে কেউ আমাকে আক্রমণ করতে তেড়ে আসছে কিনা। মলডোভার পুলিশ বা প্রশাসন আমাকে রক্ষায় এগিয়ে আসবে না সে আমি বুঝেছি; কারণ, তাদের বিবেচনায় আমি যে এক অভিশপ্ত সমকামী!

বছর দশেক আগের কথা। তখন পনেরো কি ষোলো বছর বয়স আমার। আমি ধীরে ধীরে অনুভব করতে পারলাম ছেলে হয়েও মেয়েদের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই, ছেলেরাই আমার মন কাড়ে বেশি। নিজের এ ব্যতিক্রম স্বভাব আঁচ করে নিজেই অবাক হলাম। কিন্তু, আমার এ অদ্ভুত অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিলাম না অনেক চেষ্টা করেও। আমি জানতাম, এ অস্বাভাবিক আচরণ মেনে নেয়া যায় না; তারপরও, নিজের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। বাবা-মা বা, ঘনিষ্ঠ কাউকেও আমার এ অনুভূতি নিয়ে বলতে ভয় পাচ্ছিলাম। আমার গোপন অনুভূতিগুলো গোপনই রাখলাম, যদিও এ এক অসম্ভব রকমের কঠিন কাজ।

বন্ধুদের সাথেও মেলামেশা কমিয়ে দিলাম যাতে ভুলক্রমেও আমার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ না পেয়ে যায়, পাছে তারা বুঝে ফেলে আমি আসলে একজন হোমোসেক্সচ্যুয়াল। তবে, বন্ধুদের এড়িয়ে গেলেও কম পরিচিত পুরুষদের কাছাকাছি থেকে নিজেকে খানিক হলেও আনন্দ দেবার প্রচেষ্টা ছিল আমার। খুব ছোটবেলা থেকেই জুডো শিখছিলাম আমি; আর, সেই শক্তসোমত্ব জুডো প্রশিক্ষক লোকটাকে বেশ ভালো লাগতো আমার। তাই, বাবা-মাকে বলে জুডো ক্লাসের সংখ্যা বাড়িয়ে দিলাম। আগে সপ্তাহে একবার গেলেও তা বাড়িয়ে দুবার করা হলো। এতে লোকটার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে যাবার বাড়তি সুযোগ এলো আমার, যদিও আমার সে সুদর্শন জুডো প্রশিক্ষক বিষয়টি কিছুমাত্রও আঁচ করতে পেরেছেন মনে হলো না।

পুরুষের প্রতি আমার অদম্য আকর্ষণ বুঝতে পেরেও মেয়েদের সাথে মেশার চেষ্টাও কিন্তু কম করিনি। আমার ধারণা ছিল হয়তোবা মেয়েদের সাথে মেলামেশার জন্য যে মাপের চেষ্টা বা উদ্যোগ নেয়া দরকার সে মাপের চেষ্টা আমার নেই। এক বান্ধবীকে একান্ত সান্নিধ্যে পাবার সুযোগও হয়েছিল একবার। আমাকে খুব ভালো লাগতো তার। এক সন্ধ্যায় একাই এসেছিলো সে আমার এপার্টমেন্টে আমার সাথে গল্প করতে। এক পর্যায়ে সে বান্ধবী আমাকে তার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে নানাভাবে আবেদন জানালেও আমি কিছুমাত্রও উৎসাহবোধ করিনি তাতে। টপলেস হয়ে জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁটজোড়ায় চুমু দিয়েও সে আমাকে জাগাতে পারেনি, এতটাই নির্লিপ্ত ছিলাম আমি। আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেবার চেষ্টাও করেছিল মেয়েটি। তাতেও কাজ হয়নি। আমার নির্লিপ্ততা দেখে সে তাজ্জব বনে গেলো। এ অপারগতায় আমি নিজেও ভীষণ লজ্জা পাচ্ছিলাম। সেই থেকে সে তরুণী আমাকে দেখলে এড়িয়ে যেত। মেয়েটি হয়তোবা ধরে নিয়েছে আমি অন্য কোনো মেয়েকে ভালোবাসি, বা, কোনো কারণে তাকে আমি পছন্দ করিনি। ভগবান! সে তো জানে না তার এ ছেলেবন্ধুটি স্রেফ বন্ধুই মনে করে তাকে, নারীপুরুষের রসায়নে কল্পনা করার সামর্থ বা ক্ষমতা তার এ বন্ধুটির নেই।

সত্যি বলতে কি, আমার মন পড়ে থাকে কেবল পুরুষের দিকে। একদিকে পুরুষের প্রতি আমার প্রবল আকর্ষণ, আর অন্যদিকে, এ বিশেষ পরিচয় মানুষের নজরে এলে আমার পরিণতি কি হতে পারে তা নিয়ে সংশয় আর দ্বিধা সারাক্ষণই জেগে থাকে আমার মনের গহীনে। আমি দ্বিধাগ্রস্থ আর ভীতসন্ত্রন্ত থাকি রাত-দিন; ঠিকমতো ঘুমাতেও পারিনা রাজ্যের দুর্ভাবনায়। মলডোভিয়ার সমাজে সমকামীদের খুব নিচু পর্যায়ের মানুষ মনে করা হয়। সেখানে সমকামী মানে কেবলই নোংরামো আর অনৈতিকতা। সমকামীদের শরীরও বিশ্রীসব রোগে আক্রান্ত ধরে নেয়া হয়। এও মনে করা হয়, সমকামীরা পুরুষ নামের কলংক, অভিশপ্ত মানুষ, কিংবা, পূর্বজন্মের পাপের ফল বয়ে বেড়ায় তারা।

দিন যত গড়াতে লাগলো পুরুষের প্রতি আমার আকর্ষণও ততই বাড়তে লাগলো। হাইস্কুলে পড়ার সময় এডাম নামের এক ছেলেকে আমার খুব ভালো লেগে যায়। ও ছিল ভীষণ হ্যান্ডসাম, স্মার্ট, অসম্ভব পুরুষালি দেখতে। এক সময় আমার সাথে জুডো শিখতো ছেলেটি। আমাদের ক্লাসের কয়েক মেয়ে তার সাথে প্রেম করতে চাইতো। সে কারণে মেয়েগুলোকে আমার প্রতিদ্বন্দী মনে হতো। ওদের আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতাম। ওরা তার গা ঘেঁষে দাঁড়ালে ইচ্ছে করতো তাদের সরিয়ে দিয়ে আমি নিজেই ওর কাছে যাই। এডামের মতো হ্যান্ডসাম ছেলের কাছাকাছি থাকতে পারাটা সৌভাগ্য মনে করতাম আমি। তারপরও, আমার সব চিন্তা, অনুভূতি গোপনেই রাখতে হতো সঙ্গতকারণেই। ভয় হতো, আমার মনের আসল অবস্থা প্রকাশ পেলে কেমন বৈরী পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হতে পারে আমার, পাছে আবার একা হয়ে না পড়ি।

অনেক ভেবেচিন্তে এডামের সাথে সমকাম নিয়ে গল্প শুরু করে দেব ঠিক করলাম। কারণ, এ নিয়ে আলোচনা করলেই বোঝা যাবে সে আসলে সমকামিতা নিয়ে কি ভাবে। পরে জানলাম, তার মতে সমকামীরা হলো জেনেটিক ত্রূটির ফল, এবং, এডামের ভাষায়, সমকামীদের উচিত খুব কম বয়স থেকেই মানসিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করা। এডামের সাথে একমত না হলে আমাদের বন্ধুত্ব হুমকির মুখে পড়বে জেনে অগত্যা আমিও তার সমর্থক বনে গেলাম। তার সাথে সুর মিলিয়ে আমিও বেশ এক হাত নিলাম সমকামীদের উপর।

এডামের সাথে কথা বলার সে রাতে আমি হয়ে পড়েছিলাম চরম হতাশাগ্রস্থ, দিশেহারা। মা বাবার পিড়াপীড়িতেও কিছু না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে অঝোরে কেঁদেছিও। অথচ, এ এডামকে নিয়ে কত সুন্দর স্বপ্নই না বুনেছি আজ কতদিন। কার কাছে, বা কোথায় গেলে আমার এ সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবো তার হিসেব কোনোভাবেই মেলাতে পারছিলাম না। এ অবস্থায় সাধু-সন্ন্যাসীর একাকী জীবনই আমার শ্রেয় মনে হতে লাগলো আশপাশের মানুষের সাথে মেলামেশার চেয়ে। আমি কেবল একা থাকতে চাই। এডামকে যে আমি ভুলতে পারি না! ওর নিষ্পাপ মুখ, হাসি, পেশল বাহু, প্রশস্থ বুক, সবই তো ঈশ্বর আমার জন্যেই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু না, আমার সে স্বপ্ন পূরণ হলো না। ওই যে মেয়েগুলো তার গা ঘেঁষে দাঁড়াতো, তাদেরই একজন, এমিলি, আমার সে আরাধনার জায়গাটুকু দখল করে নিয়েছে কিছুদিন হলো। তারপরও, আমি কাউকে কিছু বুঝতে দেই না; না এডাম, না এমিলিকে। বন্ধু এডাম, তার গার্লফ্রেন্ড এমিলি আর আমি মিলে আজও নিয়মিত আড্ডা দেই, রেস্টুরেন্টে এক সাথে খাই, বারে যাই, মদ খাই। শুধু এডামকে মুখ খুলে বলতে পারি না সে কতটা আমার! এডামের কারণে আজ আমার বুকের ভেতরটা পুড়ে ছারখার, যদিও এর কিছুমাত্রও সে জানে না; হয়তো জানবেও না কোনোদিন।

কল্পনারও অতীত এক কঠিন সময় পার করছিলাম আমি। তাও হাইস্কুল, মানে, উচ্চমাধ্যমিক, ঠিকভাবেই পাশ করেছিলাম। কষ্ট হলেও মেনে নিয়েছি, আমাকে এ সমস্যা নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে, পড়ালেখা শেষ করে জীবনে মানুষ হতে হবে। তাই, মনের ভেতরে যেমনই হউক, বাইর থেকে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের খোলস আমাকে রাখতেই হবে; নইলে এ সমাজে আমার জায়গা কোথায়? চারপাশের চেনা-অচেনা মানুষগুলোর ভিড়েই তো কেটে যাবে আমার এ অভিনয়-জীবন। কিন্তু, আমি কি এভাবে দুর্বল কাপুরুষের লুকোচুরির জীবন নিয়ে বেঁচে থাকবো আমরণ? খুব দীর্ঘ না হলেও মানুষের জীবন তো খুব ছোটোও না। এছাড়া দুর্দিনের সময়গুলো হয় আরো দীর্ঘ। তাই, এ জীবন কাটাতে প্রয়োজনে প্রতিবাদের ভাষা ছুঁড়ে দেয়ার মতো সামর্থ ও শক্তি আমার চাই। নিজের সুরক্ষায় হলেও এ শক্তিটুকু আমার একান্ত প্রয়োজন। ভাবলাম, পুলিশে যোগ দিয়ে পুলিশ অফিসার হয়ে গেলে কেমন হয়? ক্ষমতা, সম্মান দুইই থাকবে আমার। সমকামী বলে আমাকে গালি দেবে, বাঁকা চোখে দেখবে, বা ভয় দেখাবে সে সাহস আবার কার? তাকে আমি তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করবো, বিচার হবে তার, জেল হবে, জরিমানা হবে, হবে কঠিন শিক্ষা।

যেই কথা সেই কাজ। সফলতার সাথে আমি পাশ করলাম পুলিশ একাডেমিতে প্রবেশের পরীক্ষা। কিসিনাও পুলিশ একাডেমিতে শুরু হলো আমার পুলিশ কোর্স। ড্যানিয়েল নামের এক সহকর্মী ধীরে ধীরে বন্ধুতে পরিণত হলো আমার। রেস্টুরেন্ট আর ক্লাবে একসাথে অনেক সময় কাটালাম দুজনে। দীর্ঘকায় ড্যানিয়েলের নীলচোখ, লোমশ বক্ষ, আর পেশল বাহু নজর এড়ায় কার? আমার স্বপ্নের পুরুষই বটে ড্যানিয়েল! তার প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করলাম আমি। একদিন ক্লাবে ড্যানিয়েলের সাথে লম্বা সময় কাটানোর পর তাকে আমার এপার্টমেন্টে দাওয়াত দিলাম। আড্ডা জমে উঠলো আমাদের দুজনের, প্রচুর মদও খেলাম। নিজ থেকেই সমকামিতার প্রসঙ্গ টেনে এনে তা নিয়ে গল্প জুড়ে দিলাম। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ওর গা ছুঁয়ে ঠাট্টা মশকারাও করতে থাকলাম।

সেও নানা রকমের আদিরসাত্মক জোকস বলছে। আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বুঝিবা সত্যি হতে চলেছে আজ। তাও, ড্যানিয়েলকে সরাসরি কিছু না বলে কেবল ওর গা ঘেঁষে কাছে এসে বসলাম। সুযোগ বুঝে তার ডান হাত আমার বাম হাতে নিলাম, আর, ও কিছু বুঝে উঠার আগেই তার পুরু ঠোঁটজোড়ায় আমার ঠোঁট বসিয়ে দিলাম। আমার কান্ড দেখে ড্যানিয়েল কয়েক মুহূর্তের জন্য পাথরমূর্তি ধারণ করলো। কিন্তু, সে প্রতিবাদ করেনি, বা আমাকে ঠেলে সরিয়েও দেয় নি। এ সুযোগে আমি তার আরো কাছাকাছি হলাম; আরো গভীর করে তাকে বুকে টেনে নিয়ে চুমু দিলাম ওর ঠোঁট, গাল, গলা, বুক সবখানে, পাগলের মতো। তবে, ড্যানিয়েল ছিল নিশ্চুপ, নিথর। রাত গভীর হলে দুজনই এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু, ভোরবেলা ঘুম ভাঙতে দেখি ড্যানিয়েল পাশে নেই, আমাকে না বলেই চলে গেছে।

দুদিন পর যখন পুলিশ একাডেমির করিডোরে ড্যানিয়েলের সাথে দেখা হলো, বুঝলাম, সে আমাকে এড়িয়ে চলছে। সেদিন আর ওর সাথে আগবাড়িয়ে কথা বলিনি। পরদিন আবার দেখা হলে তাকে আড়ালে ডেকে জানতে চাইলাম তার এমন ব্যবহারের কারণ। সে আমাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলো তাকে আর কখনো স্পর্শ না করতে । এও বললো, সে সমকামীদের তীব্র ঘৃণা করে। আমাকে বাড়তি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমার মুখে একটা ঘুষিও বসিয়ে দিলো ড্যানিয়েল। আমার সন্দেহ হলো, ড্যানিয়েল পুলিশ একাডেমির সহকর্মীদের ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছে যে আমি একজন সমকামী। কারণ, এ ঘটনার পর থেকে আমি পুলিশ সহকর্মী এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে চরম অসহযোগিতা পেতে শুরু করি।

সেই থেকে পুলিশ একাডেমিতে প্রায় প্রতিদিনই নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাকে। কি করিডোর, কি ক্লাসরুম, কি বাথরুম, সবখানেই সহপাঠীরা আমাকে গালমন্দ করছে, আর, কারণে-অকারণে ধাক্কাচ্ছে। নিজেকে রক্ষার চেষ্টাও চালাতে পারছি না যদিও আমার শরীরের কাঠামো ওদের অনেকের চেয়ে মজবুত। মারামারিতে নেমেও লাভ হয় না, কারণ, ওরা আসে দলবেঁধে। সংখ্যায় ওরা অনেক বেশি। আমাকে হেনস্তা করার কয়েকটি ঘটনার পর আমি আমার উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ জানালে তারা ওসব হেসে উড়িয়ে দিলেন। গুরুত্ব দিলেন না কেউ আমার অভিযোগে, বরং বললেন, আমাকে আরো শক্ত হয়ে এসব নিজেকেই মোকাবেলা করতে হবে; কারণ, আমি যে অন্যদের চেয়ে আলাদা। এছাড়া আমাকে কে কি বললো তাতে কান না দিতেও বললেন কেউকেউ। আর এদিকে, শারীরিক আক্রমণের পাশাপাশি আমার যৌনতা নিয়ে নানারকম ব্যঙ্গ উক্তিও লিখে রাখা হলো আমার বসার চেয়ার আর ডেস্কে। কদর্য ও নোংরা ভাষার আক্রমণ আমাকে সহ্য করতেই হচ্ছে এ পরিবেশে। পুলিশ একাডেমিতে আমি বন্ধুহীন হয়ে পড়ছি খুব দ্রুতই।

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার সাথে দুর্ব্যবহার বেড়েই চললো। শিক্ষকরা কম নম্বর দিতে শুরু করলেন, সহপাঠীরা আমাকে একঘরে করতে লাগলো, কারণে অকারণে ঝগড়া বাঁধতে লাগলো আমার সাথে। সহ্যের সীমা অতিক্রমের মুখোমুখি আমি। একদিন ক্লাসের পর কয়েক সহপাঠী আমার কাছে এসে চারপাশ থেকে আমাকে ঘিরে ধরলো। কিছু না বলেই একজন আমার মুখে ঘুষি বসিয়ে দিলো; আরেকজন হ্যাঁচকা টান দিলো আমার মাথার চুল ধরে। আমি তাৎক্ষণিক মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম। কয়েকজন লাথি মারতে শুরু করলো আমার পশ্চাতদ্দেশে, বাকিরা অশ্রাব্য গালিগালাজ। আঘাতের তীব্রতায় আমি একসময় জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখলাম আমি পুলিশ একাডেমি হাসপাতালে। অবশেষে ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এক কমান্ডার আমাকে দেখতে এলেন। তাঁকে আমি আসল ঘটনা বলতে ভয় পাচ্ছিলাম, কেননা, আমার সমকামী পরিচয় শোনার পর তাঁর কাছ থেকে কি ধরণের ব্যবহার পেতাম তা আমি আগের ঘটনাগুলো থেকে আগেভাগেই বুঝতে পেরেছি। সবদিক ভেবেচিন্তে আমি তাঁকে কেবল বলেছি, আমাকে কেন মারধর করা হলো তা নিয়ে আমার পরিষ্কার ধারণা নেই। তবে, কারা আমাকে মেরেছে তাদের নামগুলো বলেছি বিচার পাবার প্রত্যাশায়।

পরিস্থিতির দিনদিন অবনতি ঘটতে লাগলো। এমন বৈরী পরিবেশে আমি আর পুলিশ একাডেমিতে থাকার সাহস পাচ্ছিলাম না। সীমাহীন হতাশায় হাবুডুবু খাচ্ছিলাম আমি। আমি জানতাম আমার জীবন ক্রমশঃ অনিরাপদ হয়ে পড়ছে সেখানে, কিন্তু, কোথায় বা কার কাছে যাবো তা ঠিক করতে পারছিলাম না। তারপরও স্থির করলাম, আমি পুলিশ একাডেমী ছেড়ে কোথাও যাবো না আপাতত:। যে করেই হউক পুলিশ কোর্স শেষ না করা পর্যন্ত আমি এখানেই থাকবো। এ আমার সংকল্প, আমার প্রত্যয়।

এক সন্ধ্যায় আমি কিছুটা রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি পুলিশ একাডেমি লাইব্রেরিতে। কারণ, দুদিন পর একটা বড়ো কুইজ ছিল আমাদের। সাব্জেক্টটাও ছিল বেশ কঠিন। ‘ইন্টারকালচারাল কম্যুনিকেশন্স ইন পুলিশিং’ এর দুর্বোধ্য বিষয়গুলো হজম করে পরীক্ষায় ঠিকমতো উত্তর লেখা চাট্টিখানি কথা নয়। প্রথম কুইজে অর্ধেকেরও বেশি ফেল করেছে। সে রাতে পড়াশোনা শেষ করে আলো আঁধারিতে বাস স্টপের উদ্দেশ্যে হাঁটছিলাম আমি। হঠাৎ দেখলাম, আমার সহকর্মীদের একজন, ডেভিড, দুজন অপরিচিতকে সাথে নিয়ে কোন দিক থেকে যেন আমার দিকে দৌঁড়ে এলো। খুব কাছে এসে তারা আমাকে গালমন্দ করতে লাগলো অতর্কিতে, আর, তাদের সাথে মারামারি করার আহবান জানাতে লাগলো আমাকে। ডেভিড তেমন শক্তিশালী না হলেও বাকি দুজন আমার মতোই শক্ত গাঁথুনির যুবক। নইলে মারামারির চ্যালেঞ্জ হাসিমুখেই গ্রহণ করতাম আমি।

এ অবস্থায় এড়িয়ে যেতে চাইলেও পারলাম না। ওদের একজন আমাকে ধাক্কাতে শুরু করে দিলো। অদূরে বাসস্ট্যান্ডে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখলেও হয়তোবা ভয়ে এগিয়ে এলো না। সহসাই তিনজন মিলে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। বেশিরভাগ আঘাত লেগেছে আমার মাথা আর পেটে। আমার ব্যাকপ্যাক পড়ে রইলো একদিকে; আর, আমি মেঝেতে অর্ধশোয়া অবস্থায় আছি পড়ে। তাও কাপুরুষেরা থেমে নেই। আমার শিরদাঁড়ায় লাথি মেরে উচ্চঃস্বরে গালি দিয়ে চলেছে: ‘লাথি হজম কর হোমো বাস্টার্ড, এটাই তোর প্রাপ্য।’ একসময় আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরতে দেখলাম আমার কাছেই বয়স্ক এক পুরুষ ও ভদ্রমহিলা উপস্থিত। মহিলা আমার মুখে পানি ছিটিয়ে চলেছেন, আর, ভদ্রলোক ফোন করে হাসপাতালের এম্ব্যুলেন্স ডাকছেন। এম্বুলেন্সে আমাকে তুলে দিয়ে এ যুগল চলে গেলেন। নাম পরিচয় জানতে চাইলেও কিছু বললেন না তাঁরা। আমাকে আক্রমণের পুরো ঘটনাই হয়তো তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন।

সে বার বুকের পাঁজরের দুটো ভাঙা হাঁড় আর শরীরে অসংখ্য কাটা দাগ নিয়ে আমি তিনদিন হাসপাতালে ছিলাম। যে পুলিশ অফিসার ঘটনা তদন্তে হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি আমাকে বলে গেছেন আমি নাকি পুলিশ বিভাগের কলংক। আমার কারণে নাকি গোটা পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, আমার উপযুক্ত স্থান নাকি হাসপাতাল নয়, জেলখানা। কার্যতঃ, তদন্ত বলে তেমন কিছু হয় নি। ফলে, আমাকে যারা এভাবে মেরে শয্যাশায়ী করেছে তারাও থেকে গেছে অধরা।

খানিক সুস্থ হবার পর আমি কমান্ডিং অফিসারের কাছে গিয়ে আমাকে যারা মেরেছে, বিশেষ করে, ডেভিডের নামোল্লেখ করে অভিযোগ দাখিল করেছিলাম। আমার সমকামিতার পরিচয় শুনে কমান্ডার অস্বস্থিবোধ করে আমাকে পুরো ঘটনা আর বলতেই দিলেন না। আরো বরং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুলিশ বিভাগ থেকে বিদায় নিয়ে পুলিশকে কলংকমুক্ত করার পরামর্শ দিলেন আমাকে। তাঁর ভাষায়, পুলিশ অফিসাররা সমকামিতা কখনোই মেনে নেবে না, কারণ, মলডোভিয়ার সমাজে তা অগ্রহণযোগ্য ও ঘৃণ্য অপকর্ম বলে বিবেচিত। আর, সাধারণ মানুষের চিন্তাচেতনা বা মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে পুলিশ নিজেদের বিতর্কিত করবে না এ কথাও আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন।

এর সপ্তাহ তিনেক পর ডেভিড আবার আমার সামনে এলো আরো দুই সহকর্মীকে সাথে নিয়ে। আমি যে উর্ধতন পর্যায়ে ওদের ব্যাপারে অভিযোগ করেছি তা তারা জানে বলে তর্জন-গর্জন করে আমাকে জানালো। সে সাথে হুমকি-ধমকি দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি পুলিশ বিভাগ ছেড়ে যেতে বললো। দুধারে ধারালো ইঞ্চি দশেক লম্বা এক চকচকে ছুরিও আমাকে দেখানো হলো বাড়তি ভয় দেখাতে। আর, পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে না গেলে আমাকে হাওয়া করে দেবার কথাও বলা হলো। আমাকে নাকি এমনভাবে গুম করা হবে যেন আমার বাবা-মাও আমার অস্তিত্ব খুঁজে না পান। হাত পা বেঁধে আমাকে আস্ত ছুঁড়ে ফেলা হবে এসিড-ভরা পাত্রে যাতে আমার হাড়গোড় পর্যন্ত গোলে যায়। আমার মতো পাপীষ্ঠের নাকি সে রকম কঠিন মৃত্যুই প্রাপ্য। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম ওদের হুমকিতে। আমি জানতাম, পুলিশ বিভাগের সহকর্মীদের এসব আর বলেও কোনো লাভ হবে না। কারণ, বুঝাই যাচ্ছে, আমার বিপরীতে তারা দল বেঁধেছে। এরা তো ওদেরই লোক। জীবন যখন এতটাই বিপন্ন, এখান থেকে পালানোই আমার জন্য বুদ্ধির পরিচয়, যা দেরিতে হলেও বুঝেছি। অবশেষে পুলিশ বিভাগ ছেড়েই দিলাম।

বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান আমি। বাবা গাড়ির মেকানিক; মায়ের আছে ছোট্ট একটা মুদির দোকান। বাবার স্বপ্ন ছিল তাঁদের একমাত্র ছেলে, এই আমি, শিক্ষিত হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবো একদিন। বাবা গর্ব করে বলতেন, ‘আমি হয়েছি গাড়ির মেকানিক, আর আমার ছেলে হবে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।’
সম্মান, অর্থ, দুইই হবে আমাদের। আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি, তখন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরলে মা চাইতেন তাঁর মুদি দোকানে গিয়ে তাঁকে আমি একটু সাহায্য করি। বাবা তাতে বাঁধ সাধতেন। বাবা চাইতেন সময় নষ্ট না করে আমি যেন পড়ালেখা করি। অনেক প্রতিভাবান হয়েও অর্থাভাবে পড়ালেখায় আমার বাবা তেমন আগাতে পারেননি। হয়তোবা উচ্চ শিক্ষার তাঁর গোপন স্বপ্নই আমাকে দিয়ে বাস্তবায়ন করতে চাইতেন বাবা। বাবা-মা’র সে আশা পূরণের স্বপ্ন আমারও ছিল; কিন্তু, প্রকৃতি তাতে সায় দেয় নি। ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বাবার আকাঙ্খার বাস্তব রূপ দিতে পারিনি এ হতভাগা আমি।

সমকামী হবার কারণে আমার মনে হতো, সমাজে ভালোভাবে বাঁচতে হলে আমাকে এমন একটি জীবন গড়ে তুলতে হবে যাতে আমি নিজের সুরক্ষায় প্রয়োজনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি। তাই, পুলিশ অফিসার হয়ে একটা ঝামেলামুক্ত ও নিরাপদ জীবন গড়ে তুলবো ঠিক করেছিলাম আমি। পুলিশ অফিসার হতে পারলে আমার সাথে থাকবে অস্ত্র, ক্ষমতা আর সম্মান। কিন্তু, বাস্তবতা তা হতে দিলো না। আমার ইঞ্জিনিয়ার না হবার বিষয় বাবা-মা এতদিনে মেনে নিয়েছেন হয়তোবা; কিন্তু, আমার সমকামিতার খবরটি তাঁরা মেনে নেবেন কি করে? তাঁদের কানে এ সংবাদ পৌঁছার আগেই যেন আমার মরণ হয়। তাই, বাবা-মার কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করি সবসময়। তাদের মনে কষ্ট দেব সে আমার কল্পনারও অতীত একটি ব্যাপার। তাই, পুলিশ বিভাগ ছেড়ে দেয়া নিয়ে তাদের কেবল বলেছি, পুলিশের কর্মকান্ড খুব কাছ থেকে দেখে তা ভালো লাগেনি আমার; এ কারণে আমার আর পুলিশ হতে মন চাইছে না। মিথ্যে না বলে আমার আর বিকল্পই বা কি ছিল? ভগবান নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করবেন।

পুলিশ একাডেমি ছেড়ে দিলেও আমি কিসিনাও’তেই থেকে গেছি। অতীতের দুর্দশা ভুলে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চাইছি আবার। মনে বেশ প্রশান্তি এসেছে পুলিশ একাডেমি ছেড়ে দিয়ে। আর যাই হউক, অন্ততঃ সহকর্মী পুলিশের হাতে তো আর নির্যাতিত হতে হচ্ছে না। ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পেয়েছি মনে হলো, যেন বুকের উপর থেকে ভারী একটি পাথর সরে গেলো। তবে সমস্যা হলো, পুলিশের অভিজ্ঞতা দিয়ে বাইরে চাকুরী পাওয়া কঠিন। অবশেষে খণ্ডকালীন নির্মাণ কর্মীর চাকুরী খুঁজে পেলাম এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে। আমার অতীতের পুলিশি অভিজ্ঞতা তাদের কাছে বলিনি। কারণ, আমি চাই না কেউ আমার অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করুক। অনেক তো হলো, এবার নির্জঞ্ঝাট একটা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন চাই। কারো সাথে বন্ধুত্ব গড়ার চিন্তাও আপাততঃ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম।

জিমে যাওয়া আমার পুরোনো অভ্যাস। সেদিন জিমে ট্রেনিং করার সময় এক ছেলেকে আমার হাতে ওজন তুলে দিতে অনুরোধ করতেই সে সহাস্যে এগিয়ে এলো। নাম তার পিটার। পরে আমিও পিটারকে আগ বাড়িয়ে জিমে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করেছি। ক্রমে দুজনের বন্ধুত্ব হলো। আসলে বন্ধুতা এমন এক জিনিস যা আপনি চাইলেও হয়তো হবে না, আবার না চাইলেও হয়ে যায়। এ এমন এক বিষয় যা আগে থেকে বলে দেয়া যায় না। এই সেদিনও তো আমি ঠিক করেছিলাম আর কারো সাথে বন্ধুতা করবো না; আর এখন? পিটার এখানকার এক দোকানের সেলসম্যান। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অসাধারণ যুবক সে। কিছুটা লাজুক স্বভাবের এ ছেলেটিকে আমার ভালো লেগে গেলো। আমাদের দুজনের অনেক মিল। যেমন, আমি নিয়মিত জিমে যাই, পিটারও; আমি যেসব মিউজিক ভিডিও পছন্দ করি পিটারও তা-ই করে; আমার প্রিয় লেখকদের প্রায় সবাই তারও প্রিয়।

এর পরের ছয় সপ্তাহ সপ্তাহে দুবার, এমনকি তিনবারও আমরা জিমে এক সাথে ট্রেনিং করেছি। পিটারকে আরো ভালো করে জানার চেষ্টা করেছি ফাঁকে ফাঁকে। যত দিন যাচ্ছিলো, পিটারের প্রতি আমার দুর্বলতা বেড়েই চলছিল। আমার ধারণা সেও আমাকে কম পছন্দ করে না, তাও আগের তিক্ত অভিজ্ঞতা মনে করে তাকে অন্যরকম ভালো লাগার বিষয়টা বুঝতে দিতাম না ঘুনাক্ষরেও। আমাদের দুজনের কারোই গার্লফ্রেন্ড না থাকায় সময় অসময়ে আমার সাথে আড্ডা দিতে পিটারেরও অসুবিধা ছিল না। এ অবস্থায় দুজন দুজনকে মন ভরে সময় দিতে লাগলাম।

এক সন্ধ্যায় জিমে ট্রেনিং করার পর পিটারকে ড্রিঙ্কের জন্য আমার এপার্টমেন্টে আমন্ত্রণ জানালাম। দুজনে মিলে গল্প করছিলাম। সে আমাকে জানালো আমার সাহচর্য তার খুব ভালো লাগে। আমার সাথে তার বন্ধুত্ব যেন আজীবন অটুট থাকে সে আশাও ব্যক্ত করলো পিটার। কথাগুলো বলতে বলতে সে আমার খুব কাছে এসে বসলো। এক সময় আমার ঠোঁটের কাছাকাছি হতেই আমি ওকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। পরস্পর বুকে জড়িয়ে ধরে দুজনই ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করতে লাগলাম হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে। ভালোবাসাসিক্ত আমাদের সে প্রথম চুম্বন কত দীর্ঘ ছিল তার হিসেবে রাখিনি। আমরা দুজনে দুজনার পরম আরাধ্য হয়ে পড়লাম নিমেষেই।

কারো কাছে মন খুলে ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ আমার জীবনে এ-ই প্রথম। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে নিজেকেই মনে হলো আজ। আমি ভুলে গেছি অতীতের সকল নিপীড়ন, দুঃখ, যন্ত্রনা আর হতাশা। আমার মনে আজ আর কোনো রাগ নেই, নেই অভিমান। জীবনে যাকে খুঁজছিলাম তাকে যে শেষতক পেয়েই গেলাম। এ স্বপ্ন, না সত্যি? একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড়ো পাওয়া আর কিইবা হতে পারে? পিটারকে পাওয়া জীবনের সবচেয়ে বড়ো অর্জন মনে হলো আমার। পিটারের মনেও আমাকে পেয়ে পরমানন্দ। আমরা দুজন মুক্তবিহঙ্গের মতো যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। মনে মনে বললাম, পুলিশ একাডেমি ছেড়ে দিয়ে কত ভালো সিদ্ধান্তই না আমি নিয়েছি! না হয় পিটারের মতো ছেলের সাথে আমার দেখা হতো কিভাবে? পিটার আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ। তাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না আর। পিটারকে কাছে পেয়ে জীবনের অতীতসব কষ্ট, লাঞ্ছনা ভুলে গেছি। এডাম, ড্যানিয়েল বা ডেভিডের প্রতিও আমার আর কোনো রাগ নেই; আমি ওদের ক্ষমা করে দিলাম।

পিটারদের পূর্বপুরুষরা থাকতেন ইতালিতে। সে সূত্রে ওর মা-বাবা প্রতি বছরই একবার ইতালি ঘুরে আসেন। কিছুদিন পর পিটার জানালো তার পিতামাতা ইতালি থেকে মলডোভায় ফিরেছেন। এ কারণে সে ভয়ে ভয়ে আছে পাছে তারা আমার সাথে পিটারের গোপন সম্পর্কের কথা জেনে যান! তাঁরা কিছু বুঝতে না পারেন মতো আমরা গোপনে দেখা সাক্ষাৎ শুরু করলাম একে অন্যের সাথে। তারপরও কিভাবে যেন খবরটা পিটারের বাবা-মা’র কানে গেছে। পিটারের বাবা একদিন আমাকে ফোন করে তাঁর ছেলের সাথে না মিশতে কড়া সতর্ক করে দিলেন। কেউবা আমাদের একসাথে ঘোরাঘোরি করতে দেখে পিটারের বাবার কানে এ খবর পৌঁছিয়েছে। না হয়, তাঁরা এসব জানবেন কিভাবে?

ফোনের খবর পিটারকে জানানোর পর সেও ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। এরপরও আমরা দুজনে গোপনে কয়েকবার মেলামেশা করেছি। একদিন পিটার আমাকে জানালো, পুলিশ ডিপার্টমেন্টের লোকজনের সাথে তার বাবার ভালো সখ্যতা আছে। সে সুযোগ কাজ লাগিয়ে আমাকে নাজেহাল করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না বলে পিটার ইঙ্গিত করলো। পুরোনো ভয়ভীতি আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো আমার ভেতরটায়। এছাড়া, পিটারকে নাকি তার বাবা মারধরও করেছে যাতে আমার সাথে কখনো না মেশে। বাড়াবাড়ি করলে পরিবারের সম্মান বাঁচাতে পিটারকে হত্যা করতেও দ্বিধা করবেন না বলেও জানিয়েছেন পিটারের বাবা। সে সাথে, এও বলেছেন, আমারও নাকি নিস্তার নেই। কথাগুলো শুনে ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। কি করবো না করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না সে অবস্থায়।

এক সন্ধ্যায় জিম থেকে একা বাসায় ফিরছিলাম আমি। আমার গতিরোধ করে দাঁড়ালো দুই পুলিশ। একজন সরাসরি আমার নাম জানতে চাইলো। নাম বলতেই আমাকে তাদের সাথে পুলিশ স্টেশনে যেতে বললো। আমি কারণ জানতে চাইতেই আমাকে হুমকি ধমকি দিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে দেয়া হলো। জানার সুযোগও দেয়া হলো না আমার কি অপরাধ। গাড়িতে বসা অবস্থায় আবারো আমাকে ধরে নেবার কারণ জানতে চাইলে পাশে বসা পুলিশ কষে এক চড় দিলো আমার গালে। নিতান্তই অসহায় আমি। পুলিশ স্টেশনের কথা বলে গাড়িতে তুললেও আমাকে তারা বনাঞ্চলের দিকে নিয়ে চলেছে। আজই মনে হয় আমার শেষ দিন। মনে মনে ঈশ্বরের নাম জপতে লাগলাম। বললাম, ভগবান তোমার সৃষ্টিকে তুমি ছাড়া রক্ষা করার কেউ নেই আজ। তোমার ইচ্ছেয় নিজেকে সপে দিলাম।

অফিসারদের দুজনেরই তিরিশের কোটায় বয়স। একজন সুঠামদেহী কিছুটা খাটো, অপরজন বেশ লম্বা। শহর থেকে দূরে বনাঞ্চলে গাড়ি থামিয়ে আমাকে নামানো হলো। আমাকে হা করতে বলা হলে হা করলাম। খাটোমতো অফিসার বন্দুকের ব্যারেল আমার হা করা মুখে খানিক ঢুকিয়ে দিয়ে ট্রিগারে আঙ্গুল বসালো। ভয় দেখালো যে কোন মুহূর্তে ট্রিগার টেনে আমাকে শেষ করে দেবার। সাথে অশ্রাব্য গালিগালাজ তো চলছেই। আর, লম্বা অফিসার হুঙ্কার দিয়ে বললো, এ শহর ছেড়ে পালাবার এটাই শেষ সুযোগ আমার। আবার দেখা পেলে নির্ঘাত মৃত্যু। হুমকির সাথে চললো মারধর। এভাবে বনে ফেলে রেখেই গাড়ি নিয়ে রাতের আঁধারে উধাও হয়ে গেলো ওরা দুজন। আমি অনেক কষ্টে পায়ে হেঁটে শহরে এসে ঢুকলাম। ভগবান আমাকে এ যাত্রাও বাঁচিয়ে দিয়েছেন দেখে অবাক হলাম। অথচ, এ-ই ঈশ্বরেরই অস্তিত্ব আছে কি নেই তা নিয়ে আমি থাকি গভীর সন্দেহে। এতটা উদার বলেই বুঝিবা তিনি মানুষ নন, ঈশ্বর।

ভয়ঙ্করসব অভিজ্ঞতা নিয়ে ভয়ে-অস্থিরতায় আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। জীবনের পদে পদে হাজারো বাঁধা মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাকে সমকামিতার কারণে। জীবন মানেই আমার কাছে ঝুঁকির দুর্গম পাহাড়, বা ধূসর মরুভুমি। কোথাও কোনো জলাধারও নেই যে আমার শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া বুকের ভেতরটা কিঞ্চিৎ ভিজিয়ে নেবো। বড়ো দুর্ভাগা, গন্তব্যহীন জীবন আমার। এমন বিবর্ণ জীবনই কি আমি চেয়েছিলাম? ভয় আর হতাশা ভরা এ বিভৎস্য জীবন আমাকে বিরাটকায় এনাকোন্ডার মতো আধগেলা করে রেখেছে: না পারছি ছেড়ে যেতে, না পারছি জীবনকে নিজের করে নিতে। প্রিয় জন্মভুমি, মলডোভার সমাজ আমাকে গ্রহণ করেনি, করবেও না কোনোদিন। পিতামাতাও জানে না আমার আসল পরিচয়; যে কারণে আমি নিজের মতো করে নিজেকে দাঁড় করাতে পারিনি, বা ভালোবাসার কাউকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারিনি মুক্তমনে। ভয়ভীতি, অনিশ্চয়তা আমার পিছু ছাড়েনি মুহূর্তের জন্যেও।

বুঝতে বাকি নেই, পৃথিবীর আর যে দেশই হউক অন্ততঃ মলডোভা আমার জন্য নিরাপদ নয়। পুলিশ একাডেমির সবাই আমাকে সমকামী হিসেবে চিনতো বলে আমার সমস্যা নিয়ে কাউকে কিছু খুলে বলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। নতুন করে তাদের কাছে সাহায্য চাইতে যাওয়াও হবে অরণ্যে রোদন। তাছাড়া, কখনো যদি আমার জন্মদাতা পিতামাতা আমার আসল পরিচয় জেনে ফেলেন তা তাঁদের জন্যও হবে চরম অপমান, হতাশা ও লজ্জার। তাঁরা আমাকে যে পরিমান ভালোবাসেন তার প্রতিদানে আমি তাঁদের কিছুই দিতে পারিনি; এ আমার ব্যর্থতা। এ অবস্থায় তাদের উপর বাড়তি কলংক বা, অপমানের বোঝাই বা চাপাই কি করে? কোন মুখে বাবা-মার্ কাছে সমকামী পরিচয়ে ফিরে যাবো আমি? তাঁরাই বা তা মলডোভার সমাজে মেনে নেবেন কি করে? উপায়ন্ত, দিশাহীন পথ চলতে চলতে আমি ক্লান্ত; তবু জীবনের অস্তিত্ব তো অস্বীকার করতে পারি না। আমিও যে জীবনকে ভালোবাসি। আর সব মানুষের মতো আমারও যে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু রয়েছে। জীবন বাঁচাতে আমাকে প্রিয় জন্মভূমি মলডোভা ছেড়ে পালাতেই হলো শেষতক। এক দালালের সহায়তায় ইসরাইলি ভুয়া পাসপোর্ট জোগাড় করে কানাডা পালিয়ে এসেছি কেবল দুদিন হলো। কানাডিয়ানরা সমকামীদেরও মানুষ মনে করে, সসম্মানে বাঁচার সুযোগ করে দেয় তাদের। তাই, এ মুহূর্তে এরাই আমার ঈশ্বর, ভিন্নরূপে।
Flag Counter


8 Responses

  1. prokash says:

    আত্নজৈবনিক, আধুনিক গল্প। লেখকের সাহস ভালো লেগেছে। সাহিত্যও রয়েছে লেখায়। ধন্যবাদ লেখককে।

  2. L Gani says:

    এ গল্প লিখতে আমাকে একাধিক সমকামীর সাথে কথা বলতে হয়েছে। বিষয়টা নিয়ে আরো ভালো জানতে পড়াশোনাও করতে হয়েছে। আমি মনে করি সমকামীদের নিয়ে সাধারণের সঠিক জ্ঞান থাকা উচিত। এ লেখায় সে জ্ঞানচর্চার চেষ্টাই ছিল আমার। কতটুকু সফল হয়েছি তার মূল্যায়ন সম্মানিত পাঠকবৃন্দের উপর ছেড়ে দিলাম।

    মাত্র কয়েক ঘন্টায় অর্ধসহস্র বন্ধু গল্পটি পড়েছেন। এ ভিত্তিতে বলা চলে লেখাটি পাঠকনন্দিত হয়েছে। বিডিনিউজে ২৪.কম’এর প্রতি কৃতজ্ঞতা এমন একটি ‘সাধারণের এড়িয়ে চলা’ বিষয়ে গল্প ছেপে উদারতা, ও একই সাথে, সাহস প্রদর্শনের জন্য। দূরের কাছের সকল পাঠককে ধন্যবাদ। এছাড়া প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য Prokash’কে বিশেষ ধন্যবাদ।

  3. zabed amin says:

    অসাধারন লেখা! মনে হল সত্যিকারের এক সমকামি তার কাহিনি বলে গেছে। সমলিঙ্গের প্রতি তার আকর্ষণ, প্রেমানুভুতি, সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক নীপিড়ন, এই যে ‘আনকেয়ার্ড ফর’ স্টেটাস- সবকিছু ফুটে উঠেছে লেখকের দুর্দান্ত কলমে। মনোজাগতিক বিশ্লেষণে লেখক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বিডিনিউজকে শুভেচ্ছা এমন সাহসী লেখা প্রকাশের জন্যে।

  4. chandar sikder says:

    I think the writer was talking about himself…. is he a homo? I think so ….

  5. L Gani says:

    আপনার কমেন্ট পড়ে ধারণা হলো আমি চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছি। লেখক হিসেবে আমার কাছে এ এক বড়ো পাওয়া। Uncommon মন্তব্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জনাব শিকদার।

  6. L Gani says:

    ধন্যবাদ জনাব জাবেদ আমিন ও জনাব প্রকাশ। গল্পটি আপনাদের ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম।

  7. Arnab R says:

    গল্পে একটি জটিল মানবিক সমস্যার কথা নিপুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লেখক তার সংবেদনশীল মননে সমস্যাটির বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। ভাষা শৈলীও চমৎকার, তবে ঈশ্বরের কৃপায় গল্পের মূল চরিত্রের বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটি বেমানান ঠেকেছে। কোন ঐশী গ্রন্থে ঈশ্বরকে কখনো সমকামীদের প্রতি দরদী হতে দেখে নি!

  8. L Gani says:

    ভিক্টর ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান হলেও ঈশ্বর তার প্রতি নির্দয় হন নি। ঈশ্বরের বিশালতা বুঝাতেই ভিক্টরকে মরতে দেইনি। আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য অশেষ ধন্যবাদ জনাব অর্ণব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.