প্রবন্ধ

দার্শনিকের মগ্নতা এবং ইতিহাসের পঙ্কিল পথ

দেবাশিস চক্রবর্তী | 21 Jun , 2018  


পিথাগোরাস, অগাস্টাস ন্যাপ (১৯২৬)

গৌতম বুদ্ধের প্রায় সমসাময়িক আয়নীয় গ্রিক গণিতবিদ, দার্শনিক পিথাগোরাস (খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৫৭০-৪৯৫) মৃত্যুর আড়াই হাজার বছর পরেও এই যান্ত্রিক সভ্যতার অংশ হয়ে আছেন। আজও প্রতিটি স্কুলগামী শিক্ষার্থীর মননকে যৌক্তিকতার আলোয় উদ্ভাসিত করছেন পিথাগোরাস। যদিও ভুল শিক্ষা পদ্ধতিতে এই যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুভবের আনন্দ শিক্ষার্থীরা কতটুকুই বা পায় তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। সংখ্যাতাত্ত্বিক যুক্তি এবং আজকে নিজের নামেই পরিচিত উপপাদ্যগুলো প্রকাশের মাধ্যমে পিথাগোরাস মানব ইতিহাসে গণিতের এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিলেন । আসলে এর মাধ্যমেই পৃথিবী বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মত ধারণার দিকে এগিয়ে যায়। সময়ের পরিক্রমায় তার ধারণাগুলো ছড়িয়ে গেছে প্লেটো, কোপার্নিকাস, দেকার্ত, কেপলার, নিউটন এবং আইনস্টাইনের মানসে। তাদের যৌক্তিকবোধের কাঠামো পিথাগোরাসের ধারনাগুলোরই উত্তরাধিকার। বৈজ্ঞানিক অর্জন ছাড়াও পিথাগোরাস আমাদের সামনে নিয়ে আসেন একটি নতুন শব্দ “দার্শনিক (Philosopher)” । নিজেকে আখ্যায়িত করেন “জ্ঞানের প্রেমিক” হিসেবে। এ ভালবাসাকে তিনি মানব জীবনে দর্শনের ব্যবহার হিসেবে আবদ্ধ করেন এক পরিমিত, ধ্যানমগ্নতায়। সিসেরোর বর্ণনায় দেখা যায়, ফ্লাইয়াসের শাসক যুবরাজ লিওনের সাথে পিথাগোরাস খ্রিস্টপূর্ব ৫১৮ এর অলিম্পিক গেমসে উপস্থিত ছিলেন। পিথাগোরাসের বহু বিষয়ে গভীর জ্ঞানের পরিচয়ে যুবরাজ লিওন পুলকিত হয়ে যান। একসময় পিথাগোরাসকে প্রশ্ন করেন কেন তিনি কোন একটি বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হয়ে একজন “দার্শনিকের” জীবন যাপন করছেন। পিথাগোরাস এই প্রশ্নের উত্তরে যে উক্তিটি দিয়েছিলেন তা পাওয়া যায় সাইমন সিংয়ের মনমুগ্ধকর Fermat’s Enigma: The Epic Quest to Solve the World’s Greatest Mathematical Problem বইটিতে ।


“ জীবনকে… তুলনা করা চলে জনসাধারণের এই খেলার সাথে কারণ এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছে কিছু একটা অর্জনের আশায়, অন্যরা খ্যাতি ও গৌরবের আশায় এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত হয়ে। কিন্তু তাদের মধ্যে এমন কয়েকজন আছেন যারা এখানে এসেছেন পর্যবেক্ষণ করতে এবং যে সমস্ত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তা বুঝতে।
জীবনও একই রকম। কেউ কেউ সম্পদের আকর্ষণে প্রভাবিত হয় এবং অন্যেরা অন্ধভাবে শক্তি ও আধিপত্যের জন্য এক পাগল জ্বরে পরিচালিত হয়, কিন্তু সেরা মানুষ নিজেকে নিজের জীবনের অর্থ এবং উদ্দেশ্য আবিষ্কারের জন্য নিয়োজিত করে। সে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করতে চায়। এই মানুষটিকে আমি দার্শনিক বলে অবিহিত করি যদিও কোন ব্যক্তি সকল বিষয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞানী নন, তিনি প্রকৃতির রহস্যগুলোর চাবিকাঠি হিসেবে জ্ঞানকে ভালোবাসতে পারেন।”
পিথাগোরাস তাঁর স্কুল প্রতিষ্ঠাকালে সে সময়ের হিসেবে বৈপ্লবিক এক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর স্কুলে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানান। এর ফল স্বরূপ পরবর্তী সময়ে পিথাগোরাসের শিক্ষার পরম্পরায় মহান সব শিক্ষার্থীর মধ্যে আমরা পাই হাইপেশিয়ার মত এক মহান নারী চিন্তককে। বিজ্ঞান বক্তা আসিফ হাইপেশিয়াকে বলেছেন “খ্রিস্টাব্দের কান্না” ।


হাইপেশিয়ার কাল্পনিক প্রতিকৃতি।

আসিফ তার “মহাজাগতিক আলোয় ফিরে দেখা” বইটিতে হাইপেশিয়া এবং আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার সম্পর্কে লিখেছেন,
“আর এই সমস্ত মহান মানুষের মধ্যে ছিলেন এক মহান নারী, যিনি এই গ্রন্থাগারের গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার সাতশত বছর পর এর ধ্বংসের সাথে এই নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু জড়িয়ে আছে- আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের শেষ প্রাণ-প্রদীপ হিসেবে তিনি কাজ করেছিলেন। তিনি ৪০০ অব্দে দর্শনের নব্যপ্লেটোনিক ধারার স্কুলের প্রধান হয়েছিলেন, জানা যায় তিনি নাটকও লিখতেন- তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কর্মকাণ্ড যে কোন যুগের যে কোন মানুষের জন্য বিস্ময়কর। এই নারীর নাম ছিল হাইপেশিয়া (Hypatia), জন্মগ্রহণ করেছিলেন আলেকজান্দ্রিয়াতে ৩৭০ খ্রিষ্টাব্দে । … মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তাঁকেসহ তাঁর সমস্ত কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়ার ফলে তাঁর সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা সম্ভব হয় নি। এভাবেই ৪১৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তিনিই প্রথম নারী যিনি গণিতে বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। বলা হয়ে থাকে ইউক্লিডের পড় আলেকজান্দ্রিয়াতে এত বড় গণিতজ্ঞের আর জন্ম হয় নি।
… সে সময় নীলনদের নিকটবর্তী পুরো আলেকজান্দ্রিয়া নরগটাই দখল করে ফেলেছিল খ্রিস্টানরা। তাদের প্রশ্ন ছিল কে এই হাইপেশিয়া? নারী তো? নারী কী জানবে দর্শনের, বিজ্ঞানের? অথচ অনুগামীদের কাছে হাইপেশিয়া ছিলেন মিনার্ভার মতো জ্ঞানময়ী, দেবরাজ্ঞী জুনোর মতো মর্যাদাময়ী… খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের প্রথম লক্ষ্য ছিল হাইপেশিয়ার বক্তৃতামঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে মিথ্যা প্রমাণ করা এবং ছাত্রদের আসতে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু তাতেও যখন তাঁকে থামানো গেল না তখন আর্চবিশপ সিরিল তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় খ্রিস্টান ধর্মের পথ প্রশস্ত করার জন্য। এদিকে হাইপেশিয়া ব্যক্তিগত মারাত্মক বিপদের খাঁড়ার মধ্যে চালিয়ে গেলেন তাঁর জ্ঞানসাধনা, শিক্ষা দেয়া ও প্রকাশনার কাজ, যে পর্যন্ত না ৪১৭ খ্রিস্টাব্দে, তাঁর কর্মস্থলে যাওয়ার পথে সিরিলের প্ররোচনায় যাজকপল্লীর একদল ক্রুব্ধ জনতা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, শকট থেকে টেনে নামায়, তাঁর সমস্ত পরিধেয় বস্ত্র টুকরো টুকরো করে এবং ঈষৎ সর্পিল ঝিনুকের অস্ত্রে, তাঁর হাড়গুলো থেকে মাংস ছাড়িয়ে নিয়ে হত্যার তাণ্ডবলীলায় নামে। তাঁর দেহাবশেষ পুড়িয়ে ছাই করা হয়, তাঁর কীর্তি, কর্মকাণ্ড নিশ্চিহ্ন করা হয়, সেইসাথে তাঁর নাম মুছে ফেলানো হয় ইতিহাসের পাতা থেকে। সিরিল অভিহিত হন সন্তের অভিধায়!”
এভাবেই উন্মত্ত খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের হাতে হাইপেশিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু এবং আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের ধ্বংসের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় এক শুন্যতার আর নেমে আসে হাজার বছরের অন্ধকার যুগ। নির্মম পরিহাসের বিষয় এই যে আমরা আজ প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ চাঁদের এক গিরিখাদের নামকরণ করি হাইপেশিয়ার নামে।
এরপর কেটে গেছে আড়াই হাজার বছর। মানুষের পথ চলা থেমে থাকে নি। অন্ধকার যুগ পেরিয়ে অনুসন্ধানী মানুষেরা খুঁজে ফিরেছেন প্রকৃতির রহস্যের সমাধান। গ্যালিলিও, নিউটন, আইনস্টাইনের যৌক্তিক বোধের আলোয় ক্রমান্বয়ে অবসান ঘটে মধ্যযুগীয় অন্ধকার। সুদীর্ঘ শূন্যতা এবং বিপত্তির পরেও মানবজাতি এসে পৌঁছে কোয়ান্টাম মেকানিকসের মত সূক্ষ্ম-জটিল-কিম্ভুতকিমাকার কিন্তু বিমূর্ত বৈজ্ঞানিক ধারণার সামনে। প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের লক্ষ্যে মানবিক কল্পনা আর যৌক্তিক বোধের এ এক অনিন্দ্য সুন্দর অভিব্যক্তি। আর আধুনিক সময়ের বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানও বলেছেন মানব জীবনের লক্ষ্য এবং অর্থ সম্পর্কে। তাঁর The Pleasure of Finding Things Out: The Best Short Works of Richard P. Feynman বইটিতে উল্লেখ করেছেন,

“সকল সময়েই মানুষ তার জীবনের মানে খুঁজে ফিরেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যদি আমাদের কর্মের একটু দিকনির্দেশনা অথবা মানে আরোপ করা হয় তবে এক মহান মানবিক শক্তির উন্মোচন ঘটতে পারে। সুতরাং, এর মানের প্রশ্নে বহু ধরনের উত্তর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো সবই বিভিন্ন রকমের, এবং কোন একটি বিশেষ উত্তরের প্রবক্তারা ভিন্ন মতাবলম্বীদের দেখেছে পরম ঘৃণার দৃষ্টিতে। পরম ঘৃণা, কারণ শুধু মাত্র ভিন্ন মতের উপর ভিত্তি করে একটি জাতির সকল মহান সম্ভাবনাসমূহকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে মিথ্যা এবং অন্ধ গলির নর্দমায়। প্রকৃতপক্ষে, মিথ্যা বিশ্বাসের দ্বারা সৃষ্ট বিপুল সংখ্যক পাশবিকতা থেকে বোঝা যায় যে দার্শনিকেরা হয়তো মানুষের অসীম এবং বিস্ময়কর ক্ষমতাগুলো উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছেন। স্বপ্ন মুক্ত পথটি খুঁজে পাওয়ার।
তাহলে, এর মানে কি? অস্তিত্বের রহস্য উন্মোচন করতে আমরা কী বলতে পারি?
যদি আমরা সব কিছু বিবেচনায় নেই, প্রাচীনেরা যা সম্পর্কে অবগত ছিলেন শুধু তাই নয়, আজকের দিন পর্যন্ত আমরা যা জানি যেসব ব্যাপারে প্রাচীনেরা অজ্ঞাত ছিলেন, তবে আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে আমরা আসলে কিছুই জানি না।
কিন্তু, এটি স্বীকার করে, আমরা সম্ভবত মুক্ত পথটিকেই খুঁজে পাই।”
ফাইনম্যান আসলে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন সত্যান্বেষীর সার্বজনীন দায়িত্ববোধ, আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্কৃতির ভূমিকা এবং বৌদ্ধ দর্শনের এক বিশেষ রূপ যাতে ধ্যান এবং সহজাত অন্তর্দৃষ্টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় ঠিক তার মতোই বিজ্ঞানের জেন্‌ এর কথা।

আর্টস-এ প্রকাশিত দেবাশিস চক্রবর্তীর আরও লেখা:
প্রথম নারী আলোকচিত্রী অ্যানা অ্যাটকিনস

Flag Counter


1 Response

  1. offbd says:

    Lekha ta onek sundor, tobe aro boro kore likhte hoyto.. Finishing ta valo hoy nai.. Pithagoash er por fabinnaco, socretis er nieye o likhben…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.