হারিয়ে ফেলা প্রেম ও বিপ্লবের উপাখ্যান

ফিরোজ এহতেশাম | ২৯ জুন ২০১৮ ১১:২৫ পূর্বাহ্ন

আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের একজন সংবেদনশীল মানুষ, যে কবি হতে চেয়েছিল, চেয়েছিল সর্বগ্রাসী প্রেম ও উত্তুঙ্গ বিপ্লব। অথচ জীবনের বাঁকে বাঁকে যে হারিয়ে ফেলেছে তার স্বপ্ন, কবিতা। যার মাঝে এখন বোবা আর্তনাদের মতো এক উপলব্ধি বিরাজ করে-যে জীবনটা সে চেয়েছিল, এটা সে জীবন নয়। পরিকল্পনা নেই, স্বপ্ন নেই, কবিতা নেই, বিপ্লব নেই। নির্লিপ্ত দাম্পত্য জীবনে মাস শেষে বেতনটাই যার একমাত্র লক্ষ্য। পুরো বছর কেটে গেলেও নিজের কথা যার নিজেরই মনে পড়ে না। যে আসলে হারিয়ে ফেলেছে নিজেকেই।
মাহবুব মোর্শেদের উপন্যাস তোমারে চিনি না আমি পড়ে এমনই এক বিষাদে আচ্ছন্ন হতে হয়। বিষাদটা উপভোগ করি।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রানা রহমান। মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে কৈশোরেই যার ‘অনিবার্য’ প্রণয় ঘটে কাজিনের সাথে। এখানে কাজিন তার খালাতো বোন।
কিছুটা এলোমেলো জীবনযাপনকারী, পরিবার-বিচ্ছিন্ন, বাস্তব ও স্বপ্নের মাঝামাঝি পথ ধরে হেঁটে যেতে থাকা রানার কত বিকাল খরচ হয়ে যায় উৎপ্রেক্ষার খোঁজে নদী তীরে ঘুরে ঘুরে। কলেজে থাকতে জড়িয়ে পড়ে বিকর্ত প্রতিযোগিতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আবৃত্তি সংগঠনে। আরও পরে রাজনৈতিক দলে।
নুরুননাহার, লুৎফুননাহার, মিলা, মিথিলা, পপি, রোজ- কৈশোর ও যৌবনের যাত্রাপথে এই ছয় নারী চরিত্রের সাথেই পর্যায়ক্রমে প্রেম হয় রানার। কোনাটা একপাক্ষিক, কোনোটা দ্বিপাক্ষিক। তবু শেষ পর্যন্ত মনে হয় যে প্রেম সে চেয়েছিল সেই আরাধ্য প্রেম তার জীবনে আসেনি। তাই চূড়ান্তভাবে এক শূন্যতা ও একাকীত্ব গ্রাস করে তাকে। শেষাবধি সব প্রেম এক ধুসর অতীতে পরিণত হয়।
আর আছে এক রহস্যময় চরিত্র সরদার। যে নিজের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানায় না। তবে একসময় বোঝা যায় সে মার্ক্সেও আছে, লালনেও আছে। সে রানাকে পথ দেখায় কিভাবে একজন কবির জীবন গড়ে তুলতে হয়। রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের বিরোধী না হলেও সরদার সচেতনভাবে রানাকে এসব থেকে দূরে রাখতে চায়। এই পথপ্রদর্শক চরিত্রটি রানাকে শুধুই কবিতার প্রতি মনোনিবেশ করতে বলে। সরদার বলে, রানার জন্য সরাসরি বিপ্লবের পথ নয়, তার পথ কবিতার। কবিতার মধ্যেই আসবে বিপ্লবের ইঙ্গিত। (সম্পূর্ণ…)

সানাউল হক খানের পাঁচটি কবিতা

সানাউল হক খান | ২৭ জুন ২০১৮ ৮:৩৬ অপরাহ্ন


অলংকরণ:ফাহমিদা জামান ফ্লোরার চিত্রকর্ম

আমার স্বপ্নমোহবন্ধন

অপরের কাছে থেকে
কতোবার যে নিজেকে
চড়ামূল্যে খরিদ করেছি
তার হিসেব রাখিনি

কতোবার যে নিজেকে
অল্পদামে বিক্রি করে
সেই ভুলেরই মাশুল গুনেছি
তার হিসেবও জানা নেই
অসুখীর হৃদয়ে সুখ দিয়ে
দুুখী মানুষের কাতারে দাঁড়িয়েছি
অভাবীর মতো নষ্ট-স্বভাবে

রৌদ্রকে ছায়া দিয়ে
ছায়াকে রৌদ্র দিয়ে
নাড়িয়ে দিয়েছি প্রকৃতির বুক

আমার ইচ্ছাগুলোই আমার শব্দ
আমার স্বাধীনতা
আমার স্বপ্নমোহবন্ধণ (সম্পূর্ণ…)

কালো আর ধলো বাহিরে কেবল…

কিশোর বিশ্বাস | ২৬ জুন ২০১৮ ৮:৩৭ অপরাহ্ন

এই আগস্টের রাতেও নরম লেপ গায়ে শুয়ে আছে শিপন। আধা আঁধারির ঘরটায় এ.সি-র এল.ই.ডি নির্দেশিকায় চোখ পড়ছে বার বার। ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস । কয়েকবার খুঁজেও রিমোটটা না পাওয়ায় শেষমেশ লেপের তলে। এই কাজ সে আগেও করেছে । গরমে এসি ছেড়ে ঘরে কৃত্রিম শীত বানিয়ে পাতলা চাদর বা কাঁথা গায়ে ঘুম দেবার মজাই আলাদা। কিন্তু এদেশে সেই নকশা করার নকশি কাঁথা কই ? তবে অনেক দিন পর আজ একটা পূর্ণাঙ্গ স্বস্তির ঘুম ঘুমাবে সদ্য চীন প্রবাসী শিপন। অবশেষে তার স্বপ্ন সত্যি সত্যিই সত্যি হল। এখন আর কোন সন্দেহ বা দুশ্চিন্তা নেই । আলাদা কোন লাইন-ঘাট বা সিস্টেম করা ছাড়াও স্কলারশিপটা যে পেয়ে যাবে, এতদিন সে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে নি। তাই প্রথম দিন বিদেশ বিভূঁইয়ে অনাগত অজানাকে পাড়ি দেওয়ার চিন্তা ছাপিয়ে তার মনের সবটা জুড়ে এখন প্রাপ্তির প্রশান্তি। শুয়ে শুয়ে মনের কোণে উদয় হয় ফেলে আসা দেশের কথা আর পথিমধ্যে ঘটে যাওয়া বিচিত্র সব কাহিনী:
— এস্কুজ মি, হয়ার ইজ দা টয়লেট ? (সম্পূর্ণ…)

ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন : রোম্যান্টিকতা, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা

চঞ্চল আশরাফ | ২৫ জুন ২০১৮ ১২:০৩ পূর্বাহ্ন

সাধনা আহমেদ রচিত ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন নাটকের মূল প্রতিপাদ্য প্রেম, তবে এর পল্লবিত রূপ মানবপ্রেমে অভিষিক্ত হয়েছে। এটা নিশ্চিত যে মানবপ্রেমই নাটকটির অভিপ্রায় ও গন্তব্য। একটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এর মূল চরিত্র বোষ্টমী এগিয়েছে, বিন্যস্ত হয়েছে নাটকটির ঘটনা-পরম্পরা। এতে এই বাস্তবতা ফের হাজির হলো– মানুষের কাল-পরিত্রমা দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়েই ঘটে; এমনকি তার চেতনা, বিশ্বাস, শূন্যতাবোধ, অনাস্থাও এই চলিষ্ণুতার বাইরে নয়। এটা অন্তহীন এক প্রক্রিয়া, যাতে সমাজকাঠামো, জীবনধারা ও সংস্কৃতির অভ্যন্তর-দ্বন্দ্ব নিরন্তর স্পন্দমান। এটা দেখানো বোধ করি নাট্যকারের লক্ষ্য নয়, পাঠের পর প্রসঙ্গটি আপনা থেকেই এসে যায় বা গেছে।
মোটামুটিভাবে লালন ও রবীন্দ্রনাথের মাঝখানে বোষ্টমীকে রেখে নাটকটির আখ্যানবিস্তার ঘটেছে। ফলে, এটা ধ’রে নেওয়া অসঙ্গত নয় যে, নাট্যকার কাছাকাছি দুটি সময়ের যোগসাধনের জন্য বেছে নিয়েছেন বোষ্টমীকে এবং বাস্তবিক, যে-কোনো জাতির সামাজিক ইতিহাসে এমন সন্ধিচরিত্র আসে। বোষ্টমী কেবল একটা চরিত্র নয়, বিশেষ এক সময়ের রূপক এবং একটা ট্রানজিশন। প্রসারিত অর্থে একটা আইডিয়া, নাট্যকার যা সংগ্রহ করেছেন শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের জমিদারিকালীন জীবন থেকে, যখন জীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল ধর্ম ও দেবানুগত্য, অপবিশ্বাসে আত্মসমর্পণই ছিল সমাজের নিয়তি। মানুষের বিকাশের প্রতিকূল এই অচলায়তনের প্রতিক্রিয়া থেকে লালনের মানবতাবাদী চেতনার উদ্ভব ঘটেছিল, পরবর্তীকালে যা রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় আশ্রয় পেয়েছে– তথ্য হিসেবে এটা যথেষ্ট পুরনো হলেও ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন তাতে সঞ্চার করেছে নতুন ও বহুমুখী অর্থ, সৌন্দর্য, তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা। অধিকন্তু, এতে লক্ষ্যযোগ্য হয়ে উঠেছে লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, যা কেবল বাংলার সামাজিক ইতিহাসব্যাখ্যার পরিসর গ’ড়ে দেয় না, অতীতের পটভূমিতে সমকালীন বাস্তবতা সম্পর্কে মূল্যায়নের সূত্রটিও তৈরি করে। তদুপরি, একটা সত্যও নতুন ক’রে হাজির হয়ে যায়– পুরুষতন্ত্রের বাহক হিসেবে ধর্ম এবং এর কলকব্জাগুলো এই জনপদের নারীর ওপর বহু আগে থেকেই চেপে ব’সে আছে। (সম্পূর্ণ…)

স্মৃতিযাপন : খোন্দকার আশরাফ হোসেন

সৈয়দ তারিক | ২৪ জুন ২০১৮ ১০:১৯ পূর্বাহ্ন

ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ৮২-৮৩ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হলাম সম্মান শ্রেণিতে। অবশ্য আমার ইচ্ছে ছিলো বাংলা সাহিত্য পড়বার। অগ্রজপ্রতিম আফজালুল বাসার ভাই আমাকে ভজিয়েছিলেন যে সাহিত্যচর্চার জন্য সহায়ক হবে ইংরেজি বিভাগের পড়াশোনা; বাংলা সাহিত্য নিজেই পড়ে নেওয়া যাবে।

প্রথমবর্ষ থেকেই যে-শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ পেয়েছিলাম তাদের একজন ছিলেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন স্যার। কোঁকরানো কেশভার, শ্যামবরণ অবয়ব, খাড়া নাসিকা, পোশাকে-ভঙ্গীতে-বাচনে একরকম প্রাকৃত নিজস্বতা নিয়ে তিনি বিরাজমান ছিলেন।

প্রথমবর্ষে তিনি পড়াতেন রোমান্টিক কবিতা— শেলি ও কিটস। প্রারম্ভিক ক্লাসে রোমান্টিক আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু ক্লাসের শুরুতেই তার সাথে ঈষৎ নিরানন্দজনক একটা ঘটনা ঘটল।

তিনি বক্তৃতা শুরু করলেন (ইংরেজিতেই বটে) এভাবে, ‘রোমান্টিক পুনরুত্থান শুরু হয় ১৭৯৮ সাল থেকে। কেন এই বছর?’ তখনই হাত তুললাম আমি। তার অনুমতি পেয়ে বললাম, ‘এর কারণ এই বছরই ওয়ার্ডসওয়ার্থ আর কোলরিজ মিলে দ্য লিরিক্যাল ব্যালাডস প্রকাশ করলেন, যার ভূমিকাকে রোমান্টিক আন্দোলনের ইশতেহার হিসেবে গণ্য করা যায়।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক, কিন্তু আমি তো কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি নাই।’ আমি একটা ধাক্কা খেলাম। তার ‘হোয়াই দিস ইয়ার’ কথাটার পরিপ্রেক্ষিতেই তো আমি হাত তুলেছিলাম। অগত্যা চুপচাপ বসে তার বক্তৃতা শুনতে লাগলাম। (সম্পূর্ণ…)

দার্শনিকের মগ্নতা এবং ইতিহাসের পঙ্কিল পথ

দেবাশিস চক্রবর্তী | ২১ জুন ২০১৮ ৩:০৫ অপরাহ্ন


পিথাগোরাস, অগাস্টাস ন্যাপ (১৯২৬)

গৌতম বুদ্ধের প্রায় সমসাময়িক আয়নীয় গ্রিক গণিতবিদ, দার্শনিক পিথাগোরাস (খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৫৭০-৪৯৫) মৃত্যুর আড়াই হাজার বছর পরেও এই যান্ত্রিক সভ্যতার অংশ হয়ে আছেন। আজও প্রতিটি স্কুলগামী শিক্ষার্থীর মননকে যৌক্তিকতার আলোয় উদ্ভাসিত করছেন পিথাগোরাস। যদিও ভুল শিক্ষা পদ্ধতিতে এই যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুভবের আনন্দ শিক্ষার্থীরা কতটুকুই বা পায় তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। সংখ্যাতাত্ত্বিক যুক্তি এবং আজকে নিজের নামেই পরিচিত উপপাদ্যগুলো প্রকাশের মাধ্যমে পিথাগোরাস মানব ইতিহাসে গণিতের এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিলেন । আসলে এর মাধ্যমেই পৃথিবী বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মত ধারণার দিকে এগিয়ে যায়। সময়ের পরিক্রমায় তার ধারণাগুলো ছড়িয়ে গেছে প্লেটো, কোপার্নিকাস, দেকার্ত, কেপলার, নিউটন এবং আইনস্টাইনের মানসে। তাদের যৌক্তিকবোধের কাঠামো পিথাগোরাসের ধারনাগুলোরই উত্তরাধিকার। বৈজ্ঞানিক অর্জন ছাড়াও পিথাগোরাস আমাদের সামনে নিয়ে আসেন একটি নতুন শব্দ “দার্শনিক (Philosopher)” । নিজেকে আখ্যায়িত করেন “জ্ঞানের প্রেমিক” হিসেবে। এ ভালবাসাকে তিনি মানব জীবনে দর্শনের ব্যবহার হিসেবে আবদ্ধ করেন এক পরিমিত, ধ্যানমগ্নতায়। সিসেরোর বর্ণনায় দেখা যায়, ফ্লাইয়াসের শাসক যুবরাজ লিওনের সাথে পিথাগোরাস খ্রিস্টপূর্ব ৫১৮ এর অলিম্পিক গেমসে উপস্থিত ছিলেন। পিথাগোরাসের বহু বিষয়ে গভীর জ্ঞানের পরিচয়ে যুবরাজ লিওন পুলকিত হয়ে যান। একসময় পিথাগোরাসকে প্রশ্ন করেন কেন তিনি কোন একটি বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হয়ে একজন “দার্শনিকের” জীবন যাপন করছেন। পিথাগোরাস এই প্রশ্নের উত্তরে যে উক্তিটি দিয়েছিলেন তা পাওয়া যায় সাইমন সিংয়ের মনমুগ্ধকর Fermat’s Enigma: The Epic Quest to Solve the World’s Greatest Mathematical Problem বইটিতে । (সম্পূর্ণ…)

পুলক হাসানের পাঁচটি কবিতা

পুলক হাসান | ২০ জুন ২০১৮ ৮:৪৯ পূর্বাহ্ন


সার্কাস সুন্দর

ভেবেছি তোমার প্রেম
একটি স্বপ্নযাত্রা
স্বপ্নভঙ্গের উপশম
এখন দেখি দৃষ্টির বিভ্রম
অহেতু দিবানিদ্রার ঢেউ
শুকনো পাতা খরস্রোতা
যে ছায়াটি পুষি
তাকেই মনে হয় গুপ্তচর
মনে হয় খুনি, ছদ্মবেশী
ভাবতে পারি না সহচর
হৃদয়ের আদান-প্রদান করি
ব্যাকুল তিয়াসে আশাবরী
নেই কেউ
কেউ নেই মুক্ত নিঃশ্বাসে
দোর খুলে বেরিয়ে এসে
জানায় স্বাগতম
তবু তুমি নীলাম্বরী
সার্কাস সুন্দর। (সম্পূর্ণ…)

মোহাম্মদ রফিকের কবিতাগুচ্ছ

মোহাম্মদ রফিক | ১৬ জুন ২০১৮ ২:২৮ অপরাহ্ন


অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরার চিত্রকর্ম

সাতরঙা জল

এক

থই থই নীলদরিয়ায়
মাঝরাতে নেমে এল ঢল
আমুণ্ড গ্রাসের ক্ষণে বলি

হায় রে যৌবন দেখিনি তো
কণ্টিকারি ঝোপ উপচে পড়ে
বেনা ফুল চোখ খোলে ধীরে

লাজনম্র কিশোরী ভ্রমরা
স্বর্নলতা বুনে গেল কোন
একদিন বরষা মেদুর

মহাকাব্য প্রেমকাহিনির
কাজলদিঘির কালোজলে
চাঁদভাঙা রাতে অন্তহীন

কারাগার শিক বেয়ে পুঁই
অচিন খাঁচার তালা ভাঙে
লালনের বাউল একতারা

ওরে ও মানুষ ভাই ভাই
আর বুঝি সত্য কিছু নাই
হত্যা করে মানুষে মানুষ

হৃদয়গগনে ওঠে চাঁদ
নিচে সাদা লাশের পাহাড়
ঘিরে শুরু মাছির কোরাস

তার ঘ্রাণ জলের ওপরে
কুয়াশায় ভারি হয়ে নামে
শীত স্যাঁতস্যাঁতে মৃত্যুহিম (সম্পূর্ণ…)

মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা: সপ্তর্ষির জন্য কবিতা

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ১৫ জুন ২০১৮ ১১:১৫ অপরাহ্ন

৪৫

সপ্তর্ষি সংসার করে কবির অধরে
কবিও সংসার করে সপ্তর্ষির ঘরে
ঘরে করে চরে করে করে চরাচরে
এ নিয়ে তুমুল তর্ক কামরাঙ্গা চরে

অঙ্গ মেশে অঙ্গ-ভাঁজে, মন মেশে মনে
কবি ও সপ্তর্ষি মেশে সতৃষ্ণ বন্ধনে,
সাতপাঁকে লগ্ন তারা মগ্ন আবরণে

৪৬

ঘর ছেড়ে করে ঘর বাহির-ভেতর
কে কোথায় ঘোরে ফেরে নগর-বন্দর
দিন যায় রাত যায় দরিয়া কহর
অষ্টপ্রহরের সাথে অধিক প্রহর

কবির করবী নিত্য ফুল্ল পুষ্প-ধ্যান;
সপ্তর্ষি কি বসে থাকে মত্ত-ধাবমান?
কবি ঘোরে মনে-বনে সাতআসমান (সম্পূর্ণ…)

মোঁপাসার ফেকায়

ইকতিয়ার চৌধুরী | ১৫ জুন ২০১৮ ১১:১১ অপরাহ্ন

লুক্সেমবুর্গ বাগানের পাশেই ‘আন্তর্জাতিক লোক প্রশাসন ইনস্টিটিউট’। আটলান্টিক সাগর পাড়ের ফেকা যাত্রা সেখান থেকেই। ওই প্রতিষ্ঠানে আমরা জড়ো হয়েছি ৩৩টি দেশ হতে। তরুণ কুটনীতিবিদ আর প্রশাসকদের জন্যে এক বছর মেয়াদী কোর্সে আপাতত সবাই ছাত্র। প্যারিসে যতগুলো সুন্দর জার্দা বা বাগান আছে তার মধ্যে লুক্সেমবুর্গ একটি। পাশেই সিনেট ভবন। বাগানে নিসর্গ প্রেমীদের জন্যে চমৎকার বৃক্ষের সারি, ছাটা ঘাস, দীঘি, নানা রকম পাখি ও কবুতরের ঝাঁক সেই সাথে বসার জন্যে ছড়ানো চেয়ার।
১৯৯২ সাল। ইউরোপে এখন গ্রীষ্ম। ভোর ছটায় আমাদের লুক্সেমবুর্গ পৌঁছুতে বলা হয়েছে। তাতে খুব একটা অসুবিধে নেই। তাপমাত্রা গড়ে ১৬-১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া এত চমৎকার যে আমেরিকা আর কন্টিনেন্টের নানা প্রান্ত থেকে শানানো তরুণী আর তুখোড় যুবকেরা ছুটে আসছে প্যারিসে। গরমের কয়েকটি দিন প্রাণ খুলে র‌্যালা করতে। কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায়। প্রায় প্রতি সকালেই কুয়াশা জমে। ঠাণ্ডা। সূর্য আমার ঘুম ভাঙ্গাক এই আশায় প্রতিদিন আমি আমার চারতলার কাচের জানালার পর্দা সরিয়ে রাখি। কিন্তু তিনি ওঠেন দেরিতে। ততক্ষণে বেলা প্রায় আটটা। বিদেশি ছাত্রছাত্রিদের জন্যে আবাসিক এলাকা সিতে ইউনিভারসিতেয়ারে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের ছেলে মেয়েদের হল ‘কলেজ ফ্রাঙ্কো-ব্রিটানিক’-এ পাকভারত উপমহাদেশ থেকে থাকছি চারজন। আমি ছাড়া মিয়ানমারের চো টিন্ট আর পাকিস্তানের নাসির আজহার ও শেরওয়ানী। তিনজনেই স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। ভেতরে ভেতরে বাঙালিদের প্রতি চো’র রয়েছে প্রচণ্ড নিচু ধারণা ও উন্মাষিকতা। সে এত লাজুক ও ভীত যে তা বাইরে প্রকাশের সাহস নেই। শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা নাসির যে পরিমাণ সরল, শেরওয়ানী সেই পরিমাণ ধূর্ত। যে কারণে তার সঠিক পেশা আমরা আজও উদ্ধার করতে পারিনি। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা আমার সহপাঠী আর ইউরোপীয় শিক্ষকদের সামনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯৭১-এ পাকিস্তানিরা ত্রিশ লক্ষ মানুষ হত্যা, দুলক্ষ নারী ধর্ষণ এবং প্রায় এক কোটি বাঙালিকে ভারতে বিতাড়নের মধ্য দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ করেছে তা বলার পরও নাসির আর শেরওয়ানী সম্পর্ক বজায় রাখতে কুণ্ঠিত নয় দেখে আমিও ওদের সাথে মিশছি অন্যান্যদের মতোই। (সম্পূর্ণ…)

লালাভ রোদের জিভ

ঝর্না রহমান | ১৫ জুন ২০১৮ ১১:১০ অপরাহ্ন


আমার ছায়াটা কোথায়? কোথায় উধাও হলো আমার ছায়াটা?
দারুণ ছায়াবাজি খেলতে খেলতে ফুটপাথ ধরে হাঁটছিলাম। পোষা পাখির মত ঝুপ ঝুপ নেমে আসছিল আমার ছায়া। হাত থেকে দানা খুঁটে খাচ্ছিল। আবার রোদের কারচুপিতে ঘুলঘুলিতে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাচ্ছিল।
নতুন টাইলস বসানো ফুটপাথ। গোল গোল নকশা। ঘূর্ণিঝড়ের চোখের মতন ধারালো গোল। নকশা দেখতে সুন্দর। কিন্তু খানিকক্ষণ ঘূর্ণির চোখে চোখ রাখলে ধাঁধা লেগে যায়। ধাঁধার সমাধান করতে করতে আমি একবার ডান চোখ একবার বাঁ চোখ ছুঁয়ে যাই। আমার ভালো লাগে।
টাইলসের ওপর রোদ্দুরের ধাঁধা। গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা গোখুরের মত ফণা তুলে জ্বলতে থাকে রোদ। তার ওপর আমার ছায়া। আমার ঢেউ তোলা দেহের ছায়া। আমার পনিটেল করা চুল– চরকিবাজি টাট্টুর লেজ। আমি টাট্টু লেজ দুলিয়ে ছুটকি চালে হাঁটি। আমার ছায়াও ছুটকি চালে হাঁটে। ঘুমু ঘুমু হাঁটা ভালো লাগে না আমার। ছুটকি ছুটকি হাঁটা ভালো লাগছে। বিকেলের রোদ্দুর ভালো লাগছে। রোদ্দুরে ছায়াবাজিও। শীতঘুম ভেঙে বেরিয়ে আসা গোখরার লালচে আভা– দারুণ লাগে!
ফুটপাথের একপাশে খাঁজকাটা সিঁড়ি। আমার শরীরের ছায়াটা খাঁজের ভেতর নেমে পড়ে। ওয়ান্ডারফুল! দারুণ ইসথেটিক! ধাপে ধাপে ঢেউয়ের ছন্দে নামতে থাকে আমার ছায়া। ততক্ষণে রোদ্দুর ছায়ার জন্য কামাতুর হয়ে উঠছে! কামরাঙা রঙ লেগেছে রোদে। ওরে রোদ, দেখছিস না, আমার গাল লাল হয়ে উঠছে! আমি ছায়ার রেণু দিয়ে রোদ্দুরের নাম লিখে দিলাম– পার্থ! (সম্পূর্ণ…)

নাহার মনিকার গল্প: রূপান্তর

নাহার মনিকা | ১৫ জুন ২০১৮ ১:১০ অপরাহ্ন


মতামতে এই লেখাটা আপলোড হয়েছে। হোমপেজে দিয়ে দিন।অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরা।

ডিসকভারি চ্যানেলে একঝাঁক পাখি উড়ে যাওয়ার শব্দ চিড়ে মুহতারিমার স্বভাব-মৃদু কন্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে শোবার ঘরের বাতাস ফালা ফালা করে ভেসে আসছে- ‘আমি তো আগেই বলছি তোমার আম্মা আমাকে দেখতে পারে না, এখন বুঝছো?’
একটু পরে ইমন বেরিয়ে এসে থমথমে মুখ করে সোফায় বসে।
হামিদা বেগম টেলিভিশন দেখার চেষ্টা করছেন। মনের ভেতরের ঘূর্ণিঝড় বাইরে প্রকাশ না করার দক্ষতা আছে তার। শান্ত মুখে ছেলেকে বলেন- ‘ চলো তাহলে, আমাদেরকে বাসষ্ট্যান্ডে নামায় দিয়া আসো’।
-’আম্মা, ইতিকে নিয়া যাওয়া কি এতই জরুরী?’
এমন অনুনয় আসবে, জানতেন। জবাব না দিয়ে ইতিকে ডাক দেন হামিদা- ‘ ব্যাগগুলা উঠা, চল’।

এপ্রিল মাসের সকাল দ্রুত তেতে ওঠে! হামিদা বাসের জানালার পর্দ্দা টেনে দেন, ঢাকা-দিনাজপুর দূরপাল্লার এসি বাসগুলো এখন আরামদায়ক। ছেলে আর বৌমাকে খুশী রেখে ফিরছেন না, এটা কাঁটার মত বিঁধছে, কিন্তু ওরা যা করেছে তা মানা যায় না।

মাস দুই আগে ভোরের কুয়াশা ছিন্ন করে ইমন ফোন করেছিল। সকালবেলা ওদের ব্যস্ততার কথা জানেন হামিদা, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ নিয়ে ফোন ধরেছিলেন।
‘আম্মা, একজনও পাওয়া গেল না?’- মীমকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে ইমন। সোয়াদকে নিয়ে মুহতারিমা অফিস কামাই দিচ্ছে। একদিন ইমন অফিস বাদ দেয় তো আরেকদিন বউমা। প্রায় মাসখানেক তাদের কাজের বুয়া বাড়ি গিয়ে আর ফিরছে না। খোঁজ তো হামিদা করছেনই, কতজনকে বলে রেখেছেন। ভালো বেতন, থাকা খাওয়া সব। কিন্তু কেউ রাজী হয় না।
হামিদার স্বভাব জেনেও ইমন বায়না করে-‘ আম্মা, তুমি চলে আসো। কি এমন রাজ্যপাট তোমার ঐখানে, এখানে নাতি নাতনীর সঙ্গে সময় কাটবে’। (সম্পূর্ণ…)

« আগের পাতা | পরের পাতা »

Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com