ব্যক্তিত্ব, শ্রদ্ধাঞ্জলি, সাহিত্য সংবাদ

শঙ্খ ঘোষের জন্মবার্ষিকী : ‘কাল থেকে রোজই আমার জন্মদিন’

muhit_hasan | 5 Feb , 2017  

Shonkhoআলোকচিত্র: রাজু আলাউদ্দিন

আজ বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি ও গদ্যকার শঙ্খ ঘোষের ছিয়াশিতম জন্মদিন। ১৯৩২ সালের পাঁচই ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। এই শুভদিন উপলক্ষ্যে তাঁর গুণগ্রাহী ও স্নেহধন্য তিন লেখক—কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, প্রাবন্ধিক-অর্থনীতিবিদ সনৎকুমার সাহা ও কবি-গদ্যকার মোহাম্মদ রফিকের তিনটি সংক্ষিপ্ত তাৎক্ষণিক শ্রদ্ধালেখ মুদ্রিত হলো। তাদের তাৎক্ষণিক শুভেচ্ছাবার্তাগুলোর শ্রুতিলিখন করেছেন তরুণ লেখক মুহিত হাসান। বি. স.

হাসান আজিজুল হক
border=0

তিনি শতবর্ষী হোন

শঙ্খ ঘোষ, আমাদের সকলের প্রিয় শঙ্খদা, ছিয়াশিতে পা দিলেন, এই খবরটি নির্দিষ্টভাবে জানার পর— শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সর্বোপরি তাঁর প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করার মতোন যথোপযুক্ত ভাষা আমার আয়ত্তে নেই। এই সময়ের বাঙালি কবিদের মধ্যে তাঁকেই আমি শ্রেষ্ঠতার আসন অনেক আগেই দিয়ে বসে আছি। আমি মানুষ শঙ্খদা ও কবি শঙ্খ ঘোষকে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আবার আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

শঙ্খদার প্রতিভা, তুলনাহীন তো বটেই, আমি বলবো, তিনি উচ্চতার যে শিখরে পৌঁছেছেন, তাতে তাঁকে দুর্নিরিক্ষ্য বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু, তিনি নেমে আসেন সকলের সঙ্গে, বিপদে-আপদে। প্রতিভার এরকম নিরহংকার প্রকাশ আর আমি দেখিনি। কবি হিসেবে যেমন তিনি আজ আমাদের সকলের কাছে এসে পড়েছেন তেমনিই এক এক সময় মনে হয় তিনি অতি দূরের নক্ষত্র। তাঁর আলো এসে পৌঁছুচ্ছে আমাদের কাছে প্রতি মুহূর্তে, প্রতিক্ষণে।

আমার সৌভাগ্য, আমি শঙ্খদার স্নেহ লাভ করেছি। এখনও তাঁর অসাধারণ কণ্ঠস্বর আমি মাঝে মাঝেই টেলিফোনে শুনতে চাই। তিনি খুব স্বল্পবাক মানুষ। অথচ অত্যন্ত রসগ্রাহীও বটেন। সকলের জন্যেই দরজা খোলা রেখেছেন তিনি। একটু জাহির করে বলি, তাঁর বাড়ির রবিবারের আসরে আমি অনেকবার উপস্থিত থেকেছি, কত কথা যে সেখানে ওঠে, যে যেমন পারে, কত খাবার যে সঙ্গে করে নিয়ে আসে, আড্ডা সরগরম হয়ে ওঠে, কিন্তু এক পাশে সফেদ ধুতি-পাঞ্জাবি পরে চেয়ারে বসে থাকেন শঙ্খ ঘোষ—তিনিই আদতে কথা বলেন সবচেয়ে কম।

……………………………………………………

জন্মদিন


তোমার জন্মদিনে কী আর দেব এই কথাটুকু ছাড়া
আবার আমাদের দেখা হবে কখনো

দেখা হবে তুলসীতলায় দেখা হবে বাঁশের সাঁকোয়
দেখা হবে সুপুরি বনের কিনারে

আমরা ঘুরে বেড়াবো শহরের ভাঙা অ্যাসফল্টে অ্যাসফল্টে
গনগনে দুপুরে কিংবা অবিশ্বাসের রাতে

কিন্তু আমাদের ঘিরে থাকবে অদৃশ্য কত সুতনুকা হাওয়া
ওই তুলসী কিংবা সাঁকোর কিংবা সুপুরির

হাত তুলে নিয়ে বলব, এই তো, এইরকমই, শুধু
দু-একটা ব্যথা বাকি রয়ে গেল আজও

যাবার সময় হলে চোখের চাওয়ায় ভিজিয়ে নেবো চোখ
বুকের ওপর ছুঁয়ে যাবো আঙুলের একটি পালক

যেন আমাদের সামনে কোথাও কোনো অপঘাত নেই আর
মৃত্যু নেই দিগন্ত অবধি

তোমার জন্মদিনে কী আর দেবো শুধু এই কথাটুকু ছাড়া যে
কাল থেকে রোজই আমার জন্মদিন।

[শঙ্খ ঘোষ, মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে]
……………………………………………………

আমি এখনও বুঝতে পারি না, শঙ্খদাকে শ্রেষ্ঠ কবির আসনেই আগে বসাতে চাইবো নাকি একালের একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবেই আসন দিতে চাইবো। পাণ্ডিত্য, সরলতা, তুঙ্গস্পর্শী মেধা একজন মানুষের মধ্যে যে একসঙ্গে থাকতে পারে, তা আমি তাঁকে দেখেই জানতে পেরেছি। সবরকম মোহহীন, অসাধারণ নির্লোভ, অহংকার-বর্জিত, অতি সাধারণ মানুষদের কাতারে এসে দাঁড়াতে পারেন—ওই যে একটু আগে যেমন বলেছিলাম—সহায়ে-সম্পদে-বিপদে, তার দৃষ্টান্তই তো তিনি হয়ে রয়েছেন। এত নির্লোভ, এত মোহহীন, এত নিরহংকার মানুষ এই সময়ে আমার আর চোখে পড়ে না। বলতে ইচ্ছে করে, তিনি চিরজীবী হোন—সেটা বলা যেহেতু একেবারেই আলংকারিক হয়ে উঠবে, সেজন্য বলবো তিনি শতবর্ষী হোন, আর তাঁর সৃজনক্ষমতার তূণ অজুর্নের তূণের মতোই কখনোই যেন নিঃশেষিত না হয়। দু হাতে দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর যা কিছু সঞ্চয় আছে তা নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে। অথচ আমরা জানি, তিনি যতই দান করুন আর স্বচ্ছন্দে বিলিয়ে দিন, ততই তাঁর তূণ পূর্ণ হয়ে ওঠে।

সনৎকুমার সাহা
border=0

অনিঃশেষ শান্ত সাহস

শঙ্খ ঘোষ একালের বাংলা কবিতার অগ্রণী পুরুষ। তাঁর কবিতা সাম্প্রতিককালে নিরাসক্তির ও গভীর মানবিক দায়িত্ব পালনের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। গোড়ার দিকে ‘কৃত্তিবাস’ কবিতাপত্রবাহিত আমেজ কিছু থাকলেও, সত্তরের দশকের পর থেকে এক সামগ্র্যের দিকে তাঁর অবিরাম যাত্রা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। একইসঙ্গে কবিতার শব্দের সক্ষমতা ও প্রচ্ছন্ন শৃঙ্খল মনে মুগ্ধতার আবেশ ছড়ায়।

আজ মনে হয়, তাঁর কালকে ধারণ করে— কালের বিবেককে সমুন্নত রেখে, তখন থেকে তিনি ক্রমাগত পথ চলেছেন। কোথাও ফাঁকি নেই, ফাঁকও নেই। এ যে কবির সত্যাবদ্ধ শুদ্ধতার সংগ্রাম। আপস তিনি করেননি — এ আমাদের পূর্ণ মানবিক আশা ও আকাঙ্খাকে এই দুর্দিনেও, বিশেষ করে তাঁর পরিমণ্ডলেও, জাগিয়ে রাখে। আমরা যেন তাঁর সহযাত্রী থাকতে পারি— এতে আমাদেরই জীবনের অসংখ্য গ্লানিমোচন। শুধু কবিতায় নয়, অতি রুচিশলী গদ্যেও তিনি তাঁর জায়গায় অনড়।

একসময় তাঁর ‘বাবরের প্রার্থনা’ আমাদের কল্যাণভাবনাকে জাগিয়ে রাখতে ও যুগের মুখোমুখি হতে শান্ত সাহস জুগিয়েছিল। আজ যেখানে তিনি বাঁচেন, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় যেখানে তিনি প্রত্যক্ষ— সেখানে চারপাশে কেবল ভূতের নৃত্য ও ছুঁচোর কেত্তন। তাই আশঙ্কা করি, তিনি আরও নিঃসঙ্গ— তা সত্ত্বেও তাঁর ঋজু সত্তা একইরকম খাড়া ও অমলিন। হয়তো রবীন্দ্রনাথের “একলা চলো রে”-র প্রতিধ্বনিই তাঁর কাছ থেকে পাই। তবে তাঁর আহ্বান সবার কাছে।

রবীন্দ্রসাহিত্যের মননশীল আলোচনায় তাঁর তুল্য এখন কাউকে দেখি না। আবু সয়ীদ আইয়ুব ছিলেন— তবে শঙ্খ ঘোষ ও আইয়ুব, দুজনের দৃষ্টিপথ ঠিক এক নয়— এতে তাঁদের পরিপূরক ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে আরও পূর্ণতা পান। আজকের হট্টরোলের ডামাডোলে তা হারিয়ে যায় না।

মোহাম্মদ রফিক
border=0

সহমর্মী মহাত্মন: শঙ্খ ঘোষ

শঙ্খ ঘোষের কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুতে। তার প্রথম বইটি দিনগুলি রাতগুলি আমাকে যথেষ্ট আপ্লুত করে। পরের বইটির জন্যে প্রতীক্ষা করতে থাকি। প্রতীক্ষার শেষ হয় না। অবশেষে হাতে এলো তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ নিহিত পাতালছায়া। এবং ওই সময়েই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার আলাপ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সমকালের বাঙালি কবিদের মধ্যে কার কার প্রতি আমি অনুরক্ত। শঙ্খ ঘোষের নামটি বললাম। শুনে তিনি একটু বিস্মিতই হলেন, বললেন, “তোমাদের এখানে আর কারো মুখে ওই নামটি শুনলাম না”। সঙ্গে আরো যোগ করলেন, “তুমি ঠিকই ধরেছ—শঙ্খ খুব ভালো লেখে”। উপদেশ দিতেও পিছ পা হলেন না: “ওকে আরো মনোযোগ দিয়ে পড়ো—লাভবান হবে”। বলতে বাধা নেই, সেই থেকে আমি শঙ্খ ঘোষের নিবিষ্ট পাঠক। এবং, লাভবানও হয়েছি অবশ্যই।

শঙ্খ ঘোষের নান্দনিক অভিযাত্রার আমি এক উৎসাহী অনুসারী। এরপর একে একে হাতে আসতে থাকলো তাঁর গদ্যগ্রন্থগুলি। আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম, ওই গদ্যভঙ্গির মাধুর্যে। শব্দ-ব্যবহার আমাকে চমৎকৃত করলো। অনুপ্রাণিতও হয়েছিলাম কি? নিজেকে মাঝে মধ্যে আজও জিজ্ঞাসা করি। নিঃসন্দিহান হলাম যে উত্তম কবি এক উত্তম গদ্যকারও বটেন—তাঁকে তা হতেই হয়। স্বদেশ, বিশ্ব, ভূমণ্ডল কবির কাব্যিক জগতের একমাত্র অনুষঙ্গ। এই বোধ পেয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে, আশস্ত হলাম শঙ্খ ঘোষে। কবি নিত্যদিন বেঁচে থাকেন, নিত্যদিন শ্বাস নেন, সঙ্গে সঙ্গে বাঁচেনও অনন্তকালে। শঙ্খ ঘোষ তাঁর কবিতায় এবং সাহিত্যশিল্পকর্মে মহাকালের অনুমাত্রক্ষণ কিন্তু মহাকালের সহযাত্রী। ছিয়াশিতম জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘায়ু এবং কর্মময় জীবন আশা করি।

আর্টস-এ প্রকাশিত শঙ্খ ঘোষের সাক্ষাৎকার
ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

আর্টস-এ প্রকাশিত শঙ্খ ঘোষের লেখা
কালো মাটির কালো পুতুল

স্তম্ভিত ইতিহাস : নজরুল

Flag Counter


4 Responses

  1. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    বাহ্। দারুন আয়োজন। স্যালুট টু আর্টস। মুহিত হাসানকে অসংখ্য ধন্যবাদ শ্রমসাধ্য কাজটি করার জন্য।

  2. asma sultana shapla says:

    অসাম। অসাধারণ। জন্মদিনের এমন চমৎকার উইশ। আর বিখ্যাত সব লেখকদের দারুণ সব লেখা। আর্টসকে ধন্যবাদ এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য। আর কবি শঙ্খ ঘোষকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

  3. ইকবাল করিম হাসনু says:

    সত্যিই খু্উব যথোপযুক্ত শ্রদ্ধালেখ। পরিমিত কিন্তু মননের গভীরতায় প্রতিটিই অনন্য।

  4. বিষাদ আব্দুল্লাহ says:

    বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা, প্রিয় কবি…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.