প্রবন্ধ, বইমেলা

আমাদের বইমেলা ও কিছু প্রশ্ন

আনিসুর রহমান | 25 Jan , 2017  

Shishu+Prohor-book+fair-05022016-17প্রতিবছর নিয়মিতভাবে একুশে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হবার বয়স তিন দশকের উপরে। প্রতিবছরই এই বইমেলা ঘিরে একই ধরণের গৎবাঁধা অনুষ্ঠানমালা। নেই তেমন কোন সংযোজন, নেই কোনো পরিমার্জন। শুধু আমরা সংখ্যায় বাড়িয়েছি স্টলের সংখ্যা, বইয়ের সংখ্যা, গায়ে গতরে মেলা বেড়ে বেড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে ভালো। আর ভেতরের চিত্র প্রকাশকরা নিজ নিজ স্টল সাজিয়ে বসবেন-পাঠক আর ক্রেতারা আসবেন, বই কিনবেন জনপ্রিয় লেখকরা স্টলে বসে বিরামহীন অটোগ্রাফ দিয়ে যাবেন। আর অজনপ্রিয় লেখকরা চেয়ে চেয়ে দেখবেন।
আর নজরুল মঞ্চে রিলিফের ভিড়ের মতো জনস্রোত ঠেলে কেউ একটু নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন। এইতো আমাদের বইমেলার মোটা দাগের চিত্র। আমি যত বছর ধরে ঢাকা শহরকে চিনি ঠিক একই সময় যাবৎ আমি আমাদের অমর একুশে বই মেলাকেও জানি। এই জানার দুই দশকের অধিককাল সময় ধরে কয়েকটি প্রশ্ন নানাভাবে ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু প্রশ্নগুলো নিয়ে খোলামেলা কোনো আলোচনা বা কার্যকর বিতর্ক আমি কোথাও লক্ষ করিনি। প্রশ্নগুলো যদি লিখি তাহলে মোটামুটি এমন দাঁড়ায়:
১। বই তেমন বিক্রি হয় না কেন? (প্রকাশকরা লেখকদেরকে এরকমই বলে থাকেন বলেই এই প্রশ্নটা এলো।)
২। বিক্রি না হলেও প্রকাশকরা বই বের করেন কেন? তারপর প্রকাশনা ব্যবসার টিকে থাকেন কিভাবে?

৩। লেখকরা কি সম্মানী পান? না পেলে এই সম্মানী নিয়ে কোনো খোলামেলা আলোচনা নেই কেন?
৪। বাংলা একাডেমির কাজ কেন বইমেলার মতো একটা অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা বা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে তাদের শ্রম, ও মনোযোগ ব্যয় করা? পৃথিবীর আর কোন মেলা দেশের এরকম একটি একাডেমি আয়োজন করে কিনা?
৫। বই মেলা আয়োজনের কাজটি কি প্রকাশক সমিতির কাছে ছেড়ে দেয়া উচিত নয়?
৬। বইয়ের প্রসার ও বিক্রি বাড়ানোর জন্যে বইমেলাই কি যথেষ্ট?
৭। পাঠাভ্যাস ও বই বিক্রি বাড়ানোর জন্যে কী কী কার্যকর উদ্যোগ নেয়া দরকার?
৮। জনপ্রিয় লেখকদের কে কত টাকা আয় করেন এবং কত টাকা কর দেন?
৯। হুমায়ুন আজাদ জনপ্রিয় লেখকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর লেখক বলে গেলেও জনপ্রিয়রা বেমালুম তা কেন হজম করে গেলেন?
১০। আমাদের এইভাবে ভুলভালে ভরা বই প্রকাশের প্রবণতা ঠেকানো দরকার কিনা?
১১। আমাদের দেশের লেখালেখি পেশাগত স্বীকৃতি কবে পাবে? বাংলাদেশে প্রকৃত পেশাদার লেখক কে কে?

শেষতক প্রশ্নটি নিয়ে কয়েকটি কথা বলে আমি আমার লেখাটি শেষ করতে চাই।
আমার জানা মতে, হাল আমলে প্রবীণদের মধ্যে বাংলাদেশে দুইজন পেশাদার লেখক যারা পুরোপুরি লেখালেখির উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের একজন বিগত হয়েছেন। তিনি হলেন আহমদ ছফা। অপরজন আমাদের প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ। অন্য লেখকরা কোনো না কোনোভাবে অন্যবিধ আয়ের যুক্ত, তাদের নিজ নিজ জীবন যাপনে কেউ কেউ আমলা, সম্পাদক, অধ্যাপক, চাকুরে, ব্যবসায়ী এবং নিদেনপক্ষে সাংবাদিক। তবে লেখালেখি পেশা হিসেবে আজও স্বীকৃত নয় এবং দাফতরিক কোন কাগজপত্রে পেশা হিসেবে ‘লেখালেখি’ উল্লেখ করার রেওয়াজ ও সুযোগ কোনটাই নাই। প্রতি বছরে আমাদের বই মেলায় চার হাজারের মতো নতুন বই প্রকাশ পেলেও সেই বইয়ের পেছনের মানুষগুলোর কাজের স্বীকৃতি সঙ্কটে থেকে যাবে?

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.