কবিতা

অলভী সরকারের একগুচ্ছ কবিতা

অলভী সরকার | 19 Jan , 2017  

আমি আর কোথাও থাকি না

মাঝে মাঝে কিছুক্ষণ,
কোথাও থাকি না আমি।

ফিরে এলে দেখি,
এক মিনিট,
এক ঘণ্টা,
সম্পূর্ণ একটি দিন
পার হয়ে গ্যাছে।

সিগনালে, সড়কবাতির নিচে
আটকা পড়ে শ্রমিকের গাড়ি।
রাতের শহর।

কয়েকটি পুরুষ মশা
গলে যাচ্ছে নখের খোঁচায়
রক্তহীন।

অতঃপর, সড়কবাতির নিচে
তালাবন্ধ খুচরো দোকান,
পোড়া সিগারেট, আধা-ভেজা
টি ব্যাগের স্তুপ।
অজস্র পিঁপড়ার লাশ।

এইসব না দেখেই
দীর্ঘ দীর্ঘ পথ পার হই।

নগরীর যাবতীয় ভাঙা বিলবোর্ড,
প্রাসাদ অথবা, স্রেফ
ধাতব শরীর।

ছেঁড়া পোস্টার,
ছিঁড়ে গ্যাছে গণতন্ত্রের কিছু
কালো অক্ষর, শব্দের বহর।

ফুটওভারব্রিজ ঘেঁষে শুয়ে আছে
গোটা দুই সোনালি কুকুর,
ঘুমিয়েছে উচ্ছিষ্ট রুটির প্যাকেট,
কয়েকটি শীর্ণ মানুষ।

সড়কবাতির ভিড়ে
অন্ধকারে জ্বলে ওঠে
শ্রমিকের শান্ত মোটর।
সিগনালে থেমে আছে গাড়ি।

কয়েক ঘণ্টার পথ,
দু এক মিনিট;
পুরো একটি দিন।
আমি আর কোথাও থাকি নি।

মাঝে মাঝে এইভাবে আমি
একদিন-
কোথাও থাকি না।

নাগরিক- ২

জীবনের গল্পগুলো গল্পের মতোই ফুরায়,
আষাঢ়ে কথার মতো আষাঢ়ের বর্ষা নেমে আসে,
লুণ্ঠিত জীবনের গন্ধ নিয়ে ফিরে যায়
অন্য কোথাও।

অন্য কোথাও বাধে ঘর;
মানুষের নিঃস্ব হাতে মধ্যরাতে
রেখেছে নোঙর;
মানুষ একাই চলে;
যেমন চলেছে সব জাতি।

যেমন চলেছে হেঁটে নীল জল,
নীল আসমান, ম্রিয়মাণ পুঞ্জীভূত মেঘ;
যেমন মাটির সাথে গেঁথে গেঁথে
বহুদূর গেলে, মাটিও একলা হয়,
কাঁটাতার মাটি ফুঁড়ে ওঠে।

আবার পেছন হেঁটে
মানুষেরা ফিরে আসে রোজ,
মানুষেরা ভুলে যায়
চলে যাওয়া কতোটা কঠিন।

একদিন ঘর ছেড়ে
একাকী হাঁটার মতো
অতোটা সহজ নয়
মহাপ্রস্থান।

নাগরিক- ৪

অবশেষে, মানুষেরা ঘরে ফিরে আসে
ঘরে ফিরে আসে শুধুমাত্র প্রেম অথবা,
দুর্বোধ্য কবিতার দিব্যি দিয়ে।

অবশেষে,
ফেলে আসে সমস্ত সংলাপ
নিয়ে আসে দু একটি শব্দ কেবল!

দীর্ঘ দীর্ঘ পথে ফেলে আসে
শব্দের পাহাড়; রাস্তা- যানজট,
মহানগরীর সরু অলিতে গলিতে
মানুষেরা হরদম ফেলে যায়
জাবরের উচ্ছিষ্ট রস, রক্তিম সুপারি ও পান
পায়ে ঘষে চূর্ণ করে যাবতীয় মানুষের বেদনা ও ক্লেদ।

প্রাচীন শহর

অতিশয় ধীরে হচ্ছো আমার

মুখাপেক্ষী,

আরো ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তুলবে

গলগ্রহ;

প্রেমে ও কাব্যে হয়তো কাটবে

দুএক বছর,

ভেসে যাবে সব, ধুয়ে যাবে সব

মাটির মতো।

তারানার মতো ঝংকার তুলে

পালিয়েছে প্রেম,

মধ্যম লয়ে যেমন ভেসেছে

সমস্ত ঘর;

বন্য গন্ধে কেউ জেগে ওঠে

কেউ মরে যায়,

কারো নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে

প্রাচীন শহর।

পলিমাটির চর

জোড়ায় জোড়ায় গেঁথে জীবন হলো পার,
তোমার আমার দুই বৃন্তে দুখানা সংসার।

এক ঘরে রোজ ঘরকন্না আরেক ঘরে মন,
লজ্জাবতী লতার পাশে শাল-সেগুনের বন।

ইষ্টিকুটুম মিষ্টিকুটুম কুটুমবাড়ির মেলা,
হজম হয়ে যাচ্ছে তোমার ঘরকন্নার খেলা।

লাটাই ঘুড়ির দ্বৈত জীবন ভোঁ-কাট্টা ঘর,
নীল আসমান হৃদয় আমার পলিমাটির চর।

জাহান্নাম

ধ্বংসের প্রবৃত্তি তোমার; বারবার ধ্বংস করে

গড়ে নিচ্ছো ঘর।

উদ্ভিদ ঘরানায়, মানুষ বদলে হয়

জৈব পাথর।

ঘুম ভেঙে ভোররাতে স্বপ্ন দেখে নিয়ো

যদি ক্লান্তি নামে;

মানুষ অচেনা বড়ো অচেনা শহরে

মন জাহান্নামে।

জন্মদাগ

এ শহর অলিগলি
কতটুকু জানা যায় তার?
কতখানি বেঁকে গ্যাছে রাজপথ
কোন চোরাপথে জমে
গাঢ় অন্ধকার!

কোনো প্রশ্ন, কোনো পাপ
চিহ্ন রাখে নাই
সড়কবাতির ভিড়ে, অন্ধকারে
মিশে গ্যাছে লাল রোশনাই।

কোনো জন্মদাগ নেই শহরের
শহর চেনাতে শুধু ক্ষতি;
হাজার বছর তুমি হেঁটে যাও রাজপথ-
ধুলোর পাহাড়ে হবে “শহুরে বসতি”।

সরীসৃপ

অতঃপর, আরো বেশি মুগ্ধ হলে পর;
এ শহর ডুবে যাবে বেশুমার লাশের ভেতর!

মানুষের কাটা মুণ্ডু, মানুষের খণ্ডিত হাত ।
মানুষের ঘরে ঘরে, প্রকাশ্য রোদ্দুরে
সরীসৃপের মতো রাত !

প্রেমপত্র

নির্বিকার জলোচ্ছ্বাসে বৃষ্টি গ্যাছে ধুয়ে,
মানুষ এসেছে ফিরে জলজ্যান্ত মৃত্যু বুকে নিয়ে।

তুমিও এসেছো ফিরে-
মৃত্যু বুকে, প্রেমপত্র হাতে;
প্রেমে ও প্রয়াণে কোনো তফাত ছিলো না,
একই জলোচ্ছ্বাসে ডুবে ভাসে একসাথে।

একই যজ্ঞে তুমি আছো, প্রেম আছে,
মৃত্যু মুখোমুখি;
তোমার কাঁধের কাছে দীর্ঘশ্বাস,
তোমার বুকের কাছে শুয়ে আছে
বিষণ্ণ নর্তকী।

তোমার পায়ের কাছে প্রতিশব্দ,
তোমার বুকের কাছে ঝোড়ো কালবেলা;
এ শহরে জলজ্যান্ত মৃত্যু এসে ঘুমিয়েছে-
প্রেমপত্রে- কাটাকুটি খেলা।

উৎসব

তুই বেঁচে থাক কালবৈশাখী ঝড়ে
তোর বুকে থাক মহুয়ার নিঃশ্বাস;
বেঁচে থাক তুই আলোয়-অন্ধকারে,
বাঁচিয়ে তুলিস জীবন্ত সব লাশ।

তোর মুখে চেয়ে বেঁচে আছি আমি আজো
একটা শরীরও হয়নি কবরে ফেলা;
চারিদিক যদি উৎসবে ‘সাজো সাজো’
কাঁটাতার জুড়ে সাজোয়া যানের মেলা।

Flag Counter


3 Responses

  1. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল says:

    আশাটা হতাশে পরিণত হলো।

  2. Nazrul says:

    কবিতা গুলো অনেক ভাল লেগেছে। বিশেষ করে প্রথম কবিতাটি। ধন্যবাদ কবি।

  3. আব্দুল কাদির says:

    অলভি অনেক ভালো লেগেছে ! তোর কবিতা বরাবর আমার ভালোলাগে !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.