কবিতা

মাহবুব আজীজের পাঁচটি কবিতা

mahbub_aziz | 16 Jan , 2017  

আরও একটি ট্রেন

farzanaআরও একটি ট্রেন চলে গেল
ধীরে ধীরে প্লাটফর্ম ছেড়ে এগোল।
ঝমঝম শব্দ চারপাশ দুলিয়ে কাঁপিয়ে,
যেন বিশাল এক অজগর যাচ্ছে চলে হেলেদুলে;
আকষ্মিক গতি এলো তার শরীরে, প্রচন্ড, উড়ে যাবে মুহূর্তে!

তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলুম একটানা
না। ট্রেনে উঠতে ইচ্ছে হলো না এবারও;
আমারই চোখের সমুখে ক্রমশ প্রাণবান হয়ে
দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেন গতিময় হয়ে উঠল।
যাক না; যার ইচ্ছে, যখন-খুশি
আমি আরও একটু দাঁড়িয়ে থাকি।

এখানে এই কলহাস্য মুখরিত থৈথৈ
মানুষের ভিড়ে। আমার দাঁড়িয়ে থাকতেই
ভালো লাগছে। আসবে আরও আরও ট্রেন
হুইশেল তুলে দিগ্বিদিক; আমি অনড়
দাঁড়িয়ে থাকব। দাঁড়িয়েই থাকব।
কৌত‚হলভরে দেখবো-ছুটন্ত মানুষ,
আসনসন্ধানীদের প্রাণান্ত দৌড়; সপরিবার কেউ কেউ
হল্লা, ধমক, সশব্দ তীব্রতা, বেঁচে থাকার সুতীব্র কোলাহল।
না, শব্দ করব না কোনো
নিঃশব্দে স্থির সন্তের দৃষ্টিতে
আমি কেবল
আরও একটি ট্রেনের তীব্র গতিতে
ছুটে চলে যাওয়া দেখব।
দেখতেই থাকব।

নীলিমায় লিখে রাখি

প্রতি ভোরে আর গভীর রাতে কান পেতে থাকি;
নিমগ্ন ধ্যানীর মতো শান্ত হয়ে অপেক্ষায় থাকিÑ
টেলিফোন আসবে!
হাত চলে যায় বাটনে বারবার ফোন দিই!
হাত গুটিয়ে নিই বুজে যাওয়া মাকড়সার মতো
নিজেরই দিকে। ঘুম ভাঙার পর জলতেষ্টা পাবারও
আগে ইচ্ছা হয় কেউ একজন আমার
ভুলে যাওয়া ডাকনাম ধরে ডাকবে!

জানি, এসব হাস্যোষ্পদ উপপদ, অর্থহীন নিষ্প্রভবাক্যÑ
এখন আকাশের দিকে ঘুণাক্ষরেও তাকাও না তোমরা।
রোদ্দুর কি বৃষ্টি গায়ে পড়লে ভ্রু কুঁচকে তাকাও।
তাই পাখিরা উধাও কবে থেকে! সেই তোমরা কে আর
আমাকে ডেকে উঠবে! অকারণে!

হতচ্ছাড়া হাত তারপরও বল্লমের মতো লাফিয়ে
ঠিকই চলে যায় ফোনের বাটনে। ফোন দিই! এখুনি!
নিরুচ্চারিত শব্দেরা ডুকরে ওঠে বারবার।
মানুষের ভাষার কী সাধ্য বুকের ভেতর
জমানো কথার অনুবাদ নিয়ে আরেক
মানুষের সামনে দাঁড়ায়!

কথা বলি না। নিরিবিলি স্তব্ধ হয়ে থাকি।
কেবল বুকের গভীরে তোমার জন্যে
অবিরল কথারা বেজে যায় বেজে যায় অহর্নিশ।
তারই কিছু আনন্দ-বিষাদ; তারার অক্ষরে
নীলিমায় লিখে রাখি

বয়স

আমার বয়স আমার স্মৃতির সমুদয় যোগফল
কিছু স্মৃতি সরল-নির্মেদ, অপাপবিদ্ধ,সুমসৃণ
আদিগন্ত শৈশব; একদমে মাঠ পাড়ি। গোল্লাছুট।
সবুজ টকটকে ওই জীবন; আশ্চর্য সরল-সুন্দর।

কিছু বা আঁকাবাঁকা স্মৃতি। ধূসর থেকে ধূসরতর;
বুকের খুব ভেতরে নীরবে বয়ে চলা অচিন রাগিনী
সেসব স্মৃতি বেদনাবহ; কবেকার শোক উথলে ওঠা;
মৃত পিতার মুখখানার আদলও অষ্পষ্ট স্মৃতি এক!

কিছু স্বপ্ন লাল নীল বহুবর্ণা
কখন কোন ফাঁকে এসে দাঁড়ায় একলা নিরিবিলি।
উনিশ’শ আটাশির বন্যায় আটকে যাওয়া কিশোর-কিশোরী।

গাঢ় শীতরাতে পাঠানো চুম্বন রঙের স্মৃতিও আছে
নিঃশব্দ-নীরব-ত্রস্থ অপমানদগ্ধ টাটকা স্মৃতিরা আছে
আছে একাকী নিরুদ্দিষ্ট হবার উদগ্র বাসনার স্মৃতি!

আমি চিনি। জন্মদাগের মতো অক্ষয় স্মারকসকল
এইসব স্মৃতির যোগফলই তো আমি। আমার বয়স

চোখের সীমা

যতটুকু দেখা যায়-ভাবনায় কুলোয়;
তা নিয়েই এত তর্ক
হানাহানি; রক্তারক্তি! জিঘাংসার চূড়ান্ত!
আর যা দেখা যায় না; কল্পনার সীমা পরিধির মধ্যে আসে না
তা থেকে যায় আকাশের ওপারে আকাশে!
স্পর্শের বাইরে চিরকাল।
মাত্র হাজারখানেক বছরের আয়োজন নিয়েই
এত লংকাকাণ্ড … এত বিতণ্ডা! এত বিভেদ!
এত নৃশংস উপাচার মনুষ্য বসবাসরত একমাত্র গ্রহে!

হাজার হাজার বছর আগে, তারও আগে-
আরও অযুত নিযুত কোটি বছর আগে, তারও আগে, তারও আগে….
তারও আগে… তারও আগে….

ছায়াপিণ্ড মুখ ঘুরিয়ে নেয়!
মানুষের চোখের সীমা আসলে এতটাই কম …

নির্ঘুম সেরেনাদ

আমার মতো তুমিও একদিন রাত জাগবে। নির্ঘুম রাত।
চোখ পুড়ে যেতে চাইবে; মরিচের গুঁড়ো জমে থাকবে যেন!
ঘুম আসবে না; আসবেই না; মনে করার চেষ্টা করবে
মুখখানা যেন কার মতো? চুলগুলো জড়িয়ে যাবে যখন!
কপাল থেকে আলতো চুল সরিয়ে দেবে
ঠোঁটের পাশে নিখুঁত সে মণ্ডল; কার মতো?
ঘুম আসবে না, ঘুম আসবে না; এপাশ ওপাশ করবে
অচেনা কষ্টে আমূল ডুবে যাবে। কেউ জানবে না
যত দূরেই যাও; নিশ্চিত জানি
ওই অচেনা পথে ভীরু কম্পিত হৃদয়ে
তারপরও বারবার বাড়াবে তোমার অনিশ্চিত পা।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.