প্রবন্ধ

সৈয়দ হকের কথাসাহিত্য: নক্ষত্রের কারুকাজ

monika_chokrovarty | 14 Jan , 2017  

Syed+Shamsul+Haq_26092016_0001‘আমাদের অনেক দুপুর ছিল কিন্তু আমরা পৌঁছতে পারিনি সন্ধ্যার কাছে।
আমাদের অনেক রাত ছিল কিন্তু আমরা পৌঁছতে পারিনি নক্ষত্রের কাছে।’
সৈয়দ শামসুল হক আমাদের কালের এক শ্রেষ্ঠ লেখক। সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর বিচরণ। তাঁকে চিনতে পারা,তাঁর খুব কাছে যাওয়ার পথটি খুবই কঠিন। তাঁকে যেটুকু জেনেছি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে। তাঁর ব্যক্তিত্ব,বাচন মনোমুগ্ধকর। যতবার কাছ থেকে দেখেছি ততবারই আলোড়িত হয়েছি। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে সৈয়দ হকের বিচরণ নেই। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, গান,অনুবাদ সকল শাখাতেই তিনি দ্যুতিময়। স্বকীয় এক ভাষা নির্মানে তিনি সার্থক। নতুন নতুন ভাবনায় সমৃদ্ধ তাঁর লেখার আবেগ,আকুতি,জীবন যন্ত্রণা, দেশপ্রেম।
স্কুল জীবনে সংবাদ পত্রিকাটির সাথে আমার একটি আত্মিক সর্ম্পক গড়ে ওঠে। তার একটি অন্যতম কারণ ছিল তাঁর লেখা শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক কলাম ‘হৃৎকলমের টানে’। খুবই জনপ্রিয় ছিল এই কলামটি। এই কলামের নানা প্রসঙ্গ ঘিরে চিঠি লিখেছি কখনও মনে মনে,কখনও প্রকাশ্যে। সমাজজীবনের নানা সংকট অতি দক্ষতার সাথে খুব তীব্র আর তীক্ষ্ণভাবে প্রতিফলিত হত এই কলামটিতে। নতুন নতুন ভাবনায় ভিতরে ভিতরে চমকে উঠেছি এসব লেখা পড়ে। নিজের ভিতরে নানা রকম বোধের বিকাশ সেসময় টের পেতে থাকি। সংবাদ পত্রিকাকে ঘিরেই তার উপন্যাস ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ ধারাবাহিকভাবে পড়তে থাকি। তখন আমার বয়স অল্প। তাঁর লেখা আমাকে মুগ্ধতার ঘোরে ভরিয়ে রাখত।

কলেজে উঠতেই যে বইটি আমি অনেক কষ্টে সংগ্রহ করে পড়েছিলাম,তা হল খেলারাম খেলে যা। কলেজের মহিলা হোষ্টেলে একটি মেয়ের কাছ থেকে বইটি সংগ্রহ করি। সংগ্রহ করার সময় পড়া শেষ হলে তাকে দ্রুত ফেরত দেবো বলি। কিন্তু একটা বড় রকমের ছুটিতে কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বইটি আর ফেরত দেয়া হয়না। বইটির ভিতর রক্তমাংসের জান্তব অনুভব এত বেশী মনে হয়েছিল তখন যে আমি হতাশ হয়েছিলাম। ঘৃনা করেছিলাম বাবর চরিত্রটিকে। ভেবেছিলাম এই লেখাটি লেখার কী প্রয়োজন ছিল!
জাহেদা বাবরকে ভালবেসে ফেলেছে এটা সন্দেহ করে বাবর যখন ভাবে–‘আমি কাউকে ভালবাসি না। কাউকে না। ভালোবাসা বিশ্বাস করি না। এহতে পারে না। এ আমি চাই না।—নিষ্ঠুরতা যেন আরো প্রবল হয়ে ওঠে বাবরের মনের মধ্যে। স্নেহ,দয়া,ভালোবাসা! হাঃ! এ কিসের মধ্যে জড়িয়ে ফেলতে চায় তাকে জাহেদা? জানে না, বাবরের জানা আছে কী করে বেরিয়ে আসতে হয়! বেরিয়ে সে আসবেই। ভালোবাসার জন্য জাহেদাকে সে আনেনি।–না কিছুতেই সে প্রশ্রয় দেবে না। তার কেউ নেই। কেই হবেও না কোনোদিন।’

‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি’ জাহেদাকে এই বাক্য বলার পর—‘বিশ্বাস না কচু! চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করল বাবরের। দু’পয়সার দাম দিই না। আমি যা চাই তা এমনি তোমার পাজামা ছিঁড়ে ভেতরে যেতে। কি ক্লান্তিকর এই অভিনয়,এই সহাস্য মুখ তৈরি করা; এই কথার মালা গাঁথা।’
খেলারাম খেলে যা উপন্যাসের সকল নারী–লতিফা, বাবলি, জাহেদা, মিসেস নাফিস প্রত্যেকেই বাবরের পাতানো খেলার জালে আটকা পড়ে। বাবর তাদের ধর্ষণ করেনা, কিন্তু কথার যাদু দিয়ে, দক্ষ অভিনয় দিয়ে, আকস্মিকতার দোহাই দিয়ে,পরিস্থিতি সাজিয়ে নিয়ে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলে সে।
আমি যে বয়সে বইটি পড়ে শেষ করি তখন আমার মানসিক প্রতিক্রিয়ায় সমস্ত পুরুষের প্রতিই একরকমের ভয় কাজ করতে থাকল। আমি অনেকদিন এই ভয়টিকে মনের ভিতর থেকে তাড়াতে পারিনি। আমার বিশ্বাসই হতনা যে সৈয়দ শামসুল হক এই বইটি লিখেছেন! নরনারীর সর্ম্পকের মধ্যে কোমল গভীর জলরঙের যে প্রেমময়তার ছবি আমি কল্পনা করতাম, সেখানে বাবর চরিত্রের নীচতা আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। আমার সেই অল্পবয়সে প্রেম ছিল এককুচি জ্যোৎস্নার মত,অলঙ্কারের মত,অকারণেই কাউকে ভালবেসে যাবার আকুতি। তা ছিল এক অবাক করা ব্যাপার,নিবিড় অনুভবের, একাকী গভীর ভাবে বেজে ওঠার এক অন্য সুর। আমি তখনও জানিনা মানুষের অবচেতনের প্রতিক্রিয়ায় বাবরের মত একটি শক্তিশালী চরিত্র উঠে আসতে পারে। বড় হয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ দিয়ে বইটি আবার পড়ি। আর অনুভব করতে থাকি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ট্রমায় আক্রান্ত একজন মানুষের মনোজগতের এইরকম পরিবর্তন হতেই পারে। অবচেতন থেকে উঠে আসা ব্যর্থতার সমন্বয়ে একজন বিষাদগ্রস্থ অসুখী মানুষ বাবর আলি। যে ভালবাসায় বিশ্বাসী নয়। জগৎ ও জীবন বিষয়ে যার বিরক্তি, বিতৃষ্ণা আমাদেরকে ভাবায়। জটিল মনস্তাত্বিক সংকটের ভর থেকেই উঠে এসেছে খেলারাম খেলে যা উপন্যাসটি। ‘সেন্স অব রিয়েলিটি’এক এক জনের জন্য এক একরকম। নানা বয়সে সময়ের প্রতি আনুগত্যও ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। বড় হতে হতে আমি এই উপন্যাসটির গভীরের বাবর চরিত্রকে আরও নানা ভাবে আবিষ্কার করি। একজন বিষাদগ্রস্থ,দুঃখিত,একাকী বাবর আলি যখন নিজেকে পুনুরূদ্ধারের জন্য নানা অভিনয় আর কৌশলকে অবলম্বন করে বারবার যৌনতার দিকে ধাবিত হয়, বিভিন্ন নারীকে প্রতারিত করে তখন সেই প্রতারিত নারীর সাথে সাথে একজন শেকড়ছেঁড়া বাবর আলির হাহাকারটিও আমাদের কানে আসে। সেই ব্যর্থ মানুষটির অবিরাম যৌনতার পিছনে ছুটে বেড়ানোর মধ্যে প্রবল বিষাদগ্রস্থতাও মিশে থাকে।

খেলারাম খেলে যা উপন্যাসটি পাঠের কয়েক বছর পর সৈয়দ শামসুল হকের লেখা আরও কয়েকটি উপন্যাস দূরত্ব, নীল দংশন, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, তুমি সেই তরবারি, স্বপ্ন সংক্রান্ত–এইসব লেখাগুলো আমি পড়বার সুযোগ পাই। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময়ের দাঙ্গা খেলারাম খেলে যার বাবর চরিত্রে যেভাবে মনোজাগতিক শূন্যতা ও বিকৃতিকে প্রকাশ করে পরবর্তী উপন্যাসগুলোতেও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব কোন না কোন ভাবে চরিত্রগুলোর মধ্যে থেকে যায়। সমাজের মধ্যে থেকেই নানা রকমের ট্রমা কী করে চরিত্রগুলোর জীবনকে অন্যরকম করে দেয়,এই উপন্যাসগুলোতে নানা পারষ্পরিক চিন্তা চেতনার মধ্যে দিয়ে সেরকম অসহায় জীবন,তীব্র জীবনকে তিনি নানা ফর্মে এঁকেছেন।

দূরত্ব উপন্যাসটি আমার খুব ভাল লাগে। এ লেখাটি সর্ম্পকে তিনি বলেছিলেন,‘ প্রবাস থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় ফিরে আমার প্রথম লেখা ‘দূরত্ব’-মণিপুরী পাড়ার ছোট্ট বাসায় ছোট্ট টেবিলে অধিকাংশই মধ্যরাত থেকে ভোর রাত অবধি লেখা এই উপন্যাসে আমার সেই বন্ধুটিকে আমি বর্ণনা করতে চেয়েছি,যে হঠাৎ একদিন ঢাকা থেকে হারিয়ে যায় এবং বহু বৎসর পরে যাকে আমি অকস্মাৎ আবিস্কার করি দূর একটি গ্রামে,কলেজের অধ্যাপক হিসেবে এবং সেই যাকে আমি সুপুরি গাছ ঘেরা বাড়িতে ছবির মতো সাজানো টিনের বাড়িতে দেখি–সবই শান্ত ও সুখময় কিন্তু যেন আমাকে দেখেই তার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় শ্বাস যেন একটা জীবন ছিল অতীতে, পেছনে,সম্ভাবনাময়,এখন আর নেই আশাহীনভাবে।’

‘জয়নাল নীরবে খোদেজার পাশ কাটিয়ে ইষ্টিশানের দিকে নেমে যায়। যেতে যেতে পচা মাংসের ঘ্রাণ তাকে নিয়ে ছলনা করছে, সে দেখতে চায়। এই আছে,এই নেই। ডান দিক থেকে আসছে,ডান দিক থেকে মুখ ফেরাতেই বাঁ দিক থেকে অতি ধীরে এসে লতিয়ে ধরছে; আর সে যেন অবিরাম সেই বিপুল ক্ষতের দিকে এগিয়ে চলেছে। তার যাবার ইচ্ছে নেই, কিন্তু ইচ্ছের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ সে যেন হারিয়ে ফেলেছে। হারিয়ে ফেলেছে ;কিন্তু আবার এটাও মনে হচ্ছে অচিরেই,এই বাঁকটা পেরুলেই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সে ফিরে পাবে। ফিরে পাবে, এই বিশ্বাসটা এখনো আছে বলেই ভেতরটা নিরুদ্বেগ। নিরুদ্বেগ কিন্তু কোথাও যেন কী একটা টিপটিপ করে চলছে, যেন একটা আঙুল বিরতিহীন তাল দিয়ে চলেছে।’
একজন অর্ন্তমুখী মানুষ জয়নাল যিনি ঢাকা থেকে রাজারহাট মফস্বল শহরের একটি কলেজে শিক্ষকতার চাকুরি নিয়ে আসেন। রাজারহাটকে প্রকৃত শহরের মানুষ গ্রামই বলবে। যদিও প্রশাসনিক নথিপত্রে রাজারহাটকে ছোট শহরই বলে। রেলষ্টেশন ,ডাকঘর,শনি-মঙ্গলবারের হাট, ডোবা ধানক্ষেত ব্যাংক, ইস্কুল ,আর নতুন কলেজটি রয়েছে রাজারহাটে। ‘দিনে দুবার ট্রেন থামে। সে ট্রেন পরের ইষ্টিশান নবগ্রাম পেরিয়ে জলেশ্বরিতে যায়,আবার সেখান থেকে উলটো যাত্রা করে রাজারহাট পেরিয়ে তিস্তা ফিরে আসে।’
‘ইষ্টিশানের ওপাশেই বহুদূর পর্যন্ত একটা খাল চলে গেছে। সেই খালে ভেজান আছে পাট। যতদূরেই যাওয়া যাক না কেন ভেজা পাটের গলিত গন্ধ পেছন ছাড়ে না।
জানা না থাকলে মনে হতে পারে পৃথিবীর শরীরে উৎকট কোন ক্ষত হয়েছে ,মাংস পচে গলে পড়েছে,বাতাস বিষাক্ত হয়ে গেছে। যখন হঠাৎ করে হাওয়া দেয়,শিউরে উঠতে হয়।
‘নতুন অধ্যাপক পাট ভেজানোর খবর রাখেনা। পচা মাংসের ঘ্রাণ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। তার জামাকাপড়েও সেই গুরুগন্ধ সে এখন টের পাচ্ছে। মনে হয়,তার নিজের শরীরেই পচন ধরে গেছে।’
পুরো উপন্যাস জুড়েই এই তীব্র পচনের গন্ধ টের পায় জয়নাল। বিষের মতো এক ভাল না লাগার মধ্যে দিয়ে তার অবিরাম অনুভব। সে অনুভব গভীর শীতল আর সর্বগ্রাসী। এক সর্বগ্রাসী বিপন্নতা ও ভয় জয়নালকে ক্রমাগত অসহায় করে তোলে। সে হয়ে ওঠে এক দিকভ্রান্ত মানুষ। রাজারহাটে ভয়াবহভাবে এক আজব জন্তুর উপস্থিতি ও বাঁশবনে এক শিশুর মৃতদেহ,মাঝে মাঝে রাতের অন্ধকারে বীভৎস চিৎকার সবমিলিয়ে এক বিচিত্র ও ভয়াবহ অনুভবের মধ্যে দিয়ে জয়নাল অসহায় ভাবে চলতে থাকে। পচা গন্ধ চাপ চাপ ভেসে থাকে চারদিকে,অনেক নূরানী চেহারার মানুষের মধ্যে সে দেখতে পায় অজানা জন্তুটির লোমশ শরীর। অজানা আশঙ্কায় সে থরথর করে কাঁপে, তবু সমাধানের পথে সে যেতে পারে না। পারষ্পরিক সর্ম্পকের কাছে মানুষ কত বেশি অসহায় ,এই উপন্যাসে সেটি বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি জয়নালের অর্ন্তনিহিত মনস্তাত্বিক জটিলতা ও অবদমনের মধ্যে জীবনের এক ভিন্নরকম নির্যাস পাওয়া যায়। এখানে বারবার, এবং অসংখ্যবার উঠে এসেছে পচা গন্ধের বীভৎসতা আর পাশাপাশি এক অদেখা জন্তু। এই দুটি বিষয়ই উপস্থাপন করেছে এমন এক নৈরাজ্যময় সময়কে যখন সকল মানুষ বোধহীন। তারা সবকিছুই বিশ্বাস করে। এমনকি বোধহীনতা এমন পর্যায়ে থাকে যে এরা পচা গন্ধটিও টের পায় না। এই পচন প্রকৃতপক্ষে এক নৈরাজ্যময় সময়ের পচন। বিষাক্ত বাতাসে শিউরে উঠতে উঠতে জয়নাল একসময় জীবন মৃত্যুর লৌকিক অলৌকিক গোধূলিতে দাঁড়িয়ে থাকে। মৃত্যু হয়ত অনিবার্য,অব্যর্থ নিয়তি, কিন্তু শেষ কথা নয়। অন্ধকারের ছায়ার ভিতর গোপন রক্তক্ষরণ আর টানাাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে এক নিরূপায় সময় জয়নাল কে তার আত্মিক জায়গা থেকে অনেক দূরে দাঁড় করিয়ে দেয়।

এই উপন্যাসটিতে আছে অর্ন্তমুখী নিরুপায় জয়নালের অর্ন্তগত ব্যবচ্ছেদ। কখনও কখনও সে আর্শ্চয্যভাবে জীবনবাদী। ‘জয়নালের এ জীবন ভাল লাগে না,জীবন তার কাছে অসম্পূর্ণ একটি খেলনা বলে মনে হয়;তবু তো সে এই খেলনা ছুঁড়ে ফেলে দেবার কথা,ভেঙ্গে ফেলবার কথা ভাবতেও পারে না। ভাবতেও তার গায়ে হিমকাঁটা দিয়ে ওঠে, আকাশ নক্ষত্র-বমন করতে থাকে,তার ঠোঁটের ওপর মুহূর্তে স্বেদ ফুটে ওঠে,পৃথিবীর সমস্ত কোলাহলকে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে হয়,রমনার সবুজ বুক দিয়ে ঠেসে ধরে রাখতে সে ছুটে যায় যেন সেই মাঠ হঠাৎ পাখা পেয়ে উড়ে না যায়।’ তাই রাজার হাটের চ্যায়ারম্যানের মেয়ে,তার কলেজের ছাত্রী সালমার প্রতি একধরনের ভাললাগার বোধ অনায়াসেই জয়নালের মধ্যে তৈরি হয়। যদিও সে ততটা উন্মুখ ও অধীর থাকে না। ‘দৃষ্টি বিনিময়ের সঙ্গে সঙ্গে সালমা স্মিতচোখে মুখ নামিয়ে নেয়। তখন আবার তাকে শিশুর মত দেখায়। সারল্যের এই আবিষ্কার তাকে আরো একবার বিস্মিত করে। জয়নাল আরো একবার স্মরণ করে,এই মেয়েটিরও নাম সালমা। কত আলাদা দুই সালমা। কত দূর রাজারহাট আর ঢাকা।’ সালমা নামের আর একটি মেয়ে তার সহপাঠী ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যদিও তার সাথে রাজারহাটের সালমার দৈহিক গঠনের কোন মিল নেই,তবু সেই সালমার প্রতিও তার একটি যাদুটান নিঃশব্দে বয়ে গেছে এই উপন্যাসের ভিতরে। নামের এই অভিন্নতা কিভাবে অবচেতনে সংকট তৈরি করে তার চমৎকার বর্ণনা আছে নীল দংশন উপন্যাসটিতেও। দূরত্ব উপন্যাসে সালমা নামটি জয়নালের ভিতরে নিঃশব্দে বহমান এবং খুব স্বাভাবিকভাবে রাজারহাটের অপরিচিতা সালমাও অকস্মাৎ তার সাথে এই নামের কারনেই এক গভীর বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। সালমার প্রতি এই সম্মোহনকে লেখক যেভাবে বর্ণনা করেছেন,‘ওষুধের মত কাজ করে এই বিস্ময়। কাল রাতে চিৎকার সে কেবল একাই শুনেছে,এটা উপলদ্ধি করার পর তার মাথার ভেতরে অবিরাম কয়েকটি জাঁতা ঘুরছিল। আর প্রতি ঘূর্ণনে সমস্ত কিছু গুড়ো হয়ে কেবলি উৎক্ষিপ্ত হচ্ছিল। একই সঙ্গে দৃশ্যমান সমস্ত কিছু বাস্তব এবং বিভ্রম বলে বোধ হচ্ছিল তার। এবং পাটের পচা গন্ধটিতে আবার তার মনে হচ্ছিল পৃথিবীর শরীর থেকে দূরারোগ্য ব্যাধিতে পচে যাওয়া মাংস বিরাট এক একটা চাঙ্গার হয়ে খসে খসে পড়ছে। এখন সালমার দিকে দৃষ্টিপাত মাত্র আর্শ্চয দ্রুতগতিতে আরোগ্যলাভ করে সে। কাল রাতে আদৌ সে চিৎকারটি শুনেছিল কিনা,এ তর্ক তাকে আর দ্বিখন্ডিত করে রাখে না।’
সালমার চোখে চোখ রেখে এই পচা গন্ধের নৈরাজ্যময় সময়ে সে শুধু সালমার মধ্যে শিশুর সারল্যটুকু আবিষ্কার করতে চায়। তার সহপাঠি সালমাকে নিয়ে তার জৈবিক অবদমনের প্রকাশও খুব স্বাভাবিক অথচ রাজারহাটের সালমা শুধুই সারল্যের প্রতীক। জীবনের চারপাশে যখন পচা গন্ধের আর লোমশ জন্তুর আনুগত্য পালনই শেষ কথা তখন রাজারহাটে সালমার সারল্যভরা মুখই জয়নালের একমাত্র আশ্রয়। জয়নাল যখন জানতে পারে সালমার বাবাই রাজারহাটের চেয়ারম্যান আর এই কলেজ তারই তখন সে একটু দ্বিধাগ্রস্থ হয়। সে প্রবলভাবে চমকে ওঠে যখন সে জানতে পারে সালমার বাবা একাত্তর সালে শান্তিকমিটিতে ছিলেন। লোকটির আচরনের মুহূর্তের বদল জয়নালকে রোমশ জন্তুটার কথা মনে করিয়ে দেয়। আর পুরো পরিস্থিতিটাই তৈরি করে এক দ্বান্দ্বিক পটভূমি। যে সীমাবদ্ধতা থেকে জয়নাল বেরিয়ে আসতে পারে না। যদিও সে অধীরভাবে অপেক্ষা করে আর তৃষিত অনুভব করে ভূধর সরখেলের গানের জন্য। এখানে এসেই তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে এত পচনের মধ্যে একমাত্র গানের কারনেই বেঁচে থাকা কখনও কখনও সম্ভব হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভূধর সরখেলের আত্মহত্যা ওই সময়ের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের চিত্রকে তুলে ধরে। এই উপন্যাসটি এক কথায় সেই সময়ের শহরায়ন প্রক্রিয়া,সাম্প্রদায়িকতার উষ্কানি,মূল্যবোধ ও নৈতিকতা ও মনস্তাত্ত্বিকতাকে চমৎকারভাবে তুলে ধরে। চরিত্রগুলোর রহস্যচারিতা পুরো সমাজটিকে বিশ্লেষনের সংকেত দিয়ে যায়। উপন্যাসটির পরতে পরতে প্রতীকীভাবে উঠে আসে ইতিহাস। জেগে ওঠে নগ্ন, সত্য, রূঢ়,একই সঙ্গে গোপন ও মিথ্যে। উপন্যাসটির ভিতর থেকে উঠে আসে আত্মহত্যা, মৃত্যু, বিপরতিগামী সময়,আর অজানা অস্থিরতা। শেষ পর্যন্ত পড়ে থাকে ভ্রম আর দূরত্ব।
জীবন তার নিজের নিয়মে গড়াতে থাকে। সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে আমরা দিকভ্রান্ত আর দিশেহারা হয়ে যাই। তীব্র জীবনকে নিয়ে তিনি ছিলেন লেখার এক বর্ণময় পৃথিবীতে। রঙের পিপাসা তাঁর মধ্যে বেঁচে ছিল আমৃত্যু। শিল্পের প্রজ্ঞা নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অকপট ভাবে এগিয়ে গেছেন মৃত্যু-উপত্যকায়। জীবন ও মৃত্যুর বিপ্রতীপ ঘূর্ণির ভিতর আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থাতেও তিনি অনিবার্য ভাবে উপস্থিত ছিলেন তাঁর শিল্পময়তায়। তাঁর যন্ত্রণাময় মুহূর্তগুলি দিয়েও রচনা করে গেছেন সৃজনকর্মের অন্তহীন আত্ম-আবিষ্কার। তাঁর নিরন্তর পরিশ্রম আর অভিনিবেশকে শ্রদ্ধা জানাই।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.