অনুবাদ গল্প

মাৎসুও বাশোর গল্প: বৃদ্ধা মা

shorab_sumon | 9 Jan , 2017  

গল্পটি ইংরেজিতে দ্য স্টোরি অব দি এজড মাদার নামেও পরিচিত, জাপানি এই লোককাহিনিটিতে অজানা এক শাসকের গল্প বলা হয়েছে যিনি তার দেশের সব বৃদ্ধকে পরিত্যাগ করে মৃত্যু বরণ করতে দেয়াসহ আরো সব নিষ্ঠুর আদেশ জারি করতেন। এখানে বাশো একজন মা এবং তার ছেলের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে করুণ একটি গল্প লিখেছেন। গল্পটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সোহরাব সুমন। বি. স.

Aged-motherঅনেক অনেক দিন আগে পাহাড়ের পাদদেশে এক দরিদ্র কৃষক এবং তার বিধবা মা বসবাস করত। তাদের একখন্ড জমি ছিল, সেখান থেকে তাদের খাবার-দাবার আসতো। তারা ছিল খুবই বিনয়ী, শান্তিকামী, এবং সুখী।
এক অসীম ক্ষমতাধর নেতা সে সময় শাইনিং শাসন করছিলেন। একজন যোদ্ধা হবার পরও স্বাস্থ্য আর শক্তিহানির যে কোন ঘটনার প্রতি তার ছিল প্রচণ্ড ধরনের কাপুরুষোচিত এক সঙ্কোচ। এধরনের ধ্যান-ধারণা থেকে সে নিষ্ঠুর এক আদেশ জারি করতে প্রোরোচিত হয়। সমস্ত প্রদেশ জুড়ে সত্বর সব বৃদ্ধ লোকেদের মেরে ফেলার কঠোর আদেশ জারি করা হয়। বর্বরতম সেই যুগে, মরবার জন্য বৃদ্ধদের দূরে কোথাও ফেলে আসার রীতি খুব অস্বভাবিক কোন ঘটনা ছিল না। দরিদ্র কৃষক খুব ভক্তি আর শ্রদ্ধা সহকারে তার বৃদ্ধা মাকে ভালোবাসতো আর তাই এমন আদেশ শুনে তার মন গভীর দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু শাসকের আদেশ অমান্য করবার কথা কেউই দুবার চিন্তা করতে পারতো না, তাই প্রচণ্ড হতাশায় বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সেই যুবক তার মায়ের জন্য সে সময়কার প্রচলিত সবচেয়ে সদয় মৃত্যু নিশ্চিত করবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

ঠিক সূর্য ডোবার সময়, দিনের কাজ শেষ হয়ে এলে, সে সামান্য আতপ চাল সেদ্ধ করে। তখনকার দিনে এটাই ছিল গরিব-দুখীদের প্রধান খাবার। তারপর সেদ্ধ ভাতের জল ঝরিয়ে, সামান্য শুকিয়ে নিয়ে তা একটুকরো চারকোনা কাপড়ে বাঁধে, একটা লাউ-এর খোলা শীতল মিঠা জলে পূর্ণ করে সেটাসহ ভাতের পুটলিটা তার গলায় ঝোলায়। এরপর সে তার অথর্ব বৃদ্ধা মাকে পিঠে তুলে নিয়ে পাহাড়ের দিকে ক্লান্তিকর আর যন্ত্রণাদায়ক যাত্রা শুরু করে। পথটা খুব দীর্ঘ আর ঢালু। সেই সরুপথ একের পর এক পথ পেরিয়ে শিকারী আর কাঠুরেদের তৈরি এমন আরো অনেক পথকে বারবার অতিক্রম করেছে। বেশ কয়েক বার, তারা পথ হারায়, বিভ্রান্ত হয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়, তবে সেদিকে খুব একটা মনোযোগ দেয় না। এপথ বা অন্য কোন পথ, তাতে কিছু যায় আসে না। সে কেবল চাইছে, অন্ধের মতো উপরের দিকে উঠতে– অনেক ওপরে সেই অনাবৃত চূড়ার দিকে যেটা অবাতসুয়ামা নামে সবার কাছে পরিচিত, “বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ফেলে আসার” পাহাড়।
বৃদ্ধা মায়ের চোখ জোড়া তখনো পুরোপুরি ঝাপসা হয়ে যায়নি, ছেলের এপথ পেরিয়ে অন্য পথে যাবার বেপরোয়া তাড়া সে টের পাচ্ছিল, তাতে করে তার স্নেহভরা মন চিন্তিত হয়ে ওঠে। পাহাড়ি এসব পথ-ঘাট তার ছেলের খুব একটা চেনা নেই, ওর ফিরে যাবার সময় আবার না কোন বিপদ হয়। এই ভেবে তাদের পথ চলবার কোন এক মুহূর্তে সে সামনের দিকে হাত বাড়ায় এবং ঝোপের একটা ডাল খাবলে ধরে ছিড়ে নেয়। ওপরে ওঠার সময় কয়েক কদম পর পর এভাবে সে পথের ওপর একটা করে ডাল ফেলতে থাকে। তাদের পেছনের সরু পথটা কিছু দূর পরপর পড়ে থাকা ছোট্ট ডালের ফুটকিতে চিহ্নিত হয়ে থাকে। অবশেষে তারা একেবারে চূড়ায় এসে পৌঁছায়। ক্লান্ত আর অবসন্ন যুবক ছেলে ভাঙা মনে আলতো করে পিঠের বোঝা নামিয়ে রেখে, শেষ বারের মতো তার আদুরে মায়ের জন্য আরামদায়ক একটা জায়গা প্রস্তুত করতে শুরু করে। পাইনের সুচালো পাতা জড়ো করে সে নরম একটি গদি বানায় এবং ওর ওপর তার বৃদ্ধা মাকে আলতো করে বসিয়ে দেয়। তার তুলতুলে কোটটিসহ খুব কাছ থেকে গাছের ডাল দিয়ে ঝুকে থাকা কাঁধ অবধি ঢেকে দেয়। তারপর ভেজা চোখে এবং ব্যথাভরা মনে তাকে বিদায় জানায়।

মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় ভরা কাঁপা কাঁপা স্বর শেষবারের মতো তাকে আদেশের সুরে বলে ওঠে। “চোখ বুজে অন্ধের মতো হাঁটিসনে, বাবা আমার।” সে বলে। “পাহাড়ি পথ বিপদ-আপদে ভরা। একটু দেখে শুনে পথ চলিস আর যে পথে একটু পরপর ডাল পড়ে থাকতে দেখবি সে পথ ধরে বাড়ি ফিরিস। ওগুলো তোকে পথ দেখাবে, ও পথ দিয়ে সোজা নেমে গেলে, আরো নিচে পরিচিত পথের দেখা মিলবে।” ছেলের বিস্মিত চোখ পেছনের পথের পানে তাকায়, তারপর অসহায় বৃদ্ধার দিকে, তার কাঁপতে থাকা দুহাতের পুরোটা জুড়ে কেবল আঁচড়ের দাগ আর মমতা জড়ানো কাজের সময়কার মাটিতে মাখামাখি। তার হৃদয় ফুসে ওঠে এবং সে মাটিতে কুর্ণিশ করে আর চিৎকার সহকারে কেঁদে ওঠে : ওহ, শ্রদ্ধময়ী মা, তোমার দয়া আমার মন ভেঙে দিলো! আমি আর তোমাকে ছেড়ে যাবো না। আমরা একসঙ্গে ওই ডাল বিছানো পথ ধরে বাড়ি ফিরে যাবো আর মরতে হলে একসঙ্গে মরবো!”
আবারো সে তার বোঝাটি কাঁধে তুলে নেয় (এবার তা আগের চেয়েও অনেক হালকা) এবং দ্রুত পথ ধরে নেমে আসে, ছায়া আর জোছনার আলোর মাঝ দিয়ে, উপত্যকার ওপর তাদের সেই ছোট্ট কুঁড়ের দিকে এগিয়ে যায়। রান্নাঘরের পাটাতনের নিচে খাবার রাখার জন্য দেয়ালের একটা তাক আছে। ওপর থেকে ঢাকা থাকায় বাইরে থেকে তা দেখে বোঝা সম্ভব নয়। সেখানে ছেলে তার মাকে লুকিয়ে রাখে, তার দরকারের সবকিছু দিয়ে আসে, বারবার গিয়ে দেখে আসে আর ভয়ে ভয়ে থাকে কখন না কে আবার দেখে ফেলে। সময় গড়িয়ে যায়, এবং ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করতে, সেই রাজ্যপাল আবারো অযৌক্তিক এক আদেশ জারি করবার জন্য তার পতাকাবাহী লোক পাঠাবার পর থেকে সে নিরাপদ বোধ করতে থাকে। এবার তার দাবি হলো তার রাজ্যে লোকদেরকে তাকে একটি ছাইয়ের দড়ি বানিয়ে দেখাতে হবে।
সমস্ত রাজ্য ভয়ে শিউরে ওঠে। শাইনিং-এর কেউ ছাই-এর দড়ি বানাতে না পারলেও আদেশ অবশ্যই মান্য করতে হবে? সেই ভয়ানক হতাশার মাঝে, একরাতে, ছেলে ফিসফিসিয়ে খবরটা তার লুকিয়ে-রাখা মাকে গিয়ে বলে। “দাঁড়াও!” সে বলে। “আমি ব্যপারটা নিয়ে ভাবছি। আমি ভাবছি” দ্বিতীয় দিন সে তাকে বলে কী করতে হবে। “পাকানো খড় দিয়ে একটি দড়ি বানাবে,” সে বলে। “তারপর ওটা একসারি চেপ্টা পাথরের ওপর রাখবে এবং বাতাস বইছে না–এমন এক রাতে ওতে আগুন দেবে।” সে লোকদের সবাইকে একত্রে জড়ো করে এবং মায়ের কথা মতো কাজ করে, তারপর সেই আগুনের দ্যুতি নিভে এলে, পাথরের ওপর, হুবহু পাকানো, আঁশ সমেত একেবারে নিখুঁত একটি ছাই-এর দড়ি পড়ে থাকতে দেখা যায়।

যুবকের বুদ্ধিতে রাজ্যপাল খুবই খুশি হন এবং নম্রভাবে তার প্রশংসা করেন, তবে এধরনের বুদ্ধি সে কোথা থেকে পেলো তা খুলে বলবার আদেশ করেন। “হায়! হায়!” কৃষক চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, “এবার তো সত্য বলতেই হবে!” এবং কুর্ণিশ করে ঝুঁকে সে এর গল্পটা খুলে বলতে শুরু করে। শাসক এর সবটা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং তারপর চোখবুজে চুপচাপ খুব করে ভাবেন। অবশেষে তিনি মাথা তোলেন। “যুবাদের শক্তির চেয়ে শাইনিং-এর আরো বেশি কিছুর দরকার রয়েছে,” তিনি গম্ভীর স্বরে বলেন। “আরে, আমি তো সেই বিখ্যাত কথাটা ভুলেই গিয়েছিলাম, “প্রজ্ঞা আসে তুষারের মুকুটে চড়ে!” ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে নৃশংস আইনটি রদ করা হয়, এবং বুড়োদের ফেলে আসার সেই রীতি অতীত হতে হতে এক সময় কেবল লোক কাহিনিতে ঠাঁই করে নেয়।
Flag Counter


2 Responses

  1. It’s a beautiful story and well translated with a message!

  2. শান্তা মারিয়া says:

    অনেক বছর আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত উপকথার সংকলন গ্রন্থ ‘মণির পাহাড়’ এ আমি আজারবাইজান বা উজবেকিস্তানের একটি উপকথায় অনুরূপ একটি কাহিনী পড়েছিলাম। সেখানেও বৃদ্ধদের মেরে ফেলার ঘোষণা দেয় নিষ্ঠুর শাসক। কিন্ত্র এক প্রজা তার বাবাকে না মেরে লুকিয়ে রাখে। পরে সেই বৃদ্ধের বুদ্ধিতে তিনটি বড় বিপদ থেকে রক্ষা পায় তাদের গোত্র। তখন শাসক বুঝতে পারে তারুণ্যের শক্তির সঙ্গে বৃদ্ধের প্রজ্ঞার সম্মিলন হওয়াটা জরুরি। সোহরাব সুমনকে ধন্যবাদ এই গল্পটি অনুবাদের জন্য। জাপানি কিছু মিথোলজির অনুবাদও যদি তিনি করেন তাহলে ভালো হয়। বাংলায় জাপানি সাহিত্যর অনুবাদ খুব বেশি হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.