অনুবাদ, প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য

হেমিংওয়ের মৃত্যুতে গার্সিয়া মার্কেসের প্রবন্ধ: একজন মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু

যুবায়ের মাহবুব | 4 Dec , 2016  

১৯৬১ সালের ২ জুলাই নতুন জীবন গড়ার উদ্দেশ্যে সপরিবারে মেহিকো সিটিতে এসে পৌঁছান তরুণ কলম্বিয় লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। ঘটনাক্রমে সেই একই দিনে মহাদেশের আরেক কোণে আত্মহত্যা করেন নোবেল বিজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। সংবাদটি পেয়ে তার ব্যক্তিগত আইডল হেমিংওয়ের প্রতি একটি শ্রদ্ধার্ঘ লিখেছিলেন গার্সিয়া মার্কেস, যেটি সপ্তাহখানেক পর স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যতদূর জানা যায়, মেহিকোয় প্রকাশিত সেটিই ছিল গার্সিয়া মার্কেসের প্রথম গদ্য রচনা। প্রথমবারের মত এটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন অনুবাদক যুবায়ের মাহবুব।
Hemingway-1

এবার বোধ হয় গুঞ্জনটি সত্যি – আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আর নেই। দূর-দূরান্তে, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে এই সংবাদ সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে, খবরটি পৌঁছে গেছে ক্যাফের বয়-বেয়ারাদের কাছে, শিকারী গাইড আর শিক্ষার্থী ম্যাটাডোরের কাছে, জেনে গেছেন ট্যাক্সি চালক, ভগ্নস্বাস্থ্য মুষ্টিযোদ্ধা, অবসরপ্রাপ্ত জনৈক বেনামী বন্দুকবাজ।

অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো অঙ্গরাজ্যের কেচাম নামের ছোট্ট শহরে এই সুনাগরিকের মৃত্যু স্রেফ একটি দুঃখজনক স্থানীয় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, ওর বেশি কিছু নয়। গ্রীষ্মের গরমে তপ্ত এক ঘরে গত ছয় দিন ধরে লাশ রেখে দেয়া হয়েছে, সামরিক সম্মাননা প্রাপ্তির কোন দুরাশায় নয়, বরং আফ্রিকায় সিংহ শিকারে গেছেন এমন একজনের ফিরে আসার অপেক্ষায়। পর্বতশৃঙ্গে মৃত চিতাবাঘের বরফজমাট দেহের পাশে এই লাশ খোলামেলা পড়ে থাকবে না শেয়াল-শকুনের আহার হয়ে, বরং মার্কিন মুল্লুকের অতিশয় শুচিশুদ্ধ কোন এক গোরস্থানে তিনি শোবেন শান্তিতে, তাকে ঘিরে থাকবে আরো কিছু চেনাশোনা মরদেহ।

বাস্তবজীবনের সঙ্গে এত মানানসই এইসব আটপৌরে পরিস্থিতির কারণেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হই যে না, হেমিংওয়ে সত্যিই মারা গেছেন অবশেষে, তার ব্যক্তিগত তৃতীয় প্রচেষ্টায়। পাঁচ বছর আগে যেবার তার প্লেন ক্র্যাশ করেছিল আফ্রিকায়, সে যাত্রা মৃত্যু হলে আসলে ঠিক বিশ্বাসযোগ্য হতো না। জঙ্গলের একটি ফাঁকা জায়গায় তাকে খুঁজে পেয়েছিল উদ্ধারকর্মীরা, ততক্ষণে তিনি উৎফুল্ল আধ-মাতাল, অল্প দূরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলো হাতির পাল। তার নিজের সাহিত্যকর্মে বিজয়ের তিক্ততা আয়েসে আস্বাদন না করে নায়কদের মরবার কোন অধিকার নেই, হঠাৎ সহজ মৃত্যু আগেভাগেই বাতিল করে দিয়েছেন ওখানে – সিনেমার জন্যে চলনসই হলেও বাস্তবে তা একদম বেমানান।

গেলো বসন্তে বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসার জন্যে দু-দুবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি, অথচ আজ ৬২ বছর বয়সী লেখককে মৃত পাওয়া গেল নিজের ঘরে, বাঘ-মারা শটগানের গুলিতে চৌচির তার খুলি। এই মৃত্যুকে আত্মহনন ভেবে নেয়ার পক্ষে কারিগরি যুক্তি আছে – বন্দুক ব্যবহারে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে মোটামুটি নাকচ করে দেয়া যায়। তবে বিপক্ষেও একটি যুক্তি আছে যেটি মূলত সাহিত্য সিদ্ধ – যে ধরণের লোক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, হেমিংওয়ে সে ধরনের মানুষ বলে কখনো মনে হয়নি। তার গল্প-উপন্যাসে আত্মহনন কাপুরুষতার পরিচায়ক, তার চরিত্রদের বীরত্ব প্রকাশ পায় কেবলই তাদের সাহসিকতা আর শৌর্যবীর্জের পরিমাপে। তবে সে যাই হোক, এক বিচারে হেমিংওয়ের মৃত্যুরহস্য কিন্তু পুরোটাই আপেক্ষিক। কারণ এবার যা ঘটে গেলো তা একেবারেই যথাযথ, তার গল্পের যে কোন সাধারণ চরিত্রের মতো মৃত্যুবরণ করেছেন লেখক, বলা যায় তার সৃষ্টির জন্যই মরেছেন তিনি।

Hemingway
গত কদিনে মুষ্টিযোদ্ধাদের অকৃত্রিম শোকের বিপরীতে প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে সাহিত্য সমালোচকদের দ্বিধা আর সংকোচ। মূল প্রশ্ন তো এই – আসলে কত বড় মাপের লেখক ছিলেন হেমিংওয়ে, নোবেল পুরস্কারের মত গৌরব তার কতখানি প্রাপ্য ছিল, যখন তিনি নিজেই এটিকে মানুষের দীর্ঘ জীবনের একটি টুকরো ঘটনার চেয়ে বড় করে দেখেননি?

প্রকৃতপক্ষে হেমিংওয়ে ছিলেন প্রখর সাক্ষী – মানবচরিত্রে তার যত না আগ্রহ, তার চেয়ে ঢের বেশি আগ্রহ ছিল ব্যক্তির কর্মপ্রচেষ্টায়। তার গল্পের বীরপুরুষ পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে উদয় হতে পারে, যে কোন পরিস্থিতিতে অথবা সমাজের যে কোন স্তরে প্রচন্ড লড়াই করতে সে প্রস্তুত, নেহায়েত টিকে থাকার জন্যে নয় বরং চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনাই তার উদ্দেশ্য। পরে গিয়ে টের পাওয়া যায় যে এই জয় খুব লোভনীয় কিছু নয় – শারীরিক অবসাদ আর নৈতিক সংশয়ই এর সারবস্তু।

তবু কথা থাকে। হেমিংওয়ের জগতে বিজয়ের বরমাল্য কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধার বরাতে জোটে না, বরং অধিকতর বিচক্ষণ ব্যক্তির কাছেই তা ধরা দেয়, কঠিন অভিজ্ঞতার পাথর ঘষে সে প্রজ্ঞা অর্জন করে নিতে হয়। সে অর্থে হেমিংওয়ে ছিলেন আদর্শবাদী। স্থূল পেশীশক্তির কাছে জ্ঞানবুদ্ধি পরাজিত হয়েছে, এমন পরিস্থিতি তার অগাধ সাহিত্যভান্ডারে কচিৎ দেখা যায়। বরং বৃহৎ রাঘব-বোয়ালকেও সাবড়ে দিতে পারে চুনোপুটি, যদি সে বেশী বুদ্ধিমত্তার পরিচয় রাখে। শিকারীর হাতে বন্দুক আছে বলেই সে সিংহরাজকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয় না, সে সফল হয় কারণ শিকারবৃত্তির সকল গোপন খুঁটিনাটি তার নখদর্পনে – যদিও ওর গল্পে অন্তত দুইবার শিকারীর চেয়ে সিংহই আরো বেশী ধুরন্ধর ছিল। যে উপন্যাসটিতে লেখকের সকল দোষ-গুণের চূড়ান্ত সমন্বয় ঘটেছে – দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি – সে গল্পেও বৈরী নিয়তির আঘাতে ক্লান্ত-বিক্ষুব্ধ একাকী জেলে সমুদ্রের সবচেয়ে বড় মাছটি ঘায়েল করতে সক্ষম হয়, সে লড়াই যত না শক্তির তার চেয়ে বেশি বুদ্ধির।

কালের পরিক্রমায় হেমিংওয়ে নিজে অধস্তন লেখক হওয়া সত্ত্বেও তার চেয়ে অনেক বড় বড় সাহিত্যিকদের গিলে খেয়েছিলেন, কারণ পুরুষমনের অলিগলি আর লেখালেখির রহস্য, উভয় বিষয়েই তিনি বেশী ওয়াকিফহাল ছিলেন। এক পত্রিকার সাথে সাক্ষাতকারে তার সাহিত্যের সেরা সংজ্ঞা দিয়েছিলেন তিনি সমুদ্রে ভাসমান হিমশীলার সাথে তুলনা টেনে। বরফের যে বিশাল পাহাড় জলপৃষ্ঠে দেখা যায়, তা সমগ্র আয়তনের অষ্টমাংশ হবে খুব বেশী হলে, অথচ পানির নীচে অদৃশ্য সাত ভাগই এই হিমশীলাকে করে তুলেছে দুর্ভেদ্য, অপরাজেয়।
Marqueaz

হেমিংওয়ের মহিমা এখানেই নিহিত – তার লেখা আপাতদৃষ্টিতে সহজ সরল স্পষ্ট, এমনকি নাটকীয় মুহূর্তেও প্রায় সময় নির্লিপ্ত। কিন্তু সাদাসিধে এই সাহিত্যের তলদেশে লুকিয়ে আছে, একে উঁচু করে তুলে ধরেছে নিগূঢ় প্রজ্ঞা।

হেমিংওয়ে স্বচক্ষে যা দেখেছেন, বাস্তবে যা উপভোগ করেছেন বা কষ্টভোগ করেছেন, কেবল তাই নিয়েই লিখতেন, কারন শেষ বিচারে স্বীয় অভিজ্ঞতাকেই শুধু বিশ্বাস করতে পারতেন তিনি। তার সমগ্র জীবন ছিল নিজ পেশা আয়ত্ত করার জন্যে নিরবচ্ছিন্ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এক ট্রেনিং, সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে গিয়ে অতিরঞ্জনের দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছে যেতেন তিনি। প্রশ্নটি না করে তাই পারা যায় না, লেখক ঠিক কতবার জান বাজি রেখেছিলেন স্রেফ তার চরিত্রের কোন ক্ষুদ্র আচরণকে বৈধতা দিতে?

সে অর্থে হেমিংওয়ে জীবনে ঠিক যা হতে চেয়েছিলেন, তাই হতে পেরেছিলেন, তার এক চুল বেশী নয় বা কমও নয় – অর্থাৎ একজন মানুষ যিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি কর্মে সম্পূর্ণ জাগ্রত-জীবন্ত ছিলেন। তার গল্পের নায়কদের সঙ্গে মিলে যায় হেমিংওয়ের নিয়তি, পৃথিবীর বুকে তাদের অস্তিত্বের যথার্থতা ক্ষণস্থায়ী হলেও প্রিয়জনের অটল ভালোবাসায় তারা অমরত্ব লাভ করেন।

হয়তো হেমিংওয়েকে মাপার সেটিই সবচেয়ে সঠিক মাত্রা। এমনও হতে পারে যে এই মৃত্যু কারো অস্ত নয়, বরং বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অজ্ঞাত-নামহীনের ঊষালগ্ন। এটিই তার প্রকৃত উত্তরাধিকার। মনুষ্যত্বের জ্বলজ্বলে উদাহরণ ছিলেন যিনি, ছিলেন ব্যতিক্রমী সম্মানে ভূষিত সফল শব্দশ্রমিক, স্রেফ আন্তর্জাতিক খ্যাতির চাইতেও বেশি কিছু হয়তো তার প্রাপ্য।
Flag Counter


4 Responses

  1. সাহানা মৌসুমী says:

    বিডি আর্টসের এক অসাধারণ পরিবেশনা! অনবদ্য অনুবাদ।

  2. তাপস গায়েন says:

    এটি নিতান্তই একটি গদ্য, জটিল কবিতা নয় । এই লেখাটিতে লেখক সত্তা ছাপিয়ে অনুবাদক সত্তা বড় হয়ে উঠেছে । কিছু কিছু জায়গায় ভাষার প্রাঞ্জলতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে আমার মনে হয় । আমার প্রশ্ন, যদি এটি যুবায়ের মাহবুবের নিজস্ব লেখা হত, তবে বাক্যের গাঁথুনি কি এমনই হোত ? এই প্রশ্নটি আমি নিজেকেও রাখছি, যেহেতু আমিও অনুবাদ কর্ম করে থাকি ।

  3. muhammad samad says:

    Nice expression and beautiful translation.

    Muhammad Samad

  4. Daud Saif says:

    সাইটটিতে সময় কাটানোর মত অনেক কিছু পেলাম। বাংলাতে এরকম একটি সাইট সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.