প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব

পথপ্রদর্শিকা রোকেয়া

নন্দিতা বসু | 6 Nov , 2016  

Rokeyaভাবতে অবাক লাগে যে বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২) আজ থেকে ১১৬ বছর আগে জন্মে কীভাবে এত কাজ করে গেলেন? পরাধীন ভারতবর্ষে বিশেষ করে মুসলমান সমাজে অবরোধ প্রথার জন্য মেয়েদের পক্ষে শিক্ষালাভ করা যখন প্রায় নিষিদ্ধ ছিল সেই অবরোধপ্রথা যে কী ভয়াবহ ছিল তা তাঁর মতিচূরঅবরোধবাসিনী’তে জানিয়েছেন, সব ঘটনাই তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। অবরোধবাসিনী সকলেরই পড়া। তার এক একটি ঘটনা মনে করল গায়ে কাঁটা দেয়। আনুমানিক ১৯০৫ নাগাদ বেগম রোকেয়ার একজন মামীশাশুড়ি ভাগলপুর থেকে পাটনা যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁর একজন পরিচারিকা। কিউল জংশনে গাড়ি বদল করতে হবে। ট্রেনে ওঠার সময় মহিলাটি বোরখায় পা জড়িয়ে ট্রেন ও প্লাটফরমের মাঝখানে পড়ে যান। স্টেশনে অন্য স্ত্রীলোক বলতে শুধু ঐ পরিচারিকা, কুলিরা মহিলাকে ধরে তুলবার জন্য এগিয়ে এলে পরিচারিকাটি সরবে সাবধান করে দেয় তাদের: “খবরদার। কেউ বিবিসায়েবাকে ধরবে না”, সে একা অনেক চেষ্টা করেও মহিলাকে তুলতে পারল না। আধঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ট্রেন ছেড়ে দিল। চলন্ত ট্রেন মহিলাটির দেহকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। কাউকে কোনো সাহয্য করবার অনুমতি দেওয়া হলো না। মহিলাটির দেহ ষ্টেশনের একটা গুদামে এনে রাখা হলো। পরিচারিকাটি বিনিয়ে কাঁদছিল, আর মহিলাকে বাতাস করছিল। ১১ ঘন্টা পর মহিলাটি মারা যান। কী মর্মান্তিক ঘটনা। পর্দানশীলতা মরে গেলও লঙ্ঘন করা চলবে না।

অবরোধবাসিনী’তে আর একটি ঘটনা আছে: কোনো বড়লোকের বাড়িতে নিমন্ত্রিতা মহিলারা আসছেন। অন্তঃপুরের দরজায় পাল্কী এসে থামছে, দাসীরা এসে আরোহিনীকে নামিয়ে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। খাবার সময় দেখা গেল হাশমত বেগম তাঁর ছ’মাসের শিশুপুত্র নিয়ে অনুপস্থিত। কেউ বলল, ছোট বাচ্চা নিয়ে বোঘহয় আসতে পারেন নি। কেউ বলল তাকে আসবার জন্য তোড়জোড় করতে দেখা গেছে। পরদিন নিমন্ত্রিত মহিলারা এক এক করে ফির যাচ্ছিলেন। খালি পাল্কি এসে অন্তঃপুরের দরজায় এসে দাঁড়াচ্ছিল, মহিলারা তাতে উঠে বসছিলেন, একটি পাল্কি এসে দাঁড়ালে দেখা গেল তার মধ্যে হাশমত কোন শিশুপুত্র নিয়ে বসে আছেন, আগেরদিন অন্তঃপুরের দরজায় যখন পাল্কী থেমেছিল, হামশত বেগম তখন নামতে পারেননি। বেহারারা ভেবেছে তিনি নেমে গেছেন, তাই পাল্কী ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি নিজে ত টুঁ শব্দটি করেননি, পাছে বাচ্চার কান্না শুনে কেউ পাল্কী খুলে দেখে সেজন্য বাচ্চাকেও কাঁদতে দেননি। পৌষমাসের শীতের মধ্যে সারা রাত খোলা জায়গায় পাল্কীর ভেতরে থেকে তিনি পর্দা পালন করলেন।
বেগম রোকেয়া মেয়েদের এই অবরোধশৃঙ্খলে আবদ্ধ অবস্থার দাসত্ব থেকে বার করে আনতে চাইছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল মেয়েরা যদি শিক্ষিত হতে পারে তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন আনতে পারবে।
Rokeya-2বেগম রোকেয়া মাত্র ৫২ বছর বেঁচেছিলেন কিন্তু তার মধ্যেই কত কাজ তিনি করে গেছেন, পড়াশোনা করবার সুযোগ তাঁর বড়ভাই ইব্রাহিম সাবের করে দিয়েছিলেন। সুযোগ করে দেওয়া মানে গভীর রাতে বাড়ির অন্যরা ঘুমিয়ে পড়লে সকলের অগোচরে রোকেয়াকে তাঁর দাদা পড়াতেন। সেকালে মুসলমান পরিবার স্কুলে গিয়ে মেয়েদের পড়াশোনার প্রশ্নই উঠত না। রোকেয়ার ষোল বছর বয়সে ৪০ বৎসর বয়স্ক বিপত্মীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ের সম্মন্ধ বড়দাদা ইব্রাহিম সাবেরই করেছিলেন এইজন্য যে সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরী ছিলেন উচ্চশিক্ষিত সরকারী কর্মচারী (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট) যিনি খুব বিদ্যানুরাগীও। রোকেয়ার স্বামী রোকেয়াকে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা শেখায় সাহায্য করেন, সাহিত্য চর্চায়ও। স্বামীর সহযোগিতায় রোকেয়া মাদ্রাজের কমলা মাতমিয়া নাথাস ও সারাজিনী নাইডু সম্পাদিত Indian Ladies Magazine-এ sultana’s Dream কল্পকাহিনীটি প্রকাশ করেন। sultana’s Dream প্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯০৮-এ। ১৯০৯-এ সাখাওয়াত হোসেন মারা যান। তার কিছুদিনের মধ্যে পারিবারিক সমস্যার কারণে রোকেয়াকে ভাগলপুর ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে হয়। স্বামীর মৃত্যুর পরপরই (সাখাওয়াত হোসেন মারা যান ১৯০৯ সালের ৩রা মে) ১৯০৯ এর ১লা অক্টোবর স্বামীর বন্ধু ভাগলপুরের সে সময়কার ডেপুটি ম্যাজিস্টেট সৈয়দ শাহ আবদুল মালেকের সরকারী বাসভবনে (বাড়ির নাম গোলকুটি) ৫টি ছাত্রী নিয়ে সাখাওয়াত মেমোরিয়েল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা, তার মধ্যে চারজন ছিল মালেক সাহেবের মেয়ে। মিতব্যয়ী সাখাওয়াত হোসেন মারা যাবার আগে রোকেয়ার হাতে দশ হাজার টাকা দিয়ে যান মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য।
১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর ভাগলপুর ছেড়ে রোকেয়া কলকাতায় চলে আসেন মালেক সাহেবের ছোট ভাই সৈয়দ আব্দুস সালেকের বাড়িতে। ১৯১১-র ১৬ই মার্চ ১৩নং ওয়ালিউল্লাহ লেনে বাড়ি ভাড়া করে আটজন ছাত্রী নিয়ে কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়েল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক অসুবিধার মধ্যে, স্কুলের বাড়ি অনেকবার পরিবর্তন করেও রোকেয়া স্কুলটি চালিয়ে নিয়ে যান। এর মধ্যে অনেক পারিবারিক বিপর্যয়ও ঘটে গেছে। ১৯১২তে মা চলে গেলেন, ১৯১৩ তে বাবা। রোকেয়া কিন্তু তাঁর কাজ একদিনের জন্য-ও থামাননি। স্কুলের জন্য এত বাধা তিনি পেয়েছিলেন, সমাজের সঙ্গে আপোষ-ও করতে হয়েছিল। ছাত্রীরা পর্দা মেনে চলবে এই প্রতিশ্রুতি তাকে দিতে হয়। প্রখর বাস্তব জ্ঞান ছিল রোকেয়ার। স্কুল উঠিয়ে দেওয়ার চেয়ে পর্দাপ্রথাটা মানা দূরদৃষ্টির পরিচয়। পর্দা মেনেও যদি শিক্ষা পাওয়া যায়।
মাত্র ১৩ বছরের বিবাহিত জীবন রোকেয়ার। কলকাতার কর্মজীবনের দৈর্ঘ্য মাত্র ২২ বছর। এর মধ্যে এত সহস্র বাধা ঠেলে স্কুল চালিয়ে আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ চালিয়ে, পত্রপত্রিকায় রাশি রাশি প্রবন্ধ, কবিতা লিখলেন, উপন্যাস লিখলেন কী করে? সভাসমিতিতে বক্তৃতাই কি কম দিয়েছেন? ১৯৩২-এর ৯ ডিসেম্বর চলে গেলেন রোকেয়া, জন্মদিন আর মৃত্যুদিন একই তাঁর। মৃত্যুর আগের দিন রাত্রে বসে লিখছিলেন ‘নারীর অধিকার’ প্রবন্ধটি। অসমাপ্ত রয়ে গেলে সেই লেখা।
বেগম রোকেয়ার কথা যত ভাবি ততই বিস্মিত হতে হয়। শুধু মুসলমান সমাজে কেন, সমস্ত ভারতবর্ষেই [অখন্ডিত দেশ তখন] এরকম কর্মযোগিনী আর কেউ ছিলেন না। একক প্রচেষ্টায় এতগুলো কাজ করে যাবার দৃষ্টান্ত, তা-ও এত অল্পদিনের মধ্যে আর নেই।
সমাজের নানা ব্যাধি নিয়ে আলোচনা করেছেন রোকেয়া, তার সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছেন। আজ এত বছর পরে যদি কোনো বিষয়ে তাঁর সঙ্গে ভিন্ন মত পোষন করি তবে কি বেগম রোকেয়ার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করা হবে? মনে হয় তা নয়। অন্তত বেগম রোকেয়া তা ভাবতেন না। তিনি তো চাইতেনই মেয়েরা যাতে সাবালক হয়। আলাদা মত-এর মধ্যে যদি যুক্তি থাকে তাহলে কেন তা গ্রাহ্য হবে না?
border=0রোকেয়ার ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’ প্রবন্ধটি যতদূর সম্ভব জানি ১৩১০-এর মহিলা পত্রিকার বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ আষাড় সংখ্যায় [সম্পাদক গিরিশ চন্দ্র সেন] প্রকাশিত হয়, তখন প্রবন্ধটির নামছিল ‘অলংকার না Badge of Slavery’। ১৩১১ তে নবনূর পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ নামে প্রকাশিত হয়। মতিচূর গ্রন্থে প্রবন্ধটি ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ নামে রয়েছে। মহিলা পত্রিকায় প্রবন্ধটির প্রকাশ বেশ বড় একটি বিতর্কের সৃষ্টি করে। দু’জন মহিলা প্রবন্ধটির প্রতিবাদও করেন, সম্পাদক গিরিশচন্দ্র সেন সম্যাটি নানা দিক থেকে আলোচনা করে একটি সম্পাদকীয়ও লেখেন। বেগম রোকেয়ার বক্তব্য স্বামীরা যে স্ত্রীদের রাশি রাশি গয়না পরিয়ে রাখেন সেটা প্রভু হিসেবে তাদের ক্ষমতার দৌড় দেখাবার জন্য। একটি উদাহরণ দিয়ে রোকেয়া দেখিয়েছেন ভাগলপুরের কোনো দুলহন বেগমের গায়ে ৫২০ ভরির অলংকার। হতে পারে, কিন্তু আমাদের প্রশ্ন এত রাশি রাশি অলংকার যে সব মহিলারা পরেন তাঁরা সংখ্যায় কতজন? ভারতবর্ষের সমস্ত জনসংখ্যার তুলনায় ১০ হাজারের মধ্যে একজনও হবেন কী? যদি তাদের সংখ্যা এতোই কম হয় তাহলে তাদের জন্য এত সরব হবার প্রয়োজন কতটুকু? অবশ্য মহিলা-র সম্পাদক গিরিশচন্দ্র সেন তাঁর সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন যে মিসেস আর এস হোসেন ২৪ বৎসর বয়সী ভাগলপুরবাসিনী একজন গৃহবধু।
বেগম রোকেয়া তাঁর প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মেয়েদের উন্নতির চেষ্টা করে গেছেন, তাঁর জন্মের ১৩৬ বছর পরও বাঙালীসমাজে বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমে যায় নি। সেজন্যই তাঁর লেখা, তাঁর স্কুল প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আজো আমাদের এতখানি উদ্দীপিত করে তোলে। এই মহীয়সী নারীকে যেন আমরা কিছুতেই ভুলে না যাই।

Flag Counter


2 Responses

  1. জুনান নাশিত says:

    ভালো লেগেছে। তবে লেখাটার আরেকটু বিস্তার দরকার ছিল মনে হয়। তবু লেখককে ধন্যবাদ। বেগম রোকেয়াকে নিয়ে আরো বেশি লেখা প্রয়োজন।

  2. গীতা দাস says:

    লেখাটিতে আরও বিশ্লেষণ আশা করেছিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.