প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য, সংস্কৃতি, সাহিত্য সংবাদ

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: বিদায় রাবাসা, অজানা কাফকা ও শিল্পকর্মের উল্টোপিঠ

বিপাশা চক্রবর্তী | 22 Jun , 2016  

বিদায় রাবাসা

rabasa.jpg
বিদায় নিলেন গ্রেগরি রাবাসা। গত ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রানফোর্ড, কানেকটিকাট-এ ৯৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এই কিংবদন্তীতুল্য অনুবাদক। “ইংরেজী ভাষায় ল্যাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ লেখক”-এই বলে যাকে একদিন ঘোষণা করেছিলেন গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেস। আর করবেনই না বা কেন? সারা পৃথিবী জুড়ে মার্কেসের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আর পরিচিতির অনেকটা ভাগীদার গ্রেগরি রাবাসা। তিনিই প্রথম মার্কেসের জাদুবাস্তবতার অনন্য আখ্যান নিঃসঙ্গতার একশ বছরকে ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করে সারা পৃথিবীর জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ১৯৬৭ সালে প্রথম প্রকাশের তিনবছর পর ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হয় আর সঙ্গে সঙ্গেই প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পায়, যা পায়নি স্প্যানিশ ভাষায় প্রথম প্রকাশের পর। অনুবাদকে রাবাসা এমন এক উন্নত পর্যায় নিয়ে যান যার ফলে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর অনুবাদ গ্রন্থটি প্রসঙ্গে মার্কেস প্রায়ই প্রশংসা করে বলতেন, “এই অনুবাদের নিজস্ব শৈল্পিক সত্ত্বা আছে, ও নিজেই একটি শিল্প ”। গ্রন্থটি আজ বিংশ শতকের সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম একটি কীর্তিস্বম্ভ হিসেবে বিবেচিত।

রাবাসার জন্ম নিউইয়র্ক শহরে ১৯২২ সালে। পিতা ছিলেন আমেরিকায় অভিবাসী কিউবান ব্যবসায়ী। রাবাসার ছিল ২য় বিশ্বযুদ্ধে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা, প্রথম জীবনে কাজ করেছেন সাংকেতিক লিপিকর হিসেবেও। ডার্টমাউথ থেকে ব্যাচলর ডিগ্রী নেয়ার পর ডক্টরেট করেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জানতেন স্প্যানিশ, ইংরেজী,পুর্তগিজ এই তিনটি ভাষা। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির কুইন্স কলেজে, ছিলেন অনুষদ সদস্য। ৬০-এর দশকে ল্যাতিন আমেরিকায় ঘটে যাওয়া সাহিত্যিক বিস্ফোরন (বুম)’কে পৃথিবীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অনেকটা ‘অপরিহার্য প্রবেশপথ’ হিসেবে কাজ করেছেন এই প্রতিথযশা অনুবাদক। তিনি মার্কেজের নিঃসঙ্গতার একশ বছরসহ মোট ছয়টি বই অনুবাদ করেন। তবে মার্কেসকে অনুবাদ শুরু করার আগেই তিনি আর্হেন্তিনিও লেখক হুলিও কোর্তাসারের(১৯১৩-৮৩) বিখ্যাত উপন্যাস হপস্কচ অনুবাদ করেছিলেন। প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। এই অনুবাদের জন্য রাবাসাকে ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া রাবাসার অনুবাদে মারিও বার্গাস যোসা’র কনভার্সসেশন ইন দ্য ক্যাথেড্রেল এবং জর্জ আমাদো’র ক্যাপ্টেন্স অব দ্য স্যান্ড সারা বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। অন্যান্য ল্যাতিন আমেরিকান লেখকদের বইও অনুবাদ করেছেন তিনি। এভাবে ল্যাতিন আমেরিকার সাহিত্যজগত তার হাত ধরেই মূলত কোটি কোটি ইংরেজ ভাষাভাষী পাঠকদের নিকট পরিচিতি ও গ্রহনযোগ্যতা পায়। হিস্পানিক সাহিত্যক্ষেত্রে অপরিসীম অবদানের জন্য তিনি ২০০১ সালে ‘পেন আমেরিকান সেন্টার’ আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৫ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী If This Be Treason-এ তিনি বর্ণনা করে গেছেন অনুবাদক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা, ভাললাগা, ভালবাসা, সমালোচনা, অর্জন আর ত্যাগের গল্প। ভাষার প্রতি গ্রেগরি রাবাসার ছিল আজীবনের মোহ। তাঁর মৃত্যুতে ‘ডন কিহোতো’ খ্যাত আরেক বিখ্যাত অনুবাদক এডিথ গ্রসম্যানের শোকাহত উচ্চারণ “তিনি ছিলেন আমাদের সকলের গডফাদার। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ল্যাতিন আমেরিকান সাহিত্যকে গুরুত্বের সাথে ইংরেজী ভাষাভাষীদের বিশ্বে তুলে ধরেছেন”। একটি ভাল অনুবাদ যে পুনরায় সৃষ্ট সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করতে পারে তা দেখিয়ে গেছেন গ্রেগরি রাবাসা।

জানা-অজানা কাফকা

kafka.jpgবিংশ শতাব্দীর ‘দান্তে’ হিসেবে পরিচিত ফ্রানৎস কাফকাকে পাঠকদের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। টিউবারকুলোসিস নামক ব্যাধিতে ভুগে ১৯২৪ সালের ৩ জুন মারা যান এই অসাধারণ সাহিত্যিক প্রতিভাসম্পন্ন মানুষটি। বলা হয়ে থাকে, স্বরযন্ত্রের এই যক্ষার কারণে তাঁকে উপোস করে থাকতে হতো। গলার অবস্থা এতই নাজুক ছিল যে কোন কিছু খাওয়া খুবই যন্ত্রনাদায়ক ছিল তাঁর জন্য। একপ্রকার অনাহারেই মারা যান কাফকা। ইহুদি পরিবারে জন্ম নেয়া কাফকা ছিলেন ছয় ভাই-বোনের মাঝে সবার বড়। ছোট দুইভাই মারা যায় শিশুকালেই । কাফকার মৃত্যুর অনেক পরে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধচলাকালীন বন্দিশিবিরে মারা যায় বাকী তিন বোন। মানুষের অসহায়ত্ব আর অর্থহীনতার অনুভূতির প্রকাশ ঘটে কাফকা রচিত দ্য ট্রায়াল, দ্য ক্যাসেল, দ্য মেটামরফোসিস ইত্যাদি গ্রন্থের মাধ্যমে। সাহিত্যিক দক্ষতার সাথে অদ্ভুতভাবে অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন।

চলুন প্রিয় পাঠক,বিরানব্বইতম মৃত্যুবার্ষিকীতে সাহিত্যের জিনিয়াস এই মানুষটির জীবন সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা বা কম জানা তথ্য জেনে নেই আবার।
১। কাফকা ১০০ পাতার একটি চিঠি লিখেছিলেন তাঁর বাবাকে। কাফকার বাবার চরিত্রের কর্তৃত্বপরায়ন মনোস্তত্ত্ব, স্বৈরচারী মনোভাব আর সহজে সন্তুষ্ট না হবার ব্যাপারটির ব্যাখা ছিল চিঠিতে। চিঠিটি ‘লেটার টু হিজ ফাদার’ নামে বিখ্যাত।
২। কাফকার লেখনীতে তাঁর বাবার আধিপত্য বিস্তারকারী অবয়বটির যথেষ্ট উপস্থিতি রয়েছে।
৩। বাবার সাথে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কাফকা ৩১ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর বাবা-মায়ের সাথে বসবাস করেছেন।
৪। ইতালিয়ান ইনস্যুরেন্স কোম্পানীর চাকরিটি ছেড়ে দিয়েছিলেন কারণ কর্মঘন্টা তাঁকে যথেষ্ট সময় দিত না সাহিত্যর প্রতি মনোযোগী হবার।
৫। ‘দ্য জাজমেন্ট’ গল্পটি এক রাতের মধ্যে লিখে শেষ করেছিলেন।
৬। লেখা ছিল তাঁর কাছে এতটাই পবিত্র অনেকটা উপাসনা করার মতো।
৭। কবি ডব্লিউ এইচ অডেন তাঁকে “বিশ শতকের দান্তে” বলে অভিহিত করেন। গাব্রিয়েল গর্সিয়া মার্কেস কাফকার লেখা সম্পর্কে বলেন যে, “সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে যে লেখা যায় তা সম্ভব করেছিলেন।”
৮। এই লেখক কোনদিনও বিয়ে করেননি। দুজন রমনীর সাথে ভিন্ন ভিন্ন সময় তিন তিনবার বাগদান করেছিলেন। কিন্তু বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি।
৯। ১৯৮৮ সালে একবার কাফকার স্বহস্তে লেখা দ্য ট্রায়াল-এর পান্ডুলিপিটি বিক্রির জন্য দাম উঠেছিল ১.৯৮ মিলিয়ন ডলার।
১০। বিশ্বাস করা হয় যে, কাফকা প্রায়ই আত্মহত্যা করতে চাইতেন। ১৯১২ সালে নাকি সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন।

শিল্পকর্মের উল্টোপিঠের প্রদর্শনী

artist-vic.jpg
ছবি: ভার্সো প্রদর্শনীতে শিল্পী ভিক মিউনেজ
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি,ভ্যান গগ, মাতিস কিংবা পিকাসোর মতো পৃথিবী বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম বারবার শিল্পপিপাসু মানুষদের টানে। যুগ যুগ ধরে তাঁদের আঁকা চিত্রগুলোর দিকে মানুষ অবাক দৃষ্টি ফেলেছে, মোহাচ্ছন্ন হয়ে থেকেছে। কিন্তু একজন শিল্পবোদ্ধা হিসেবে কখনো ভেবে দেখেছেন, ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ কিংবা অন্য কোন বিখ্যাত চিত্রকর্মের পেছন দিকটা কেমন? ভেবেছিলেন ব্রাজিলিয়ান শিল্পী ও আলোকচিত্রী ভিক মিউনেজ। তিনি করলেন কি, পৃথিবীর তাবৎ তাবৎ সব জাদুঘর আর সংগ্রহশালা ঘুরে বিখ্যাত সব চিত্রকর্মগুলোর পেছন দিকের হাই-রেজুলেউশন ছবি তোলার অনুমতি সংগ্রহ করলেন এবং ছবি তুললেন। এরপর মিউনেজ আর তাঁর দল নেমে পড়লেন কাজে।
border=0
ছবি: ভুবনজয়ী হাসি দেয়া মোনলিসার উল্টোপিঠ
তারা এক্কেবারে আসল চিত্রকর্মের হুবহু রেপ্লিকা বানালেন। তবে পেছন দিককার। সেসব নিয়েই নেদারল্যান্ডের হেগ শহরের মারিতসাস জাদুঘরে চলছে এই অভিনব প্রদর্শনী। অবশ্য মিউনিজের মাথায় এমন ভাবনা আসার অনেকদিন পরেই প্রদর্শনীর মাধ্যমে এর একটি সফল পরিণতি তিনি দিতে সক্ষম হয়েছেন। ব্যাপারটি নিয়ে আরো কাজ করার ইচ্ছে আছে এই শিল্পীর ।
world.jpg
ছবি: জোহানেস ভারমিয়ার’এর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ;গার্ল উইথ পার্ল ইয়ারিং’ (১৬৬৫) পেছন দিকের রেপ্লিকা।
এর মাধ্যমে এই বিশেষ চিত্রকর্ম আর শিল্পীকে নিয়ে অনেক স্মৃতি , অনেক না জানা তথ্য নিয়ে আরো বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়। যেমন মোনালিসার ফ্রেমের এক জায়গায় লেখা আছে ‘দিস ওয়ে আপ’ কথাটি। আবার মাতিসের ‘রেড স্টুডিও’ চিত্রকর্মটির পেছন দিকটা ছেয়ে ছিল মুরগীর খাঁচা বানানোর পাতলা তার দিয়ে। প্রদর্শনীর নাম দেয়া হয়েছে ‘ভারসো’ পুর্তগিজ এই শব্দের ইংরেজী মানে হলো ‘দ্য ব্যাক’। প্রদর্শনীটি চলবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউ ইয়র্কার, দ্য গার্ডিয়ান, ইন্ডিয়া টাইমস

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত বিপাশা চক্রবর্তীর আরও লেখা:
জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গম: অর্ধনারীশ্বর অথবা তৃতীয় প্রকৃতি

মানব তুমি মহীরুহ তুমি

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: আইনস্টাইন, শেক্সপিয়র, আঁদ্রে গ্লুক্সমাঁ, ফের্নান্দো ও বিয়োরো

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: স্রোতের বিরুদ্ধে স্নোডেন, অরুন্ধতী, কুসাক

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: ভিক্টর হুগো ও টেনেসি উইলিয়াম

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: আরবমুখী ফরাসী লেখক ও মার্গারেটের গ্রাফিক-উপন্যাস

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: গত বছরের সেরা বইগুলো

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: নতুন বছরে নারীরাই রবে শীর্ষে

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: নতুন এলিয়ট, ব্যাংকসির প্রতিবাদ ও তাতিয়ানার রসনা

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য:চিরকালের শত শ্রেষ্ঠ

নারী দীপাবলী: তুমি হবে সে সবের জ্যোতি

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য:চিরকালের শত শ্রেষ্ঠ ননফিকশন

গ্রন্থাগারের জন্য ভালোবাসা

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: যাদুবাস্তবতার শাহেনশাহ মার্কেসের মানসিক গ্রন্থাগার

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য:ভাষারাজ্যের তীর্থযাত্রী ঝুম্পা লাহিড়ী ও টেন্টাকলের মার্গারেট এটউড

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: প্রত্যাখ্যাত রাউলিং ও পুনর্বাসনে লুইয এলিজাবেত ভিযে ল্য ব্রাঁ

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: রোবট লিখবে হাইব্রিড উপন্যাস?

সাম্প্রতিক শিল্পসাহিত্য: পানামা পেপার্স-এ চিত্রকলাও

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: বিজ্ঞানসচেতন শেক্সপিয়র

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: দ্য জাঙ্গল বুক-এর চোখধাঁধানো নতুন অলংকরণ

জাহা হাদিদ: আপোষহীন প্রতিভার অনন্য স্থাপত্য

সুর বাগিচার বুলবুলি, গান সায়রের মতি

আদিম লতাগুল্মময় শেকসপিয়রের নগ্ন প্রদর্শনী

ভিতরে বাইরে ছন্দোময় কবি মোহাম্মদ আলী

Flag Counter


1 Response

  1. saifullah mahmud dulal says:

    শিল্পকর্মের উল্টোপিঠের অভিনবত্ব প্রদর্শনী ‘ভারসো’ অর্থাৎ ‘দ্য ব্যাক’পড়ে খুব মজা পেলাম। নেদারল্যান্ডে যেতে ইচ্ছে করছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.