অনুবাদ, প্রবন্ধ, বিশ্বসাহিত্য

উপেক্ষিত কাভাফির অর্জুন ও আমরা

রাজু আলাউদ্দিন | 21 Jun , 2016  

cavafy2.jpgসি. পি. কাভাফির কবিতার সঙ্গে আমার লিপ্ততা দিয়েই লেখাটা শুরু করছি বলে মার্জনা করবেন, তবে এই উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলেই ব্যক্তিগত অবতারণা। সি. পি কাভাফির কবিতা শীর্ষক একটা অনুবাদ গ্রন্থ বেরিয়েছিল ১৯৯২ সালে, তার মানে গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো অনূদিত হয়েছিলো আরও অন্তত দুএক বছর আগে। তখনও পর্যন্ত কাভাফির কোন কবিতার তর্জমা-গ্রন্থ বাংলাভাষায় প্রকাশিত হয়নি। গ্রীক চিরায়ত সাহিত্যের প্রতি আমাদের প্রধান লেখক-অনুবাদকরা মনোযোগী হলেও, আধুনিক গ্রীক সাহিত্যের প্রতি তারা খুব বেশি উৎসাহী ছিলেন বলে কোনো নজির পাওয়া যায় না। অথচ আধুনিক যুগের দুজন গ্রীক কবি, জর্জ সেফেরিস ও ওডেসিয়ুস এলিটিস নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়া সত্ত্বেও এই ভাষার কবিতা সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল খুব একটা দানা বাঁধেনি। সত্য বটে জর্জ সেফেরিসের নির্বাচিত কবিতা শিরোনামে প্রয়াত শিশির কুমার দাশের একটি অনুবাদ গ্রন্থ বেরিয়েছিল নব্বুইয়ের দশকের প্রথম দিকে বোধহয়। কিন্তু এলিটিসের বাংলা তর্জমা বোধ হয় এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। হয়েছে কি? সেফেরিস এবং এলিটিসেরও পূর্বসূরী কাভাফি, যিনি মৌলিকতায় ও কাব্যিক গুরুত্বে আরও বেশি শীর্ষ পর্যায়ের, তার কবিতার ব্যাপারে আমাদের দীর্ঘ নিরবতাকে আমার কাছে খানিকটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল তখন। ঐ নিরবতার পুকুরে আমার বইটি ছিল একটি বুদবুদ মাত্র। আমি ধরে নিয়েছিলাম পরে কেউ যোগ্য হাতে কাভাফির কবিতা অনুবাদ করবেন, করেছেনও দেখলাম। ১৯৯৭ সালে পুস্কর দাশগুপ্ত মূল থেকে অনুবাদ করেছেন। কিন্তু তিনি অনুবাদ করার পরেও কেন আমি আবার কাভাফির ‘চিরন্তন’ (নিচে দেখুন) কবিতাটি অনুবাদ করছি? প্রথম কথা হলো, এই কবিতাটি তিনি অনুবাদ করেননি। কেন করেননি জানি না। এর কোনো হদিস কি আগে জানা ছিল না? মনে হয় জানা ছিল না কারোরই। এই কবিতাটি, কাভাফির ইংরেজিতে যেসব অনুবাদ গ্রন্থ সহজলভ্য–জন মাভরোগর্দাতো, এডমান্ড কিলি, ফিলিপ শেরার্ড বা রায়ে ডালভেনের অনুবাদে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কবিতাটির হদিস পাওয়া গেল ২০১২ সালে প্রকাশিত ড্যানিয়েল ম্যান্ডেলসন-এর Complete poems by C. P. Cavafy নামক গ্রন্থে।

চিরন্তন

সি পি কাভাফি

সদাশয় কোমলহৃদয় ভারতীয় রাজা অর্জুন
নরহত্যা ঘৃণা করতেন। যুদ্ধে তিনি যাননি কখনো।
কিন্তু ভয়ংকর যুদ্ধদেবতা তাতে বিরক্ত ভীষন
(যেহেতু গৌরব তার লুপ্ত হতে থাকে, মন্দিরগুলো তার শূণ্য হয়ে গেছে)
সীমাহীন ক্রোধ নিয়ে অর্জুনের প্রাসাদে গেলেন।
ভয় পেয়ে রাজা বললেন, “মহান দেবতা,
মার্জনা করবেন যদি আমি অপারগ নরহত্যায়।”
ঘৃণাভরে উত্তরে দেবতা বলেন, “তুমি কি নিজেকে ভাব
আমার চেয়েও বেশি ন্যায়পরায়ন? দোহাই, হয়ো না প্রতারিত।
এ অবধি কোনো প্রাণ হয়নি হরণ। জেনে রাখ তবে
জন্মে না যারা, তারা মরে না কখনো। ”

এবার এই কবিতাটি সম্পর্কে আমার অনুভূতির কথাটা বলি। কাভাফির কবিতার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা জানেন তিনি কবিতায় উপজীব্য করেছেন মূলত গ্রীক পুরাণ, ইতিহাস, সমকাম ইত্যাদি বিষয়। কখনো কখনো মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা ব্যক্তিত্ব। কিন্তু সরাসরি ভারতীয় পুরাণ বা ইতিহাসের চরিত্র কখনো দেখা যায়নি তার কবিতায়। কখনো কখনো দুএকটি কবিতায় ভারতীয় পুরাণের কোনো কোনো চরিত্র বা ঘটনা উপমা বা উৎপ্রেক্ষা হিসেবে এসেছে বটে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কোনো কবিতা বোধ হয় এই ‘চিরন্তন’ই।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো কাভাফি বিষয়ের দিক থেকে মূল প্রবণতার বাইরে গেলেও তার যে আলংকারিক বৈশিষ্ট্য, আমাদের অলংকারশাস্ত্র যাকে ব্যাজস্তুতি (Irony) বলে অভিহিত করে, তা এই প্রবণ-ছুট কবিতাতেও অটুট আছে পুরো মাত্রায়। অর্জুনকে নরহত্যায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য যে যুক্তি যুদ্ধের দেবতা দেখাচ্ছেন তা আমাদেরকে হকচকিয়ে দেয় না কি?
“দোহাই হওনা প্রতারিত।
এ অবধি কোন প্রাণ হয়নি হরণ।
জন্মে না যারা, তারা মরে না কখনো।”
কিন্তু কাভাফি এই যুক্তিকে তার নিজস্ব ব্যাজস্তুতির স্মারকচিহ্নে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে কবিতাটি পুরোপুরি পুরাণের প্রাচীন খোলস থেকে আধুনিকতার কাল-সরনিতে এসে হাজির হয় কৌতুককর মেজাজসহ।

বাংলা ভাষায় কাভাফির উপস্থিতির ক্ষীণতা লক্ষ্য করার ফলে আমার কাছে যে-প্রশ্নগুলো ঘুরঘুর করতে থাকে তার একটা হলো এই যে কাভাফির কবিতা কি এমনই যে তা মৌলিকতা ও অনন্যতা সত্ত্বেও আমাদের মনোজগতের স্ফূর্তিকে জাগিয়ে তোলে না, কারণ তা আমাদের কাব্যরুচির কোনো অভিমুখকেই উদ্দীপ্ত করে না বলে? নাকি তার প্রবণতাকেই আমরা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করিনি বলে উদ্দীপক সব গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও অপরিচয়ের অন্ধকূপের বাসিন্দা হয়ে পড়ে আছেন তিনি? জানি, এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণাসাপেক্ষ। কিন্তু এতো সত্যি যে পৃথিবীর বহু ভাষার প্রতিভাবান লেখককে যিনি তার কাব্যপ্রতিভায় মুগ্ধ করেছেন তিনি কেন আমাদের প্রধান লেখকদের স্পর্শ করতে পারেননি? বুদ্ধদেব বসু, যিনি আধুনিকতার মানচিত্রকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আঁকার চেষ্টা করলেন, সেখানে কাভাফি তো দূরের কথা, আধুনিক গ্রীক কবিতার কোনো নিঃশ্বাসই তাতে শুনতে পাই না:
“এ-কথাও স্মর্তব্য যে বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে, যখন পর্যন্ত তিমিরলিপ্ত ইঙ্গ-দ্বীপতটে দুই মার্কিন ত্রাতা এসে পৌঁছননি, তখনই ইয়েটস ধীরে-ধীরে ইংরেজি ভাষায় আধুনিক কবিতা সম্ভব ক’রে তুলেছেন; আর প্রায় একই সময়ে এক কৃশতনু জর্মান ভাষার কবি প্যারিসে ব’সে রচনা করছেন ‘মাল্টে লাউরিড্জ ব্রিগগে’ নামক গদ্যগ্রন্থ, যার কোনো-কোনো অংশে বোদলেয়ারের স্তবগান ধ্বনিত হ’লো। আর তার পর থেকে পশ্চিমী কবিতায় এমন কিছু ঘটেনি, সত্যি যাতে এসে যায় এমন কিছু ঘটেনি,”(শার্ল বোদলেয়ার:তাঁর কবিতা, অনুবাদ: বুদ্ধদেব বসু, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রকাশকাল: জুন ১৯৮১, পৃ-২)
তাহলে কাভাফি কোনো ঘটনা নয়? কিংবা তারও আগে কস্টিস পালামাস, তিনিও কেউ নন? অথচ আমাদের তাকাবার সুযোগ ছিল আধুনিক পর্বের গ্রীক সাহিত্যের দিকে, কেন না রবীন্দ্রনাথের আশিতম জন্মদিন উপলক্ষ্যে Golden book of Tagore নামে যে বইটি বের হয়েছিল সেখানে কস্টিস পালামাস রবীন্দ্রনাথকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রাচ্যের প্রতি তার কৌতূহল ও সংযোগকে মূর্ত করে তুললেন। কিন্তু আমরা এই সংযোগের সূত্রটিকেও সাহিত্যিক কৌতূহলের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করিনি অবজ্ঞাবশত। কাভাফি এরও খানিকটা পরে তার প্রবল স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আবির্ভূত হলেও আমাদের উপেক্ষার শিকার হয়ে থেকে গেছেন বহুদিন। অথচ প্রতীচ্যের প্রধান ধারার সংস্কৃতির প্রবল ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় পুরাণের প্রতি কৌতূহল ও একে তার কাব্যব্যক্তিত্বের বৈশিষ্টপূর্ণ ব্যবহার করে অপূর্ব ব্যঞ্জনায় মূর্ত করে তুললেও অামরা বিমুখ থেকেছি তার প্রতি।

আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিনের অন্যান্য প্রবন্ধ:
বোর্হেস সাহেব

অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

“একজন তৃতীয় সারির কবি”: রবীন্দ্রকবিতার বোর্হেসকৃত মূল্যায়ন

রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ

কার্লোস ফুয়েন্তেসের মৃত্যু:
সমাহিত দর্পন?

মান্নান সৈয়দ: আমি যার কাননের পাখি

বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আঁদ্রে মালরো

স্পানঞল জগতে রবীন্দ্র প্রসারে হোসে বাসকোনসেলোস

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ:
‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে আমার কয়েক টুকরো স্মৃতি

বনলতা সেনের ‘চোখ’-এ নজরুলের ‘আঁখি’

ন্যানো সাহিত্যতত্ত্ব: একটি ইশতেহার

যোগ্য সম্পাদনা ও প্রকাশনা সৌষ্ঠবে পূর্ণ বুদ্ধাবতার

দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে গানের কথাই বলি

অজ্ঞতার একাকীত্ব ও আমাদের মার্কেস-পাঠ

আবেল আলার্কন: স্পানঞল ভাষায় গীতাঞ্জলির প্রথম অনুবাদক

জামান ভাই, আমাদের ব্যস্ততা, উপেক্ষা ও কদরহীনতাকে ক্ষমা করবেন

এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘দর্পন’-এ বাংলাদেশ ও অন্যান্য

প্রথমার প্রতারণা ও অনুবাদকের জালিয়াতি

আবুল ফজলের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

আবু ইসহাকের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

কুদরত-উল ইসলামের ‘গন্ধলেবুর বাগানে’

মহীউদ্দীনের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

বোর্হেস নিয়ে মান্নান সৈয়দের একটি অপ্রকাশিত লেখা

অকথিত বোর্হেস: একটি তারার তিমির

ধর্মাশ্রয়ী কোপ

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্পর্কে অক্তাবিও পাস

লাতিন আমেরিকার সাথে বাংলার বন্ধন

Flag Counter


2 Responses

  1. saifullah mahmud dulal says:

    ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন চমৎকার! তবে কাভাফির কথা আর রাজুর আলোচনা দু’টোই পান্ডিত্যের দাড়িপাল্লায় সমান।
    ————-যেমনঃ
    “বাংলা ভাষায় কাভাফির উপস্থিতির ক্ষীণতা লক্ষ্য করার ফলে আমার কাছে যে-প্রশ্নগুলো ঘুরঘুর করতে থাকে তার একটা হলো এই যে কাভাফির কবিতা কি এমনই যে তা মৌলিকতা ও অনন্যতা সত্ত্বেও আমাদের মনোজগতের স্ফূর্তিকে জাগিয়ে তোলে না, কারণ তা আমাদের কাব্যরুচির কোনো অভিমুখকেই উদ্দীপ্ত করে না বলে?…জানি, এসব প্রশ্নের উত্তর গবেষণাসাপেক্ষ”।

  2. মায়া সাহা says:

    কাভাফি সম্পর্কিত প্রথম কোন লেখা পড়লাম! দূরদেশী এই কবির ভারতীয় পুরান বিষয়ক পান্ডিত্যময় এই কবিতা আর বলিষ্ঠ অনুবাদ ও ছোট্ট আলোচনা ভাল লাগল। আরো পড়তে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.