কবিতা

পূরবী বসুর কবিতা: বাড়িখালি

পূরবী বসু | 10 May , 2016  

বাড়িখালি-১

যশোরের বাড়িখালি।
তিরিশ জনের বাড়ি খালি।
কিন্তু ক্যান্‌?
শাহীন চেয়ারম্যান।
ঘর ছেড়ে সব বনে গেছে ভাই
বাড়িখালির তিরিশ বাড়ি খালি আছে তাই।

বাড়িখালি-২

(শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের “অবনী বাড়ি আছো” অবলম্বনে)

দুয়ার খুলে পালিয়ে গেছে তারা
তবু শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী, বাড়ি আছো?’

এখানে বৃষ্টি পড়ে বারোমাস
মেঘেরা এখানে দানবের মতো চরে
ভিটেসাপ, কোলাব্যাঙ আর বালিহাঁস
বাড়িখালির দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী, তুমি যেয়ো না।’

আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে জেগে থাকি আমি
বাড়ি খালি; তবু শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী, বাড়ি আছো?’

বাড়িখালি-৩

(শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের “অবনী বাড়ি আছো” ও শহীদ কাদরীর“অগ্রজের উত্তর” পড়ে)
“অবনী বাড়ি আছো?
অবনী বাড়ি আছে।?”
অবনী বাড়ি আছে।
মিলেছে উত্তর।

শহীদ কাদরী বাড়ি আছো?
“শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।” অগ্রজের উত্তর।
“জানি না কোথায় যায়, কী করে, কেমন করে দিনরাত কাটে।
…না, না তার কথা আর নয়।“

বাড়ি খালি করে যারা চলে গেছে,
এবার তাদের উদ্দেশে হাঁক ছাড়ি,
“তিরিশ বাড়ি খালি! তোমরা কোথায়?”
“মৃত্যু ছাড়া আর যেখানে গেলে কেউ ফেরে না,
আমরা সেখানে – সেই জায়গায়।“

সন্ধ্যা নামে; ধীরে ধীরে রাত্রি যুবতী হয়।
শেয়াল কিংবা তক্ষক ডাকে আশেপাশে;
ভূতুম প্যাঁচা ঝিমোয় ডালে বসে।
আবছা অন্ধকারে অনড় দাঁড়িয়ে থাকে বাড়িখালি।
শূণ্য ঘরের খোলা দরজায় বাতাস কড়া নাড়ে,
অস্পষ্ট এক গোঙানির শব্দ ভেসে আসে,
“একদা আমরা এখানে ছিলাম।“

Flag Counter


7 Responses

  1. ফরিদ আহমদ দুলাল says:

    ভালো মতই লাগলো। কিছু চমক আছে বটে তবে চমকিত হয়ে উঠতে পারিনি। গাঁথুনি এবং উপস্থাপনশৈলীতে সাবলীল ভাব মুগ্ধ করেছে। কবিকে অভিনন্দন।

  2. গীতা দাস says:

    এ কি সংখ্যালঘুদের বাড়িখালি!

  3. খুবই চমৎকার।

  4. ভজন সরকার says:

    কবি শক্তি চট্রোপাধ্যায়ের “অবনী বাড়ি আছো” কবিতাটি পূরবী বসু যে ভাবার্থে ব্যবহার করেছেন সেটা জানলে কবি শক্তি চট্রোপাধ্যায় পূনর্বার “হার্টফেল” করতেন। পূরবী বসু “অবনী বাড়ি আছো” কবিতাটির মূল ভাবার্থ বুঝতেই ব্যর্থ হয়েছেন ব’লে আমার ধারণা। যাহোক, শক্তির এ কবিতাটিতে বৃষ্টির এমন ব্যবহার বাংলা ভাষায় পূর্বে হয়েছে কিনা আমার জানা নেইঃ ” বৃষ্টি পড়ে এখানে বারো মাস/ এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে”। “মেঘ গাভীর মতো চরে”- কী দারুণ অর্থময় উপমা; বাংলা কবিতায় যা অনন্য ও অনবদ্য।

    যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নেমে আসা বর্বরোচিত অত্যাচার-নির্যাতন নিয়ে ব”লার মতো কেউ নেই, সেখানে পূরবী বসু সাহসের সাথে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছেন; ধন্যবাদ ও অভিনন্দন পূরবী বসুকে।

  5. পূরবী বসু says:

    ভজন সরকারকে আমি চিনি না। কিন্তু এই নিয়ে দু’বার আমার লেখা সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া থেকে এটুকু বুঝি, আমার ওপর কোন কারণে তাঁর ক্ষোভ আছে। ব্যক্তি পর্যায়ে তাতো থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা তাঁকে অধিকার দেয় না অন্যকে অপমান করার চেষ্টার ব্যাপারে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আমি বুঝেছি কি বুঝিনি সেটার বিচার করলেন তিনি আমার কবিতায় তার ব্যবহার দেখে। খুব মজা লাগছে আমার ব্যাপারটিতে। ভজন সরকার কি জানেন না, স্বাধীনতা নিয়ে প্রচুর লেখক, কবি যে পুরাণের, মহাকাব্যের, শেক্সপিয়ারের নাটকের, রবীন্দ্রনাথের লেখার নবরূপায়ণ করেন, যেখানে লেখক বিখ্যাত কোন মূল গল্প বা কবিতার কেবল খোসাটি নিয়ে নিজের মতো করে নতুন কিছু নির্মাণ করেন। কবি মধুসূদন দত্ত তো তাঁর কালেও করেছেন সেটা। সাম্প্রতিককালে ভারতে লক্ষ্মীপ্রসাদ “দ্রৌপদী” বলে যে উপন্যাস লিখে আকাদেমী পুরস্কার পান, এ উপন্যাসের দ্রৌপদী চরিত্র মোটেই মহাভারতের দ্রৌপদীর মতো নয়। এখানে দ্রৌপদী আরো অনেক কিছুর মধ্যে কর্ণের প্রেমে সম্পূর্ণ নিবেদিত। এ উপন্যাস পড়ে অনেক কট্টর মৌলবাদী হিন্দু বহু আন্দোলন করে নিরাশ হয়ে হার মেনেছেন। লক্ষীপ্রসাদের দ্রৌপদী কি মহাভারতের দ্রৌপদীর মতো ছিল? আদৌ? নাকি লক্ষ্মীপ্রসাদ মহাভারত বুঝতে পারেননি? আমি ভজন সরকারকে অনুরোধ করবো আমার প্রাচ্যে পুরাতন নারীর একটি অধ্যায় যেন দয়া করে পড়েন তিনি। “সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পৌরাণিক নারীর নবরূপায়ণ।” আমি মনে করি, অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় লেখাকে নতুন আঙ্গিকে নতুনভাবে, নতুন অর্থে ব্যবহার করার চেষ্টা একটি অভিনব পদক্ষেপ, একটি স্বীকৃত উদ্ভাবন। আমরা সাধুবাদ জানাই সে প্রচেষ্টার -সৃষ্টিশীলতার। কেউ তা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে (যেমন আমি হয়েছি), সেটা দুঃখের কথা। কিন্তু প্রচেষ্টাটিতে কোন লজ্জা বা দোষ নেই। আশা করি আমরা অন্যদের অযথা অসম্মান করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকবো। “অবনী ‘বাড়ি আছো”-একটি প্রকাশিত ও বিখ্যাত কবিতা। এই কবিতার কিছু লাইন বা সবটা কবিতাই আমি আরো অনেক অর্থে অনেকভাবে ব্যবহার করবো- করতে পারি। আমার এটা অধিকার।

  6. ভজন সরকার says:

    পূরবী বসু আমার খুব প্রিয় একজন লেখক। তাঁর ঝরঝরে গদ্য ও সাহসী উপস্থাপনা আমাকে মুগ্ধ করে। পূরবী বসুর প্রতিটি লেখাই আমি শুধু পড়ি বললে ভুল হবে-আমি গোগ্রাসে গিলে ফেলি। যে কথা সবাই মিনমিন করে বলি, পূরবী বসু তা বলেন অকপটে ও উচ্চকন্ঠে। অগাধ পান্ডিত্য ও নিরলস পরিশ্রমের ছাপ প্রতিটি রচনাতেই দেখা মেলে। এ সময়ে যা বিরলই বলা চলে।

    তাই ব’লে পূরবী বসুর বিশেষ কোন লেখা নিয়ে কোন মন্তব্য করা যাবে না- এ কেমন কথা! আমার এ মন্তব্যের রেশ ধরে পূরবী বসু বলেছেন,”দু’বার আমার লেখা সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া থেকে এটুকু বুঝি, আমার ওপর কোন কারণে তাঁর ক্ষোভ আছে। ব্যক্তি পর্যায়ে তাতো থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা তাঁকে অধিকার দেয় না অন্যকে অপমান করার চেষ্টার ব্যাপারে।” যা আমাকে ভীষণ ব্যথিত ও মর্মাহত করেছে। প্রথমতঃ ব্যক্তি পূরবী বসুকে আমি চিনি না-দেখিনি কোনদিন। তাঁকে নিয়ে ক্ষোভ তো দূরের কথা- লেখার বাইরে তিনি কোথায় থাকেন, কি করেন-সে সব ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। দ্বিতীয়ত; দুঃখিত, আমি তাঁকে অপমান করার চেষ্টা করেছি-এটা নিতান্তই ভুল বুঝেছেন পূরবী বসু। কবি শক্তি চট্রোপাধ্যায়ের কবিতার প্রতি আমার ব্যক্তিগত ভাললাগা প্রায় পাগলামীর পর্যায়ে। শক্তির শুধু একটি কবিতার টানে সুদূর ডুয়ার্সে-মেটলির হাটে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। তাই “অবনী বাড়ি আছো” কবিতাটির ভুল উপস্থাপনা আমাকে মর্মাহত করেছে। মনে হয়েছে হয়ত পূরবি বসু কবিতাটিকে ভুল ভাবে উপস্থাপনা করেছেন। আমি তাৎক্ষণিক মন্তব্যে সেটাই বলতে চেয়েছি। কোন লেখা নিয়ে মন্তব্যকে ব্যক্তি পর্যায়ে টেনে নামানো খুব হতাশাজনক। পূরবী বসুর মতো গুনীজনের কাছে আমি এটা আশা করিনি।

    আমার আরেক প্রিয় মানুষ অকাল প্রয়াত শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীকে নিয়ে এক লেখক সম্পূর্ণ ভুল তথ্য উপস্থাপন করে সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে মুড়িয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন এবং সেখানে পূরবী বসুর একটি মন্তব্যের সাথে আমি হয়ত দ্বিমত প্রকাশ করেছিলাম। পূরবী বসু প্রায় বছর দু’তিন আগের আমার সে মন্তব্যকে মনে রেখেছেন এবং উল্লেখও করেছেন।

    আমরা এক অসহিষ্ণু সময়ে বাস করছি। কেউ কারো সমালোচনা সহ্য করতে পারি না। একটা ধারণা নিয়েই আমরা চলি যে, নামী মানুষেরা যা বলবেন সেটাই ঠিক। নিজের মতের বিপরীতে অন্যের বিপরীত মত থাকতেই পারে, সেটা বলতে গেলেই ব্যক্তিগত ভাবে নেয়ার প্রবনতা খুবই সংক্রামক হয়ে দেখা দিচ্ছে ইদানিং।

    তবু আশা করবো পূরবী বসু যদি আমার কোন মন্তব্যে দুঃখ পেয়ে থাকেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে দুঃখিত ও ব্যথিত- আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

  7. benjirtipu@gmail.com says:

    উত্তরে পূরবী বসু কিছু বলুন ভজন সরকারকে। আমরা কেন সত্য স্বীকারে কুণ্ঠিত হই ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.