চিত্রকলা, সাহিত্য সংবাদ

সাম্প্রতিক শিল্পসাহিত্য: পানামা পেপার্স-এ চিত্রকলাও

বিপাশা চক্রবর্তী | 17 Apr , 2016  

একটি নিলাম যেভাব পাল্টে দিল শিল্পজগতের ইতিহাস

pablo.jpg বিলিওনিয়ার জো লুইস কিভাবে ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা পৃথিবী বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম সস্তায় কিনে নিয়েছিলেন সম্প্রতি পানামা পেপার্সে তার একটি বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। মার্কিন ব্যবসায়ী ও শিল্প সংগ্রাহক দম্পতি ভিক্টোর গ্যান্জ ও শ্যালি গ্যান্জ-’এর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল বহু বিশ্ববিখ্যাত শিল্পকর্ম। জহুরির চোখ দিয়ে তারা সেই শিল্পকর্ম বাছাই করতেন। এ ব্যাপারে তারা ছিলেন বিশেষজ্ঞ। কখনোই তাদের পছন্দ ব্যর্থ হয়নি। বলা যায়, পৃথিবীর ইতিহাসে এই দম্পতিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগত শিল্প সংগ্রাহক। এমনকি শিল্পসংগ্রহ নিয়ে এই দম্পতি আ লাইফ অফ কালেক্টটিং নামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থও লিখেছিলেন। বিশেষ করে পাবলো পিকাসোর ভক্ত ছিলেন তারা। এবং পিকাসোর বিখ্যাত কিছু শিল্পকর্ম তাদের সংগ্রহশালায় ছিল। ১৯৯৭-এর জানুয়ারিতে ৮৫ বছর বয়সে শ্যালি গন্জ-এর মৃত্যুর পর থেকে একে একে নিলাম হতে থাকে তাদের সংগ্রহে থাকা শিল্পকর্মগুলো।

women-of-algiers.jpgসময়টা ১৯৯৭ সালের নভেম্বর মাস। ম্যানহাটনের নিলাম ঘর ক্রিস্টিজ সেলসরুমে গন্জ দম্পতির সংগ্রহে থাকা পাবলো পিকাসোর যুদ্ধপরবর্তী মাস্টারপিস বিশ্ববিখ্যাত শিল্পকর্ম ‘ওমেন অব আলজিয়ার্স’সহ অসংখ্য চিত্রের একটি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিখ্যাত স্প্যানিশ কিউবিস্ট চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর ‘ওমেন অব আলজিয়ার্স( ভার্সন ও)’ ছিল ১৫টি অসাধারণ চিত্রকর্মের একটি সিরিজ। আর ‘ভার্সন ও’ হচ্ছে ঐ সিরিজের সর্বশেষ চিত্রকর্ম। আর এজন্যই ওটা ছিল একটু বেশী ব্যতিক্রম। নিলামে থাকা শিল্পকর্মগুলো মাত্র ৩২ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। আর ১৮ বছর পর যার মূল্য হয় ১৭৯ মিলিয়ন ডলার।

সেদিন ক্রিস্টিজ নিলাম হাউজে মোট ৩৩টি চিত্রকর্ম সুদৃশ্যভাবে লটে টানানো হয়। সমাজের অভিজাত শ্রেণীর ধোপদুরস্ত প্রায় দুইহাজারেরও বেশী মানুষ সমবেত হয় বিক্রয় কক্ষে। ভিক্টর ও শ্যালির ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা আধুনিক শিল্পকর্মের প্রতি অসীম আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে সমবেত বিত্তশালীরা। নিলামে ডাক তোলার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ৬০টি টেলিফোন সংযোগও প্রস্তুত।
“ডাক উঠছে- ১৬ মিলিয়ন ডলার…২০ মিলিয়ন … ২২ মিলিয়ন… ২৭ মিলিয়ন থেকে ২৮ মিলিয়ন ডলার” ।

নিলামে হাতুড়ির শেষ ঘা পড়ল, আর সেই সাথে শিল্প দুনিয়ারও পরিবর্তন হলো। লন্ডনের একজন ডিলার যিনি কিনা মধ্যপ্রাচ্যের এক রহস্যময় ক্রেতা, তিনি ৩১.৯ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেন ৪০ বছর আগে ৭০০০ ডলারে কেনা শিল্পকর্মগুলি। গন্জ দম্পতির সংগৃহীত শিল্পকর্মগুলির সেই নিলাম ছিল একটি মাইলফলক কারণ সেই থেকে শিল্পকলা একটি বৈশ্বিক পণ্য হয়ে যায়। মানুষ যেভাবে বিভিন্ন সম্পত্তি, শেয়ারবাজার বা অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করে সেভাবে শিল্পকলার জগতও একটি বিনিয়োগের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।

নভেম্বরের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় উপস্থিত জনতা তখনও বোঝেনি অনেক চিত্রের সাথে ‘ওমেন অফ আলজিয়ার্স’ নিলামে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ছয় মাস আগের একটি গোপন চুক্তি অনুসারে একটি অফশোর কোম্পানি মূল্যবান সেই শিল্পকর্মগুলি কিনে ফেলে। আর সেই কোম্পানির ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রক ছিলেন বিলিয়নিয়ার অর্থ ব্যবসায়ী জো লুইস। কিন্তু তার নাম তখনও সেভাবে কেউ জানত না । তিনি সেই শিল্পকর্ম থেকে ১৬৮ মিলিয়ন ডলারের ফায়দা লুটে নিলেন- বিভিন্ন উপায়ে। সেই নিলামের পেছনের ঘটনা আজ পানামা পেপারসের মাধ্যমে জানল সবাই। ক্রিস্টিজের সেই নিলাম ঘরে সবার নাকের ডগার উপর দিয়ে জুয়া খেলল জো।

জো’র ভাগ্যের চাকা ঘোরা শুরু হয় ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা দিয়ে। ১৫ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দিয়ে বাবার ব্যবসায় হাত লাগান। এরপর ব্যবসা বিক্রি করে দেশের কর ফাঁকি দিয়ে বাহামায় চলে যান। ক্যারিবিয় দ্বীপেই তিনি আর্থিক ব্যবসায় জড়িত হয়ে মিলিয়নিয়ার থেকে বিলিওনিয়ার বনে যান। ১৯৯২ সালে যোগদেন হাঙ্গেরিয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান ধনকুবের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় জর্জ সরোস-এর সঙ্গে। ঐ সময় ব্রিটিশ পাউন্ডের মূল্য ডলারের তুলনায় কমে যায়। আর সেখানে জো বেশ ফায়দা তোলেন। এরপর প্লানেড হলিউড চেইন রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করেন। আর ব্যাপক পরিচিতি পান টোটেনহাম ফুটবল ক্লাবটির স্বত্বাধিকারী হয়ে। সম্প্রতি পানামা পেপারসের মাধ্যমে তার বিভিন্ন অফশোর কম্পানিতে বিনিয়োগের চিত্র উঠে আসে। আর সেই কোম্পানির মধ্যে শিল্পব্যবসায় জড়িত অনেক কোম্পানিও রয়েছে।

যেভাবে নিলামের পথ তৈরি হলো

আবার ফিরে যেতে হয় গন্জ দম্পতির কাছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা কস্টিউম জুয়েলারির ব্যবসা করতো। আগেই বলেছি, তারা ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম চিত্র সংগ্রাহক। তাদের সংগ্রহে শুধু পিকাসোর নয়, ফ্রাঙ্ক স্টেলা, জ্যাসপার জনস, রবার্ট হাউজেনবার্গ ও ইভা হেশে’র মতো বিশ্বনন্দিত শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম ছিল। এই শিল্পীরা প্রত্যেকেই ছিলেন এবস্ট্রাক্ট স্টাইলের এক একজন অগ্রদূত। গন্জ পরিবার ৫০ বছরে ২ মিলিয়ন অর্থ ব্যয় করেছিলেন এই সংগ্রহের পেছনে। কিন্তু গন্জ দম্পতির মৃত্যুর পর যখন করের বোঝা বাড়ছিল তখন তাদের ছেলেমেয়েরা সেই চিত্রকর্মগুলি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। এর জন্য তারা ক্রিস্টিজ নিলাম হাউজ বেছে নিল। এই নিলাম হাউজের মালিক জেমস ক্রিস্টি আগে থেকেই জানত বিক্রির ব্যবসা সফল হবে। কারণ ১৯৯৭ সালের মে মাসে ‘নিয়ো’ সাউথ প্যাসিফিকের ছোট্ট এই দ্বীপের একটি কোম্পানি সেই চিত্রকর্মগুলি কেনার জন্য মিলিয়ন ডলার হস্তান্তর করেছিল। সিমসবেরী ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন, ১৯৯৭ সালের নিবন্ধিত হয়ে ১৯৯৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। বোঝা যায় গন্জ পরিবারের সেই নিলামের জন্যই এটি তৈরি হয়েছিল। আর এটির নিবন্ধন এজেন্ট ছিল মোসাক ফনসেকা! এই ল’ফার্মের কর্মীরাই সিমসবেরীর নমিনি পরিচালক ছিলেন। যারা আসলে নামেমাত্র ছিলেন, আসল নিয়ন্ত্রক ছিল অন্য কেউ। পানামা পেপার্সের মাধ্যমে জানা যায়, মি. জোসেফ চার্লস লুইস ছিলেন সেই ব্যক্তি। তিনি ছিলেন ঐ কোম্পানির মূল ব্যাংক হিসাবের স্বাক্ষর কর্তা। আরো জানা যায় ১৯৯৭ সালের ২ মে সিমসবেরীর সাথে স্পিংক এন্ড সন্স নামে এক নিলাম হাউজের সাথে একটি চুক্তি হয়। যা কিনা কয়েকবছর আগে ক্রিস্টি কিনে নেয়। আর এভাবে সিমসবেরী স্পিংক-এর মাধ্যমে প্রায় ১০০ শিল্পকর্ম গন্জদের কাছ থেকে কিনে নেয়, যার মধ্যে পিকাসোর অত্যন্ত মূল্যবান তিনটি চিত্রকর্মও ছিল।

একটি শিল্পবাজার বিপ্লব

শিল্প বাজারে এখন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়। ১৯৯৭ সালে যে ঘটনা ঘটেছিল তা অবৈধ ছিল না বলে দাবী করে ক্রিস্টিজ নিলাম হাউজ। জো লুইস দু’ভাবে লাভবান হয়েছিলেন। তিনি নিজে শিল্পকর্মগুলি কিনে নিয়েছিলেন অন্যদিকে অর্থ বিনিয়োগ করেও লাভবান হয়েছিলেন। জানা যায়, ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি ক্রিস্টিজ-এর শেয়ার কিনতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তী দুবছরে প্রায় ৩০ ভাগ শেয়ার নিজের করে নেন। সে হিসেবে কমিশন বাবদ বেশ মোটা অংকের ভাগ পেয়েছিলেন ক্রিস্টির কাছ থেকে। এখন দেখা যাক, ক্রিস্টিজের সেই নিলামে তার লাভের অংক। পিকাসো ‘মেরী থেরেস ওয়াল্টার’ চিত্রকর্মটি ৪৫ মিলিয়নে কিনে ৪৮ মিলিয়নে বিক্রি করেন, ২৫ মিলিয়নে বিক্রি হয় ২০ মিলিয়নে কেনা ‘ফেম এন চেমিস’ যার ক্রেতা পরবর্তীতে এটি নিঃশর্তে দান করে দেন, নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্টসকে। এখন সেখানেই আছে এই চিত্রকর্মটি।

সবচেয়ে বড় চমক ছিল “ ওমেন অফ আলজিয়ার্স’। বিক্রির আগে এর দর কষা হয় ১২ মিলিয়ন ডলার । ক্যাটালগে উল্লেখ হয় ১০-১২ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী ১৮ বছর ধরে এই চিত্রকর্মটি অন্তরালে চলে যায়। কাউকে কাউকে বলতে শোনা গেছে এটি সম্ভবত কোন সৌদি সংগ্রাহকের কাছে আছে। গতবছর মে মাসে সেটি আবার ক্রিস্টিজ নিলাম হাউজের ক্যানভাসে দেখা যায়! ইতিহাস পুনরায় ফিরে আসে। ‘ওমেন অব আলজিয়ার্স’ (ভার্সন ও) এখন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যক্তির দখলে। তিনি ১৬০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে চিত্রকর্মটি কিনে নিয়েছেন। এটি একটি নতুন রেকর্ড কোন নিলাম হাউজে এত বেশী মুল্যে কোন শিল্পকর্ম বিক্রি হবার।

এই ঘটনা সম্পর্কে জো লুইসের তরফ থেকে উল্লেখযোগ্য কোন মন্তব্য পাওয়া যায় নি। তবে কয়েকদিন আগে, ফরচুন ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে জো লুইস বলেন “একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আপনি ১০ বারের মধ্যে ৩ বার ভুল প্রমাণিত হতেই পারেন। আর সেটা খুবই বিরল ঘটনা”।

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত বিপাশা চক্রবর্তীর আরও লেখা:
জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গম: অর্ধনারীশ্বর অথবা তৃতীয় প্রকৃতি

মানব তুমি মহীরুহ তুমি

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: আইনস্টাইন, শেক্সপিয়র, আঁদ্রে গ্লুক্সমাঁ, ফের্নান্দো ও বিয়োরো

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: স্রোতের বিরুদ্ধে স্নোডেন, অরুন্ধতী, কুসাক

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: ভিক্টর হুগো ও টেনেসি উইলিয়াম

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: আরবমুখী ফরাসী লেখক ও মার্গারেটের গ্রাফিক-উপন্যাস

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: গত বছরের সেরা বইগুলো

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: নতুন বছরে নারীরাই রবে শীর্ষে

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: নতুন এলিয়ট, ব্যাংকসির প্রতিবাদ ও তাতিয়ানার রসনা

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য:চিরকালের শত শ্রেষ্ঠ

নারী দীপাবলী: তুমি হবে সে সবের জ্যোতি

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য:চিরকালের শত শ্রেষ্ঠ ননফিকশন

গ্রন্থাগারের জন্য ভালোবাসা

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: যাদুবাস্তবতার শাহেনশাহ মার্কেসের মানসিক গ্রন্থাগার

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য:ভাষারাজ্যের তীর্থযাত্রী ঝুম্পা লাহিড়ী ও টেন্টাকলের মার্গারেট এটউড

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: প্রত্যাখ্যাত রাউলিং ও পুনর্বাসনে লুইয এলিজাবেত ভিযে ল্য ব্রাঁ

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: রোবট লিখবে হাইব্রিড উপন্যাস?

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
Flag Counter


1 Response

  1. shoibal says:

    ব্যতিক্রমী অথচ মননশীল নানা বিষয়ে মানসম্মত লেখা নিয়মিত প্রকাশ করার জন্য আর্টসের এই আয়োজনকে অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.