বিশ্বসাহিত্য, ব্যক্তিত্ব, শ্রদ্ধাঞ্জলি

মারিও বার্গাস যোসা, আপনাকে শুভেচ্ছা

রাজু আলাউদ্দিন | 2 Apr , 2016  

mario-with-my-book.jpg
ছবি: রাজু আলাউদ্দিনের লেখা বই হাতে মারিও বার্গাস যোসা, সঙ্গে যুবায়ের মাহবুব, স্পেন।
গত ২৮ মার্চ ছিল নোবেলবিজয়ী লেখক মারিও বার্গাস যোসার ৮০তম জন্মদিন। নানান কাজ-অকাজের কুয়াশায় এই দিনটি আড়াল হয়ে গিয়েছিল বলে আমার নজরে পরেনি। এ জন্য নিজেকে খানিকটা অপরাধীই মনে হচ্ছে। যদিও জানি আমার এই অপরাধবোধের কথা তিনি কখনোই জানবেন না। তার জীবন এতই কর্মমুখর যে পৃথিবীর কোন প্রান্তে কোথাকার কোন পাঠক তার জন্য অপরাধ বা আনন্দে ভুগলো– এতে তার কীইবা আসে যায়। কিন্ত আমার আসে যায়, কারণ তার লেখার হাত ধরে হাটতে শিখেছি সাহিত্যের রাজপথে, জানতে শিখেছি তার লেখার মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সব রত্নের মর্মার্থ। মারিও বার্গাস যোসার মতো অসামান্য লেখকদের লেখা পাঠ মানে পাঠক হিসেবে রুচির উন্নয়ন ঘটানো, সময়ের অপচয় না ঘটিয়ে। তাদের মতো লেখক পাঠকের সময়ের কেবল অপচয়ই রোধ করেন না, পাঠককে সাহিত্যপাঠের আনন্দলোকের স্থায়ী নাগরিকত্বে ভূষিত করেন।
আমার পরম সৌভাগ্য যে আমি লেখালেখির শুরুতেই মারিওর মতো এক মহান লেখকের হাত ধরার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি তার নির্ভুল পাঠ ও পাঠের শৈল্পিক বিস্তারের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছিলেন কাদের লেখা পাঠ করা জরুরী। তিনি নিজেও ছিলেন সেই লেখক, মাত্র ২৩ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় যার প্রথম গল্পগ্রন্থ লোস হেফেস (কর্তারা)। আর ২৬ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস লা সিউদাদ ই লোস পেররোস (শহর ও সারমেয়) লিখে স্পানঞল সাহিত্যে রীতিমতো হুলুস্থুল ফেলে দেন। একই বছর ঐ বইয়ের জন্য স্পানঞার বিব্লেওতেকা ব্রেবে পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে অতলান্তিক সাগরের উভয় পারে রাতারাতি সাহিত্যের সবচেয়ে বয়োকনিষ্ঠ নায়ক হিসেবে অর্জন করেন ইর্ষণীয় খ্যাতি ও সৌভাগ্য। কিন্তু যে লেয়নসিও প্রাদোর ক্যাডেট কলেজের অভিজ্ঞতায় লিখিত হয়েছিল এই অবিস্মরণীয় উপন্যাস সেখানেই সে বছর তার অভিজ্ঞতা বয়াণের প্রতিবাদে তা পোড়ানো হল। বার্গাস যোসা এসব প্রতিবাদের কোনো তোয়াক্কা না করে বরং ক্রমাগত আরও বেশি প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছেন তার পরবর্তী উপন্যাসগুলোয়। “সাহিত্য হচ্ছে আগুন, এর অর্থ প্রথাবিরোধিতা এবং বিদ্রোহ”– বার্গাস যোসা কেবল কথায়ই নয়, তার সকল কর্মকান্ডেই তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন এই আগুনকে প্রমিথিয়ুসের মতো। লাতিন আমেরিকার ‘বুম’ আন্দোলনের বয়োকনিষ্ঠ এই লেখক কথাসাহিত্যে যেমন, তেমনি সাহিত্যসমালোচনা ও সাংস্কৃতিক প্রবন্ধেও তার দূরদর্শিতা, গভীরতা ও সুক্ষ্মতার জন্য সার্বজনীন ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। তার কৌতূহল কেবল ইউরোপীয় এবং লাতিন আমেরিকান রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বৈশ্বিক কৌতূহলের অংশ হিসেবে দূর ফিলিস্তিন, ইসরায়েল, ইরাকের রাজনীতি, এমনকি বাংলাদেশের এসিডদগ্ধ নারীরাও তার অন্তর্ভুক্ত। লাতিন আমেরিকার তিনি সেই গুটিকয় লেখকদের একজন যিনি জীবন অনুসারে কাজ নয়, বরং কাজ অনুসারে জীবন যাপন করেন। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে তাকে সম্মানিত করা হয় নোবেল পুরস্কারে।
mario-mail.jpg
রাজু আলাউদ্দিনকে লেখা মারিও বার্গাস যোসার চিঠি।

আমার সৌভাগ্য এই যে তাকে নিয়ে অামার যে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল তা তিনি প্রকাশের দুদিনের মাথায় পেয়ে গিয়েছিলেন আমার লন্ডনপ্রবাসী দুই বন্ধু তারিকুল আলম খান ও যুবায়ের মাহবুবের সহযোগিতায়। যুবায়ের জানিয়েছিল যে বইটি পেয়ে তিনি খুশী হয়েছিলেন। বইটি তিনি হাতে পাওয়ার প্রায় দেড় মাস পরে তার সচিব বেরোনিকার মাধ্যমে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমাকে চিঠি লিখে যেমন বিস্মিত করেছেন, তেমনি লেখক হিসেবে তার অসাধারণ সৌজন্যবোধেরও পরিচয় দিয়েছেন। কালিদাস বলেছিলেন বড় লেখকদের একটি বড় গুণ এই যে তারা গৌণদের দাবীর প্রতি আন্তরিক হন। তিনি অামার মতো গৌণকে চিঠি লিখে কালিদাসের এই উক্তিকে চিরন্তন সত্যে প্রসারিত করেছেন। প্রিয় মারিও, আপনাকে আবারও জন্মদিনের বিলম্বিত, কিন্তু বিলম্বিত বলেই তা প্রলম্বিত শুভেচ্ছা। আপনি দীর্ঘজীবী হোন।

আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিনের অন্যান্য প্রবন্ধ:
বোর্হেস সাহেব

অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

“একজন তৃতীয় সারির কবি”: রবীন্দ্রকবিতার বোর্হেসকৃত মূল্যায়ন

রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ

কার্লোস ফুয়েন্তেসের মৃত্যু:
সমাহিত দর্পন?

মান্নান সৈয়দ: আমি যার কাননের পাখি

বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আঁদ্রে মালরো

স্পানঞল জগতে রবীন্দ্র প্রসারে হোসে বাসকোনসেলোস

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ:
‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে আমার কয়েক টুকরো স্মৃতি

বনলতা সেনের ‘চোখ’-এ নজরুলের ‘আঁখি’

ন্যানো সাহিত্যতত্ত্ব: একটি ইশতেহার

যোগ্য সম্পাদনা ও প্রকাশনা সৌষ্ঠবে পূর্ণ বুদ্ধাবতার

দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে গানের কথাই বলি

অজ্ঞতার একাকীত্ব ও আমাদের মার্কেস-পাঠ

আবেল আলার্কন: স্পানঞল ভাষায় গীতাঞ্জলির প্রথম অনুবাদক

জামান ভাই, আমাদের ব্যস্ততা, উপেক্ষা ও কদরহীনতাকে ক্ষমা করবেন

এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘দর্পন’-এ বাংলাদেশ ও অন্যান্য

প্রথমার প্রতারণা ও অনুবাদকের জালিয়াতি

আবুল ফজলের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

আবু ইসহাকের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

কুদরত-উল ইসলামের ‘গন্ধলেবুর বাগানে’

মহীউদ্দীনের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

বোর্হেস নিয়ে মান্নান সৈয়দের একটি অপ্রকাশিত লেখা

অকথিত বোর্হেস: একটি তারার তিমির

ধর্মাশ্রয়ী কোপ

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্পর্কে অক্তাবিও পাস

লাতিন আমেরিকার সাথে বাংলার বন্ধন
Flag Counter


2 Responses

  1. বিপাশা চক্রবর্তী says:

    রাজু আলাউদ্দিন, আপনার সৌভাগ্য দেখে ঈর্ষা হচ্ছে । আবার ভালও লাগছে। গৌণদের দাবীর প্রতি আমাদের এখানে বড় বড় কজন লেখক আন্তরিক হতে পারেন। লিখতে এসে বুঝেছি তার সংখ্যা নিতান্তই কম। আর এখানে যোসা একজন নোবেল বিজয়ী!

  2. রাজু আলাউদ্দিন says:

    বিপাশা চক্রবর্তী, লেখাটি আপনার নজরে পড়েছে দেখে আনন্দিত হলাম। ইর্ষা করতে পারেন বৈকি, ইর্ষা যদি হয় প্রীতির অন্য নাম। আপনার ভালো লাগার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। ঠিকই বলেছেন, গৌণদের প্রতি আমাদের তথাকথিত ‘বড়’ লেখকদের অনুদারতা, ক্ষুদ্রতাতো কম দেখছি না। আপনিও যে একই অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন–তাতে আর আশ্চর্য হওয়ার কী আছে। এই অপপ্রবাহের বিরুদ্ধে উজিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। আপনার লেখার শক্তিই এই ‘বড়’দের একদিন ছোট করে দেবে। আপনার কল্যাণ কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.