১৯৭১, প্রবন্ধ

কী পাইনি, তার হিসাব মেলাতে

golam_murshid | 25 Mar , 2016  

54-kendriokhelagharashor-nationalflagrally-25032016-10.jpgসামাজিক উন্নতির যতো সূচক আছে, তার সবই নির্দেশ করে ২৬শে মার্চ আমাদের জন্যে এসেছিলো কী অকৃপণ অবদান নিয়ে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার অর্জন কতো ইতিবাচক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ একটা বড়ো রকমের হোঁচট খেয়েছিলো। অর্থনীতিতে তার ছাপ পড়েছিলো। প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় তার আঘাতটা লেগেছিলো আরও তীব্রভাবে। দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ অন্যের বমিও খেয়েছিলো–শোনা যায়। বাংলাদেশ ছিলো তখন পৃথিবীর সবচয়ে দরিদ্র চার-পাঁচটি দেশের মধ্যে একটি। কিন্তু এক দশকের মধ্যে মানুষ সেই প্রচণ্ড অভিজ্ঞতার কথা ভুলে গিয়েছিলো।

তারপর গত তিন দশকের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কেবল গড়ে ওঠেনি, এমন বিস্তীর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এ অঞ্চলে আগে কখনো দেখা যায়নি। ব্যবসা-বাণিজ্য এখন কালবাজারি-নির্ভর নয়, সে এখন আপন মহিমায় প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ এখন আমদানির চেয়ে রপ্তানি করে অনেক বেশি। ৭২-৭৩ সালে শিল্প বলতে বোঝাতো জিঞ্জিরার নকল-কারখানা। এখন বহু ক্ষেত্রে দেশ শিল্পের জন্যে স্বনির্ভর। বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে এখন বিশ্বের একটা প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশে কেবল পোশাক নয়, জাহাজ পর্যন্ত তৈরি হয়।

এখন বাংলাদেশ তার দারিদ্রকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে এসেছে সামনের দিকে। বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমা এখন আগের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে। এখন আর সে পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম নয়। এখন সে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ। এবং যেভাবে সে উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্চে, তাতে অচিরে সে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে অর্থনীতিকরা আশা করছেন।

কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর শিক্ষায় তার পরিমাণগত উন্নতি। শিক্ষার মান কতোটা উন্নত হয়েছে, সে নিয়ে সন্দেহ থাকতেই পারে। উচ্চশিক্ষা অনেকটাই নামে মাত্র উচ্চশিক্ষা। কিন্তু আসলে যেখানে তার সত্যিকার উন্নতি হয়েছে, তা হলো: দেশে সাক্ষরতা – শিক্ষার হার – দ্বিগুণের চেয়েও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে যে-মেয়েরা এই সেদিনও শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে ছিলো ছেলেদের তুলনায়, সেই মেয়েরা এখন শিক্ষায় ছেলেদের হারিয়ে দিয়েছে – সংখ্যার দিক দিয়ে, মানের দিক দিয়ে। ১৯৭১ সালেও খুব কমসংখ্যক নারী চাকরি করতেন, আজ দেশের বড়ো বড়ো পদেও অধিষ্ঠিত আছেন নারীরা। কেবল তাই নয়, অর্থনীতিতে নারীরা গ্রামের দূরতম প্রান্তেও ভূমিকা রাখছেন। মাঠে কাজ করছেন, রাস্তায় নির্মাণে অবদান রাখছেন। শিক্ষা, সেবা ইত্যাদিতে এক সময়ে মেয়েরা ভূমিকা পালন করতেন। আজ তাঁরা বিমান চালনা করছেন, সামরিক এবং পুলিশ বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন, বিচারকের আসনে বসেছেন, উপাচার্য হয়েছেন। দেশের পোশাক শিল্পের কর্মীদের প্রধান ভাগই নারী। অর্থনীতিতে অবদান রাখার মাধ্যমে তাঁরা আজ নিজেদের পরিবার এবং সমাজেও নিজেদের বক্তব্যকে তুলে ধরতে সক্ষম হচ্ছেন। রাজনীতিতে নারীরা এখন সর্বোচ্চ স্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এমন কি, গ্রামের স্থানীয় সরকারেও তাঁরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

আরও একটা তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি হয়েছে গড় আয়ু বৃদ্ধিতে। ১৯০০ সালে যেখানে গড় আয়ু ছিলো তিরিশের ঘরে, এখন সেটা বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার একেবারে হ্রাস পেয়েছে।

এসব দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশকে উন্নতির একটা দৃষ্টান্ত বলে গণ্য করতে হয়।

কেবল একটি জায়গাতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে, পিছিয়ে পড়ছে। যেসমস্ত মানবিক গুণাবলীর জন্যে মানুষ জন্তুকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়, সেসব মানবিক গুণ কেবল তাদের মধ্যে কম দেখা যাচ্ছে, তাই নয়, ক্রমাগত সেসব গুণ তাদের মধ্য থেকে লোপ পাচ্ছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। মানুষ আজ টাকার জন্যে তার মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিতে পারে। ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তির জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বীকে খুন করতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বীর শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে মাটি চাপা দিতে পারে, অথবা পানিতে ভাসিয়ে দিতে পারে। আইনের প্রয়োগ যাদের হাতে, তারা আজ আইন হাতে তুলে নিতে দ্বিধা করছে না। যৌনক্ষুধা মেটানোর জন্যে মানুষ শিশুকেও ধর্ষণ করতে দ্বিধা বোধ করে না।

দেশ কি কেবল শিক্ষার হার? অর্থনৈতিক সূচক? গড় আয়ুবৃদ্ধি? বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বৃদ্ধি? দেশ মানুষের জন্যে। দেশের জন্যে মানুষ নয়। আমাদের স্বাধীনতা দিবস কেবল বাহ্যিক উন্নতির সূচকগুলো উদযাপন করার কথা মনে করিয়ে দিতে আসে না। সে আমাদের মানবিক অর্জনগুলোকেও পরিমাপ করার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেখানে আমরা যেন কেবল পিছিয়ে না-পড়ি!
২৪ মার্চ ২০১৬, লন্ডন
Flag Counter


3 Responses

  1. ভানু ভাস্কর says:

    মানবিক গুণাবলি অর্জনের জন্য শিক্ষার কারিকুলামের একটা ভূমিকা আছে। আগে সকালে উঠিয়া আমি … বা আমি হবো সকাল বেলার পাখি পড়তাম, ‘দাদীকে ঔষধ দাও…’ পড়তাম, অর্থাৎ শিখে নিতাম ছোট বেলাতে। এখন আর নিচ্ছি না।
    আগে বাবা ছেলেকে অংক শেখাতেন, ধরো তোমার কাছে তিনটি আম আছে, তা থেকে একটি তুমি তোমার গরীব বন্ধুকে দিয়ে দিলে, তোমার কাছে এখন কয়টি রইলো?
    আর এখন বাবা অংক শেখান, ধরো একটি ছেলে আর দুটি মেয়ে বসে গল্প করছে, তাহলে মোট কতজন গল্প করছে?
    অর্থাৎ সন্তানের দানের বস্তু এখন পার্টির বান্ধবীদের দখলে চলে যাচ্ছে। মানবিকতা আসবে কোত্থেকে?

  2. mohammad setab uddin says:

    মানুষের নৈতিকতার অবক্ষয়ের জন্যই খুন,ধর্ষণের মত ঘটনাগুলো ঘটছে। আগে যে ঘটতো না তা নয়। তবে আগে একটা খুন হলে আমলভেদে- অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে, এলাকার মানুষের ঘুম, নাওয়া-খাওয়া হারাম হয়ে যেত! পাকিস্তান আমলেও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদ এবং প্রতিকার করতে দেখেছি। এখন মানুষ মানুষকে পেটাচ্ছে, প্রতিবাদ তো দূরে থাক কেউ ফিরেও দেখে না। আর রাষ্ট্র নয় পিতামাতার কারণেই আমাদের সমাজ নষ্ট হয়েছে এবং হচ্ছে। সকল পিতামাতা এবং গুরুজন শিশুকাল থেকেই যদি সন্তান-সন্ততিদের বিষয়ে যত্নবান না হই আমরা প্রত্যেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হব ।

  3. স্বরোচিষ সরকার says:

    লেখাটি বাংলাদেশের সর্বত্র প্রচারিত হওয়া উচিত।
    মাত্র একটি জায়গায় উন্নতি করতে পারলেই আমরা উন্নত হবো; তাহলে কেন সেই চেষ্টা করবো না? — লেখাটি এমন চেতনা ধারণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.