পঁচিশে মার্চের স্মৃতি: ঢাকার বাইরে

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস | ২৫ মার্চ ২০১৬ ৭:৫১ অপরাহ্ন

26-march.jpgএকাত্তরের মার্চ পুরো মাসটাই ছিল টালমাটাল। রাজনীতির বিশাল, বিস্তৃত জাল এক একবার ফুলে উঠছিল, দুলে উঠছিল, আর সমগ্র দেশ তাতে প্রচন্ডভাবে আন্দোলিত হচ্ছিল। তিন তারিখে জাতীয় সংসদ বসার কথা। ইয়াহিয়া খানের বেতার ঘোষণায় যখন তা বাতিল হল, তখন থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এলো জনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলগুলোই এতদিন দুলছিল সমান তালে। সেদিন রাতে ছাত্র জনতা বস্তির মানুষ সবাই নেমে পড়লো রাস্তায়। এরপর সাতই মার্চের বক্তৃতা। দশ লক্ষ লোকের উপস্থিতিতে এদের কারো মাথায় লালপট্টি বহুজনের হাতে লাঠি–তো এদের সরব উপস্থিতিতে শেখ মুজিব শোনালেন এক শ্বাসরুদ্ধকর, নাড়া দেওয়া স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতা–তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা। মনে পড়ে মহসিন হল থেকে আমরা ক’বন্ধু– নূরুল হুদা, সাযযাদ কাদির, মাহবুব সাদিক বের করেছিলাম চারপৃষ্ঠার কবিতা পত্রিকা। তাতে স্বাধীনতার ম্লোগান দেওয়া সব কবিতা আর ছড়া। সেটাই চার আনার বিনিময়ে মাঠের লোকেদের মাঝে বিতরণ করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল তখন–ইয়াহিয়ার ঘোষণার পর সবই আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেছে। আলোচনার ফাঁদে পা দিলেন শেখ সাহেব। আলোচনার কোনো গতি না দেখে বন্ধুদের অনেকেই হল ছেড়ে দেশের বাড়ি চলে গেল। ষোল মার্চে আমিও গেলাম পৈতৃক নিবাস বগুড়া শহরে।

ঢাকা থেকে শ’ দেড়েক মাইল উত্তরের ওই শহরেও দামাল ছেলেদের দৃপ্ত পদচারণা, তাদের মধ্যেও ছিল প্রচন্ড উত্তেজনা। বগুড়ার মাইল ছ’এক দক্ষিণে মাঝিরা গ্রামে ছিল এক মিলিটারি পোস্ট। এখন সেখানেই হয়েছে বিশাল ক্যান্টনমেন্ট। তো সেদিন বিভিন্ন বাসা বাড়ি থেকে, থানা থেকে বন্দুক রাইফেল নিয়ে ছেলেগুলো এই মিলিটারি ঘাটি ঘেরাও করে উনিশজন পাকিস্তানী সৈন্যকে বন্দি করে শহরের জেলখানায় এনে রাখে। আমাদের বাসা জেলখানার বাগানের পাশেই। আমি বলতাম কারাকানন। সেখানে দুটো রাস্তা বাগানকে মাঝখানে রেখে দুদিক দিয়ে চলে গেছে হাটখোলা আর মালতিনগরে। সেদিন সম্ভবত ঊনিশে মার্চ। হঠাৎ একটানা গুলির শব্দ শুনে ছুটে গিয়ে দেখি ছেলেগুলো গরাদের ফাঁক দিয়ে বন্দুক তাক করে বন্দি সৈন্যদের গুলি করছে, আর সৈন্যরা কোনো রকমে এদিক ওদিক সরে বৃথাই বাঁচার চেষ্টা করছে। মুক্তিবাহিনি গঠন হতে তখনো অনেক দেরী; কিন্তু এই ছেলেগুলোই বগুড়ার প্রথম মুক্তিযোদ্ধা। বন্দি পাকিস্তানী সেনাদের মারার কারণ জানা গেল। মাঝিরায় ওদের আটক করতে গিয়ে ছেলেরা কিছুটা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় এবং তাতে একজনের মৃত্যুও ঘটে। তার মৃত্যুসংবাদ আসার পরই ওরা এরকম বেপরোয়া হয়ে গুলি করে উনিশ জন সেপাই আর তাদের ক্যাপ্টেনকে মেরে ফেলে। কয়েকটা লাশ জেলখানার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদীর তীরে মাটি খুঁড়ে পুঁতেও ফেলা হয়। সন্ধ্যার পর কার সঙ্গে যেন নদীর তীরে গিয়ে স্লান চাঁদের আলোয় কয়েকটি সদ্যখোড়া কবর আর দু একটি খাকি পোশাকের টুকরো এদিক ওদিক পড়ে থাকতে দেখেছিলাম।

এরপর আসে পঁচিশে মার্চ। পঁচিশে মার্চ বললে সবার চোখে ভাসে ঢাকা শহরের ছবি। ভাসারই কথা। রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার, সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, জগন্নাথ হল, মধুর ক্যান্টিন সবখানে চলে বেশুমার হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু দেশের মফস্বল শহরগুলোয় তখন চলছিল যুদ্ধের প্রস্তুতি। বগুড়া শহরের দামাল ছেলেরা আগে থেকেই বাসাবাড়ি থেকে, থানা থেকে অস্ত্র নিয়ে রেখেছিল। সেসব সঙ্গে করে তারা শহরের উত্তর প্রান্তে রংপুর রোডের বিভিন্ন বাড়ির ছাদে পজিশন নিয়ে বসেছিল। খবর রটে গিয়েছিল যে মাঝিরা সেনা পোস্টের হত্যাকান্ড জানতে পেরে কয়েক প্ল্যাটুন সৈন্য ট্যাঙ্ক নিয়ে আসছে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে। তাদের ঠেকাতেই ছেলেরা একনলা, দোনলা, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে শহর রক্ষায় এগিয়ে গিয়েছেল। পাকিস্তানী সেনারা এসেছিল, কিন্তু শহর প্রান্তে বাধা পেয়ে সেখানে থেমেও গিয়েছিল। এভাবে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় তিন সপ্তাহ বগুড়া শহরকে শত্রুমুক্ত রাখতে পেরেছিল।

কিন্তু পঁচিশের রাতের কথা মনে আছে। আমাদের মাটির একচালা বাসার সামনে বিষন্ন লালচে আলো ছড়িয়ে জ্বলছিল এক ল্যাম্প পোস্ট। সেটার নিচ দিয়ে উত্তেজিতভাবে চলে যেতে দেখি দুজন তরুণকে হাতে তাদের বন্দুক। সারা শহরেই থমথমে উত্তেজনা ও শঙ্কা। কিছু একটা ঘটবে কি ঘটতে যাচ্ছে এমন অনুভব সর্বত্র বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আলোচনা ভেস্তে গেছে, ভূট্টো ইয়াহিয়া পালিয়ে গেছে, জাহাজভর্তি সৈন্য আর গোলাবারুদ খালাস হচ্ছে চিটাগাঙ বন্দরে–এসব গুজব তখন লোকের মুখে মুখে। সারাদেশ অপেক্ষা করছে আসন্ন কোনো বিপদের। বগুড়া শহরেও সে রাতে তেমনি অশুভ কিছুর পূর্বাভাস। আমার মনে পড়ে সেই সন্ধ্যারাতের কথা। আমাদের বাসার সামনে খোয়া বিছানো রাস্তায় পাশের পাড়ার খোকন আর তার বন্ধু বন্দুক হাতে বিষন্ন আলো গায়ে মেখে চলে গেল। আমার বাবা আর আমি ছিলাম দাঁড়িয়ে। বাবা তাকে কিছু একটা বললেন, হয়তো বলেছিলেন, “যাসনে খোকন, যুদ্ধ করবি তো প্রস্তুতি কোথায়?” এধরনের কথা। উত্তরে খোকন বিড়বিড় করে কি যেন বলে চলে গেল। হয়তো বললো, “হবে মামা, এভাবেই হবে।” এভাবে বলে ছেলে দুটো আলো আঁধারির পথ ধরে জানিনা কিসের টানে কোন আলোকের সন্ধানে চলে গেল।

দু’তিন মাস পর শুনি জয়পুর হাট বর্ডার পার হতে গিয়ে নাকি– অপারেশনে এসে আরো অনেকের সঙ্গে খোকন ধরা পড়ে এবং সঙ্গীদের সঙ্গে সেও নিহত হয়। কিন্তু আজ এত বছর পর তার সেই আধো আলো আধো অন্ধকারে উত্তেজিত চলে যাওয়ার দৃশ্যটা বেশি করে মনে পড়ে।
আর্টস-এ প্রকাশিত খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের আরও লেখা:
ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার কবিতা: তন্দ্রাচারীর কাব্য

সি. পি. কাভাফির কবিতা

রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ

আন্তোনিও মাচাদোর কয়েকটি কবিতা

দিলীপ পালের লেখা: বাংলাদেশে সংষ্কৃতি-চর্চা, নববর্ষ ও মৌলবাদ

রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুবাদ

আচেবের অন্তর্ধান

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com