বইয়ের আলোচনা

ফরিদ আহমদ দুলালের বহুবর্ণিল নাইওরগাথা

বিনয় বর্মন | 17 Mar , 2016  

border=0ফরিদ আহমদ দুলালের নাইওর এক অনিন্দ্যসুন্দর কাব্যগ্রন্থ। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এই গ্রন্থটিতে চুয়াত্তরটি কবিতা অন্তর্ভুক্ত। কবিতাগুলোর কোনো বিষয়ভিত্তিক শিরোনাম নেই; এগুলো সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত। সনেট ফর্মে লেখা কবিতাগুলোর চৌদ্দ লাইন, ইতালীয় ঐতিহ্যানুসারে, যথাক্রমে আট ও ছয়ের অক্টেভ ও সেস্টেটে বিভক্ত। কবিতার চরণগুলো কাপলেট হিসেবে AA BB CC DD EE FF GG রাইমিং প্যাটার্ন রক্ষা করেছে। প্রধানত অক্ষরবৃত্তে রচিত কবিতাগুলো ধীরলয়ের আবহে পাঠককে বিমোহিত করে। আমরা তন্ময় হয়ে শুনি ফরিদ আহমদ দুলালের বহুবর্ণিল নাইওরগাথা এবং সাক্ষী হই এক অসাধারণ কাব্যউচ্চারণের, যার মধ্যে মিশ্রিত এপিকবিন্যাসের আলোছায়া, পোয়েটিক মনোগ্রাফের নিবিড় নান্দনিকতা।

নাইওর কাব্যগ্রন্থে সমস্ত কবিতায় নাইওর নামক এক বাঙালি পল্লিপ্রথাকে অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। শ্বশুরবাড়িকে কিছুদিন অবস্থানের পর এক নববিবাহিতা নারী পিতৃগৃহে প্রত্যাগমন করে। এই ঘটনাটিকে কবি বিচিত্ররূপে উপস্থাপিত করেছেন তার কবিতায়, যেখানে নতুন ব্যঞ্জনা, নতুন অনুভূতি, নতুন চিন্তার ফল্গুধারায় সিক্ত হয়েছে কুসুমকোমল শব্দমালা। নতুন সময়ের আঁচড় পড়েছে কবিতার ছত্রে ছত্রে। নাইওয়ের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে পুষ্পপাপড়িতে, বৃক্ষপত্রে, পাখির কলকাকলিতে, পথের ধূলিতে, আকাশের মেঘে, চন্দ্রাবতী-মহুয়া-মলুয়া-কাজলরেখা লোকগাথায়, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির তোড়জোড়ে, রাজনৈতিক বুলি-বাচালতায়। স্মৃতি-বিস্মৃতির মধ্য দিয়ে নাইওয়ের সংরাগ অনুরণিত হয় প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ ও মিলনাকাঙ্ক্ষায়। নাইওরবিচ্ছেদ সাময়িক, এর পশ্চাতে লুকিয়ে থাকে পুনর্মিলনের হিরন্ময় আলো:

তুমি যাও আমি থাকি অপেক্ষার কষ্ট নিয়ে বুকে
বিচ্ছেদের রথ ছুটিয়েছি দু’জন পুনর্মিলন অভিমুখে।
(‘এক’)

নাইওরকাব্য জসীম উদ্দীন ও আল মাহমুদের গ্রামসংস্কৃতিধারার রোমান্টিক এক্সটেনশন, যেখানে প্রেমের একাগ্রতা ফুটে থাকে কথাকলিতে, গুঞ্জরিত হয় ভ্রমরপাখায়। নাইওরী যেন রাধিকা, যার মুখে সর্বক্ষণ উচ্চারিত হয় কৃষ্ণনাম। ‘রাধিকার কৃষ্ণনাম আমার প্রান্তর জুড়ে আছো শুধু তুমি’ (‘ছয়’)। হাজারো ফুলের সমারোহে সৌরভময় নাইওর-বিহার। পথে পথে ফুটে থাকে গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, বনটগর, শিয়ালমোতি, ক্রিসেনথিমাম, শিউলি, কাশ, দোলনচাঁপা, আকন্দ, অর্কিড ও পারিজাত। ‘চন্দ্রমল্লিকা শিশুর কান্না শুনে হাসে গোলাপ-রঙ্গন’ (‘আট’)। বর্ষা নিয়ে আসে তার নিজস্ব ফুলের সম্ভার। স্ফীত নদীবক্ষে পালতোলা নৌকায় ভেসে চলে নাইওরী:

আষাঢ়ের কদম টগর কেয়া অভিমানে ঝরে যায়
নাইওরে চলেছে বধূ ভরা গাঙ দিয়ে পাল তোলা নায়।’
(‘বাইশ’)।

নাইওরযাত্রা হাজারো পতঙ্গের উচ্ছ্বাস ও পাখির কলতানে মুখরিত। নাইওরের পথে প্রজাপতি ও গঙ্গাফড়িং ওড়াওড়ি করে। পানকৌড়ি, চাতক, খঞ্জনা, ডাহুক, মৌটুসি ও সারস মাতিয়ে রাখে পরিবেশ। এক জোড়া ঘুঘু উড়ে যায় প্রেমিক-প্রেমিকার বেশে। ‘উড়ে যায় ঘুঘুদম্পতি তোমার ছায়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে’ (‘এক’)। ‘মাছরাঙা-চিল থাকে একসাথে ঝিলে ভাসে হাঁস’ (‘পাঁচ’) – তারই মধ্য দিয়ে নাইওর যায় অলকানন্দ কিনারে। প্রেমিক তার প্রেমিকাকে খুঁজে বেড়ায় এদিকসেদিক খঞ্জনা পাখির মতো। ‘খঞ্জনা পাখির মতো হেঁটেছি বিকেলে পথে পদচ্ছাপ এঁকে’ (‘তিন’)। ছাতিম বৃক্ষ ও সরিষার ক্ষেত নাইওরীকে ডেকে ডেকে সারা:

‘তোমাকে ডেকেছে ছাতিম ফুলের মাতাল সুঘ্রাণ
সরিষার ক্ষেতে সোনালি সৌরভ প্রাণের সাম্পান।’
(‘তেরো’)

প্রেমিকহৃদয় চায় প্রেম। বিরহ ও বিচ্ছেদ প্রেমেরই আরেক প্রকাশ। দূরত্ব প্রেমকে ম্লান করতে পারে না, বরং প্রেমের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দেয়, যেমনটা ইংরেজি প্রবাদে আছে: ‘Absence makes the heart grow fonder’। প্রেমিকের মনে দীর্ঘ প্রতীক্ষার আগুন জ্বলে: ‘কতদিন আছি তোমার সংস্রব থেকে বহুদূরে / জ্বলছে আগুন নিভৃতে-নিঃশব্দে গভীর অন্তপুরে’ (‘তেইশ’)। তাকে দেখার জন্য, কাছে পাওয়ার জন্য মন হাঁসফাঁস করে, প্রতীক্ষার প্রহরগুলো ভারী হয় বিষণ্ণতায়, কিংবা প্রতীক্ষাতেই পুলক জাগে। কখনো কখনো বার্তা আসে নীল খামে, প্রণয়ের তীর হয়ে: ‘বার্তাকক্ষে যদি নিরন্তর বার্তা আসে সুরভিত নীল খামে / প্রণয়ের বিষমাখা তীর ধনুকের বান ছেড়ে বর্ষা হয়ে নামে’ (‘একত্রিশ’)। প্রস্ফূটিত ফুলে শোনা যায় বিরহের দীর্ঘশ্বাস: ‘ডালিমের ফুল ফোটে আঙিনার কোণে তুমি তার কারিগর / আমি জানি কোথা থেকে আসে বুকে বিরহের কাতর খবর’ (‘তিয়াত্তর’)। জালে আটকা মাছের মতো বিরহী মন ছটফট করে:

তোমার নাইওর খেলাচ্ছলে হঠাৎ গলায় আটকে যাওয়া ফাঁসি
জল বিনে মীন রাত জেগে বুঝেছি তোমায় কত ভালোবাসি।
(‘তিন’)

গ্রীষ্ম যায়, বর্ষা আসে, তবু প্রেমিকার দেখা নেই। ‘মধুমাস যায় বঁধু নেই পাশে বরিষ ধারায় রাত কাটে’ (‘বাইশ’)। বৃষ্টির দিনে প্রেম আরো অধিক সজীব হয়ে ওঠে। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে বিরহের গান বেজে ওঠে। বৃষ্টি কি বিরহী আকাশের কান্না? স্বাধীন মেঘ সুযোগ নেয় ইচ্ছেমতো প্রতাপ দেখানোর। ‘মেঘেদের কি কম স্বাধীনতা ইচ্ছা হলে বৃষ্টি হবে কিংবা বজ্রপাত / পাহাড়ের অশ্রু হয়ে অবিরাম ঝরে দেখ জলের প্রপাত’ (‘তেষট্টি’)। বৃষ্টির দিনে জানালা দিয়ে শুধুই আকাশের ফিকে চেয়ে থাকা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা: ‘বৃষ্টিবন্দী দিনে সাথে আছে জানালার সংকীর্ণ আকাশ / আকাশের আস্তিনে কিছুটা জুড়ে আছে নীল রঙ দীর্ঘশ্বাস’ (‘চল্লিশ’)। বৃষ্টিভেজা বিরহকাতরতা নিয়েই কবি বাঁচতে চান, অধিক আয়ুযোগে: ‘গতরাতে বৃষ্টি ছিলো সারাক্ষণ ভেজা-ঠাণ্ডা বায়ু / ঈশ্বরের কাছে নিঃসঙ্গ রাতের একাকীত্বে দাঁড়িয়ে চেয়েছি পরমায়ু’ (‘ঊনচল্লিশ’)। কবি বর্ষার অভিজ্ঞতাকে ব্যাঙের উপমায় সর্বজনীন করে তোলেন:

বৃষ্টি দিয়েছে শীতল স্পর্শ প্রচণ্ড ভৈরব নাদে
এখন সবাই ব্যাঙ, জনপদে উচ্ছ্বাসে বৃষ্টির সুর সাধে।
(‘ষোল’)

কবি সমস্ত আয়োজন করে বসে থাকেন, কিন্তু বধূর দেখা নেই। তাকে ছাড়া জীবন অর্থহীন মনে হয়। ‘স্বর্গ ছেড়ে দূরে হঠাৎ নাইওরে দূরে আছো তুমি / তুমি ছাড়া এ জীবন যেন মরীচিকা ধূধূ মরুভূমি’ (‘চার’)। না-পাওয়ার বেদনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে আলোকসজ্জায়, বিরহের রাগিনী তীব্র হয়ে ওঠে পুষ্পধারায়। ‘আলোকোজ্জ্বল মহলে পুষ্পবৃষ্টি ঝরুক চন্দন বাজুক সানাই / বুকের গভীরে খুঁজে পাবে হাহাকার – কিছু নাই কিছু নাই’ (‘বারো’)। কবি সর্বান্তকরণে তার সান্নিধ্য কামনা করেন। ‘তবু কেন দূরে থাকা অভিমান নাইওরের ছলে / বাহুল্য যা-কিছু সব অনর্থক ভিড় করে মিথ্যার বল্কলে’ (‘একুশ’)। কবি কিছুতেই তার আরাধ্য নারীকে ছুঁতে পারেন না। কেবলই দূর থেকে দূরে চলে যায়। ‘সন্ধানে তার হাঁটছি পথে অনন্তকাল ধরে / পথ যতটা যাই এগিয়ে পথটাই যায় সরে’ (‘সতেরো’)। তার আক্ষেপ: ‘সুতো ছিঁড়ে উড়ে যায় রাঙা ঘুড়ি কেন অকারণ’ (‘ত্রিশ’)! অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনাই কবির ভাগ্য। ‘নাইওরে বিষণ্ণ নিরন্ন সামান্য কবি বঞ্চিত থাকাই সমীচীন’ (‘ঊনত্রিশ’)। প্রেমিকের ভাবনা, প্রেমিকা আবার ফিরে আসবে, এসে তার পাশে বসবে। তার বিরহের অবসান হবে:

পরানে তোমার নান্দনিক ফেরা গঙ্গাস্নাত মন
বিবেচনা করি চিত্ত পীড়ায় অধির, মন উচাটন
এ আমার নিঃসঙ্গ-বিরহ-দিনে বাঁচার কৌশল
পঞ্জিকার দিন স্মৃতি হয়ে যায় তবু হারাই না মনোবল।
(‘একচল্লিশ’)

নাইওর পাঠককুলকে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি করে। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় মোড়া এক কালো সময় ঘিরে থাকে চারপাশ, যেখানে প্রতারণা, হানাহানি, খুনোখুনি, লাঞ্ছনা নিত্যকার ঘটনা। হিংসা-প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড জনজীবনকে শঙ্কিত করে তোলে। ‘যারা বোমাবাজ আর এসিড বোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারে / ট্রেনের স্লিপার উপড়ে ফেলে যারা নিশুতি রাতে অন্ধকারে’ (‘চব্বিশ’), কবি তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন। পথে পথে কেবলই মৃত্যু বিছানো, যা দেখে কবির মন হাহাকার করে ওঠে। ‘ক্রস ফায়ারের মুখে বিচারবিহীন মৃত্যু দেখা হয়েছে অনেকবার / ঘাতক ট্রাকের চাকা পিষ্ট করে পথ মানুষের চলাচল শতবার’ (‘ছাপ্পান্ন’)। ‘চৌত্রিশ’ নম্বর কবিতায় অবতারণা করা হয়েছে ভূমিদস্যুদের উৎপাতের প্রসঙ্গ। ‘তেত্রিশ’ নম্বর কবিতায় মানুষের নৈতিক অধপতনের চিত্রটি প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। এ কবিতায় তুলনা-অলংকারে অত্যন্ত মনোগ্রাহী ভাষায় কবি বলেন: ‘সততা ও শান্তি নামের দু’বোন ধর্ষণের প্রকাশ্য শিকার / সৌজন্য এবং শিষ্টাচার ছেলে দুটি পক্ষাঘাতে মননে বিকার।’ দুঃসময় গ্রাস করে সবকিছু এবং শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে নাইওর:

‘নাইওরের নৌকা গেছে উজানের স্রোত ঠেলে ভোরে
বেহারাকে ফাঁকি দিয়ে স্বর্ণালঙ্কার সবই নিয়ে গেছে চোরে।’
(‘তেত্রিশ’)

নাইওরকে খুঁজতে গিয়ে কবির চোখ পড়ে খেটে খাওয়া মানুষের দিকে। নাইওরযাত্রায় লিখিত হয় সংগ্রামী মানুষের ইতিহাস। মুক্তিকামী জনতা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, সংগ্রাম করে, নতুন ইতিহাস সৃজনের প্রতিজ্ঞায়। ‘মানুষের ইতিহাসে দুর্লঙ্ঘ প্রতিটি মুক্তির সংগ্রাম / ইতিহাসে তুমি নতুন চমক দিয়ে কিনেছো সুনাম’ (‘পঁয়ত্রিশ’)। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের সঙ্গে নাইওরের একাত্মতা। ‘আমার সঞ্চয়ে আছে কুমুদিনী হাজংয়ের ময়ূখ টংকদ্রোহ-স্মৃতি / তেভাগার দুরন্ত সাহস মাটি ও মানুষে সনিষ্ঠ প্রণতি’ (‘সত্তর’)। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সংগ্রাম এসে ঠেকে স্বাধীনতা যুদ্ধে:

সিপাহী বিদ্রোহ থেকে টংক ও তেভাগা স্বপ্ন ছুঁয়ে
রক্তাক্ত মুমূর্ষু বাঁচি লড়াইয়ে সামিল হতে তিতুমীর হয়ে
হাজং দ্রোহের রাশিমনি-কুমুদিনি অতঃপর ভাষার লড়াই চিনি
জনতার উত্থানে শরীক হতে আমি মুজিবসেনা-মুক্তিবাহিনি।’
(‘আটত্রিশ’)

নাইওরে যে গেছে সে কি চিরতরেই গেছে? সে কি চলে গেছে অন্য ঘরে, অন্য পুরুষের কাছে? ‘তুমি চলে গেছ বাষ্পশকটে নাইওর বিকেলে বিপক্ষ রথে’ (‘দুই’)। নানা অপচিন্তা পুরুষমনকে পীড়িত করে। নাইওরে দূরস্থিত নারী – হয়তো সে ছিল কবির কিশোর প্রণয়ী, বারবার ফিরে ফিরে আসে সেই পুরনো স্মৃতি। ‘পর্দার আড়ালে আঙুলে নাড়াও সুতো অবিরাম / কিশোর প্রণয় মরে না কখনো সে যে নিকষিত হেম’ (‘এগার’)। পরকীয়ার হাতছানিও দেখা যায় পত্রালিতে। ‘পরকীয়া মেঘ-বালিকার প্রসারিত চোখে নাইওয়ের কারুকাজ / মৎস্যকন্যার সুডৌল বুকে মধু-স্ফিতি নিপুণ বিনম্র সাজ’ (‘ছেচল্লিশ’)। পরকীয়া প্রেমে মাখা হয় শুদ্ধতার প্রলেপ:’সমর্পিত মন ভুল গণনায় ভুলের আঁচলে প্রাণ দিয়া / পরিযায়ী পাখি আসে শীতে হাওরে-বিলে রচে শুদ্ধ পরকীয়া’ (‘বাষট্টি’)। কিন্তু সমাজ কি মেনে নেয় সেই প্রেম? সমাজের নিয়মে এ তো নিষিদ্ধ। তাই কপালে জোটে কলঙ্কের কালি:

নদী সরে গেলে জনপদ জাগে হারায় ঢেউয়ের কলরোল
আমাদের নামে কলঙ্গের ঢিঢি বাজে অস্বস্তির ডামাডোল।
(‘একাত্তর’)

নাইওরে যাওয়া নারীর সঙ্গে চলে কবির নিত্য কথকতা, জাগরণে-নিদ্রায়, প্রকাশ্যে-গোপনে। নাইওরী নানা রূপে হাজির হয় কবির সামনে। পাখি কিংবা ফুলের বেশে, আশা কিংবা হতাশার আবেশে। কখনো সে ব্রীড়াবতী অনিন্দ্য-সুন্দর শ্যামলী, যার চোখ-চুল পিঙ্গল-রূপালি, যার দিকে ব্যাধ সব সময় তীর তাক করে থাকে। ‘কখনো সে মায়ামৃগ বনের সবুজ ঘাস কখনো সে নদী / পথে পথে তার ছড়ানো রয়েছে প্রতিরোধ সমুদ্র অবধি’ (‘বত্রিশ’)। শ্যামলীর প্রশংসা বেজে ওঠে গানে গানে:’ইমন-বেহাগ সুরে সমস্বর গান ধরে টেরাকোটা নারী / শ্যামলীর কথামালা শবরী-চুম্বন যেন কিন্নর-সঞ্চারী’ (‘চুয়ান্ন’)। নাইওর-ভ্রমণ প্রকৃতির সন্নিধানে, গাছগাছালির ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গনে, দেশপ্রেমের উদার প্রান্তরে। ‘শাল সেগুন চম্বল মেহগিনি রঙ্গি যে অর্থে অরণ্য সহোদর জানি / সে অর্থে ছাতিম বট কড়ই অশোক বিশ্বাসে স্বগোত্র নয় ততখানি’ (‘আটান্ন’)। সবুজ ধানক্ষেতও সামিল হয় নাইওরে:

সবুজ ধানের ক্ষেত কলারঙ শাড়ি নাইওর সাম্পানে ভাসে
পৃথিবীর যত সকরুণ গান ভোরের বাতাসে ভেসে আসে।
(‘ষাট’)

কখনো কখনো নাইওরী হয়ে ওঠে কবির কবিতা। কবির বয়ান: ‘শ্যামা তুমি হীরা-মোতি-পান্নায় খচিত / আমার বুকের উষ্ণ কবিতার উত্তাপে রচিত’ (‘বায়ান্ন’)। কবিতা থেকে ঝরে ভালোবাসা: ‘কবিতার স্বপ্ন স্বর্ণ-উপত্যকা সহস্র পংক্তির উপাত্ত-চরণ / ভালোবেসে দিলে মেঘের সঙ্গীত নন্দিত শরণ’ (‘পঞ্চাশ’)। কবিতামগ্ন কবি নাইওরীর দিকে হাত বাড়ান, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। ‘কবিতার দু’হাতে কাচের চুড়ির রিনিক-ঝিনিক বাজে / অপেক্ষায় অভিমানে দিন কেটে যায় স্বপ্নীল খাম্বাজে’ (‘চুয়াল্লিশ’)। কবি তার মায়াবি চোখের গভীরে প্রত্যক্ষ করেন পান্না-মোতি ও মুক্তোর হাসি, তার উথাল-পাতাল বুকে স্বর্ণ-সীতাহার। কবিতা যে রাস্তা দিয়ে হাঁটে তার নাম কবিতা-সরণি, যেখানে কবির সঙ্গে দেখা হয় কবিতার: ‘সড়কের নাম কবিতা-সরণি যে পথে কবিতা হাঁটে একা / যে পথে একান্ত অভিসার কবি-কবিতার নিরিবিলি দেখা’ (‘চুয়াল্লিশ’)। কবিতাই কবিকে আশার বাণী শোনায়:

আশা নিয়ে বুকে অপেক্ষার দিন গোনা
খেয়া পাড়ে ঘর জলের সাম্পানে চ’ড়ে কবিতার নিত্য আনাগোনা।
(‘বাহাত্তর’)

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির স্পর্শ থেকেও নাইওর বঞ্চিত নয়। কবি স্যাটেলাইট ডিজিটালে তাকে প্রেমপত্র পাঠান। যখন ফেসবুক ই-মেইল ইন্টারনেট আইপিতে ব্যস্ত সকলে, নাইওর তখন ‘নেটওয়ার্ক পার হয়ে স্বতন্ত্র ভূখণ্ডে’ (‘সাত’)। আবার সবাই যখন ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত, তখন কবির কিছুই করার নেই, হাহুতাশ করা ছাড়া। কবির মন তখন বিরহকাতর, বেদনাবিধুর:

ফেসবুক স্ট্যাটাসে সবাই রচনা করে সুসংবাদ
আমার তখন বিষণ্ণ সকালে শত বিসম্বাদ।
(‘তেরো’)

ফরিদ আহমদ দুলালের কবিতায় শব্দচয়ন ও উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগে আছে মুন্সিয়ানার ছাপ। ‘আমৃত্যু দু’জন রবো ঘনিষ্ঠ বৃষ্টির মতো কাছে’ (‘তিন’), ‘বেদনাকে পুড়িয়েছো হাপড়-আগুনে’ (‘একান্ন’), ‘অবহেলা-অনুরাগ মুদ্রার দু’পিঠ’ (‘তিপ্পান্ন’) ইত্যাকার শিল্পিত উচ্চারণ তার কাব্যপ্রকাশকে করেছে বর্ণোজ্জ্বল। তার কবিতায় থাকে ‘মৌনতা-সৌরভ’, ‘বৃষ্টিবৃক্ষ’, ‘শিল্পিত নিরালা’, ‘যুবতি রাত’, ‘ব্রাত্যগুল্ম’, ‘বিকেলের নীল খাম’-এর মতো শব্দবন্ধ, যা উচ্চতর নান্দনিক বোধের প্রতীক। ‘রোদের পেছনে পেছনে গোপন ছায়ারা ঘোরে’ (‘নয়’) – সত্যিকারের কবির চোখ ছাড়া এ ধরনের পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়। তিনি অবলীলায় ব্যবহার করেন বাংলা বাগধারা এবং বাক্যকে করে তোলেন সরস চনমনে। যেমন, ‘আড্ডার আসরে উঁচু পর্বতের অবশেষে মুষিক প্রসব’ (‘বিশ’), ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’, ‘বজ্র আটুনি ফস্কা গেরো’ ‘কানাওলা ধরে’ ইত্যাদি তাঁর বাকভঙ্গিকে নিয়ে আসে প্রচলিত আলাপচারিতার কাছাকাছি, অবারিত হাস্যরসের প্রস্রবণ ঘটিয়ে। সহজাত নৈপুণ্যে তিনি চট করে বাংলা শব্দের পাশাপাশি বসিয়ে দেন বিদেশি শব্দ, যেমন- করিডোর, ক্লাইমেক্স, প্রবলেম, গেমওভার, ফ্লাওয়ারভাস, জিকির, শারাবান-ই-তহুরা ইত্যাদি, যা তার কবিতাকে করে মিশ্রমধুর। কখনো কখনো তার শব্দোচ্চার জীবনানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ থেকে অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করে:

হেমন্তে পেকেছে ধান উষ্ণতা সন্ধান শীত রাতে
স্বর্গসুখ ফেলে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছুঁয়ে প্রিয় শ্যামলীর হাত রাখি হাতে।
(‘ঊনপঞ্চাশ’)

পরিশেষে, ফরিদ আহমদ দুলালের নাইওর কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করে আমাদের মনে এই প্রতীতি জন্মায় যে নাইওর আমাদের জীবনযাত্রার প্রতীক, সামগ্রিক মানবীয় অভিজ্ঞতার উদ্ভাসন। আমরা পৃথিবীতে আসি অল্প সময়ের জন্য নাইওরী হয়ে, তারপর আবার ফিরে যেতে হয় পরম পিতার কাছে। ‘তুমি দক্ষিণে নাইওর গেলে বিকেলে শকটে চড়ে / আমার অগস্ত্যযাত্রা হবে চার বেহারার পালকিতে অনন্ত অম্বরে’ (‘দশ’)। সাংসারিক আটপৌরে ঘটনার মধ্য দিয়ে এরকম আধ্যাত্মিক বোধের উন্মোচন কেবল একজন উচ্চমার্গীয় শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব। ফরিদ আহমদ দুলাল একজন বড় শিল্পী, কবিতার দক্ষ কারিগর, যাঁর কবিতা পাঠে আমাদের মনে এক অনির্বচনীয় দিব্য আনন্দের সঞ্চার হয়।

Flag Counter


4 Responses

  1. Mostafa Tofayel says:

    I have not yet read the text of the fresh publication from the pen of Farid Ahmed Dulal .But, from a reading of the splendid critical appreciation done by Dr. Binoy I understand the epic quality of our talented poet, Farid Ahmed Dulal.With the magical power of blending folk with modernist literature, poet Dulal Bhai can present a new creation.

  2. matin bairagi says:

    কবি ফরিদ আহমদ দুলাল-এর সাম্প্রতিক কাব্য ‘নাইওর’ নিয়ে কবি ড. বিনয় বর্মন চমত্কার মনোজ্ঞ আলোচনা করেছেন। লেখাটি সুন্দর সামগ্রিকও বটে। দুজনেই কবি, তাই নাইওর একদিকে যেমন এসময়ের একটি কাব্য লোকজীবনের লোক সংস্কৃতির আবহে বর্তমানকে তুলে আনার, আধুনিকতার রূপবিন্যাস, তেমনি বিনয় তার অন্তরজগতে প্রবেশ করে নির্ণয় করার চেষ্টাটি অব্যাহত রেখেছেন এর গঠন, প্রকৃতি, ভাষায়ন এবং সম্মোহনের দিকটি কাব্যিক গদ্যের আবহে। নাইওর এর ইংরেজি ভার্ষন বেরিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি ভিন্ন ভাষাভাষি কাব্য প্রেমিকেরা তা পছন্দ করবেন। বিনয়কে ধন্যবাদ দেব কেন তা ঠিক নির্ণয় করতে পারি না, কারণ সে কবি, সে একাডেমিশিয়ান, আর এক কবির সৃজনশীলতা পর্যবেক্ষণ ও অন্যকে জানিয়ে দেয়া তার হৃদয়রীতিরই প্রকাশ। তবু তাকে অনেক ধন্যবাদ।

  3. ফরিদ আহমদ দুলাল says:

    ড. বিনয় বর্মন-এর পাঠ আমায় মগ্ধ করেছে। কবিতার গূঢ়ার্থ আবিষ্কারে গভীর মনোযোগ প্রয়োজন, আমাদের যা খুবই অভাব। ড. বিনয়-কবি বিনয় বর্মনকে অভিনন্দন।

  4. tariq says:

    অনেক ভাল লাগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.