কবি রফিক আজাদের মৃত্যু সংবাদ আমাকে স্তব্ধ করে দিল। আমাদের প্রিয় মানুষেরা এত দ্রুত চলে যান কেন? কবি রফিক আজাদকে দেখেছি আমার শৈশবে যখন বাবার হাত ধরে বাংলা একাডেমির সাধারণ সভায় এবং একুশের কবিতা পাঠের আসরে যেতাম। প্রথম তারুণ্যে পড়েছি ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতাটি। কিন্তু আমার কাছে সব সময় অনেক বেশি অসামান্য মনে হয়েছে তার প্রেমের কবিতা। আমি হয়তো মুখস্থ বলতে পারবো ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কিংবা ‘কণ্ঠে তুলে আনতে চাই’-এর সব কবিতা।
বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে তাঁকে পেলাম আমাদের শিক্ষক হিসেবে। সেটা ১৯৯৬ সাল। বিশ শতকের শেষ দশকটি চলছে। আমাদের মতো বেশ কয়েকজন তরুণ লেখকের চোখে দুর্দান্ত সব স্বপ্ন। সেই স্বাপ্নিক অভিযাত্রায় তিনি ছিলেন পথ দেখানো আলো। তিনি আমাকে এবং আমাদের অনেককে শিখিয়েছিলেন স্বপ্ন দেখতে। শিখিয়েছিলেন নিজের স্বপ্নকে ভালোবাসতে। প্রকৃত জৈমিনী হয়ে তিনি আমাদের সামনে খুলে দিয়েছিলেন এক নতুন জগৎ। তবে শুধু স্বপ্ন নয়, কবিতা নয়, তিনি প্রায়ই বলতেন, প্রতিটি শিল্পই রক্ত দাবি করে। দাবি করে সমগ্র জীবন। শিল্পের পথে যারা চলাচল করে তাদের জীবন বড় কষ্টের, বড় যন্ত্রণার। সেই যন্ত্রণার স্বরূপ তিনি দেখিয়েছিলেন। তবে রূঢ়ভাবে নয়, বরং আশ্চর্য মায়ায়।
এখানে একটা ব্যক্তিগত কথা বলি। শৈশবে তিনি ছিলেন আমার কাছে ‘রফিক চাচা’ যেহেতু বাবাকে তিনি ভাই বলতেন। কিন্তু লেখক প্রকল্পে তিনি হয়ে গেলেন ‘রফিক ভাই’। কি অনায়াসে তিনি মুছে ফেললেন বয়সের কাঁটাতার|। কত সহজে, কত অসংকোচে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন, গল্প করতেন তা ভাবলে এখন আমি অবাক হই। তখন কিন্তু সেই বিস্ময়বোধটুকু জাগেনি। কারণ সেটা ছিল এতই অনায়াসলব্ধ যে এর ব্যতিক্রম কিছু হতে পারে তা ভাবনায় আসেনি। তার মতো বিখ্যাত কবি আমাদের মতো তরুণ সদ্য লিখতে শুরু করা, হাঁটি হাঁটি পা ছেলেমেয়ের সঙ্গে এমন সহজে জীবন ও শিল্পের জটিল রহস্যগুলো তুলে ধরতেন যে মনে হতো তিনিও আমাদের বন্ধু। তিনি আমাদের কবিতাবিষয়ক ক্লাস নিতেন। মাঝে মধ্যেই বলতেন, ‘চলো, এখানে না, এখানে বড্ড বেশি ক্লাস আর পড়াশোনার গন্ধ। চলো বরং বটের ছায়ায়।’ সত্যি আমাদের আড্ডা জমতো বাংলা একাডেমির বিখ্যাত বটগাছের ছায়ায়। বাঁধানো বেদীতে বসে। তার কাছে শুনেছিলাম এটাকে নাকি বলা যায় বোধিবৃক্ষ। ঠাট্টা করেই বলতেন অবশ্য। ভীষণ ভালো লাগতো বোধিবৃক্ষের তুলনাটি। আজকাল অনেক বিখ্যাত কবির গেরেমভারি আচরণ দেখে ভয় লাগে। অথচ রফিকভাইয়ের মতো এত বড় কবির আচরণ ছিল কি সহজ। সত্যি কথা হলো, অন্তঃকরণে শিশুর সহজ সারল্য না থাকলে এত বড় হওয়া যায় না। তার কথা উদ্ধৃত করেই বলি আগে মানুষ হিসেবে ভালো হওয়া তারপর তো বড় কবি।
রফিক ভাই ছিলেন আপাদমস্তক কবি। তিনি বেহিসেবী, বেখেয়ালি মানুষ ছিলেন।
তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন বাংলা কবিতার ছন্দ ও ইতিহাস। বলাবাহুল্য মোটেই স্কুল মাস্টারি ভঙ্গিতে নয়, গল্পচ্ছলে। কথায় কথায় তিনি শোনাতেন বিশ্ব কবিতার ইতিহাস। মনে পড়ে বলতেন লোরকা, জীবনানন্দ, এসেনিন আরও অনেকের কথা। একবার তিনি অ্যাক্রসটিক নিয়ে একটি ক্লাস নিলেন। আমি তাকে নিয়ে একটি অ্যাক্রসটিক লিখে তাকে দেখালাম| কবিতার প্রতিটি লাইনের প্রথম অক্ষরগুলো মেলালে হয় ‘কবি রফিক আজাদ’। কবিতাটি তাকেই উৎসর্গ করা। এই ছেলেমানুষী দেখে তিনি হাসলেন।
৯৭’ এর বইমেলায় একটি নীল রঙের টি-শার্টে তার কবিতার লাইন এমব্রোজ করে তাকে উপহার দিয়েছিলাম। রফিক ভাই আবারও মৃদু হেসেছিলেন| আমার খুব ইচ্ছা ছিল সেই টি-শার্টটি তিনি পরুন এবং আমরা ছবি তুলি একসাথে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। এখন বুঝতে পারছি সেরকম হাস্যকর কাজে তিনি রাজি হবেন বা নিজের কবিতা লেখা টি-শার্ট গায়ে পরে ঘুরে বেড়াবেন–এত হালকা রুচির মানুষ তিনি ছিলেন না।
তার সঙ্গে শেষ দেখা হলো ডিসেম্বরে বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায়। লেখক প্রকল্পের অন্য ব্যাচের সতীর্থ মনিরা মিম্মু, রিতা ভৌমিক, ফয়জুল আলম পাপ্পু ছিলেন সেখানে। ছিলেন জুনান নাশিত এবং আরও কয়েকজন। আমরা একসঙ্গে ছবি তোলার সময় কে যেন মন্তব্য করলো, রফিকভাইয়ের চারপাশে নারীরা কেন? আমি বললাম রফিকভাই চিরদিনই নারীদের কাছে প্রিয়। এ কথায় হাসলেন রফিকভাই, তার স্বভাবসিদ্ধ সেই স্নিগ্ধ হাসি।
কবি হিসেবে রফিক আজাদ কেমন ছিলেন, তার লেখার বিশ্লেষণ, বাংলা কবিতায় তার অবদান সেসব করবেন যোগ্যতর লেখকরা, করবেন অজর, অমর অধ্যাপকরা। আমি সামান্য মানুষ। আমি তার অতি অধম শিষ্য। আমি শুধু নিবেদন করতে পারি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।
রফিকভাই, আপনি আপনার আর্কেডিয়াতে চলে গেলেন। মৃত্যু কি তবে অন্ধকার ঘর পেরিয়ে হেঁটে যাওয়া অন্য এক ঘর? মৃত্যু কি অশ্রুর লবণাক্ত সাগরের উপর ভেসে থাকা এক শহরের নাম?
রফিকভাই আমাদের কাছে, আমার কাছে, আপনি মৃত নন। জীবনের তীব্র আলোচনায় আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছেন যেন।
মনে পড়ছে লেখক প্রকল্পের সেই দিনগুলো। প্রাচীন বটের ছায়ায় আপনার সঙ্গে কতদিন কত গল্প, কত কবিতার ঘুম ভাঙানিয়া আলাপন। ‘বালক ভুল ক’রে নেমেছে ভুল জলে!’ আমাদের জীবন তো ভুল জলেই ডুব সাঁতার। এতদিনে আপনি হয়তো খুঁজে পেয়েছেন সেই কাঙ্ক্ষিত জলাশয়। রফিকভাই, আপনার সঙ্গে শেষ দেখা বাংলা একাডেমিতে, সেই বোধিবৃক্ষের ছায়ায়। ‘বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে/ ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে!’ রফিকভাই, এ জন্মে আর ফেরা হবে না, দেখা হবে না, তবে হয়তো আগামী জন্মে আবার দেখা হবে। হবেই।
ভালো থাকুন গুরু, ভালো থাকুন প্রিয় কবি।
সদ্যপ্রয়াত কবি রফিক আজাদ সম্পর্কে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত অন্যান্য প্রতিবেদন ও নিবন্ধ:
দ্রোহের সুরকার প্রেমের শিল্পী
লেখাটি কবিকে ভিন্ন মাত্রায় পরিচয় করিয়ে দেয়। শেয়ার করলাম। অনেক ধন্যবাদ।