প্রবন্ধ, বক্তৃতা, বিশ্বসাহিত্য, সংস্কৃতি

লাতিন আমেরিকার সাথে বাংলার বন্ধন

রাজু আলাউদ্দিন | 7 Mar , 2016  

ambassors.jpgআমি যেহেতু কোনো গবেষক নই, তাই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বাংলাদেশের সাথে লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কটি ঠিক কোন পর্যায়ে আছে। তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে বাঙলা সংস্কৃতির সাথে লাতিন আমেরিকার সম্পর্কের একটা দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। কম করে হলেও এই ইতিহাস একশ বছরের দীর্ঘ পরিসর অর্জন করেছে। এবং এর সূচনা ঘটেছে বাঙালি সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে, স্প্যানিশভাষী জগতে যিনি ‘রবীন্দ্রনাথ তাগোরে’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। দুর্ভাগ্যক্রমে স্প্যানিশ ভাষায় আমাদের অগম্যতার কারণে সম্পর্কের এই দীর্ঘ ইতিহাসটি আমাদের কাছে দীর্ঘদিন যাবত অজানা অবস্থায় ছিল। কিন্তু এখন আমরা জানি যে লাতিন আমেরিকান জনগোষ্ঠীর উদার রুচি, স্নিগ্ধ ও গ্রহিষ্ণু মন কৌতূহলের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আজ থেকে শতবর্ষ আগে। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিশীল ঐশ্বর্যকে তারা যে কৌতূহল থেকে গ্রহণ করেছিলেন লাতিন আমেরিকার কোনো কোনো অঞ্চলে তার সাংস্কৃতিক অভিঘাত ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ প্রবেশ করেন আর্হেন্তিনার লেখক সাংবাদিক কার্লোস মুন্সিও সায়েন্স পেনঞার অনুবাদে ১৯১৫ সালে। এই সূচনা উম্মুক্ত করে দিয়েছিল লাতিন আমেরিকার মহান ব্যক্তিত্বদের সাথে রবীন্দ্রনাথের তথা বাঙালি সংস্কৃতির এক কার্যকর সম্পর্ক। রবীন্দ্রচর্চা, রবীন্দ্র-অনুবাদ বা রবীন্দ্র-আলোচনায় একের পর এক যুক্ত হয়েছিলেন আর্হেন্তিনার ভাবুক ও মন্ত্রী হোয়াকিন ভি গনসালেস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো, কবি এদুয়ার্দো গনসালেস লানুসা, হোর্হে লুইস বোর্হেস, অসবালদো স্ভানাসিনি, রিকার্দো গুইরালদেস, চিত্রশিল্পী ওরাসিও আলবারেস বোয়েরো, চিলির কবি ও শিক্ষাবিদ গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, লেখক অধ্যাপক রাউল রামিরেস, কবি বিসেন্তে উইদোব্রো, কবি পাবলো দে রোকা, কবি ও রাষ্ট্রদূত পাবলো নেরুদা, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক আর্তুরো তররেস রিওসেকো। বলিবিয়ার লেখক ও কূটনীতিবিদ আবেল আলার্কন। পেরুর বামপন্থী চিন্তাবিদ হোসে কার্লোস মারিয়াতেগি ও ঔপন্যাসিক মারিও বার্গাস যোসা। দোমিনিকান রিপারলিক-এর ভাবুক ও প্রাবন্ধিক পেদ্রো এনরিকেস উরেনঞা। আর গোটা মহাদেশের একেবারে উত্তরে অবস্থিত মেহিকোতে লেখক ও দার্শনিক হোসে বাস্কনসেলোস, কবি হোসে গরোস্তিসা ও নাট্যকার সেলেস্তিনো গরোস্তিসা, অকালপ্রায়ত অনুবাদক পেদ্রো রেকেনা লেগাররেতা, এম্মা গদোই, কবি হাইমে সাবিনেস, কবি ও রাষ্ট্রদূত অক্তাবিও পাস, আন্তোনিও কাস্ত্রো লেয়াল, চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিবেরা, গাব্রিয়েল ফের্নান্দেস লেদেসমা ও রবের্তো মন্তেনেগ্রো। এরা সবাই রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির আত্মাকে কেবল স্পর্শই করেননি, সেই স্পর্শের আলো তারা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নিজ নিজ সংস্কৃতির বহুবর্ণিল পরিমন্ডলে।

guest.JPGঅন্যদিকে আমরা বাঙালিরা লাতিন আমেরিকার দিকে কৌতূহলী হতে শুরু করেছি অপেক্ষাকৃত বিলম্বে, তাদের তুলনায় প্রায় অর্ধশতাব্দির ব্যবধানে। কিন্তু দেরিতে হলেও আমরা সময়ের এই দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিতে পেরেছি লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ থেকে অনুবাদ, চর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে। আপনারা হয়তো অবাক হবেন জেনে যে বাংলা ভাষায় এখন লাতিন আমেরিকার প্রায় প্রধান সব লেখকের লেখাই অনূদিত হয়েছে এবং তা ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছে। মেহিকোর মারিয়ানো আসুয়েলা থেকে শুরু করে হুয়ান রুলফো, অক্তাবিও পাস ও কার্লোস ফুয়েন্তেস, নিকারাগুয়ার কবি রুবেন দারিও, এর্নেস্তো কার্দেনাল, সের্হিও রামিরেস, চিলির গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, বিসেন্তে উইদোব্রো, পাবলো নেরুদা, নিকানোর পাররা, পেরুর ইনকা গার্সিলাসো দে লা বেগা, সেসার বাইয়্যেহো, রিকার্দো পালমা, মারিও বার্সাস যোসা, কিউবার হোসে মার্তি, আলেহো কার্পেন্তিয়ের, নিকোলাস গিয়েন, বেনেসুয়েলার রমুলো গাইয়েগোস, ব্রাজিলের জোর্জে আমাদু ও জোসে কার্লোস কাভালকান্তি বোর্জেস, আর্হেন্তিনার হোর্হে লুইস বোর্হেস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো ও হুলিও কর্তাসার, কলোম্বিয়ার গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। এদের প্রত্যেকের প্রধান প্রধান রচনাগুলো বাংলা ভাষায় ইতিমধ্যে অনূদিত হয়ে গেছে। স্মর্তব্য যে এরাই সব নন, আরও অনেকেই আছেন। আশা করি অপূর্ণাঙ্গ এই তালিকা থেকেই এটা স্পষ্ট হবে যে লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতির প্রতি আমাদের সাড়া দেরিতে হলেও তা বিপুল। তাছাড়া আমাদের আগ্রহ আজ কেবল লাতিন আমেরিকান সাহিত্য ও চিত্রকলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, গান ও ফুটবল পর্যন্ত তা বিস্তৃত হয়ে আছে। ভৌগলিক অর্থে আমরা দূরবর্তী হলেও লাতিন আমেরিকান সংস্কৃতি এখন আমাদের আত্মার ঘনিষ্ঠ সহচর। আমরা পরস্পর ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভূখন্ডের হলেও সংস্কৃতি আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আমাদের পরস্পরের মনের গড়ন একই রকম বলেই হয়তো আমরা পরস্পরের এত নিকটবর্তী। আমাদেরকে আপনাদের নিকটবর্তী করেছে আরও একটি ঘটনা। সেটাও এখানে উল্লেখ করা উচিৎ বলে আমি মনে করি।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আপনাদের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ কয়েকজন সন্তান আমাদের প্রতি যে সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশ করেছেন তা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি এই সুযোগে। আর্হেন্তিনার বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বিক্তোরিয়া ওকাম্পো, হোর্হে লুইস বোর্হেস, এর্নেস্তো সাবাতো এবং মেহিকোর বিশ্ববিখ্যাত লেখক ও রাষ্ট্রদূত অক্তাবিও পাস আমাদের সেই দুঃসময়ে সহানুভূতি ও সমর্থন জানিয়ে যে অসামান্য বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই যে সম্পর্কের মূল ভিত্তি তা আপনাদের সংস্কৃতির যেমন মূলমন্ত্র, তেমনিভাবে আমাদেরও। মনে পরছে গার্সিয়া মার্কেসের সেই উক্তি, যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসে বুয়েন্দিয়া পরিবারের নিঃসঙ্গতার মূল কারণ কী। তিনি বলেছিলেন ‘ভালোবাসাহীনতা’। ঠিক একই কথা অন্যভাবে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও: ‘আমরা ভালোবাসি না বলে বুঝি না কিংবা আরও ভালোভাবে বললে দাড়ায় আমরা বুঝি না বলে ভালোবাসি না।’ আমার ধারণা পরস্পরের সাংস্কৃতির প্রতি এই অনুরাগ আমাদেরকে আরও বেশি বুঝতে ও ভালোবাসতে সহযোগিতা করবে। আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

(গত ৫ মার্চে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় লাতিন আমেরিকার ৯টি দেশের রাষ্ট্রদূতদের জন্য নৈশভোজে পঠিত ইংরেজি বক্তৃতার বাংলা তর্জমা।)
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত বাংলাদেশের সাথে লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ক খবরটি পড়তে ক্লিক করুন:A new era of Bangladesh-Latin America bonhomie begins

আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিনের অন্যান্য প্রবন্ধ:
বোর্হেস সাহেব

অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

“একজন তৃতীয় সারির কবি”: রবীন্দ্রকবিতার বোর্হেসকৃত মূল্যায়ন

রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ

কার্লোস ফুয়েন্তেসের মৃত্যু:
সমাহিত দর্পন?

মান্নান সৈয়দ: আমি যার কাননের পাখি

বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আঁদ্রে মালরো

স্পানঞল জগতে রবীন্দ্র প্রসারে হোসে বাসকোনসেলোস

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ:
‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে আমার কয়েক টুকরো স্মৃতি

বনলতা সেনের ‘চোখ’-এ নজরুলের ‘আঁখি’

ন্যানো সাহিত্যতত্ত্ব: একটি ইশতেহার

যোগ্য সম্পাদনা ও প্রকাশনা সৌষ্ঠবে পূর্ণ বুদ্ধাবতার

দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে গানের কথাই বলি

অজ্ঞতার একাকীত্ব ও আমাদের মার্কেস-পাঠ

আবেল আলার্কন: স্পানঞল ভাষায় গীতাঞ্জলির প্রথম অনুবাদক

জামান ভাই, আমাদের ব্যস্ততা, উপেক্ষা ও কদরহীনতাকে ক্ষমা করবেন

এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘দর্পন’-এ বাংলাদেশ ও অন্যান্য

প্রথমার প্রতারণা ও অনুবাদকের জালিয়াতি

আবুল ফজলের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

আবু ইসহাকের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

কুদরত-উল ইসলামের ‘গন্ধলেবুর বাগানে’

মহীউদ্দীনের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

বোর্হেস নিয়ে মান্নান সৈয়দের একটি অপ্রকাশিত লেখা

অকথিত বোর্হেস: একটি তারার তিমির

ধর্মাশ্রয়ী কোপ

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্পর্কে অক্তাবিও পাস

Flag Counter


3 Responses

  1. anisuz zaman says:

    great job!!

  2. মনির ইউসুফ says:

    রাজু ভাই, অনেক ভাল হল- আপনার লেখাটা। লাতিন আমেরিকার শিল্প সাহিত্য নিয়ে -আমি নিজেও কৌতূহলী। ২০১৬ একুশে বইমেলায় আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দু’জন মহান সাহত্যিক নিয়ে আমার একটা প্রবন্ধের বইও বের হয়েছে ‘তীরবিদ্ধ মহাদেশ’ নামে। কেনিয়ার- নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গো ও চিলির প্রতিকবিতার জনক- নিকানোর পাররার কে নিয়ে – লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার সাহিত্য শিল্প সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নিয়ে অালোচনা করেছি। আপনার এই প্রবন্ধ থেকে লাতিন আমেরিকা সমন্ধে আরও অনেককিছু জানলাম। ভবিষ্যৎ তা আমার অনেক কাজে দেবে। আপনার কাছ থেকে আরও তথ্যসহ, লাতিন আমেরিকার শিল্প সাহিত্য- ক্ল্যাসিক বইয়ের অনুবাদ আশা করছি।

  3. saifullah mahmud dulal says:

    রাজু, খুব ভালো লাগলো। খুবই সংক্ষিপ্ত তবু তথ্যবহুল। খুব মজা পেলাম- ‘রবীন্দ্রনাথ তাগোরে’; যাকে কানাডিয়ানেরা বলে, ‘রবীন্ড্রনাথ টেগুর’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.