বই, বইমেলা, বইয়ের আলোচনা

রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি: রবীন্দ্রজীবনের তথ্য ও সত্য

muhit_hasan | 13 Feb , 2016  

jamidargiri.jpgরবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বছরে বছরে বাংলা ভাষায় মোট কয়টি বই প্রকাশিত হয়, সেই হিসাব পাওয়া দুষ্কর। তবে সেসবের মধ্যে মানসম্পন্ন কিংবা ভিন্নতাবাহী বইয়ের সংখ্যা নেহাতই কম― এমন ধারণা কষ্টকল্পিত নয়। তাই রবীন্দ্র-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যতিক্রমী বই পাঠান্তে একইসঙ্গে সমৃদ্ধ ও শাণিত হই। তৃপ্তির সঙ্গে তেমনই একটি বই পড়া গেল সম্প্রতি, কুলদা রায় ও এম আর জালালের লেখা রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি। নামটি সাদামাটা, কিন্তু বইয়ের ভেতরের মালমশলা মোটেও সেরকম নয়―বরং এই বইয়ের উদ্দেশ্য রবীন্দ্রনাথের জীবনপ্রবাহের নানান ঘটনাকে তথ্য ও সত্য উপস্থাপনের মাধ্যমে পাঠকের সামনে স্বচ্ছরূপে তুলে ধরা। এজন্য লেখকদ্বয় গুজব ও রটনার মায়াবী পর্দাকে নিপুণ হাতে সরিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন।

বইটি রচনার প্রেক্ষাপট চটজলদি বুঝে নেবার জন্য এখানে কয়েকটা পুরোনো কথা ফের বলে রাখি। রবীন্দ্রনাথের জমিদার-জীবন নিয়ে অসত্য ও চটকদার তথ্য দিয়ে তাঁকে হেয় করবার চেষ্টা দেশভাগ-উত্তর পূর্ববাংলায় বেশ জোরেশোরেই শুরু হয়েছিল পাকিস্তানি-শাসকযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। পূর্ববাংলা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে, কিন্তু ওই অপপ্রচারকারীদের প্রেতাত্মারা দূর হয়নি। তাদের মিথ্যাভাষণের পরিমাণ স্বাধীনতার পর খানিক স্তিমিত হয় বটে, কিন্তু তারা আবার মহাসমারোহে ফিরে আসে পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের পর। শুধু তাই নয়, তখন কোনো কোনো কথিত ‘প্রগতিশীল’ পণ্ডিত আবার নিজের লুক্কায়িত সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে আড়াল করার জন্য নানান উত্তরাধুনিক ফন্দিফিকিরময় ফালতু তত্ত্বকথা গুলিয়ে ছলে ও কৌশলে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চাইছিলেন রবীন্দ্রনাথ কতই না খারাপ! সেই পাক-আমল থেকে শুরু করে বর্তমানের নানান রবীন্দ্র-বিরোধী অপপ্রচারের সুলুক-সন্ধান ও সেসবের উপযুক্ত এবং বিস্তারিত জবাবমণ্ডিত এক পরিশ্রমী আয়োজন লভ্য বর্তমান বইটিতে।

মোট বারোটি অধ্যায় নিয়ে গঠিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি-র মূল অবয়ব। অধ্যায়গুলোর শিরোনাম নিম্নরূপ : ‘জমিদারগিরিখ-’, ‘প্রজানিপীড়ণখণ্ড’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান খণ্ড’, ‘বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও রবীন্দ্রনাথ’, ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথের পল্লী পুনর্গঠন’, ‘রবীন্দ্র বিরোধিতার স্বরূপ : পাকিস্তান পর্ব’, ‘আমি কোথায় পাব তারে থেকে আমার সোনার বাংলা’, ‘বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা ও রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথ কতটা হিন্দু ছিলেন’, ‘শান্তিনিকেতনের শান্তি রহস্য’ ও ‘হিন্দুমেলা’। আকারেও নেহাত কম নয় বইটি। তাই আপাতত এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করছি।

‘জমিদারগিরিখণ্ড’-এর শুরু ঠাকুরবাড়ির জমিদারির সূত্রপাত ও বিস্তারের বিবরণ দিয়ে। এরপর রবীন্দ্রনাথের পূর্ববঙ্গে আগমণ, সেখানের প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং সংযোগের বৃত্তান্ত বেশ সরসভাবে তুলে ধরা হয়েছে। জমিদার রবীন্দ্রনাথের নানা কর্মকাণ্ডের বিবরণ এর আগে আমরা অমিতাভ চৌধুরীর একটি বইতে বেশ সরসভাবে পেয়েছি। কিন্তু এখানে সেই কাহিনি আরো পূর্ণতর হয়েছে, লেখকেরা অনেকানেক নতুনতর তথ্য ও ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণও তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজের জমিদারীর অধীনে থাকা প্রজাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছেন― এমন উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগ তথা বয়ান যে আদতে নেহাতই সারবত্তাহীন ও কষ্টকল্পিত, তা-ই মূলত যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে ‘প্রজানিপীড়ণখণ্ড’ অধ্যায়ে। নানান ঐতিহাসিক তথ্য বিবেচনা করে লেখকদ্বয় এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, পিতা দেবেন্দ্রনাথের কৃতিত্বপরায়ণ-জমিদার ‘ইমেজ’-টি দূর করে প্রজাহিতৈষী প্রশাসক হিসেবেই নিজেকে গড়ে তুলতে তরুণ জমিদার রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছিলেন। কৃষকদের জমির খাজনা সংক্রান্ত অসহায়তা তিনি যেমন লাঘব করতে চেয়েছিলেন, তেমনি পূর্ববঙ্গের গ্রামদেশে সুপেয় জলের ঘাটতি কেমন করে মেটানো যায়― এ নিয়েও তাঁর ভাবনাচিন্তা নেহায়েত স্বল্প ছিল না।

‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান খণ্ড’ অধ্যায়টি রচনার ক্ষেত্রে লেখকেরা মূলত ভূঁইয়া ইকবালের আকরগ্রন্থ রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ-এর উপর নির্ভর করেছেন মনে হয়েছে(এটা কিন্তু মোটেও দোষের কিছু নয়, এ বিষয়ে আলোকপাতের ক্ষেত্রে উক্ত বইটি যে ভূমিকা পালন করেছে তা শুধু অসামান্য বললেও কম বলা হয়)। উক্ত অধ্যায়ে একাধিক বিশিষ্ট বাঙালি মুসলমান ব্যক্তিত্বের নিকট প্রেরিত রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রের ভাষ্য উপস্থাপন করে তাঁদের সাথে কবির সম্পর্কের গভীরতা ও আন্তরিকতা বিস্তারিতভাবে উন্মোচনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে তৎসংক্রান্ত রবীন্দ্র-রচনার বিশ্লেষণও। পড়শি বাঙালি মুসলমানদের রবীন্দ্রনাথ কীভাবে দেখতেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর পারস্পরিক যোগাযোগটি কেমন ছিল― তা এখান থেকে জানা যাবে, অনেক নেতিবাচক ‘মিথ’-এর ভিত্তিহীনতা সম্পর্কেও অবহিত হওয়া যাবে।

‘বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও রবীন্দ্রনাথ’ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততা ও পরে সেখান থেকে তাঁর নীরবে সরে যাওয়ার প্রসঙ্গটি। বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিক্রিয়া এবং অবস্থান নির্ণয়ের একটা চেষ্টা এখানে লভ্য। তাঁর নানান সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ, সমাজ-শিক্ষা-স্বদেশ-রাজনীতি বিষয়ক রচনা ও মতামতের সাহায্যে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের গোড়ার দিকে সক্রিয় ছিলেন ঠিকই, কিন্তু এ আন্দোলনের সঙ্গে নীতিগত দূরত্ব তৈরি হওয়াতে পরে নিজেকে এ জায়গা হতে সরিয়ে নিয়েছিলেন। এর পরিণতিতে হিন্দু-মুসলমান দুই ভাইয়ের বহুদিনের নিবিড় বন্ধন ছিন্ন হলো, মাঝখান হতে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ পরিপুষ্টি পেয়ে গেলো; তাতে বঙ্গের প্রান্তবাসী মানুষের কী লাভ হল? এ আন্দোলনের প্রতি হতাশ রবীন্দ্রনাথ অবশেষে তো এই প্রশ্নই করেছিলেন! তাই কবির উপলব্ধি দাঁড়ালো এমন “তাঁর স্বদেশ অন্যদের স্বদেশের চেয়ে আলাদা।” ফলে “তিনি তাঁর মতো করে তাঁর স্বদেশের কাছে ফিরে গেলেন― গেলেন পূর্ববঙ্গে, পল্লীপূনর্গঠনে।” এই পূনর্গঠনের কৌতূহলোদ্দীপক আখ্যানই বিবৃত হয়েছে এর পরের অধ্যায় ‘রবীন্দ্রনাথের পল্লী পুনর্গঠন’-এ।

‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন― এমন একটি বহুল প্রচারিত ধারণা যে কতটা শূন্যগর্ভ, তা উপযুক্ত তথ্য প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম আবদুল মতিন একটি বইতে লিখে বসেছিলেন, “ ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কলিকাতা গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়”। কুলদা রায় ও এম আর জালাল যথাযোগ্য মান্যসূত্র ঘেঁটে দেখিয়েছেন, ওই বছরের ২৮শে মার্চ রবীন্দ্রনাথ কলকাতাতেই ছিলেন না। সেদিন তিনি অবস্থান করছিলেন শিলাইদহে! স্রেফ রবীন্দ্রনাথকে খাটো করার উদ্দেশ্যে আবদুল মতিন এমন একটি ডাহা মিথ্যা লিখিত আকারে প্রচার করতে চেয়েছিলেন। ‘রবীন্দ্র বিরোধিতার স্বরূপ : পাকিস্তান পর্ব’ অধ্যায়ে পাকিস্তান আমলে প্রচারিত আরো এমনকিছু রবীন্দ্র-বিরোধী প্রপাগান্ডা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তৎকালীন সাম্প্রদায়িক শাসক-শক্তির ছড়িয়ে দেওয়া নির্লজ্জ মিথ্যার বেসাতির পরিবর্তে উপস্থাপিত হয়েছে প্রকৃত সত্য-সম্বলিত তথ্যাদি। এরপরের অধ্যায়গুলোতে যথাক্রমে আলোচিত হয়েছে ইত্যাকার বিষয় : রবীন্দ্রনাথ ও গগন হরকরার পারস্পরিক যোগাযোগের খতিয়ান, বিশ্বপরিচয় গ্রন্থ সংক্রান্ত বিতর্কের জবাব, তাঁর মানুষভাবনা, পারিবারিক জীবনে রবীন্দ্রনাথের বারংবার আঘাতপ্রাপ্তি এবং যৌবনে হিন্দুমেলার আয়োজনে তাঁর ভূমিকা ।

রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর তর্ক-বিতর্ক কম হয়নি। একটি গণতান্ত্রিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে তর্ক-বিতর্কের ধারা চলমান থাকবে, এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পাকিস্তান আমলে ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যেসব রবীন্দ্র-বিরোধী অপপ্রচার ও কাল্পনিক গল্পগাছাময় প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছিল ও এখনও ছড়ানো হচ্ছে― সেসব কোনোমতেই তর্কের পর্যায়ভুক্ত হতে পারে না, এগুলো নিছকই সাম্প্রদায়িক-ভাবনাদুষ্ট অসুস্থ মিথ্যাচারমাত্র। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বা সমাজভাবনা নিয়ে মত-দ্বিমত থাকতেই পারে, তাঁর কবিতা ঘিরে আবু সয়ীদ আইয়ুব ও শঙ্খ ঘোষের অসাধারণ তর্কাতর্কির কথা আমরা ভুলে যাইনি। রবীন্দ্রনাথের পল্লী-ভাবনা এ যুগের অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমানে কতটা প্রয়োগযোগ্য তা নিয়ে জরুরী বিশ্লেষণ করেছেন প্রাবন্ধিক-অর্থনীতিবিদ সনৎকুমার সাহা। বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে সেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের সাথে দ্বিমতই করেছেন অধিক― তাঁর রচনাটিও সুস্থ তর্কের আভায় উজ্জ্বল। রবি-বিরোধী প্রপাগান্ডা-প্রচারকদের উদ্দেশ্য তো আর সেরকম তর্কসভার আয়োজন করা নয়, তারা রবীন্দ্রনাথকে ঘায়েল করে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণতান্ত্রিক সুস্থতাকেই বিনষ্ট করতে চায়। তাদের ওইসব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কুলদা রায় ও এম আর জালালের বইটি এক অসামান্য ও সুলিখিত প্রতিবাদের উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবেই হবে, এমন আশা করাই যায়।

রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি
লেখক: কুলদা রায় ও এম আর জালাল
প্রকাশক: বিপিএল (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পাবলিশিং লিমিটেড)
প্রচ্ছদ: পিএমজে
টাইপোগ্রাফি: অনিন্দ্য রহমান
মূল্য: ৫০০ টাকা
পৃষ্ঠা: ৫০৩
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী ২০১৫

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে চলমান বইমেলা উপলক্ষ্যে বিশেষ ছাড়ে এ বইসহ বিপিএল-এর অন্যান্য বইও কেনার ‍সুযোগ পাবেন আগ্রহী ক্রেতারা। যারা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে বিপিএল-এর বই কিনতে আগ্রহী তারা এই লিংকটি দেখতে পারেন:http://bpl.bdnews24.com/index.php/

Flag Counter


2 Responses

  1. মন্মথ সাহা says:

    গ্রন্থটির পর্য্যালোচনা পড়ে খুবই উপকৃত হলাম । ভারতে বইটি কীভাবে পাওয়া যেতে পারে?

  2. ভবঘুরে says:

    সংক্ষিপ্ত কিন্তু সারগর্ভ একটি আলোচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.