১৯৫২, বই, বইমেলা, বইয়ের আলোচনা

‘যখন ক্রীতদাস স্মৃতি ’৭১’: দহন ও দ্রোহের অনন্যোপায় প্রকাশ

alat_ehsan | 8 Feb , 2016  

border=0বইটি পড়ে মনে হয়, লেখক নাজিম মাহমুদ এটি মোটেই লিখতে চান নি। কিন্তু সেই সময়ের অবস্থা এমনই ছিল যে, এটা লিখতে বাধ্য হয়েছেন। অনন্যোপায় হয়ে লিখেছেন। প্রচণ্ড অনীহা ও সন্দিগ্ধতার ভেতর দিয়ে লিখেছেন। একজন মানুষের দহন ও দ্রোহের গভীর থেকেই কেবল এই ধরনের স্মৃতি লেখা যায়। আমরা যতটা সহজভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ফ্রেম বন্ধী করি, ব্যাপারটা ঠিক ততটা সহজ কিছু ছিল না। এর এক-একটি মুহূর্ত এক-একটা বছর কিংবা যুগের যন্ত্রণা নিয়ে হাজির হয়েছে কারো জীবনে। হানাদারদের কবল থেকে বাঁচতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়ে একটু দূরের মীরগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছেন লেখকের পরিবার, সেখানেও হানাদারদের উপস্থিতি। তখন বাঁচার তাগিদে গর্তে নেমেছিলেন সপরিবারে। হায়, সেটা বাঁচার জন্য ক্ষণিক আশ্রয় হলেও, ওটা মানুষের মল-মূত্রের ওই ভাগাড়ে এক মুহূর্ত একবছরের চেয়েও দীর্ঘ মনে হবে।

তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময়প্রবাহে অজস্র গলি, রন্ধ্র, চোরাস্রোত, চোরাবালির ফাঁদ আর মহাকালের গহ্বরের মতো অতিকায় ক্ষত ছিল। সেই ক্ষতগুলো, ফাঁকগুলো খুঁজে বের করা দরকার। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একটা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর কিভাবে অজস্র চোরাবালির ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, তার ওপর দিয়ে কিভাবে শ্বাপদরা দাপিয়ে বেড়ায় নাজিম মাহমুদ আমাদের সেই দিকে নজর এনেছেন। এটা কেবল কোনো ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের আত্মকথা নয়, এটা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভেতরের শক্তিকে চিহ্নিত করে, মানুষের যন্ত্রণার অবয়ব তুলে ধরে।

মুক্তিযুদ্ধ যেখানে গৌরবের ইতিহাস, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা কি করে ক্রীতদাসের স্মৃতি হয়? লেখক স্মৃতি শুরু করেছেন, ’৭১-এর ফেব্রুয়ারি থেকে। তখন থেকেই সশস্ত্রযুদ্ধের আবশ্যিকতা পরিস্কার হয়ে গেছে। শুধু নির্বাচন আর ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে কালক্ষেপণ আর ভেতরে ভেতরে গণহত্যার নকশা ও প্রস্তুতি নিচ্ছিল দখলদাররা। তা কিছুটা গুছিয়ে উঠতেই ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় আক্রমণের মধ্যদিয়ে রক্ত-পিয়াসী হয়ে ওঠে ঘাতকের গুলি ও বেয়োনেটগুলো। রাজশাহীতে এই খবর রাষ্ট্র হতে সময় লেগেছিল। একরাতে প্রচণ্ড বিষ্ফোরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারটি গুড়িয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা বুঝিয়ে দিল, বাঙালি জাতিসত্তার মূলস্তম্ভ যে ভাষা, তাকে তারা অস্বীকার করে। বাঙালির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অত বড় বড় ভবন রেখে ওই ‘ক্ষুদ্রাকৃতি’র শহীদ মিনার ভাঙার বিরাট প্রতীকি অর্থ সেদিন পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল। মূলত ’৫২-র আন্দোলনের পর তার ধারাবাহিকতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই সতেজ রেখেছিল এবং তা এই শহীদ মিনার ঘিরেই দানা বাঁধতো। এর বেদিতে দাঁড়িয়েই শপথ নিতো শিক্ষার্থীরা। আসলে ভাষা এমন এক জিনিস যা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু শক্তিশালী। এই আন্দোলনও তাই অনেক বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক। তাই কোনো একটি প্রতীককে ধ্বংস করতে হলে সেটা শহীদ মিনারই হবে। পাকিস্তানিরা সেটাকেই ধ্বংস করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় যে ক্যান্টনমেন্ট হতে যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খালেদ হাসান আগেই এর আঁচ করতে পেরে ২৫ মার্চ রাতেই ক্যাম্পাস ছেড়ে যান। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকাপরা শিক্ষকদের নিয়ে ২৭ মার্চ উপাচার্য যখন প্রথম মিটিংয়ে বসলেন, তখনই লেখক অনুভব করলেন তাদের ক্রীতদাসের জীবন শুরু হতে যাচ্ছে। ‘ভাইস চান্সেলর সমীপে উপস্থিত হয়ে আমরা পরস্পর ঠোঁট নাড়ছি, কিন্তু কারো মুখেই তেমন কোনো কথা নেই। আমাদের সকলের চোখই খোলা, পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছি, কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। নিরীহ শান্ত গোবেচারা সাতেপাঁচে না থাকা ছাপোষা চির অনুগত বশংবদ জীব আমরা তখন শুধু হুকুমের প্রতীক্ষাতুর।’
এই ক্রীতদাসের জীবন তিনি মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই যে তার স্ত্রী, অসুস্থ সন্তান আর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যুবতী শ্যালিকা, তাকে নিয়ে চাইলেই পালিয়ে যেতে পারছিলেন না। তিনি অপেক্ষা করেছেন কেবল। শেষে তারা পালিয়েও ছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা, অর্থ সংকট, সন্তানের জন্য ওসুধপত্র ও খাবার যোগার, অমন ঘোর সংকটের দিনে অন্যদের ঘাড়ের ওপর ভর করা থেকে তাকে সব সময়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য লড়তে হয়েছে। ভাগ্যের বিড়ম্বনা আর উপাচার্যের নির্জলা মিথ্যে প্রচারণায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে বুঝলেন তিনি অনির্দিষ্ট দিনের জন্য ক্রীতদাসের শিকল পায়ে জড়ালেন। ‘দুঃখে ক্ষোভে আমাদের কান্না পাচ্ছে। কি ভুলটাই না করেছি। শেষে কি না এ দেশে ক্রীতদাসের মতো আমাদের বাঁচতে হবে।’ এরপর থেকে সাত মাস দুঃসহ ক্রীতদাসের জীবনই পার করতে হয়েছে তাঁকে। নেহায়েত ক্রীতদাসের জীবন সেটা নয় যে, কষ্টেশিষ্টে দিনগুজার করে দিলেই হলো। বরং সব সময় মাথার ওপর ঝুলেছিল মৃত্যুর খড়গ। নিজের সঙ্গে সঙ্গে বিপন্ন হতে পারে পুরো পরিবার।
কিন্তু এই জীবনের মধ্যেও তার ভেতরে ভেতরে কাজ করেছে বিদ্রোহ, স্রোতের মাঝেই বিরুদ্ধ স্রোত, স্বদেশের মুক্তির জন্য প্রার্থনা। বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা এই বিদ্রোহ, ‘উইশফুল থিংকিং’ তখন দ্রোহের ভারী অস্ত্রের মতোই ভয়ংকর, অবৈধ। যে কারণে সব সময়ই শত্রুর আঘাতের সম্ভাবনা থেকেই যায়। নাজিম হিকমত যেমন লিখেন, ‘ মৃত্যু…/ দড়ির একপ্রান্তে দোদুল্যমান শবদেহ/ আমার কাম্য নয়, সেই মৃত্যু।/ কিন্তু প্রিয়তমা আমার, তুমি জেনো/ জল্লাদের লোমশ হাত/ যদি আমার গলায়/ ফাঁসির দড়ি পরায়/ নাজিমের নীল চোখে ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়।’ (জেলখানার চিঠি)
তখন সব বাঙালি শিক্ষক-কর্মকর্তার চোখেই অবাঙালী ও পাকিস্তানপন্থী শিক্ষকরা খুঁজে ফিরছেন সেই ভয়। লেশমাত্র পেলেই আর রক্ষা নেই। যেমন ভাষা বিভাগের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দারকে পাকিস্তানি সৈন্যদের চিনিয়ে দিয়েছিল তারই দুই সহকর্মী অধ্যাপক। এজন্য তারা গর্বিতও যে, একজন পাকিস্তানবিরোধী ও হিন্দু শিক্ষককে হত্যা করতে পেরেছে। এমনটা ঘটা নাজিম মাহমুদের জন্যও অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। এজন্যই তাকে কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল–ক্রীতদাসের অভিনয়। বাঁচার জন্যই এই কৌশল। কিন্তু জোর করে, টাকা দিয়ে ক্রীতদাসের কাছ থেকে শ্রম-শরীর পাওয়া যায় কিন্তু হাসি-আনুগত্য পাওয়া যায় না। যে তাও বিক্রি করে, সে আর মানুষ থাকে না। রাষ্ট্র বারবারই তার ক্রীতদাসদের সন্দেহ করে, তাকে পরীক্ষা করতে চায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কমে গেছে, কিন্তু যারা আছে তাদের ভেতর রাজনীতি ঘন হয়ে আছে। যেমন সেই পরিস্থিতিতেও একবার হঠাৎ করেই সাচ্চা পাকিস্তানপ্রেমী বোঝানোর জন্য সেদেশের জাতীয় কবি ইকবালের জন্মজয়ন্তি পালনের ধুম পড়ে যায়। এমন কি পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন ‘নামাজ না পড়ে শরীর এলিয়ে পা দুলিয়ে দুলিয়ে সিগারেট ফুঁকলেন এবং ভাইস চ্যান্সেলরও নামাজ না পড়ে’ তাদের সঙ্গে সঙ্গ দিয়ে অধ্যাপকদের উপর্যুপরি নামাজ পড়ে দেখাতে হয়েছে ‘আমরা যে ধর্মপ্রাণ মুসলমান, ইসলাম ধর্মের সাথে যে আমাদের কোনো বিরোধ নেই।’ কি বিসদৃশ পরিস্থিতি। ধর্ম রক্ষা–এই একটি বোল তুলেই সেদিন পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে চেষ্টা করেছে। দেশ-বিদেশে প্রচার করেছে এটা নিছক গৃহদ্বন্দ্ব, মুহূর্তেই ঠিক করে ফেলবো। কিন্তু সেটা ছিল বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। এখনো যখন একই ধোঁয়া তুলে মানুষের বিভেদ তৈরি করে সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদিতাকে জায়েজ করতে চায় কতিপয় মানুষ, এখনো পাকিস্তান রাষ্ট্রের ন্যায্যতা দাবি করে, বোঝা বাকি থাকে না, যুদ্ধ পরিস্থিতি আজও শেষ হয়ে যায়নি। এই বই আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
‘আচ্ছা এখন আপনি যেমন আছেন, মৃত্যু কি তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু?’ লেখকের সাবেক এক সহকর্মী ওমর ফারুকের এই জিজ্ঞাসা দিয়েই সে সময়ের বিভৎসতা বোঝা যায়। এর ভেতরেই নাজিম মাহমুদ তার পরিবার নিয়ে দিনাতিপাত করেছেন। এমন দিনে মস্তিষ্ক ঠিক রাখাও দুষ্কর। উত্তেজনায় ফেটে পড়তে পারে যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ। অধ্যাপক মুজিবুর রহমান যেমন উত্তেজনায় ও প্রতিবাদে কর্ণেলকে চিঠি দিয়েছিলেন। এমনকি হিন্দু নিধনের প্রতিবাদে নিজের নাম বদলে রেখেছিলেন ‘দেবদাস’। এই সাহসী মানুষকে পাকিস্তানিরা নির্যাতন করে শেষ পর্যন্ত পাগলই করে ফেলেছিল। সেদিন অনেক অধ্যাপকে অবলীলায় হত্যা করলেও অধ্যাপক রহমানের সাহসের কাছে বোধ হয় পাকিস্তানিরা হারই মেনেছিল। তাই নির্যাতনই করেছে, হত্যা করতে পারে নি। যদিও সেই নির্যাতন মৃত্যুর চেয়ে অধিক কষ্টদায়ক।
আসলে ‘যখন ক্রীতদাস’ নামের মধ্যে একটা বিদ্রুপ আছে। এই বিদ্রুপ যেমন পাকিস্তানিদের প্রতি, যেখানে তারা ক্রীতদাস মনে করলেও বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়েছে। আবার যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করেও মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে সুবিধা নিচ্ছেন, মিথ্যে সাহসিকতার গল্প ফাঁদছে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বিদ্রোহ নিজের বিরুদ্ধেও। কারণ পুরো জাতি যখন আক্রান্ত হয়, ব্যক্তি মানুষ কোনোভাবেই তার বাইরে থাকতে পারেন না। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধের অমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত অধ্যাপকরাও মুহূর্তেই তাদের নীতি-আদর্শ জলাঞ্জলি দেয়। পাকিস্তানপন্থী এবং অবাঙালি অধ্যাপকরা কিভাবে তাদের নিহত সহকর্মীর বাসা লুট করে নিজের বাসায় তোলে। যুদ্ধ আমাদের অনেক কিছুই শেখায়। কিন্তু শিক্ষক সমাজের এই যে অধঃপতন আমরা মনে হয় এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এমন শিক্ষা এই বইয়ে অনেক আছে।

স্কুল জীবনের এক অবাঙালি পরিবারের কাছে শেখা উর্দু সেদিন নাজিম মাহমুদকে বাঁচতে সহযোগিতা করেছে। তিনি একজন প্রত্যক্ষদর্শীই নন, একটা চরিত্র যেখানে দুঃসহ পরিস্থিতিতে মানুষ নীতি দিয়ে কিভাবে চালিত হতে পারে, তা শেখায়। তিনি ক্রমাগত নিজের গালে চাপড় মেরে নিজের বিবেককে জাগ্রত রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যার দৃশ্য দেখেও যারা সেদিন পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে তাদের নিয়ে আমাদের চূড়ান্ত ভাবনা এখনো বাকি আছে। বইয়ের ছত্রে ছত্রে, বাক্যে বাক্যে ছড়িয়ে আছে কৌতুক। পাকিস্তান রাষ্ট্র ও তার কর্মচারীদের নিয়ে কৌতুক। কখনো কখনো কৌতুক করে নাজিম মাহমুদ গুমোট পরিস্থিতে হালকা হতে চেয়েছেন বটে, কিন্তু তাতেই বেরিয়ে এসেছে পরিস্থিতি কতটা নিঃশ্বাসহীন।
যুদ্ধদিনে পাকিস্তানিদের প্রতারণারও শেষ ছিল না। খুবই সহজ ছিল সেই প্রতারণায় পা দেয়া। একবার যেমন প্রতারণায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে নভেম্বরে লেখক যখন সপরিবারে ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন পাকিস্তানি সৈনিকরা শেষ সময়ের লুটপাটে ব্যস্ত। মানুষের বাড়িতে বন্দুকের গুলি রেখে হলেও ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। তার আগে, আগস্ট-সেপ্টেম্বরের বিশ্বগণমাধ্যমের চাপে হিন্দুনিধন হচ্ছে না দেখাতে পাকিস্তানি সৈন্যের হাতে ধরা পরা এক ছাত্রকে যেমন তারা বাঁচিয়ে রেখেছিল, কুমিরের ছানার মতো সব জায়গায় দেখানোর জন্য, তেমনি হিন্দুদের নদী পার করে ওপাড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে নদীর ঘাটে ডেকে নিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে মারা হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষকে। পাকিস্তানের জিঞ্জির থেকে মুক্তির জন্য সেদিন হিন্দু পরিচয়ে নদী পার হতে গিয়ে মারা পড়েছিল মুসলমানও।
যখন কৃতদাস বইটি লেখা একাধারে সাহসী ও আত্মবিচারী। লেখক বারবারই নিজেকে কিঞ্চিতকর করে তুলে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকেই বড় করতে চেয়েছেন। এই বই লেখার সময় তাকে একটা ধারালো ফলার ওপর দাঁড়িয়ে লিখতে হয়েছে। খুব সম্ভাবনা ছিল পা ফসকে যাওয়ার, হাতে বানিয়ে মুখরোচক গল্প ফাঁদার। তিনি তা করেন নি। হাজার বছরের ধর্মাচারের সঙ্গে যেমন অজস্র কুসংস্কার জড়িয়ে গেছে গভীর বিশ্বাসে, আমাদের দেশের বীরত্বের কাহিনীতে অজস্র মেকি গল্প মিশে গেছে। এইসব ঘটনার সত্যাসত্য বোঝার জন্য নাজিম মাহমুদের এই বই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের কাজ করবে।

নাজিম মাহমুদ তার দেখা পাকিস্তানিদের বর্বরপনা যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি পাকিস্তানি কোনো সৈনিকের সামান্য উপকারও তিনি তুলে ধরতে কার্পণ্য বোধ করেন নি। নিজেকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলার চেষ্টা করেন নি। বইটা লেখার সময় তাকে সব সময় বিশ্বস্ত থাকতে হয়েছে দেখা ও নীতিগত সত্যের প্রতি। তিনি খুব পারতেন অনেক অধ্যাপকের কপট চরিত্র আরো বিভৎসভাবে তুলে ধরতে, তিনি সেদিকে যাননি, সে কারণে বইয়ে ঘটনাগুলোর বিশ্বস্ততা নিয়ে আমাদের ভেতর সন্দেহ তৈরি হয় না।

আজকের দিনে মুক্তিযুদ্ধের কত শত দলীয় ইতিহাস তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সুবিধার জন্য ব্যক্তির প্রশস্তি গাওয়া হচ্ছে। নির্জলা মিথ্যা আর বিকৃতির খপ্পরে পরে গেছে ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কি সেই চেতনা তা পরিষ্কার নয় কারো কারো কাছে। সেই চেতনাকে চিনিয়ে দেয়া ও সুসংহত করার জন্য এই বই গুরুত্বপূর্ণ। বইটি একটা ভ্রমণ। দুঃসহ সময়ে ভ্রমণ। ইতিহাসে ভ্রমণ যে ইতিহাস এখনও চলমান।

যখন ক্রীতদাস
লেখক: নাজিম মাহমুদ
প্রকাশক: বিপিএল (বিডিনিউজ পাবলিশিং লিমিটেড)
প্রকাশকাল: ২০১৫
প্রচ্ছদ: অনিন্দ্য রহমান
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১২৪
মূল্য: ২৯০

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে চলমান বইমেলা উপলক্ষ্যে বিশেষ ছাড়ে এ বইসহ বিপিএল-এর অন্যান্য বইও কেনার ‍সুযোগ পাবেন আগ্রহী ক্রেতারা। যারা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে বিপিএল-এর বই কিনতে আগ্রহী তারা এই লিংকটি দেখতে পারেন:http://bpl.bdnews24.com/index.php/

Flag Counter


1 Response

  1. হাসান শাফিঈ says:

    ‘যখন ক্রীতদাস স্মৃতি ৭১’ নিয়ে নিজের স্মৃতির কথাই ছোট করে লিখছি। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। ওই বয়সেই আমার প্রেম তৈরি হয়ে যায় সিলেবাসের বাইরে থাকা স্তুপ স্তুপ বইয়ের সঙ্গে। বিকাল হলেই আমার ঠিকানা হয়ে উঠে তাই আবাসিক স্কুলের বাউন্ডারির বাইরে অবস্থিত নড়াইলের সরকারি পাবলিক লাইব্রেরীতে। মুখ বুজে কেবল পড়ি। বাংলায় লেখা প্রতিটা বই।…
    একটা পর্যায়ে লাইব্রেরীর দায়িত্বে থাকা এক চাচা (নাম মনে পড়ছে না) আমার প্রতি বিশেষ নজর রাখতে শুরু করলেন। আমি লক্ষ্য করতাম, লাইব্রেরীতে পা রাখলেই তিনি এ বই ওই বই এগিয়ে দিতেন। একদিন এগিয়ে দিলেন একটা বিজ্ঞপ্তি- রচনা প্রতিযোগিতার। বললেন, রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নাও, ভালো লিখলে পুরস্কার পাবে।…
    চাচার কথা মেনে ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নিই আমি। পুরস্কারও পেয়ে যাই। পুরস্কার হিসেবে পাই প্যাকেট মোড়ানো চারটি বই। সেই বইয়ের একটি ছিল নাজিম মাহমুদের ‘যখন ক্রীতদাস স্মৃতি ৭১’।…
    শৈশবের সেই বইটির রিভিউ তাই এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম। তবে মনে প্রশ্ন জাগছে, বইটির প্রকাশকাল হিসেবে ২০১৫ লেখা হয়েছে- এটা কেন? আমার ধারণা, ২০১৫ সালে বইটি কেবল রিপ্রিন্ট হয়েছে… এর বেশি কিছু নয়।
    যারা এই রিভিউ পড়েও বইটি সংগ্রহে আগ্রহী হবেন না তাদের বলছি, বইটি পড়ুন… অসাধারণের চেয়েও বেশি পছন্দ হবে অাপনার…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.