আঁতোয়ান দ্য স্যাঁতেকসুপেরি’র বন্দীকে লেখা চিঠি

আনন্দময়ী মজুমদার | ১৩ জানুয়ারি ২০১৬ ৮:১৫ অপরাহ্ন

আঁতোয়ান দ্য স্যাঁতেকসুপেরি (১৯০০–১৯৪৪) একজন ফরাসি কথাসাহিত্যিক, কবি, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব ও পথিকৃৎ বৈমানিক। ফ্রান্সের কয়েকটি সেরা সাহিত্য পুরস্কার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই ‘ল্য প্যতি প্র্যাঁস’ (‘দ্য লিটল প্রিন্স’), ‘তের দেজোম’ (‘উইন্ড, স্যান্ড অ্যান্ড স্টারস’) ও ‘ভোল দ্য নুই’ (‘নাইট ফ্লাইট’)।

দুঃসাহসী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ছিলেন তিনি; ১৯৩৫ সালে প্যারিস থেকে সায়গনের উড়াল-রেকর্ড ভাঙতে চেষ্টা করেন। কিন্তু লিবিয়ার মরুভূমিতে তাঁর বিমান-দুর্ঘটনা হয়। তিনি ও তাঁর সহ-বৈমানিক মরুভূমিতে পথ হারিয়ে তিনদিন ঘুরে বেড়ানোর পর তাঁদের উদ্ধার করা হয়। ১৯৩৮ সালে আরেকটি বিমান দুর্ঘটনা হয় তাঁর – এইবার নিউ ইয়র্ক থেকে আর্জেন্টিনার তিয়েরা দেল ফুয়েগোতে যাবার সময়ে, গুরুতর আহত হন তিনি। দীর্ঘদিন নিউ ইয়র্কে অচেতন ছিলেন। ৩১ জুলাই ১৯৪৪, ভূমধ্যসাগরের উপর প্যারিস থেকে করসিকা অভিমুখে এক দুঃসাহসী বিমানযাত্রার সময়ে তিনি নিখোঁজ হন – সম্ভবত বিমান-দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। এরপরের বই ‘তের দেজোম’। এটি তাঁকে আকাদেমি ফ্রঁসেজ-এর ‘গ্রঁ প্রি দ্য রমাঁ’ (উপন্যাসের জন্যে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার) ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড এনে দেয়।

একসুপেরির ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ বইটি আড়াইশোর বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এটি সর্বকালে সর্ববহুল বিক্রীত বইয়ের শীর্ষতালিকায় স্থান পেয়েছে। ফ্রান্সে তিনি মরণোত্তর জাতীয় বীরের মর্যাদা পেয়েছেন। নানা ভাষায় তাঁর বইয়ের অনুবাদ তাঁকে আন্তর্জাতিক ভাবে সুপরিচিত করেছে। ফ্রান্সে ও তার বাইরে পাওয়া তার প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি সম্মাননা বিবিধ, বিচিত্র ও বিপুল। ১৯৬০ সালে তাঁর দার্শনিক আত্মস্মৃতি ‘তের দেজোম’-এর নামে (আক্ষরিক অনুবাদে ‘মানুষের ভুবন’) একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নাম রাখা হয়েছে। অন্তত তিনটি মহাদেশে তার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার দার্শনিক প্রবন্ধ ‘বন্দীকে লেখা চিঠ ‘ এই প্রথম বাংলাভাষায় অনূদিত হলো আনন্দময়ী মজুমদারের তর্জমায়।


১৯৪০-এর ডিসেম্বরে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রের পথে পর্তুগাল পার হচ্ছি, তখন লিসবনকে আমার সাক্ষাৎ অমরাবতী বলে বোধ হয় – উজ্জ্বল,অথচ বিষণ্ণ। লোকজন সে-সময়ে পর্তুগালে এক আসন্ন আক্রমণ নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু সে-দেশ তখনো তার সুদিনের মায়াবী কল্পনায় ডুবে আছে। এক অসাধারণ প্রদর্শনী খুলে ব’সে, যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ সন্তানের মায়ের মতো ম্লান হেসে কোনো গাঢ় বিশ্বাস নিয়ে সে বলতে চেষ্টা করে, ‘আমার ছেলে বেঁচে আছে; দেখো, কেমন হাসছি আমি।’ লিসবন সেভাবেই বলতে চাইছে, ‘দেখো, আমি কত সুখী, কত স্থির, কত ঝলমলে!’ অথচ, সমস্ত ইয়োরোপ তখন তাকে পাহাড়ের মতো কোণঠাসা করে আছে, যে-পাহাড়ে হিংস্র জনগোষ্ঠী গিজগিজ করছে। ছুটির মেজাজে ইয়োরোপকে পর্তুগাল যেন তবু বলছে, ‘আমাকে কে আঘাত করবে, যখন লুকানোর কোনো চেষ্টাই আমি করি না! যখন আমি এতটাই অরক্ষিত!’
আমি যেখান থেকে আসছি রাতের বেলায় সেখানকার শহরগুলির রং উনুনের জ্বলন্ত ছাইয়ের মতো। যে-কোনো আলোয় অনভ্যস্ত আমি, তাই রাতের এই ঝলমলে নগর আমাকে কেমন যেন অস্বস্তিতে ফেলে। শহরের যে-অংশে বাতি কম, সেখানে আলোকিত গয়নার দোকানের জানলার সামনে যেমন ফন্দিবাজ লোকজন জটলা পাকায়, সর্বত্র যেমন তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়, তেমনি লিসবনের শিয়রে আমি বাকি ইয়োরোপের ঘনিয়ে-আসা কালরাত্রিকে অনুভব করতে পারি। বোমারু বিমানের ঝাঁক যেন দূর থেকে এক দুর্লভ গুপ্তধন শুঁকে এগিয়ে আসছে।
কিন্তু পর্তুগাল এই দুর্দমনীয় রাক্ষুসে খিদেকে পাত্তা দেয় না। অলক্ষুনে আলামতগুলো সে আমলে নেয় না। বরং এক মরিয়া আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সে শিল্প নিয়ে কথা বলতে থাকে। কে তার সত্তার এই শৈল্পিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে ফেলতে পারে? একে একে দেশটি তার সমস্ত ঐশ্বর্য মেলে ধরে। ইতিহাসের ডালা খুলে সে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বের করে আনে। তার না আছে কামান, না আছে ফৌজ; হানাদারদের লোহালক্কড়ের বিপরীতে সে তার কবি, পরিব্রাজক, বিজয়ী বীরদের পাথরের ভাস্কর্য তুলে ধরে। রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে থাকে পর্তুগালের অতীত ইতিহাস। গৌরবময় অতীতের এই উত্তরাধিকারকে ধ্বংস করবে কোন যুদ্ধবাজ?

……………………………………………………
saint-exupery.jpg

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নিউ ইয়র্কে বসে ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ লেখার দিনগুলিতে, স্যাঁতেকসুপেরির মনকে অধিকার করে রেখেছিল তাঁর মাতৃভূমি ফ্রান্স আর তাঁর বন্ধুরা। তিনি ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ উৎসর্গ করেছিলে ন প্রিয় বন্ধু লেওঁ ভেরৎ-কে। এ বইয়ের মাস দুয়েক আগে ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত ‘বন্দীকে লেখা চিঠি’ লেখা হয়েছে ভেরৎ -এরই উদ্দেশে। স্যাঁতেকসুপেরির আরো তিনটি বইয়েও তাঁর উল্লেখ রয়েছে।
লেওঁ ভেরৎ (১৮৭৮–১৯৫৫) ফরাসি শিল্প-সমালোচক, প্রবন্ধকার, ঔপন্যাসিক – সাম্রাজ্যবাদ, নাৎসিবাদ এবং স্তালিনবাদেরও কট্টর সমালোচক। তাঁর সঙ্গে স্যাঁতেকসুপেরির প্রথম আলাপ ১৯৩১ সালে। বয়েসে দীর্ঘ বাইশ বছরের ব্যবধান সত্ত্বেও এই দুই লেখকের মধ্যে খুব দ্রুতই অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বৈমানিক সহকর্মীদের বাইরে ভেরৎ-ই ছিলেন স্যাঁতেকসুপেরির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
বাইরে থেকে দেখলে দুজনের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। ভেরৎ একে নৈরাজ্যবাদী ইহুদি, তার উপর বামঘেঁষা রাজনৈতিক মানুষ – রীতিমতো সমাজতন্ত্রী। এক কথায় তিনি স্যাঁতেকসুপেরির বিপরীত গড়নের লোক। অথচ তাঁর লেখার সততা আর স্বচ্ছতার, তাঁর গদ্যের সাবলীল ব্যবহারোপযোগিতার অনুরাগী ছিলেন বয়োকনিষ্ঠ লেখকটি। ভেরৎ-এর সাংবাদিকতার প্রশংসা রয়েছে ‘বন্দীকে লেখা চিঠি’তে। কারো কারো মতে, ভেরৎ ছিলেন স্যাঁতেকসুপেরির সাহিত্যিক গুরু।
১৯৪১ সালে নাৎসি-অধিকৃত ফ্রান্স থেকে পালানোর সুযোগ পেয়েও ভেরৎ স্বদেশ ছাড়েননি, অভিবাসী হননি। ইহুদি হিসেবে তাঁকে নাম নিবন্ধন করাতে হয়েছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁকে থাকতে হয়েছে সুইৎজারল্যান্ডের কাছের এক পাহাড়ি গ্রামে, যেখানে তিনি প্রায়শ ‘নিঃসঙ্গ, শীতার্ত আর ক্ষুধার্ত’ থাকতেন। তাঁর স্ত্রী সে-সময়ে প্যারিসে নাৎসি-বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
১৯৪০-এর অক্টোবরে ভেরৎ তাঁর যুদ্ধকালীন দিনলিপি স্যাঁতেকসুপেরির হাতে তুলে দিয়েছিলেন, ফ্রান্স থেকে সেটা পাচার হয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। কথা ছিল, ‘৩৩ দিন’ নামের সেই দিনলিপি ইংরেজি অনুবাদে ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হবে; স্যাঁতেকসুপেরি এর জন্যে একটা মুখবন্ধও লিখেছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে সে বই আর আলোর মুখ দেখবে না বুঝতে পেরে, স্যাঁতেকসুপেরি তাঁর মুখবন্ধটির খোলনলচে পালটে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ হিসেবে সেটি প্রকাশ করেন। ভেরৎ-এর নাম তাঁর নিরাপত্তার খাতিরেই ঊহ্য রাখা হয়। স্যাঁতেকসুপেরির সেই লেখাটিই যুদ্ধের সময় নিয়ে তাঁর দার্শনিক প্রবন্ধ ‘বন্দীকে লেখা চিঠি’।
স্যাঁতেকসুপেরি ‘মুক্ত ফরাসি বিমান বাহিনী’তে যোগ দিয়ে ১৯৪৩ সালের গোড়ার দিকে ফ্রান্স ফিরেছিলেন; তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, ‘যারা দুঃস্থ, ক্ষুধার্ত, তাদের কাছ থেকে আমি দূরে থাকতে পারি না.. আমি কষ্ট পাব বলেই চলে যাচ্ছি, যাদের ভালোবাসি তাদের সঙ্গে একাত্ম হতে চাই বলে।’
১৯৪৪ সালের ৩১ জুলাই স্যাঁতেকসুপেরি বিমানসহ ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ হন; সেই সংবাদ ভেরৎ জানতে পারেন পরের মাসে, এক বেতার ঘোষণায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে লেওঁ ভেরৎ নিজভূমে ফিরে একটি প্রগতিশীল পত্রিকায় লেখালিখি শুরু করেন। তাঁর কথায়, ‘যুদ্ধ-শেষে শান্তি পেয়েছি, কিন্তু তোনিও-র (স্যাঁতেকসুপেরি) অভাবে সে শান্তির মধ্যে পূর্ণতা পাইনি।’ যে বই স্যাঁতেকসুপেরি তাঁকে উৎসর্গ করে যান, সেই ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ ভেরৎ প্রথম চাক্ষুষ করেন স্যাঁতেকসুপেরির মৃত্যুর পাঁচ মাস পরে।
ভেরৎ-এর শরণার্থী জীবনের দিনলিপি ১৯৪৬ সালে বই হয়ে বেরোয়। ‘সাক্ষ্য’ নামের সেই বইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে ছিল স্যাঁতেকসুপেরির প্রসঙ্গ, যা ১৯৪৮ সালে ‘স্যাঁতেকসুপেরিকে যেমন দেখেছি’ নামে একটি আলাদা বই হিসেবে প্রকাশিত হয়।
১৯৫৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্যারিসে লেওঁ ভেরৎ-এর জীবনাবসান হয়।
তাঁর যুদ্ধকালীন দিনলিপি ‘৩৩ দিন’-এর পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গিয়েছিল; অনেক বছর পরে ১৯৯২ সালে এর খোঁজ মেলে। অবশেষে ‘৩৩ দিন’ মূল ফরাসিতে বই হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২০০২ সালে এ বইয়ের একটি ছাত্রপাঠ্য সংস্করণ ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়। লেওঁ ভেরৎ তাঁর স্বদেশেই ১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশক জুড়ে পুনরাবিষ্কৃত হন। ‘৩৩ দিন’ নতুন অনুবাদে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে একেবারে হালে – ২০১৫ সালে।

……………………………………………………

অগত্যা, প্রতি রাতেই, আমি এই প্রদর্শনীর তাকলাগানো সব শিল্পকর্মের ভিড়ের ভিতরে মনমরা হয়ে হেঁটে বেড়াই। এখানকার সব কিছুতেই দারুণ রুচির ছাপ, সব কিছুই নিটোল, এমনকী ওদের আবহসংগীত এমনভাবে বাছাই করা হয়েছে যে, বাগানের ভিতর দিয়ে তা সবার অলক্ষ্যে ঝরনার মতো মৃদু বয়ে যায়। এই অপূর্ব মাত্রাজ্ঞান কি পৃথিবী থেকে নেহাত হারিয়ে যাবে?
স্মিত হাসির আড়ালে লিসবন আমার দেখা যুদ্ধকালীন অনালোকিত শহরগুলির চেয়েও বিষণ্ণ।
অদ্ভুত কিছু পরিবারের কথা আমি জানি, আপনারাও জানেন, যেখানে কোনো মৃত স্বজনের জন্যে টেবিলে জায়গা রেখে দেবার চল আছে। যা ঘটে গেছে, তাকে তারা অস্বীকার করতে চায়। আমার কখনো মনে হয়নি এমন আচরণ কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারে। মৃতদের মৃত বলে জানাই ভালো। এভাবে তারা অন্য এক ধরনের উপস্থিতি লাভ করে। কিন্তু যেসব পরিবারের কথা আমি বললাম, তারা এই ফিরে-আসা ঠেকিয়ে রাখে। মৃতদের নাম তারা চিরদিনের জন্যে নিখোঁজদের তালিকায় তুলে রাখে, যেন এসব অতিথির বরাবর দেরি করে হাজির হওয়াই দস্তুর। শোকের পরিবর্তে তারা এক ফাঁকা প্রত্যাশা লালন করে। আর সেইসব পরিবারের মানুষজন শোকের চেয়েও দমবন্ধ-করা দুর্দশার কবলে পড়ে। যে বন্ধুকে আমি সর্বশেষ হারিয়েছি, সেই বিমান-ডাক সার্ভিসের গিয়োমে, তার জন্যে – হ্যাঁ, তার জন্যেও আমি মেনে নিয়েছি, আমাকে শোক করে যেতে হবে। গিয়োমে-কে শেষবার যেমনটা দেখেছি, তারপর ও আর পাল্টাবে না।১ কখনো ফিরবে না সে, আবার কখনো হারাবে না। আমার খাবার টেবিলে তার জায়গা আমি গুটিয়ে নিয়েছি। অর্থহীন মায়ার বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে আমি তাকে সে যেমন, তেমন ভাবেই দেখছি – একজন মৃত বন্ধু হিসেবে।

অন্যদিকে পর্তুগাল যেন আনন্দকে কিছুতেই কাছছাড়া হতে দেবে না – টেবিলে তার জন্যে বরাদ্দ জায়গাটা রেখে দিয়েছে, তার রোশনাই, তার সুরেলা মজলিশ আঁকড়ে ধরে আছে। লিসবনে সকলেই সুখী হবার ভান করছে, যেন ঈশ্বর স্বয়ং এই পালায় যোগ দেবেন।
লিসবনে বিশেষ কিছু শরণার্থীর উপস্থিতির কারণে ব্যাপারটা আরো শোকাবহ হয়ে উঠেছে। শরণার্থী বলতে আমি সেই সব তাড়া-খাওয়া মানুষদের বোঝাচ্ছি না যারা আশ্রয়প্রত্যাশী, যেসব ভিনদেশী মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আবাদ করবার জন্যে একখণ্ড জমির খোঁজ করছে। বরং আমি সেই সব লোকের কথা বলছি, যারা তাদের টাকাকড়ি নিরাপদ রাখার জন্যে নিকটাত্মীয়দের দুর্দশা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশান্তরী হয়।
শহরে ঠাঁই খুঁজে না পেয়ে আমি এক ক্যাসিনোর কাছাকাছি এস্তোরিলে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলাম। যুদ্ধের ময়দান থেকে সবে ফিরেছি। আমার বিমানবহর একটানা নয় মাস জার্মানির আকাশসীমায় উড়েছে – জার্মানদের মাত্র একবারের আক্রমণেই চার ভাগের তিন ভাগ সহযোদ্ধাকে আমরা হারিয়েছি। দেশে ফিরে,গোলামির গ্লানি আর অনাহারের কবলে পড়েছি। আমাদের শহরগুলিতে নিকষ জমাট অন্ধকার রাত পার করবার অভিজ্ঞতা আমার আছে। সেখান থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরে, এস্তোরিলের ক্যাসিনোতে, রোজ রাতে মজা লুটতে আসে কিছু প্রেতাত্মা। নিঃশব্দ বিলাসবহুল গাড়ি তাদের পৌঁছে দিয়ে যায় ক্যাসিনোর বালি-ভরা উদ্যানে। আরোহীদের পরনে পাটভাঙা জামা, বা হয়তো মুক্তোখচিত কেতাদুরস্ত পোশাক, যেন তারা আগেকার দিনের মতোই কোনো এলাহি নৈশভোজের অতিথি। রোজ রাতে তারা এই মেকি ভোজের আয়োজনে পরস্পরকে ডেকে নেয়, অথচ তাদের নিজেদের বলার মতো কোনো কথা নেই।

এরপর তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী জুয়ো খেলে, তাস পেটায়। আমি মাঝেমধ্যে দেখতে যাই। এদের দেখে আমার রাগ অথবা বিদ্রুপ নয়, কেবল অদ্ভুত এক হতাশা বোধ হয়। যেমনটা চিড়িয়াখানায় লুপ্তপ্রায় কোনো প্রাণীর খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে হওয়া সম্ভব। আশা, হতাশা, শঙ্কা, ঈর্ষা, উল্লাস অনুভব করার চেষ্টায় তারা জুয়োর টেবিলের চারিদিকে ভিড় জমায়। জ্যান্ত মানুষ যেমন করে আর-কী। নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করতে চায় তারা, যদিও সে-ভাগ্যই এখন নিরালম্ব। তারা যে-মুদ্রা ব্যবহার করে, সে-মুদ্রার ব্যবহার হয়তো উঠে গেছে। তাদের সিন্দুকের যাবতীয় সঞ্চয়ই হয়তো দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানের পেটে গেছে, অথবা বোমার আঘাতে এখন ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। তাদের রসিদও যেন অন্য কোনো গ্রহ থেকে কেটে-আনা। অতীতে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালাতে গিয়ে তারা ভান করে, বেশ কিছু মাস যাবৎ গোটা দুনিয়া যে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, এমনটা আদৌ সত্যি নয়; যেন তাদের এই বাজিমাতের উত্তেজনা নেহাত জলজ্যান্ত, যেন তাদের কড়কড়ে চেকগুলি ভাঙিয়ে নেওয়া যাবে, যেন একই রকমের বৈঠকি চালে তারা অনন্তকাল ধরে মিলিত হবে। পুরোটা এক অলীক স্বপ্নের মতো। অথবা পুতুলনাচও হতে পারে। বড়ো বিষণ্ণ ব্যাপার।
হয়তো, কিছুই অনুভব করে না তারা। তাদের হালচাল বোঝার আশা আমি ছেড়ে দিই, বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্যে সমুদ্রের ধারে গিয়ে দাঁড়াই। এস্তোরিলের নিরীহ শান্ত সমুদ্রও যেন এ খেলায় তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তার অবসন্ন ঢেউগুলো সে উপসাগরের দিকে ঠেলে পাঠাতে থাকে। যেন এক বাহারি পুরোনো পোশাক, যার মাটিতে-লুটানো ঝুল চাঁদের আলোয় ঝকমক করছে।
এই শরণার্থীদের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে যাবার পথে স্টিমারে আবার দেখা হয়ে যায়। স্টিমারের ভিতরেও সেই বিষাদের ছায়া। কিছু ভুঁইহীন, শেকড়হীন গাছকে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে চালান দেওয়া হচ্ছে। মনে মনে ভাবি, ‘আমি যাত্রী হতে চাই, কিন্তু কস্মিনকালেও অভিবাসী হতে নয়। ঘরে যা কিছু শিখেছি বাইরে তা আমার কোনোই কাজে আসবে না।’ অথচ এই অভিবাসীরা তখন পকেট থেকে ঝাপসা ঠিকুজির মতো ছোটো নোটবই বের করছে। যেন তারা নামহীন গোত্রহীন নয়; এই সব আনুষ্ঠানিকতার যেন বিন্দুমাত্র মানে আছে। আমি তাদের বলতে শুনি, ‘হ্যাঁ, আমি অমুক, তমুক জায়গা থেকে এসেছি… আমি ক-এর বন্ধু… আপনার সঙ্গে কি গ-এর আলাপ আছে’

তারপর তারা কোনো বন্ধুর গল্প ফেঁদে বসে, নয়তো কোনো দায়দায়িত্বের কথা, কারো কেচ্ছা বা যে-কোনো কাহিনির বয়ান শুরু করে। কিছু-না-কিছুর সঙ্গে তাদের যে যোগাযোগ আছে, সেটাই বোঝাতে। কিন্তু তারা যেহেতু দেশত্যাগী, অতীতের কোনো কিছুই আর তাদের কোনো কাজে লাগবে না। অথচ, সবকিছুরই তখনো কুসুম কুসুম ওম, সব কিছুই টাটকা, ধুকপুকে, প্রেমের উপহার বা স্মৃতিচিহ্নের মতো। ভালোবাসার দু-একটা অভিজ্ঞান যেমন। নিপাট যত্নে বাঁধা। প্রথম প্রথম সেই স্মৃতিচিহ্ন থেকে বিষণ্ণ এক সৌন্দর্য ঠিকরে বেরোয়। তারপর কোনো অপরূপা পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, আর স্মৃতিরাও বোঁটায় ঝরে। এমনই তো ঘটে ছোটোবেলার বন্ধু, দায়দায়িত্ব, নিজের শহর, ভিটেমাটির স্মৃতি – সব ব্যাপারেই। ব্যবহারের অভাবে সব ক্রমশ মলিন হয়ে যেতে থাকে।
লোকগুলো এ-কথা জানে বইকী। ঠিক যেমন লিসবন উৎফুল্ল হবার ভান করে, তেমনি তারাও ভান করে, তারা ঘরে ফিরবে। উড়নচণ্ডী পুত্রের নির্বাসন কতই মধুর! কিন্তু সেটা সত্যিকার নির্বাসন নয়, কারণ জন্মের ভিটে তো দিব্যি টিকে থাকে। পাশের ঘরের মানুষটা, বা পৃথিবীর উল্টো পিঠের কেউ একজন কেউ চলে গেছে – এ ঘটনা তখন কাউকে ভাবায় না। অনেক দূরের বন্ধুকে অনেক সময়ে কাছে পাওয়ার চেয়ে বেশি নিবিড় করে পাওয়া যায়। প্রার্থনার সময়ে যেমন। আমি যখন সাহারায় নির্বাসিত ছিলাম, তেমন করে আর কখনো দেশকে ভালোবাসিনি। বাগদত্ত নারীপুরুষেরা ষোড়শ শতাব্দীতে যেমন ঘনিষ্ঠ ছিল, কখনো আর তেমন হবে না। নাবিকেরা তখন হর্ন অন্তরীপের বলয় আবিস্তার ঘুরে সমুদ্রে এক-পাঁচিল প্রতিকূল বাতাসের সঙ্গে লড়তে লড়তে বুড়ো হতো। তারা যে-মুহূর্তে বেরিয়ে পড়ত, সে-মুহূর্ত থেকেই তাদের ফিরে আসা শুরু। তাদের প্রকাণ্ড হাতে তারা যখন পাল খাটিয়ে নিত, তখনই আদপে তাদের ঘরে ফেরার আয়োজনের শুরু। ব্রেটন বন্দর থেকে দয়িতার বাড়ি পৌঁছনোর সবচেয়ে কাছের পথ পেরোতে হর্ন অন্তরীপ ঘুরেই আসতে হতো।

অথচ, আমার স্টিমারের অভিবাসীরা যেন সেইসব ব্রেটন নাবিকদের মতো, যাদের দয়িতারা লাপাত্তা হয়ে গেছে। কোনো ব্রেটন মেয়ে এখন তাদের কথা ভেবে আর জানলায় পিদিম জ্বালিয়ে রাখে না। উড়নচণ্ডী পুত্ররাও আর নেই; যারা আছে, তাদের ফেরবার মতো ঘর নেই। এই হলো আসল সফর, নিজের অন্তর থেকে বাইরের দিকে যাত্রা।
নিজেকে কীভাবে নতুন করে তৈরি করতে হয়? কীভাবে স্মৃতির জট খুলতে হয়? প্রেতাত্মাবাহী যে-জাহাজে আমি চলেছি, সেটা নরকঘেঁষা আশ্রয়ের মতো, জন্মানোর জন্যে অপেক্ষমাণ আত্মায় ঠাসা। এই জাহাজে যারা বাস্তব, এত বাস্তব যে আঙুলে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে – তারা জাহাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সত্যিকার নৈমিত্তিক দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত – বাসন মাজা, পিতলের তৈজস পালিশ, জুতো ঝাড়া, আর নেহাত নির্লিপ্তি নিয়ে মৃতদের সৎকার। খাটিয়ে লোকের অভিবাসীদের প্রতি অবজ্ঞা তারা গরীব বলে নয়। অভিবাসীদের মধ্যে যে-অভাব তা টাকার নয়, জীবনের গভীরতার। অমুক পরিবার বা তমুক বন্ধুর বাৎসল্যের দাবি তারা আর করতে পারে না। কোনো দায়িত্বের অধিকারে তাদের আর কেউ ফিরিয়ে নেবে না। রঙ্গমঞ্চে তাদের অভিনয় এখন আর বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। তাদের কারুর দরকার নেই। কেউ তাদের কাছ থেকে কিছু আর দাবি করে না। যে-টেলিগ্রাম আমাদের স্বস্তি কেড়ে নেয়, রাতদুপুরে ঘুম থেকে টেনে তোলে, তড়িঘড়ি স্টেশনে ছুটতে বাধ্য করে – সেই টেলিগ্রাম কী জাদুকরি! ‘তোমাকে দরকার। জলদি এসো!’ যে-বন্ধুরা দুঃখের দিনে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে, তাদের খোঁজ আমরা চট করে পেয়ে যাই। কিন্তু আমাদের সাহায্য যারা দাবি করে, তাদের বন্ধু হবার যোগ্য হয়ে উঠতে আমাদের অনেক সময় লাগে। আমার স্টিমারের এই প্রেতাত্মাদের কেউ ঘৃণা, ঈর্ষা অথবা বিরক্ত করে না। একমাত্র যে-ভালোবাসার কোনো মানে আছে, সেরকম ভালোবাসাও তাদের কপালে জোটে না। আমি মনে মনে ভাবি: যে-মুহূর্তে তারা তীরে পৌঁছবে, তাদের কোনো-না-কোনো ধোপদুরস্ত পানীয়-ভোজের আসরে ঝেঁটিয়ে নেওয়া হবে, কোনো নৈশভোজে নিয়ে গিয়ে সান্ত্বনা জানানো হবে। কিন্তু কে তাদের দরজায় করাঘাত করে ঘরে ঢুকতে চাইবে? ‘খোলো! আমি এসেছি!’ বহুদিন বুকে আগলে রাখলে তবেই শিশু তার দাবি আদায় করতে শেখে। তেমনি বহুদিন ধরে বন্ধুত্ব আবাদ করলে তবেই বন্ধু বন্ধুত্বের পাওনাগণ্ডা বুঝে নিতে আসে। বহুদিন যাবৎ নিজের সর্বস্ব উজাড় করে কোনো ফাটলধরা বাড়ি সারাই করলে, তবেই তো তাকে ভালোবাসা যায়।


আমি তাই নিজেকে বলি, ‘মোদ্দা কথা হলো যে-জীবন মানুষ পেরিয়ে এসেছে, তার অভিজ্ঞতা কোথাও-না-কোথাও আদ্যোপান্ত সংরক্ষিত থাকা চাই। আনুষ্ঠানিকতা; পরিবারের পুনর্মিলন; বাস্তুভিটে আর একে ঘিরে মানুষের স্মৃতির সাম্রাজ্য; আসল কথা হলো ফিরে আসার জন্যে বেঁচে থাকা।’ আমার নিজের দ্বিধাদীর্ণ অস্তিত্ব আমাকে তুমুল ভোগাতে থাকে। জীবনে এই প্রথমবার এক সত্যিকারের মরুভূমিতে এসে পড়েছি; অনেক কাল ধরে জীবনের যে-রহস্যের কোনো কূলকিনারা করতে পারিনি, এবার তার নাগাল পাব বলে মনে হয়।
সাহারা মরুভূমিতে আমি তিন বছর ছিলাম। এর ইন্দ্রজাল আমাকে আর সকলেরই মতো স্বপ্নাতুর করে তুলেছিল। সাহারাকে যারা চেনে, তারা জানে, জীবন সেখানে নির্জনতা আর ক্লেশের নামান্তর মাত্র, অথচ তাদের কাছে সেই দিনগুলিই জীবনের সেরা অধ্যায়। ‘বালির জন্যে স্মৃতিকাতরতা’, ‘নির্জনতার জন্যে, অবকাশের জন্যে স্মৃতিকাতরতা’ – এ সবই কতকগুলি পোশাকি শব্দবন্ধ, আদতে যা কিছুই বোঝায় না। এবার, লোকে লোকারণ্য এই স্টিমারে উঠে, এই প্রথমবারের মতো আমার মনে হলো আমি মরুভূমিকে বুঝতে পেরেছি।
এ কথা সত্যি, যত দূর চোখ যায়, সাহারা আদিগন্ত বালির বিস্তার ছাড়া আর কিছুই নয় – যেন এক নুড়ি-বিছানো সৈকত, ব্যতিক্রম বলতে কেবল দু-চারটে বালিয়াড়ি। অনন্ত অবসাদ চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। আর অদৃশ্য দেবতারা সেখানে পথের নিশানা রেখে দেন – এখানে-ওখানে চড়াই, সাংকেতিক চিহ্ন; যেন এক লুকানো, ধুকপুকে পেশিতন্ত্র। একঘেয়েমি কেটে যায়। সবকিছু সেখানে জায়গা করে নেয়। এমনকী এখানকার নৈঃশব্দ্য অন্য সমস্ত নৈঃশব্দ্য থেকে আলাদা।
যখন মরুভূমির জনগোষ্ঠীগুলো শান্ত আর সন্ধেবেলার ঠান্ডা ভাবটা ফিরে আসে, সে-সময়ের এক ধরনের শান্তিময় নৈঃশব্দ্য আছে; যেন কোনো নিঃশব্দ বন্দরে এসে পাল গুটিয়ে নিয়েছে জাহাজ। দুপুরের স্তব্ধতা আরেক রকম, যখন সূর্যের তাপে জীবন চিন্তাশূন্য, গতিহীন। আবার বালিঝড় শুরু হবার আগের এক ধরনের মেকি নৈঃশব্দ্য আছে, যখন উত্তরের লু থেমে যাবার পর পঙ্গপালের দল হামলে পড়ে, পুবের মরূদ্যান থেকে ঝাঁকঝাঁক পরাগবৃষ্টির মতন। আবার ষড়যন্ত্র ঘনিয়ে ওঠার এক ধরনের নৈঃশব্দ্য আছে, যখন জানা যায় দূরের কোনো গোষ্ঠী খেপে উঠেছে। আরবদের দু’পক্ষের দুর্বোধ্য আলোচনা শুরু হবার আগের এক রহস্যময় নৈঃশব্দ্য আছে। আবার মরুভূমিতে যখন দূর-দূরান্তে খবর আনতে গিয়ে কোনো দূত দেরি করে ফেরে, তখনো এক রকম উদ্বেগময় নৈঃশব্দ্য ঘনিয়ে ওঠে। কান খাড়া করে শোনার সময়ে ছুঁচের মতো এক ধরনের নৈঃশব্দ্য টের পাওয়া যায়। ভালোবাসার মানুষকে মনে করার সময়ে এক বিষণ্ণ নৈঃশব্দ্য কানে বাজে।

সব কিছুর মেরুকরণ হয়ে যায়। প্রত্যেক তারা এক নির্দিষ্ট নিশানায় আঙুল উঁচিয়ে আছে। প্রত্যেক তারাই জাদু জানে, যেন তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব দেবতা আছে। কোনো তারা দূরের এক পাতকুয়োর পথ দেখিয়ে দেয়, যেখানে পৌঁছনো কঠিন। এই দূরত্ব দুর্গের মতো পথ আগলে রাখে, তাই একেও মেপে নিতে হয়। আরেক তারা শুকিয়ে-যাওয়া কুয়োর ঠিকানা বাতলে দেয়। সেই তারাকেই তখন খটখটে নীরস বলে মালুম হতে থাকে। এই শুকনো কুয়োতে পৌঁছবার কোনো চড়াই-উৎরাইয়ের উত্তেজনা টের পাওয়া যায় না। আরো এক তারা আছে, যে গোপন মরূদ্যান চেনায়। যে-মরূদ্যানের কথা আমরা বেদুইনদের গানে কখনো শুনেছি, কিন্তু যেখানে পৌঁছতে গেলে বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীর বাধা পেরিয়ে যেতে হবে। সেই ব্যবধানকে তখন সবুজ তৃণভূমির মতো বোধ হতে থাকে। আরেক তারা দক্ষিণের এক জনবসতির দিকে আঙুল তুলে দেখায়, সে-তারা টুসটুসে ফলের মতোই সুস্বাদু। ফের আরেক তারা সমুদ্রের নিশানা দেখায়।
এছাড়া কিছু কাল্পনিক মেরু আছে, যারা দূর থেকে মরুভূমিতে এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি করে: শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি, কোনো পুরোনো বন্ধু, সে যে বেঁচে আছে – এটুকু ছাড়া যার কোনো খবর মেলে না।
কাজেই নিজেকে টানটান এক চৌম্বক ক্ষেত্রের আকর্ষণ-বিকর্ষণের অধীন বলে অনুভব করা যায়। নিজের অবস্থান, অস্তিত্বের ভারকেন্দ্র যেন কম্পাসের এই বিভিন্ন বিন্দু দিয়ে নির্ধারিত হয়ে যায়।
মরুভূমি ধরাছোঁয়া যায় এমন পুরস্কার তো কখনো দেয় না। এখানে না যায় কিছু দেখা, না যায় শোনা, তাই সে-কথা মেনে নিলে, মানুষের অন্তর্জগৎ এখানে কমজোর হবার বদলে মজবুতই হয়। মানুষকে কেউ যে আড়াল থেকে পুতুলের মতো নাচাচ্ছে, সে কথাই প্রমাণ হয়। মানুষের জন্যে আত্মিক আধিপত্যই মূল। মরুভূমিতে মানুষের অন্তরের শক্তির যতটুকু জোর, ততটুকু তার দাম।

সুতরাং এই বিষণ্ণ স্টিমারে ভেসে যেতে যেতে আমি টের পাই, পরিপার্শ্বের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমার যদি এখনো অটুট থেকে থাকে, আমার নিজের জগৎটা যদি এখনো সজীব থেকে থাকে, তার জন্যে দায়ী আমার মৃত বন্ধুরা, যারা ফ্রান্সে নিহত হয়েছে, যাদের উপস্থিতি – আমি ক্রমেই উপলব্ধি করতে পারছি – আমার কাছে অপরিহার্য।
এটা নিশ্চিত, আমার স্বদেশ আমার কাছে কোনো বিমূর্ত ঈশ্বরী অথবা ইতিহাসের পাঠ নয়, বরং জলজ্যান্ত এক বাস্তব, যে-বাস্তবের উপর আমি ষোলো আনা নির্ভর করি; নানা বন্ধনের এক সমন্বয়, যা আমাকে চালিত করে; দুই মেরুর এক সার্বিক আকর্ষণ, যা আমার হৃদয়ের অবয়ব গড়ে দেয়। আমার এখন তাই বিশ্বাস করা প্রয়োজন, পরিপার্শ্বের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্যে যাদের উপর আমি আমি নির্ভর করেছি, তারা আমার চেয়ে ধ্রুব আর দীর্ঘজীবী। এ যেন প্রত্যাবর্তনের ঠিকানা খুঁজে নেওয়া, নিজের সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখা।
এইসব মানুষজনের হৃদয়েই আমার স্বদেশের চিরন্তন আবাস, আর তাদের মধ্য দিয়েই দেশ হয়ে ওঠে আমার নিজেরও সত্তা। যারা সমুদ্র পাড়ি দেয়, তাদের কাছে বাতিঘরের দু-চারটে আলোর সংকেতে মূর্ত হয়ে ওঠে গোটা একটা মহাদেশ। বাতিঘর দূরত্বের কথা বলে না। এর আলোর রশ্মি চোখকে দিশা দেয় – কেবল এটুকুই। অথচ একটা মহাদেশের তাবৎ সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে সেই সামান্য একবিন্দু আলোতে।
আজ তাই, আমার স্বদেশ যখন সম্পূর্ণ অধিকৃত, যখন সে এক আলোহীন মালবাহী জাহাজের মতো নিঃশব্দে পাড়ি দেয়, যখন কেউ জানে না সমুদ্রপথের সমূহ সংকট সে কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা – তখন যাদের আমি ভালোবাসি তাদের প্রত্যেকের ভাগ্য আমাকে তাড়িয়ে ফেরে, দুরারোগ্য ব্যাধির মতো। তাদের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব আমাকে পুরোদস্তুর বিপন্ন করে দেয়।
আজ রাতে যার স্মৃতি ফিরে ফিরে আমার মনে পড়ছে, তার বয়েস পঞ্চাশ। অসুস্থ সে। এবং সে একজন ইহুদি। কী করে সে জার্মানদের নির্যাতন সইবে? সে যে এখনো বেঁচে আছে, এ-কথা বিশ্বাস করতে গেলে আমাকে জোর করে ভেবে নিতে হয় যে, হানাদার বাহিনী এখনো তাকে খুঁজে পায়নি, তার গাঁয়ের কৃষকেরা তাকে নীরবতার নিরেট প্রাচীরের আড়ালে গোপনে লুকিয়ে রেখেছে। শুধু এমনটা চিন্তা করলেই তার বেঁচে থাকার কল্পনা ধোপে টেকে। কেবলমাত্র এই কল্পনার ভিতর দিয়ে তার বন্ধুত্বের সীমানাহীন সাম্রাজ্যে বিচরণ করতে গিয়ে, আমি নিজেকে অভিবাসী হিসেবে নয়, পরিব্রাজক হিসেবে চিনে নিতে পারি। সকলে যেখানে ভাবে, মরুভূমি আসলে সেখানে নেই – আছে অন্য কোথাও। সাহারা যে-কোনো মহানগরীর চেয়ে অনেক বেশি প্রাণোচ্ছল। সবচাইতে জনাকীর্ণ শহরও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে, যদি তার অস্তিত্বের চৌম্বক আবেশ কেড়ে নেওয়া হয়।


বেঁচে থাকার এই চৌম্বকক্ষেত্র জীবন তাহলে তৈরি করে কীভাবে? আমার এই বন্ধুটির ঘরের দিকে আমার যে-টান, তার উৎস কী? কোন ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তার উপস্থিতি আমার জীবনের ধ্রুব মেরুর একটি হয়ে ওঠে? কোন কোন রহস্যময় ঘটনার দৌলতে আমাদের সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে, এবং তার ভিতর দিয়ে আমাদের চেতনায় দেশপ্রেমের জন্ম হয়?
সত্যিকারের অলৌকিক ঘটনা কখনো বলে-কয়ে আসে না। জীবনের সবচেয়ে দুর্মূল্য ঘটনাগুলো সাদা চোখে ধরা পড়ে না। যে-ঘটনার বর্ণনা এখানে দিতে চাই সে-সম্পর্কে বলার কথা এত কম যে, আমাকে স্বপ্নের মধ্যে সেই ঘটনার থই খুঁজে নিয়ে আমার বন্ধুটির কাছে তার বর্ণনা দিতে হয়।
যুদ্ধ শুরু হবার আগের এক দিনের ঘটনা। তুরনুস শহরের অদূরে সাওনে নদীর ধার। দুপুর। নদীর উপর কাঠের ঝুলবারান্দাঅলা এক রেস্তোরাঁ। সাদামাটা কাঠের টেবিলে আমাদের দু’জনের কনুই রাখা। পাশেই খান কতক ছুরি-চামচ। আমাদের সামনে দুই গেলাস দামি মদ। তোমার মদ খাওয়া বারণ, তবে বিশেষ উপলক্ষ থাকলে তুমি ডাক্তারের অবাধ্য হও। সেদিন তেমনই এক উপলক্ষ ছিল হয়তো-বা। কী উপলক্ষ, কে জানে। রোদ-ঝলমল ওই দুপুরে আমাদের মনে এত ফুর্তি কেন, তাও বলা মুশকিল। তুমি দামি মদ আনতে দিয়েছ, যা কিনা উৎসবের দস্তুর। অদূরে বজরার দুই খালাসিকে মাল খালাস করতে দেখে তাদেরও আমন্ত্রণ জানাই আমরা। এবং তারা ইতস্তত না করেই আসে। যেন এহেন আমন্ত্রণ স্বাভাবিক। উৎসবের আমেজের টানে তারাও আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। একত্রে বসে, আমরা পরস্পরের স্বাস্থ্য-কামনা করি।
সূর্যের আলোর ভিতর গা ডুবিয়ে বসে থাকতে আমাদের ভালো লাগে। নদীর উল্টোদিকে আদিগন্ত বিস্তৃত পপলার গাছের সারি, মধুর মতো ঘন আলোয় ডুবে আছে। আমাদের ফুর্তি কী জানি কী কারণে বেড়েই চলে। সব কিছু আমাদের স্বস্থ করে – স্বচ্ছ আলো, নদীর কুলকুল ঢেউ, টেবিলের খাবার, আমাদের দলে ভিড়ে যাওয়া দুই খালাসি, আমাদের পরিবেশন করতে আসা মেয়েটির স্বভাবসুলভ সাবলীলতা – যেন এ-ভোজ চলবে অনন্তকাল। যেন আমরা সভ্যতার সব রোগবালাই থেকে মুক্ত – শান্ত। যেন পরিপূর্ণ, প্রসন্ন আমাদের হৃদয় – যেন কোনো ইচ্ছেই আর অপূর্ণ নেই, পরস্পরকে সম্পূর্ণ চিনলে যেমন আর নতুন করে উন্মোচিত করার মতো কিছু থাকে না। আমাদের সমস্ত সত্তা পরিশুদ্ধ, ঋজু, টানটান, উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ, সহিষ্ণু হয়ে ওঠে। সবকিছুর ভিতর দিয়ে কোন সত্যের উদ্ভাসন ঘটে, আমরা বলতে পারব না। কিন্তু গভীর এক অনুভূতির জন্ম হয়, গর্ব-মাখা এক নিশ্চিন্দির।
আমাদের ভিতর দিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার শুভবোধের প্রমাণ দাখিল করে। যূথবদ্ধ হয় নক্ষত্রবীথি, গ্রহেরা গাঢ় হয়ে আসে, আদিপ্রাণী অ্যামিবার কোষে প্রাণ সঞ্চারিত হয়, এককোষী জীব থেকে শুরু করে মানুষ অব্দি বিবর্তনের চাকা ঘোরে – যাতে সমস্ত কিছু একযোগে, আমাদের ভিতর দিয়ে, আজকের এই আনন্দ-মুহূর্তে এসে ঐকতানে মিলতে পারে! অর্জন হিসেবে এই-বা কম কী?

সুতরাং আমরা এই শব্দহীন কথোপকথন আর এই আপাত-ধর্মীয় রীতিগুলি উপভোগ করি। পরিচারিকার মৃদু চলন আমাদের শান্ত করে; যেন আমরা একই ধর্মে বিশ্বাসী চার হরিহর আত্মা, একত্রে বসে গলা ভেজাই – যদিও সেই ধর্ম যে আদপে কী, আমাদের জানা নেই। খালাসিদের একজন ওলন্দাজ, অন্যজন জার্মান। দ্বিতীয় লোকটির গায়ে সাম্যবাদী, ত্রোৎস্কিপন্থী, ক্যাথলিক অথবা ইহুদির তকমা লাগানো (কোনটা এখন আর মনে নেই), তাকে নাৎসি-হুলিয়া তাড়া করছে। কিন্তু এ-মুহূর্তে তার গায়ে কোনো তকমা আঁটা নেই। খোলসের ভিতরের মানুষটাই আসল। রুটির প্রধান উপাদান এই মানব-খামির। সোজা কথায়, লোকটা আমার বন্ধু। আমরা বন্ধুসুলভ ভাবে একতানে বাঁধা। তুমি, আমি, বজরার দুই খালাসি আর পরিবেশনকারী মেয়েটি – সকলেই। কিন্তু ঠিক কীভাবে আমরা একতানে বাঁধা – মদের গেলাসে? জীবনবোধে? সূর্যের নরম আলোয়? জবাব নেই এ-প্রশ্নের। অথচ সে বন্ধন সমগ্রভাবে ভরাট। বিশেষ কোনো নাম না থাকলেও অগাধ বিশ্বাসে এর শিকড় গাঁথা। এই দেহাতি সরাইখানায় ব্যারিকেড বসিয়ে, যে-কোনো অবরোধ মরণপণ ঠেকাতে প্রস্তুত ছিলাম আমরা।
এসবের মূল উপাদান তাহলে কী?… এখানেই অর্থকে শব্দের ছাঁচে ফেলা বেশ কঠিন। শব্দ বড়োজোর একটা প্রতিবিম্ব তৈরি করতে পারে, কিন্তু তার গহন নির্যাস অধরাই থেকে যায়। অক্ষম শব্দের ফাটল গলে সত্য বেরিয়ে যায়। আমি যদি বলি, আমরা যে-যুদ্ধ করছি তার লক্ষ্য কেবল তোমার-আমার, বজরার খালাসিদের, পরিচারিকা মেয়েটির হাসির সূক্ষ্ম ইঙ্গিতগুলি বজায় রাখা, রোদের আশ্চর্য উদ্ভাসনকে ধরে রাখা, যা কিনা লক্ষ কোটি বছর জুড়ে এত শত ঝক্কি পোহানোর পর – আমাদের মাধ্যমে – এই মুহূর্তবিন্দুতে পৌঁছেছে, তাহলে কথাটা হয়তো নেহাতই রক্ষণশীল শোনাবে।
যা একান্ত অপরিহার্য, তা চিরকালই গহিন। এখানে অপরিহার্য আমাদের সকলের এই হাসি। জীবনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেমন। হাসিই আমাদের মজুরি, আমাদের প্রতিদান, আমাদের চালিকাশক্তি। আবার কিছু হাসি আছে, যা মৃত্যুর পরোয়ানা এনে দেয়। কিন্তু এখন যে-হাসির কথা বলছি, সে-হাসি সমকালীন যন্ত্রণা থেকে আমাদের পুরোপুরি মুক্তি দেয়। আমরা প্রত্যেকে সেই হাসির মধ্যে আশা, ভরসা, শান্তি, নিশ্চিন্দি খুঁজে পাই। কথাটা নেহাত যথাযথভাবে ব্যক্ত করার জন্যে আমাকে অন্য এক হাসি নিয়ে এবার গল্প ফাঁদতে হবে।


আমি তখন স্পেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন লিখছি। একবার রাত তিনটে নাগাদ এক মালের গুদাম থেকে চোরাগোপ্তা মাল বোঝাই করার ঘটনা আমি দেখে ফেলি। মাল-পাচারকারীদের হইহুল্লোড় আর রাতের আঁধারের কারণে আমি নিজেকে আড়ালে রেখেই সব দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কয়েকজন বিদ্রোহী সান্ত্রির নজরে পড়ে যাই।
এর পরের ঘটনা খুব শান্তভাবেই ঘটে যায়। তারা যে গুড়ি মেরে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে আমি তা আঁচ করার আগেই আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, মুঠো-করা আঙুলের মতো। আমাকে রীতিমতো ভড়কে দিয়ে আমার পেটের কাছে তারা বিনাবাক্যবায়ে বন্দুকের নল আলতো ভাবে ছুঁইয়ে দেয়। হাত দুটো উপরে তোলা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না আমার।
আমি লক্ষ করি তাদের নজর আমার মুখের উপর নয়, আমার টাইয়ের দিকে (নৈরাজ্যবাদী-কেতায় এমন নান্দনিক সংযোজনের চল নেই কিনা)। আমার মাংসপেশি টানটান হয়ে ওঠে। এক ঝাঁক গুলির জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি। দ্রুতবিচারে দণ্ড দেওয়াই তো তখনকার দস্তুর। কিন্তু গুলিবর্ষণ হয় না। কয়েক মুহূর্ত চূড়ান্ত অপেক্ষার মধ্যে কাটে। যেন তারা কোনো নৃত্যনাট্যের কুশীলব হয়ে উঠেছে; আমাকে প্রায় দেখা-যায়-না এমন ভঙ্গিতে মাথা হেলিয়ে সামনে এগোবার নির্দেশ দেওয়া হয়। যেন কারো কোনো তাড়া নেই। একটা হাতের মুদ্রাও বাজে খরচ না করে, পিনপতন নীরবতায় আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সমুদ্রের তলার জগৎটা বোধহয় এরকমই।

আমাকে দ্রুত একটা তলকুঠুরিতে ঢোকানো হয়, এ ঘরটায় তারা পাহারা বসিয়েছে। সস্তা কুপির আলোয় রাইফেল দুই হাঁটুর মাঝখানে গুঁজে, সান্ত্রিদের কয়েকজন তখনো ঘুমে ঢুলছে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তাদের সঙ্গে টহলদারদের বাতচিৎ হয়। কেউ একজন আমার খানাতল্লাশি চালায়।
আমি স্প্যানিশ বলতে পারি, কিন্তু ক্যাটালান আমার কাছে দুর্বোধ্য। তাদের হাবভাবে মনে হয়, আমার পরিচয়পত্র দেখতে চাইছে তারা। আমি সেগুলি ভুল করে হোটেলে রেখে এসেছি। দু-এক শব্দে আমার অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করি: ‘হোটেল… সাংবাদিক…’, যদিও আমার জানা নেই এসব ভিনদেশি শব্দ ওরা বুঝতে পারবে কিনা। আমার ক্যামেরা সান্ত্রিদের হাতে হাতে ঘোরে; ওদের ভাবখানা এই, যেন ওটা রাখাই আমার অপরাধ। নড়বড়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙছিল এমন কয়েকটি মূর্তি অলস অবসাদের ভঙ্গিতে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।
এদের দেখে প্রথমেই মনে হয় এরা ভারি ক্লান্ত। অবসন্ন আর ঘুমকাতর। মনোযোগ দেবার মতো অবস্থা এদের নেই। এদের মধ্যে আমি কিছুটা বৈরী ভাব, কিছুটা হলেও মানবিক প্রকাশভঙ্গি দেখলে তবু যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারতাম। কিন্তু তারা রাগারাগি বা গালিগালাজের সামান্য আভাসও দেয় না। বার কয়েক আমি স্প্যানিশে প্রতিবাদ করি। কিন্তু আমার চিৎকার ওরা কানেই তোলে না। মানুষ যেমন একোয়ারিয়ামে নির্বিকার ভঙ্গিতে মাছ দেখে, ঠিক তেমনি এরা আমাকে ভাবলেশহীন লক্ষ করতে থাকে।
তারা অপেক্ষা করছে। কিন্তু কেন? তাদেরই কেউ একজন ফিরে আসবে বলে? নাকি সূর্য ওঠার জন্যে অপেক্ষা? মনে মনে আমি ভাবি: ‘হয়তো এরা খিদে পাবার অপেক্ষায় আছে।’
তারপর আমার মনে হয়: ‘এরা নির্ঘাত হঠকারী কিছু করে বসবে। কী বিশ্রী ব্যাপার!…’ দুশ্চিন্তা নয় – একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটে যেতে পারে, এই ভেবে আমার ভারি বিতৃষ্ণা হতে থাকে। আমি নিজেকে ফের বলি: ‘চলৎশক্তি ফিরে এলে, এরা একটু নড়তে-চড়তে চাইলে, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে গুলি করে মারবে।’
সত্যিই কি আমি বিপদে পড়েছি? কে জানে! আমি যে অন্তর্ঘাতক বা টিকটিকি নই, একজন সাংবাদিক – এ-কথা কি ওরা এখনো বুঝতে পারেনি? ওরা কি বিশ্বাস করতে পারছে না যে, আমার কাগজপত্র সত্যি-সত্যি হোটেলে ফেলে এসেছি আমি? ওরা কি আদৌ আমার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে? কী সেই সিদ্ধান্ত?

আমি এদের সম্পর্কে খুব অল্পই জানি; শুধু জানি, এরা বিবেকের ধার ধারে না, লোকজনকে গুলি করে মারতে এদের হাত কাঁপে না। বিপ্লবী ভ্যানগার্ডরা তো আর মানুষ খোঁজে না (ব্যক্তির প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই), খোঁজে উপসর্গ। বিরোধী সত্য তাদের কাছে মহামারীর মতো মারাত্মক। সে-বালাইয়ের সামান্য লক্ষণ দেখা দিলেই রোগীকে তড়িঘড়ি আলাদা ওয়ার্ডে সরিয়ে নেওয়া হবে। অর্থাৎ গোরস্তানে। আর তার জন্যেই এই জেরা। এদের জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে হ্যাঁ বা না-সূচক এক-অক্ষরের কয়েকটা শব্দ আমার কানে ভেসে আসে – আমি ওসবের মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারি না, তবু সবটা মিলিয়ে ভয়াবহ শোনায়। আমার জীবন নিয়ে এখন জুয়োখেলা চলছে। সেই জন্যেই আমার অস্তিত্ব তাদের সামনে আমি জোরদার ভাবে তুলে ধরতে চাই, চেঁচিয়ে কথা বলতে চাই, যেন তারা বুঝতে পারে আমি রক্তমাংসের মানুষ। ধরা যাক, আমার বয়েস – এই বয়েসই আমি ওদের নজরে আনতে চাই এ-মুহূর্তে। মানুষের বয়েস অন্যের মনে দিব্যি ছাপ ফেলতে পারে। যেন গোটা একটা জীবনের নির্যাস এই বয়েস। বয়েস ব্যাপারটা ধীরেসুস্থে বাড়ে; এর মধ্যে একজন মানুষের একান্ত নিজস্ব পরিণতির ছাপ ধরা থাকে। যে বাধা সে জয় করে এসেছে, তার রক্ত-মাংস-পেশিতে যে বেদনার অভিজ্ঞান, যে কঠিন রোগ থেকে সে মরতে মরতে ফিরে এল, অথবা যে হতাশার মধ্য থেকে তাকে ফের মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়েছে, ঝুঁকি নিতে গিয়ে যে বিপদ সে নিজের জীবনে ডেকে এনেছে – সব ওই একটি সংখ্যার মধ্যে দানা বেঁধে আছে, তার অজান্তে।
কত না স্বপ্ন, বুক-ভরা আশা, কত না খেদ, বিস্মৃতি, ভালোবাসা মিশে আছে সেই সংখ্যার বীজে। মানুষের বয়েসের ভিতর তার অনন্ত অভিজ্ঞতার সম্ভার, অফুরান স্মৃতি! যত চোরাগর্ত আর ফাঁদ, যত ঝড়ঝঞ্ঝা, যত চড়াই-উৎরাই, খানাখন্দ, মজবুত মালগাড়ির মতো সে পেরিয়ে এসেছে। আর তাই, বরাতজোরে তার বয়েস এখন সাঁইত্রিশ। আর ভাগ্য অনুকূলে থাকলে, এই মালগাড়ি তার স্মৃতির ভারকে আরো কিছু দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। সুতরাং, নিজেকে আমি বলি, ‘আমি আজ যে-মুহূর্ত ছুঁয়েছি, সে-মুহূর্তে, আমার বয়েস কানাভরা সাঁইত্রিশ।’ এই স্বীকারোক্তি আমি আমার উপস্থিত হাকিমদের দিতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু তারা তো আমাকে কোনো প্রশ্ন করে না।

অলৌকিক ব্যাপারটা তখনই ঘটে। আবার সাদা চোখে দেখলে, নেহাত মামুলি ব্যাপার। আমার কাছে সিগারেট ছিল না। ওদের একজন তখন সিগারেট ধরিয়েছে; আমি তার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে ইঙ্গিত করি আমাকে একটা সিগারেট দেবার জন্যে। লোকটি প্রথমে হাত-পা ছড়ায়। কপালে একটু আঙুল বুলিয়ে নেয়। চোখ তুলে তাকায় (এবার আর আমার টাই-এর দিকে নয়, সোজা মুখের দিকে) এবং আমাকে হতচকিত করে দিয়ে, সামান্য হাসে। যেন সূর্যোদয় হয়।
এই অলৌকিক ঘটনাটি গল্পের জট ছাড়িয়ে দেয় – একেবারে নিমেষেই। আলো যেমন অন্ধকারকে এক পলকে হটিয়ে দেয়, তেমনি। নাটকীয় কিছু ঘটেনি। এই ঘটনায় চারদিকের দৃশ্যপটে কোনো হেলদোল হয়নি। সস্তা কুপি, কাগজপত্র-ছড়ানো টেবিল, দেয়ালে ঠেস-দেওয়া লোকজন, সবকিছুর গন্ধ, রঙ – সব এক রয়ে গেছে। অথচ এক লহমায় সব কিছুর চেহারা গেছে পাল্টে। ওই হাসি আমার মনে স্বস্তি এনে দেয়। ওটাই সুস্পষ্ট, পাকা ইশারা – সূর্যোদয়ের মত চিরন্তন। যেন এক নতুন যুগের সূচনা। কিছুই বদলায়নি, আবার বদলেছে সব কিছু। কাগজ-ছড়ানো টেবিল জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। কুপির শিখা উজ্জ্বল হয়েছে। দেয়াল প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রাণহীন জিনিসপত্র ছড়ানো এই কুঠুরির জবুথবু ভাবটা মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেছে। যেন ফুসমন্তরে। শরীর জুড়ে যেন এক অদৃশ্য রক্ত-সঞ্চালন শুরু হয়েছে। চারপাশের তাবৎ জিনিস যেন এই শরীরেরই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সব কিছুই নিজস্ব তাৎপর্য ফিরে পেয়েছে।

লোকগুলো নড়েনি; অথচ এক মুহূর্ত আগে যাদের দেখে আমার প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর চেয়েও দূরের বলে মনে হচ্ছিল, তারাই এখন আমার অস্তিত্বের এক অবিচ্ছিন্ন প্রবাহে মিশে যায়। উপস্থিতির এক আশ্চর্য সংবেদন আমি অনুভব করি। উপস্থিতিই আসল! ওই মুহূর্তে আমি তাদের সঙ্গে সেই উপস্থিতির বোধে একাত্ম হই।
যে ছেলেটি একটু আগে হেসেছিল, যাকে দেখে একটা কেজো, কেঠো যন্ত্র অথবা একটা বড়োসড়ো কীট বলে বোধ হচ্ছিল, তাকেই যেন এখন থতোমতো-খাওয়া জড়োসড়ো একজন মানুষ বলে চিনতে পারি। এই লোকটি যে অন্যদের চেয়ে কম নিষ্ঠুর, তা নয়; কিন্তু ওর অন্তর্গত মানুষটার উদ্ঘাটন সব কিছুকে উজ্জ্বল করে তোলে। মানুষ অনেক ভান করতে পারে, কিন্তু আমাদের ভিতরে যে উদ্বেগ, খটকা, অস্থিরতা, এসব অস্বীকার করা যায় না।
তখনো কোনো কথা হয়নি। কিন্তু সব সমস্যা যেন মিটে গেছে। লোকটা আমাকে সিগারেট এগিয়ে দেয় আর আমি তার ঘাড়ে হাত রেখে কৃতজ্ঞতা জানাই। বরফ গলে গিয়ে তখন বাকিরাও রক্তমাংসের মানুষ বনে যায়, এবং তাদের সকলের হাসির মধ্যে আমিও প্রবেশাধিকার পাই। যেন কোনো নতুন, স্বাধীন দেশে ঢোকার অবাধ অনুমতি।
তাদের হাসির মধ্যে আমি যে প্রবেশাধিকার পাই, সাহারা মরুভূমিতে আমি তেমনটা পেয়েছিলাম আমাদের উদ্ধারকারীদের কাছে। যে-বন্ধুরা অনেক তত্ত্বতালাশ চালিয়ে আমাদের খোঁজ পেয়েছিল, যতদূর সম্ভব আমাদের কাছে নেমে, ইশারায় জলের থলেগুলো আমাদের দৃষ্টিগোচর করতে করতে আমাদের দিকে দ্রুত এগিয়ে এসেছিল। নির্বাসিতের কাছে ত্রাণকর্তার হাসি, ত্রাণকর্তার কাছে নির্বাসিতের হাসি – এই হাসির মধ্যেই স্বদেশের সুখস্পর্শ আছে, সেই সুখের স্বাদ আমি পেয়েছি। সত্যিকারের আনন্দ – আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার তৃপ্তি। উদ্ধার পাওয়া তো উপলক্ষ মাত্র। আর মানুষের শুভবোধের প্রস্রবণ থেকে যদি সেই পিপাসা মেটানোর জল না আসত, তবে কি তার এমন সম্মোহন থাকত?
অসুস্থ মানুষের সেবা করা, শরণার্থীদের স্বাগত জানানো, অথবা ক্ষমার মুহূর্তে, হাসির ঔজ্জ্বল্যে এ সবকিছু অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাসির মুহূর্ত আমাদের একাত্ম করে, যে-হাসি ভাষা, জাতপাত বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের দূরত্বকে অনায়াসে ছাড়িয়ে যায়। আমি এবং আমার মানুষেরা – আমাদের তখন ধর্ম এক, সংস্কার এক, অভিরুচিও এক।


আনন্দিত হবার ক্ষমতাই কি আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে মহার্ঘ সম্পদ নয়? একচ্ছত্র স্বৈরশাসনও আমাদের জাগতিক চাহিদা মেটাতে পারে। কিন্তু আমরা তো বলির পাঁঠার মতো মোটাতাগড়া হবার পশু নই। বিত্ত-বৈভব আর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের উপকরণ আমাদের যাবতীয় প্রয়োজন মেটাতে পারে না। আমরা, মানুষের শ্রদ্ধায় যাদের আস্থা রাখতে শেখানো হয়েছে, তাদের কাছে সামান্য সংলাপও গভীর অর্থবহ হতে পারে।
মানবিক শ্রদ্ধাবোধই আমাদের কষ্টিপাথর। একজন নাৎসি যতক্ষণ নিজের মতন যা-কিছু কেবল তাকেই শ্রদ্ধা করে, সে আসলে নিজেকে ছাড়া আর কিছুকে শ্রদ্ধা করে না। বিপরীতকে খারিজ করে দিয়ে মানুষের উত্থানের সমস্ত সম্ভাবনা আর আশাকে সে ধ্বংস করে দেয়, পিঁপড়ের যান্ত্রিকতা মেনে নেয়। নিজেকে এবং জগৎকে আমূল পালটে দেবার ক্ষমতা মানুষের মৌলিক ক্ষমতা – নিয়মসর্বস্বতা এ-ক্ষমতা কেড়ে নেয় । জীবন অনুশাসন তৈরি করে, কিন্তু অনুশাসন জীবন তৈরি করে না।
তবে আমার ধারণা, আমাদের উত্থানের এখনো ঢের বাকি, অতীতের ভুল স্বীকার করে নিয়েই ভবিষ্যতের সত্য বেড়ে ওঠে। আর নিরসনের জন্য যে অপেক্ষমাণ দ্বন্দ্ব, তার মধ্যেই বিকাশের বীজ নিহিত। আমরা তখন ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গেও আত্মীয়তা অনুভব করি। সে এক অদ্ভুত আত্মীয়তা! কারণ তা অতীত নয়, ভবিষ্যৎ-নির্ভর। উৎস নয়, গন্তব্য-নির্ভর। পথে আমরা সকলেই যাত্রী। ভিন্ন পথে হেঁটে শেষে এক মোহনায় মিলব।
আমাদের উত্থানের পূর্বশত যে মানবিক শ্রদ্ধাবোধ, তা-ই আজ হুমকির মুখে। আধুনিক জগতের ভাঙনের শব্দ চারদিকে – আলো নিভে গেছে। আমাদের সমস্যাগুলো খাপছাড়া, সমাধানগুলোও তাই পরস্পরবিরোধী। অতীত-সত্যের মৃত্যু ঘটেছে, ভবিষ্যতের সত্য এখনো নির্মাণাধীন। সমন্বয়ের, মেলবন্ধনের সম্ভাবনা দূরপরাহত; আমাদের প্রত্যেকেরই সম্বল খণ্ডিত সত্য। যে অন্তগর্ত সত্য রাজনৈতিক মতাদর্শগুলোকে প্রশ্নাতীত করে তুলতে পারত, তার অভাবে তাদের সন্ত্রাসের আশ্রয় নিতে হয়। পথের দিশা না থাকায় আমরা বিস্মৃত হই যে, আমাদের গন্তব্য এক।
একজন পরিব্রাজক যখন পাহাড় পেরিয়ে যেতে চায়, চুড়োয় পৌঁছনোর ভাবনায় বিভোর হয়ে তার চোখ তার ধ্রুব নক্ষত্র থেকে সরে যেতে পারে। শুধু কাজসিদ্ধির জন্যে যখন আমরা কাজ করি, তখন কোথাও ঠিক পৌঁছতে পারি না। গির্জার খাদেম চেয়ার সাজানোর প্রবল উৎসাহে ভুলে যেতে পারেন যে, তিনি ঈশ্বরের সেবক। একই ভাবে, দলীয় রাজনীতির প্রবল উদ্দীপনায় ডুবে গিয়ে আমরা ভুলে যাই যে, কোনো আত্মিক সত্যের দিকে না পৌঁছতে পারলে রাজনীতি অর্থহীন। কোনো কোনো বিরল মুহূর্তে মানবিক আত্মীয়তার যে স্বাদ আমরা পাই, সেখানেই তো সত্যের অধিষ্ঠান।
কাজের তলব যত জরুরিই হোক না কেন, সে-কাজের যথাযথ প্রণোদনার কথা ভুলে বসলে সবকিছুই বিফলে যাবে। আমাদের লক্ষ্য মানবিক সত্য প্রতিষ্ঠা করা। একই শিবিরের লোক হয়েও আমাদের মধ্যে তবে আড়াআড়ি সম্পর্ক কেন? শুভবোধের উপর নিশ্চয়ই কারুর একচেটিয়া অধিকার নেই। অন্য কারুর বেছে-নেওয়া পথের চাইতে আমার পথটাই যে ভালো, এ নিয়ে আমি তর্কাতর্কি জুড়ে দিতে পারি। আমি তার যুক্তির সমালোচনা করতে পারি – মানুষের যুক্তিবোধ তেমন নিশ্চিত কিছু তো নয়। কিন্তু যদি সেই মানুষটার পথচলা হয় একই নক্ষত্রের অভিমুখেকে, তার অন্তরতম সত্তাকে শ্রদ্ধা করা ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না।
এমন শ্রদ্ধা মানুষের হৃদয় থেকে যখন জন্ম নেয়, তখন যে-ব্যবস্থা এই শ্রদ্ধাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে, তেমন আর্থসামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষ শেষপর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করবেই। সভ্যতার পত্তন হয় প্রথমত বাইরের অবয়বে, কোনো এক বিশেষ উষ্ণতার অন্ধ আকাঙ্ক্ষায়। পায়ে পায়ে ভ্রান্তি মাড়িয়ে তবেই কাঙ্ক্ষিত আগুনের কাছে পৌঁছনোর পথ খুঁজে পাই আমরা।


আর ঠিক এই কারণে, বন্ধু, তোমার বন্ধুত্ব আমার এত প্রয়োজন। এমন একজন সঙ্গী আমার দরকার,যে কিনা যুক্তিতর্কের কসরতের বাইরে দাঁড়িয়ে এই আগুনের পথে আমাকে চিনে নেবে। সেই প্রতিশ্রুত আগুনের উষ্ণতায় মাঝেমাঝে একটু আগেভাগে ওম নেওয়া জরুরি। নিজের বাইরে এসে, ভবিষ্যতের সেই সম্মিলিত সাক্ষাতের জায়গায় কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া জরুরি।
আমি বাদানুবাদ, একগুঁয়েমি আর উগ্র অযৌক্তিক উন্মাদনা দেখে দেখে ক্লান্ত। তোমার ঘরে আমাকে উর্দি পরে, মন্ত্র আউড়ে ঢুকতে হয় না, আমার অন্তরের মাতৃভূমিকে ছেড়ে আসতে হয় না। তোমার কাছে আমার কৈফিয়ত দিতে হয় না, অজুহাত দেখাতে হয় না, নিজের সপক্ষে প্রমাণ দাখিল করতে হয় না। তুরনুস-এ কাটানো সেই দিনটার মতো, আমি তোমার কাছে এসে শান্তি খুঁজে পাই। অবান্তর আলাপ, মনভোলানো তর্ক – সব ছাড়িয়ে তুমি আমাকে মানুষ হিসেবে চিনতে পারো। তোমার কাছে আমার সমাদর প্রীতি, আস্থা আর ঐতিহ্যের বার্তাবাহক হিসেবে। তোমার সঙ্গে আমার মতের অমিল হতে পারে, কিন্তু তোমাকে আমি অন্যায় দোষারোপ করি না, বরং তোমার মতের সঙ্গে নতুন কিছু যোগ করি। তুমিও জেরা করো আমাকে, ঘরে-ফেরা পরিব্রাজককে যেমন প্রশ্ন করে মানুষ।
স্বীকৃতি পাবার সহজাত তাগিদ থেকে, আমি তোমার কাছে পরিশুদ্ধ হতে আসি। আমার কথা আর কাজের মধ্য দিয়ে তুমি যে আমাকে চিনেছ, তা তো নয়। আমাকে সম্পূর্ণ মেনে নিয়েছ বলেই আমার কথা আর কাজকে তুমি প্রশ্রয় দাও। তুমি আমাকে যেমন দেখেছ, তেমন করে মেনে নিয়েছ। আমি কৃতজ্ঞ। যে-বন্ধু আমার বিচার করতে বসে, তাকে দিয়ে আমার কী কাজ? আমার ঘরে যদি একজন পঙ্গু লোক আসে, তবে আমি তাকে বসতে বলি, নাচতে বলি না।
তোমাকে আমার দরকার অবাধ নিঃশ্বাস নেবার সবুজ টিলার মতন। তোমার পাশে আবার বসতে হবে আমাকে, সাওনে নদীর ধারে, এক নড়বড়ে রেস্তোরাঁর ঝুলবারান্দায় – যেখানে বজরার দুই খালাসিকে আমরা আমন্ত্রণ জানাতে পারব, শান্ত প্রসন্ন কোনো উৎসবে।

এখনো যদি এই যুদ্ধে আমাকে লড়তে হয়, তবে আমি লড়তে চাই কিছুটা তোমার জন্যেও। ওই অমলিন হাসির অটুট ভবিষ্যতে আস্থা রাখার জন্যে আমার যে তোমাকে খুব প্রয়োজন! প্রয়োজন তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার। তোমাকে দেখতে পাই – দুর্বল, হুমকির মুখে সন্ত্রস্ত, পঞ্চাশ বছরের দুর্বহ ভার কত দীর্ঘ সময় ধরে তুমি মুদিখানার বাইরে টেনে আনো, এক ছেঁড়াখোঁড়া পাতলা আলোয়ানে জড়ানো তোমার শীতার্ত শরীর, মাত্র আর দু-একটা দিন বাঁচার আশায়। তুমি এতটা ফরাসি বলেই ফরাসি আর ইহুদি দুই পরিচয়েই ধরা পড়ার ঝুঁকি তোমার। যারা কোন্দলে জড়ায় না, তাদের আমি কী দারুণ শ্রদ্ধা করি। আমরা সবাই ফ্রান্সেরই সন্তান, একই বৃক্ষের শাখাপ্রশাখা। আমি তাই তোমার সত্যের সপক্ষে দাঁড়াতে চাই, যেমন তুমি আমার সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছ।
আমরা, যেসব ফরাসি ফ্রান্সের বাইরে আছি, এই যুদ্ধে জার্মান দখলদারির হিমে জমে-যাওয়া তাবৎ বীজ-কে মুক্ত করে দেওয়ার পথ খুঁজে নিতে হবে আমাদের। যারা বেঁচে আছে, তাদের উদ্ধারেরই-বা পথ কী? যে-মাতৃভূমিতে শিকড় ছড়ানো তোমার মৌলিক অধিকার, সেই মাটিতে তোমাকে মুক্তি দেবার কী উপায়? তোমরা সেখানে চার কোটি অবরুদ্ধ বন্দী মানুষ। নিপীড়নের গুহায় তৈরি হয় নতুন সত্য – চার কোটি জিন্মি আজ তাদের এই নতুন সত্যের ভাবনায় অধীর। আমরা বাকিরা সেই সত্যের কাছেই সমর্পিত।
তোমাদের কাছেই আমরা শিখব আজ। তোমরা, যারা মোমের মতো সমস্ত সত্তা দিয়ে আত্মার অনির্বাণ শিখা ধারণ করে আছ, তাদের আমরা কোন আগুন দিতে পারি? আমরা যেসব বইপত্র লিখব, সেগুলো কি তোমরা আদৌ পড়বে? আমরা যে বক্তৃতা দেব, তা কি তোমরা শুনবে? বরং আমাদের চিন্তাকেই হয়তো উগরে বের করে দেবে। ফ্রান্সকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ আমরা করছি না। আমরা শুধু তার সেবা করতে পারি। আমরা যা-ই করি না কেন, কৃতজ্ঞতা পাবার অধিকার আমাদের থাকে না। সৈনিক আর জিম্মির মধ্যে কোনো সাধারণ মাটি নেই। কেবল তোমরাই পবিত্র মানুষ।
(‘বন্দীকে লেখা চিঠি’ সমাপ্ত, এই বইমেলায় লেখাটি প্রকৃতি পরিচয় প্রকাশনী থেকে ছোট্ট রাজপুত্র গ্রন্থের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হবে)

টীকা ১ :

স্যাঁতেকসুপেরির খুব কাছের বন্ধু এবং উত্তর ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘লাতেকোয়েরে’ কোম্পানিতে তাঁর সহকর্মী আঁরি গিয়োমে, ১৯৪০ সালের শেষদিকে এক বিমান-হামলায় নিহত হন। ইতালীয় বৈমানিক তাঁর বিমানটিকে ভুলবশত ব্রিটিশ বিমান বলে ধরে নিয়েছিল। একসুপেরি কিছু দিন পরে লিখেছিলেন: ‘অভিযোগ আমি করছি না। মৃত মানুষদের জন্যে কখনো আমি করুণা অনুভব করতে শিখিনি।’
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tokon Thaakoor — জানুয়ারি ১৪, ২০১৬ @ ৭:৩৫ অপরাহ্ন

      অানন্দময়ী মজুমদার। সেই ‘প্রাকৃত’তে পেয়েছিলাম। এরপর, বহুকাল পরে ফের তাকে পড়ার সুযোগ মিলল…অামার জন্যে অানন্দময়

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Debashish Goswami — জানুয়ারি ১৫, ২০১৬ @ ৫:৩৯ অপরাহ্ন

      লেখাটি লেখিকাকে চেনার সুবাদে আগেই পড়বার সুযোগ হয়েছিল। আবার লিংকটি পেয়ে পড়লাম। সাবলীল সুন্দর অনুবাদ। মুগ্ধতা জানাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অানন্দময়ী মজুমদার — জানুয়ারি ১৬, ২০১৬ @ ১০:৩২ পূর্বাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com