প্রবন্ধ, বইয়ের আলোচনা

মার্জিনে মন্তব্য: বই হয়ে-ওঠার বহির্বাস্তব ইতিহাস

আহমাদ মাযহার | 26 Dec , 2015  

samsul-haque_90797.jpgউনিশশো উনআশি কি আশি সাল। সৈয়দ শামসুল হক দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরেছেন। নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর বর্ণাঢ্য উপস্থিতি। তরুণদের কাছে তিনি তখন দূর আকাশের ধ্রুবতারা। ব্যক্তিত্বে একধরনের চৌকস উজ্জ্বলতা। পাশ্চাত্যের কায়দাকানুন তিনি অর্জন করেছেন সেখানে কিছুকাল জীবন যাপন করে। এদিকে আমাদের তরুণ লেখকেরা অধিকাংশই তখন পাশ্চাত্য ভাবধারায় বিমুগ্ধ! সেখানে সৈয়দ শামসুল হক পাশ্চাত্য আধুনিকতার মূর্তিমান ধারক। লেখক হবার যাত্রাপথে এমন মানুষই তো তারুণ্যের অনুসরণীয়। তিনি একই সঙ্গে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার। যা-ই লেখেন তা-ই সোনা! লেখক হিসেবে যেমন অগ্রগণ্য তেমনই বহুপ্রজ! অথচ তরুণ লেখক মহলে তখন এমন মন্ত্রের উচ্চকিত উচ্চারণ যে, বেশি লেখা লেখকের অননুকূল। সৈয়দ শামসুল হক এমন উচ্চারণকর্তাদের কাছেও ব্যতিক্রম বিবেচিত। সুতরাং যে পত্রিকাতেই তাঁর লেখার প্রকাশ অবধারিতভাবে সেটার খোঁজ চলে আমাদের। এমনি পরিস্থিতিতে শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ধারাবাহিক ‘মার্জিনে মন্তব্য’ নামে একটি কলাম।
কলামের নামটি আমার মনোযোগ কাড়ল। পড়তে শুরু করলাম একের পর এক পর্ব। পড়ি আর লেখালিখির কলাকৌশল নিয়ে ভাবি। একেকটা পর্ব পড়ি আর তার মর্ম অনুশীলনের চেষ্টা করি। যে-কোনো শিল্পেরই মিস্তিরিগিরির দিক আছে একটা–এই কলামেরই ভাষ্য তাঁর। বুঝেছিলাম প্রতিভা হয়তো মানুষের জন্মগত ব্যাপার, কিন্তু তাকে গড়ে তুলতে হয় অনেক অনুশীলনে। মিস্তিরিগিরির দিকটায় উন্নতি করা সম্ভব অনুশীলনের মাধ্যমে। লেখালিখি শুরুর দিকে ‘মার্জিনে মন্তব্য’ পড়েছিলাম বলেই না আমার কাছেও ক্রিয়াপদের ব্যবহার গদ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে বিবেচিত। এ থেকে উত্তরণের অনুশীলন করেছিলাম ‘মার্জিনে মন্তব্য’র নির্দেশনা-অভিজ্ঞতা নিয়ে! ‘মার্জিনে মন্তব্য’ থেকেই শিখে নিয়েছিলাম গল্প-উপন্যাসে সংলাপ ব্যবহারের রীতি। কী করে একটা নির্দষ্ট রীতি মেনে চলা উচিত লেখকদের এবং সেটা কেন উচিত তার প্রাঞ্জল আলোচনা পেয়েছিলাম সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত এই ‘মর্জিনে মন্তব্য’তেই।
আশির দশকের গোড়ায় তাঁর সঙ্গে আলাপের সূচনা হলেও ঘনিষ্ঠতা হয়েছে অনেক পরে। মাঝে মধ্যেই বলতাম এইসব লেখা একত্রে একটা বইয়ে থাকলে তরুণ লেখকদের উপকার হবে। কিন্তু এ নিয়ে তিনি বিশেষ উৎসাহ দেখাতেন না। আমার ধারণা সৃষ্টিশীল লেখার দিকেই কেন্দ্রীয় মনোযোগ বলে এসব দ্বিতীয় স্তরের বিষয়ে অগ্রাধিকার নেই তাঁর।
সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘মার্জিনে মন্তব্য’ প্রকাশ বন্ধ হবার বেশ কয়েক বছর পর তাঁর আর এক অগ্রজ সহযাত্রী মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বের করলেন ত্রৈমাসিক ‘সুন্দরম’ পত্রিকা। সেখানে সৈয়দ শামসুল হক নিয়মিত লিখতে থাকলেন ‘গল্পের কলকব্জা’। আমি সেখানকারও মনোযোগী পাঠক। অধ্যাপকী ঢঙের বাইরে সৃষ্টিশীল লেখকীয় অভিজ্ঞতার আলোকে রবীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জগদীশ গুপ্ত ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কয়েকটি বিখ্যাত গল্পের লেখকীয় কারিগরি দিক নিয়ে এমন প্রাঞ্জল আলোচনা করলেন যে যে কোনো তরুণ লেখক এখান থেকে দিক-নির্দেশনা পেতে পারেন।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে একদিন বাংলাবাজারের বিশিষ্ট প্রকাশনা সংস্থা বিদ্যাপ্রকাশের মজিবর রহমান খোকা আমাকে বললেন তিনি সৈয়দ শামসুল হকের ‘গল্পের কলকব্জা’ সিরিজের লেখাগুলো সংগ্রহ করতে পারছেন না। তবে তিনি জেনেছেন যে ‘সুন্দরম’-এর সংখ্যাগুলো আমার কাছে আছে। আমি খুশি হলাম এই লেখাগুলো একত্রে গ্রন্থভূক্ত হবে বলে। যথারীতি সবগুলো পর্ব ফটোকপি করে মজিবর রহমান খোকাকে দিলাম। কয়েকদিন পরে তিনি পাণ্ডুলিপি নিয়ে এলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে, আমার কাছেই। তখন আমি কেন্দ্র-সমন্বয়কারীর দায়িত্বরত। কম্পিউটার বিভাগ থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রধানত প্রকাশনা সংস্থাগুলোকে সীমিত কম্পিউটার কম্পোজের সেবা দেয়ার ব্যবস্থা ছিল তখন। আমি সেটারও দেখাশোনা করতাম। সেই সূত্রেই আমার কাছে ‘গল্পের কলকব্জা’র পাণ্ডুলিপি আসে। কিন্তু ‘মার্জিনে মন্তব্য’র কয়েকটিমাত্র লেখা দেখে আমি অবাক হয়ে তাঁকে বলি যে, এর সংখ্যা অনেক বেশি হবে। অন্তত ১৫ বা ষোলোটি তো হবেই! যথারীতি সৈয়দ শামসুল হককে বিষয়টি জানালে তিনি স্মরণ করতে পারলেন না কটি লেখা লিখেছিলেন। আর দু-একটির বেশি লেখা পাওয়ার কথা নয় বলে মনে করলেন তিনি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে একজন তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের বাঁধাই করা সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ দান করেছিলেন। আমি সেই সংগ্রহে তল্লাশি লাগালাম। ধারাবাহিক সবগুলো লেখাই সেখানে বর্তমান। পাওয়া গেল মোট ২৩ টি রচনা। পাণ্ডুলিপি পুনর্গঠিত হলো। বইয়ের নাম হলো মার্জিনে মন্তব্য/গল্পের কলকব্জা। বইটি উৎসর্গপত্রে লেখা হলো: ‘উৎসর্গ/অধ্যাপক কবির চৌধুরী/অগ্রজপ্রতিমেষু’ [উৎসর্গপত্রে ‘কবীর’ এর স্থলে ‘কবির’ হয়ে গিয়েছিল] বইটি প্রকাশের তারিখের জায়গায় উল্লিখিত ছিল ২৭ ডিসেম্বর ১৯৯৫; অর্থাৎ তাঁর জন্মদিনে প্রকাশিত হয়েছিল বইটি। পৃষ্ঠা ১০১ থেকে ১২৮ পর্যন্ত। পরিশিষ্ট পর্বে মুদ্রিত হয়েছিল ‘গল্পের কলকব্জা’ পর্বের আলোচ্য গল্পগুলো। এখানেই প্রথম সংস্করণের শেষ।
প্রথম সংস্করণের বই দীর্ঘকাল পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় সংস্করণের প্রিন্টার্স লাইনে লেখা আছে একুশের বইমেলা ২০০৫। কিন্তু এটিকে দ্বিতীয় সংস্করণ বলা হয়নি। বলা হয়েছে ‘পরিবর্তিত প্রথম সংস্করণ’। যথার্থই পরিবর্তিত, ৩১১ পৃষ্ঠার বই। যেহেতু বইয়ের রূপটি নতুন হয়েছে সুতরাং এটি ‘পরিবর্তিত প্রথম সংস্করণ’ বটে! তবে আগের রূপটির ইতিহাস এখান থেকে হারিয়ে গেল। আমাদের প্রকাশনা জগতের ‘সংস্কৃতি’র এই-ই হাল। বইয়ের ভূমিকায় আগের রূপটির সঙ্গে কোন কোন পরিবর্তন ঘটেছে তার ন্যূনতম ফিরিস্তি থাকলে সৈয়দ শামসুল হকের এই ধরনের রচনার গতিপ্রকৃতি অনুধাবন আরো সহজ হতো। নতুন রূপের ‘মার্জিনে মন্তব্য’র প্রথম পর্ব ‘মার্জিনে মন্তব্য’তেই যুক্ত হয়েছে নতুন ১৭টি রচনা। ‘গল্পের কলকব্জা’ পর্বটি অবশ্য রয়েছে অবিকল। তবে আলোচ্য গল্প আগে রেখে তারপর বিন্যস্ত হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের আলোচনা। বইয়ের তৃতীয় পর্বে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন অংশ ‘কবিতার কিমিয়া’। এতে রয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ২৬ টি রচনা। সবগুলোই কবিতাসম্পর্কিত।
একজন সৃষ্টিশীল কবি হিসেবে এবং কবিসমাজের একজন প্রবল প্রতিনিধি হিসেবে সৈয়দ শামসুল হককে যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তারই চিহ্ন আঁকা আছে ‘কবিতার কিমিয়া’ পর্বটিতে। লক্ষণীয় যে, কবিতা সম্পর্কে কথাবার্তায় এখানেও সামান্যও অধ্যাপকী ভঙ্গি নেই! থাকবে কেন–অধ্যাপক তো তিনি নন! এই যে অধ্যাপকী উপায় ছাড়া অধ্যাপনা করতে পারার মুন্সিয়ানা–এটাই সৈয়দ শামসুল হকের শক্তি! বড় বড় কবির সূত্রে তিনি প্রায়শই কথা বলেছেন কিন্তু তা একজন সৃষ্টিশীল কবিরই ভাষ্য হয়ে এসেছে। সেই সঙ্গে কবিকে হামেশা যে সমস্যায় পড়তে হয় এবং তা থেকে যেভাবে উত্তরিত হতে হয় তার ফিরিস্তি আছে। ‘কবিতার কিমিয়া’ও অন্য পর্বগুলোর মতোই লেখক সৈয়দ শামসুল হকের স্মৃতিচিহ্নিত! তাঁর এ স্মৃতিকথাকে একজন সৃষ্টিশীল ব্যক্তির সাহিত্যিক-জীবন কথা হিসেবেও অভিহিত করা যায়!
‘পরিবর্তিত প্রথম সংস্করণে’র উৎসর্গও পাল্টে গেছে! এই সংস্করণের উৎসর্গপত্রে লেখা আছে: কবিতা-প্রদোষে সান্নিধ্য যাঁদের পেয়েছি/ জসিমউদ্দিন, আবুল হোসেন,/ আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ।/ গদ্য-সূচনায় সারথী যাঁদের পেয়েছি/ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, শওকত ওসমান,/ ফজলে লোহানী, আনিস চৌধুরী/ গভীর কৃতজ্ঞতায় এঁদের স্মরণ করি। [এখানেও একজনের নামের বানানে ভুল আছে–‘জসীম উদদীন’-এর স্থলে ‘জসীম উদ্দিন’ হয়ে আছে।] ৩ টি স্তবকে বিভক্ত ৭ লাইনের উৎসর্গলিপির প্রতিটি স্তবকের প্রথম চরণ উৎসর্গিত ব্যক্তির নামের তুলনায় ১ পয়েন্ট কমে সাজানো; একই মাপের হরফ শেষ চরণটির।
বইয়ের তিনটি পর্বের নামকরণের সৃজনশীলতার কথা উল্লেখ না করলে স্বস্তি নেই আমার! বইয়ের মার্জিনে অনেক অনানুষ্ঠানিক মন্তব্য থাকে পাঠকের, থাকে বিভিন্ন সূত্র। এগুলো পাঠকের একান্তই নিজস্ব। যেন পাঠকের নিজস্ব মতামত কেবল নিজের জন্যই হাজির এই রকম একটা ভাব এই ‘মার্জিনে মন্তব্য’ নামকরণে। ‘গল্পের কলকব্জা’ নামেও সহজ ভাবে এর অভিপ্রায় প্রকাশিত। ‘কবিতার কিমিয়া’ও কল্পনাঋদ্ধ নাম! সব মিলিয়ে সৃষ্টিশীলতার এক সম্ভার যেন এই বই!
শেষে এমন একটু ফোড়ন কাটা কি অন্যায় হবে যে ‘মার্জিনে মন্তব্য’ পাঠকদের কাছে একটু কি কৃত্রিম লাগতে পারে! হৃদয়ের সজীবতার কি একটু অভাব রয়েছে এই বইয়ে? নাকি এই সজীবতার ঊনতাটুকুই এর বস্তুনিষ্ঠতার কারণ, কারণ এর তীক্ষ্নতা ও ঋজুতার?

Flag Counter


2 Responses

  1. Zia Arefin Azad says:

    লিখেছেন প্রবন্ধ কিন্তু কবিতা পাঠের আনন্দ পাওয়া গেল। অভিনন্দন, মাযহার ভাই!

  2. গীতা দাস says:

    ‘মার্জিনে মন্তব্য’ বইটির পরিবর্তিত সংস্করণ আমার সংগ্রহে আছে। তবে প্রথম সংস্করণের কথাটি জেনে ভালো লাগলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.