কবি ও মুক্তিযোদ্ধা সাবদার সিদ্দিকি

পুলক হাসান | ২ december ২০১৫ ৯:০৯ অপরাহ্ন

যেখানেই পা রাখি
ভিন গ্রহে কিংবা ভিন গাঁয়ে দেখি
পায়ের নিচে টুকরো দুই জমি
হয়ে যায় আপন মাতৃভূমি

sabdar.jpgচির ভ্রামণিক কবি সাবদার সিদ্দিকি (১৯৫০-১৯৯৪) তাঁর চুয়াল্লিশ বছরের সংক্ষিপ্ত উদ্বাস্তু উন্মুল জীবনকে রঙিন বেলুনের মতো উড়িয়ে দিয়ে গত হয়েছেন আজ একুশ বছর। ১৯৯৪ সালে ঘুরতে ঘুরতে দিল্লি গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কোলকাতা হয়ে ঢাকায় ফেরার পথে সাতক্ষীরা সীমান্তে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই নাম না জানা এক গ্রামে সমাহিত হন। সাবদার সিদ্দিকি প্রকৃত একজন কবি ছিলেন। কিন্তু দেশের উল্লেখযোগ্য কাব্যসংকলনে তিনি উপেক্ষিত আজও পর্যন্ত। তাঁর প্রথম কবিতা ১৯৬৫ সালে সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দেশাত্মবোধক কবিতা সংকলন ‘অনন্য স্বদেশ’-এ ছাপা হয়। সে-হিসেবে তিনি ষাটের দশকের কবি। আবার বয়স বিবেচনায় তাঁকে বেঁধে দেয়া যায় সত্তরেও। কিন্তু এই সময়ে একজন প্রথম দশকের কবির যেখানে গ্রন্থের ছড়াছড়ি সেখানে ‘পা’, ‘গুটি বসন্তের সংবাদ’, ‘সোনার হরিণ’ নামের কয়েকটি ক্ষুদে কবিতা সংকলন ছাড়া তাঁর শক্ত বাঁধাই ও পুরো মলাটের কোনো কবিতাগ্রন্থই নেই। যদিও এসব ক্ষুদ্র কবিতা সংকলনের মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সাবদার সিদ্দিকি, হয়ে উঠেছিলেন সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার নতুন এক কণ্ঠস্বর। তাঁর পরিচয় হয়ে যায় তীব্রভাবে প্রথাবিরোধী এক নাগরিক কবি হিসেবে। প্রথাবিরোধী তো বটেই, সেই সঙ্গে তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং জীবনযাপন নিয়ে উঠতি তরুণ কবিকুলে ছিল বিশেষ কৌতুহল কিন্তু সমসাময়িক ও অগ্রজরা ছিলেন ততটাই উদাসীন। হয়তো বিরক্তও। ফলে মুত্যুর পর তাঁকে নিয়ে কোনো রকম হইচই হয়নি। না এপারে, না ওপারে। অথচ এপার ওপার দু’পারেই ভেসেছে তাঁর জীবন নৌকো। জন্ম পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার বশিরহাটে। পিতা আইনজীবী, তাই পরিবারের বসবাস ছিল মহানগর কোলকাতাতে। সাবদার সিদ্দিকির শৈশব-কৈশোরও কেটেছে সেখানেই। ১৯৬৪ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় বাবা গোলাম মাওলা সিদ্দিকি পুরো পরিবার নিয়ে চলে আসেন সাতক্ষীরায় এবং ১৯৭১ সালে ফের চলে যান কোলকাতায়। সাবদার থেকে যান এখানেই এবং মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে আট নম্বর সেক্টরে কিছুদিন যুদ্ধও করেন। তারপর ঐসময়েই তিনিও চলে যান ওপারে। তাঁর মধ্যে যেমন ছিল সেই দাঙ্গার ক্ষত, তেমনি তারুণ্যের টগবগে দেশপ্রেমে নতুন একটি দেশের স্বপ্নও। পরে দেখলেন বিপরীত বাস্তবতা। কোলকাতার দাঙ্গা ও তৎপরবর্তী আন্দোলন সংগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। সেসব উঠেও এসেছে তাঁর ‘কোলকাতা, আমি এক তরুণ মহাপুরুষ’ শিরোনামের আটাত্তর লাইনের দীর্ঘ কবিতায়।

‘মধ্যরাতে দাঙ্গার মাতাল চীৎকার / নিঃসঙ্গ প্রদীপের মতো/ কেঁপে ওঠা আমার কিশোর কলকাতা/ তুমি কেমন ছিলে ইদানীং/ আজকাল কেমন আছ?/ কলকাতা তোমার মনে নেই? মনে নেই?/ পঞ্চাশের কলকাতা?/ দাঙ্গামথিত শহরের বাতাসে ধ্বনিত বিবেকের মতো তোমার, আমার জন্ম চীৎকার?/ কিংবা ’৬৪ দাঙ্গামথিত শহরের নগ্নভঙ্গ মৌলালীর উলঙ্গ দরগাহ/ অথবা/ রাজপথে নিঃসঙ্গ সুনীল ভগ্ন শঙ্খের/ নিঃশব্দ নিনাদ?

একজন কিশোর মহাপুরুষ/ মায়ের ডাক উপেক্ষা করে/ মায়ের দীর্ঘশ্বাসের মতো বেরিয়ে পড়েছি/ পথে পথে রাজপথে

একজন কিশোর/ সমস্ত কলকাতার/ যাবতীয় রূপ রস বর্ণগন্ধের একচ্ছত্র অধিপতি।/ কলকাতা, তুমি তাই সুড়ঙ্গগামী আজ/ লজ্জায় লুকাতে চাও তোমার কংকাল মুখ/ লক্ষ লক্ষ-সতীর ভষ্মাচ্ছাদিত/ তুমি এক ভণ্ড কাপালিক কলকাতা।/ প্রত্যহ বিধৌত তুমি তাই গঙ্গাজলে/ তুমি আজ মুখ লুকাতে চাও কোন মুখে?

বুক পকেটে চীৎকার নিয়ে/ তোমার যাদুঘরে সংরক্ষিত মমির মতো/ বড়ই নিঃসঙ্গ আমি আজ।

হাওড়া ব্রীজ যেন লোহার ব্রেসিয়ার তোমার/ কলকাতা, যন্ত্রের সমান বয়সী তুমি/ কলকাতা, তোমার ইতিহাস/ বাইবেলের পিছনে গাদাবন্দুক/ বাংলা গদ্যের সমান বয়সী/ আমার কিশোর কলকাতা/ সন্ন্যাসীর লিঙ্গের মত নিস্পৃহ তুমি আজ।

মিছিলে/ ব্লডব্যাঙ্কে/ টিয়ার গ্যাসের মুখোমুখি/ তুমি বারবার কেঁদেছ/ আমিও কেঁদেছি কলকাতা/ ইয়ং বেঙ্গলের হুররে হাহহা/ কলকাতা।’
এ যেন কবিতা নয়, একজন কবির জীবনাভিজ্ঞতারই জবানি।
খুব অল্প বয়সে তাঁর মধ্যে ঢুকেছে কবিতার ভূত। তাই প্রতিষ্ঠার হাতছানি উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় বেছে নেন উপেক্ষিত কবি জীবন। কবিতায় তিনি ছিলেন খুবই সমাজ ও রাজনীতি সচেতন। তাই পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন, নাগরিক ভণ্ডামি, সাম্রাজ্যবাদি আগ্রাসন, যন্ত্র সভ্যতার ফানুস–কিছুই বাদ পড়েনি তাঁর কবিতার বিষয় থেকে। বরং শ্লেষমাখা বাক্যবাণে তা হীরকদ্যুতির মতো খুলে দিয়ে গেছে ব্যক্তির অন্ধত্ব, জাগ্রত করে গেছে বিবেক। তাই মৃত্যু তাঁকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেলেও সহজে মলিন হবার নয় তাঁর কবিতার তির্যক পংক্তিগুচ্ছ। সে-কারণে দু’দশক পর আবার তাঁকে নিয়ে নতুন করে ভাববার এই চেষ্টা, এই পুনর্পাঠ।

তাঁকে নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পরেই ১৯৯৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে একটি দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী পাতায় লিখেছিলাম, দীর্ঘ লেখা। শিরোনাম ছিল ‘কবি সাবদার সিদ্দিকির মৃত্যু : এক উদ্বাস্তু নগর বাউলের প্রস্থান’। কিছু দিনের সম্পর্কের উষ্ণতায় শ্রদ্ধায় আবেগে রচিত ঐ লেখায় তাঁর একটি রেখাচিত্র আঁকার চেষ্টা করেছিলাম : ‘দেখতে অবিকল তরুণ সাধু কি সন্তের মতো। লম্বাটে মুখ, ভাঙা চোয়াল, ঈগল ঠোঁটের ন্যায় নাক আর যে কোনো তরুণের মতোই ঘাড় অবধি নেমে যাওয়া এক মাথা চুল। মুখে এক গোছা পাতলা দাড়ি, গায়ে নামমাত্র মূল্যের তোষকের কাপড়ের আলখাল্লা, পা জোড়া কখনো খালি কখনো বা খড়মে, কখনো বা পরিত্যক্ত টায়ারে তৈরি চপ্পলবন্দী। ক্লান্ত চোখ জোড়া কোটরাগত, কিন্তু দূর স্থির লক্ষ্যে আগুণের মতো প্রজ্জ্বলিত। কাঁধে ঝোলা সে তো নিমিত্ত। হালকা-পাতলা ছিপছিপে গড়নের সাদামাটা এ মানুষটি এতো তেজ ধরেছিলেন বুকে-মনে। ভাবাই যায় না, যেন তাঁর নির্মোহ আদর্শের কাছে হিমালয় পর্বত পর্যন্ত অবনত।’ লেখাটিতে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে তাঁর স্বাধীন, স্বতঃস্ফূর্ত ও অনমনীয় জীবনচিত্র। অদ্ভুত জীবনচারিতায় তাঁকে তাই মনে হতো সাধু কি সন্তের মতোই নির্বিকার ও নির্লিপ্ত এক মানুষ। সে-জীবন ছিল তাঁর কবিতার চেয়েও রোমাঞ্চকর। স্বনির্মিত সে-জীবনচারিতায় ছুটে চলাই ছিল তাঁর দৈনন্দিন বাস্তবতা। ফলে জনারণ্যে থেকেও সে ছিল একা, উদ্বাস্তু এক নগর বাউল। ভিড়ের মধ্যে একাকী তিনি ছুটে যেতেন যেমন সুদূর দিল্লি পর্যন্ত, তেমনি নিমগ্নতায় প্রশান্তির খোঁজে যেতেন পাহাড়ের সান্নিধ্যেও। ভেতরে দারুণ অস্থিরতা, হঠাৎ আত্মমগ্নতা ভাঙলেই তা বুঝা যেত। কিন্তু কী খুঁজতেন তিনি একাকিত্বের গহণে?

প্রত্যেক কবিই তো ভেতরে ভেতরে একা এবং সেটা তাঁর সৃষ্টিরই প্রেরণা যোগায়। সাবদার সিদ্দিকির সমসাময়িক প্রয়াত কবি আবুল হাসান তো কবিতায় বলেছেনই, ‘অবশেষে জেনেছি, মানুষ মূলত একা।’ আর এই একাকিত্ব আবুল হাসানের কবিতাকে দিয়েছে দুঃখের অমল জ্যোতিধারা। তাই তাঁর কবিতার ভেতরে, গভীরে শুধুই দুঃখকষ্ট আর মায়ামমতাভরা। তিনি তাঁর ‘ঝিনুক’ কবিতায় তা আরও স্পষ্ট করেছেন : ঝিনুক, তুমি নীরবে সহো, ঝিনুক নিরবে সয়ে যাও/ ভিতরে বিষের বালি/ মুখ বুঝে মুক্তা ফলাও। অর্থাৎ একজন কবিকে ঝিনুকের মতোই দুঃখ-কষ্টের ভিতর সৃষ্টির সোনা ফলিয়ে যেতে হবে। কবি সাবদার সিদ্দিকিও মনে করেন, কষ্ট বেদনা সব মানুষের কাছেই সমান। হোক কবি কিংবা পাঠক, বেদনার কাছে কেউ পৃথক নয়। যেমন– ‘মোমবাতি ভাষা ক’জন বুঝতে পারে/ কবি হৃদয়ে ক্ষয়রোগ কিরকম অক্ষয়।/ ………. কি রকম কলম কতটুকু ক্ষয়রোগে ভোগে/ ক্ষয়ে ক্ষয়ে কলম তীক্ষ্নতর হলে/ বিদ্ধ সকলেই হয়/ কবি কিংবা পাঠক/ বেদনার কাছে কেউ পৃথক নয়।’ [বিনোদিনী চক্ষু হাসপাতাল।]
হাসান ও সাবদার দু’জনের কাব্যবোধ হয়তো কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু সাবদারের আবেগ সেখানে অনেক খানি সংযত। যদিও জীবনযাপনে তিনি ছিলেন চরম স্বেচ্ছাচারি। ফলে হাসান তরুণ কবি ও কবিতাপ্রেমী পাঠক হৃদয়ে পেয়ে যান বিশেষ এক আসন।

কবি বন্ধু শামসেত তাবরেজীর মুখে শুনেছি ’৭৮ সালের টাঙ্গাইল সাহিত্য সম্মেলনে সাবদারকে দেখা গেছে জিন্সের প্যান্ট শার্ট এবং চোখে চশমাপরা পুরোদস্তুর এক আধুনিক যুবক হিসেবে। তবে ভেতরের কোন্ আন্দোলনে বিস্ফোরিত হয়ে তুমুল তারুণ্য থেকে তাঁর এই বিচিত্র রূপধারণ? এ কী তাঁর নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা, না রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ? তাঁর এই অদ্ভুত বেশে কেউ কেউ তাঁকে মনে করতো উন্মাদ, নয়তো ছন্নছাড়া। কিন্তু মুখ থেকে যখন গরগর করে বেরিয়ে আসতো বিশুদ্ধ বাংলা ও ইংরেজি এবং চোখের চশমা সরালে জ্বলে উঠতো দুটি দীপশিখা, তখন টের পেত মানুষটার ভেতর রয়েছে অন্যরকম এক তেজ। এই তেজ তাঁর জীবনাভিজ্ঞতার এবং তিক্ততার। ফলে যৌবনের উষালগ্নেই যে তাঁর মধ্যে জায়গা করেছিল বারুদের মতোই স্বাধীনচেতা এক মনোভাব, যুদ্ধোত্তর স্বাধীন দেশে নিজের নাম থেকে ‘গোলাম’ শব্দটি ছেটে দিয়ে তিনি তা বুঝিয়ে দেন। এ ছাড়া ‘যে কবির কবিতা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া যায়’ শিরোনামে তাঁর ছোট্ট এক গদ্য লেখার মধ্যে আমরা টের পাই ভেতরে ভেতরে তাঁর অঙ্কুরিত হচ্ছিল লাতিন আমেরিকার জগৎবিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদার বিপ্লবী চেতনার বীজ। হয়তো সেই বীজমন্ত্রের আকর্ষণে বাঁধা পড়ে যাওয়ায় কবি জীবনের শুরুতেই স্বপ্ন দেখতেন শোষণমুক্ত মেহনতি মানুষের এক শান্তিবিশ্ব! নইলে খরাপীড়িত ইথিওপিয়ার মানুষের প্রতি সমবেদনায় তিনি সেখানে ইরি চাষের স্বপ্ন দেখবেন কেন?
পাবলা নেরুদা তাই শুধু তাঁর বিপ্লবী চেতনার প্রেরণাই ছিল না, ছিল কাব্যাদর্শও। দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লবী গেরিলানেতা চে’ গুয়েভারা যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বক্ষণ সঙ্গে রাখতেন নেরুদার কবিতার বই।
কবি সাবদার সিদ্দিকি এই দুই মহৎ প্রাণের চেতনাই বহন করেছেন হৃদয়ে। তাই জীবনের মধ্যে খুঁজতেন অন্য এক জীবন এবং সমষ্টির প্রতিধ্বনি। তাঁর এই উপলব্ধি সেই ইঙ্গিতই তো দেয় : ‘অক্ষরগণ শব্দ হন/ শব্দগণ বাক্য হন।/ বাক্যগণ ধ্বনি হন/ ধ্বনিগণ হন প্রতিধ্বনি।
এই যুথবদ্ধ ভাবনা, জীবনের কোরাস তাঁর মর্মে মর্মে, চিন্তায় ও মগজে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত এবং উপলব্ধিগত বলেই ‘ওয়াকিটকি’ কবিতায় তিনি একজন কমরেডের মতোই উচ্চারণ করেন, ‘আলো জ্বালতে এসে ভুলে/ আগুন ফেলেছি জ্বেলে।’ তাঁর কবিতায় তখন মুক্তি সংগ্রামে লড়াকু কোনো গেরিলার ছবিটি যে এভাবেই জীবন্ত ফুটে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। ‘শিরোনামহীন’ কবিতার পঞ্চম ছত্রে তাই দেখি :
‘পরিণত হাত যখন হাতিয়ারে/ সময়ের ধার তখন কে রে ধারে/ এ ধারে ও ধারে/ ঘুমায়ে পড়েছে কে রে? / রেখে মাথা ঘাস বাংকারে/ তর্জনী রেখে ট্রিগারে?’
যে জীবনই সাবদার যাপন করে যান না কেন তাঁর ভেতরে ছিল বিপ্লবের স্পন্দন, ছিল চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন। তাই তিনি কবিতায় সঞ্চারিত করেন এই বোধ :
‘প্রত্যেকটি কবিতাই যেন/এক একটি স্বাধীনতার সনদ।/ প্রত্যেকটা কবিতাই যেন/ পোস্টারে উৎকীর্ণ/ আগ্নেয় ভাষা।/ প্রত্যেকটা কবিতাই যেন/ মিছিলে উচ্চারিত/ প্রতিবাদের ভাষা/ প্রতিরোধের ভাষা।/ প্রত্যেকটা কবিতাই যেন/ স্বাধীনতার ভাষা।’ [প্রত্যেকটা কবিতাই যেন]
তাঁর ‘টেলিগ্রাম টেলিগ্রাম’ শিরোনামের কবিতায় সেই আহবান আরও উচ্চকিত :
‘টেলিগ্রাফের তার/ যেন রবিশংকরের সেতার/ সুরের মুর্চ্ছনায় মুর্চ্ছনায় / টক্কা টরে টক্কায়/ টরে টক্কায় বলে যায়/ ডাক দিয়ে যায়,/ আয় ওরে আয় আয়/ আয় নারী/ আয় বিপ্লবের ব্রহ্মচারী।’
বিপ্লবী না ব্রহ্মচারি এ দু’য়ে বিভক্ত হয়ে গেছে তাঁর কবিসত্তা। আর এই দ্বৈত সত্তার ওপর একটা তুলনামূলক আলোচনাই এ লেখার উদ্দেশ্য। সেখানেই তাঁর বাঁকফেরা নতুন জীবন। বিপ্লবের প্রশ্নে তিনি আজীবন মুক্তিযোদ্ধা, অন্তহীন সংগ্রামী। কিন্তু ব্রহ্মচারী আন্দোলিত জীবন গুটিয়ে নিজের নিভৃতে পলায়ন। ফলে যে তেজ ও অঙ্গীকার নিয়ে তাঁর শুরু, তাঁর শেষ না দেখেই অর্থাৎ চূড়ান্ত পরিণতির দিকে না গিয়েই তিনি পিছু হটেন। বিপ্লবী ও ব্রহ্মচারী এক অর্থে আবার অভিন্ন, উভয়েই ঘরহীন। ঘর থাকলেই নারী ও সন্তান, থাকে পিছুটান।
ব্রহ্মচারী তথা বাউলিয়ানায় সেসবের বালাই নেই, সে এক আত্মনিমগ্ন জীবন। অবশ্য সাধনার জন্য তার কোন বিকল্প নেই।
এই জন্যই সাবদার বিপ্লবের ব্রহ্মচারী, অমীমাংসিত তাঁর জীবন। যাঁর কবিতা সমাজের অশনি-সংকেতে এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করে গেছে, ‘কলম ও বন্দুক সমমন/ কানের ও মনের/ রাখিও যতন।’
যিনি জাতির দিক নির্দেশনায় একমাত্র ভরসা বুদ্ধিজীবীদের স্বার্থের কাছে বিবেক বিকিয়ে দেয়াকে ইঙ্গিত করে বলতে পারেন ‘কলম ভাড়া দেব না’।
সেই অগ্নিপুরুষ যদি বলেন, ‘মনটারে তুই কর/ পাথর/ দেহটারে মাটি/ চোখে চোখে সরোবর।’
তখন আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না সত্যিই তাঁর মধ্যে ঘটেছে আমুল পরিবর্তন। সেই জীবনভাটার জন্যই তাঁর মধ্যে এই সুরের ভাটিয়ালি টান।
ফলে আমরা বলতেই পারি কবি সাবদার সিদ্দিকির মৃত্যু আসলে প্রকৃত অর্থে এক নগর বাউলেরই প্রস্থান।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন rashed — december ২, ২০১৫ @ ৯:২৭ অপরাহ্ন

      তার কোন কবিতার বই এখনো পাওয়া যায় ??

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah mahmud dulal — december ২, ২০১৫ @ ১০:২৪ অপরাহ্ন

      পুলক হাসান, অনেক অনেক ধন্যবাদ। হারিয়ে যাওয়া এই আমাদের সাবদার সিদ্দিকিকে মনে করিয়ে দেয়া। খুব ভালো লাগলো লেখাটি। বেশ চমৎকার মূল্যায়ন!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sculptor rajib siddiqui — december ৩, ২০১৫ @ ৬:৪৮ পূর্বাহ্ন

      Pulok Bhai, After long day your writing makes me remember a lot of memories . bulbul academy, Sabder bhai etc ………
      yes i miss him
      Thank you ……

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kamruzzaman Balark — december ৩, ২০১৫ @ ৮:২১ পূর্বাহ্ন

      Valo laglo lekha ta. Someone introduced me to little mag shampadok “Paa” -er shathe in early eighties some where near Shahabag.

      Valo thakun Golam Shorder Shiddiquie – RIP.

      – Melbourne

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dilwar Hasan — december ৩, ২০১৫ @ ১১:০৩ পূর্বাহ্ন

      Amader prokashokra ki ekon tar rachona samagro prokash korte paren na?
      Ei nibandher lekhak ke dhannobad.

      Dilwar Hasan

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোহাম্মদ আজিজুল হক রাসেল — december ৩, ২০১৫ @ ৮:১৫ অপরাহ্ন

      নিভৃতে থাকা গুণী লেখকদের নিয়ে এমন প্রতিবেদন প্রসংশার দাবী রাখে । পুলক হাসান আপনার প্রতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা । কবির সংক্ষিপ্ত জীবনের কাব্য সমূহ বাংলা কাব্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে । ওনার তৎকালীন সময়ের বর্তমান নিয়ে লেখাগুলি প্রকাশের চেষ্টা করার জন্য অনুরোধ করছি । ধন্যবাদ ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Erfanur Rahman Bhuiyan — december ৫, ২০১৫ @ ৪:০২ অপরাহ্ন

      অসাধারণ। অজানা কবি আজ এত আপন হয়ে গেল।যথাযথ মূল্যায়ন।তার উপর আরও লেখা চাই।ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nurul Alam Atique — ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৬ @ ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

      পুলক হাসানকে অশেষ ধন‌্যবাদ। কবি সাবদার সিদ্দিকিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‌‌হাকিম চত্বরে বেশ কয়েকদিন দেখেছি, আলাপ-পরিচয় হয় নাই। আজ তাঁর কবিতা-জীবন নিয়ে কিছুটা জানা গেল। আফশোস্, সময়ের জরুরী এই কবিকে আমার পাঠ করা হয় নাই! সাবদার সিদ্দিকির কাব্য-সমগ্র প্রকাশ হোক, আরো জানাশোনা হোক।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com