কবিতার দেশ, প্রেম আর মোহাম্মদ রফিক

শুভাশিস সিনহা | ২৩ অক্টোবর ২০১৫ ৮:৪৭ পূর্বাহ্ন

mohammad-rofiq.jpg
ছবি: নাসির আলী মামুন
Painting is poetry that is seen rather than felt, and poetry is painting that is felt rather than seen.
–Leonardo da Vinci

অর্থাৎ কবিতা আর চিত্রকলার সম্পর্ক অনেকটা বরের ঘরের মাসী আর কনের ঘরের পিসী–এরকম।

চিত্রকলা বা সোজা কথায় আঁকা ছবির মধ্যেও কবিতা থাকে, কিন্তু সেটা অনুভবের চাইতে বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে কবিতার ভেতর থাকে সেই ছবি, যা দেখার চাইতে বেশি অনুভব করা যায়।

কথা এল অনুভবের। ওয়ার্ডওয়ার্থ বলেছিলেন, কবিতা শক্তিশালী অনুভূতির স্বতঃস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ। এই অনুভরের কথাই ঘুরে ফিরে কবিতায় চলে আসে। এই অনুভূতিকে কেন্দ্রে রেখেই কবিতাকে আমরা বিচার বিবেচনা করি।
আজ গোটা দুনিয়ার নানান আর্থরাজনৈতিক সংঘাতের চাপে শিল্পের নানান আঙ্গিক যখন নিজেকে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে একটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে নিজের রূপ বা চেহারাকে দেখার জন্য নানান তৎপরতায় লিপ্ত, তখন কবিতাও সেই পরিবর্তিত সৃজনপরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে নানান যাদু বা ম্যাজিক, ডিকশনাল চেঞ্জেস বা বয়ানগত রূপবদলের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই অবস্থায় কবির জন্য একটা মহা মোকাবেলার ব্যাপারই, সে কবিতার অন্তরের স্পন্দনকে একটা মিথিক্যাল সত্যতার জায়গা থেকে এখনো উপলব্ধি করা, যেখানে কবিতা এতসবকে ছাপিয়ে মানুষের অব্যক্ত হৃৎকথামালার গুঞ্জরণ বলে প্রতিভাত হয়।

কবিতার সেই অনুভবের গভীর বিশুদ্ধতার স্পর্শ মনে পড়ছে কবি মোহাম্মদ রফিকের কথা যিনি আজ পদার্পণ করলেন তিয়াত্তর বছর বয়সে।
প্রথম বই বৈশাখী পূর্ণিমার কাল থেকে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কবিতা লিখেছেন। শুধু কবিতাই যে লিখেছেন তা নয়। জীবনকে যথার্থ মনুষ্যযাপিত করে তোলার জন্য যা যা নিয়ামক তিনি তা ঘটিয়েছেন এবং তা তাঁর কবিতার অনুভবের গভীরতা ও শৈল্পিক সত্যতার সকল দায় পুরণে সহায়ক ক্রিয়াশীল থেকেছে। তিনি নিজ বসতের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেছেন, তাদের সকল দুঃখদুর্দশা বঞ্চনাযন্ত্রণা সুখ-আনন্দ প্রেম-কাম ভালোবাসা ও ঘৃণার ভেতর থেকে বুঝতে গিয়ে, সেখান থেকে উৎরাবার রাজনীতিতে একদা সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছেন, সবচেয়ে বড় কথা তিনি একটি ভূখন্ডের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন; বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তিনি সশস্ত্র সৈনিক, যুদ্ধের পর সদর্পে কলম হাতে নিয়েছেন, দেশ-মানুষ-জীবনের কাব্যিক ভাষ্য তৈরির নতুন যুদ্ধে তিনি ফের হয়েছেন লড়াকু সেনানী; কিন্তু এ লড়াইয়ে– স্বাতন্ত্রিক অভিনবত্ব হলো– তিনি যে নতুন ময়দানে নামলেন, সেই কবিতার নিজস্ব ধর্ম/স্বভাব/শক্তিকে ক্ষুণ্ণ হতে তো দিলেনই না, বরং কহতব্যকে তার গভীর ও চূড়ান্ত ভাবসৌন্দর্যের আধারে বিন্যস্ত করার নতুন এক প্রয়াস নিলেন।
সেটা তিনি যেভাবে করেছেন, তার ধরনের মধ্যেই রয়েছে তাঁর অনন্য স্বতন্ত্রতা। সেটা সুদূর দেশের এক কবি টি এস এলিয়ট বলেছিলেন, প্রকৃত কবিতা বুঝে ওঠার আগেই পাঠকের কাছে পৌঁছায়। (Genuine poetry can communicate before it is understood.)

মোহাম্মদ রফিক তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে সেভাবেই পৌঁছে যান। কবিতার নিতান্ত কাব্য-কৌশলগত কারিকুরি ছাড়াই। একটা নিখাদ চিত্রকল্প সেই সেতু তৈরি করে দেয়।
‘মায়াবিনী ছায়ার পিছনে ছুটতে ছুটতে
দেখি দুই হাতে তালু জুড়ে
জমছে ফোঁটা-ফোঁটা শিশিরের জল
যার মধ্যে মাথা তুলছে পদ্মকুঁড়ি
যার রেণুগুলি খেয়ে নিচ্ছে
বিজাতীয় পোকা-মাকড়ের দল!’

কবির সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবেলায় থেকে শিরোনামহীন একটি কবিতা, যার শুরুতে একটা অধি-বাস্তবিক টানের কথা আছে, কিন্তু পরক্ষণে একটার পর একটা ছবি, শুধু ছবি নয় ক্রিয়াশীল এবং রূপান্তরমূলক দৃশ্যের কল্পনা। ছবিগুলো এমনভাবে (ভাষায়) আঁকা হয়, যেটা বোঝার জন্য আমাদের ভাষার আর ভেতরে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয় না। ছবিটির জীবন্ত উপস্থিতিই মনোযোগ কেড়ে নেয়, আমাদের এবং পাঠশেষে শুরু হয় তার অন্তর্গত ব্যাখ্যার আপনাপন তাড়না।

এভাবে কল্পনাকে কবিতা করে তুলতে তিনি যে ভাষা আদি-অন্ত ব্যবহার করে গেছেন সেটা ঈর্ষণীয়ভাবে তাঁর একার। এবং সেখানে প্রকরণে, শব্দ প্রয়োগে, ভাবনার ছবি আঁকাতে, ভাবশরীর নির্মাণে কোথাও পূর্বতন কোনো কবির প্রভাব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। একটা ঋজু পেশল কিন্তু সুষমাময় ভাষাভঙ্গিতে কবিতার শরীর তৈরি করেছেন তিনি। বাংলা কবিতার গীতলতা বা লিরিসিজমকে যা শব্দের বাজনায় বা অর্কেস্ট্রেশনে বাজিয়ে তোলে।

কেন তিনি এতটাই স্বতন্ত্রভাবে ভাষা আর বয়ানের একটা জগৎ তৈরি করতে পারলেন, তার পেছনে প্রধান যে কারণটিকে অনুভব করা যায়, সেটা একদমই অ-নন্দনতাত্ত্বিক, শুনে খানিকটা খটকাই লাগতে পারে : দেশপ্রেম।
এটা আবার কী জিনিস! দেশপ্রেম তো দেশের নাগরিকদের চেতনার ব্যাপার, তার সাথে কবিতার বা কবির সৃজনকল্পের সম্পর্কটা কোথায়!

কবিতা কোনো না কোনো গভীর প্রেমানুভূতির মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়, সেকথা আমরা সকলেই কমবেশি মনে করি। আমাদের এখানে প্রায়শ একটা মনোসেন্ট্রিক বা এককেন্দ্রিক প্রেমকে আমরা কবিতায় এবং কবিতানেপথ্যে পেয়েছি। এমনকি আমাদের বৈষ্ণব পদাবলীর অধিকাংশ পদে নর-নারীর টান রাধা-কৃষ্ণ রূপকে পেশ করা হয়েছে, যা বৈষ্ণবীয় জীবাত্মা-পরমাত্মার মিলনের দর্শনকে ছাপিয়ে মানবিক আবেগপূর্ণ কাম আর প্রেমের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রতি অঙ্গ লাগি প্রতি অঙ্গ কাঁদে, থরথর কাঁপে, সংশয়ের ‘বিজুরিলতা’র সামনে।
রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে পূজার স্তরে উত্তীর্ণ করলেন। সেখানে প্রাণের মানুষের কথা এল। এই প্রাণের মানুষ সবখানে ছড়িয়ে আছেন। প্রাণ থেকে শুরু করে অপ্রাণ বস্তু পর্যন্ত। প্রেমের স্পষ্ট জৈবিক বা শরীরী টানের সুতোকে ছিঁড়ে দিয়ে খানিকটা নিষ্কাম এবং আত্ম-নিবেদন বা উৎসর্গের এক বাজুবন্ধে কবিতাকে বাঁধলেন। কিন্তু সেখানে সবকিছু কবির নিজ বা অহমেরই চৈতন্যে ক্রিয়াশীল : তাঁরই ‘চেতনার রঙে পান্না’ হয় সবুজ, ‘গোলাপের দিকে তাকিয়ে’ কবি সুন্দর বললেই গোলাপ সুন্দর হয়ে ওঠে।
নজরুলের প্রেমের প্রায় একমুখীন তীব্রপ্রকাশ ছিল নারীর প্রতি। নজরুল তার সকল ক্ষোভ-দ্রোহ-কান্না-ক্ষরণ-বিপ্লব যার সাথে সম্পর্কায়িত করে প্রকাশ ঘটাতেন, সে নারী। উলটো করে বললে নজরুলের সকল তুমি বা নারী, বিশেষত তাঁর গীতিকায় বা গানে, বয়ে বেড়াত তার অপরাপর সকল মানবিক সংক্ষুব্ধ ও বেদনার্ত পরাজয়ের অনুভব। মোটা দাগে বাংলা কবিতার ইতিহাসে একটা ভাবমূর্তি বা সহজকথায় এক স্বতন্ত্র চি‎হ্ন হয়ে ওঠা কবি জীবনানন্দ দাশ। রূপসীবাংলার প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত দেশের একটা ছবি আছে, যে ছবি পটে আঁকা, সে ছবি বাংলাদেশেরই, কিন্তু জীবনানন্দ পরবর্তীকালে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন এবং পূর্ব বাঙলা থেকে বাংলাদেশ হয়ে ওঠার সময়ের আগে এ-পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন বলে বাংলার ছবিটিকে রূপের কৈবল্য থেকে বের করে ভেঙেচুরে ঘষেমেজে উলটেপালটে দেখার ও দেখানোর ভাষাপ্রপাত তাঁর ছিল না। সেখানে দেশের জায়গায় দেশ ছবি হয়ে আছে, দূর থেকে তাকে দেখে দেখে প্রেমে মজে যাওয়ার বয়ানও আছে। কিন্তু কার্তিকের নবান্নের দেশে তার ফিরে আসা না-আসার আবেগি ভাষিক রোমান্টিকতা ও সুন্দরতা তাকে দেখতে দেয়নি এখানে যে নবান্নের পাশাপাশি রাক্ষুসে বান ওৎ পেতে থাকে, কোনোমতে খেটে-খুটে যোগাড় করা অন্নটুকুকে ভাসিয়ে নিতে পারে সেই বান। তার দ্বারা লেখা সম্ভব হয়নি, ‘এদেশে বন্যার কি শেষ আছে?’

আল মাহমুদে দেশ আছে। এই ভূগোলের লোকাচার, সংস্কার, কাম, প্রেম তাঁর কবিতায় অনন্য সাবলীলতা ও গীতলতায় স্বতন্ত্র এক ভাষা পেয়েছে, বক্রকথন, কূটাভাষ, শ্লেষ, হিউমার সবকিছু সেখানে উছলে উঠেছে ‘বানের জলের মতো’। বয়ানের এক নদীঢেউপ্রতুল চলনভঙ্গি উপমা ব্যবহারের অভিনবত্ব কবি হিসেবে তাঁকে অনেক উঁচুতেই স্থান দেবে। কিন্তু বাংলাকে আল মাহমুদ দেখেছিলেন আত্মকামবাসনার সঙ্গে যুক্ত করে। সেখানে সবকিছুর পরে আমি বা অহমই মুখ্য। নারী, মাটি, শস্য, নদী, জল সবকিছু তার পৌরুষিক দৃষ্টিভঙ্গির আকাঙ্ক্ষা ও বাসনার টানে আবর্তিত হয়েছে। কবিতার উন্মাতাল শক্তি দিয়ে আল মাহমুদ শেষাবধি পরাজিত করে গেছেন ভূগোল-বাস্তবতার জৈবনিক রূপের নিজস্ব উদ্ভাসনের আকাঙ্ক্ষাকে। সেখানে সবকিছু দেখা-বোঝার আর বিবেচনা করার কারিগর তিনি, এবং তার জন্যই সবকিছু। তাই তাঁর এই অন্তিমপর্বের কাব্যচর্চায় এসে দেখা যায় তিনি একরৈখিক ও দুর্বিনীতভাবে কবিতার মুখ ঘুরিয়েছেন ক্রমশ চিরায়ত ‘রমণী’র দিকে, পুরুষের বিপরীতলিঙ্গীয় টানের ব্যাকুলতা ছাড়া আপাতত সেখানে আর কোনো দার্শনিকতা নেই।

মোহাম্মদ রফিক অন্তিমেও তা থেকে দূরে থাকেন। এমনকি তাঁর মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন কবিতাও ব্যক্তির একান্ত অহম-সংশ্লিষ্ট অনুভব, দীর্ঘশ্বাস, হা-হুতাশে পর্যবসিত হয়নি, কোনোভাবেই, সেখানেও তা হয়ে উঠেছে কালের পুনরুজ্জীবনের আভায় খচিত : ‘গুছিয়ে গাছিয়ে ফের রেখে-যাওয়া প্রতিটি বস্তুর গায়ে অশ্রু লেগে থাকে,/ আর, হাড়-কঙ্কালের খাঁজে একফুলকি অগ্নি!’ (না, থাক) বাঙলা কবিতার চিরাচরিত অভিজ্ঞতা থেকে কবি হিসেবে আদি-অন্ত তিনি এভাবেই স্বতন্ত্র। আজ এই আয়ুপ্রান্তে এসেও কবিতার ভাষা-বয়ন-রূপ-আত্মা আর দার্শনিক অভিপ্রায়ে তিনি একই জমিনের ভিতে দাঁড়িয়ে; পায়ের নিচ থেকে তার মাটি সরে যায়নি। নাগরিক জীবনের সকল সমাজ-রাজনৈতিক তৎপরতার বলয়ে দাঁড়িয়ে প্রেম ও দ্রোহকে বাঙলার যাপিত বাস্তবতার মধ্যে যে নন্দনে শামসুর রাহমান বাঁধতে চেয়েছিলেন, সে-বাঁধন তাঁর মৃত্যুর বহুকাল আগেই আলগা হয়ে গিয়েছিল। আত্মবাসনাক্ষোভবেদনার সাথে সম্পর্কিত করে জগৎজীবনকে বিচার করার নান্দনিক এক ত্রুটি বাংলাকবিতার আদি-অন্ত রয়ে গিয়েছিল, কবিতাবীক্ষণের স্বতন্ত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে যা থেকে মোহাম্মদ রফিক মুক্তি দিতে চেয়েছেন, নিজেকে তিনি সেই জগৎ-জীবনের দ্বান্দ্বিক ভাবচক্রের ভেতর গভীরভাবে অনুভব করে চলেছেন। এবং অন্ত্যপর্বে বলেন ‘মানুষ মরণশীল/ বেঁচে থাকতে/ ক্রমশ পচনশীলও বটে!’ (আত্মজন)

হাজার বছর ধরে পৃথিবীর নানান ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে নিজ-কে খুঁজে ফেরার জীবনানন্দ বনলতা সেনের কাছে ফিরে আড়ালার্থে দেশকেই খুঁজে পান।
কিন্তু মোহাম্মদ রফিক বাঙলার বানভাসা জীবনের সেই শ্রেণির বেদনার কাব্যায়নে মজে গিয়ে উপলব্ধি করেন,
‘যেখানে যাত্রার শুরু সেখানেই শেষ।’ আবার এখানেই প্রাণ ‘মরে ফের বেঁচে ওঠে।’ আর ‘শীতের নদীতে বান ডাকে।’ (গাওদিয়া)

বাংলার প্রকৃতি যে কবির প্রেমে বুঁদ হবারই বিষয়মাত্র নয়, মানুষের সঙ্গে সে প্রত্যহ ইতি-নেতির রসায়নে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ফেদে চলে, তার রূপকে বোঝার জন্য মোহাম্মদ রফিকের আর বিকল্প হয় না। সেটা জীবনানন্দের ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতারও কোনো ব্যাপার নয়। জীবনানন্দ তাঁর কবিতার আগ্রাসী রোমান্টিকতা, সময়ের পরিবর্তনশীলতার কাছে ব্যক্তির নিজেকে ফিরে ফিরে পাওয়ার ব্যর্থতার বা পরাজয়ের গাঢ় বেদনার অম্লসুন্দরতা, অতিরহস্যময় এক তুমির আকর্ষণ ও গভীর খুনসুটির মোহমুগ্ধতা এবং সর্বোপরি জীবনের নশ্বরতাকে মুগ্ধদৃষ্টিতে চেয়ে দেখার সৌন্দর্য্যর মধ্য দিয়ে বিশিষ্ট, শক্তিমান এবং চির-গুরুত্বপূর্ণ। জীবনানন্দ এমনকি বয়ানে বা কবিতা বলার অভূতপূর্বতার মধ্য দিয়েই বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। যার চূড়ো মেঘ অবধি পৌঁছেছে নিঃসন্দেহে।

কিন্তু আমাদের এখনকার মোহাম্মদ রফিক, তাঁর অনেক পরের কালের এই কবি, সেই বিশেষ এক ঘোরলাগানো, মদির-করে-তোলা, আফিমের মতো ডুবিয়ে চুবিয়ে নেয়া ভাষার জীবনানন্দীয় শক্তির সাথে তুলনীয় হওয়ার দায়ে নয়, কবিতার বিষয় আর বিষয়ীর এক নতুন সংশ্লেষের নতুনতম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন; পাঠকের ভালো-লাগার যে অংশটা কবির কবিতার চুম্বকে আকর্ষিত, তাকেই প্রায় অস্বীকার করে কবিতাকে চিত্রসৌন্দর্য আবেগমুগ্ধতা দীর্ঘশ্বাস-সহবাসের ঋণাত্মক আনন্দ সৃষ্টির অতিলিপ্ত ভাষাভঙ্গি থেকে মুক্ত করে এক ধরণের ইম্পার্সোনেশন বা নৈর্ব্যক্তিকতার বোধ তৈরি করার চেষ্টা সেখানে চলতেই থাকে, যা পাঠককে আপাত অর্থে আকর্ষিত করার উপাদান বহন করে না, কিন্তু পাঠকের অনুভূতিকে এই বলে উস্কে দেয় যে, ‘তুমি যা বুঝলে তা আসলে কিছুই বোঝোনি’। তখন পাঠক ফিরে তাকাতে বাধ্য হয়, কথিত ভাষ্যের ছবিমালার ভেতর দিয়ে আবার বিহার করতে গিয়ে কবি টের পেতে থাকেন তার ভেতর কী অনায়াস বিপর্যাস তৈরি হয়ে আছে। সেই বিপর্যাস, সেই দ্বান্দ্বিকতা, সেই ভাঙাগড়ার সকল খেলার ভেতর আদি-অন্তে কাজ করে কবির একটা প্রেম। তা জীবন-মরণ, স্মৃতি-বিস্মৃতি সবকিছুকে ছুঁয়ে এলেও তার অন্তরের ভেতর যে শক্তি অগ্নিআঁচ হয়ে সেইসব অনুভুতিকে চাগিয়ে রাখে তা হলো দেশপ্রেম।

বৈশাখী পূর্ণিমা থেকে শুরু করে আপাত-সর্বশেষ বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবেলায় — প্রতিটি কাব্যগন্থে জীবনের উদ্দামতায়, মৃত্যুর শীতলতায়, প্রেমের আকুতিতে, নৈরাশ্যের দীর্ঘশ্বাসে, লড়াইয়ের সংক্ষুব্ধ ফেনায় ভেতর থেকে বুদ্বুদ তুলেছে একটাই– দেশপ্রেম।

কিন্তু সেই দেশ যেমন মানুষকে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তার সংকীর্ণ বলয়ের ভেতর থেকে দেখার আধার হিসেবে আসেনি, তেমনি তার প্রতি প্রেমের প্রকাশটাও হয়নি স্বার্থ বা স্ব-অর্থে বিশেষায়িত কোনো টান বা অনুভব। সেই দেশ একজন কবির কবিতা-করে-তোলার সকল উপাদানের ফসলক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কবি সেই ফসলকেই চাষার প্রকৃত গর্বে বিশ্বহাওয়ায় সুবাসিত করে মাতিয়ে তোলেন। সেজন্য তা ethno-aesthetice নৃ-নান্দনিক তাৎপর্যে শক্তিতে সমকালীন বাংলা-কবিতার বৃহৎ-প্রতিনিধিত্ব করে (সূত্র :Oxford India Anthology of Bengali Literature-এ মোহাম্মদ রফিকের কবিতার দীর্ঘায়তন-অনুবাদ প্রকাশ।) কবির বিশ্বজনীনতা তার কবিতাপ্রণালীতে উদ্বিহারের নির্ভূগোল-ইচ্ছা নয়, আপন দেশ (সেই দেশ শুধু রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার দেশ নয়, নিজের বাসের ভূমি, নিজের যাপিত জীবনের পূর্বাপর, সামগ্রিকতা, যার ভেতর তার প্রাত্যহিকতা, কল্পনা ও স্বপ্নের চলমান রসায়ন।)-এর জমিনে দাঁড়ানো সত্তার ‘বিশ্বজোড়া ফাঁদ’ পাতার মনন ও সৃজন-আকাঙ্ক্ষা।

মোহাম্মদ রফিকের সেই দেশ কখনো কৃষ্ণাভ। লেখেন :
‘কৃষ্ণাভ স্বদেশ তুমি। তুমি শান্তি। সন্ত্রস্ত হৃদয়
জুড়ে ওড়ে মুক্তির পতাকা। জনগণ ইস্তেহার। ঘোর
অমাবস্যা চিরে তুমি স্বাধীন পূর্ণিমা। দুধেরক্তে নাওয়া।’
(স্বদেশী নিঃশ্বাস তুমিময়)

সে দেশ কখনো বেহুলা আর মহুয়ার ‘শাড়ি বেয়ে ভিজে ওঠা’(মহুয়া, বেহুলা), ‘উত্তাল বাহুতে ঢেউয়ে ভাসমান’ (শোকতীর্তে পুনর্বার) কোনো জনপদ।

কখনো সেই দেশের ভেতর থাকে আমিষাশী জল, যে খেয়ে নেয় কোনো নারীর ছেলে-স্বামী-একটিমাত্র মেয়ে; কখনো বা কামিনীর ঝাড়, মাতোয়ারা ফুল, গোখরো সাপ, খর রোদে দগ্ধ চামেলি, বিষন্ন তক্ষক, নোংরা সাড়হীন দেহ, বাদুড়ের হিংস্র চেরা দাঁত, শেয়ালের চিৎকার, এলোকেশী আলুথালু ভুবনডাঙা, শ্যাওলাজমা নড়বড়ে পুরনো শরীর, ক্ষ্যাপা কীর্তিনাশা, গাওদিয়া, বসন, শীতার্ত বর্ষার ফলা, সারা গায়ে ল্যাপটানো শাড়ি, সূর্যের লোলুপ চোখ, রোদে পোড়া রূপশালি ধান, কবিতার ছেঁড়া পঙক্তি, উথাল-পাথাল জল, ভাজা ইলিশের পোড়া ঘ্রাণ, মূঢ় শতাব্দীর অভিশপ্ত এলোচুল, আড়াআড়ি পড়ে থাকা ন্যাংটো লাশ, কর্ষণে উন্মুখ দীর্ঘ দিন, নেতানো কলমীর দাম তেতো ফুল, ঘোলাটে পুকুৃর, ক্ষুধার্ত গঞ্জের হাট, আদিগন্ত ফুঁসে আসা ঝড়, উড়ে যাওয়া চালের মাস্তুল, বানভাসি ভাতের বাসন, অনাহারী সন্তানের পচা লাশ, অভিশপ্ত ইতিহাস, ফতেমার কপিশ চোখের লোনাজল, ঘোমটা-টানা মাটির বাসর ফুঁড়ে কামিনীর ঘ্রাণ, অভাবের নিশুত শিথান, মেহেদির রক্তলাল আলতামাখা দুঃস্বপ্নের শিস, কপিলার জলজ সংসার, মৎস্যগন্ধা, মাতিকিসকু, হাড়ের পাহাড়, ধানের গুচ্ছের ফাঁকে খণ্ডযুদ্ধ রৌদ্র ও ছায়ার, সড়কির ফলায় বিদ্ধ‎ ছিন্নমুণ্ডু চি‎িহ্নত শত্রুর, নিরন্ন ব্যাঙের ছাও, ধানশূন্য ধান, উদাম ইরফান, সোহাগি সংসার, শকুনিবৃষ্টির কান্না, পাঁশুটে নকশির কাঁথা, পোয়াতির বেশরম লাশ, ধস-নামা যে-কোনো বৃদ্ধার মেরুদ- বেয়ে পলিজমা ভাঙন কাহিনী, মৎস্যগন্ধ্যা, কচু-ঘেচুডোবা মোড়া শিশুকাল, নৌকার গলুই, এক-বাটি মুড়িলঙ্কা, এক-এক-চিলতে বিদ্যুৎ-সন্ত্রাস, দুধেল রোদ্দুর, অন্তর শরীর ভরে হাই তোলা ধানের সুবাস, বিবশ-জ্যোৎস্না, মৃত্তিকার সহোদরা, কাদাবালু মাখামাখি ধড়, ছেঁড়াখোরা সারাটা আকাশ, গাল চুনজর্দা হাসি, সোঁদা-মাটি ঘ্রাণ…

মোহাম্মদ রফিকের অধিকাংশ কবিতার মর্মমূলে ভাঙাগড়া ভাসাডোবা সুন্দরঅসুন্দর চেনাঅচেনা রূপকথালোককথা পুরাণআখ্যান উত্থানপতনের দ্বন্দমধুর এক দেশ রসসিক্ত হয়ে বিকশিত করেছে কবিতার বহুধাবিচ্ছুরিত বাকশাখাপত্রাবলী। যাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসি তার সাথেই তো দ্বন্দ্ব চলে। রফিকের কবিতার প্রকৃতি, মানুষ, জীবন, ভূগোল এবং মানুষের সকল অনুভূতির, আবেগ, কাতরতা, বেদনা, রোমন্থন, বিচ্ছেদের সুর সবকিছু হয়ে ওঠে গভীরভাবে ‘দেশীয়’। এক অদ্ভুত নির্লিপ্ত কায়দায় তিনি কাজটি সম্পন্ন করেন। যেমন :

সাহসী মুখের রং পেয়ে যায় ঘাস,
মাঠের ওপরে মেঘ জলভারে নত
স্তব্ধ ক্ষণ মৌন রোদ ষোড়শী কিষানী,
নীলিম দৃষ্টির তাপে কাঁপে ভরা বিল ;

অলস হাঁটার ঢং-এ নড়ে পাটগাছ
উর্বর জমিতে চাষ দেয়া হবে বীজ
সলাজ ঋতুর নম্র প্রস্তাবনা শোনে,
অচিন দেহের বাঁকে নেমেছে জোয়ার ;

সোনালি ব্রীড়ার ছলে খেলে যায় হাওয়া
স্বপ্ন বোনে ছিঁড়ে ফেলে তন্তু আকাঙ্ক্ষার
রক্তিম শস্যের গুচ্ছে পোয়াতীর স্বাদ
উষ্ণ হাত স্পর্শ চায় ধারালো কাস্তের;
ভেজা মুখ লোনা মেঘ ভাঁটায় জোয়ারে
এই বৃষ্টি এই খরা বেড়ে ওঠে ধান।’
(রূপকথা, তাও নয়)

তাঁর একেবারেই অনালোচিত একটি কবিতা পেশ করলাম। প্রকৃতির নানান উপাদান, সক্রিয় ঘটনারাশি আছে এই কবিতায়, কিন্তু প্রতিটিই মানুষের ভাব-অনুভব এমনকি অঙ্গের সাথে যুক্ত হয়ে নিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ, তা ঘটেছে অবলীলায়। ঘাস পেয়ে যায় সাহসী মুখের রং, মেঘ জলভারে নত, যেন জল এখানে যেন বিপুল আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, মৌন রোদ ষোড়শী কিষানী, যে ক্ষেতে কাজে নেমেছে, সেই ক্ষেত একই সাথে শ্রমের ও সংসারের, তার কম্পিত বাসনার তাপে সম্ভাবনার বিল ভরে ওঠে, আগামী উর্বরা দিনের সম্ভাবনার দ্ব্যর্থক এক জোয়ার তার দেহের বাঁকে নেমেছে, কারণ সে জানে সে শস্য ও ফসলের জন্ম দিতে পারে, জল-কাদার ভেতর থেকে শস্য ফলানোর জীবন কিষানীর কাম-প্রেম-আকাঙ্ক্ষার সবকিছু অনন্য হয়ে উঠেছে তাদেরই শ্রমজীবনের অনুষঙ্গে, লজ্জা– সেও খেলে যাওয়া হাওয়ার মতো, তবু আকাঙ্ক্ষার তন্তু ছিঁড়ে ফেলারও বেদনা, এমনই অনিশ্চিত এই স্বপ্নযাত্রা, পোয়াতীর জঠর থেকে যে রক্ত উদগীরিত হয় তারই ভেতর শস্যসন্তানের মুখ ভেসে ওঠে, যে উষ্ণ হাত ধারালো কাস্তের স্পর্শ চায়, পাকা ধান কেটে নেয়ার জন্য কাস্তেই সেই একমাত্র হাতিয়ার, শস্য চায় তার স্পর্শ, যেভাবে নারী চায় পুরুষের সেই প্রেমকাম-উষ্ণ স্পর্শের। কিন্তু এখানে বৃুষ্টি হয় বন্যা হয় খরা হয়, জীবনের সকল অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে জীবন, সেখানে মুখ তো ভিজে উঠবেই, মেঘও অশ্রুনুনে মেশা, আর নিরন্তর এক জোয়ার ভাটার খেলা। অর্থাৎ আশা আর আশাহীনতার চক্র। এই যে পুরো একটি কবিতা অবলীলায় দেহ কাম ঔরস গর্ভ মন মুখের কথা বলে গেল তার পরতে পরতে লেগে রইল এক জৈবনিক রূঢ় বাস্তবতা, যার আয়নায় চেনা হয়ে যায় একটি দেশ।

রফিকীয় সেই দেশ আর দেশপ্রেম উচ্চকিত তো নয়ই উচ্চারিতও নয়, জাতীয়তাবোধ-উস্কানোর কাব্যিক প্রপাগাণ্ডা সেখানে নেই, সেখানে তার চোখের সামনে দেখা এক ভাঙাগড়ার ডোবাভাসার বাংলাদেশ বিশেষত দক্ষিণবঙ্গ আছে নদী-সমুদ্রের জোয়ারে-ভাটায় … যে-দেশের জন্য তিনি লড়াই করেছেন, সে দেশের নাম বারবার বলার মধ্য দিয়ে তৈরি করা কোনো ছল-হীনম্মন্যতার কবি তিনি নন, বরং তার রূপকে, সংকটের রসায়নকে, মানুষের বিপন্নতাকে এবং বিপন্ন সুন্দরতাকেও পলে পলে বুঝে নিতে চান তিনি, দেখে নিতে চান, একটা লড়াই তিনি করে এসেছেন যুদ্ধের ময়দানে, আগ্রাসী শক্তিকে হটিয়েছেন দেশ-এর আঙিনা থেকে, এখন আর কার বিরুদ্ধে উচ্চকিত হবেন, এখন সবাই তার দোসর সোদর; এবার তাই তিনি হয়ে উঠেছেন পর্যবেক্ষক, নিজের ভূখন্ডকে তার মানুষকে দেখে চলেন বুঝে চলেন আর নিখাদ কবির চোখ দিয়ে মুহুর্মুহু আবিষ্কার করে চলেন তাদের পারস্পরিক বেড়ে-ওঠা ভেঙে-পড়া আর উঠে-দাঁড়ানোর লীলা। কিন্তু তার সেই দেখা দূর থেকে নয় কখনোই, একেবারে হাত দিয়ে স্পর্শ করে, সকল রক্তের ভেতর রক্তাক্ত হয়ে, পলিক্লেদে মাখা হয়ে, লোনাজলে ভিজে গিয়ে, যেখানে ‘জলে জলে ভাঙা চাঁদ কেঁদে ওঠে বিদায় বিদায়।’ এমনকি যখন দিনান্তে এই অনুভূতি কবির মানুষের পরিচিত কন্ঠস্বর ধরে উচ্চারিত হয় ‘এ জীবন অন্য কারও/ আমি শুধু যাপন করেছি’ বলে, তখনও তা কেবল এক ব্যক্তির নিয়তিনির্ধারিত নিঃসারতার দীর্ঘশ্বাস নয়, তা হয়ে ওঠে ‘খড়-বিচুলিতে মুখ গুঁজে’ পড়ে থাকা এক কালের আক্ষেপ।

শুরুতে যা বলেছিলাম, সেই অনুভব, যা কবিতায় দেখার চেয়ে শক্তিমান, মোহাম্মদ রফিকের কবিতায় তা-ই যেন ছড়িয়ে যায় পাঠকের তন্ত্রীতে। সেজন্যই তিনি বলতে পারেন, ‘নেই থেকে এই তুমি/তুমি তো আজ ওই দূর, বহুদূর…’। (মৎস্যগন্ধা) কিংবা কবিতার পরিচয় খুঁজতে গিয়ে জন্ম-সৃষ্টি-প্রকৃতির এক গূঢ় সম্পর্ক আবিষ্কার করেন, যার প্রকাশ দৃশ্যসুখের চেয়ে অনুভূতির গহনতলই স্পর্শ করে অবলীলায় :

আসার সময়, আসে একইভাবে, একই পথ ধরে,
সাক্ষী তার মাতার জরায়ু, বনমালতীর ঊরু;

যাবার বেলায়, যায় যার যার মতো, ভিন-ভিন,
বলে ওই স্ত্রীগহ্বর, মাঠে-মাঠে মাঘের ফলন;

বয় হাওয়া, আমৃত্যু খাতের দুই পাশে ধাবমান
উড়ো খড়, বালুস্রোত, কী ফুল বিপুল তমিস্রায়।
(কবিতা/ দোমাটির মুখ)

অভিনব, অদ্ভুত, স্বেচ্ছাধীন বাকপ্রতিমায়, রূপকল্পে, যে ‘অভিনবত্ব’ তৈরির কাব্যনেশায় আমরা মেতেছি, মাতছি, সেখান থেকে মোহাম্মদ রফিক অনেক দূরের। আমরা তার কাছে যাই নি, যাই না, যাবোও না হয়তো। কারণ নিত্য পাশ-কেটে-যাওয়ার যে জীবনবাস্তবতা একটা বেদনার ভূগোলে সামষ্টিক রূপ নিয়ে আছে, তার পাঠ থেকে আপন আপন বাস্তবতা তৈরির কাব্যিক নান্দনিক লড়াই-সাধনার গভীর প্রত্যয় আমরা খুঁজে পাইনি বা পেয়েও হারিয়েছি; ফলে শূন্য থেকে, দূরাকাশ থেকে, নভোমণ্ডল থেকে, ভার্চুয়াল সংযোগের দেশতন্ত্রী থেকে উল্লম্ফনের কাব্যবাক্যরাশি আমরা আমদানি করে আধুনিক কিংবা আরও আধুনিক কবিতামণ্ডল রচনা করেছি, এবং নির্লজ্জভাবে বলে চলেছি উপনিবেশ-বিরোধিতার কথা। আমাদের যে কবিতা তার নিতান্ত ব্যক্তিক অবসাদের ভুবনকে ব্যক্তিরই নান্দনিক স্বেচ্ছাচাারে ভরিয়ে রেখেছে, সেখান থেকে রফিকের কবিতা অন্যদিকে মুখ ফেরাতে বাধ্য করে। এ কবিতা চমকে যাওয়ার নয়, থমকে যাওয়ার নয়, বা‎ক-ধ্ব‎িন-চিহ্ন‎‎ ব্যবহারের উল্লম্ফন নয়, এ কবিতা নিজের যাপিত জীবন ও ভূগোলের আপনমানুষ আপনপ্রকৃতি আপনকালের গর্ভনাড়ি ছিঁড়েখুরে জন্ম দেয় উপলব্ধি ও উচ্চারণের নতুন প্রকরণ।

‘তোমার শরীর থেকে ছিটকে পড়া
একটি খণ্ডধুমকেতু যেন
ছাই হতে গিয়ে ফের জেগে উঠি
তোমার প্রগাঢ় স্নেহে, অবো‎ধ আদরে
তাই আজও
মাটি ছুঁয়ে বলি, মাগো তোমাকে প্রণাম!’

(ইংরেজ কবি টেনিসনের একটি কবিতায় আছে :
‘কোনো এক সোনালি মুহূর্তে
রোপন করেছি একটি বীজ।
একদা সেখানে ফুটল ফুল;
তোমরা বললে সে আগাছা।’

জন্ম আর জীবনের নঞর্থকতাকে দেখার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্য কী করে ভিন্ন হয়ে যায়, কী করে সে উৎসমূলে ফের গিয়ে প্রণত হয়, তাকে স্বভাবভাষায় এভাবেই নবায়ন করলেন রফিক।)

শেষ কাব্যগ্রন্থের বয়স-অন্তিমে দাঁড়ানো এক কবির ফের ফিরে তাকানা উৎসমূলে, মায়ের দিকে, তবু সেই পেশল মাটিকর্ষী চাষারু কলমের নড়াচড়া, ফের আপন মা’কে মা-কেবল করে না দেখে মাটির সঙ্গে মেলানোর খেলা। সেখানে মাটিই যেন হয়ে ওঠে দেশ। দেশ তো একটা জায়গাও, মানুষের বারবার ফেরার, যেখানে ফিরেছিলেন কোনো এক সুদূর দেশের কবি এমে সেজায়ার, এক ব্যঞ্জনাগত মহাকাব্যিক বয়ানের মধ্য দিয়ে (বলেছিলেন, ‘চূড়োর অনেক উঁচুতে উড়ে যাওয়া এলামেলো চুলকে/ অবিশ্রাম আছড়ায় পাল্টায় হাওয়া/ লোনা লাফানো ঘোড়ার মতো/ আর আমার নাড়িতে আমি টের পেয়ে যাই যে এই/ ভিনদেশিপনায় আমার সত্যিকার কোনো পুষ্টি নেই। — দেশে ফেরার খাতা’); আর মোহাম্মদ রফিকে যে জায়গাটি মাটি, পদ্মা-মেঘনা, নৌকার গলুই, আর কখনো বা আপন শরীর (‘ভাসান’ কবিতায় আছে : এইবার দেহখানি ডিঙি-নাও/ ভেসে চলে মেঘে-মেঘে…)

এই নিজকে ফিরে ফিরে খুঁড়ে চলার, দেশকে ফিরে ফিরে খুঁজে পাওয়ার, জীবনকে ঘুরেফিরে লুফে নেবার দুর্দমনীয় কাব্যিকতার নাম মোহাম্মদ রফিক।
দেশকে, তার পরিপূর্ণ রূপমালার ভেতর দিয়েই ভালোবেসেছেন রফিক, তার প্রেমে পড়েছেন, তাকে ভর্ৎসনা করেছেন, তার হতশ্রীকে দেখেছেন, রূপসুধাকে পান করেছেন, সেই দেশের জোয়ার-ভাটায় দুলতে দুলতে তিনি যে কবিতার জলবায়ু তৈরি করে নিলেন, তাও হয়ে উঠল তার দেশ। কবিতাই হয়ে উঠল তার দেশ। দেশ আর কবিতা তার ‘একই দেহে পরস্পর বেড়ে ওঠা’র জীবনী। সেজন্য দেশকে যেমন কবিতাকেও তেমনি কোনোকালেই এক ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার নান্দনিক হরিলুটের খেলায় মজতে দেন নি, যেমন খাঁটি দেশপ্রেমিক পারেন না দেশকে নিয়ে তা হতে দিতে।

তিরিশের দশকের কাব্যধারাকে চরম উপনিবেশ-প্রভাবিত বলা হয়ে থাকে, জীবনানন্দও যেখান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নন। কিন্তু আমরা সেই উপনিবেশের সাহিত্যকল্প থেকে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে পৃথক হতে পারলাম ভাবলে হতাশ হতে হয়। গ্লোবাল উপনিবেশকে মেনে নেবার বাসনাও আমাদের কবিতার চরিত্রে এখন ফুটে উঠছে। সেটাও নব্য আধুনিকতা। নিজের ভাষাকে বিষয়কে উপলব্ধিকে উপনিবেশ-মুক্ত করতে পারার কাজটি মোহাম্মদ রফিক সবচেয়ে সবেগে করে গেছেন। সে আলোচনা এখানে সম্ভব নয়, কিন্তু একথা বলা যায়, উপমাপ্রয়োগের ধরন, ভাষা-ব্যবহারের ভঙ্গি, রূপ-নির্মাণের কারিগরি, বিষয়-ভাবনার সূত্র কোনোটাতেই রফিক ঔপনিবেশিক নন। উপনিবেশের বর্তমান ইশারাই হলো ব্যক্তিক হীনম্মন্যতার বীজ পুষে রাখা, আত্মবিকাশপ্রকাশের অনুকূল প্রতিকূলকে বুঝে নিজস্ব হতাশা নৈরাশ্যের বিস্তার ঘটানো, এবং সর্বোপরি নিজের সবকিছুকে নিয়ে দোনোমনার অবসাদ। সেজন্যই ঔপনিবেশিক কবিরা নিজেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা ভেবে ভূগোলজমিনদেশ-বিহীন এক অন্ধপ্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করে আত্মরতির সুধা পান করে আনন্দ পান। অশ্রুনুনও সেই নান্দনিক সুধাই। মোহাম্মদ রফিক একটিবারের জন্যও সেই প্রকোষ্ঠে ঢোকেননি। বরং প্রতিমুহূর্তে মোকাবেলা আর সমঝোতা করেছেন সামষ্টিক জীবনের সুন্দর আর বৈকল্যের সঙ্গে। সেজন্য তাঁর চাঁদ ‘পদ্মা-যমুার বালুজল মাখামাখি খাটে বিছানো শয্যায়/মধ্যরাতে আড়াআড়ি শুয়ে’ থাকে (ঘাট আরিচায়) কিংবা তা তারপরও–এখনও– আশা নিয়ে ঝোপের আড়ালে ‘ধুতুরার বোঁটাছুঁয়ে পাপড়ি মেলে’। তাই দেশকে তিনি নিজের (একজন কবির) কাব্যতৎপরতার নিয়ামক হিসেবে দেখেননি, কবিতার বিষয বা ভাব হিসেবে দেশ-এর সামনে নিজেকে নান্দনিক কারিগর হিসেবে বসিয়ে তাকে রোমান্টিক বা সিম্বলিক কিছু করে তুলেননি; ক্রম সঞ্চরণশীল, ক্রিয়াশীল, জৈবনিক আধারভূগোল হিসেবে তার সকল সংঘটনকে–অবশ্যই একটি বিশেষ অঞ্চলের ভূ-সাংস্কৃতিক (Echosocial) প্রেক্ষাপটে, এবং তা বাংলাদেশের প্রতীকী সামগ্রিক রূপ হিসেবে সিদ্ধÑকবির নান্দনিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিত থেকে নতুন করে চেনানোর প্রয়াস করেছেন এবং তা করতে গিয়ে নিজের মতো করে একটি ভাষাকেও ভালোবেসেছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন, এক বিষয়-আস্তীর্ণ ভাষা (Content-dominated language) বিষয়ী-শাসিত ভাষা (Form-dominated language) নয়। কিন্তু এভাবেই ভাষাকে বিষয়ের স্বতঃপরিবেষ্টিত জল-হাওয়ার সাথে অভিযোজিত করতে গিয়ে তিনি যে ভাষাকে নির্মাণ করে ফেললেন, সেখান থেকে একটিবারের জন্যও বিচ্যুত হননি, এমনকি কোনোরূপ নিরীক্ষার অজুহাতেও না, কারণ ততদিনে কবির সে ভাষাও তার কাছে ভাবনাযাপনের এক দেশ, ডাব্লিউ এইচ অডেন যাকে বলেছিলেন ‘কবির প্রথম ভালোবাসা’।

আমরা পারিনি এই নব-বঙ্গীয়-কাব্যের উত্তরাধিকার বয়ে নিতে। এই জীবন্ত রক্তমাংসময় অভান অকৃত্রিম আত্মহৃৎসংযুক্ত আশ্চর্য স্বাভাবিক কবিতা-ধারায় ভিজে রক্তাক্ত হবার দুরন্ত কঠিন কাব্যিক মানক দায় বয়ে নিতে অপারগ থেকেছি আমরা, নিজেদের রতিরোমন্থনচমকগমকের বিকৃত সব নিরীক্ষার স্থূল প্রবণতার রোগে শীর্ণদশা হয়ে। কেন পারিনি তার আরও কারণ আছে, কিন্তু সব তো এখনই বলার নয় :

কিছু তো অব্যক্ত থাক, এই ঘোর মহাসান্ধ্যকালে
ভাষার কলঙ্ক কথা নাভিশ্বাস বাক্যের আড়ালে…
(কালাপানি)

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com