কেন শুদ্ধতম ?

ওমর শামস | ২২ অক্টোবর ২০১৫ ১:১১ অপরাহ্ন

jibon.jpg

১. ‘শুদ্ধতম’ কাকে বলে?

আমরা কি বুঝি? ‘শুদ্ধতম’ কবি, চিত্রী, সঙ্গীতশিল্পী – খুব মুশকিল তাকে সংজ্ঞায় চিহ্নিত করা। অন্নদাশঙ্কর জীবনানন্দকে কেন ‘শুদ্ধতম’ আখ্যা দিয়েছিলেন, আমার জানা নেই। একটা আন্দাজ করা যেতে পারে – যে শিল্পী আদ্যোপান্ত, সর্বক্ষণ, নিদ্রায়-জাগরণে শিল্পের আরাধনাতেই নিমগ্ন থাকেন তাঁকে অথবা যিনি জাগ্রত সত্তার থেকে নয়, অবচেতন থেকেই শিল্পকে গ্রহণ এবং নির্মাণ করেন -তিনিই শুদ্ধ এবং এক স্তরে গিয়ে কেউ শুদ্ধতম। এইরকম ঘোরে যাঁরা থাকেন তাঁরা শুদ্ধতার কাছে যেতে চাইছেন অথবা শুদ্ধতায় ডুবে আছেন। এই অর্থে ইউরিপিদিস, রুমী, দান্তে, লিওনার্দো, সেক্সপীয়র, নিউটন, গাউস, রীমান, রেমব্রাঁ, রামানুজন – এঁরা সবাই শুদ্ধতম। তবে, ‘শুদ্ধতা’-র বদলে যদি আরেকটু পার্থিব শব্দ, ‘মৌলিকতা’, বসাই, তবে প্রশ্নটি রূপান্তরিত হয়ে দাঁড়ায় – কেন মৌলিক ? এই প্রশ্নের যৌক্তিক ও সংগতিপূর্ণ উত্তর দেয়া সম্ভব। শিরোনাম যাই থাকুক, আমি এই প্রশ্নের – জীবনানন্দ কেন মৌলিক, না, ‘জীবনানন্দ কেন বাংলা কবিতায় মৌলিক’ – উত্তর দেবার চেষ্টা করবো।
২. জীবনানন্দ কেন বাংলা কবিতায় মৌলিক ?
১. জীবনানন্দই প্রথম বাংলা কবিতাকে গান থেকে সম্পূর্ণ বিশ্লিষ্ট করলেন।১ বাংলা কবিতা এবং গান এক সঙ্গেই যাত্রা শুরু করেছিলো। আদি পয়ারের ৮+৬ মাত্রার উচ্চারণেই (আশলে সঙ্গীতের হিশাবে ৮+৮, শ্বাসক্ষেপ হেতু) কাহার্‌বা লুকিয়ে থাকে এবং স্তবক বিন্যাসের মধ্যেই অস্থায়ী-অন্তরার গঠন। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ এমনকি ‘দুঃসময়’কে বন্দিশে মানে গানে পরিণত করা মুশকিল নয়, কিন্তু জীবনানন্দ-র ক্যাম্পে, অবসরের গান, দুজন, আট বছর আগের একদিন, গোধূলি সন্ধির নৃত্য, অনন্দা সঙ্গীত থেকে বহু দূরের।
২. জীবনানন্দই প্রথম চিত্রকল্পের মধ্যে দিয়ে বাংলা কবিতাকে প্রতিভাস করা শেখালেন। চর্যাপদ থেকে রবীন্দ্রনাথ অব্দি রূপকের ব্যবহার ছিলো, ‘ক-র মতো খ’ ধরণের উপমা ছিলো কিন্তু ঠিক চিত্রকল্প ছিলো না – অনন্বিত জিনিশের প্রতিস্থাপন এবং প্রতিতুলনার মধ্যে দিয়ে চিত্রস্তনিত কল্পনার প্রচারণা জীবনানন্দই বাংলা কবিতায় নিয়ে এলেন। এই ধারণার সুঠাম থিওরি বোদলেয়ার-ই রচনা করেছিলেন তাঁর ‘প্রতিসঙ্গ২ (Correspondences)’ কবিতায় । অনুষঙ্গের থেকে অনুষঙ্গে কল্পনা-বিচরণজনিত ব্যঞ্জনার উৎসারণ জীবনানন্দই সার্থক প্রয়োগে বাংলা কবিতায় করে দেখালেন।
৩. শুধু চিত্রকল্প নয়, শ্রুতিকল্প৩ (ধ্বনি, অনুপ্রাস, স্বরবর্ণ সমন্বয়, মধ্যমিল, প্রবাহমানতা, ছন্দ, সিনট্যাক্স) নিজের মতো করে তৈরি করেছিলেন যা আগে ছিলো না। এবং শ্রুতি ও চিত্রকল্পকে একে অন্যের সহযোগী হিশেবে সূক্ষ্ম প্রয়োগ করেছিলেন, – ‘বনলতা সেন’ এর চিত্রকল্প এবং শ্রুতির সমন্বয় স্মরণ করুন। এই কবিতার অদ্ভূত উপমা-চিত্রকল্পগুলো সম্পূরক ভাষা-শ্রুতি ছাড়া কি ফুটে উঠতো ? তিনি অক্ষরবৃত্তকে প্রধানভাবে ব্যবহার করলেও, বাংলা কবিতায় অতিবিলম্বিত লয়ের চলন তাঁর নিজস্ব অবদান। ভাষা, ছন্দ-র (এবং গদ্যকবিতার) এই স্থিতিস্থাপকতার জন্যই তিনি জটিল বিষয়কে কবিতায় প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৪. জীবনানন্দ কবিতার নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছিলেন এবং তাঁর কাব্যভঙ্গি তাঁরই চিত্র-শ্রুতিকল্প ওই ভাষায় একাত্ম-সংগ্রথিত হয়ে। সঞ্জয় ভট্টাচার্য৪-র সঙ্গে আমি এক মত যে, “রবীন্দ্রনাথের কাব্যভঙ্গি বাংলাভাষাকে যতোটা প্রকাশ ক্ষমতা দিয়েছিল, জীবনানন্দের কাব্যভঙ্গি তার চাইতে খানিকটা বেশি দিয়েছে।” আধুনিক কবিতার একটি গন্তব্য – কবিতাকে কথ্য ভাষার কাছে নিতে হবে – এই সূত্রকে তিনি বাংলা কবিতায় ফলপ্রসূ করেছিলেন অন্যের চেয়ে অনেক বেশি।
৫. জীবনানন্দ-র ইতিহাসভিত্তিক ‘প্রোগ্রেস’ বা প্রগতির৫ সঠিক ধারণা ছিলো এবং সেই সূত্রেই তিনি তাঁর কবিতাকে তাঁর কালের রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সোজা কথায় তিনি তাঁর সময়কে ধরতে পেরেছিলেন তাঁর কবিতায়।
৬. জীবনানন্দ আধুনিক কবিতা কি তার শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা এবং ব্যাখ্যা দিতে পেরেছিলেন আধুনিক কবিতা, কবিতার কথা, নিবন্ধে। তাঁর আধু্নিকতার ধারণা বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো-র চিন্তাকে আত্মস্থ করে আরো কিছুদূর এগিয়ে, কেননা তিনি ইতিহাস, বিজ্ঞানের প্রগতির সূত্রের সঙ্গে কবিতার আধুনিকতার সংযোগ ধারণ করতে পেরেছিলেন, শুধু টেকনিকের বিচারেই কিম্বা বোদলেয়ারীয় নির্বেদে, র‌্যাঁবো-র অবচেতন-মর্মীতায় আধুনিকতাবোধকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। টিকা ৫ অংশে কবিতার কথার থেকে কিছু উদ্ধৃতিই এই মতের সাক্ষ্য দেবে। উল্লেখযোগ্য যে অক্টাবিও পাজ৫ বিশ শতকের শেষাংশে একই ধরণের আধুনিকতার ধারণা দিয়েছেন।
জীবনানন্দ তাঁর নিজস্ব আধুনিক কবিতার চিন্তাহেতুই বিশাল অভিজ্ঞতা ও জটিল বিষয়ের সূক্ষ্ম কবিতা লিখতে পেরেছিলেন।
৭. কবিতা যে বিষয় নিয়ে শুচিবায়ু-আক্রান্ত৬ নয়, যে-কোনো অভিজ্ঞতা ও কল্পনা কবিতার বিষয়, এ-কথা তুলনীয়ভাবে জীবনানন্দই তিরিশের অন্য সব কবির এবং আগেকার কবিদের থেকে ভালো বুঝেছিলেন। সে-হেতু তিনি বাস্তুত্যাগের [বলিল অশ্বত্থ সেই ], যুদ্ধের [ গোধূলি সন্ধির নৃত্য, সময়ের তীরে, ভোর ও ছয়টি বমার : ১৯৪২ ], ঔপনিবেশিকতার [ নিরঙ্কুশ, বিভিন্ন কোরাস, নাবিকী ], দুর্ভিক্ষের [ তিমির হননের গান, বিভিন্ন কোরাস ], সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার [১৯৪৬-৪৭ ], নিঃসঙ্গতা-নির্বেদের [ অবসরের গান, আট বছর আগের একদিন ], ফাসিবাদ আশঙ্কার [ অনন্দা ], অর্থনৈতিক ধসের [ ১৯৪৬-৪৭ ] সার্থক কবিতা লিখতে পেরেছিলেন। প্রেম, মৃত্যুচিন্তা এ-সব প্রচলিত প্রসঙ্গে কবিতা তো তিনি লিখেছিলেনই, তাঁর অননুকরণীয় অভিজ্ঞতা ও প্রকাশভঙ্গিতে। অনভ্যস্ত বাঙালি পাঠকের এ-সব ধরতে-বুঝতে বহু কাল লেগে গেছে।
৮. বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ ছাত্র না হয়েও, জীবনানন্দ বিজ্ঞানের ভিত্তির মূল সূত্রটি ধরতে পেরেছিলেন। সমাজে, ইতিহাসে বিজ্ঞানের সংক্রমণ এবং সেই হেতু অভিজ্ঞতা ও কবিতায় তার প্রতিফলন তাঁর শেষ দিককার কবিতায় অল্প হলেও পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ, উপনিষদে আজীবন আস্থাবান থেকে, বিজ্ঞানের মূল প্রতিপাদ্য ধরতে পারেন নি। আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনেই সেটা ধরা পড়ে।
৯. বাংলা ভাষায় গদ্য-কবিতা রবীন্দ্রনাথ প্রথম লিখলেও, এই শৈলীর সবল ও ঋজু রূপটি জীবনানন্দই৭ দিয়েছিলেন। যেহেতু চিত্র-শ্রুতিকল্পর দায়িত্ব ও গুরুত্ব তিনি সম্যক বুঝেছিলেন, কবিতা থেকে মাত্রা সরিয়ে নিলে অন্য কি উপকরণ টেনে আনলে কবিতা ব্যঞ্জনা রক্ষা করে কথা বলতে পারবে, এ সূত্রটি তিনি অন্যের চেয়ে ভালো ধরতে পেরেছিলেন। বনলতা সেন এবং সাতটি তারার তিমির গ্রন্থদ্বয়ে ১৬টি এবং অগ্রন্থিত আরো কিছু অসাধারণ গদ্য-কবিতা লিখে তিনি পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন।
১০. জীবনানন্দ তুলনীয়ভাবে সবচেয়ে আন্তর্জাতিক, চিন্তায় এবং প্রকাশভঙ্গিতে।

৩. মৌলিক কেউ নয়
আর্কিমিডিস না থাকলে নিউটন হতো না, নিউটন না থাকলে আইনস্টাইন হতো না – এ-ভাবে আশলে কেউই মৌলিক নন। কবিরাও নন। নেরুদা-র উক্তি : No poet is original. কিন্তু জীবনানন্দ যা গ্রহণ করেছিলেন, ইউরোপীয় কবিদের কাছ থেকে, সে-সব চিন্তা, উপলব্ধি, টেকনিক সবকিছুকে তিনি আমূল অন্তঃস্থ করে নিজস্ব করে নিয়েছিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর দেশজ ঐতিহ্যর গ্রহণ এবং উৎসার অধীত শিক্ষাকে অবলম্বন ও দেশজ গ্রন্থণা দিয়েছিলো। জীবনানন্দ-র বোধ এবং কবিতা-বিকাশের বিস্তৃতি আমি তাঁর কালের ইউরোপীয় কোনো কবির কাছে পাই না।

টিকা ও গ্রন্থপঞ্জী :
১. আধুনিক বাংলা কবিতার পর্যালোচনা, উৎপলকুমার বসু // শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে, ২০০০, বিংশতিতম বঙ্গ সম্মেলন, আমেরিকা। এই পর্যবেক্ষণের লিখিত দলিল উৎপলকুমার বসু-র, অন্য কেউ আগে বা পরে লক্ষ্য করেছেন কি না তার দলিল আমি পাই নি।
কেউ কেউ জীবনানন্দ-র রূপসী বাংলা-র কবিতা, বনলতা সেন সুরে বসিয়েছেন, কিন্তু সেগুলো খুব খাপ খায় না – জোর করে গান বানানো। একটা পর্যবেক্ষণ বলা দরকার। আজকাল যে কোনো কথাতেই এক ‘টাইপের’ সুর বসানো যায়। কিন্তু এখানে আমরা বাংলার ঐতিহ্যমূলক গান রচনার কথা বলছি –‘কাব্যগীতি’ – যার ‘বোলে’ অন্ত্যমিল থাকে এবং সুর স্থায়ী-অন্তরায় গঠিত।
২. ১৮৫৭ তে প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ, Les Fleurs de Mal-এর ভূমিকায় লিখেছিলেন, That poetry is like the arts of painting, cooking, cosmetics is the ability to express every sensation of sweetness or bitterness, beautitude or horror … , এবং শুধু তাই নয়, তাঁর সনেট ‘Correspondences (প্রতিসঙ্গ)’ কবিতায় বিভিন্ন ইন্দ্রিয়র পারস্পরিক সম্পৃক্তি প্রকাশের গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

প্রতিসঙ্গ

শার্ল বোদলেয়ার

প্রকৃতি মন্দির এক ; স্তম্ভরাজি প্রাণের কম্পনে
মাঝে-মাঝে অস্পষ্ট প্রলাপে দেয় সংকেত ছাড়িয়ে ;
সেখানে মানুষ আসে প্রকৃতির অরণ্য পেরিয়ে
যে-অরণ্য দ্যাখে তাকে অনুক্ষণ অভ্যস্ত নয়নে।

বহু ভিন্ন প্রতিধ্বনি – দূরাগত, গভীর, অত্বর,
অবশেষে খুঁজে পায় অন্ধকার, গাঢ সমতান ,
নিশীথের মতো ব্যাপ্ত, স্বচ্ছতার মতো মহীয়ান –
সেইমতো বর্ণ, গন্ধ পরস্পরে জানায় উত্তর।

কোনো- কোনো গন্ধ যেন অর্গানের নিস্বনে কোমল,
প্রেইরির সবুজে মাখা, শিশুর পরশে সুখময় ;
অন্যেরা – বিজয়ী, খিন্ন, কলুষিত, ঐশ্বর্যে উচ্ছল,

এনে দেয় অসীমের আদিগন্ত বিরাট বিস্ময় –
অম্বর, কস্তুরি, ধূপ, পরিকীর্ণ গম্ভীর লোবান
গুঞ্জরে আনন্দময় আত্মা আর ইন্দ্রিয়র গান।

[ অনুবাদ: বুদ্ধদেব বসু ]

৩. ওমর শামস, জীবনানন্দ-র শ্রুতিকল্প
৪. সঞ্জয় ভট্টাচার্য, কবি জীবনানন্দ দাশ ; ভারবি, ১৯৭০
৫. Jacob Bronowski, The Origins of Knowledge and Imagination; Yale University Press, 1978
Progress-এর সবচেয়ে ভাল সংজ্ঞা দিয়েছেন Jacob Bronowski, “Progress is the exploration of our own errors”.
জীবনানন্দ দু-ধরণের আধুনিকতার কথা বলেছেন। (১) “মানুষের মনের চিরপদার্থ কবিতায় বা সাহিত্যে মহৎ লেখকদের হাতে যে বিশিষ্টতায় প্রকাশিত হয়ে ওঠে তাকেই আধুনিক সাহিত্য বা আধুনিক কবিতা বলা যেতে পারে।” (২) “যুগের বিশেষ কতকগুলো লক্ষণ এ কালের কবিতায় থাকে ; দেশকাল সন্ততি ( আজ পর্যন্ত মানুষের ধারণায় তাদের যেরূপ আমরা পাই সেই রূপ ) যে কোনো যুগের প্রাণবন্ত বলে পরিগণিত হবার সুযোগ যে কাব্যে লাভ করেছে সে-কবিতা আধুনিক।” সংজ্ঞা (২) ‘নমিনাল’ বা সাধারণ ধারণা, (১)-ই গভীরতর চিন্তা। কিন্তু জীবনানন্দ-র “চিরপদার্থ” কোনো ধ্রুবক নয়, তা সমাজ-ইতিহাস-রাজনীতি-বিজ্ঞান এ-সবের পরিবর্তন ও প্রগতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নিজেও ক্রমপরিবর্তনশীল। কালের কবিকে সঠিকভাবে সেইটেই ধরতে হয় আধুনিক হয়ে উঠবার জন্য। “ এই সব প্রচলিত সত্য নব যুগের মতন লৌকিক বুদ্ধি ও মনীষীদের অভিচেতন মূল্যানুসন্ধানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যে নবীন তনুলোক বিচরণ করে সেই তন্বীদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিলিত না হতে পারলে আধুনিক কালে সৎ কবিতা সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না। মানুষের আবহমান পৃথিবীর শীর্ষে এই নতুন পৃথিবী – এবং মানুষের অনেকদিনের চেনা সত্যমিথ্যার কুয়াশা ভেদ করে আজকের নতুন মিথ্যা ও সত্যের শরীরে অঙ্কিত বিজ্ঞানের স্বাক্ষর – এই সব নিয়েই আজকের কবিতার সৃষ্টি বলয়। …… আমাদের যুগে আমরা কতকগুলো পুরোনো সত্যকে নতুন করে গ্রহণ করেছি এবং উদ্বোধিত করেছি সমাজের ও বস্তুবিশ্বের কতকগুলো নতুন সত্য ; এগুলো আজ পর্যন্ত নতুন সত্য, আগামীকাল এদের সম্বন্ধে কি ভাববে জানা নেই। কয়ান্টাম থিওরি, সময়-দেশের আপেক্ষিকতা, দেশকালের সীমা প্রসৃতি, বিচূর্ণ পরমাণুর আশ্চর্য উত্তেজ, ধনতান্ত্রিক সুনিয়ম ও সুকৃতির উপর সৎসমাজের প্রতিষ্ঠা এই বৈজ্ঞানিক প্রবর্তনার পক্ষেই মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তনের সম্ভাব্যতা – কোনো আদর্শ আবেগের পথে নয় ; আমাদের পরবর্তী যুগ এসে এসব সত্যকে খতিয়ে দেখবে আর একবার। আমরাও দেখছি – এবং এই আশ্চর্য চলৎপ্রতিভাময়ী পটভূমির সঙ্গে একাত্ম হয়ে রয়েছে আধুনিক কবিমন ; সেই মনের থেকে উত্তীর্ণ ছন্দের দ্যোতনায় সৃষ্ট হয় যা তা-ই কবিতা। ”
Octavio Paz, Children of the Mire ; Harvard University Press, 1974.
উল্লিখিত আধুনিকতার ধারণাটি পিটার ওয়াটসন চমৎকারভাবে তাঁর বইতে ব্যাখ্যা করেছেন :
Peter Watson, The Modern Mind; HarperCollins Publications, 2001
৬. সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এই ইশ্তেহার জানতেন। সেইজন্যই রবীন্দ্রনাথ-এর সঙ্গে বাজি রেখে ‘কুক্কুট’-এর মতো দুর্দান্ত কবিতা লিখেছিলেন। তবু, তাঁর কবিতারও বিষয়ের সীমা আছে– প্রেম, এক্সিসটেনসিয়ালিস্টিক অবলম্বনহীনতা এবং দু-একটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন রাজনীতি বিষয়ের বাইরে তিনি যান নি।
৭. “আমাদের দেশে গদ্য-কবিতার দাবি নানা রকম অদেয় জিনিস চাইছিল যখন খানিকটা রবীন্দ্রনাথেরও সমর্থনে; অথবা আজকে – মার্কসীয় বিচারে কবিতা শুদ্ধ হল কিনা কোথাও-কোথাও তার আশ্চর্য আতিশয্যের ভিতরে।” – দেশ কাল ও কবিতা, কবিতার কথা।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — অক্টোবর ২২, ২০১৫ @ ৬:২৩ অপরাহ্ন

      পড়লাম। কবি ওমর শামস কবি জীবনান্দ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণামূলক লেখা লিখছেন যা আনন্দের, উপলব্ধির, প্রয়োজনের, সে জন্য তিনি দূরে থাকলেও মনে হয় খুব কাছেই আছেন। নিজের জিনিশ নিয়ে আমাদের উৎসাহ খুব কম, বাইরের কাউকে ধরতে পারলে এখানকার বুদ্ধিদীপ্ত বুদ্ধির মহলে একটা জায়গা মেলে এবং বিশেষজ্ঞ অভিধা জোটে। অপরাধ ওমর শামসেরও আছে, তিনি জীবনানন্দের নিচে আর নামতে চান না। আর একটু চক্ষু মেলুন দেখুন জীবনানন্দ এখানে নানা কবির নানা কবিতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছেন আরো একটু ভিন্ন প্রবাহ নিয়ে। সেটা জীবনানন্দেরও আনন্দ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. BInoy Barman — অক্টোবর ২৪, ২০১৫ @ ৮:৩৪ অপরাহ্ন

      ওমর শামসের লেখা ‘কেন শুদ্ধতম?’ পড়ে বোঝা যায় জীবনানন্দ কিভাবে অন্যান্য অনেক কবির চেয়ে আলাদা, মৌলিক। লেখকের যুক্তিগুলো অখণ্ডনীয়, পর্যবেক্ষণ সুচারু। তবে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য গ্রহণ করতে দ্বিধা হয়। ‘রবীন্দ্রনাথ, উপনিষদে আজীবন আস্থাবান থেকে, বিজ্ঞানের মূল প্রতিপাদ্য ধরতে পারেননি’ – এই রায় মেনে নেওয়া কঠিন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com