নন-ফিকশনের দস্তয়ভস্কি সোয়েতলানা অ্যালেক্সিয়েভিচ

আন্দালিব রাশদী | ১৩ অক্টোবর ২০১৫ ১১:৪৯ অপরাহ্ন

svetlana1.jpgনোবেল সাহিত্য পুরস্কার কি সাহিত্য থেকে সরে এলো? নাকি সাহিত্যের সীমানায় ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা’-কেও অন্তর্ভুক্ত করা হলো?
নন-ফিকশন আগেও বেশ ক’বার নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে সেন্টার স্টেজে এসেছে, কিন্তু দীর্ঘ সময় মঞ্চ দখল করে রাখতে পারেনি।
তলস্তয়ের মতো সর্বকালের সেরা একজন কথা সাহিত্যিককে উপেক্ষার মধ্য দিয়ে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের যাত্রা শুরু ১৯০১ সালে। নিজ দেশ ফ্রান্সেও স্বল্প-পরিচিত সুলি প্রধোম প্রথম পুরস্কারটি নিলেন। তবুও ভালো তিনি তো কবি। সাহিত্যের মূলধারাতেই অবস্থান করছেন।
দ্বিতীয় বছরের পুরস্কারটি পেলেন একজন অ-সাহিত্যিক জার্মান ধ্রুপদ পন্ডিত, ঐতিহাসিক, আইন বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ (ক্রিশ্চিয়ান ম্যাথিয়াস) থিওডোর মোমসেন। তাঁর তিন খন্ডের বিখ্যাত গ্রন্থ এ হিস্ট্রি অব রোম। তাঁর হাতে রচিত হয়েছে ’রোমান ক্রিমিনাল ল’। বিশুদ্ধ সাহিত্য পাঠক সুইডিশ একাডেমির এই নির্বাচন ভালোভাবে নেয়নি। পান্ডিত্যের জন্য মোমসেনকে হাজারটা পুরস্কার দেওয়া হোক, কিন্তু নোবেল সাহিত্য পুরস্কার কেন?
৪৮ বছর পর পুনরাবৃত্তি ঘটলেও ১৯৫০-এর পুরস্কৃত ব্যক্তি বার্টান্ড রাসেলের মতো ব্যক্তিত্ব হওয়ায় সমালোচনা বেশি দূর এগোয়নি। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ১৯৫৩ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের একপেশে ইতিহাস লেখক উইনস্টন চার্চিল নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় সাহিত্যবিশ্ব অসন্তষ্ট হলো। অযোগ্য ও যুদ্ধবাজ অনেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। উইনস্টনও তাদের একজন হলে এমন কোনো ক্ষতি হতো না। কিন্তু নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় সুইডিশ একাডেমির ফোকাস এবং সাহিত্যের ফোকাস নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনাকে সাহিত্যের প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে বিদায় করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। ১৯৬৪-র নোবেল বিজয়ী এবং একইসঙ্গে প্রত্যাখ্যানকারী জ্যাঁ পল সার্ত্রেকে নিয়েও একই অভিযোগের সুযোগ ছিল-তিনি কি সাহিত্যের মূলধারায় ছিলেন? জবাব না, যদিও তার রচনায় ফিকশন ও নন ফিকশন দুটো ধারাই বর্তমান ছিল। কিন্তু তাঁর বিশ্বব্যক্তিত্ব এসব প্রশ্ন ম্লান করে দিয়েছে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক বেলারুশিয়ান সোয়েতলানা অ্যালেক্সিয়েভিচকে সাহিত্যের জন্য পুরস্কৃত করা সমীচীন হয়েছে কি না এ প্রশ্নটি সবার মুখে মুখে,এমনকি বেলারুশেও। ভ্লাদিমির পুতিনকে চপোটাঘাত করার জন্য সুইডিশ একাডেমি সোয়েতলানাকে বেছে নিয়েছে কিনা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোতে, পূর্ব ইউরোপিয় সোভিয়েত প্রভাবিত দেশগুলোতে এ প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে।
……………………………………………………….

ভূমিকা ও অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

……………………………………………………….
নোবেল পুরস্কার চালুর ১১৫তম বর্ষে নোবেল কমিটি সাহিত্যকে নতুন করে সঙ্গায়িত করে সাহিত্যের মানচিত্র বদলে দিতে চাচ্ছে কি না তাও জিজ্ঞাস্য।
আবার বিষয়টি এমনও নয় যে এবারই প্রথম সোয়েতলানার নাম প্রস্তাবিত হয়েছে এবং তিনি পুরস্কার পেয়ে গেছেন। গত বৎসরও তিনি কেবল প্রস্তাবিতই হননি, ল্যাডব্রোকের বাজিতে প্রথম তিনজনের মধ্যেই তাঁর নাম ছিল। আর ২০১৫ তে তো তিনি বাজির শীর্ষে।
সোয়েতলানার সমর্থনে বলা হচ্ছে- তিনি হচ্ছেন নন-ফিকশনের দস্তয়ভস্কি! তিনি বৃহত্তর সোভিয়েত জনগোষ্ঠির মনঃস্তত্ব ও মনস্তাপের কারুকার। সুতরাং নোবেল তাঁর প্রাপ্য।
সোয়েতলানা আলেক্সান্দ্রাভনা অ্যালেক্সিয়েভিচ, জন্ম ১৯৪৮, ইউক্রেনের স্টেনিসলাফ শহরে। পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নেন। তাঁর প্রথম বই দ্য আনওমেনলি ফ্রেস অব ওয়ার (১৯৮৫) মহাযুদ্ধে নারীর ভোগান্তির মৌখিক ইতিহাস, বিশ লক্ষ্যেরও বেশি বিক্রি হয়েছে। তাঁর খ্যাতি তুঙ্গে এনেছে ভয়েসেস ফ্রম চেরনোবিলঃ দ্য ওরাল হিস্ট্রি অব নিউক্লিয়ার ডিজাস্টার। আর একটি বিখ্যাত বই জিঙ্কি বয়েসঃ সোভিয়েত ভয়েসেস ফ্রম আফগানিস্তান ওয়ার

চেরনোবিল থেকে একটি অধ্যায়ের একাংশ অনূদিত হল। সমালোচকরা যা-ই বলুন, অনুবাদের সময় আমার মনে হয়েছে ফিকশনেরই ভাষান্তর করছি।

ভ্যাসিলি ও লুডমিলার উপাখ্যান

আমি জানি না আমি কী নিয়ে কথা বলব– মৃত্যু না ভালোবাসা? নাকি মৃত্যু ও ভালোবাসার একই মানে? আমি কোনটার কথা বলব?
আমরা কেবল বিয়ে করেছি। এমনকি যদি দোকানেও যেতে হয় আমরা হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাই। আমি তাকে বলি, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
কিন্তু তখনো জানি না কতোটা ভালোবাসি। আমার কোনো ধারণাই নেই। … আমরা একটি দমকল অফিসের ডর্মিটরিতে থাকি, তার চাকরি ওখানে দমকল বাহিনীতে। আমরা থাকি দু’তলায়। সেখানে আরো তিন জোড়া তরুণ দম্পতি, আমরা সবাই ভাগাভাগি করে একটি রান্নাঘর ব্যবহার করি।
নিচতলায় থাকে ট্রাক। দমকল বাহিনীর লাল ট্রাক। এখানেই তার চাকরি। কী ঘটছে আমি জেনে যাই–সে কোথায় আছে, কেমন আছে, সবই।

একরাতে আমি হইচই শব্দ শুনলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। সে আমাকে দেখে ফেলে। ‘জানালা বন্ধ করে ঘুমোতে যাও। পারমাণবিক চুল্লিতে আগুন লেগেছে। আমি শিগগির ফিরে আসছি।’ আমি ঠিক বিস্ফোরণটা দেখিনি। দেখেছি কেবল অগ্নিশিখা। সবকিছুই জ্বলজ্বল করছে, গোটা অজানা চেয়ে আছে। সুদীর্ঘ এক অগ্নিশিখা। আর ধোয়া। উত্তাপ কী ভয়াবহ! কিন্তু তখনো সে ফেরেনি।

ছাদ ঢেকে আছে যে বিটুমিন, ধোয়া উড়ছে সেখান থেকেই। পরে সে বলেছে, ব্যাপারটা গণগণে আলকাতরার উপর দিয়ে হেঁটে যাবার মতো। তারা আগুনের শিখা দমাতে চেষ্টা করেছে, তারা জ্বলন্ত গ্রাফাইটে পা দিয়ে লাথি মেরেছে… তাদের পরণে ক্যানভাসের পোষাক আর মাথায় পট্টি নেই। তারা যে সেখানে যে অবস্থায় ছিল হাতাওয়ালা শার্ট পরে বেরিয়ে এসেছে। তাদের কেউ কিছু বলেনি। কেবল আগুন নেভাবার জন্য ডাকা হয়েছে, ব্যাস এটুকুই।

border=0চারটা বাজে। পাঁচটা। ছ’টা। ছ’টার সময় তার বাবামার বাড়ি যাবার কথা। আলুর চারা রোপণ করতে হবে। গ্রিপায়াত থেকে স্পেরিটে, সেখানে তাদের বসবাস- এখান থেকে চল্লিশ কিলোমিটার। বীজ বোনা, হাল চাষ করা তার খুব পছন্দের কাজ। তার মা অনেকবার বলেছে তারা চান ছেলে শহরে চলে যাক, এমন কি ছেলের জন্য নতুন বাড়িও তৈরি করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু জোর করে তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হল। সে মস্কোতে দমকল বাহিনীর সদস্য হিসেবে কাজ করেছে। যখন সে বেরিয়ে আসে সে দমকলের ফায়ারম্যান হতে চেয়েছে। আর কিছু নয়! (নীরবতা)
কখনো মনে হয় আমি তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু সে কখনো আমাকে ডাকে না … এমনকি আমার স্বপ্নেও না। আমিই কেবল তাকে বারবার ডেকে যাই।

সাতটা বাজে। সাতটার সময় আমাকে জানানো হয় সে হাসপাতালে। আমি দৌঁড়ে সেখানে যাই। পুলিশ জায়গাটা ঘিরে ফেলেছে, কাউকেই ভেতরে যেতে দিচ্ছে না। ভেতরে যাবার অনুমতি পাচ্ছে কেবল অ্যাম্বুলেন্স। পুলিশ চিৎকার করে বলছে: অ্যাম্বুলেন্সগুলো তেজস্ক্রিয়, তোমরা দূরে সরে দাঁড়াও।
এখানে কেবল আমি একা নই। সে রাতে যাদের স্বামীরা পারমাণবিক চুল্লির কাজে সেখানে ছিল তাদের সবার স্ত্রীই এসেছে। আমি আমার এক বান্ধবীর খোঁজ করতে থাকি, সে হাসপাতালের ডাক্তার। যখন সে একটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে বেরিয়ে আসে আমি তার সাদা অ্যাপ্রন আঁকড়ে ধরি, ‘আমাকে ভেতরে নিয়ে চল।’
‘আমি পারব না। তার অবস্থা ভালো নয়, কারো অবস্থাই ভালো নয়।’ আমি তাকে ধরে রাখি, ‘আমি শুধু তাকে এক নজর দেখে আসব।’ এক সময় সে বলে, ‘ঠিক আছে, আমার সাথে চল। কিন্তু পনের বিশ মিনিটের বেশি সময়ের জন্য নয়।’
আমি তাকে দেখলাম। তার সমস্ত শরীর ফুলে ফেপে উঠেছে। তার চোখ দেখতে পাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমার বান্ধবী বলে, ‘তার দুধ খাওয়া দরকার। প্রচুর দুধ। তাদের প্রত্যেককে অন্তত তিন লিটার করে দুধ খেতে হবে।’
‘কিন্তু সে তো দুধ পছন্দ করে না।’
‘তবুও তাকে দুধ খেতে হবে।’
সে হাসপাতালের অনেক ডাক্তার এবং নার্স, বিশেষ করে আর্দালিরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং মারা যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা তখনো আমাদের জানা হয়ে উঠেনি।
সকাল দশটায় ক্যামেরাম্যান শিশেনকের মৃত্যু হয়। তাকে দিয়ে শুরু। প্রথম দিনের প্রথম মৃত্যু আমরা জানতে পারি ধ্বংস্তুপের নীচে আরো একজন আছে– ভ্যালেরা কোদেমচুক। তারা কখনো তার কাছে পৌঁছতে পারেনি। তারা তাকে কংক্রিটের নিচে সমাহিত করে। আমরা তখনো জানিনি তারাই প্রথম দিককার মৃত ক’জন।
আমি বলি, ‘ভ্যাসিয়া, এখন আমি কী করব?’
‘যাও, এক্ষণি বেরিয়ে যাও। তোমার তো বাচ্চা আছে।,
‘আমাদের বাচ্চা।’ কিন্তু আমি কেমন করে তাকে ছেড়ে যাব?
সে-ই আমাকে বলে, ‘এক্ষনি যাও! চলে যাও! বাচ্চাটাকে বাঁচাও।’
‘আগে তোমার জন্য দুধ এনে দিই, কী করা উচিত তার পরই ঠিক করব।’
আমার বান্ধবী তানিয়া কিবেনক দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে হাজির–তার স্বামীও একই কক্ষে। তার সাথে তার বাবা। বাবার গাড়ি আছে। আমরা গাড়িতে উঠি। দুধের খোঁজে নিকটবর্তী গ্রামের দিকে যাই। শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। আমরা তিন লিটারের দু’টি বোতল কিনি, এতেই সবার হয়ে যাবে। কিন্তু তারা মুখ থেকে দুধ উগরে ফেলছে, অজ্ঞান হয়ে, কেউ আবার যাচ্ছে টেলিভিশনের সুইচ অন করতে। ডাক্তাররা তাদের বলেছে, তারা বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। তখনই সামরিক যানবাহনে শহর ছেড়ে যায়, তারা সব রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়। ট্রলি ও ট্রেন–সবই থেমে গেছে। সাদা পাউডার ছিটিয়ে তারা রাস্তা সাফ করছে।
আমি ভাবছি আরো খাঁটি দুধ আনার জন্য কাল কেমন করে গ্রামে যাব। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কেউ মুখ খুলছে না। সামরিক বাহিনীর লোকজন সার্জিক্যাল মুখোশ পরে আছে। শহরের লোকজন খোলা বস্তায় রাখা পাউরুটি কিনে আনছে। প্লেট থেকে কেক তুলে খাচ্ছে।
সেদিন সন্ধ্যায় আমি হাসপাতালে ঢুকতে পারিনি। চারদিকে মানুষের সমুদ্র। আমি তার জানালার কাছে এসে দাঁড়াই, সে এগিয়ে এসে কিছু একটা চেঁচিয়ে বলে। মরিয়া হয়ে উঠা তার কণ্ঠস্বর। কেউ একজন তার কথা বুঝতে পেরেছে- সে রাতে তাদের মস্কো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্ত্রীরা সবাই জোট বাধে। আমরা তাদের সাথে যেতে চাই। আমরা আমাদের স্বামীর সাথে যাব, যেতে দাও। কিন্তু আমাদের কোনো অধিকার নেই আমরা ঘুষি বাগালাম, আঁচড় দিলাম। কিন্তু সৈন্যরা তো সৈন্যই। তারা আমাদের ঠেলে পেছনে সরিয়ে দিল। তারপর ডাক্তার বাইরে এসে বলল, উড়োজাহাজে তাদের মস্কো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাড়ি গিয়ে তাদের কাপড়চোপড় নিয়ে আসার কথা বলল। কাজের সময় তারা যে পোষাকে ছিল তা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা শহরের দিকে ছুটলাম। আমরা তাদের ব্যাগ নিয়ে যখন ছুটতে ছুটতে হাজির হই, প্লেন চলে গেছে। তারা আমাদের সাথে চাতুরি করেছে, যাতে আমরা সেখানে চিৎকার, কান্নাকাটি না করি।
রাত হয়েছে। রাস্তার একদিকে বাস, শত শত বাস। শহর থেকে সব লোক সরিয়ে নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাস্তার অন্যদিকে শত শত অগ্নিনির্বাপক ট্রাক। চারিদিক থেকে বাস ও ট্রাক এসে জমা হয়েছে। শহরের রাস্তা সাদা ফেনায় আচ্ছাদিত। আমরা এর ভেতর দিয়ে হাঁটছি, অভিশাপ দিচ্ছি আর কাঁদছি। রেডিওতে তারা ঘোষণা দেয়: চার পাঁচ দিন ধরে শহর জনশূন্য করার কাজ চলবে, গরম কাপড় সাথে রেখো। তোমাদের জঙ্গলে থাকতে হবে। তাবুতে থাকতে হবে। মানুষ বরং খুশি এটা যে ক্যাম্পিং ট্রিপ। আমাদের এতদিনকার রুটিন ভেঙ্গে এভাবেই মে দিবস উদযাপন করব। বারবিকিউ করার প্রস্তুতি নিল কেউ; কেউ সাথে নিল গিটার, রেডিও। কেবল একজন নারী-কাঁদছে। তার স্বামী তখন পারমাণবিক চুল্লিতে ছিল।

আমি কিভাবে আমার বাবার গ্রামে পৌঁছেছি মনে করতে পারছি না। যখন জেগে উঠি দেখি সামনে আমার মা।
‘মা, ভ্যাসিয়া মস্কোতে। একটি বিশেষ বিমানে নিয়ে গেছে।’
বাগানে আমাদের রোপন কাজ শেষে হয়েছে। (এক সপ্তাহ পরে এই গ্রাম থেকেও জনগণকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কে জানত! তখন কে জানত এমন হবে। দিনের শেষদিকে আমার বমি শুরু হয়। আমি দু’মাসের গর্ভবর্তী। আমার অসহ্য লাগছে। সেই রাতে আমি স্বপ্ন দেখি সে ঘুমের মধ্যে আমাকে ডাকছে ‘লিউসা! লিউসেঙ্কা!’ কিন্তু তার মুত্যৃর পর কখনো আমার স্বপ্নে তার ডাক শুনিনি। একবারের জন্য ও না। (সে কাঁদতে থাকে)।

chernobyl-112.JPGআমি সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঠিক করি আমাকে মস্কো যেতে হবে। আমি একাই যাব। আমার মা চিৎকার করে জানতে চায়, তুই কোথায় যাচ্ছিস? কোন পথে?’ কাজেই আমার বাবাকে সাথে নিলাম। বাবা ব্যাঙ্কে গেল এবং তাদের টাকা পয়সা যা ছিল সব তুলে নিল।
কেমন করে গেলাম মনে নেই। আমার স্মৃতি থেকে মস্কোর এই ট্রিপটা মুছে গেছে। মস্কোতে প্রথম যে পুলিশ অফিসারের সাথে দেখা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ’চেরনোবিলের ফায়ারম্যানদের কোথায় রাখা হয়েছে।’
পুলিশ অফিসার ঠিকানা বলে দিলেন। আমরা বিস্মিত-সবাই আমাদের ভয় দেখাচ্ছে, এটা অত্যন্ত গোপনীয় ব্যাপার। ‘হসপিটাল নম্বর ৬। সুকিনস্কায়া স্টপেজে।’

এটা রেডিওলজির একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। পাশ ছাড়া ভেতরে যাবার কোনো উপায় নেই। হাসপাতালে গেটের মহিলাটিকে কিছু টাকা দিলাম। সে বলল, ‘সামনে এগোয়। তারপরও কাউকে জিজ্ঞেস করতে হল, তার কাছে পৌঁছার সুযোগ ভিক্ষা চাইতে হল। সব শেষে আমি প্রধান রেডিওলজিস্ট অ্যানজেলিনা ভ্যাসিলিয়েভনা গাসকোভার রুমে বসে আছি। কিন্তু তখনও তার নাম জানিনি, আমার কিছুই মনে নেই। আমি শুধু জানি আমার স্বামীকে আমার দেখতে হবেই। ঠিক তখনই ডাক্তার জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কোন সন্তান আছে?’
আমি তার প্রশ্নের কী জবাব দেব? আমি বুঝতে পারছি আমি যে গর্ভবতী এটা লুকোতে হবে। গর্ভবতী টের পেলে আমাকে যেতে দেবে না। ভাগ্য ভালো, আমি হ্যাংলা পাতলা, এ সময় কী-ই বা বলা যায়।
‘হ্যা, আমি জবাব দিই।
‘ক’জন?’
আমি ভাবতে থাকি। আমাকে দু’জন বলতে হবে, কেবল একজন হলে আমাকে যেতে দেবে না।
‘একটি ছেলে একটি মেয়ে!’
‘তাহলে তোমার আর বাচ্চা নেবার দরকার নেই। ঠিক আছে, শোন, তার সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে, তার মাথার খুলির অবস্থাও তা-ই।’
বেশ! আমি ভাবছি, তার শরীর একটু নড়ে উঠুক।
‘আর শোন: তুমি যদি কাঁদতে শুরু কর আমি লাথি মেরে তোমাকে এখান থেকে বের করে দেব। আলিঙ্গন করা, চুমো দেওয়া-এসব নিষেধ। এমনকি তার কাছেও যেতে পারবে না। আধ ঘন্টা থাকতে পারবে।’
কিন্তু আমি জানি আমি তাকে ছেড়ে যাব না। যদি যেতে হয় তাকে সাথে নিয়েই। আমি প্রতিজ্ঞা করি, ঠিক আছে। আমি ভেতরে এসেছি, তারা বিছানায় বসে তাস খেলছে, হাসাহাসি করছে।
তারা চেঁচিয়ে ডাক দেয়, ‘ভ্যাসিয়া!’
সে ফিরে তাকায়।
‘আহ্, সব শেষ। সে তো আমাকে এখানেও খুঁজে পেয়েছে।’
তাকে খুব হাস্যকর দেখাচ্ছে, তার পরণে ৪৮ মাপের পাজামা কিন্তু তার ‘মাপ তো ৫২। হাতাগুলো অনেক ছোট, পেন্টও খাটো। তার মুখ আর আগের মতো ফোলা নয়। তাদের এক ধরণের তরল খাবার দেওয়া হয়েছে।’
আমি বলি, ‘তুমি কোথায় পালিয়েছ?’
সে আমাকে আলিঙ্গন করতে চেষ্টা করে
মহিলা ডাক্তার বাধা দেয়। বলে, ‘বস, বসে পড়। এখানে কোন কোলাকুলি নয়।’

[ফায়ারম্যান ভ্যাসিলি ইগনাটেঙ্কোকে তার গর্ভবতী স্ত্রী লুডমিলা ইগনাটেঙ্কো সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সত্যিই আলিঙ্গন করে। লুডমিলা তাকে ভালোবাসত, কিন্তু কতোটা– কখনো বুঝে উঠতে পারেনি।
তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত রোগীদের এই হাসপাতালে আনা হয়। তাদের আয়ু বড়জোর চৌদ্দ দিন। ভ্যাসিলির শরীর ক্রমেই খারাপ হতে থাকে, শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তপাত শুরু হয়। লুডমিলা প্রধান রেডিওলজিস্টের কাজে ধরা পড়ে যায় যে সে গর্ভবতী। ডাক্তার রেগে যায়, জানতে চায় ভ্যাসিলির কতোটা কাছে সে এসেছে।
দু’জন ফায়ারম্যান, দুজনেই ভ্যাসিলির বন্ধু, মারা যায়। লুডমিলা তাদের সমাহিত করতে তিন ঘন্টার জন্য বেরিয়ে আসে। ফিরে গিয়ে নার্সকে জিজ্ঞেস করে, সে কেমন আছে?
নার্স জবাব দেয়, ভ্যাসিলির মৃত্যু হয়েছে ঠিক পনের মিনিট আগে। দু’মাস পর লুডমিলা মস্কোর হাসপাতালে প্রসূতি ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। নার্সরা লুডমিলাকে তার সদ্যজাত মেয়ে দেখায়।
লুডমিলা বলে, এ মেয়ের নাম নাতাশেঙ্কা। তার বাবা এই নামটিই রাখতে চেয়েছিল। মেয়েটির শরীর স্বাস্থ্য চমৎকার। কিন্তু ভেতরে তেজস্ক্রিয়তার ছাপ-যকৃতে সিরোসিজ, হৃদপিন্ডে সমস্যা, ছোট্ট দেহের ভেতরে ২৮ রন্টজেন তেজস্ক্রিয়তা। লুডমিলা মেয়েকে কাছে চায়। চার ঘন্টা পর নার্স এসে জানায় নাতাশেঙ্কা মারা গেছে। লুডমিলা মরা মেয়েকেই পাশে চায়।
অসম্ভব! তারা সাফ জানিয়ে দেয়।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com