মাইকেল ম্যাকক্লুরের কাব্য: এক বিজ্ঞানীর দৃষ্টি

জাকিয়া সুলতানা | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৮:৩৫ অপরাহ্ন

crick.jpgফ্রান্সিস ক্রিক (জুন ৮, ১৯১৬- জুলাই ২৮, ২০০৪) ছিলেন পরমাণু জীববিজ্ঞানী। তিনি, জেমস ডি ওয়াটসন এবং মরিস উইলকিন্স মিলে ডিঅক্সিনিউক্লিয়িক (ডিএনএ) এসিডের পারমানবিক গঠন এবং ডিএনএ কিভাবে জীবন গঠনের মৌলিক তথ্য বংশপরম্পরায় পৌঁছে যায়, এই তাৎপর্য আবিষ্কারের জন্য ১৯৬২ সালে শারীরতত্ত্ব শাখায় নোবেল পুরষ্কার পান। বায়োলজি ও জেনেটিক্সে ডারউইনের বিবর্তনবাদ থিওরির পরে এটি একটি বিশাল ঘটনা। এক অর্থে ডারউইন প্রকৃতিকে দেখে-শুনে-বুঝে যা সিদ্ধান্ত করেছিলেন, ক্রিক-ওয়াটসন-উইলকিন্স-এর আবিষ্কার তার পারমাণবিক ভিত্তি প্রদান করেছে এবং সঙ্গে-সঙ্গে জীবনের গঠন ও বিকাশের নতুন পথ খুলে দিয়েছে। ডঃ ফ্রান্সিস হ্যারি ক্রিক মূলত একজন পদার্থবিদ ছিলেন। পরে তিনি জীববিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হন। আনন্দের ব্যাপার, তাঁর কাব্যের প্রতিও আগ্রহ ছিল এবং তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। জেনেটিক্স নয়, ক্রিকের কবিতা-বোধই এখানে প্রসঙ্গ।
১৯৭৫ সালে মার্জিন সিম্পজিয়ামে ফ্রান্সিস ক্রিক রচিত “ মাইকেল ম্যাক্ল্যুরের কাব্যঃ এক বিজ্ঞানীর দৃষ্টি” প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। মাইকেল ম্যাকক্ল্যুর ৫০-৬০ দশকের মার্কিন বিট জেনারেশনের কবি – অ্যালেন গিন্সবার্গ, জ্যাক কেরুয়াক, গ্যারি স্নাইডার, লরেন্স ফারলিংহেট্টি – এদের সমসাময়িক। তিনি ষাটের দশকের যুদ্ধবিরোধী, প্রকৃতিপন্থী, কাউন্টার-কালচারের একজন হোতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি “The Beat Surface” নামের এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, “ বিজ্ঞানের সীমানা পেরিয়ে কাব্য এবং কাব্যের সীমানা পেরিয়ে বিজ্ঞানে প্রবেশ করাই বিট মুভমেন্টের একটা অংশ”। তিনি আরও বলেছেন- “ক্রিকের মত আমিও বিশ্বাস করি, দেহ ও চৈতন্য একই বিষয় এবং আমি বিজ্ঞান ও কাব্যের মধ্যে কোন ফারাক দেখি না”। পরবর্তীতে মাইকেল ম্যাকক্ল্যুর “Double Moire” নামে একটি কবিতা ক্রিককে উৎসর্গ করেন। ১৯৭৫ সালে Margins Symposium-এ প্রকাশিত ক্রিক-এর এই প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন জাকিয়া সুলতানা।

mcclure.jpg

মাইকেল ম্যাক্লুরের কাব্য

১৯৫৯ সালের গ্রীষ্মকাল আমরা বার্কলেতে কাটিয়েছিলাম, তখন আমি সেখানকার ভাইরাস ল্যাবরেটরীতে চাকুরী করতাম। আমাদের অবসর সময়ে আমি ও অডিল1 জিন্সের প্যান্ট পরে বে-ব্রীজ পার হয়ে নর্থ বীচে মোটর চালিয়ে যেতাম। যখন আমি সিটি লাইট বইয়ের দোকানের বেজমেন্টে ঢু দিচ্ছিলাম তখন মাইক ম্যাকক্লুর নামে অচেনা এক কবির, শক্ত বাদামী কাগজের ছোট একটি ফোল্ডারে আড়াআড়ি ঢোকানো একটুকরা কাগজে একটি কবিতা চোখে পড়ে। “পেয়োটে পোয়েম” নামে কবিতাটি প্রায় ১০০ লাইনেরও কম ছিল। সেসময়ে আমি এতটাই সরল ছিলাম যে, পেয়োটে কি সেটাই জানতাম না, তবে কবিতাটির একটি তাৎক্ষনিক আকর্ষণ ছিল। কবিতার বইয়ের দোকানের স্তুপীকৃত পেপারব্যাকে ঠাসা বেজমেন্ট কবিতা যাচাইয়ের জন্য খুব ভালো জায়গা না হলেও কোন এক তাড়নায় তখনই বইটি কিনে ফেলি এবং এটি আমার মধ্যে ভর করতে থাকে। কবিতাটিকে এতই পছন্দ করলাম যে, আমি যখন গোল্ডেন হেলিক্স-এ ফিরে এলাম তখন এটা হলরুমের দেয়ালে আটকে রাখলাম এবং সেখানেই কয়েক বছর সেটা আটকে ছিল। আমি যখন বাইরে যেতাম বা আসতাম তখন মাঝে মাঝেই চোখ বুলিয়ে নিতাম।

Seeing the loose chaos of words
on the page.

(ultimate grace)

গত কয়েক বছর যাবত কবিতাটির হ্যালুসিনোজেন-এর আছর কতোটা প্রকাশ করতে পারে তার প্রশংসা করে এসেছি। কিন্তু সেই সময়ে আমি এর ঔজ্জ্বল্য গুণ এবং আকস্মিকতাতেও মুগ্ধ ছিলাম।
There is no Time. I am visited by a man
who is the god of foxes
there is dirt under the nails of his paw
fresh from his den.
We smile at one another in recognition.

কোনো সময় নেই। এক মানুষ আমাকে দেখতে আসে
যে শৃগালের ঈশ্বর
তার থাবার নখের নিচে ময়লা
সদ্য তার ডেরার থেকে।
আমরা পরস্পরে স্মিত হাসি, ঠিক চিনতে পেরে।
আমি আরো আবিষ্কার করলাম যে কবিতাটি রচনার স্টাইল খুবই সম্মোহক, কিন্তু ছোট ছোট উদ্ধৃতি দিয়ে এ বোঝানো যায় না। এটা শুধু ম্যাকক্লুরের বড় হরফের বিষ্ফোরণই নয়, যা ম্যাকক্লুরের নিজস্ব –বরং তার বাক্যের আপন বাক-ছন্দ। এর কিছু কিছু অংশ খুবই উদ্ধৃতিযোগ্য – এতোটাই, যে আমি যখন একটি ভাইটালিজমের ওপর বই লেখা শুরু করলাম তখন আমি এর থেকে কিছু অংশ তুলে দিয়েছিলাম।
THIS IS THE POWERFUL KNOWLEDGE
we smile with it.

এ শক্তিশালী জ্ঞান
এ নিয়ে আমরা হাসি
যদিও অপ্রাসঙ্গিকভাবে তার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল, তবু তা আমার মনের ভাব সঠিক প্রকাশ করেছিল। আমি যে বিষয়ে জানতাম না বা ধারণা করতে পারি নি, তা হলো সে সময় মাইকেলের বিজ্ঞানের প্রতি প্রগাঢ় ও ব্যক্তিগত আগ্রহ । আমি পরে তা জানতে পারি, যখন আমার প্রকাশকের মাধ্যমে আমাদের যোগাযোগ হয় এবং আমি তার পরবর্তী কাজগুলো পড়ি। বর্তমানে যে সকল কবি লিখছে, তারা মোটামুটি বিজ্ঞানের ব্যাপারে অজ্ঞ এবং তাদের বেশীরভাগ বিজ্ঞান-বিরাগীও বটে। আরো অধোগতির ব্যাপার এই যে, এমনকি তাদের গভীর বিশ্বাসগুলোও সংস্কৃতিবান বিজ্ঞানীর কাছে অগ্রহণযোগ্য। ইয়েটস্‌ অথবা এলিয়টের কবিতাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব (যদিও হালফ্যাশন তাদের কবিতাকে ম্রিয়মাণ করেছে) – কিন্তু তাদের প্রধান চিন্তা-যারা প্রতিদিনের অণু পরমাণুর মধ্যে থাকে, মহাবিশ্বের বিবর্তন ভেবে মগ্ন হয়ে থাকে, প্রাণের সৃষ্টি এবং জীবের অদ্ভুত ব্যাখ্যাতীত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করে, তাদের কাছে ইয়েটস্‌-এর অতীন্দ্রয়বাদ এবং এলিয়ট্‌-এর ইংরেজিয়ানা স্পষ্টতই হাস্যকর। একজন কবির বিশ্বাসকে সম্পুর্ণরূপে উপেক্ষা করা যায় না। তবু শব্দাবলী প্রাথমিকভাবে যতোই সম্মোহক হোক না কেন, কবিতার গভীর সার-বিষয় বস্তুর স্বরূপের মৌলিক ধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জ্যোতিঃশাস্ত্রের প্রতি সিরিয়াস এবং গভীরভাবে বিশ্বাসী একজন কবিকে বিজ্ঞানীর পক্ষে চেষ্টা করেও গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এই অবস্থা অন্তত কবিতার ক্ষেত্রে, একজন বিজ্ঞানীকে সাংস্কৃতিক মরুভূমিতে ফেলে দেয়ার মতন। আমি আশা করছি, কেউ এখনও ভাবেন না যে-বিজ্ঞানীরা অচেতন, কল্পনা শক্তিহীন এবং তারা চিরকাল নিরুত্তাপ আর শুধু মাপজোক করে। প্রতিটা পেশারই নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে, কিন্তু ভালো বিজ্ঞানীরা অন্তত তাদের বিষয়কে ভালোবেসেই আকৃষ্ট হয় এবং তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে গভীর আবেগে নিয়োজিত থাকে। বিজ্ঞানই তাদের জন্য যথেষ্ঠ কাব্য এবং এটা প্রায় সর্বাংশে সত্য। তবে শব্দ দিয়ে সূক্ষ্ম সম্মোহনের কোন বিকল্প নেই এবং সময়ে সময়ে কেউ বিজ্ঞানের কাঠামোগত পদ্ধতিতে অবসন্ন হয়ে কবিতাকে চাইতে পারে –যা তার মনের গভীরে কথা বলে।
অবশ্য কিছু বিজ্ঞানী কাব্য রচনা করে, যা সাধারণত পড়তে খটমটো মনে হয়। কখনোবা কোন কবি প্রচুর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হজম ও প্রক্রিয়াজাত করে, কিন্তু সব সময়ই তা কবিতাকে নির্জীব করে ফেলে। কবিতা একমাত্র তখুনি প্রাণবন্ত হয়, যখন বিজ্ঞানকে হটিয়ে ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়মুখ্য হয়ে উঠে। ইংরেজ কবি রোনাল্ড ডানকান এ বিষয়ে চেষ্টা করে আংশিক সফল হতে পেরেছিলেন।
সেই বিস্ময়কর জগত যা বিজ্ঞান, মানুষ এবং আর আমাদের পারিপার্শ্বিকতার রূপান্তর ঘটিয়েছে, তার সঙ্গে মাইকেল ম্যাকক্লুর এতটা সম্পৃক্ত – সেই জগত যা সংস্কৃতির অন্য শাখার দুনিয়াকে খুব মামুলি আর বানোয়াট করে দেখায়- ফলে মাইকেল তার সবকিছুই উদ্যমের সঙ্গে আহরণ করেছেন। যখন তিনি লিখেছেন-

LIFE BEGINS WITH COILING – MOLECULES BE NEBULAE
or
ACTION IS PROTEIN

জীবন শুরু চক্রে – পরমাণু হয়ে যায় নীহারিকা
অথবা
ক্রিয়া মানেই প্রোটিন
আমার মতো যে কেউই তাকে সহজভাবে গ্রহণ করবে, যেমন করে একজন অবৈজ্ঞানিকও তাকে মেনে নেবে।
CITIES ARE SWIRLS OF POPULATIONS
শহর গুলো জনতার ঘূর্ণি
মাইকেল “Wolf Net” নামে অপ্রকাশিত বিশাল এক গদ্য লিখেছেন (তিনি যাই লিখুন না কেন তাকে গদ্য বলা যেতে পারে) যা তাঁর বিশ্বের প্রতি ধারণা প্রকাশ করে, এবং তাঁর গভীর জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রতি বিরাট উৎসাহ স্পষ্ট করে। তার কবিতায় প্রায়ই বিজ্ঞান প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে আর কোন কোন আলোচ্য বিষয়বস্তু তাঁর গভীর সম্পৃক্তি দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। মাইকেলের কবিতায় যা আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে তা হলো এগুলোর কল্পনার উন্মত্ততা ও চিত্রকল্প। আমি তার প্রতিক্রিয়ার ঔজ্জ্বল্য, নিজস্ব আঁক-বাঁক ও প্রতিটি চরণের ঘূর্ণি ভালোবাসি। ভালোবাসি, আমি যে জগতে নিজে বাস করি- নিজস্ব বোধসহ ব্যক্তিগত পৃথিবী, বায়োলজিক্যাল পৃথিবী (প্রাণী, উদ্ভিদ এমনকি ব্যাকটেরিয়ারা একে অপরকে খুঁজে বেড়াচ্ছে কবিতার ভিতরে), অণু-পরমাণুর জগত, নক্ষত্র-ছায়াপথ সবই সেখানে রয়েছে; আর তার মাঝে-উপরে-নিচে দাঁড়ানো মানুষ, আর্তনাদরত স্তন্যপায়ী- আকস্মিকতা ও প্রয়োজন হেতু মাংস দিয়ে গড়া। আমি কবি হলে, মাইকেল ম্যাকক্লুরের মতো লিখতাম- যদি আমার সেই প্রতিভা থাকতো!

অবলোকন

ফ্রান্সিস ক্রিক কাব্য বিষয়ে একটি মাত্র ছোট লেখা লিখেছিলেন। কিন্তু কবি এবং কবিতার জন্য তাঁর কিছু উক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা, এমনকি আধুনিক কবিতাও যে বিষয়ের দিক থেকে অনেক সময় খুব সংকীর্ণ হয়ে পড়ে – একটা বড় পাঠক অংশের থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়- সে দিকে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এলিয়ট এবং ইয়েটস সম্পর্কে তাঁর মতামত কবি ও ক্রিটিকদের গতানুগতিক মতের সংকট সৃষ্টি করেছে। আসলে মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সকল অঙ্গকে ধারণ করে কবিতার বিষয় এবং বোধ আরো ব্যাপ্ত হওয়া দরকার।

পাদটিকাঃ
ফ্রান্সিস ক্রিক-এর দ্বিতীয় স্ত্রী।
*মাইকেল ম্যাকক্লুর-এর বেশ কিছু কবিতা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Of Indigo and Saffron (2011), Mysterious and Other Poems (2010), Rebel Lions (1991), The New Book/A Book of Torture (1961) । এর বাইরে তিনি প্রবন্ধ, গান, নাটক, টিভি ডকুমেন্টারি লিখেছেন। এক সাক্ষাৎকারে, “আপনি কবিতা কেন লিখেছিলেন, মনে আছে?” তার উত্তরে বলেছিলেন, “আমি মহাবিশ্বের আবহকে বদলাতে চেয়েছিলাম”। বিজ্ঞান নিয়ে তার আগ্রহের কথা তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে। তিনি জার্মান রোমান্টিক কবি স্লেগেলকে উদ্ধৃত করেছেন এভাবে, “ সব শিল্প বিজ্ঞান হওয়া উচিত আর সব বিজ্ঞান শিল্প। কবিতা এবং দর্শন মিলেমিশে এক করা দরকার”।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সেন্টু — সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৫ @ ৯:৫০ অপরাহ্ন

      অনেক সুন্দর হয়েছে অনুবাদটি।আগামীতে আরও সুন্দর সুন্দর লেখা পড়ার প্রত্যাশায় থাকলাম জাকিয়া সুলতানা।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com