খুশবন্ত সিং-এর সাক্ষাৎকার: সেক্স তাদের মগজে

আন্দালিব রাশদী | ৩০ আগস্ট ২০১৫ ৯:৩৫ অপরাহ্ন

k-1.jpg১৫ আগস্ট ২০১৫ ছিল খুশবন্ত সিং-এর জন্মশত বার্ষিকী। কেবল ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পঠিত এই লেখক ২০ মার্চ ২০১৪ মৃত্যুবরণ করেন। ৯৪ বছর বয়সেও কলাম লিখে গেছেন, ৯৮ বছর বয়সেও তাঁর বই প্রকাশিত হয়েছে। দিল্লির ‘ডার্টি ও টি ম্যান খুশবন্ত সিং ভিনোদ মেহতাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে খোলামেলা অনেক কথা বলেছেন। জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধা জানাতে ভিনোদ মেহতার নেয়া এই সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন কথাসাহিত্যিক অনুবাদক আন্দালিব রাশদী। বি. স.

শীলা রেড্ডি সম্পাদিত ও সংকলিত খুশবন্ত সিং-এর Why I supported Emergency: Essays and Profiles-এর প্রকাশনা উপলক্ষে দুজন কীর্তিমান সম্পাদক আলাপ করতে বসেছিলেন। একজন Outlook-এর প্রধান সম্পাদক ভিনোদ মেহতা, অন্যজন দ্য ইলাসট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়ার একদা ডাকসাইটে সম্পাদক এবং প্রকাশিতব্য গ্রন্থটির গ্রন্থকার।
এমন দুজন মানুষ যখন কথা বলেন, লাগাম কে টানবে? আলোচনায় সেক্স, ডার্টি জোকস থেকে শুরু করে মানেকার বাজে ভাবে বেড়ে উঠা সন্তান করুন–কোনো কিছুই লুকোনো থাকেনি।

ভিনোদ:
দেবোনায়ার ম্যাগাজিনে ‘সেন্টারফোল্ড’ বলে একটা ব্যাপার ছিল। আমি প্রায়ই এ নিয়ে খুশবন্ত সিং-এর সাথে আলাপ করতাম। সুতরাং আমাদের বন্ধুত্ব ১৯৭৪ থেকে। মাঝখানে অবশ্য কিছু ঢেকুরও ছিল। আমি বোম্বে নিয়ে Bombay A Private View নামে একটি বই লিখি, এর একটি পুরো অধ্যায়ই খুশবন্ত সিংকে নিয়ে। একটি সাক্ষাৎকার নেবার জন্য যখন খুশবন্ত সিং-এর সাথে দেখা করি আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি যে এতো বছর ইংল্যান্ডে ছিলেন, কী করেছেন? তিনি জবাব দিলেন, সঙ্গম, পনির আর মদ। আমি তখন থেকে তাকে চিনি এটা আমার জন্য আনন্দের ব্যাপার।

খুশবন্ত, আমি (ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা) জরুরি অবস্থা নিয়ে আলাপ করতে চাই না, এটা অনেক আগেকার ব্যপার। কিন্তু পরপারে চলে গেছেন এমন অনেক খ্যাতিমানকে নিয়ে আপনি লিখেছেন। আপনার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ হচ্ছে যেহেতু মৃত খ্যাতিমানরা আপনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে না, সে জন্য আপনি তাদের ব্যাপারে নির্দয়। মৃত মানুষ নিয়ে লেখালেখি করার ক্ষেত্রে আপনার নির্ধারিত কোনো কানুন রয়েছে? আপনি তাদের সাথে সদয় হতে চান না কষে লাথি মারতে চান? আমার মনে আছে আপনি রজনী প্যাটেল সম্পর্কে কী লিখেছেন।…

খুশবন্ত:
(ভিনোদ কি বলছেন তা ঠিকভাবে শোনার জন্য সামনে ঝুঁকে পড়েন) আমি কেন বেশি লিখছি তা-ই জিজ্ঞেস করছেন কি?
ভিনোদ: (আরো জোরে বললেন) না তা বলিনি। আপনি যখন মৃতদের নিয়ে অবিচুয়ারি লিখেন তখন কি অবিচুয়ারি লিখার কোন নিয়ম কানুন মেনে চলেন? আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আপনি মৃত খ্যাতিমান মানুষের ব্যাপারে নির্দয়।
খুশবন্ত: মৃত মানুষের অবিচুয়ারি রচনার প্রশ্নে আমার মনোভাব ভিন্ন। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন কেউ মারা গেলে মৃত ব্যক্তি কোনো না কোনোভাবে একজন সাধুসন্তে পরিণত হন। আর তখন তার সম্পর্কে যা কিছু ভালো কেবল তাই লিখতে হবে। আমি সেভাবে দেখি না। যখন সততার সঙ্গে একটি অবিচুয়ারি লিখতে হয় আপনি যদি মনে করেন মানুষটি বদমাশ তাহলে অকপটে তাই লিখুন। লিখতে গিয়ে যদি সম্পর্ক খারাপ হয় হোক। তাতে কিছু এসে যায় না। আমার লেখার ধারাটা এমনই। আমি জানি আমার যখন মৃত্যু হবে বহু মানুষ আমার সম্পর্কে অনেক নোংরা কথা বলবে। এসব পড়ার জন্য তখন আর আমি বেঁচে থাকব না। আমি আশা করি আমার পরিবারও তা নিজেদের মতো করে মানিয়ে নিতে পারবে।

ভিনোদ:
আপনার এই ৯৪ বছরের জীবনে যাদের সাথে দেখা হয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে আপত্তিকর মানুষটি কে? তালিকাটি নিশ্চয়ই বেশ লম্বা।
খুশবন্ত: (হাসতে হাসতে) আমার এই দীর্ঘ জীবনে তিন-চার জনকে কেবল অন্তর থেকে অপছন্দ করেছি। আমার মনে হয় কৃষ্ণ মেনন এই তালিকার শীর্ষে, আমি তার অধীনে চার বছর চাকরি করেছিলাম। আমি জানি তিনি কোন ধরনের মানুষ। আরো কেউ কেউ আছেন, তাদের কথা বলতে চাই না। তিনি চলে গেছেন, তিনি আমার আর কিছু করতে পারবেন না। মামলাও না। অবিচুয়ারির লেখার নিরাপত্তা ওখানেই। তাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে কিছু বললে তাদের সন্তানেরাও কিছু বলতে পারবেন না। এ জন্যই এটা নিরাপদ। এরকম আরও তিন-চারজন আছেন। তবে আমার মনে হয় আমি তাদের ছেড়ে দেব।
ভিনোদ: আপনার কারণে আমার একটি বন্ধু হারিয়েছি। আমি যখন Sunday observer-এর সম্পাদক আপনি আপনার বন্ধু রজনী প্যাটেলকে নিয়ে কিছু একটা লিখেছিলেন।
খুশবন্ত: লন্ডনে আমার কলেজ জীবন থেকে রজনী প্যাটেল আমার বন্ধু। আমি তাকে জানতাম। রজনী আমার দেখা সবচেয়ে নীতিহীন রাজনীতিবিদ। তিনি নির্মমভাবে মহারাষ্ট্র শাসন করেছেন। কিন্তু তিনি যে অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ন এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাও ছিল না। আমি যখন তার অবিচুয়ারি লিখি আমি দরদ দিয়েই লিখি কিন্তু তাকে ছাড় দিইনি।
ভিনোদ: ম্যালকম মুগারিজ একবার বলেছিলেন ব্রিটিশদের যৌনতা তাদের মাথায়, যৌনতার জন্য তা এক ভুল জায়গা।
খুশবন্ত: তা ঠিক।
border=0ভিনোদ: আপনি কি মনে করেন ভারতীয়দের বেলাতেও তাদের যৌনতা মাথায়? তারা সক্রিয় যৌনতার চেয়ে সঙ্গমের গল্প করতেই পছন্দ করে। আমরা বেশি বলি এবং কম করি?
খুশবন্ত: ভারতীদের বেলায় যৌনতা যেখানে থাকা দরকার তার বদলে এটা মাথাতেই বিরাজ করে। যখন বয়স বাড়তে থাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা শরীরের মাঝখান থেকে মাথায় চলে আসে এবং যৌনতা নিয়ে অবসেশন সৃষ্ট হয়। এটা মৌলিক অনুভূতি, অপরিহার্য এবং ভালোবাসা ও ক্রোধের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি আবেগ। যেহেতু এটা মৌলিক; অদ্ভুত এর প্রকাশ বিচিত্র ও অদ্ভুত পন্থায়। এটাকে দমিয়ে রাখা যায় না। সে কারণেই কৌমার্যব্রত সফল হয় না। বহুমাত্রিক সম্পর্কের তাড়নাও মানবিক। আমি তথাকথিত সুখী দম্পতি সম্পর্কে অনেকবার লিখেছি। এই ধরনের দম্পতি ব্যাভিচারে অংশগ্রহণ করুক বা নাই করুক ব্যাভিচার দু জনের দম্পতি মনের পশ্চাদ্দেশে রয়ে গেছে।
ভিনোদ: আপনি বেশ কটি বইয়ে যৌনতা নিয়ে সরাসরি লিখেছেন।
খুশবন্ত: হ্যাঁ, আমার নিশ্চয়ই একটি ‘ডার্টি মাইন্ড’ রয়েছে। আমার সংগ্রহে বহু নোংরা জোকস আছে যা সাধারণ সর্দারজি কিংবা পার্সি কিংবা গুজ্জ (গুজরাটি) জোকসের চেয়ে অনেক বেশি মজার। কিন্তু এই সমাজে তা প্রকাশ করলে অশ্লীলতার জন্য জেল খাটতে হবে। তবে আমার সংগ্রহটি আশা করি আমার মৃত্যুর প্রকাশিত হবে।
border=0ভিনোদ: সাহিত্যিক হিসেবে ভি এস নাইপল একবার আমাকে বলেছেন খোলামেলাভাবে যৌনতা নিয়ে লিখা খুব জটিল ব্যাপার, কারণ তার দুশ্চিন্তা এ লেখা তার মায়ের হাতে পড়তে পারে তারপর মা তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেবেন। সাহিত্যে খোলামেলাভাবে যৌনতার প্রকাশ কি খুব কঠিন কাজ?
খুশবন্ত: ইচ্ছাকৃত এ নিয়ে লিখা যায় না কিন্তু এটি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ, লেখালেখিতে যৌনতাকে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। মানুষের সম্পর্ক কি হবে যৌন বাসনাই তা নির্ধারণ করে থাকে।
ভিনোদ: সেক্স নিয়ে খোলামেলাভাবে লেখা কি খুব কঠিন কাজ? মানুষ বলে সেক্স হচ্ছে দু’জন মানুষের পরস্পরের এমন একটা আচরণ যা এক অসম্ভব কর্ম।
খুশবন্ত: (সেক্স-এর নামে) মানুষের পরস্পরের প্রতি এমনসব কর্মকান্ডের সংবাদ পড়তে হয় মামলা-মোকদ্দমা থেকে দৈনিক পত্রিকা থেকে, বন্ধুদের কাছ থেকে তাদের সমস্যার গল্প শুনে ধারণায় উপনীত হতে হয়। আমি বুঝতে পারি পুরুষ ও নারীর সম্পর্ক কতো বহুমুখী হতে পারে এবং কখনো কখনো কী অদ্ভুত রূপ ধারণ করতে পারে। এর কিছু কিছু এমনকি বর্ণনার সম্পূর্ণ অযোগ্য। কাজেই এইসব বিষয় না লিখে এড়িয়ে যাওয়া আমি মনে করি অসততার শামিল।
k-3.jpgভিনোদ: কিন্তু সেক্স নিয়ে লেখা কঠিন কাজ, বিশেষ করে বর্ণনা করা? আপনি তো এ নিয়ে অনেক লিখেছেন। সেক্স দৃশ্য রচনা করা আপনার কাছে সহজ মনে হয় না কঠিন?
খুশবন্ত: আমার লেখায় ততোটা সেক্স নেই। আমি যদিও ডার্টি ওল্ড ম্যান হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছি, আমার দু’একটি ছোট গল্পে বা উপন্যাসে দু’এক জায়গায় সেক্স উঠে এসেছে- আমার অধিকাংশ লেখাই তো খুব সিরিয়াস ধরনের– ইতিহাস, জীবনী, ধর্মীয় বিষয়। ধার্মিক না হয়েও আমি ধর্ম নিয়ে যে কোনো লেখার চেয়ে অনেক বেশি লিখেছি।
ভিনোদ: এবার একটি জটিল প্রশ্ন– মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন! আপনি এতো বেশি সংখ্যক সুন্দরী মেয়েদের প্রলুব্ধ করেন কেমন করে? ভারতে আপনাকেই সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা করা হয়।
খুশবন্ত: এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই তবে এটা ঠিক নিয়মিত অনেক আকর্ষণীয় যুবতীরা আমার সাথে সাক্ষাৎ করে যায়। আমি তাদের সঙ্গ পুরোপুরি উপভোগ করি। তবে আমাকে এটাও বলতে হবে যতোই বুড়ো হচ্ছি অল্প সময়েই আমি বিরক্ত বোধ করতে থাকি, অন্যদের সাথে যেমন করি তাদেরও ঠিক পৌনে আটটার মধ্যে বিদায় করে দিই। আমি ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলি না, আমি বলে দিই, এখন চলে যাও। আমার ঢের হয়েছে।
ভিনোদ: চলুন সাংবাদিকতা নিয়ে কথা বলি। এখনকার সম্পাদকের ব্যাপারে কী মনে করেন? আপনার সময়ের রূপকথাপ্রতীম সম্পাদকের সাথে কেমন করে তাদের তুলনা করবেন?
খুশবন্ত: আমার সময়ে সবগুলো পত্রিকারই বস ছিলেন সম্পাদক, ম্যাগাজিনের বেলায় তো অবশ্যই। এখন সারা ভারতবর্ষে জুড়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং হিন্দুস্থান টাইমস প্রচারিত কিন্তু আমি আজকাল সম্পাদকদের নামও জানিনা, কারণ তারা পত্রিকা চালান মালিক কিংবা স্বত্তাধিকারী। তারা সামনের পাতায় হেডলাইন হিসেবে যতো বেশি সংখ্যক সম্ভব খবর ছাপেন আর বাকী সব বলিউড, ফ্যাশন কিংবা সুন্দর মেয়ে। গোটা কগজ ঘেটে দেখুন পড়ার মতো কিছু নেই। আপনার লেখা পড়ি, কারণ আপনারটা পড়া যায়। কিন্তু আর কোনো সম্পাদকের নাম আমার মনে পড়ছে না যার লেখা আমাকে পড়তে হয়। (রামচন্দ্রন) গুহ সম্ভবত একজন ব্যতিক্রম কিন্তু তিনি তো সম্পাদক নন। অল্প কজন সাংবাদিক রয়েছেন যাদের লেখা আমি পড়ি, তারা ভালো ও যুক্তিসংঘত লেখা প্রকাশ করে থাকেন।
ভিনোদ: আপনি কি মনে করেন না আপনার সময়ের সম্পাদকরা আত্মম্ভরী ধরনের ছিলেন–যেমন গিরিলাল জৈন বলতেন–আমি আমার সম্পাদকীয় লিখেছি ভারতের মাত্র দু’জন মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং আমার নিজের জন্য।
খুশবন্ত: না, লোকটা আসলে (দিলিপ) পাদগোয়েঙ্কার; তিনি বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পর তিনিই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সে সময় তিনি টাইমস অব ইন্ডিয়া সম্পাদনা করতেন। আমার সময় এস এম মালগোয়াকর একজন ভালো লেখক ছিলেন, ভালোদের একজন ফ্রাঙ্ক মোরেস, কিন্তু এসব তো অতীতের বিষয়। এসময় আমি এমন কারো কথা মনে করতে পারি না। আমি প্রতিদিন ছয় থেকে আটটা খবরের কাগজ পড়ি আর অধিকাংশ সময়ই চলে যায় ক্রসওয়ার্ড পাজলের সমাধান করতে, কারণ আজকাল খবরের কাগজে এটাই আমার কাছে সবচেয়ে মজার বলে মনে হয়।
ভিনোদ: টাইম অব ইন্ডিয়ার একজন বড় সম্পাদক জন জে নানপোরিয়া রোবকয়ের চোর বাজার থেকে জিনিস পত্র কিনতেন। একদিন এক যুবক এশটি দোকানে তাকে পেয়ে বললেন গুড আফটারনুন মিস্টার নানপোরিয়া। নানপোরিয়া যেখানেই যান দুজন তাকে অনুসরণ করতে থাকেন এবং তাকে গুড আফটারনুন জানান। শেষে নানগোরিয়া যখন গড়িতে উঠতে গেলেন, সেখানেও সেই যুবক। তিনি তাকে বললেন, ‘তুমি তো চমৎকার মানুষ, কিন্তু তুমি কে?’ আপনি কি মনে করেন আমার কুকুরকে সম্পাদক বলা যুক্তিযুক্ত ?
খুশবন্ত: হ্যাঁ,
ভিনোদ: গ্রাহাম গ্রিন একবার বলেছেন, একজন মানুষকে কেবল তার বন্ধু কারা সেই নিরিখে বিচার করা উচিত নয়, আসলে বিচাকের মানদন্ড হওয়া উচিত তার শত্রু কারা। বলুন, আপনার শত্রু কারা?
খুশবন্ত: ধর্মীয় মৌলবাদীরা ছাড়া আমার কোনো শত্রু নেই। যখন আমাদের মধ্যে ভিন্দ্রানওয়ালে ছিল, আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম, তার বিরুদ্ধে লেখার মতো সাহস আমি দেখিয়েছি। পুলিশ আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছে, সে জন্যই, দোহাই ওদের উত্থান যেনো না হয়।
border=0ভিনোদ: এস. কে আদভানি সম্পর্কে কিছু লিখতে পারি?
খুশবন্ত: আদভানি সাহেবকে নিয়ে আমি সত্যিই হতাশ। আমি তাকে চিনি, তিনি যখন দিল্লির নির্বাচনে অংশ নিলেন যোগ্য মানুষ বলেই আমি তার মনোয়নে সমর্থন জানিয়েছি। তিনি ভালো বলতেন। তিনি নির্দোষ ও স্বচ্ছ মানুষও ছিলেন। আমি তার মনোনয়নের কাগজে সই দিয়েছি কারণ সে সময় ১৯৮৪ (অপারেশ ব্লু স্টার, শিখদের অমৃতসর স্বর্ণমন্দির আক্রমন)-র পরপর শিখেরা কংগ্রেসকে ভোট দিতে আগ্রহী ছিল না। কাকে ভোট দেবে তাও তাদের জানা ছিল না। যখন আমার সইসহ তার মনোনয়নের কথা কাগজে প্রকাশিত হলো, তার বাক্সে শিখদের ভোট পড়ল এবং তিনি সহজে জিতে গেলেন। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিতে এলেন। কিন্তু যখন তিনি এই রথযাত্রা শুরু করলেন আমি সত্যিই হতাশ হলাম, এবং ইন্ডিয়া ইটারন্যাশনাল সেন্টারে এক সভায় তা বললাম। তিনি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তার সাথে ব্ল্যাক কমান্ডো, আমি প্যাঙ্গুইনের সাথে ছিলাম বলে সভাপতিত্ব করছি। আমি এ কথা বলার স্বাধীনতা নিলাম: ‘আদভানি সাহেব। আমি ভালো নই, তবুও এখানে এসেছি, আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই যা হয়ত অন্যভাবে বলা সম্ভব হবে না। আপনি দেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করেছেন, এর জন্য দেশকে মূল্য দিতে হবে… আমি সবসময়ই বিশ্বাস করতাম যে আপনি পরিচ্ছন্ন, সৎ, নারীগামিতার উর্ধ্বে-এসব মানুষ ভয়ঙ্কর হয়।
indira.jpgভিনোদ: আপনাকে ইন্দিরার চামচা বলা হয়েছে।
খুশবন্ত: যখন জরুরি অবস্থা জারি করা সঠিক বলে আমি মনে করেছি আমি তাকে সমর্থন করেছি। কিছু আপত্তি থাকলেও ২৫ জুন ১৯৭৫ জারি করা ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থাকে সমর্থন করেছি। কেন করেছি তা ব্যাখ্যা করেছি। আমি স্বীকার করি যে প্রতিবাদ করার অধিকার গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সভা সমিতি করে সমালোচনা ও নিন্দা অবশ্যই করতে পারেন, মিছিল করতে পারেন, হরতাল করতে পারেন, ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু জোর করে বাধ্য করতে পারেন, সহিংস হতে পারেন না। যদি সে রকম কিছু ঘটে, প্রয়োজনে সরকারের কর্তব্য হচ্ছে বলপ্রয়োগ করে তা বন্ধ করা।
জরুরি অবস্থার সময় তিনি যখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলেন, আমার সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলাম। যিনিই ইন্দিরার বিরোধিতা করেন তাকে দেখে নেওয়ার বাতিক ইন্দিরার ছিল। আমি যেহেতু এর পর আর কখনো তার সাথে দেখা করিনি, তিনি সে সুযোগ পাননি।
sanjoy.jpgভিনোদ: সঞ্জয় গান্ধীর এতো বড় ভক্ত যে হয়ে উঠলেন এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা আছে?
খুশবন্ত: সঞ্জয় অস্থির হতে পারে কিন্তু সে সঠিক পথেই ছিল। আমাদের দেশে বাধ্যতামূলক জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কিন্তু কেমন করে এগোবো আমার জানা নেই। আমি তাকে সমর্থন করেছি এবং এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।
ভিনোদ: অবশ্য আপনি তাকে গুন্ডাও বলেছেন। সমকালীন ভারতীয়দের মধ্যে মৃত নন এমন কোন ব্যক্তিত্বকে আপনার সবচেয়ে বেশি পছন্দ?
খুশবন্ত: আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দের মানুষটি মনোমোহন সিং। তার আদর্শ আছে। তিনি যখন বিজয় কুমার মালহোত্রার বিরুদ্ধে দক্ষিণ দিল্লির আসনের জন্য লড়ছিলেন, তখনকার কথা বলি। নির্বাচনের তিন দিন আগে তার মেয়ের জামাতা আমাকে দেখতে এলেন এবং বললেন, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নেবার মতো টাকা তাদের কাছে নেই। তাদের কেন্দ্রে নিতে আমাদের শতশত ট্যাক্সি ও বাস দরকার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কত লাগবে?’ তিনি বললেন, কয়েক লাখ তো লাগবেই। পরদিন আমি তাকে নগদ টাকা দিই। নির্বাচনে মনোমোহন সিং হেরে গেলেন। আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন আমি একা কিনা এবং তিনি আসতে পারেন কিনা। আমি ‘হ্যাঁ’ বলে দিলাম। তিনি একটি বান্ডিল বহন করে এলেন। বললেন, ‘আমি জানি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসার জন্য আপনি আমার জামাতাকে কিছু টাকা ধার দিয়েছিলেন ‘আমি টাকাটা খরচ করিনি।’ তিনি টাকা ফিরিয়ে দিলেন। এমন করতে পারেন আর একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদের কথা বলতে পারবেন? তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায়।
ভিনোদ: আর মাত্র দুটো প্রশ্ন। আপনি তো অনেক জোক লিখেছেন। আপনার শোনা শ্রেষ্ঠ জোক কোনটি?
খুশবন্ত: আমার সেরা জোকগুলো সবই নোংরা, জনগণকে তা জানানো ঠিক হবে না। অন্য এক সন্ধ্যায় আমার গাড়িতে চলে আসুন একটি প্রাণবন্ত সন্ধ্যা কাটবে। দুনিয়ার সব নোংরা জোক শোনাবো।

ভিনোদ: আজ সন্ধ্যায় যদি মানেকা ও বরুনের সাথে দেখা হয়, তাদের কি বলবেল?
খুশবন্ত: মানেকা ছেলেটাকে (বরুন) বড্ড বাজেভাবে বড়ো করেছে। যে সব কথা সে বলেছে বলে আমি জেনেছি তা অবিশ্বাস্য। অবশ্য প্রথমে সে অস্বীকার করেছে, কিন্তু বেরোবে কেমন করে, সবই রেকর্ড করা। মুসলমান কিংবা শিখদের সম্পর্কে প্রকাশ্য সভায় গালাগাল জাতিগত অপমানের সামিল। মুসলমানদের সম্পর্কে সে যা বলেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। আমি মনে করি তাকে নির্বাচন থেকে বহিষ্কার করা উচিৎ। কিন্তু আমি বলার কে? ভোটাররা জবাব দিক। কিন্তু আমি সন্দিহান সে জিতে যাবে।
ভিনোদ: এমন আমিই আপনার কাজটা করি – আপনাকে একটা জোক বলি।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অতিথি হিসেবে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। একদিন চার্চিল ভিকটেশন নেবার জন্য তার ব্যক্তিগত সহকারিকে ডাকলেন। হাতে প্যাড নিয়ে ব্যক্তিগত সহকারি বাথরুমে ঢুকলেন এবং দেখলেন চার্চিল সম্পূর্ণ দিগম্বর, মুখে পাইপ। তিনি ডিকটেশন দিতে শুরু করলেন। হঠাৎ দরজায় টোকা, চার্চিল দরজা খুলে দেখেন রুজভেল্ট সামনে দাড়িয়ে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন, পুরো আত্মবিশ্বাসের সাথে তিনি বললেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, দেখলেন তো, আমার লুকোবার কিছু নেই।
খুশবন্ত সিং দীর্ঘজীবী হোন।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — আগস্ট ৩০, ২০১৫ @ ১০:১৯ অপরাহ্ন

      বি.স’র ভূমিকায় ” ৯৪ বছর বয়সেও কলাম খিলে গেছেন, ৯৮ বছর বয়সেও তাঁর বই প্রকাশিত হয়েছে। ” এই বাক্যটি খুব সম্ভবত ‘৯৪ বছর বয়সেও কলাম লিখে গেছেন, ৯৮ বছর বয়সেও তাঁর বই প্রকাশিত হয়েছে” হবে।

      দুর্দান্ত সাক্ষাৎকার। খুবই প্রাঞ্জল অনুবাদ। অনেক ধন্যবাদ এমন একটা লেখা উপহার দেবার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Numan — আগস্ট ৩০, ২০১৫ @ ১১:৩৬ অপরাহ্ন

      simply awesome interview ! We know if any one say humanity is the religion our molla’s will declare him munafiq or nastik ! always He is my idol

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Prodip — আগস্ট ৩১, ২০১৫ @ ৩:৩৬ অপরাহ্ন

      চমৎকার সাক্ষাতকার। এসব কথা আগেই পড়েছি তার আত্মজীবনীতে ।
      এই একজন লেখক,যিনি পাঠককে সারাজীবন আনন্দ আর চিন্তার খোরাক দিয়ে গেছেন। আমার প্রিয় একজন লেখক। তার স্মৃতি অমর হোক ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন asgar ali sarker — আগস্ট ৩১, ২০১৫ @ ১০:০৯ অপরাহ্ন

      বিনোদ না লিখে ভিনোদ কেন লিখলেন? ভারতে কিছু নামের ক্ষেত্রে b না লিখে V লেখা হয়। যেমন rajiv gandhi , visha hindu parishad । আমরা কি রাজিভ বা ভিশ্ব লিখি ?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সিকদার তাহের আহমদ — সেপ্টেম্বর ১, ২০১৫ @ ১১:১০ পূর্বাহ্ন

      পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, ভারতীয়রা যখন ইংরেজিতে তাদের নাম লিখে তখন তারা “ব” কে “V” লিখে থাকে। যেমন, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংকে সংক্ষেপে লেখা হয় V P Singh, ইন্দিরা বর্মা হয়ে যান ইন্দিরা ভার্মা, ইত্যাদি। সে হিসেবে মনে হচ্ছে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম বিনোদ লেখা উচিত ছিল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tariq — সেপ্টেম্বর ১, ২০১৫ @ ১২:৪১ অপরাহ্ন

      ভাল লাগল।Hiccup এর বাংলা ঢেকুর না হয়ে হেঁচকি হবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন gani adam — সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৫ @ ১:৩৯ অপরাহ্ন

      ইংরেজি hiccup-এর প্রতিশব্দ হেঁচকি বা ঢেকুর দু’টোই বলা যায়। বিষম খাওয়া-ও বলা যায়। তবে যখন দু’জন বন্ধুর সম্পর্কের কথা প্রসঙ্গে শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে, (আমাদের বন্ধুত্ব ১৯৭৪ থেকে। মাঝখানে অবশ্য কিছু ঢেকুরও ছিল।)… এ ক্ষেত্রে আসলে এগুলোর কোনোটাই প্রযোজ্য হয় বলে মনে হয় না। এটা হতে পারে “উত্থান-পতন,” “ভুল বোঝাবুঝি,” “টানাপোড়েন” বা এ রকম কিছু।

      আন্দালিব রাশদী ভাইয়ের অনুবাদ তো এমনিতেই অসাধারণ! দারুণ লাগলো সর্দারজীর সাক্ষাৎকার পড়ে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com