মাহবুব হাসানের দুটি কবিতা

মাহবুব হাসান | ২৯ আগস্ট ২০১৫ ১১:৩১ পূর্বাহ্ন


পরাবাস্তব

আজকাল প্রায়শই মানুষকে উড়তে দেখি
তাদের পা আকাশে আর মাথা মাটির দিকে;
মাটির মানুষ কি-না!
এমন উল্টা কারবার জীবনে দেখিনি আমি, এমন কি
পশ্চিমারাও কখনো আকাশে পা দিয়ে হেঁটে বেড়াবার সখ করেনি,
তবে বাংলাদেশ তো কল্পরাজ্যের আগার-
কিছু মানুষকে দেখি অহমিকা আর ঐশ্বর্যের পিঠে চেপে
দিব্বি হেঁটে বেড়াচ্ছে সুনীল আকাশে।
আকাশ-পরীরা ভয়ে পাঙ্শু বর্ণ,
মেঘেদের সে কি পলায়ণপর দৌড়!
খরতপ্ত মানুষের মতো তারা হাপাচ্ছে, আর ঈশান কোণে জড়ো হচ্ছে
বৈশাখী ঝড়ের মতো প্রতিরোধের মিছিল করবে বলে
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলতে পারতেন ওই আকাশ তো আমার নামে পত্তন করা হে,
তোমরা কে গো?
বিনা অনুমতিতে আমার অন্তরে পা রেখে হেঁটে বেড়াচ্ছো?
ঐশ্বর্যের রাজা-রানীরা সুনীলের কথার তোয়াক্কা করে না।
তারা নিজের অধিকার ভেবে গোটা আকাশ-সাম্রাজ্য তছনছ করে ফেলে!

তারা হেঁটে বেড়াচ্ছে যথেচ্ছা, কেউবা দৌড়াচ্ছে; তাদের বুক পকেটে সার্টিফিকেট আছে মুক্তিযুদ্ধের। হোক তারা গৃহবন্দী, কিংবা বিদেশে লুকিয়ে থাকা যোদ্ধা বা কারাবন্দী রাজনৈতিক নেতা। দখলদারদো চাকরি করা অনেক মুক্তিসেনানিও আছে সেই আনন্দ মিছিলের অগ্রভাগে, তাদো গলার রগ-ফোলা বক্তৃতা ছড়িয়ে পড়ছে মেঘের পাড়া-মহল্লা ভেদ করে সুদূর নিহারিকামন্ডলের রাজ্যে,রাজ্যে।
তারাই তো সোনার ছেলেমেয়ে আমাদের? মুক্তিদাতা,
এবং ত্রাতা!

কোথাও কোনো বাঁধা নেই, প্রতিবাদ করার কেউ নেই, চারদিক নির্ঝঞ্ঝাট,
চান্দের আলোর নাগাল ফকফকা। যারা প্রতিবাদ করেছিলো
তাদের কবর দেয়া হয়েছে সোঁদা মাটির তলে,
মৃত্তিকার গভীরে নীল কাপড়ে মুড়িয়ে,
আর যারা ভেবেছিলো রাজপথে মিছিল করবে, তাদের অধিকারকে শানাবে
তলোয়ারের মতো, তারা পরিণতি ভেবে আত্মগোপনে গেছে।

কে চায় মধুর জীবন হারাতে?

‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?’

সেই ত্রাসে স্বাধীনতা তার অপার্থিব মাথাটিকে নুইয়ে দিয়েছে।
বিন্ধ্য পর্বত যেমনটি করেছিলো অগস্ত্য মুনির আদেশে। কিন্তু নিচে, সেই মাটিতে
নতুন ঘাসের ডগা দেখতে পাচ্ছে সে,
নতুন প্রাণের পরশ পাথর জ্বলজ্বল করছে হীরের টুকরোর মতো।

কিন্তু আমি চমকিত হলাম এই ভেবে যে যারা হাঁটছে নীলের সমুদ্রে পা রেখে
তারা জানে না সেখানে কোনো মাটি নেই-
জ্যোৎস্নার মতো মসৃণ আলোর খেলা, সারাবেলা,
কেবলি অনন্ত নীল আর অনন্ত শূন্যের কারসাজি ডিগবাজি খায়।
বাজি ধরে বলতে পারি
ক্ষমতার মধ্যাকর্ষণ যখন ফেল করবে, তাদের হবে ইকারুসের মতো সলীল সমাধি কিংবা ভূমির গহনে তারা ঢুকে যাবে গোত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো।
উটপাখির মতো নীলের সাগরে মুখ-চোখ গুঁজে ভাবছে তাদের কোনো পতন নেই
কেবলি উত্থান উর্ধ্বাকাশে—

আসলেই কি তারা হাঁটছে উপুড় আকাশে?

‘আমি এই দেখিলাম সোনার ছবি
আবার দেখি নাইরে…’

আকাশের কূল নাই কিনারা নাইরে-
বিষম আকাশ-নদী মেঘ করে কানাকানি,
ক্ষমতাবানেরা তা জানে না রে…

আমি দেখি তাদেরই যারা মাটিকে দেশ না ভেবে
নিছক খেলনা ভাবে এবং তারাই
আকাশে হেঁটে বেড়ায় আজ।
পরাবাস্তবের ঘোড়ায় চড়ে আমি
এই সব দেখি আর বোররাখের ক্ষীপ্র গতি উপভোগ করি।
কল্পনাকে হাতির দাঁতের সাথে বেঁধে
কলমকে সুপারসনিক মিসাইল করে তুলি-
স্বপ্নের ভেতর থেকে টেনে তুলে আনি বাস্তবের শাখা-প্রশাখা
তাদেরই একটি ডালে সুস্বাদু ফল পেকে টুসটুসে হয়ে আছে
নাম তার স্বাধীনতা!

আমি ওই স্বাধীনতা ফলটিকে খাবো বলে হাত বাড়াই
কিন্তু আমার হাত দুটি কেন যেন ফিল্মের ফ্রিজ-শটের মতো হয়ে গেলো!

ত্রিশঙ্কু যেমতি মহাকাশে—-

০৬/৩০/১৫
পোমোনা, লস এঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র

product.JPG

বৃষ্টির আয়াত

আজ সকালে নাতিদীর্ঘ আয়াতের ঢঙে ভোরের বেহাগ বাজাতে বাজাতে
আষাঢ়ি বৃষ্টি নামলো। আমি বৃষ্টির ঘ্রাণ পেলাম আর কৈশোরের টিনের চালে
বাজতে থাকা ঝমঝমাঝম নূপুরের ধূসর ধ্বনি আমাকে বড়শিতে গেঁথে তুললো।
বাস্তব আর স্মৃতির এই দ্বৈত বৃষ্টির সঙ্গীত আমাকে নাচাতে নাচাতে
মাঠে নামালে আমি ভিজতে থাকলাম সত্তার গহনে
আর সারা অঙ্গ ভিজলো আরা অ-বাংলার বৃষ্টিতে।
খুব চেনা সে, বাংলার জল-হাওয়া, ইলিশের স্বাদু গন্ধে ভরপুর মার্কিনি বারিধারা।

রোদ আর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমি বহুকাল কাটিয়েছি আমার গ্রামে।
জন্মেও ভিটায়, উঠোনে গড়াগড়ি গেছি বৃষ্টির নাছোড় টানে, ভাই-বোন, পাড়াপরশীদেও নিয়ে পিচ্ছিল কাদায় ভরা পথে হেঁটে গেছি
বন-বাদাড়ে কোন খেয়ালের রাগের পিঠে সওয়ার হয়ে।
আমি বহুবার কপ্টারের মতো উড়েছি ঝড়োবাতাসে কাঁপতে থাকা
আমবাগানের উপর দিয়ে বাড়ির পথে। কিন্তু আমার বাড়ি ফেরা হয়নি কোনোদিন। দুনিয়ার সব বৃষ্টি-বাদলার সাথে দেখা করে, ভিজে কাক হয়ে জানলাম আসলে সব সঙ্গীতেই আছে বাতাসের শিষ, আছে বৃষ্টির গোঙানি, আর কান্নার শব্দরাজি।

কে কাঁদে এই বাদলা দিনে?

সেই ছেলেবেলায় বর্ষাকালে বৃষ্টিকে ধেয়ে আসতে দেখে আমার মনে হতো সে কি দেও-দানব কোনো? দাদির গল্পের সেই দৈত্যদের মতো শম শম শব্দে চার দিগন্ত কাঁপিয়ে তারা ছুটে আসতে থাকলে আমাদের সংসারি নারীরা ভয়ার্ত গলায় সবাইকে ডাকতো শুকুতে দেয়া ধান বা পাটের মুঠাগুলো তুলে ফেলার জন্য, আর সেই হিড়িকের সময় আমার মনে হতো এ তো মেঘের ফোটা নয়, যেন আল্লার চোখের পানি, অজস্রধারায় ঝরছে। নিরাক-পড়া মধ্যদিনের বৃষ্টি সেই বেদনারই কথামালা বলে মনে হতো আমার।
আল্লাহ বেদনার্ত হলে মানুষ ও প্রকৃতিকে ভিজিয়ে শান্ত হয়ে যান। কেননা, তাতে মানুষের পাপ ধুয়ে মুছে যায়। মানুষ প্রতিনিয়ত যে পাপাচার করে চলেছে মিথ্যা বলে, আর মিথ্যা অভিমানে, মানবাত্মা কলঙ্কময় করে, প্রকৃতি-আত্মার ওপর নিখিল আগ্রাসী লোভ উসকে দিয়ে,
বৃষ্টি তার নানান ঠাটে সঙ্গীত বাজাতে বাজাতে সেই কলঙ্ক মুছে দেয়, ভালোবাসায় সিক্ত করে তোলে মানবজীবন।
আমি সেই মানুষ, বৃষ্টিতে ভিজে প্রতিবারই নতুন মানুষ হয়ে উঠি
আর গাই বৃষ্টির গান।

পোমোনা, লস এঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র
০৬/২৫/১৫

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — আগস্ট ৩১, ২০১৫ @ ১২:৫৯ অপরাহ্ন

      আজ সকালে নাতিদীর্ঘ আয়াতের ঢঙে ভোরের বেহাগ বাজাতে বাজাতে
      আষাঢ়ি বৃষ্টি নামলো। আমি বৃষ্টির ঘ্রাণ পেলাম আর কৈশোরের টিনের চালে
      বাজতে থাকা ঝমঝমাঝম নূপুরের ধূসর ধ্বনি আমাকে বড়শিতে গেঁথে তুললো।

      বাহ্…

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।