সি. পি. কাভাফির কবিতা

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস | ২৬ আগস্ট ২০১৫ ৩:০২ অপরাহ্ন

cavafy-1.jpgকেবল গ্রিক আধুনিক কবিতারই প্রধান ব্যক্তিত্ব নন, আধুনিক যুগের বিশ্বকবিতারই তিনি এক প্রধান কন্ঠস্বর। কাভাফির জন্ম ১৮৬৩ সালে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায়। জন্ম মিশরে হলেও জাতিগত ও ভাষিক পরিচয়ে তিনি ছিলেন গ্রিক। সারা জীবন গ্রিক ভাষাতেই লিখেছেন। লিখেছেন কবিতাই, কিন্তু তা সংখ্যায় অল্প হলেও প্রায় প্রতিটি কবিতায় রয়েছে তার নিজস্বতার ছাপ। প্রথমে সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাজীবনের শুরু হলেও পরে তিনি Ministry of Public Works বিভাগে কেরানি হিসেবে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন। ১৯৩৩ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি আলেকজান্দ্রিয়াতে মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় তিনি বহির্বিশ্বে দূরের কথা, মিশরে বা গ্রীসেও খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। অধ্যাপক ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের তর্জমায় কাভাফির প্রতিনিধিত্বশীল কবিতাগুলোর একটি এখানে প্রকাশ করা হলো। বি. স.

ইথাকা

ইথাকার পথে তুমি যখন মাস্তুল দিলে তুলে
প্রার্থনা কর যেন যাত্রা হয় প্রলম্বিত,
পরিপূর্ণ রোমাঞ্চ ও অভিজ্ঞতা দ্বারা।
লিস্ট্রাইগ্যনি, সাইক্লপ, ক্রুদ্ধ পসাইডন
কাউকে করো না ভয় যতক্ষণ তোমার হৃদয়
রয়েছে উন্নত, যতক্ষণ তোমার দেহ ও আত্মা
সৃষ্টি করে দুর্লভ আবেগ।
লিস্ট্রাইগ্যণি, সাইক্লপ, রুষ্ট পসাইডন
এদের কারোই দেখা পাবে না, যদি না
নিজেই তুমি এদের বহন কর অন্তর্গত প্রাণে,
যদি না তোমার মন এদের সারাটা ক্ষণ
ধরে রাখে সমুখে তোমার।

প্রার্থনা কর যেন যাত্রা হয় দীর্ঘায়িত,
অনেক গ্রীষ্ম আর বসন্ত প্রভাতে
কি আনন্দে ফুল্লচিত্তে না-দেখা বন্দরে ফেলা প্রথম নোঙ্গর
জাহাজ ভেড়ানো ব্যস্ত ফিনিসিয় বাণিজ্য নগরে
সওদা করেছ তুমি দ্রব্যাদি উত্তম–
প্রবাল, স্ফটিক, মুক্তা, আবলুস কাঠ,
রকমারি ইন্দ্রজাগানীয়া ঘ্রাণ, মেশক-এ-অম্বর;
মিশরীয় অনেক শহরে ভ্রমণে;
গুণীজন সংস্পর্শে, জ্ঞান সঞ্চয়নে
ইথাকাকে পুষে রাখো মনের কোঠায়।
শেষযাত্রা সেখানেই বিধির বিধান
কিন্তু ভুলেও যাত্রা করো না ত্বরিৎ।

বরং এটাই ভালো,
হাজার বছর যাক সমুদ্র ভ্রমণে
কারণ যখন তুমি ফিরবে স্বদেশ তটে
বৃদ্ধ হয়ে গেছ তুমি বটে।
পথের সঞ্চয়ে তুমি হয়েছো ধনেশ
ইথাকার সম্পদের ভগ্ন অবশেষ
না-ই বা করলে আশা আর।
তোমার গৌরবযাত্রা–সে তো ইথাকারই দান
তার উদ্দেশ্যেই ছিল দুর্জয় এ অভিযান
এখন ফেরার পর তোমাকে দেবার
বাকী আর নাই কিছু তার
তবু যদি জননীকে মনে হয় বড় আকিঞ্চনা
জেনে রেখো সে কখনো করেনি বঞ্চনা।
অভিজ্ঞতাপ্লুত হয়ে এতটাই হয়েছ সজ্ঞান যে
ইতিমধ্যে এইসব ইথাকার মানে
তোমার হৃদয়ই সেটা জানে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — আগস্ট ২৬, ২০১৫ @ ৬:৪২ অপরাহ্ন

      অসামান্য অনুবাদ, যেখানে দেখি কবির গ্রীক-হৃদয়ের উদযাপন । অনুবাদক কাভাফির কবিতার জন্য আমাদের ভালবাসাকে উস্‌কে দিয়েছেন, কিন্তু নিষ্ঠুর থেকে গেছেন সেই ভালবাসাকে উদযাপনের জন্য বিচরণক্ষেত্র নির্মাণ না করে । আরও অনুবাদ চাই !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sharmin Ahmed — আগস্ট ২৬, ২০১৫ @ ১০:২১ অপরাহ্ন

      I actually enjoyed the poem…..”Elias sir fan”…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাহেদ সরওয়ার — আগস্ট ৩০, ২০১৫ @ ১২:১২ পূর্বাহ্ন

      মার্কেজের পেয়ারার সুবাসের পর থেকে খালিকুজ্জামান ইলিয়াস আমার প্রিয় অনুবাদকদের একজন। আবার প্রিয় কবিদের একজন কনস্তান্তিন কাভাফি। অসংখ্য ধন্যবাদ। ইথাকা কবিতাটার আরেকটা অনুবাদ পড়ছিলাম পুস্কর দাশগুপ্ত ও কালিয়োপি ব্লাৎসা দাশগুপ্তের অনুবাদে। তাদেরটা মূল গ্রিক থেকে অনুবাদিত। একটা ভাল জিনিসের একাধিক অনুবাদ সবসময় কামনা করি। সেটাও পড়া যেতে পারে।

      ইথাকা
      …………
      ইথাকার পথে বেরিয়ে পড়ার মুহুর্তে
      কামনা কোরো যেন তোমার যাত্রাপথ দীর্ঘ হয়।
      পূর্ণ হয় যত আশ্চর্য ঘটনা আর অভিজ্ঞতায়,
      ল্যাস্ট্রিগোনিয়ান আর সাইক্লোপদের
      কিংবা ক্রুদ্ধ পসিডনকে ভয় কোরো না,
      তোমার চিন্তাভাবনা যদি উর্ধ্বগামী হয়,
      যদি শুদ্ধ কিছু উপলব্ধি তোমার শরীর আর মনকে অধিকার করে থাকে,
      তাহলে তুমি যাত্রাপথে এ জাতীয় কোন কিছুরই অধিকার পাবে না।
      তোমার নিজের মধ্যেই যদি তুমি ওদের বয়ে না বেড়াও,
      তোমার অন্তর যদি তোমরই সামনে এনে ওদের বসিয়ে না দেয়,
      তাহলে তুমি ল্যাস্ট্রিগোনিয়ান আর সাইক্লোপদের
      অথবা ক্রোধে উন্মাদ পসিডনের দেখা পাবে না।

      কামনা কোরো যাত্রাপথ যেন দীর্ঘ হয়ে ওঠে।
      যেন অগুনতি হয় গ্রীষ্মের ভোর-
      যখন কি যে সুখ আর কি যে আনন্দ নিয়ে
      তুমি প্রবেশ করবে সেই বন্দরে যাদের তুমি প্রথম চোখে দেখছ।
      ফিনিসিয় বন্দরগুলিতে কিছুটা থেমে যেও,
      সওদা কোরো সুন্দর সুন্দর সব পসরা-
      ঝিনুক আর প্রবাল, মরকত আর মেহগিনি,
      নানান ধরনের বিলাসী সুগন্ধি-
      অনেক আরো অনেক বিলাসী সুগন্ধি;
      অসংখ্য মিশরীয় শহরে তুমি যেও,
      আর সেখানকার জ্ঞানীদের কাছ থেকে শিখে নিও অনেক কিছু

      ইথাকার কথা তুমি মনে রেখো।
      সেখানে পৌঁছোনোটাই তো তোমার লক্ষ্য।
      তা বলে তোমার যাত্রা ত্বরান্বিত কোরো না,
      বরং তা যেন বছরের পর বছর দীর্ঘায়িত হয়,
      তোমার নিজের দ্বীপে পৌঁছে নোঙর ফেলার আগেই তুমি যেন বুড়ো হয়ে যাও-
      পথে পথে যা কিছু অর্জন করেছ তাতে সমৃদ্ধ।
      আর ইথাকা তোমাকে ধনসম্পদ দেবে তেমন কোন প্রত্যাশা তোমার ছিল না।

      ইথাকা তোমায় দিয়েছে চমৎকার যাত্রা।
      সে না থাকলে তুমি তো আর পথে বেরিয়ে পড়তে না।
      তোমাকে এছাড়া আর কিছুই তার দেওয়ার নেই।

      ইথাকাকে তোমার নি:স্ব বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সে তো তোমায় প্রতারণা করেনি।

      এখন এতো কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে তুমি যখন একজন প্রাজ্ঞ মানুষ,
      তুমি বুঝতে পেরেছ ইথাকা কী বলতে চায়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Khaliquzzaman Elias — সেপ্টেম্বর ২, ২০১৫ @ ৩:২১ অপরাহ্ন

      মতামত দিয়ে যারা উৎসাহিত করলেন, সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ; বিশেষ করে ধন্যবাদ দিই জাহেদ সরওয়ারকে মূল গ্রীক থেকে বাংলা তর্জমা সংযোজিত করায়। আমারটা যে কার ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছিলাম তা আজ ৪৫ বছর পর আর মনে নেই। আবার তখনকার আমার এক নোট বইয়ের পাতায় অনুবাদকের নামটাও লিখে রাখিনি। সেসময় ইংরেজিটার পাশে কাঁচা হাতে সম্ভবত তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাটাও করে রেখেছিলাম। এখন সেটাই ঘসেমেজে দাঁড় করানো হয়েছে। এক সময় মনে করতাম যে অনুবাদ মূল ভাষা থেকেই হওয়া উচিত– অনূদিত টেক্সট থেকে নয় কেননা এতে মূল থেকে দু প্রস্ত সরে যাবার ভয় থাকে। তো এখন মূল গ্রীক থেকে অনূদিত বাংলাটা পড়ে মনে হলো আমি মূল থেকে খুব একটা সরে যাইনি। অন্তত দুদফা সরে গেছি এমন বোধ হয় বলা যাবে না। এজন্য ইংরেজি সংস্করণের অনুবাদককেই ধন্যবাদ দিই কারণ মনে হচ্ছে তাঁরটা মূল গ্রীকের খুবই অনুগত তর্জমা। এজন্য ইংরেজি অনুবাদ তা যে কোনো ভাষারই মূলানুগ হোক, সেখান থেকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে বাংলায় তর্জমা করলে তাতে হয়তো পাঠক তেমন বঞ্চিত হন না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন roman — december ১, ২০১৬ @ ১১:২১ অপরাহ্ন

      how can i relate ithaka in my personal life ? or is there any political sense in these poem ?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com