গল্প

অতর্কিতে

afsana_begum | 23 Aug , 2015  

আজ হঠাৎ আকাশে আগুন লাগল কেন? থমকে গেল বীথির পা দুটো।
আসাদগেট আড়ং-এর ছাদের ওপর দিয়ে মোহাম্মদপুরের আকাশটাতে আগুন। বীথির ইচ্ছে করল ‘আগুন, আগুন’ বলে চিৎকার করে। কিন্তু পা যেমন পাথর হয়ে থাকল, মুখও গেল আটকে। ইশারায় বলার শক্তিও নেই, শরীর অসাড়। বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চ থেকে উঠে বাসের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে সে মূর্তি হয়ে গেল, তাকিয়ে থাকল সামনের রহস্যময় লালিমার দিকে। সূর্য ডুবছে প্রতিদিনকার মতো, অথচ তখন যেন সবদিকে আগুনে ছেয়ে গেছে। হ্যাঁ, আগুনই তো, অসভ্য আর অবাধ্য আগুন, যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে ছড়ায়, সবকিছু নিজের আওতায় নিয়ে শেষে রাখে শুধু ছাই… হয়ত কারো ইচ্ছেগুলো তুচ্ছ করে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়। কিন্তু কার হয়েছিল এমন সর্বনাশ? বীথি ভাবল; তার নিজেরই কি? ঠিক এমনই লাল-নীল শিখা আকাশময় যেমন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, বীথি দেখেছিল পেপারের প্রথম পাতায়, টেলিভিশনেও। টায়ার পুড়ছিল, চকচকে গাড়ি একটাÑ দাউ দাউ করে জ্বলছিল, একটা কাভার্ড ভ্যান মনে হয়, একটা বড় বাস– হ্যাঁ, একটা বাস, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। টেলিভিশন দেখার সময়ে কে যেন ডুকরে কেঁদে উঠেছিল, কে যেন পেছন থেকে অস্থির চাপা গলায় বলেছিল, ‘টিভি অফ কর, অফ কর, বীথির খারাপ লাগবে, আহা রে, মেয়েটা সহ্য করতে পারবে না…’ কার কণ্ঠস্বর, মনে পড়ে না; তবে বীথির খারাপ-ভালো কোনো অনুভূতি হয়নি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় তখন বিভিন্ন চ্যানেলে বলে যাচ্ছে রমনা পার্কের পাশে বাস পোড়ানোর খবর, ছবি দেখাচ্ছে, প্রতিযোগিতা চলছে কে কত ডিটেইলে দেখাতে পারে। বাসের ভেতরে কী করে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আগুন, তা নিয়ে রিপোর্টিং হচ্ছে। মানুষের হাতে ভরা বোতল, বাসটাকে নিশানা করে ছুটছে, তাদের ধরিয়ে দিতে বলা হচ্ছে। পেট্রল বোমা আর গান পাউডারের কথা প্রথম শুনেছিল বীথি তখন। বাসের ভেতরে গান পাউডার সুযোগ মতো ছড়িয়ে দিতে পারলে আর কোনো চিন্তা নেই, ভেতরের অনেকে নিশ্চিত বেরোতে পারবে না, বেরিয়ে আসার আগেই গায়ে আগুন লেগে যাবে; বারুদের গন্ধ কোথা থেকে আসছে ভাবারও সময় পাবে না। সেদিনও হয়ত অনেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি, যারা একটু ভেতরের দিকে ছিল, সিট নিয়ে বেশ আরাম করে বসে ছিল, তারা নিশ্চিত পারেনি। কমলও পারেনি। এতদিনে বীথির মনে হলো, আকাশভরা আগুনরঙা মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বীথিকে কে যেন বলে দিল, কমল আগুনে পুড়তে থাকা বাসটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। কমল নেই, কোথাও অপেক্ষায় নেই বীথির জন্য। আচ্ছা, পুড়ে যাবার ঠিক আগে আগে কি কমলের নাকে তীব্র বারুদের গন্ধ লেগেছিল?
face.jpg
হয়ত লেগেছিল। কারণ পরদিন রনি এসে পেপারের প্রথম পাতার ছবি দেখিয়ে বলেছিল, ‘এই যে পা দেখছ বাসের জানালা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে, ওটা কমলের।’ শরীরটা নাকি ভেতরে ছিল, নিশ্চয়ই গন্ধ পেয়েছিল বারুদের কিংবা ধোঁয়ার আর বাঁচার চেষ্টায় জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। বীথি কমলের ওসব কথা পাত্তা দেয়নি। রনি কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, ‘ভালো করে দেখ, বীথি, এটা কমলের পা, আমি জানি।’ বীথি কাগজ চোখের কাছে টেনে নিয়ে দেখেছিল। নাহ্, ওরকম ছাইরঙা একটা পা কিছুতেই কমলের হতে পারে না। তার পা ছিল ফরসা, মুখের চেয়েও। বীথি বলত, ‘পা এত ফরসা হওয়ার কী মানে হয় বলো তো? মুখ হলেও একটা কথা ছিল।’ কমল হেসে বলত, ‘জুতোর ভেতরে থেকে থেকে ফর্সা হয়েছে। মুখের জন্যে যে জুতো নেই!’ বীথি হাসত সে কথা শুনে। কমল বাইরে গেলে জুতোই পরত। বাসের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসা পায়ে কোনো জুতো ছিল না। একটা খালি পা, কালো কুচকুচে হয়ে যাওয়া। ওটা কমলের পা হবে কেন? ওই বিশ্রী কালো ধ্বংসস্তূপের মতো বাসটার সাথে কমলের কোনো সম্পর্ক নেই। বীথির যুক্তি কেউ বিশ্বাস করেনি। বরং সবাই মিলে তাকেই বোঝাতে চেয়েছে, ‘কমল মারা গেছে, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’ বীথি কোনো মন্তব্য করেনি। তার মনেই হয়নি কোথাও কিছু হয়েছে, কোনো দুর্ঘটনা বা কোনো বিশেষ কিছু। তখন প্রতিদিন পেপার খুললেই পোড়া মানুষেরা যেন মিছিল নিয়ে আসত। ওপরের পাতায় আগুন জ্বলতে থাকা বাসের ছবি, মৃত্যুর খবর তার নীচে। বীথির মনে হয়েছিল সেটাও তেমনই একটা খবর, অন্য সব দিনের মতো, পেপার ভাঁজ করে রাখলেই যা চোখের আড়ালে চলে যায়। বিছানায় হেলান দিয়ে হাত থেকে পেপার নামিয়ে এখনই কমল হয়ত বলবে, ‘উহ্, এই পুড়িয়ে মারা আর সহ্য করা যায় না। যারা মারছে তারা কি জানে যে শরীরের চামড়াগুলো পুড়ে গলতে থাকলে কেমন লাগে?’ আর বীথি তাওয়ায় রুটি উলটিয়ে বলবে, ‘সত্যি, কমল, রাঁধতে গিয়ে সামান্য আঙুল পুড়লেও কেমন জ্বলতে থাকে! আর ওই দিন যে ইস্ত্রি লেগে তোমার হাত পুড়ল, কতদিন কষ্ট পেলে, বলো? প্রথমে নীল, তারপর চামড়া উঠে বিশ্রী সাদাটে হয়ে থাকল।’ বীথি কিছুতেই বিশ্বাস করেনি কমলের চামড়াগুলো পুড়ে গলে গলে পড়েছে, কমলের টুকটুকে ফরসা পা…! আর বাসের জানালায় ঝুলন্ত পায়ে কিছু চামড়া কালো কুচকুচে হয়ে কুঁকড়ে ছিল, উঠে উঠে এসেছিল খোসার মতো, রনি বলেছিল, ‘ওটাই, ওটাই কমলের পা, বেচারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচতে চেষ্টা করেছিল, খুব চেষ্টা করেছিল, বীথি।’ বীথির মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি।

শেষপর্যন্ত সবাই ধরেই নিল যে শোকে-দুঃখে বীথি হয়ত হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে গেছে। তা না হলে শ্রাদ্ধের দিনে প্যাকেট হাতে নিয়ে ওরকম হাপুসহুপুস করে বিরিয়ানি খেতে পারে? উত্তেজিত চোখে রনির দিকে তাকিয়ে বলতে পারে, ‘আজকাল ডিমের বদলে একটা বাজে টিকিয়া দিয়ে রাখে কেন বলেন তো? ডিম ছাড়া কাচ্চি জমে? কমল খেলে খুব রাগ করত, আঙুল দিয়ে চাল খুঁড়ে খুঁড়ে কিছুক্ষণ ধরে ডিম খুঁজত বেচারা।’ শুনে রনি খাবার মুখে খাবার নিয়েই হা করে তাকিয়ে ছিল বীথির দিকে, ভাবছিল, ‘কমল খেলে!’ বীথি কি পাগলটাগল হয়ে গেল নাকি! কিছুদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে, বলছিল সবাই। রনি খুব আয়োজন করে কমলের মৃত্যুর পরের সব কাজ শেষ করল। কী করবে, কোথায় করবে, কাকে খবর দেবে, কোনো প্রশ্নেই উদাস বীথি কোনো উত্তর দেয়নি, তাই তাকেই করতে হলো সব।

তারপর একসময় বীথি ঠিক হলো, একেবারে স্বাভাবিক। সময়মতো স্কুলের অফিসে যায়-আসে, তবে ভাবলেশহীন। কমলকে নিয়ে কোনো কথাই বলে না। কমলের চ্যাপ্টার যেন তার মুখের সামনে দুম করে বন্ধ হয়ে গেছে। অফিস থেকে ফিরে রনির বাড়ির সাবলেট রুমটায় সেই যে ঢুকে পড়ে, পরের দিন সকাল না হওয়া পর্যন্ত হাওয়া। রনি অবশ্য ভাড়াটিয়া হারানোর ভয় অগ্রাহ্য করে দু’চারবার বলেওছিল, ‘কমল তো নেই, এ শহরে তোমার আর থেকে কাজ কী? বাড়ি যাও।’ প্রতিবারই কথাটা শুনে চমকে উঠে পরমুহূর্তে নির্লিপ্ত হয়ে গেছে বীথি। শেষবার কে যেন একই কথা বলাতে সে উত্তর দিয়েছিল বটে, মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলেছিল, ‘চাকরি তো আছে, রনি ভাইয়ের ভাড়া মিটিয়ে দিতে পারব।’ তারপর কেউ আর এ নিয়ে ঘাঁটায়নি তাকে। রনিও কমলের কথা অথবা বাবা-মায়ের কাছে বীথির ফিরে যাবার কথা আর বলেনি। বীথির উপস্থিতি তার ভালোই লাগছিল। অসহায়ের মতো মাঝেমধ্যে লুকিয়ে তাকিয়ে থাকত বীথির দিকে। কমল থাকতে কখনো ওভাবে তাকায়নি। বীথির শ্যামলা মুখে বড় বড় কালো চোখের দিকে সেভাবে নজর দেয়া হয়নি আগে। কমল মারা যাবার পরে তাকালেই মনে হতো ভয়ানক বিষণ্নতা আর রাজ্যের কথা জমা হয়ে আছে সে চোখে; সেসব কথা জানতে ইচ্ছে করত। কেবল তাকিয়ে থাকলে তো আর জানা যায় না, তবে কিছুটা অনুভব করা যায় কখনো, কমল তাই তাকিয়েই থাকত। খাওয়ার টেবিলে বসে চায়ের কাপে চামচ নাড়ছে তো নাড়ছেই বীথি, কাত হয়ে থাকা গালে হাত, অন্যমনস্ক চোখ কাপের দিকে কিন্তু জানেই না কী দেখছে, ভেজা চুলের আগা থেকে পানি গড়িয়ে কামিজের পিঠ ভিজিয়ে দিচ্ছে… রনি পেপার পড়ার ছলে টেবিলে বসে দেখত, খুব মায়া হতো তার। কখনও মনে হতো বীথির হাত কি মাথায় ছুঁয়ে সামান্য সান্ত¦না দেয়, সঙ্কোচ এসে বাঁধা দিত। কে কী ভাববে, বীথি নিজেই বা কী ভাববে বোঝা যেত না। কমল যে মারা গেছে এই বিষয়টা নিয়ে তার সাথে খোলাখুলি কথা হলে কত কিছু বলা যেত, নতুন করে অনেক কিছু ভাবাও যেত। ধীরে ধীরে রনির ইচ্ছে করত বলে, ‘দেশের বাড়ি গিয়ে আর কী হবে, এখানেই থেকে যাও, আমিও তো একাই।’ বলতে সাহস হতো না। কে জানে, রাগ করে বীথি যদি চলেই যায়!
সবাই জানত, কমল যে মারা গেছে, বীথি তা বোঝে। বীথি নিজেও কি তা জানত না? কিন্তু জানা আর মেনে নেয়ায় যে তফাত আছে, সেটা হয়ত অনেকে জানত না। কমল নেই, এই কথাটা বীথি গত ছয় মাসে এক মুহূর্তের জন্যেও ভোলেনি অথচ তীব্র প্রতীক্ষায় ছিল যে কমল আসবে। কমল নিশ্চয়ই কোথাও গেছে, কাছেধারেই কোথাও, ফিরে এলে আবার তারা একসাথে সংসার করবে, এ যেন জীবনযাপনের পথে ভবিষ্যতের জন্য বেছে নেয়া যায় এমন অনেকগুলো উপায়ের মধ্যেই একটি। তাই বীথি অপেক্ষায় ছিল; কতদিনের অপেক্ষা তা জানত না কেবল। নানারকমের ব্যস্ততা নয়, শুধু একজনের অপেক্ষার ঘোরেও যে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয়া যায়, বীথি বুঝে ফেলেছিল। কখনও কমলের মোবাইল নম্বরে ফোন করত, রেকর্ডেড মেসেজ বেজে উঠত, ‘দুঃখিত, এই মুহূর্তে নম্বরটিতে সংযোগ দেয়া সম্ভব নয়…’ বীথি কানে ধরে রাখত, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরে একই বাক্য শুনে যেত বহুবার। চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ত কোনো কোনোদিন, ফোনটা ধরতে কমলের এত অবহেলা কেন– এটা ভেবে। এমনিতেও বড্ড ভুলো মন ছিল তার, প্রায়ই ফোনে চার্জ করাতে ভুলে যেত। চার্জারটাও ঠিকমতো কাজ করছিল না। কমল বলেছিল আগামী মাসের শুরুতে একটা নতুন চার্জার কিনে নেবে। হুট করে বাড়তি একটা খরচের জন্য টাকা থাকত না তার কাছে তবে হিসেবের টাকায় চমৎকার চলে যেত দুজনের। বছরখানেকের কষ্টের পরে ভালো একটা সময় এসেছিল, বীথি স্কুলে চাকরি পেল, সংসারে আয় বাড়ল। পরের বছর সাবলেট ছেড়ে নিজেরাই ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নেবে, এমনই কথা ছিল। বীথির কাছে এই ছয় মাসেও প্রতিদিন মনে হয়েছে, সেই সবকিছুই হবে– কমল ফিরবে, আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে। কোনোদিন যেভাবে কমলের হাত ধরে ঢাকায় চলে আসার জন্য জেলা শহরের বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিল, কমল বেশ দেরি করে এলে একসাথে একটা বাসে চেপে চলে এসেছিল কাউকে না জানিয়ে, তেমনই কোথাও যেন কমল তাকে দাঁড়াতে বলে গেছে। সামান্য বেশি দেরি হচ্ছিল শুধু।

তবে বীথি জানত সে হতাশ হবে না। কোনোদিন হয়নি। হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করবে বলে বাড়ি ছাড়তে হলো, অথচ সব ছেড়েও কখনও একলা লাগেনি তার। কমল ভরিয়ে রেখেছিল, তখনও রাখছে। সারাদিন মনে মনে সে কমলের সাথে কথা বলে, কথোপকথন চলে মাথার ভেতরে। বীথি প্রশ্ন করে, কমল উত্তর দেয়। আবার উলটোটাও। কখনও আগের কোনো ঘটনার কথা ভাবতে ভাবতে চোখের সামনে সেসব দেখা যায়। কল্পিত কথোপকথন জুড়ে দিলে সেই ঘটনা আরও বিস্তৃত হয়, নতুন মাত্রা পায়। গত ছয় মাস ধরে এমনই চলছে। রনির বাসার ওই সাবলেট ঘরটিতে ঢুকে দরজা আটকে দেবার পরে বীথি কোনোদিন একা ছিল না, একা হয়নি। একটা বাস পুড়ল আর সবাই বলল কমল আসবে না, তাই হয় নাকি? বীথি জানত কমল আসবে আর জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে গল্প শুরু করবে, ‘আজ বাসে কী হলো জানো?’
‘না বললে কী করে জানব?’ বীথি বলবে।
‘বাসে পেছনের সিটে এক লোক বসল।’
‘সে তো প্রতিদিনই বসে, গিজগিজ করছে মানুষ, কোনো সিট কি ফাঁকা থাকে?’
‘আরে শোনোই না– জানালাটার একদিকের কাচ ভাঙা, আরেকটা কাচ এদিক ওদিকে নাড়ানো যায়। দেখেছ তো, আজ কী ভীষণ গরম ছিল? গাছের পাতাও নড়ে না, গুমোট। বাস চলতে থাকলে তা-ও যা বাতাস লাগে গায়ে অথচ লোকটা বারবার কাচটা ঠেলে পাঠিয়ে দিচ্ছিল আমার দিকে। ব্যস, আমার বাতাস খাওয়া বন্ধ, একে তো ট্রাফিক জ্যাম, তারপর যেই না বাস চলতে শুরু করে, আমি আলতো করে জানালাটা পাঠাই তার দিকে, তারপর বাতাস খাই।”
‘বাহ্! লোকটা তখন কাচটা ঠেলে না?’
‘ঠেলবে না কেন? তার বাতাসের দরকার নেই নাকি?’
‘তাহলে সারা রাস্তা চলল ঠেলাঠেলি?’
‘আরে শুধু ঠেলাঠেলি না, পুরোটা শোনো আগে’
তারপর জুতো দরজার কোণে সমান করে সাজিয়ে রেখে দুই চেয়ারের ছোট্ট খাবার টেবিলে কনুই রেখে আরাম করে বসবে কমল। রহস্যের হাসি হেসে বীথিকে ইশারায় আরেক চেয়ারে বসতে বলবে। হাঁটু মুড়ে চেয়ারের ওপরে উঠিয়ে হাঁটুতে হাত বোলাতে বোলাতে বলবে, ‘আরে তারপর শুরু হলো আসল মজা– গুমোট আবহাওয়ার মধ্যে বলা নেই কওয়া নেই– ঝুম বৃষ্টি! ডিপ্রেশন মনে হয়।’
‘তো?’ ভুরু নাচিয়ে বলবে বীথি।
‘তো আবার কী? ভিজে যেন না যাই তাই কাচটা আমি আামার দিকে টানলাম আর সে তার দিকে।’
গল্প শেষ হয়েছে ভেবে বীথি অন্য কাজে যাবার প্রস্তুতি নিতে নিতে বলবে,‘মানে হলো গিয়ে, এতক্ষণ চলছিল ঠেলাঠেলি আর বৃষ্টি আসতেই শুরু হলো টানাটানি।’
তারপর দুজনে মিলে এই নিয়ে একচোট হাসাহাসি করবে, বীথি উঠে গিয়ে ভাঁজ করা শুকনো কাপড় বের করে আনবে, কমল চেয়ার থেকে উঠতেই চাইবে না, আধভেজা কাপড়েই বসে চা শেষ করবে, বলবে,‘দেখ না, প্রায় শুকিয়েই তো গেছে।’
বীথি যা ভাবত, যা বলত, যা শুনত, সব শব্দ ওই ঘরে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকত, প্রতিধ্বনিত হতো। ছয় মাসে বীথি কখনও একা হয়নি। ওই কালচে ছাইরঙা বাসটার সাথে কমলের কোনো সম্পর্ক নেই, বীথি বিশ্বাস করে। তবে মনে মনে ঘটনাটা নিয়ে সে যে ভাবেনি, তা নয়। বাসটা যখন জ্বলে উঠেছে তখন আশেপাশের বহু মানুষ নিশ্চয় সেখানে ছুটে গেছে। কেউ যেমন গিয়েছিল বারুদ ছেটাতে, কেউ পেট্রল ভরা বোতল হাতে, তেমনই কেউ গেছে উদ্ধার করতে, সাধ্যমতো পানি বা বালি ছিটিয়েছে, চেঁচামেচি করে মানুষ জড়ো করেছে, ফায়ার ব্রিগেডকে ফোন করেছে। বারবার বীথি ভাবতে চেষ্টা করত ঠিক কী হয়েছিল সেখানে। মানুষ ‘হায় হায়’ করেছে, যারা আগুন দিয়েছে তাদের গালিগালাজ করেছে কিন্তু তার বেশি যখন কিছুই করতে পারেনি তখন বোকার মতো চারদিকে ঠায় দাঁড়িয়ে পুড়তে দেখেছে। ভেতরের মানুষগুলোর আর্তনাদ নিশ্চয়ই একসময় থেমে গেছে, দর্শকদের শোকাতুর নীরবতার মাঝখানে একটা সময় নিশ্চয় বন্দীদের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পোড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। ছেলেবেলায় বাড়ির পেছনের শ্মশানে মানুষ পোড়ানো বহুবার দেখেছে বীথি। পিলারের পেছনে লুকিয়ে চিতার আগুনের স্ফূলিঙ্গ দেখেছে আর পটপট শব্দ শুনেছে অনেকবার। কল্পনায় সেই শব্দগুলো সাউন্ড এফেক্ট হিসেবে জুড়ে দিতে কোনো অসুবিধা হয়নি। কমলের যকৃৎ কিংবা অগ্নাশয় পুড়ছিল; পুড়ছিল কমলের হৃদপি-…পট পট পট…। সে সব কেবলই সাধারণ প্রত্যঙ্গ, হতে পারে তা অন্য কারও অথবা কমলেরই। কিন্তু কে বলেছে হৃদপিণ্ডে থাকে ভালোবাসা আর সাহস? কমলের ভালোবাসা আর সাহস কি ভস্মীভূত হতে পারে কখনও? হৃদপি- তো একটা অঙ্গমাত্র, তার বিনাশের সাথে কমলের বিনাশের কোনো যোগাযোগ নেই। তবু নিশ্চয় আশেপাশের মানুষেরা হতাশ হয়েছিল, ক্রোধে পাগল হয়েছিল কেউ কেউ। ঘটনার আকস্মিকতায় উত্তেজনা বা আঘাত যা-ই হোক, কাটিয়ে উঠলে নিজেদের মধ্যে আলাপও করেছে। মানুষ পোড়ার গন্ধ অগ্রাহ্য করে নাকে হাত চাপা দিয়ে তারা নাকি স্বরে কথাবার্তা বলেছে। একজন আরেকজনকে বলেছে, ‘কালকের পেপারে কার্টুন দেখছেন নাকি, ভাই? হাসিনার চেয়ারের নিচে খালেদা একটা বাসের মধ্যে কাঠকুঠ দিয়া আগুন দিতাছে?’ আরেকজন খানিকটা হতাশ গলায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছে, ‘দেখব না ক্যান, কিন্তু ক্ষমতার চেয়ার তো পোড়ে না, পোড়ে খালি শালার মানুষ।’ এক সময় হয়ত আধাপোড়া কিছু মানুষের আহাজারিতে তাদের গল্প থেমে গেছে, আহতদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়েছে কেউ। কেউ কেউ সেখানেই থেকেছে সাংবাদিক আর টেলিভিশন ক্যামেরা না পৌঁছানো পর্যন্ত, নিজেদের মধ্যে কিংবা ক্যামেরার সামনে বলাবলি করেছে, কী সব সাংঘাতিক ঘটনাই না ঘটে চলেছে খোদ রাজধানীতে!
বাসায়ও চলত তেমনই আলাপ, কমলের বন্ধু রনি ভাই আর তার ভাড়া বাড়ির আরেক সাবলেট ফ্যামিলির ভাই- ভাবী, বীথিকে সান্তনা দেয়া না-দেয়া সমান ভেবে কিছুদিন পর তারা চুপ হয়ে গেল। তবে ভাই-ভাবীর বাঁকা দৃষ্টি ছিল তার দিকে, বীথি একা আর রনিও অবিবাহিত, এক বাসায় থাকা ঠিক না। কোনো ব্যাভিচার শুরু হবার আগে বীথি ভালোয় ভালোয় দেশের বাড়ি চলে গেলেই শান্তি। দুর্দশায় পাশে থাকতে গিয়ে রনি যে দিনরাত বীথির এত খেয়াল রাখছে, তা তো ভানও হতে পারে, হতে পারে বীথিকে একলা পেয়ে কোনো সুযোগ খুঁজছে। ভাই-ভাবীর মনোভাব বুঝতে পারলেও সেসব নিয়ে ভাবার কোনো ইচ্ছে বা রুচি ছিল না বীথির। রান্নাঘরে বা খাবার টেবিলে রনির সাথে দু’একটা কথা হতো তার। খুব কমই কথার ফাঁকে হুট করে বুদ্বুদের মতো ভেসে উঠত কমলের কথা।
রনি বলছিল, ‘আমি নিশ্চিত ওটা কমলের পা।’
‘জুতো ছিল না, রনি ভাই,’ বীথি প্রতিবাদ করেছিল।
‘ভেতরের পায়ে ছিল বীথি, আমি শুনেছি।’
‘আরে বাবা, শুনলেই হলো? ভেতরের পা কি আস্ত ছিল যে জুতো দেখা যাবে?’
বলতে গিয়ে গলা ধরে এসেছিল তার। কিন্তু কাঁদেনি, কারণ সে জানে ওটা কমলের পা নয়। তবে হ্যাঁ, পা যারই হোক, তারও হয়ত কমলের মতোই একটা সাধারণ জীবন ছিল, তার জীবনেও একটা ‘বীথি’ ছিল, বাড়ি ফিরে ক্লান্তি কাটাবে বলে জমানো এক ঝুড়ি দৈনন্দিন গল্প ছিল। কিন্তু কে ছিল সে? বাসের ভেতরে গান পাউডার ছেটানোর আগে তার কাছে কেউ জানতে চায়নি, ‘ভাই, আপনি কোন পার্টির লোক? কারে সাপোর্ট করেন?’
সন্ধ্যার পরেও বীথি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল বাসস্ট্যান্ডে। চারদিকে মানুষ আসছে-যাচ্ছে, কেউ তাকে লক্ষ করেনি। অফিসফেরত দু’একজন দ্রুতগামী মানুষ তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। সামনে রাস্তায় একের পর এক বাস থেমে আবার চলেও গেছে, বীথি পা বাড়ায়নি, চোখ স্থির রেখেছিল লাল-নীল আকাশটার দিকে। পা নাড়াবে কী করে, সামনে যেন উঁচু পর্বত, সে উঠতে পারবে না, এই পর্বতময় শহরে সে থাকে কেন? ছেলেবেলায় শ্মশানের মাঠে যেভাবে বরফ-পানি খেলত, ঠিক সেই অবস্থা হয়েছে তার। কমল মারা গেছে; কেউ যেন তাকে আলতো ছুঁয়ে ‘বরফ’ বলে চলে গেছে, আর ফিরে আসেনি ‘পানি’ বলতে। বীথি বরফ, লাল মেঘগুলো বরফ।
আকস্মিক নির্জীব হাতটা ধরে কে যেন বলে, ‘এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ, বীথি?’
শব্দ শুনেও তাকাতে পারে না সে। মানুষটা বীথির কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকায়, গম্ভীর গলায় ডাকতে থাকে, ‘বীথি, অ্যাই বীথি, বাড়ি যাবে না? এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে কী দেখছ?’ মানুষটা নিজেও আসাদ গেটের ওপর দিয়ে মোহাম্মদপুরের পেছনের আকাশের দিকে তাকায়, বীথি কী দেখছে বোঝার জন্য। সেখানে কিছুই পায় না। আকাশে ততক্ষণে কালচে অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে। বোঝা যায় না কোনো পাখি নাকি প্লেন, কী দেখে বীথি ওরকম পাথর হয়েছে। জোরে ঝাঁকানি খেয়ে স্তব্ধ বীথি যেন জেগে ওঠে, চমকে তাকিয়ে দেখে রনি তার কাঁধ ধরে আছে। হঠাৎ বাধভাঙা কান্না আসে, চোখ মোছার কোনো চেষ্টাও করে না, হালকা অন্ধকারে বাস আর ট্যাক্সির খোঁজে ছোটা মানুষেরা কে আর খেয়াল করবে। কোথাও থেকে ফিরে এসেছে বীথি, কে আর বুঝবে! রনি মরিয়া হয়ে জানতে চায়, ‘কী হয়েছে তোমার?’ বীথির কান্না থামে না দেখে বলে, ‘চলো তো বাড়ি যাই, তারপর শুনব।’ বীথির ভেতর থেকে কিছু একটা ঘাই দিয়ে ওঠে তখন, কান্নার দমকে কোনোরকমে সে বলতে পারে,‘কমল মারা গেছে, রনি ভাই, কমল আর আসবে না।’
রনি বীথির হাত ধরে দাঁড় করানো সিএনজি ট্যাক্সির দিকে টানতে টানতে বলে, ‘কমল সত্যিই মারা গেছে, বীথি। দূর থেকে তোমার মুখ দেখেই বুঝেছিলাম কমলের কথা ভাবছ। তবু জানতে চাইলাম। কত কিছু হয় আমাদের চারপাশে, কত কিছু আমাদের কত নাড়িয়ে দিয়ে যায়! এতকিছুর পরেও বেঁচে থাকা বিস্ময়কর বটে। অথচ দেখ, বেঁচে থাকতে ভালোও তো লাগে,বীথি!’
ট্যাক্সির সিটে রনির পাশে বসতে গিয়ে বীথির মনে হয়, এ যেন তার জীবনে শোনা সবচেয়ে সুন্দর কথাগুলোর একটি। বীথির কোলের ওপরে পড়ে থাকা হাত ধরে রাখে কমল। এর চেয়ে বেশি সান্ত¦না হয়ত তার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। অন্ধকারে মুখ দেখা যাবে না জেনেও বীথি ফিরে তাকায় রনির দিকে।

Flag Counter


4 Responses

  1. kausar parveen says:

    সুন্দর !

  2. লীনা দিলরুবা says:

    “ট্যাক্সির সিটে রনির পাশে বসতে গিয়ে বীথির মনে হয়, এ যেন তার জীবনে শোনা সবচেয়ে সুন্দর কথাগুলোর একটি। বীথির কোলের ওপরে পড়ে থাকা হাত ধরে রাখে কমল।”
    এখানে কমলের জায়গায় রনি হবে না?

    গল্পটা বেশ লাগল। সাবলীল। একটানে পড়ে ফেললাম।
    গল্পলেখকের জন্য শুভকামনা।

  3. K Ahsanuddin says:

    একটানে পড়ে ফেললাম। শুভকামনালেখকের জন্য.
    This is life.

  4. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    কত কিছু হয় আমাদের চারপাশে, কত কিছু আমাদের কত নাড়িয়ে দিয়ে যায়! এতকিছুর পরেও বেঁচে থাকা বিস্ময়কর বটে। অথচ দেখ, বেঁচে থাকতে ভালোও তো লাগে।

    খুব ভালো লাগলো পড়ে, গল্পটা। অভিনন্দন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.