শামসুর রাহমান: বাংলাদেশের হৃদয়

সৈকত হাবিব | ১৭ আগস্ট ২০১৫ ২:৫৬ অপরাহ্ন

images1.jpgযদিও কবি হিসেবে এই ভূগোলে জীবৎকালে ছিলেন সর্বোচ্চ গৌরবান্বিত; ভালোবাসা-সম্মান-শ্রদ্ধা পেয়েছেন অশেষ, তবু নিজের সৃষ্টির অমরত্ব বিষয়ে সংশয়ী শামসুর রাহমান লিখলেন:

ভীষণ আঁধার আমাকে চকিতে মুছে ফেলে দিলে,
আমার সৃষ্টি শব্দমালা কি ঝুলবে তখনও
পাঠক-সমাজে? জানবো না, হায়, কিছুতেই আর।
তবুও সফেদ কাগজ সাজাই কালো অক্ষরে।
হয়তো আড়ালে জাঁদরেল কোনো ক্রিটিক অধরে
বাঁকা হাসি টেনে আমার বেচারা কবিতার বই
ছুঁড়ে ফেলে দেন বাজে কাগজের ঘৃণ্য পাহাড়ে।
এই পরিণতি জেনেও এখনো বেহায়া মাথায়
এক রাশ শাদা কাশফুল নিয়ে কখনো সকালে
দুপুরে অথবা গভীর নিশীথে কলম চালাই।
[এই পরিণতি জেনেও এখনো/শামসুর রাহমান]

রবীন্দ্রনাথের ‘১৪০০ সাল’-এর মতো আত্মবিশ্বাসী কোনো কবিতা বোধহয় লিখেননি শামসুর রাহমান। বলেননি, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে… পড়িছ বসে আমার কবিতাখানি’। বরং ওপরের কাব্যাংশের মতো চিরটাকাল তিনি ছিলেন সংশয়ী; মৃত্যু-উত্তর জীবনে তার কবিতার অমরত্ব নিয়ে দ্বিধাদীর্ণ। অথচ শামসুর রাহমান, জীবদ্দশায়ই খ্যাতিমান ছিলেন ‘বাংলাদেশের প্রধান কবি’ হিসেবে। শুধু তা-ই নয়, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জসীমউদ্দীনের পর জীবিতকালে এত শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-জনপ্রিয়তা আর কোনো কবি পেয়েছেন কি-না সন্দেহ।

আর অমরত্ব বলতে যা বোঝায়, তিনি তা মৃত্যুর আগেই লাভ করেছিলেন। কবি ও কবিতাকে ঘিরে বাংলাদেশে জীবনের উৎসবের পুনরুজ্জীবনও যেন ঘটেছে শামসুর রাহমানকে ঘিরেই। তাহলে কেন এত সংশয়? কেন নিজেকে নিজেই ব্যঙ্গ করা? (…বেহায়া মাথায় এক রাশ শাদা কাশফুল নিয়ে কখনো সকালে
দুপুরে অথবা গভীর নিশীথে কলম চালাই।) কারণ কবিতা, কেবল কবিতার ভেতর দিয়েই তিনি যাপন করেছেন জীবন, কবিতার জন্যই ছিল তার বেঁচে থাকা আর কবিতার মধ্য দিয়েই তিনি চেয়েছেন অমরত্ব। সেজন্যই নিরন্তর কলম চালানো ‌’সকালে দুপুরে অথবা গভীর নিশীথে’।

আজকের এই ভোগলিপ্সাময় পৃথিবীতে এ বড় কঠিন বেঁচে থাকা, যেন অন্ধকারের ভেতরেই ঢিল ছোঁড়া, সীমানা-গন্তব্যহীন। কিন্তু শামসুর রাহমান নিজের এমন এক গন্তব্য চিহ্নিত করেছিলেন, যেখানে অমরতাই একমাত্র পথ। তিনি একটি ভূখণ্ডের এমন এক প্রতিনিধি, গত শতাব্দীতে তার যে বিপুল-ব্যাপক ইতিহাসের বিস্তার ও ঘটনাপ্রবাহ, তার সবকিছুই যেন পরম মমতায় ধরা আছে তার কলমে। শামসুর রাহমান যুদ্ধের-সংগ্রামের মাঠে সক্রিয়ভাবে ছিলেন না তেমন, কিন্তু এই জাতির যা কিছু অর্জন, মহিমা, ত্যাগ, সংগ্রাম ও সাধনা- তার সবচেয়ে নিবিড় প্রকাশ আছে তাঁর কবিতায়। পুশকিনকে বলা হয় রাশিয়ার আত্মা, শামসুর রাহমানকেও বোধকরি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ অভিধা দেওয়া যায় বাঙালি জাতিসত্তার তাবৎ কিছুকে তার সত্তায় ধারণ করার জন্য।

কিন্তু কেবল ঐতিহাসিক কারণেই কি শামসুর রাহমান প্রাসঙ্গিক? না। বরং বাংলা কবিতায় সহজ-নির্ভার-স্বচ্ছ এক ভাষাশৈলী নির্মাণও শামসুর রাহমানের একটি বড় অর্জন।
প্রায় ছয় দশকের কবিজীবনে তিনি তাঁর কাব্যস্বভাবকে অক্ষুণ্ন রেখেও নিজেকে নিয়ত নির্মাণ করেছেন। সামান্য সমকালের পথ বেয়ে মহাকালের দিকে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। বিন্দু বিন্দু করে গড়ে তুলেছেন তার কাব্যসিন্ধু।

শামসুর রাহমানের কাব্যসত্তাকে নিবিড়ভাবে পাঠ করলে তাই মনে হয়, পৃথিবীর এই দুঃসময়ে হয়তো কবিতাই আমাদের পরম আশ্রয়স্থল এবং কবিই শেষ ভরসা। কেননা কবি তার সত্যের শক্তিকে আজও নিবিড়ভাবে বহন করে চলেছেন। শামসুর রাহমান ছিলেন এরই উজ্জ্বল প্রতিনিধি। আমৃত্যু ছিল তাঁর সত্যের সাধনা এবং আমাদের জীবনের সব সংকটমুহূর্তে ছিল তার তীব্র-দৃঢ় উচ্চারণ।

সত্য ও সুন্দরের প্রতি, পৃথিবী ও স্বদেশের প্রতি, জীবন ও সপ্রাণতার প্রতি তার তীব্র ভালোবাসা, সুগভীর আকর্ষণ দিয়ে তিনি প্রতিটি মুহূর্তে জীবনের জয়পতাকা উড়িয়ে গেছেন, সব বৈরীমুহূর্তে আমাদের ভরসা জুগিয়েছেন।

জাতি হিসেবে আমরা অনেকটা আবেগপ্রবণ, কিছুটা হুজুগে এবং বিস্মৃতিপ্রবণ– এ অভিযোগ প্রায় প্রতিষ্ঠিত। কারণ এই বিপুল সৃষ্টিসমৃদ্ধ কবির ক্ষেত্রে বোধকরি তার নামটিই কেবল আমরা স্মরণ করি, তার সৃষ্টির সঙ্গে আমাদের কতটা গাঢ় পরিচয়–এ নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

কবিকে ভালোবাসা মানে কেবল ব্যক্তিকবিকে ভালোবাসা নয়, বরং তাঁর সৃষ্টি, আদর্শ, অর্জনকে ভালোবাসা। আর শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি আমাদের যতটা ব্যক্তিক ভালোবাসা, এর চেয়ে তার সৃষ্টির গভীরে প্রবেশ করে সেখান থেকে নিহিতার্থ খুঁড়ে তাকে হৃদয়-মনন দিয়ে ভালোবাসায় অনেক ঘাটতি আছে। আমরা যদি সত্যিকারভাবে কবিকে ভালোবাসতে চাই তাহলে তার সৃষ্টিতে অবগাহন করতে হবে। তাকে নিরন্তর পাঠ করতে হবে। এই-ই একমাত্র পথ আমাদের প্রিয় কবিকে চিরজীবিত রাখার। আর তিনি তো তা-ই চাইতেন।

জয় হোক কবি, কবিতা আর সুন্দরের।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শহীদ ইকবাল — আগস্ট ১৮, ২০১৫ @ ১০:১৮ পূর্বাহ্ন

      কবি সৈকত হাবিবের কাছে কবিতা নিয়ে আরও নিবিড় বিশ্লেষণ প্রত্যাশা করেছিলাম। একটু বোধ হয় ফরমায়েসী হয়ে গেছে। প্রণতি শামসুর রাহমান…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — অক্টোবর ১৮, ২০১৫ @ ১১:৫৩ অপরাহ্ন

      This article from the pen of Saikat Habib looks too small to our expectation from him who could have given a far detail description about Shamsur Rahman verbally if asked for in the teatable.Why Rahman has not been compared with anyone contemporary with him

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com