অনুবাদ, উপন্যাস, কথাসাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 2 Aug , 2015  

combo.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২৬

বাড়ির অন্ধকারে বসবাসরত এই নিঃসঙ্গ বিধবা, যে নাকি এক সময়ে তার অবদমিত ভালবাসার সমস্ত আলাপের অংশিদার ছিল, যার নাছোড় মনোভাব তার জীবন বাঁচিয়েছিল, সে পরিণত হয়েছে এক অতীত অধ্যায়ে। হাতের কব্জি পর্যন্ত কালো রঙে আবৃত, ছাই হয়ে যাওয়া হৃদয় নিয়ে রেবেকা, খুব সামান্যই যুদ্ধের খবর রাখত। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মনে হচ্ছিল যেন তার হাড় থেকে বের হওয়া প্রভা চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসছিল, ঘুরে বেড়াচ্ছিল আলেয়ার আলোয় আর যে বদ্ধ বাতাস তখনও পর্যন্ত গ্রহণ করছিল তা ভরা ছিল বারুদের গন্ধে। কর্নেল উপদেশ আরম্ভ করে তার শোকের মাত্রা একটু কমাতে, ঘড়ের ভিতর আলো বাতাস ঢোকাতে, আর হোসে আর্কাদিওর মৃত্যুর জন্য পৃথিবীকে ক্ষমা করতে। কিন্তু এরই মধ্যে এই বিশ্বসংসারের সব কিছুর উর্ধে। মাটির স্বাদের মধ্যে, পিয়েত্র ক্রেস্পির সুগন্ধিযুক্ত চিঠির মধ্যে, স্বামীর উত্তাল বিছানার মধ্যে বৃথাই অর্থ খুঁজে বেরাবার পর সে শান্তি খুঁজে পেয়েছিল এই বাড়িতে, যেখানে স্মৃতিগুলো বিমূর্ত হয়ে উঠত অপ্রসম্য শক্তির মধ্য দিয়ে, আর ফলে বাতিল করে দেয়া ঘরগুলোতে সে ঘুরে বেড়াতো মানুষের মত। বেতের দোলচেয়ারে হেলান দিয়ে সে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে দেখছিল, যেন সে অতীত থেকে উঠে আসা কোনো দৃশ্য। এমনকি আর্কাদিওর জোড় করে দখলকৃত জমিগুলো আসল মালিকের হাতে ফিরিয়ে দেবার সংবাদটাও তাকে কোনো রকম বিচলিত করে না। -“তুই যা বলবি তাই হবে আউরেলিয়ানো”- দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে- “সবসময় বিশ্বাস করে আসছি, আর আবার তার প্রমাণ পেলাম যে তুই হচ্ছিস এক অকৃতজ্ঞ”। সম্পত্তির স্বত্তাধিকার পরীক্ষার সময়েই কর্নেল হেরিনোল্দো মার্কেসের বিচারের সমাপ্তি ঘটে। বিদ্রোহীদের হাতে বন্দি হওয়া সকল অফিসারদের গুলি করে মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে। শেষ বিচারটা বসে জেনারেল হোসে রাকেল মংকাদার জন্য। উরসুলা হস্তক্ষেপ করে এর মধ্যে -“এ পর্যন্ত যতগুলি গভর্নর এসেছে সে হচ্ছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল।” কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে বলে সে- “অবশ্যই তার হৃদয়টা বিশাল আর সে কথা তোর চেয়ে ভাল কেউই জানে না”। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া উরসুলার দিকে ভৎর্সনার দৃষ্টি নিয়ে তাকায়: -“বন্দিদের বিচার করার ভার আমি নিজ হাতে নিতে পারব না”- উত্তর দেয়, “যদি আপনার কিছু বলবার থাকে তবে কোর্ট মার্শালদের বলতে পারেন।”

উরসুলা শুধু যে বলে তাইই নয়, মাকন্দোতে বাসরত সব বিদ্রোহীদের মা’দের জড়ো করে নিয়ে যায় কোর্ট মার্শালের বিচারকদের কাছে সাক্ষী দেবার জন্য। প্রাচীন মাকন্দো পত্তনকারী যাদের মধ্যে কেউ কেউ ভয়ংকর পাহাড় পাড়ি দিয়েছিল, তারা একের পর এক জেনারেল মংকাদার গুনগান গেয়ে যায়। সারির মধ্যে সবার শেষে ছিল উরসুলা। তার বিষন্ন আত্মমর্যাদাপূর্ণ আবির্ভাব, তার নামে গুরুত্ব, নিশ্চিত প্রত্যয় ও তীব্র আবেগপূর্ণ জবানবন্দি মুহূর্তের জন্য বিচারের ভারসাম্যকে টলিয়ে দেয়। “ তোমরা এই ভয়ংকর খেলাটাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছ আর খুবই ভাল করেছ কারণ তোমরা কর্তব্য পালন করেছ।” কোর্টের সদস্যদের লক্ষ্য করে বলে- “কিন্তু ভুলে যেও না, যতদিন ঈশ্বর আমাদের আয়ু দিয়েছেন আমরা তোমাদের মাঝে থাকব আর যত বিদ্রোহীই হও না কেন আমাদের অধিকার আছে তোমাদের প্যান্ট নামিয়ে কোমড় বন্ধনী দিয়ে দু’ঘা লাগিয়ে দেবার, যখন প্রথমবারের মত তোমরা আমাদের অশ্রদ্ধা করবে।” বিতর্কের জন্য জুড়িরা যখন স্থান ত্যাগ করে সেনাসদরে পরিবর্তীতে স্কুলের ব্যাপ্তিতে তখন পর্যন্ত তার কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। মধ্যরাতে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হোল জেনারেল হোসে রাকেল মংকাদা। উরসুলার মারমুখী ভৎর্সনা সত্ত্বেও কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া এই দন্ড সরাতে রাজি হয় না। ভোর হবার কিছু আগে বন্দীশালায় সাজাপ্রাপ্তর সঙ্গে দেখা করতে যায় সে।-“মনে রেখ কন্পাদ্রে” – বলে তাকে- “আমি তোকে গুলি করছি না, তোকে গুলি করছে বিপ্লব”।
জেনারেল ওকে ঢুকতে দেখার জন্য এমন কি মাথা তুলেও তাকায় না।

-“জাহান্নামে যা, কম্পাদ্রে”- উত্তর দেয়। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ফিরে আসার পর থেকে এই সময় পর্যন্ত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সুযোগ হয়নি জেনারেলকে অন্তর দিয়ে তাকানোর। এই সময়ের মধ্যে সে কতটুকু বুড়িয়ে গেছে, কিভাবে তার হাত কাঁপছে, কিভাবে বাধ্য হয়ে নিয়মমত মৃত্যূর জন্য অপেক্ষা করছে, এইসব দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় সে। তার নিজের উপরই করুণা জড়ানো বিরক্তির উদ্রেগ হয়।
-“তুই আমার চাইতে ভাল করেই জানিস” -বলে-“ সমস্ত কোর্ট মার্শালই হচ্ছে এক মিথ্যে প্রহসন আর তোকে মাশুল দিতে হচ্ছে অন্য লোকের অপরাধের কারণে, এইবারের যুদ্ধটা আমরা জিতব যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন। আমার জায়গায় যদি তুই হতি তাহলে কী করতি?”
জেনারেল মংকাদা কাছিমের খোল দিয়ে বানানো মোটা চশমাটা শার্টের কোনা দিয়ে মুছতে ব্যাস্ত হয়। “সম্ভবত তাই-ই” -বলে -“যা আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে তা আমার এই মৃত্যু নয়, কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের মত মানুষের জন্য এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক মৃত্যু”। চশমাটা বিছানার উপর রেখে চেনসহ পকেট ঘড়িটা খোলে। “যা আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে”- যোগ করে -“মিলিটারিদের প্রতি এ ঘৃণা, ওদের বিরুদ্ধে এত যুদ্ধ, আর ওদেরকে নিয়ে এত চিন্তা করে তুইও রূপান্তরিত হয়েছিস ওদেরই একজনে। আর জীবনে এমন কোনো আদর্শ নেই যার জন্য তোকে এত নীচে নামতে হবে” । সে বিয়ের আংটিটা ও পবিত্র কুমারীর মেড়ালটা খুলে চশমা আর ঘড়ির সঙ্গে রাখে। “এভাবে চলতে থাকলে”- সমাপ্তি টানে “ তুই শুধুমাত্র যে আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য রক্তক্ষয়ী স্বৈরাচারী শাসক হবি তাই নয়, আমার কম্মাদ্রে উরসুলাকে গুলি করে মারবি, তোর বিবেককে শান্ত করার চেষ্টায়”।

কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চল হয়ে, আর জেনারেল মংকাদা চশমা, মেডেল, ঘড়ি ও আংটিটা ওর হাতে দিয়ে গলার স্বর বদলায় । -“কিন্তু তোকে তিরস্কারের জন্য এখানে ডেকে পাঠাইনি”- বলে- “এই জিনিসগুলো আমার বউকে পাঠিয়ে দেবার অনুরোধ করতে তোকে ডেকেছি”। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ওগুলো পকেটে ঢোকায় ।
-সে কি এখনও মানাউরে আছে ?
-“হ্যাঁ, এখনও মানাউরেই আছে” নিশ্চিত করে জেনারেল মংকাদা –“গীর্জার পিছনের সেই একই বাড়িতে যেখানে পাঠিয়েছিলি সেই চিঠিটা” ।
“অনেক আনন্দের সাথেই কাজটা করব আমি, হোসে রাকেল”-বলে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ।

যখন কুয়াশা থেকে বেরিয়ে সুনীল হাওয়ার পরশ পায়, যখন তার মুখ আর্দ্র হয় অতীতের এক ভোরের ছোঁয়ায় শুধুমাত্র তখনই সে বুঝতে পারে কেন সে মৃত্যুদণ্ডটা গোরস্থানের দেয়ালের বদলে উঠানে কার্যকর করতে আদেশ দিয়েছে, দরজার সামনে গাড়ী নিয়ে দাঁড়ানো প্লাটুন তাকে রাজ্যপ্রধানের সম্মান জানায়।
-“ওকে নিয়ে আসতে পার”- আদেশ দেয় ।
cien-anos-de-soledad.jpg

কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেসই প্রথম বুঝতে পারে এই যুদ্ধের অসারতা। মাকন্দোর সামরিক এবং বেসামরিক প্রধান হিসেবে সপ্তাহে দুবার তাকে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সঙ্গে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হত। প্রথমদিকের সাক্ষাতগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করত এক জলজ্যান্ত যুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের গতি প্রকৃতি আর তার ভবিষ্যৎ। যদিও কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া তার অতি ঘনিষ্টজনকেও বিশ্বাস করেনি তবুও তার গলার অন্তরঙ্গ ভাবটা অপর পাশের লোকটাকে বলে দিত তার পরিচয়। অনেকবারই এইসব আলোচনা পূর্বনির্ধারিত বিষয়বস্তুর সীমা পেরিয়ে দীর্ঘায়িত হত ঘরোয়া আলাপচারিতায়। কিন্তু আস্তে আস্তে যুদ্ধটা যখন তীব্র হতে থাকে আর ব্যপ্তি ছড়িয়ে পরতে থাকে, তখন তার প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে যেতে থাকে এক বিশাল অবাস্তবতায়। তার সুরের দাড়ি কমাগুলো ক্রমশই চলে যেতে থাকে দূর থেকে দূরত্বে, আর অসাড় থেকে অসাড়তায়, আর তারা যেন একত্রিত হত শুধুমাত্র কথার বুনুনীর জন্য, যেগুলো হারিয়ে ফেলেছে ধীরে ধীরে তাদের অর্থবহতা। সেই সময়গুলোতে কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস যেন টেলিগ্রাফিক যোগাযোগে অপর পাশে কোনো এক ভিন্ন গ্রহের অচেনা কারও সঙ্গে আলাপ করছে–এই ভাবনায় প্লাবিত হয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখত একজন শ্রোতা হিসেবে ।
“বুঝেছি আউরেলিয়ানো” শেষ করত যন্ত্রের মাধ্যমে “উদারপন্থী দল দীর্ঘজীবী হোক ।”

শেষমেষ সে হারিয়ে ফেলে যুদ্ধের সঙ্গে সকল যোগাযোগ। অন্য সময়ে যা ছিল এক বাস্তব কর্মকাণ্ড, যৌবনের অপ্রতিরোধ্য উদ্দীপনা, তাইই এখন হয়ে দাড়িয়েছে দূরের কোনো প্রাসঙ্গিক ব্যাপারে, এক অসারতায়। তার একমাত্র আশ্রম ছিল আমারান্তার সেলাইঘর। প্রতি বিকেলেই ঢুঁ মারত সে ওখানে। রেমেদিওস লা বেইয়্যার (সুন্দরী রেমেদিওস) সাহায্যে সেলাইকল ঘুরিয়ে আমারান্তার হাতগুলো যখন কাপড়ে কুঁচি দিত, সে তা দেখতে পছন্দ করত। ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিত কথাবার্তা না বলে, একে অপরের সাহচর্যে তৃপ্ত হয়ে। কিন্তু যখন আমারান্তা আনন্দিত হত কর্নেল হেরিনাল্দোর অনুরাগের আগুনকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরে, হেরিনাল্দো তখন পর্যন্ত আমারান্তার রহস্যাবৃত হৃদয়ের গোপন পরিকল্পনা সম্বন্ধে সম্পূর্ন অজ্ঞ। সে যখন ফিরে আসে আমারান্তা তখন ডুবে যায় উৎকন্ঠায়। কিন্তু তার মোহভঙ্গ হয়ে মূর্ছা যাবার উপক্রম হয়, যখন তাকে আউরেলিয়ানোর হট্টোগোল তোলা সরব দলের সাথে, নির্বাসনের হাতে বিধ্বস্ত বয়স আর বিস্মৃতির হাতে বুড়িয়ে গিয়ে ঘাম ধূলো মাখা শরীরে পশুর মত দূর্গন্ধ নিয়ে কুৎসিত অবস্থায়, বাম হাতটাকে স্লিং-এর সাথে ঝুলিয়ে আসতে দেখে । “হায় ঈশ্বর” –ভাবে এতো সে নয়, যার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম । অবশ্য পরেরদিন দাড়ি কামিয়ে, পরিচ্ছন্ন হয়ে, রক্তবিহীন স্লিং নিয়ে, গোফে ল্যাভেন্ডারের সুগন্ধী নিয়ে আবার বাড়িতে আসে। আমারান্তাকে উপহার দেয় কৃত্রিম মুক্তো বাঁধানো প্রার্থনা পুস্তক । “পুরুষগুলো কি অদ্ভুত” ভেবে, অন্যকিছু না পেয়ে বলে- “পাদ্রীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে জীবন দিয়ে দেয়, আর বই উপহার দেয় প্রার্থনা করার জন্য”!

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
সেইদিন থেকে এমনকি যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতেও রোজ বিকেলে সে দেখা করত আমারান্তার সাথে। অনেকবারই রেমেদিওস লা বেইয়্যা উপস্থিত না থাকায় সে নিজে সেলাইকলের হাতল ঘোরাতো। বৈঠকখানার বাইরে অস্ত্র রেখে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় সেলাইঘরে চলে আসা প্রবল ক্ষমতাশীল এই ব্যাক্তিটির লেগে থাকা, বিশ্বস্ততা, ও আনুগত্য আমারান্তাকে বিচলিত করে তোলে। কিন্তু চার বছর যাবত যখনই হেরিনাল্দো তার ভালবাসার কথা আবারও জানায়, আমারান্তা তার মনে আঘাত না দিয়ে ফিরিয়ে দেবার একটা উপায় কোন না কোনভাবে বের করে ফেলে, কারন যদিও সে তাকে ভালবাসতে পারেনি তবুও তাকে ছাড়া আমারান্তার বেঁচে থাকা অসম্ভব ছিল। রেমেদিওস লা বেইয়্যা, যে নাকি সব কিছু সম্বন্ধে ছিল নিস্পৃহ, যাকে মনে হত মানসিকভাবে অপরিণত, এমনকি সে পর্যন্ত এই গভীর ভালবাসায় সাড়া না দেয়ায় কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেসের পক্ষ নেয়। আমারান্তা হঠাৎ লক্ষ করে যে মেয়েটিকে সে লালন করে বড় করেছে, যে কেবলমাত্র বয়োসন্ধির দিকে পা বাড়াচ্ছে, সে ইতিমধ্যেই মাকন্দোর সবচেয়ে সুন্দরী। সাথে সাথে তার হৃদয়ে পুনর্জন্ম নেয় সেই একই হিংসা যা অন্য সময়ে অনুভব করত রেবেকার বিরুদ্ধে আর ঈশ্বরের কাছে সে প্রার্থনা করে যাতে মেয়েটার মৃত্যু কখনোই তাকে কামনা করতে না হয়, আর সেলাইঘর থেকে বের করে দেয় তাকে। এগুলো ঘটেছিল সেই সময়ে যখন কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস যুদ্ধের প্রতি অবসাদ বোধ করে। যে যশের জন্য সে জীবনের মহার্ঘ সময়টা উৎসর্গ করেছে, সেই যশ পর্যন্ত বিসর্জন দেবার জন্য প্রস্তত হয়ে, ওকে বিশ্বাস করানোর প্রত্যয় নিয়ে, তার বিশাল চেপে থাকা সমস্ত কোমলতা দিয়ে, আবেদন করে হেরিনাল্দো, কিন্তু রাজী করাতে পারে না আমারান্তাকে। তার নাছোড়বান্দা প্রেমিককে শেষ জবাব দেবার পর, আগস্টের এক বিকেলে নিজের একগুয়েমিপনার ভারে অতিষ্ঠ আমারান্তা তার একাকীত্বের লক্ষে আমৃত্যু কান্নার জন্য শোবার ঘরে দরজা বন্ধ করে । -“চিরদিনের জন্য ভুলে যাব আমরা”- ওকে বলে- “এগুলো করার বয়স আমাদের পার হয়ে গেছে” ।

সেই বিকেলে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার ডাক আসে কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেসের কাছে। সেটা ছিল এক রুটিনমাফিক আলাপ যেটাতে নিশ্চল যুদ্ধটার নতুন কোনো দরজা খোলার মত কিছু ছিল না। আলাপটা শেষ হবার পর জনহীন রাস্তার দিকে দৃষ্টি ফেলে আলমন্ডের জমে থাকা স্ফটিক জলের দিকে তাকিয়ে নিজেকে আবিস্কার করে নিঃসঙ্গতার মধ্যে।
-“আউরেলিয়ানো”- বিষণ্ণতার সাথে যন্ত্রটার মধ্য দিয়ে জানায় “মাকন্দোতে বৃষ্টি হচ্ছে”

টেলিগ্রাফের লাইনে এক দীর্ঘ নৈঃশব্দ বিরাজ করে । হঠাৎ করেই কর্নেল আউরেলিয়ানো মার্কেসের কিছু নির্দয় সংকেত নিয়ে লাফিয়ে ওঠে যন্ত্রটা ।
-“গাধা নাকি তুই, হেরিনাল্দো”- সংকেতগুলো বলে “ আগস্টে যে বৃষ্টি হচ্ছে এটাইতো স্বাভাবিক” ।

দীর্ঘদিন সাক্ষাৎ না হবার কারনে এই আক্রমণাত্মক প্রক্রিয়ায় আহত বোধ করে কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস। দুমাস পর যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ফিরে আসে মাকন্দোতে তখন তার অবস্থা দেখে এই আহতবোধ পরিণত হয় হতবুদ্ধিকর বিস্ময়ে। এমনকি উরসুলা পর্যন্ত বিস্ময়াহত হয় তার এই প্রবল পরিবর্তনে। নিঃশব্দে দেহরক্ষীহীন প্রচন্ড গরম সত্ত্বেও নিজেকে কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে তিন প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসে সে, আর তিন প্রেমিকা একই বাড়িতে তার সঙ্গে আস্তানা গাড়ে যাদের সঙ্গে সে অধিকাংশ সময়ই কাটিয়ে দেয় হ্যামকের মধ্যে। রুটিনমাফিক টেলিগ্রাফের মাধ্যমে আসা যুদ্ধের খবরগুলো সে পড়তই না বললে চলে । একবার কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেস সীমান্তের এক জায়গায় যুদ্ধ বেঁধে গেলে ব্যাপারটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে যাবার আশংকায় সৈন্য সরিয়ে নেবার নির্দেশ নিতে যায় ।
-“ছোটখাট ব্যাপারে আমাকে বিরক্ত করিসনে”-ওকে আদেশ দেয়- “স্বর্গীয় বাক্যাবলী খুলে দেখ, তাতে কি লিখা আছে।”

খুব সম্ভবত ওটাই ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ সময়। উদারপন্থী ভূস্বামীরা যারা প্রথমদিকে বিদ্রোহে সমর্থন যুগিয়েছিল তারা সম্পত্তির মালিকানার যাচাই এড়াতে গোপনে রক্ষনশীল ভূস্বামীদের সঙ্গে আঁতাত করে। নির্বাসন থেকে যে সকল রাজনীতিবিদ এই যুদ্ধে মদদ যোগাত তারা জনসম্মুখে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার চরম সিদ্ধান্তগুলি বাতিল করে; কিন্তু তাদের এই অননুমোদনেও সে সতর্ক হয় না। তার পাঁচ খন্ডে বিভক্ত কবিতা সংকলন বিস্মৃত অবস্থায় পরে থাকে, সে ওগুলো আর খুলেও দেখে না। রাতে বা দুপুরে ঘুমের সময় তার প্রেমিকদের হ্যামকে ডেকে নিত আর তা থেকে পেত এক আদিম পরিতৃপ্তি, আর পরে ঘুমাত পাথরের মত; সামান্যতম দূর্ভাবনায় সে প্রশান্তি ভঙ্গ করত না। শুধুমাত্র সেই জানত তার বিধ্বস্ত মনটা চিরদিনের মত বিতাড়িত হয়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। প্রথম দিকে অবিশ্বাস্য বিজয় নিয়ে প্রত্যাবর্তনে মাতাল হয়ে, সে উঁকি দিয়েছিল মহত্বের অতল গভীরে। যুদ্ধশিল্পের মহান শিক্ষক ডিউক অফ মার্লবোগ; যার চামড়ার পোশাক ও বাঘের নখ বড়দের কাছ থেকে সম্ভ্রম আর শিশুদের মাঝে সৃষ্টি করে বিস্ময়, তাকে নিজের ডান পাশে রাখতে পেরে পরিতৃপ্তি পেত সে। তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয় নিজের তিন মিটারের মধ্যে কোন মানবকুল এমনকি উরসুলাও আসতে পারবে না । যেখানেই পা ফেলত সেখানেই তার মজরঞ্জনকারী সহকারীরা চক দিয়ে যে বৃত্ত একে দিত, সেখানে সেই শুধু ঢুকতে পারত । সেই বৃত্তের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে সে সংক্ষিপ্ত আর তর্কাতীত, পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারক আদেশ দিত । জেনারেল মনকান্দার মৃত্যু দন্ডের পর প্রথমবার যখন মানউরে পৌছায় তখন সে বলির পাঁঠার শেষ ইচ্ছা পূরনে তৎপর হয়, আর বিধবা চশমা, মেডাল,ঘড়ি ও আংটি গ্রহন করলেও তাকে দরজা পার হতে দেয় না ।

-“কর্নেল ঢুকবে না”- ওকে বলে “তোমার আদেশে যুদ্ধ চললেও আমার বাড়ি চলে আমার আদেশে”।
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


1 Response

  1. mostafa tofayel says:

    The Bangla translation , I feel, is as living and vibrant as my own breathing. With the English one by Rabassa, and the Bangla one by Anis, read parallely, I enjoy the current world’s best novel,One Hundred Years of Solitude.I observe, critically, of course that Pablo Neruda in poetry and Gabriel in fiction do not like surrealism. Is the practice of surrealism against their temperament or do the occidentals only make it pastime of their own playing with surrealism and the Indians do blindly follow them?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.