অনুবাদ, উপন্যাস, কথাসাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 16 Jul , 2015  

garcia_marquez.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২৫

“দুশ্চিন্তা করো না কমমাদ্রে (ব্যাপটাইজের সময় ধর্মপিতা এক ধর্মমাতা পরস্পরকে কমপাদ্রে বা কমমাদ্রে বলে থাকে। অর্থঃ সহপিতা বা সহমাতা:)-“ হেঁয়ালিভরে ওকে কর্নেল মংকাদা বলে –“তোমার আন্দাজ করা সময়ের আগেই এসে পরবে সে”।
যা জেনারেল জানত আর দুপুরের খাবার সময় সেটা উদঘাটিত করতে চায়নি তা হচ্ছে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া এ পর্যন্ত যতগুলো বিদ্রোহ ঘটাবার চেষ্টা চালিয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভিত নড়ানো ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটাতে নেতৃত্ব দেবার জন্য পথে আছে।

পরিস্থিতি আবার প্রথম যুদ্ধের মাসগুলোর মত উদ্বেগপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বয়ং মেয়র প্রবর্তিত মোরগ-লড়াই স্থগিত করা হয়। নগররক্ষীদের কমান্ডার আকিলেস রিকার্দ পৌরক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেয়। উদারপন্থি তাকে উস্কানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করে।

“ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে”- আউরেলিয়ানো হোসেকে বললো উরসুলা –“বিকেল ছটার পর রাস্তায় বের হবি না”। সেগুলো ছিল নিছক নিষ্ফল আকুতি। অন্য সময়ের আর্কাদিওর মতই আউরেলিয়ানো হোসে আর তার এক্তিয়ারে ছিল না। যেন দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তায় নিজেকে বিরক্ত না করে তার চাচা হোসে আর্কাদিওর মতই যৌনকামনা আর অলসতা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যই তার ফিরে আসা। কোনো দাগ না রেখেই আমারান্তার প্রতি তার কামনা নিভে যায়। বিলিয়ার্ড খেলায় নিজের নিঃসঙ্গতাকে ক্ষণিকের মেয়ে মানুষদের দিয়ে স্বান্তনা জুগিয়ে, উরসুলা টাকা রেখে ভুলে যাওয়া জায়গাগুলো হাতরিয়ে উচ্ছন্নে যাওয়া দিন কাটাতে থাকে সে। শেষমেষ বাড়ি ফিরে আসত শুধুই কাপড় বদলাবার প্রয়োজনে। “সবগুলোই এক রকমের” অনুশোচনা করত উরসুলা-“ প্রথমদিকে সবাই ভালমানুষ, সবাই অনুগত, নিয়মনিষ্ঠ, যেন একটা মাছি মারতেও মনে কষ্ট পায়, আর যেই দাড়ি ওঠা শুরু করে এমনি সব নষ্ট হয়ে যায়”। আর্কাদিওর উল্টো, আউরেলিয়ানো জেনে ফেলে যে পিলার তেরনেরা হচ্ছে তার মা আর দুপুরের ঘুমটা তার বাড়িতেই সারার জন্য এক হামক টাঙ্গিয়ে দেয় পিলার। ওদের সম্পর্ক ছিল মা ছেলের সম্পর্কের চেয়েও গভীর, একে অপরের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী। পিলার তেরনেরা ততদিনে তার আশা প্রত্যাশার শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।

তার হাসি তখন অরগানের মতো বাজে, তার বুক নতি স্বীকার করেছে মাঝেমধ্যে বিতৃষ্ণাকর আদরের কাছে, তার পেট আর উরু শিকার হয়েছে বহুজনে ভোগ করা নরীদের অপরিবর্তনীয় ভাগ্যলিপির কাছে, কিন্তু তার মনের বয়স বাড়ছে কোনো রকমের তিক্ততা ছাড়াই। মোটা, বাচাল, অসুখী ভদ্রবাড়ির মেয়েদের ভাগ্য গননার জন্য তার দেখা ছেড়ে দিয়ে সে সান্তনা খুঁজে পায় অচেনা লোকদেরকে সুখ দিয়ে। যে বাড়ীতে আউরেলিয়ানো হোসে দুপুরে ঘুমুতো সেখানেই প্রতিবেশী মেয়েরা আপ্যায়ন করত তাদের সাময়িক প্রেমিকদেরকে। “তোমার ঘড়টা আমাকে ধার দেবে, পিলার?”, শুধ মাত্র এটুকুই বলত তারা আর ভিতরে ঢোকার পর “অবশ্যই” বলত পিলার, আর অন্য কেউ যদি সেখানে উপস্থিত থাকত সে ব্যাখা দেবার সুরে বলত “মানে, লোকজন তাদের বিছানায় সুখী হলেই আমিও সুখী”।
কখনই এ জন্যে টাকা নিত না সে। কখনই কাউকে ফিরিয়ে দিত না যেমনটি ফিরিয়ে দেয়নি অগুনতি লোকদের যারা খুঁজে বেরিয়েছে ওকে তার পরিণত বয়সের প্রারম্ভ পর্যন্ত, যাদের কাছ থেকে সে কখনও টাকা পয়সা বা ভালবাসা পায়নি, মাঝে মাঝে পেয়েছে একটুকু সুখ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গরম রক্তের অধিকারী তার পাঁচ মেয়ে বয়সন্ধিকালেই জীবনের বন্ধুর পথে হারিয়ে গেছে। যে দুই ছেলেকে বড় করতে পেরেছে তাদের একজন মারা গেছে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বাহিনীতে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর অপরজন জলাভূমির এক গ্রামে চৌদ্দ বছর বয়সে মুরগি চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে আহত হয়ে। একদিক থেকে দেখতে গেলে অর্ধ শতাব্দী জুড়ে তাসের রাজা তাকে যে দীর্ঘদেহী গাঢ় বর্ণের ব্যক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে আউরেলিয়ানো হোসে ছিল সেই ব্যক্তি। আর যেমনি তাসগুলো সব খবর তাকে পাঠাতো সেই একইভাবে তার হৃদয়ে এসে পৌঁছায় যে আউরোলিয়ানো এরই মধ্যে মৃত্যুছাপ দিয়ে চিহ্নিত। সে তাসগুলোতে স্পষ্টভাবে দেখতে পায় সেটা।
“আজ রাতে বাইরে যাস নে” ওকে বলে পিলার “এখানেই ঘুমো, তোর বিছানায় তাকে ঢুকিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পরেছে কার্মোলিতা মান্তিয়েল”।

ঐ নৈবদ্য ও আকুতির পিছনে যে গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে আউরোলিয়ানো হোসে তা ধরতে পারে না। “ওকে বলো মধ্যরাতে আমার জন্য অপেক্ষ করতে” উত্তর দেয় আউরোলিয়ানো। সে যায় স্প্যানিস কোম্পানী ঘোষিত “শেয়ালের ছোড়া” নাটকটা দেখার জন্য, সত্যিকারে অর্থে যেটা ছিল সোরিইয়ার (হোসে সোরিইয়া স্পানিশ নাট্যকার এবং কবি) লিখিত। আর সেটার নাম বদলে দেয়া হয়েছে ক্যাপ্টেন আকিলেস রিকার্দর আদেশে। কারন উদাপন্থিরা রক্ষণশীলদের গথ (বর্বর) নামরকন করেছিল। প্রবেশপথে টিকিট দেখানোর সময় হোসে আউরেলিয়ানো টের পায় যে ক্যাপ্টেন আকিলেস রিকার্দ তার দুই অস্ত্রধারী সৈন্যদের দিয়ে দেহ তল্লাসী করছে। “ সাবধান ক্যাপ্টেন” সর্তক করে আউরেলিয়ানো হোসে, “আমার পায়ে হাত তোলে এমন মরদ জন্ম নেয়নি এখনও”। জোড় করে তল্লাশী চালাতে চেষ্টা করে ক্যাপ্টেন আর নিরস্ত্র আউরেলিয়ানো হোসে দৌড় দেয়। সৈন্যরা খুনের আদেশ অমান্য করে “ও একজন বুয়েন্দিয়া” ব্যাখ্যা দেয় এক সৈন্য। রাগে অন্ধ ক্যাপ্টেন রাইফেল কেড়ে নিয়ে রাস্তার মাঝখানে চলে আসে আর তাক করে। “হারামজাদারা” চিৎকার করার সময়টুকু পায় “ভাল হত এটা যদি কর্নেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়া হতো”।

বিশ বছরের কুমারী কার্মেলিতা মন্তিয়েল কমলার সুগন্ধিযুক্ত পানিতে গোসল সেরে পিলার তেরনেরার বিছানায় যখন রোজমেরির পাতা ছড়াচ্ছে তথনই ভেসে এল গুলির শব্দটা। আউরেলিয়ানো হোসের কপালে লিখা ছিল যে সুখ, তাকে যে সুখ থেকে আমারান্তা বঞ্চিত করেছে সেই সুখ কার্মেলিতার কাছ থেকে পাওয়ার আর সাত সন্তানের পিতা হয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় তার হাতে মাথা রেখে মরার, কিন্তু যে বুলেটটা তার পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক ঝাঁজরা করে দেয় সেটা চলছিল তাসের এক ভূল ব্যাখ্যার আদেশে। যখন গুলির শব্দ হলো, একই সাথে অন্য দুটো গুলি এসে শুইয়ে দিল ক্যাপ্টেনকে, যে গুলির উৎস কখনই জানা যায়নি। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসে অনেক গুলির সম্মিলিত রাত কাপানো চিৎকার।
“উদারপন্থিদের জয় হোক! জয় হোক কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার।”

বারোটার সময় যখন কার্মেলিতা মন্তিয়েল দেখতে পায় তার ভবিষ্যৎ নির্দেশক তাসে কিছুই লিখা নেই, যখন আউরেলিয়ানো হোসের রক্তক্ষরন শেষ হয়েছে, তখন থিয়েটারের সামনে চার শ’রও বেশী লোক জমায়েত হয় তাদের রিভলবার খালি করে ক্যাপ্টেন আকিলেস রিকার্দর পরিত্যাক্ত শরীরের উপর। সীসায় সীসায় ভারি হয়ে যাওয়া ফুলে ওঠা রুটির মত শরীরটাকে ঠেলাগাড়িতে তুলতে একদল লোকের প্রয়োজন হয়।

নিয়মিত সৈন্য বাহিনীর দৌরাত্মে উত্যক্ত জেনারেল হোসে রাকেল মংকাদা নিজের রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আবার গায়ে ইউনিফর্ম চড়ায় আর আবার মাকন্দোর সামরিক এবং বেসামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করে। সে আশা করেনি যে তার আপোষমূলক নীতিমালা অবশ্যম্ভাবীকে ঠেকিয়ে দিতে পারবে। সেপ্টেম্বরের সব খবরই ছিল পরস্পরবিরোধী। যখন সরকার ঘোষনা করছিল যে সাড়া দেশে নিয়ন্ত্রন বজায় রাখছে তখন বিদ্রোহীরা খরব পেত দেশের অভ্যন্তর থেকে অস্ত্র হাতে তুলে নেবার গোপন সংবাদ। সরকার কোনো ঘোষনা না পাওয়ার ফলে যুদ্ধাবস্থাকে স্বীকার করে না আর তার অনুপস্থিতিতেই কোর্ট মার্শালে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মৃত্যুদন্ড ধার্য করা হয়। আদেশ দেয়া হয়, যে দল প্রথমে তাকে বন্দী করতে পারবে তারাই যেন তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। “তার মানে সে ফিরে এসেছে” – জেনারেল মংকাদার সামনে আনন্দিত উরসুলা বলে, কিন্তু জেনারেলের কাছে উত্তরটা অজানা ছিল।
——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
আসলে একমাসেরও বেশী সময় ধরে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দেশে অবস্থান করছে। পরস্পরবিরোধী গুজবের তাড়ায় আর একই সময়ে দুরবর্তী দুই স্থানে তার অবস্থানের কথা শুনে যতদিন পর্যন্ত না সরকারীভাবে তার দ্বারা উপকুলের দুটো রাজ্য দখলের ঘোষনা না আসে ততদিন পর্যন্ত খোদ জেনারেল মংকাদা বিশ্বাস করে না তার ফিরে আসার কথা।

“অভিনন্দন, কমমাদ্রে”- টেলিগামটা দেখিয়ে উরসুলাকে বলে সে- “ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এখানে পাবেন ওকে ।” সেই প্রথম বারের মত উদ্বিগ্ন হয় উরসুলা, ”আর আপনি কি করবেন কমপাদ্রে?” প্রশ্ন করে সে -“ও যা করত তাই করব, কমমাদ্রে” – উত্তর দেয় –“আমার কর্তব্য পালন করব।”
অক্টোবরের প্রথম দিকে ভোরে সুসজ্জিত হাজার সৈন্য নিয়ে মাকন্দো আক্রমন করে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া আর নগররক্ষীরা আদেশ পায় শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবার।
দুপুরবেলা যখন জেনারেল মংকাদা উরসুলার সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন সারছিল, এক বিদ্রোহী কামানের গোলা সাড়া গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিউনিসিপাল কোষাগারের সামনেটা ধুলো করে দেয়। “ওরাও আমাদের মতই অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত” -দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেনারেল মংকাদা- “ আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে যুদ্ধ করে সমস্ত অন্তর দিয়ে”। বেলা দুটোর সময় যখন দুপক্ষের কামানের গোলার প্রকটে পৃথিবী কাঁপছে সে উরসুলার কাছ থেকে বিদায় নেয় এক নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে যে হেরে যাওয়া এক যুদ্ধ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে সে।

-ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন আপনি এই রাতে আউরেলিয়ানোকে বাড়িতে না পান”- বলে – “আর যদি পেয়েই যান, তাহলে আমার পক্ষ থেকে ওকে একবার জড়িয়ে ধরবেন, কারণ কখনই ওকে দেখার আশা আর রাখি না। “

মাকন্দো থেকে পালিয়ে যাবার সময় ধরা পরে যায় জেনেরাল। সেই রাতে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে যুদ্ধটাকে মানবিক করে তোলার অভিন্ন লক্ষ্য আর সামরিক নেতা ও দুই পক্ষেরই উচ্চাভিলাসী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে সুনিশ্চিত বিজয কামনা করে এক সুদীর্ঘ পত্র লিখে পালাবার সময় ধরা পরে যায় সে। পরের দিন উরসুলার বাড়িতে তার সঙ্গে দুপুরের খাবার খায় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া আর সেখানেই বন্দি হয়ে থাকে যতদিন না বিপ্লবী যুদ্ধাপোদেষ্টারা তার ভাগ্য নির্ধারন করে। সেটা ছিল এক পারিবারিক মিলন। কিন্তু যখন দুই প্রতিদ্বন্দী স্মৃতি রোমন্থনের জন্য যুদ্ধের কথা ভুলে যায় তখন উরসুলার এক বিষাদপূর্ণ অনুভূতি হয় যে তার ছেলে হচ্ছে এক অনুপ্রবেশকারী। যে দিন উরসুলা দেখে কোলাহলমুখর একদল মিলিটারি আউরেলিয়ানোকে পাহারা দিয়ে বাড়িতে এনে শোবার ঘড়গুলোকে খুব ভালভাবে পরীক্ষা করে কোনো রকম বিপদ অপেক্ষা করছে না ভেবে নিশ্চিন্ত হয়ে রেখে যায়, সেদিন থেকেই তার এরকমটি মনে হচ্ছিল। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া সেদিন মিলিটারিদের কার্যকলাপ শুধু মেনে নিয়েছিল তাই-ই নয়, সে কড়া আদেশ জারি করে যেন কেউই তার তিন মিটারের কাছে ভিড়তে না পারে, এমনকি উরসুলাও নয়, যতদিন পর্যন্ত না তার দেহরক্ষীরা বাড়ির চারপাশে এক ভাল রক্ষাব্যূহ তৈরী করতে পারে। সে সাধারণ সৈনিকদের ইউনিফর্ম পরত যেটাতে কোন পদভেদ বোঝা যেত না আর পায়ে ছিল সীল লাগানো কাদা আর শুকনো রক্ত মাখা উঁচু বুট। কোমড় বন্ধনীতে সবসময় ঝুলত মুখখোলা পিস্তলের খাপ আর যে হাতটা পিস্তলের বাটে রাখত তাতে থাকত তার চোখের দৃষ্টির মতই এক সার্বক্ষণিক সতর্কতা। কপালে গভীর টাকের আভাসসহ তার মাথাটাকে মনে হচ্ছিল অল্প আঁচে ওটাকে চুল্লিতে ঢোকানো হয়েছিল। ক্যারিবিয়ান লবণের বদৌলতে মুখমন্ডলে চিড় ধরায় সেটা এনে দিয়েছিল এক ধাতব কাঠিন্য। আসন্ন বার্ধক্যকে ঠেকিয়ে রাখা প্রাণশক্তি যেন তার আন্ত্রিক শীতলতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। চলে যাওয়ার সময়ের চেয়ে সে ছিল আরও লম্বা, আরও পান্ডুর ও কৃশকায়, আর স্মৃতিকাতরতা প্রতিরোধের প্রথম চিহ্নগুলো ফুটে উঠেছে ওর ভিতরে।

“ঈশ্বর”- ভয় পেয়ে উরসুলা বলে “এখন মনে হচ্ছে ও সব পারে।” সে আসলেই সব পারত। আমারান্তার জন্য যে আজটেক শালটা নিয়ে আসে, মধ্যাহ্নের খাবার সময়ে যে স্মৃতি রোমন্থন করে, মজাদার ছোটগল্পগুলো যে শুনায়, সেগুলো ছিল অন্যসময়ের রসবোধের অবশিষ্টাংশ। এক গনকবরে মৃতদেহগুলো গোর দেয়ার আদেশ দিয়ে কর্নেল রোকে কার্নিসেরোকে নিযুক্ত করে সামরিক বিচার দ্রুত শেষ করতে, আর নিজে হাতে নেয় রক্ষনশীল দলের মৌলবাদী আইনগুলো আমূল সংস্কার সাধনের ক্লান্তিকর কাজ, যাতে করে রক্ষনশীল দলের পুনরাগমন হলেই পরবর্তীকালে আইনগুলো সংস্কার করা তাদের পক্ষে সহজ না হয়। “দলের রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে আমাদের” বলত তার উপদেষ্টাদেরকে, “যখন ওরা চোখ খুলে বাস্তবতাকে দেখতে পাবে ততক্ষণে আমাদের সব কাজ শেষ হয়ে গেছে।” ঐ সময়ই সে জমির বৈধ স্বত্ত্বতা পরীক্ষা করে আর আবিস্কার করে তার ভাই হোসে আর্কাদিওর জবরদস্তি করে দখল করা জমিগুলো। কলমের এক খোঁচায় খারিজ করে দেয় সব রেজিস্ট্রি। শুধুমাত্র সৌজন্য দেখাতে এক ঘন্টার জন্য নিজের কাজ মুলতবী করে রেবেকাকে দেখতে যায় তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে।
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


1 Response

  1. Mostafa Tofayel says:

    এক গনকবরে মৃতদেহগুলো গোর দেয়ার আদেশ দিয়ে ………I have enjoyed the faithfulness of the Bangla torjama done by Mr Anisuzzaman.Only one word_ I would prefer the word Kabor in place of Gor.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.