সাক্ষাৎকার

দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রাজু আলাউদ্দিন | 10 Jul , 2015  

dsc01051.JPGদিলীপ কুমার বসুর জন্ম বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জে। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে দেশত্যাগ করে দিল্লির স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ওঠেন তিনি।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক দিলীপ কুমার বসু একাধারে কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং অভিনেতা। ষাটের দশকের শেষার্ধে কলকাতায় কবি অমিতাভ গুপ্তের নেতৃত্বে ‘উত্তরাধুনিকতা’ নামে যে সাহিত্যআন্দোলন গড়ে ওঠে, তিনি তার শরীক ছিলেন। বাংলা এবং ইংরেজি– উভয় ভাষায়ই লেখালেখি করছেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ: ভালোবাসার কবিতা ( ১৯৭৮), কঙ্কনমালা(১৯৯১), দার্জিলিং( ১৯৭৯), নাট্যকাল(১৯৯৪), ভাঙা ছন্দ পঙক্তি পদ(২০০৯), কথানদীর বাঁকে বাঁকে(২০১০), দিলীপ কুমার বসুর নির্বাচিত এবং প্রসঙ্গত (২০০৫),The home and the world— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, (সম্পাদনা: দিলীপ বসু ও দেবযানী সেনগুপ্ত ২০১১), সত্তর দশকের বারটি নাটক (যৌথভাবে রচিত, ১৯৯৪), যাওন-আসন (২০১৩) ইত্যাদি।
গত দুই এপ্রিল দিল্লিস্থ তার বাসভবনে কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে তার একটি দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। ভিডিওতে ধারণকৃত সেই দীর্ঘ আলাপচারিতার অনুলিখন করেছেন তরুণ লেখক অলাত এহসান। লেখক কর্তৃক পরিমার্জিত অনুলিখনের চূড়ান্ত রূপটি এখানে ভিডিওসহ উপস্থাপন করা হলো। বি. স.


রাজু আলাউদ্দিন : আপনি নাটক লিখেছেন, নাটকে অভিনয় করেছেন, তারপর উপন্যাস লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন। এছাড়া আপনি কবিতাও লিখছেন। শিল্পের নানান মাধ্যমে কাজ করেছেন এবং কাজ করে যাচ্ছেন এখনো। সেটা দুই ভাষাতেই–বাংলা এবং ইংরেজি। এই সব মাধ্যমে কাজ করার পরও আপনি শেষ পর্যন্ত নিজেকে কী ভাবেন? প্রশ্নটা এই জন্য করলাম যে, অনেক সময় একজন লেখক গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ লেখার পরও যখন উনি কবিতা লেখেন নিজেকে কবি বলেই দাবি করতে বেশি পছন্দ করেন। এ রকম কোনো পক্ষপাত কি আপনার আছে?
দিলীপ কুমার বসু : একচ্যুয়ালি সব যা লিখেছি অখাদ্য লিখেছি। কবিতা আর নাটক আমি বেশি লিখি। এই দু’টো লিখতেই ভালবাসি। প্রবন্ধ দায়ে পড়ে লিখতে হয়। উপন্যাস ৫২টা শুরু করে ১টাই শেষ করেছি। অতএব উপন্যাসের কথাটা না বলাই ভাল। নাটকে আমার বেশির ভাগ কাজটা হচ্ছে আরো বন্ধুদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে। এটার পেছনে আমাদের একটা তত্ত্বও ছিল, কেন আমরা সম্মিলিতভাবে নাটক রচনা ও পরিচালনা করবো। আমরা কোন প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছি। এসবের একটা তত্ত্ব ছিল। কাজে কাজেই আমার নাটক, আমি যেটা আট বছর বয়স থেকে করে চলেছি। (আট বছর বয়স থেকেই আপনি নাটকে..–রাজু আলাউদ্দিন)। নাটক রচনা-পরিচালনা-অভিনয় সবই করছি।

রাজু আলাউদ্দিন : যেহেতু আপনি অল্পবয়সেই শুরু করেছেন, সেই জন্য আমার জানার কৌতূহল হলো যে, এত অল্প বয়সে শুরু করার প্রেরণাটা কিভাবে পেলেন?
দিলীপ কুমার বসু : নাটকের ব্যাপারে যদি বলতে হয়, প্রেরণা যদি বলা যায় তাহলে প্রথম কথা হল ‘পথিক’ বলে একটা সিনেমা দেখেছিলাম। নাটক দেখার পয়সা ছিল না। বাবা-মা যেতেন বহুরূপীর নাটক হলে। কিন্তু আমাদেরকে নিয়ে যাবেন এত আর্থিক সামর্থ আমাদের ছিল না। আমরা নাটক দেখতাম, দিল্লির কালীবাড়ি-দুর্গাবাড়ির মঞ্চে এবং ভীষণ ভাল লাগতো। এটা পাবলিকলি (Publicly ) বলছি, বসে বসে প্যান্টে অল্প অল্প করে প্রস্রাব করতাম। কারণ জায়গা ছেড়ে উঠে গেলে আর জায়গা পাবো না প্রথম রো(Row)তে। এতই তন্ময় হয়ে নাটক দেখতাম রাত দু’টো-তিনটে-চারটে অবধি।
কিন্তু আমরা নিজেরা যে নাটক করতাম তার একটা মূল কারণ হচ্ছে ‘পথিক’ বলে যে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, তাতে শম্ভু মিত্র কাঁধে ঝোলা ঝুলিয়ে পথিক সেজেছিলেন। বহুরূপীর আর্টিস্টরা সবাই ছিলেন। তুলসী লাহিড়ীর লেখা নাটক। আমার কাঁধে ঝোলা ও নাটকের উৎসাহ, এবং আমার ভাইদের, যারা মিলে প্রতিবছর নাটক করতাম একটা করে, তাদের সবারই গোড়ায় বোধ হয় ‘পথিক’ সিনেমাটা আছে। এবং অল্প বয়সে কালীবাড়িতে দেখা নাটকগুলো আছে।

রাজু আলাউদ্দিন : নাটক আপনি বেশি লিখেছেন। ফলে নাটককে আপনি অনেকটা কেন্দ্রে মনে করেন ?
দিলীপ কুমার বসু : কবিতাকে মনে করি। আমার বন্ধু অমিতাভ, সে এক সময় আকুল হয়ে বলতো, তোমার শেষ নাটকগুলো তো তুমি কবিতায় লিখবে, গদ্যে কেন লিখতে যাবে। (তাতে কবিতা আর নাটক অনেকটা মিলে যাবে।) আসলে দিল্লিতে আমার পরিচয় হচ্ছে নাটকের লোক বলে, আর কলকাতায় আমার পরিচয় হচ্ছে কবিতার লোক বলে। এটা অনেকটা মজার ব্যাপার।

রাজু আলাউদ্দিন : তাহলে দুই জায়গায় দুই পরিচয়ে আপনি পরিচিত। একটা ঘটনা ঘটেছে বলে কি আপনি মনে করেন, তা হলো, আপনি বাংলা ভাষায় দীর্ঘ কবিতার চর্চার করছেন। আমরা যদি তাকাই, দীর্ঘ কবিতার সম্ভাবনার কথা কোথাও কোনো এক প্রবন্ধে জীবনানন্দ দাশ উল্লেখ করেছিলেন। (মহাকবিতা–দিলীপ বসু)। সেই মহাকবিতায় দীর্ঘ কবিতার একটা ইঙ্গিত থেকে থাকতে পারে আর কি। ওনার সমসাময়িক, আমার যতদূর মনে পড়ে, মনীন্দ্র রায়, উনি বেশকিছু দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন, আপনার মনে আছে কি ?
দিলীপ কুমার বসু : আমি যেগুলো সম্পর্কে সচেতন তা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের ‘বনফুল’-এর তলায় ব্র্যাকেটে উনি ‘কাব্যোপন্যাস’ কথাটা লিখেছিলেন। সেটা তো প্রথম জীবনের লেখা। আমি যখন স্কুলের শেষ ক্লাসে এবং কলেজের প্রথম দিকে অংকে রেগুলার ফেল করে যাচ্ছি, তখন আনন্দ বাগচী ‘স্বকালপুরুষ’ নামে একটা কাব্যোপন্যাস (ধ্রুপদী পত্রিকায়) ক্রমশ বার করছিলেন। আমি সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। পরে নচিকেতা ভরদ্বাজ ‘অন্য রূপ রূপান্তর’ না কি যেন একটা কাব্যোপন্যাস লিখেছিলেন, সেটা খুব বাজে লেগেছিল। আমি কলকাতা থেকে দিল্লি যাই ১৯৬২ তে। সেখানে আমার এক বান্ধবী আমাকে একটি খাতা দেন, সেই খাতাতে আমি ‘আলোকশতাব্দ’ বলে একটা কাব্যোপন্যাস শুরু করি। তখন আমি টিনেজার, বয়স কুড়িতে পৌঁছায়নি। তখন থেকে আমি লিখেই যাচ্ছি। আমার অন্য কোনো বইয়ে, কথানদীর বাঁকে বাঁকে-এর ভূমিকায় লিখেছি: এটা একেবারেই আশ্চর্য নয় যে, আমি বারবার কাব্যোপন্যাস লিখি; ‘বনফুল’– এগুলো তো আমি পরে জানছি। ‘স্বকাল পুরুষ’-এর কথা জানতাম যখন ওটা লিখেছি। আর নচিকেতা ভরদ্বাজের কাব্যোপন্যাস আরো পরে লেখা। জয় (জয় গোস্বামী)-এর তো অনেক পরে লেখা।
আমি বলছি, আমার ছোটবেলা কিন্তু আশ্চর্য ছোটবেলা। আমি ‘আদর্শলিপি’ বলে একটা বই পেয়েছিলাম পাঁচ বছর বয়সে, হাতে খড়ির সময়। কিন্তু পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে, নারায়নগঞ্জ শহরে বসে, আমার ঠাকুমা’র সহযোগে, প্রথমে ঠাকুমা পড়তেন খুব দ্রুত, আমি পড়তে শুরু করলাম। কি করে শুরু করলাম আমি আজো জানি না। রহস্য হলো, কোনো বর্ণ পরিচয় জাতীয় বইয়ের শিক্ষা ছাড়া আমি সম্পূর্ণ কৃত্তিবাসের রামায়ণ, সম্পূর্ণ কাশীদাসী মহাভরত, চৈতন্যচরিতামৃত, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, নানা প্রকারের কিশোর অ্যাডভেঞ্চারের বই, তিনটে দস্যু মোহনের উপন্যাস–এগুলো সব পড়েছি। সেখানে যদি পাতার সংখ্যা ধরা যায়, শব্দ সংখ্যা ধরা যায়, তাহলে কাব্যে লেখা লাইন, পয়ারে লেখা লাইন গদ্যে লেখা লাইনের পঞ্চাশগুণ। কাজে কাজেই আমি যে কবিতায় ভাববো, আমার যে কবিতায় গল্পগুলো বলা, এটা আমার পক্ষে খুব স্বাভাবিক। আমার আশ্চর্য একটা শুরু হয়েছে। আমি জানি না, কিভাবে পড়লাম ওই বইগুলো।

রাজু আলাউদ্দিন : তবে কাহিনীর প্রতি একটা ঝোঁক তো আছেই। কাহিনীর প্রতি এই যে ঝোঁকটা, যেটা আপনি এই মুহূর্তে বললেন, সেটা শুরুই হয়েছে কিন্তু কবিতায় লেখা কাহিনী দিয়ে, রামায়ণ-মহাভারত যেগুলো আপনি বললেন যে, টুকরো কবিতা পড়া বা শোনার আগেই আপনি কাহিনী পড়ে ফেলেছেন। হয়তো ওইটা আপনার মনের মধ্য গেঁথে আছে। ওই কারণে ভাল লাগার একটা স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে।
দিলীপ কুমার বসু : এটা করেছে। কিন্তু তা ছাড়াও আমার একটা অবস্থা হয়েছিল। এটা আমার বলা উচিত। বছর ষোল যখন বয়স, তখন আমি আর আমার এক পিসতুতো ভাই, আমাদের মনে হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসটা খুব ভুলভালভাবে লেখা। যে কোনো কারণেই মনে হয়ে থাক না কেন।

রাজু আলাউদ্দিন : কার দ্বারা? কাদের দ্বারা?
দিলীপ কুমার বসু : সব্বাই। যারা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখেন।

রাজু আলাউদ্দিন : বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তো লিখেছেন খুব অল্প কয়েকজন। তার মধ্যে সুকুমার সেন, দীনেশ সেন…
দিলীপ কুমার বসু : হ্যাঁ, সুকুমার সেন, দীনেশ সেন আরো বোধ হয় মুখোপাধ্যায়, এরকম অনেকেই। (শ্রী কুমার মুখোপাধ্যায়, তিনি তো কেবল উপন্যাস করেছিলেন– রাজু আলাউদ্দিন)। যাই হোক, আমাদের মনে হয়েছিল আমাদের সংশোধন করা খুব কর্তব্য।

রাজু আলাউদ্দিন : ভুলটা কোন জায়গায় মনে হচ্ছিল?
দিলীপ কুমার বসু : নানা জায়গায়। সেই ডিটেইলে গেলে খুব মুশকিল হবে। অনেক জায়গায় যথেষ্ট বিচার করা হয়নি মনে হচ্ছিল। যেমন আমি একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, প্রহসন বলে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাটক উড়িয়ে দেয়া হয়। মাইকেলের বাকি নাটকগুলোকে আমি নাটক বলেই মনে করি না। কিন্তু ওই প্রহসন দুটিকে অসাধারণ নাটক বলে মনে করি। যাইহোক, এগুলোর কথা আমি বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছি যে, এই রকম একটা উদ্দেশ্য থেকে এবং বড় হয়ে আমরা কি করবো সে-রকম একটা রোমান্টিক কল্পনা ছিল; সেই সময় আমার মনে হয়েছিল, শুধু শুরুর ইতিহাসগুলোই নয়, ইতিহাস বদলাতে হবে। বাংলায় লিরিক কবিতা একটা পেয়ে বসেছিল। ন্যারেটিভ পয়েম বলে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়-টাধ্যায় এরা সব লিখতেন এক সময়। কিন্তু উপন্যাসের মতো, যেটা সাধারণ ন্যারেটিভের চেয়ে আরেকটু জটিল চেহারার, সেইটা কবিতার সঙ্গে মেলানো যায় কি না, কবিতায় নতুন শাখা তৈরি হয় কি না, এইসব ভেবেছি; কেননা বাংলা ভাষার হয়ে এই গর্বটা আছে যে, আমরা তো অন্যভাষার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাহিত্য রচনা করবো। কাজে কাজেই শুধু লিরিক কবিতা লিখলে চলবে কেন, আমাদের কর্তব্যবোধ এমন দাঁড়িয়েছিল। আসলে কি, আমার একদা ‘কঙ্কণমালা’ লিখে খুব ভাল লেগেছিল। কিন্তু আমার সমস্ত লেখার মধ্যে একটু মাস্টারি ভাব আছে। আমি তো মনে করি, আমি না হয় লিখলাম না তেমন কিছু, কিন্তু এই লাইনটা যদি ধরিয়ে দিতে পারি তাহলে আমার চেয়ে বহুগুণে প্রতিভাশীল বন্ধুরা আমার চেয়ে দারুণ সব তৈরি করতে পারবে। তাতে বাংলা সাহিত্যের খুব গৌরব হবে।
dsc00776.JPG
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার দীর্ঘ কবিতা বা কাহিনীনির্ভর কবিতা রচনার পেছনে এইটাও কি আরেকটা কারণ যে, আমি অনুমান করছি, আপনি তো ইংরেজির ছাত্র ছিলেন এবং ইংরেজির শিক্ষকতা করেছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রকে পড়াতে গিয়ে আপনাকে পড়তে হয়েছে, ছাত্রাবস্থায় আপনাকে পড়তে হয়েছে রোমান্টিক পিরিয়ডের সেই সব কবিতা যেগুলো দীর্ঘ কবিতা বলি, যেগুলো অনেকটা কাহিনী নির্ভর কবিতা বলি যেমন, কোল্ডরিজের ‘কুবলা খান’ ……
দিলীপ কুমার বসু : যদি ইংরেজি কবিতার কথা বলা হয়, আমি এইটা লিখেছিও, অনেক সময় ভেবেছিও, আমার এম.এ পড়ার দিনে রমাপ্রসাদ দে বলে এক জন মাস্টারমশাই তিনি আমাদের চসারের ক্যান্টারবেরি টেলস-এর প্রোলগ পড়িয়েছিলেন। আমি চসার-মুগ্ধ। আমি মনে করি, ইংরেজি সাহিত্যে শেকস্পিয়ার ছাড়া যে দু-তিনজন বড় কবি আছেন তার মধ্যে চসার মহত্তমদের একজন। চসারের স্টাইল আমার ওপর গভীর ছাপ রেখে গেছে। বহু শ্লেষ যমকের ব্যবহার, আমার নানা জিনিস, চসারের স্টাইল থেকে এসেছে। চৌদ্দ শতাব্দি, সেই চতুর্দশ শতাব্দির একজন লেখক, তাও ইংরেজি সাহিত্যের, বাংলায় নয়, তার প্রভাব আমার মধ্যে গভীর-যদি ‘কঙ্কণমালা’ পড়া যায়। আমি রোমান্টিকদের থেকে নয়, ‘কুবলাই খাঁ’র মতো কবিতা থেকে নয়, বাইরনের কবিতা থেকে নয়, চসারের ওই ক্যান্টাবেরি টেলস থেকে আমি প্রভাবিত হয়েছি। বিদেশি প্রভাবের কথা বলতে গেলে এইটুকু, তা নাহলে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ।

রাজু আলাউদ্দিন
: কিন্তু কাহিনীনির্ভর কবিতার ক্ষেত্রে, একটা জিনিস তো ছিল, যেটা আমাদের বাংলা ভাষাতেও ছিল, যেগুলোকে বলে রোমান্স কাব্য আর কি। সেগুলো আপনাকে কখনো উদ্বুদ্ধ করে নি?
দিলীপ কুমার বসু : মঙ্গলকাব্যগুলো করেছে। আপনি যদি কখনো ‘কঙ্কণমালা’ কোনো দিন পড়েন, তাহলে দেখবেন ‘কঙ্কণমালা’য় অন্যান্য আঙ্গিক ছাড়াও ছন্দগুলো তুলে নেয়া হয়েছে ওই জায়গা থেকে। আমি চাই ওই লেখাগুলোর পেছনে মানুষ মঙ্গলকাব্যকে দেখুক।

রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু আপনার দীর্ঘকবিতার মূল ছন্দ তো মনে হয় পয়ার। পয়ারের অক্ষরবৃত্ত…
দিলীপ কুমার বসু : না, না। নানা মিশ্রণ আছে। দ্রুত পরিবর্তন আছে তাতে। মানে দলবৃত্ত থেকে মাত্রাবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত থেকে অক্ষরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্তের পংক্তির সংখ্যাই বেশি। অক্ষরবৃত্ত পয়ারের লাইন বেশি। (অক্ষরবৃত্তই প্রধান–রাজু আলাউদ্দিন)। কিন্তু পুরো কাজটার একটা আর্কিটেকচারাল ফর্ম আছে, যেখানে ওই যে ছন্দ পরিবর্তন আছে, তার মধ্য দিয়েও কিছু বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। একটা কিছু জীবনদর্শন, জীবনকে দেখা, গড়বার চেষ্টা।
রাজু আলাউদ্দিন: এমন যে একই ছন্দে জীবন চলে না?
দিলীপ কুমার বসু : এরকম জেনারেল কথা নয়। আমি বলছি যেখান থেকে যেখানে যাচ্ছে, যেই কথাটা থেকে যেই কথায় যাচ্ছে, সেই কথাটা কেন দলবৃত্ত থেকে হঠাৎ মাত্রাবৃত্তে চলে গেল, তাতে যে সুর বদলে গেল, এর সুরটার সঙ্গে সঙ্গে যে বিষয়বস্তুরও সুর বদলে গেল।

রাজু আলাউদ্দিন : মানে কাঠামো ও ছন্দ নিজেই একটি…(পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত–দিলীপ কুমার বসু)। আর ওটা মিলিয়েই একটা মেসেজ দেয়ার চেষ্টা করছে। আরেকটা জিনিস হচ্ছে, সেটা হলো, কবিতার ক্ষেত্রে আপনারা একটা সময় অমিতাভ গুপ্ত এবং আপনি বা আপনাদের সঙ্গে আরো কেউ কেউ (অঞ্জন সেন–দিলীপ কুমার বসু), হ্যাঁ, অঞ্জন সেন মিলে ‘উত্তর-আধুনিক’ নামে একটা আন্দোলনের সূত্রপাত আপনারা করেছিলেন। সে নিয়ে অনেক লেখালেখি আছে এবং এমনকি আপনারা একটি সংকলনও করেছিলেন। অমিতাভ গুপ্তর নেতৃত্বে, বলবো কি?
দিলীপ কুমার বসু : হ্যাঁ, হ্যাঁ। অমিতাভ গুপ্তই মূল এর। আমি তো আরো অনেক পরে এসেছি। অমিতাভ গুপ্তই প্রথম।

রাজু আলাউদ্দিন
: তো এই অমিতাভ গুপ্তের নেতৃত্বে আন্দোলন করার প্রেরণাটা কি পরিবর্তনের কারণেই আপনারা করেছিলেন, মানে আপনারা পরিবর্তন চান বলে নাকি এরও বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল?

dsc01048.JPG
দিলীপ কুমার বসু : না। আমরা দেখি যেই সময়ে এইগুলো হয়েছে তার অনেক আগে থেকে আমার মনের মধ্যে একটা দ্বিধা ছিল যে, ত্রিশের দশকের আধুনিকতা একটা মেকি জিনিস। ত্রিশের দশকে যেই কবিরা বিখ্যাত হয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ দিক পরিবর্তন করেছেন, যেমন বিষ্ণু দে। উনি ডেভলপ করেছেন। ( ডেভলপ করেছেন, না দিক পরিবর্তন করেছেন?–রাজু আলাউদ্দিন)। দু’টোই করেছেন। বিষ্ণু দে অন্যদিকে এগিয়ে গেছেন। (অন্যদিক মানে?–রাজু আলাউদ্দিন)। সাঁওতালী কবিতার অনুবাদক বিষ্ণু দে ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ বা ‘চোরাবালি’র বিষ্ণু দে একজন নয়, ‘তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখে’র বিষ্ণু দে নন, মোটেই সে আগের সেই বিষ্ণু দে নয়। সুধীন দত্ত-টত্ত এরা সবাই খুব বড় কবি এবং সবাই আমাদের প্রভাবিত করেওছে। কিন্তু এদের মধ্যে একটা প্লাস্টিসিটি, এদের এই ভাষার মধ্যে নিষ্প্রাণতা, বহুস্তরের অভাব। শুধু ভারতীয় বা ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির কথা বলছি না। আমি ঐ ভাষার পিছনের কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে পড়তে পারছি না। বিষ্ণু দে-রাও যখন ঐতিহ্য সংস্তৃতি ব্যবহার করছেন তখন মনে হচ্ছে এটা একটা অ্যাকাডেমিক এক্সারসাইজ, টি এস এলিয়ট করেছিলেন অতএব আমরাও করছি। তো এরকমের একটা অবস্থা। আবার স্বাভাবিক চোখে দেখুন। আমি একটা একদম অন্যকথা বলি, কবিতার বাইরে গিয়ে।
দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের শেষে প্রফুল্ল এসে বাসন মাজছে। সেটা কারোর ভাল লাগেনি। আমি এর মধ্যে এটা পড়তে চাই যে, কেন ভাল লাগেনি? আমি এটা পড়তে চাই–এ সম্বন্ধে আমার লেখা আছে। লাস্ট আমরা দেবী চৌধুরানীকে কোথায় দেখছি। একটা বজরায়। তার এক পাশে দিবা আর এক পাশে নিশা। পায়ের কাছে প্রায় পড়ে আছে তার স্বামী ব্রজ। দুর্গা মূর্তিঃ বিজয়া ভাসানের পরে অন্তত হিন্দু বাঙালি মনে, সম্ভবত অনেক মুসলমান বাঙালি মনেও, কারণ আমরা সংস্কৃতিটাকে শেয়ার করি, তার পরে আর কিছুই ভাল লাগে নি। এই যে বিষাদটা, এই যে বিজয়া এলিমেন্টটা ঢুকে গেল এখানে, তারপরে দেবী চৌধুরানীর সেই ষড়ৈশ্বর্যযুক্তরূপ যা ব্রিটিশকে আক্রমণ করবার সামর্থ্য রাখতো, জমিদারকে আক্রমণ করার, পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ করার, পিতৃতন্ত্রকে আক্রমণ করার, সেই মূর্তি চলে গেল। এই যে বিজয়ার যে ছবিটা, নৌকা ভাসানের যে ছবিটা, দুর্গা ভাসানের এই ছবিটা কিন্তু একে এতো গভীরতা দিচ্ছে।

তোরাব যখন রোগকে মারছে তখন পেছনে যদি আমি বজরংবলীকে, হনুমানকে না দেখি, কেননা রাম-লক্ষ্মণের রেফারেন্স সমানে নবীনমাধব বিন্দুমাধবের কথায় আছে বাংলা রামায়ণে হনুমান যেমন রাবণকে অপমান করে, থাপ্পর-টাপ্পর মেরে তাকে নিয়ে চলে গেল আগুন লাগিয়ে দিয়ে লঙ্কায়, সেটা যদি আমি তোরাবের বিদ্রোহের মধ্যে না দেখি, ‘বাই জোভ বীটন টু জিল।’–রোগ সাহেব বলছেন, ‘নীল দর্পন’-এর নীলকর, সেটা যদি আমরা না দেখি, তাহলে আমরা দেখতেই পারছি না কেন এটা এতো গভীর। তারপর ধরুন হাজারটা সিনে এ্যাটেমপ্ট টু রেপের কথা আছে, কোথাও কোনো সিন ‘নীল দর্পন’-এর সেই সিনের মতো দাঁড়ায়নি। এখানে কেন দাঁড়িয়েছে? আমি বলি, ওই আর্কিটাইপটা পেছনে কাজ করছে বলে। আমি বলছি কারবালার আর্কিটাইপ, দেখুন কারবালা কিন্তু ইন্ডিয়ান ভূখণ্ডের মধ্যে নয়; ‘যিশাস অন ক্রস’–এই আর্কিটাইপ এবং ভারতীয় অনেক সংস্কৃতির নানা প্রকার আর্কিটাইপ। (কারবালায় যিশাস আর্কিটাইপ কিভাবে?–রাজু আলাউদ্দিন)। না, কারবালা আর্কিটাইপটা বিহাইন্ড মেনি রাইটিংস। আপনি সবগুলো পড়েন নি। আপনি দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাব্যোপন্যাসটা পড়ে দেখুন কারবালা আর্কিটাইপটা সেখানে কিভাবে কাজ করে। দিলীপ আমার জুনিয়ার বন্ধু। ও আমাকে কথা দিয়েছিল, ‘দিলীপদা’ আমি একটা কাব্যোপন্যাস লিখবো। ‘আপনি বলেছেন যখন, আদেশ করেছেন, আমি একটা লিখবো ‘। লিখেছে। পিছনে বিষাদসিন্ধু কাজ করেছে। আমি বলেছি কারবালার আর্কিটাইপ যিশাস অন ক্রস আর্কিটাইপ, সেই অসীম ক্ষমার যে জায়গাটা বা ভারতীয় সংস্কৃতির নানা রকম দিক আছে। এক ব্যাঙ্গের মধ্য দিয়ে কঙ্কণমালাতে একটা ছবি হচ্ছে, মা এই বইয়ের হিরোইনের জন্ম দিচ্ছে। মা দেখছে গায়ের মধ্যে সাদা অ্যাম্বাসেডর গাড়ি ঢুকে যাচ্ছে। সাদা হাতি ঢুকেছিল বুদ্ধের মায়ের শরীরে, ওই স্থানে সাদা অ্যাম্বাসেডর ঢুকে যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে একটা ব্যাঙ্গ আছে।
তিনটে ভিখিরি বসে তারা দেখছে আকাশে, আর বৃষ্টি পড়ছে। জেরুজালেমের যিশুকেও, বেথেলহেমের যিশুকেও তারা দেখে ওয়াইজ-ম্যানরা ছিল। এখানে তিনটে ভিখিরি আছে, যাদের গা বৃষ্টিতে শুধু ভিজছে। তো এইগুলো যদি আমি না দেখতে পাই…

রাজু আলাউদ্দিন : তিনটে ভিখিরির ব্যপারটা কিন্তু শেকসপিয়রের থ্রি উইচেস-এর ভেতরেও আছে। থ্রি উইচেস।
দিলীপ কুমার বসু : না, থ্রি উইচেস তো অন্যরকম। এখানে ওটার বর্ণনাটা দেখে বুঝতে পারবেন, এটা জন্মের সঙ্গে জড়িত। (আমি বলছিলাম তিনের একটা ব্যাপার আছে–রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, তিনের একটা ব্যাপার আছে। এটা হচ্ছে যে, আকাশের একটি উজ্জল তারা ওদের কাছে গিয়ে পড়ছে, ইশারায় এই সব লাইন আছে। সেই বেথেলহেমের সেই স্টার যেটা দেখে থ্রি ওয়াইজ পিপল ফলো করছে। সে ছবিটা যদি আমরা না দেখতে পাই, তাহলে আমরা সমস্ত ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।
উত্তর-আধুনিকের আন্দোলনে আমাদের মনে হয়েছিল, এই রুটসগুলো মানব ইতিহাসের, বিশেষ সামাজিক জগতের, ইতিহাসের এই রুটস থেকে আমরা ছিটকে বের হতে আমরা পারি না, উচিত না। এইটাই হচ্ছে আধুনিকোত্তরবাদ, আমরা যেটাকে বলি পোস্ট-মর্ডানিজম, তার সঙ্গে এটার সবচেয়ে বড় তফাৎ। দু’টোই আধুনিকতাবাদকে আক্রমণ করে। পোস্ট মার্ডানিজমও করে, উত্তর-আধুনিকও করে। কিন্তু সেটা হচ্ছে আপাত মিল, গভীর অমিল হচ্ছে ওইটা–একটা ইতিহাসকেই স্বীকার করে না, আরেকটা ইতিহাস ঐতিহ্যের মধ্যেই ঢুকতে চায়।

রাজু আলাউদ্দিন : আপনি বলছিলেন আপনাদের সেই উত্তর-আধুনিক আন্দোলনের কথা। এই আন্দোলনের কি কোনো ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করছেন?
দিলীপ কুমার বসু : দেখুন আমি আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই যে, এটা কিন্তু অমিতাভ গুপ্ত, এবং খুব দ্রুত অঞ্জন সেন ও আরো দুয়েকজন, এই আন্দোলনটা করেছে। আমি তার সঙ্গে একটু পরেই এসেছি বরঞ্চ। আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি, যে ঘটনাটা ঘটে সত্তরের দশকের শেষে, তখন পশ্চিমবঙ্গে অন্তত এবং সমস্ত ভারতবর্ষে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। এমন কি বাংলাদেশেও, মানে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে, মওলানা ভাসানীর দল-টল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বামপন্থী আন্দোলন অত্যন্ত প্রবল। বদরুদ্দীন উমর যেমন আমাদের বড় থিওরিটেশিয়ান ছিলেন। এই সময় একটা উপমার মতো ব্যবহার হতো–গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলা। এটা একটা শ্লোগান ছিল। ভারতীয় বাংলা কালচারে কলকাতাকেন্দ্রিকতাকে আমরা ভেঙে দিয়েছিলাম। এটা ছিল তৎকালীন ইতিবাচক প্রভাব। কলকাতা সেই পজিশন অনেকটা রিকভার করেছে, কিন্তু পুরোপুরি রিকভার কখনোই করতে পারেনি।

আমি দেখেছি একটি বিশেষ বাড়িতে, অমিতাভ গুপ্তের বাড়িতে, উনি তখন সাহা নগর হাউজিং স্টেটে থাকতেন, নানা জায়গা থেকে–বাংলার উত্তরতম কোণ থেকে দক্ষিণতম কোণ অবধি–নানা জায়গা থেকে লোকজন এসে ‘অমিতাভ দা, এসে গেলাম’ বলে এসে যেতেন। তাদের অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন এই শ্লোগানগুলো তুলে ধরেছিল। তাতে তাদের কবিতার চেহারা কি হয়েছিল, তা তো আরো বিস্তৃত বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। কিন্তু অমিতাভরা যাদেরকে ভেবেছিলেন উত্তর-আধুনিক, তাদের কিছু লোক নিজেদেরকে ভাবতেন বিপ্লবী নকশাল প্রায়। তো কাজে কাজেই তাদের নিজেদেরকে দেখা এবং অমিতাভ ও অঞ্জনের দেখার মধ্যে তফাৎ ছিল। বীরেনদা’ বলে একজন ছিলেন যিনি এই সেদিন মারা গেলেন। (বীরেন্দ্র চক্রবর্তী–রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, বীরেন্দ্র চক্রবর্তী, তিনি কবিতা লিখতেন না। লিখলেও আমরা খবর রাখি না। তিনি তাত্ত্বিকই ছিলেন শুধু। তিনি সেই সময় সঙ্গে ছিলেন। তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন। পরের দিকে তিনি একটু বিমুখ হয়ে যান এই আন্দোলন সম্পর্কে। কিন্তু আমরা নানান জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে, লিটল ম্যাগাজিনের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে, নানারকম কাজ করে একটা জিনিস করেছিলাম; সেটার উত্তর-আধুনিকতা তৈরি হয়েছে কিনা জানি না, কিন্তু যেটা তৈরি হয়েছে সেটা হচ্ছে নাটকে যে-রকম করেছিলাম সম্মিলিতভাবে রচনা ও সম্মিলিত পরিচালনা; সেই গুরুবাদ থেকে যে বেরিয়ে যাওয়া, যে একটা বা দু’টি কেন্দ্রিয় চরিত্র থাকবে তার ওপর সবাই নির্ভরশীল থাকবে। নাট্যকার ও পরিচালক থাকবে, বা এক অঙ্গে নাট্যকার ও পরিচালক। (সেটি আপনারা ভেঙে দিয়েছিলেন–রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, সেটি আমরা ভেঙে দিয়েছিলাম। সে রকমই–কলকাতায় উপস্থিত বলে, ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপা হয় বলেই যে তারা মহান কবি–এই সংস্কারটা তখন একদম চলে গিয়েছিল।

dsc01049.JPG
রাজু আলাউদ্দিন : তার মানে আপনারা ডিসেন্ট্রালাইজ করেছিলেন?
দিলীপ কুমার বসু : হ্যাঁ, ডিসেন্ট্রালাইজ। ফেডারাল একটা চেহারা দাঁড়িয়েছিল। এইটার বোধ হয় এখনো রেশ রয়ে গেছে।

রাজু আলাউদ্দিন : আপনার আরেকটা বড় চর্চার দিক হচ্ছে–রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরের যে অনুবাদ তার নতুন সংস্করণ আমরা দেখলাম। যেটাতে আপনার মূল ভূমিকা ছিল সম্পাদকের। তো সেই সম্পাদনা করতে গিয়ে ঘরে-বাইরে সম্পর্কে আপনার নতুন পর্যবেক্ষণ কি? বা এই অনুবাদটি কেন আবার সম্পাদনার মাধ্যমে প্রকাশ করার তাগিদ বোধ করলেন? এটার তো অনুবাদ ছিলই।
দিলীপ কুমার বসু : না, অনুবাদ তো এখনো সেই অনুবাদটাই আছে। একবিংশ শতাব্দিতে পৌঁছে দু’টো নতুন অনুবাদ তৈরি হয়েছে। সেই অনুবাদের নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতা–সবই আছে। দুর্বলতার দিকটা আমি বলছি না গায়ে পড়ে।

রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু আমরা তো জানতে চাই সেই দুর্বলতাটা কি।
দিলীপ কুমার বসু : না, মানে বাংলা ভুল বোঝা। ভুল জায়গায় ঝোঁক দিয়ে উপন্যাসের শেষ দিক যদি অনুবাদ হয়–এ ধরনের আছে।

রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু শক্তির দিকে যাওয়ার আগে আমি এই প্রশ্নটা জেনে নিতে চাই যে, সেই অনুবাদ তো রবীন্দ্রনাথ নিজে দেখেছেন।
দিলীপ কুমার বসু : না না, আমি একবিংশ শতাব্দির উপন্যাস দু’টির কথা বলছি। (একবিংশ শতাব্দির কোন দু’টো?–রাজু আলাউদ্দিন)। ২০০২ এবং ২০০৫-এ নিবেদিতা সেন ও আরেকজন কে যেন… পেঙ্গুইনের সেই অনুবাদটা করেছেন। আমি সেইগুলোর কথা আলোচনা করছি। যেহেতু সেগুলো এত প্রচলিত অনুবাদ নয়, একটা তো বোধ হয় পাওয়াও যায় না, নিবেদিতা সেনের অনুবাদটা। সেটা যেহেতু প্রচলিত নয়, সেটার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করতে খারাপ লাগে, রুচিতে বাধে।

রাজু আলাউদ্দিন : আপনি রুচিশীল জায়গা থেকেই সমালোচনা করেন।
দিলীপ কুমার বসু : নিবেদিতা সেনের অনুবাদটা আমার মনে হয়, দুর্বলতাটা আমি আগে বলছি, কিন্তু আগে শক্তির দিকটা বলা উচিত, যাই হোক, ওটার দুর্বলতাটা হচ্ছে ওটা ডাল রিডিং। ঘরে-বাইরে উপন্যাসের ইংরেজিটা যদি ডাল রিডিং হয় তাহলে তো আপত্তি আছেই। আর পেঙ্গুইনের যে ইংরেজি অনুবাদটা আছে, তার একটা বড় দোষ হচ্ছে ভূমিকা। একজন বিখ্যাত লোক ভূমিকাটা লিখেছেন। (কে লিখেছেন?–রাজু আলাউদ্দিন)। নাম মনে পড়ছে না। খুব বিখ্যাত লোক, এটা বলতে পারি। তিনি কিচ্ছু রবীন্দ্রনাথ জানেন না, এটাও বলতে পারি।

রাজু আলাউদ্দিন : তিনি কি কোনো ব্রিটিশ অনুবাদক?
দিলীপ কুমার বসু: না না, বাঙালি।

রাজু আলাউদ্দিন : বাঙালি অনুবাদক?
দিলীপ কুমার বসু : বাঙালি অনুবাদক, বাঙালি ভূমিকা লেখক।

রাজু আলাউদ্দিন : কলকাতার?
দিলীপ কুমার বসু : কলকাতার না অক্সফোর্ডের তা বলতে পারবো না। এক্ষুণি মনে পড়ছে না, বই আছে আমার বাড়িতে। (আমার মনে হয় দেখে নেয়া ভাল–রাজু আলাউদ্দিন)। উমমম, দেখলে পরে দেখে নিবেন। আমি বলছি, কিন্তু জায়গায় জায়গায় মারাত্মক কতগুলো লাইনের ভুল অনুবাদ আছে। (যেমন?–রাজু আলাউদ্দিন)। কিন্তু সেটা সহজ পাঠ্য। সেটা পড়তে ফুর্তি লাগে বেশি, পেঙ্গুনের অনুবাদটা।
রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু তাতে রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায় কম বা মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়।
দিলীপ কুমার বসু : মাঝে মাঝে গণ্ডগোল আছে। কিন্তু এসবের বাইরে একটা অন্যকথা আছে। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে অনুবাদটা ১৯১৮-তে সিরিয়ালাইজড হয়েছিল ‘মর্ডান রিভিউ’-এ, যেটার নাম হয়েছিল ‘At Home And Outside’। যেটা সম্ভবত ম্যাকমিলান, আমরা জানি না কিভাবে কে বদলালো, The Home and The World নামে ছাপালো।

রাজু আলাউদ্দিন : তাতে অসুবিধা কী হল?
দিলীপ কুমার বসু : তাতে অসুবিধা হল আমরা ইংরেজিতে এই উপন্যাসটা পড়াতে গিয়ে দেখেছি, Home এবং World-কে বাইনারি হিসেবে ধরা হলো যে, Home versus The World আর কি। অথচ বাংলা শব্দের তা মানে নয়, ঘরে এবং বাইরে সেটা। (যেটার ইংরেজি হওয়া উচিত At Home And Outside-রাজু আলাউদ্দিন) । হ্যাঁ। মর্ডান রিভিউ-এ ইংরেজি অনুবাদে সুরেন্দ্রনাথ এই টাইটেলটাই দিয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাকমিলানের বই হয়ে বেরিয়ে আসতে গিয়ে নামটা বদলে গেল। অভিয়াসলি আমরা অনুমান করছি ম্যাকমিলান এই নামটা বদলালো। তারা হয়তো ভেবেছে যে, এই নামটা বেশি ক্যাচি হবে।

রাজু আলাউদ্দিন : এ সব ক্ষেত্রে প্রকাশকরা অনেক সময় নাম বদলে দেয়। যেমন জীবনানন্দ দাশের ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমায়’ বইটার নাম হয়ে গেল ‘রূপসী বাংলা’।
দিলীপ কুমার বসু : তো সেই রকম একটা কিছু হয়েছে। তাতে আমাদের পড়াতে গিয়ে বিভিন্ন কলেজে গিয়ে বোঝাতে হয়েছে যে, ভাই, ঘর এবং বাইরের বিরোধটা এখানে বক্তব্য নয়, ইনফ্যাক্ট ‘দেশে দেশে মোর ঘর আছে’–এটা রবীন্দ্রনাথের স্ট্যান্ড। ঘরে-বাইরে তো তার বাইরে নয়। নিখিলেশ বিমলাকে বাইরেই করতে চাইছে। নিখিলেশ সেখানে প্রায় রবীন্দ্রনাথ, অনেকটাই রবীন্দ্রনাথ। তো এ রকম নানা সমস্যা থেকে আমাদের আরো বেশি রাগ হতে শুরু করলো। যাই হোক, এই সম্পর্কে যে বক্তব্য আছে : বাকিরা যত ভাল অনুবাদই করুক, যেমন কেতকী কুশারী রবীন্দ্রনাথের ‘শেকসপীয়র প্রশস্তি’ কবিতাটির একটি অনুবাদ করেছেন। এবং কেতকী কুশারী বারবার বোঝাতে চেয়েছেন, স্ট্যাটফোর্ড অন আভনে রবীন্দ্রনাথের মূর্তির নিচে সেই কবিতাটা উৎকীর্ণ করা হোক। উনি যোগাযোগও করছেন ভারতবর্ষের সবার সঙ্গে। ভারতবর্ষের সবাই কিন্তু তা অ্যাকসেপ্ট করেনি এই মাত্র কারণে যে, ওটা রবীন্দ্রনাথের করা অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের কবিতার রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ সেটা যদি কোনো গুণগত মানে কেতকী কুশারীর অনুবাদের চেয়ে নিকৃষ্টও হয় বা অনাধুনিক হয়, আজকের ইংরেজিতে মানায় না–এ রকমও হয়, তাহলেও রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ রবীন্দ্রনাথেরই অনুবাদ। সুরেন ঠাকুরের অনুবাদ ইজ রিভাইজড বাই দ্যা পয়েট। সে বইকে বদলাবার অধিকার আমাদের কারো নেই। সেই ইংরেজি বইয়ের ইমপর্টেন্সটা এবং সেই বই থেকে জর্মন ফরাসি অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ হয়েছে–এইটাই সারা বিশ্বের পারসেপশনে ঘরে-বাইরে। যারা বাংলা জানে না তাদের কাছে ঘরে-বাইরে মানে ওই সেই ইংরেজি অনুবাদটা। সেক্ষেত্রে নতুন এডিশন, সে যত ভালই হোক, আমি ধরে নিলাম এই দু’টো অনুবাদই খুব ভাল, পুরনো অনুবাদের চেয়ে অনেক ভাল, সেটাতে তার নিজস্ব মহিমা থাকতে পারে কিন্তু সেটা ঘরে-বাইরে নয়। লেখক নিজে যেখানে রিভাইজ করছেন, এবং লেখক যেখানে রবীন্দ্রনাথ, তো রিভাইজড বাই দ্য পয়েট আর উদাহরণ-টুদাহরণ প্রমাণ-ট্রমাণ আমরা দেখিয়েছি আমাদের সংস্করণে যে সত্যি যে রিভাইজড, কোথায় কোথায় রিভাইজড হওয়ার দরকার হয়েছে ইত্যাদি।

রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু আপনি তো সম্পাদনা করতে গিয়ে মূলের সঙ্গে যেসব জায়গায় অসঙ্গতি রয়েছে সেগুলো আবার…
দিলীপ কুমার বসু : সেগুলোর সংক্ষিপ্ত একটা চেহারা দিয়েছি। আমি সেদিন আপনার সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে পুরো গল্পটা শেষ করতে পারি নি। ১৯১৫-১৬ তে ‘সবুজপত্র’-এ এটা বের হলো। ১৯১৬ তে উপন্যাসটা বের হলো। উপন্যাসটা যখন বের হলো সবুজপত্র’র পাঠটা বর্জিত হলো। ১৯১৮ তে আবার একটা রিপ্রিণ্ট হলো। এবার ১৯১৬-র পাঠটাই চললো। ১৯১৮-তে মর্ডান রিভিউয়ে এটার ইংরেজি অনুবাদটা সিরিয়ালাইজ শুরু হলো। ১৯১৯-এ ইংরেজি বইটা বের হলো। ১৯১৯-এ ইংরেজি বইটা বেরুবার সময় রবীন্দ্রনাথ রিভাইজ করলেন। রবীন্দ্রনাথ রিভাইজ করছেন, অ্যান্ড্রুজকে বলছেন, তার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। তিনি মুখে মুখে বলছেন, দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ তা লিখে নিচ্ছেন।

রবীন্দ্রনাথ রিভাইজ করতে গিয়ে, আমি খুব সংক্ষেপে বলছি ব্যাপারটা, কারণ আমার বইতে ব্যাপারটা লেখা আছে, উনি দেখলেন যে সর্বনাশ হয়ে গেছে। যেসব বর্জিত হয়েছিল তার কিছু কিছু উনি ফিরিয়ে আনলেন, যেগুলো অত্যন্ত জরুরি। উনার হাতে সময় ছিল না, তাই প্রতি লাইনের তিনি করলেন না। কিন্তু সারগুলো তিনি আনলেন বইয়ের মধ্যে। এটা হচ্ছে ১৯১৯-এ ইংরেজি বই বের হলো। নেক্সট বইটা বের হলো বাংলা ঘরে-বাইরে, এটা ১৯২০। ১৯২০-তে যখন বই বের হল তখন সে সবুজপত্র’র পাঠ ফিরে পেলো। আমি ধরে নিচ্ছি এর থেকে, হার্ড প্রুফ নেই, কিন্তু যা ঘটনাক্রম দাঁড়াল যেই ইংরেজি বইয়ের রিভিশন করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেলেন ভুল হয়ে গেছে, সবুজপত্রের পাঠ বদলানোটা। অতএব সবুজপত্রের পাঠেই ১৯২০তে ফিরে গেল। এবং আজো আমরা যে পাঠ ফিরে পাচ্ছি সেটা হল ১৯২০তে সে পাঠ। অথচ ইংরেজি ঘরে-বাইরে’টা সুরেন্দ্রনাথের সেই ১৯১৬ বা ১৯১৮-তে সেই বইয়ের অনুবাদ। প্রায় সেই অনুবাদ, তার সঙ্গে খানিকটা রিভিশন হলো। এই জিনিসটাই বিস্তারিত করে আমাদের লিখতে হয়েছে ওখানে। (আপনার সম্পাদিত ঘরে-বাইরের ইংরেজিতে–রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ।

রাজু আলাউদ্দিন : আর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তো কিছু কিছু বিতর্ক আমরা শুনতে পাই। যেমন একটা বিতর্ক, যেটা বলা হয় যে, রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করলেন কেন? এটা করা ঠিক হয়েছে কি না?
দিলীপ কুমার বসু : এটা কিন্তু, রাজু আমি স্পষ্ট বলছি, প্রথম আপনার কাছে (গত)কালকেই শুনলাম। এটা হতে পারে যে, এটা আমাদের কূপমণ্ডুকতার কারণে মনে হয়, পূর্ববঙ্গে মানে বাংলাদেশে যে এই রকম একটা মনোভঙ্গি থাকতে পারে সেটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। জানা তো ছিলই না। সকলেই আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথের প্রবল প্রশস্তি গাওয়া হয়েছে উনি বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছেন বলে। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা যে আপত্তিকর হতে পারে, এটা কিন্তু বাংলাদেশের রিঅ্যাকশন, নতুন জানলাম, এখনো চব্বিশ ঘণ্টা যায়ও নি।

রাজু আলাউদ্দিন : এবার আপনি আমাকে বলুন, বিরোধিতা উনি কেন করেছিলেন?
দিলীপ কুমার বসু : এই কারণে করেছিলেন, ওনার মনে হয়েছিল যারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন তারা সবাই বাঙালি। ওনার এই চিন্তার মধ্যে, আমার নিজের বিচারে, একটা দুর্বলতা ছিল। দূর্বলতা এই ছিল–তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি মানে তাতে আসামের অংশ আছে, তাতে বিহার-উড়িষ্যার অংশ আছে, তাঁর মনে কোথাও এ রকম একটা ধারণা ছিল যে, এদের সকলেরই ধাত্রীভাষা হচ্ছে বাংলা। এটা বিহারি, অসমিয়া বা উড়িয়ারা একবারেই মনে করবে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মনে এই ধারণা ছিল যে, কোনো কারণেই হোক, তিনি ভেবেছিলেন বাঙালিদের দু’ভাগ করে দিয়ে ইংরেজ আমাদেরকে দুর্বল করে দিতে চাইছে। তাঁর দেশাত্মবোধ তাঁকে উজ্জীবিত করেছিল এর বিরুদ্ধে যেতে। ভারতবর্ষের কথা যা-ই বলুন, তাঁর কাছে ইমিডিয়েট দেশ ছিল বাংলা। দেশাত্মবোধের রবীন্দ্রনাথের যে এত সংখ্যক গান তার দু-একটি বাদে কিন্তু সবই বাংলার কথা, ঠিক তত ভারতীয় নয়। আর পূর্ববঙ্গে বাংলাদেশের কথা, আমি রিঅ্যাকশনগুলো ইদানিং ফেসবুকে আর কবিতার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, অন্যরকম চমকে চমকে উঠছি। কারণ আমি আমার কূয়াতে ছিলাম, অন্যের কূয়াটার দিকে তাকাইনি। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আমরা অনেক সময় দেখি যে দুই জার্মানি এক হয়ে গেছে, দুই কোরিয়া হয়তো এক হবে, দুই বাংলা কি এক হবে? আমি এটা স্বপ্নের মতো ভাবি। এই স্বপ্নটা একেবারে রোম্যান্টিক স্বপ্ন।
dsc01052.JPG
রাজু আলাউদ্দিন : আপনার কি মনে হয় না, দুই বাংলা কোনো দিন এক হবে?
দিলীপ কুমার বসু : আমি দেখলাম পূর্ব বাংলার লোকেরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ আপত্তি করে যাচ্ছে, কেন এক হবে? বয়েই গেছে! আমি এটা অনুমানই করতে পারি নি। আমি ভেবেছিলাম দুই বাংলার লোকই এইটা চায়। চায় না যে, এটা আমি আবিষ্কার করলাম ফেসবুকে।

রাজু আলাউদ্দিন : এই বাংলার বাঙালিরা কি সেটা চায়?
দিলীপ কুমার বসু : এই বাংলার বাঙালিরা সেটা চায় অনেকেই।

রাজু আলাউদ্দিন : আমি একেবারে ফ্রাংলি জানাতে চাই, এইখানকার এই চাওয়ার পেছনে এবং চাওয়ার পক্ষে যে আচরণ থাকা উচিত সেটা কি আপনি আছে বলে মনে করেন?
দিলীপ কুমার বসু : দেখুন এর মধ্যে নানা সমস্যা আছে। আমি তো সোসলজিস্ট নই। আমি শুধু আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। যেটা ইনসাফিসিয়ান্ট ডাটা। আমি জানি কালকেই যদি দিল্লির মাঠে ফুটবল ম্যাচ ঢাকা মোহামেডান স্পোটিং এবং পাঞ্জাবের জালন্দর স্পোটিংয়ের মধ্যে হয় আমি ইন্সট্যান্টলি ঢাকা মোহামেডানকে সাপোর্ট করবো, আমার ছেলে বোধ হয় করবে না। (এইটা হচ্ছে রিয়ালিটি–রাজু আলাউদ্দিন)। আমি যেই সময় জন্মেছি তাতে বাংলা হচ্ছে আমার দেশ, থিওরিটিক্যালি ভারতবর্ষ আমার দেশ। আমি ভারতবর্ষের একাত্মতা নিয়ে অনেক ভেবেছি, আমার লেখা পড়লেই বুঝতে পারবেন, রাজু আপনি পড়বেন আমার কাব্যোপন্যাসটা, দেখবেন ভারতে পরিভ্রমণ হচ্ছে তাতে। গোরাতে যে ভারতবর্ষ আবিষ্কার আছে, গোরা যে চলে গেল চরঘোষপুরে, এগুলো আমাদেরকে এক্সাইট করে। কিন্তু বিঅন্ড অল থিওরি প্রথমেই হচ্ছে বাঙালি। আসল কথা ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো। অনেক বানানো। তামিলরা তামিল, বাঙালিরা বাঙালি এরকম একটা ব্যাপার আছে। এটাকে আমরা ধুয়ে মুছে ফেলতে চাইছি। কিন্তু এটা থেকেই যায়। আমার মনে হয় আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের আরেকটু কম, তারপরের জেনারেশনের আরেকটু কম, তারপরের জেনারেশনের আরো একটু কম–এ-রকম হবে। কিন্তু আমাদের সময় যারা জন্মেছে আমাদের কাছে আমাদের বাঙালিয়ানা আমাদের ভারতীয়র চেয়ে অনেক বড় অনুভব। এটা সত্যকথা। এই বাংলায় অন্তত।
এগুলো অলস কল্পনা। এর মধ্যে কোনো পলিটিক্যাল সম্ভাবনা আমি দেখতে পাই না। কিন্তু এটা বুকের কথা, একদম বুকের কথা। বুকের কথায় তো আর অনেক সময় লজিক থাকে না।

রাজু আলাউদ্দিন : অনেক ধন্যবাদ দিলীপদা, খুব ভাল লাগলো আপনি সময় দিলেন। আপনাদের সময় নিয়ে, আপনাদের ওই সময়ের ভাবনা এবং আপনার নিজের ভাবনাগুলো আমাদের কাছে জানাবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
দিলীপ কুমার বসু : একটা কথা দিয়ে শেষ করি, এটা একটা পারসোনাল গল্প। (ক্যামেরা)এটা বন্ধ করেও বলতে পারি। (অসুবিধা নেই, বলুন–রাজু আলাউদ্দিন)। মানুষের জীবনের চেতনাগুলো কিভাবে তৈরি হয়। আমার যখন সাড়ে তিন বছর বয়স, তখন আমাদের পাঞ্জাবের দিকে দু’দিক থেকেই ট্রেন লোড অফ ডেড বডিস-এ পর্যন্ত গেছে। ভীষণ গোলমাল হচ্ছে। কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে এটা হয়নি। বাস্তুচ্যুত হয়েছে অনেক, দুই বঙ্গে। হয়তো পূর্ববঙ্গ থেকে বাস্তুচ্যুত হিন্দুদের সংখ্যা অনেক বেশি, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ থেকে, বিহার থেকেও বাস্তুচ্যুত হয়েছে মুসলমানরা, ওখানে গেছে। হিন্দুদের বাস্তুচুতির সংখ্যা বেশি, মুসলমাননের তুলনায়। কিন্তু খুনোখুনিটা ’৪৭-এ তো প্রায় হয়-ই নি, ১৯৫০-এ সে তুলনায় মার্চ মাসের তিনটে দিন একটু বেশি হয়েছিল। চাঁদপুরের ট্রেনে তিন দিন, মানে তিন দিন মিলিয়ে এক হাজারের মতো লোক মারা গেছিল, কাটা পড়েছিল ট্রেনে। এই তিনটে দিনের একটা দিনে আমি নারায়ণগঞ্জ ছাড়ি। ঢাকার তেজপুরে তখন এয়ারপোর্ট ছিল, ওখান থেকে আমরা উঠি। (তেজগাঁয়?-রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ। সেই বয়সে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশে কারো প্লেনে চড়ার কথা নয়। এমনকি ‘আর্থিক’ কথাটাও আনতে পারি। যাই হোক, কিন্তু আমার কাকীমা ছিলেন একেবারেই অল্পবয়সী, আমি ছিলাম শিশু, আমার বৃদ্ধ দাদু আমাদেরকে নিয়ে; বাকিরা তখনো দেশে আছেন, দেশে মানে পূর্ববঙ্গেই আছেন। তো আমাদেরকে কলকাতা নিয়ে গেলেন এবং পনেরো দিনের মাথায় ছোঁ মেরে বাবা দিল্লিতে নিয়ে আসলেন। আমার বাবা এখানে চাকুরি করতেন। আমি ছিলাম উনার ওখানে।
dsc01213.JPG
(পূর্ববঙ্গ) সেখানে আগের দিন আমার ঠাকুরদা বললেন; আমার জমানো অল্প চল্লিশ-পঞ্চাশটা ডাক টিকেট ছিল। সেটা গিটার বলে একটা বাচ্চাদের রঙ করার একটা বাক্স থাকতো তাতে জমাতাম। এরকম আরো সব থাকে না ছোটবেলায় নিজের? আমার দাদু বললেন, এগুলো নিয়ে যেতে দিবে না, এগুলো অ্যালাও করে না। আমার ভীষণ দুঃখ হলো। আমার বাড়ির সামনে একগাদা গাছ ছিল–গোলাপ, বেলি, হাসনুহানা, টগর। মানে গন্ধের একটা হুল্লোড় ছুটে যেত বাড়ির সামনেটায়, নানা সুগন্ধ। সেই গোলাপী গোলাপ গাছের নীচে রোদ্দুরে বসে, আমার মনে আছে, আমি সেই গিটারের বাক্সটা, যেটায় স্ট্যাম্প আছে, আস্তে করে নামিয়ে রাখলাম। সেটাই আমার দেশভাগের বেদনা। আমার ট্রাজেডি। আমার সেই শিশুর কাছে সেটা বড় সম্পদ ছিল।
পরদিন সকালবেলা, আমি কিন্তু একটুও বাড়িয়ে বলছি না এবারের কথাটা, পরদিন আমাকে ভেতরে একটা পাঞ্জাবি পরানো হলো। সেখানে একটা সোনার বোতাম লাগানো হলো, পাঞ্জাবির বোতাম যেটা ছোটবেলা কেউ দিয়েছে অন্নপ্রাশন ইত্যাদিতে। তার ওপর শার্ট এবং হাফ প্যান্ট পরিয়ে আমাকে এরোপ্লেনে ওঠানো হলো। সেটা তো আসলেই অ্যালাও করবে না, না? কিন্তু ওটা লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আমি, রাজু, সত্যি কথা বলছি, সেই দিন থেকে সোনার প্রতি, কারণ আমি তো ওটা চাইনি, সোনার বোতামটা, আমার তো প্রয়োজন ছিলই না, আমার না কোনো দিন টাকা-পয়সার প্রতি ইন্টারেস্ট হয়নি। কোনো দিন না। কোনো সোনা-দানা, কোনো টাকা-পয়সার লোভ সারা জীবনের মতো হয়নি আর। তার মধ্যে এটাও একটা খবর।

পড়ুন মতামত-বিশ্লেষণ বিভাগে প্রকাশিত এই লেখকের লেখা :
একাত্তরের একটি মিছিলের গল্প

Flag Counter


5 Responses

  1. কুমার দীপ says:

    রাজু ভাই,
    খুব ভালো লাগলো। আপনার নেয়া সাক্ষাৎকার পেলেই আমি পড়বার চেষ্টা করি। দিলীপ কুমার বসু’র কথাগুলোর ভেতরে কোনো কৃত্রিমতা নেই বলে মনে হলো। সাহিত্য-ইতিহাস নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ ভাবনাউদ্রেককারি। এমন চিন্তাশীল লেখা সত্যই পড়তে চাই। আর আপনার জানাশোনাও তো দারুণ সমৃদ্ধ। ধন্যবাদ।

  2. অমর্ত্য মুখোপাধ্যায় says:

    দারুণ লাগলো পড়ে!

  3. সাক্ষাৎকারটা পড়লাম। ভালো লাগলো। পড়তে পড়তে মনে পড়ে গেলো শ্রদ্ধেয় দিলীপ কুমার বসু যখন চট্টগ্রাম আসেন সস্ত্রীক তখন আমি একটা বিশাল সাক্ষাৎকার মোবাইলে রেকর্ড করে নিয়েছিলাম, সাক্ষাৎকারটি লেখাও শুরু করেছিলাম রেকর্ড থেকে কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেটা শেষ করা হয়নি। এই সাক্ষাৎকারের কিছু কথা পড়ে মনে পড়ে গেলো সেদিনের কথা। দাদার শৈশব থেকে জীবনের বিভিন্ন সময় নিয়ে বলেছিলেন অকপটে। কবিতা নিয়েই বেশি কথা হয়েছিল। এসেছিল উত্তর আধুনিক প্রসঙ্গটা। সময় করে সেটা শেষ করবো আশা রাখি। কবি সম্পাদক রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ সাক্ষাৎকারটি পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

  4. তারেক মাহমুদ says:

    বাস্তবতা হল বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়া এখন আলাদা সংসার। পশ্চিম বাংলা কোনখানেই আর কর্তৃসত্তা নেই। তো বাংলাদেশের সংগে ঘর বাধতে হলে পশ্চিম বাংলাকে তার বাপের সংসার (ইন্ডিয়া) ছেড়ে আসতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশ আর ‘পূর্ববঙ্গ’ নেই, তার পক্ষে অন্যের সংসারের অংশ হতে যাওয়া সম্ভব নয়। মিলনটা আমাদের খুবই কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু পশ্চিম বাংলা কি এই ত্যাগ স্বীকার করবে!

  5. জাহিদুল ইসলাম says:

    একটি অসাধারণ সাক্ষাতকার, রাজু ভাই। মুগ্ধ হলাম।

    অনেক মূল্যবান একাডেমিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ আছে। কিছু দিকের সাথে একমত, অন্যকিছুর সাথে দ্বিমত পোষণ করাই যায়। উদাহরণ টানতে চাই না। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠে এই সাক্ষাতকারে ধরে আনা শেষ একমুষ্টি অশ্রুজল, যা মুক্তোর মতো জ্বলে। এই বেদনা অন্তরের গহীনে সংক্রমণ ঘটায়। মনকে ভারী করে তোলে।

    দীলিপ দা, ভালো থাকুন আপনি। আপনার বেদনাবোধের মধ্য দিয়ে বাঙালি নতুন করে নিজেদের মধ্যের একাত্মতাকে আবিষ্কার করুক। এই জটিল সাক্ষাতকারের সেটিই হোক ‘সহজপাঠ’:

    “(পূর্ববঙ্গ) সেখানে আগের দিন আমার ঠাকুরদা বললেন; আমার জমানো অল্প চল্লিশ-পঞ্চাশটা ডাক টিকেট ছিল। সেটা গিটার বলে একটা বাচ্চাদের রঙ করার একটা বাক্স থাকতো তাতে জমাতাম। এরকম আরো সব থাকে না ছোটবেলায় নিজের? আমার দাদু বললেন, এগুলো নিয়ে যেতে দিবে না, এগুলো অ্যালাও করে না। আমার ভীষণ দুঃখ হলো। আমার বাড়ির সামনে একগাদা গাছ ছিল–গোলাপ, বেলি, হাসনুহানা, টগর। মানে গন্ধের একটা হুল্লোড় ছুটে যেত বাড়ির সামনেটায়, নানা সুগন্ধ। সেই গোলাপী গোলাপ গাছের নীচে রোদ্দুরে বসে, আমার মনে আছে, আমি সেই গিটারের বাক্সটা, যেটায় স্ট্যাম্প আছে, আস্তে করে নামিয়ে রাখলাম। সেটাই আমার দেশভাগের বেদনা। আমার ট্রাজেডি। আমার সেই শিশুর কাছে সেটা বড় সম্পদ ছিল।

    পরদিন সকালবেলা, আমি কিন্তু একটুও বাড়িয়ে বলছি না এবারের কথাটা, পরদিন আমাকে ভেতরে একটা পাঞ্জাবি পরানো হলো। সেখানে একটা সোনার বোতাম লাগানো হলো, পাঞ্জাবির বোতাম যেটা ছোটবেলা কেউ দিয়েছে অন্নপ্রাশন ইত্যাদিতে। তার ওপর শার্ট এবং হাফ প্যান্ট পরিয়ে আমাকে এরোপ্লেনে ওঠানো হলো। সেটা তো আসলেই অ্যালাও করবে না, না? কিন্তু ওটা লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।…”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.