অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 4 Jul , 2015  

garcia_marquez.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২৪

ঐ সময়টাতে মৃত্যু হয় ভিসিতাসিওনের। অনিদ্রা রোগের ভয়ে সিংহাসন প্রত্যাখ্যান করে স্বাভাবিক মৃত্যুকে বরণ করার সৌভাগ্য হয় তার, আর তার অন্তিম বাসনা ছিল বিশ বছরের বেশী সময় ধরে জমানো বেতন তার বিছানার নীচ থেকে খুঁড়ে বের করে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিায়াকে পাঠিয়ে দেবার যাতে করে সে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই সময় প্রাদেশিক রাজধানীর কাছে জাহাজ থেকে নামার সময় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া মারা গিয়েছে বলে গুজব ওঠায় উরসুলা আর টাকাগুলো বের করার কষ্ট করে না। সেই সরকারি ঘোষণা – যেটা ছিল দুবছরের মধ্যে চতুর্থবার, ছমাস ধরে এটাকেই সত্য বলে ধরে নিয়েছিল সকলে, কারণ কেউই তার সম্পর্কে কিছু জানত না। পরে যখন আমারান্তা ও উরসুলা আগের শোকপর্বের সঙ্গে নতুন একটি শোকের জন্য নিশ্চিতভাবে প্রস্তুত, তখনই অপ্রত্যাশিত খররটা আসে; কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বেঁচে আছে, কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে নিজ দেশের সরকারকে বিব্রত করা ক্ষান্ত দিয়ে অন্যান্য বিজয়ী ফেডেরালিষ্ট কারিবিও প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। প্রতিবারই ওর নাম প্রকাশিত হতো তার গ্রাম থেকে ক্রমেই দূের, দূরান্তরে। পরে জানা যাবে যে সেই সময়ে তার চিন্তা ছিল আলাস্কা থেকে পাতাগোনিয়া পর্যন্ত সমস্ত রক্ষণশীলদের উৎপাটন করার, মধ্য আমেরিকার সমস্ত ফেডারেনিস্টদের একত্রিত করা। অনেক বছর পার হবার পর সান্তিয়াগো দে কুবা থেকে হাতে হাতে এক দুমড়ানো মোচড়ানো চিঠির মাধ্যমে প্রথম সরাসরি ওর খবর পায় উরসুলা।
-“ওকে আমরা চিরকালের জন্য হারিয়েছি”- পড়ার পর হাহাকার করে উরসুলা- “এইভাবে চলতে থাকলে ও বড়দিন পালন করবে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে।”
যাকে কথাটা বলে সে হচ্ছে রক্ষণশীলদের জেনারেল হোসে রাকেল মংকাদা। যুদ্ধ শেষের পর থেকেই সে মাকন্দোর মেয়র আর সেইই চিঠিটা উরসুলার কাছে নিয়ে এসেছিলো। “দুঃখজনক হচ্ছে” মন্তব্য করে জেনারেল মঙ্কাদা-“আউরেলিয়ানো রক্ষণশীলদের একজন নয়”। সত্যিকার অর্থেই সে আউরেলিয়ানোকে শ্রদ্ধা করত। অনেক বেসামরিক রক্ষণশীলদের মতই হোসে রাকেল মংকাদা তার দলকে রক্ষা করতে যুদ্ধে যোগ দেয়, আর সামরিক বাহিনীর লোক না হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ ক্ষেত্রে জেনারেল খেতাব অর্জন করে। তার দলের আরও অনেকের মতই সে ছিল সামরিক বাহিনীর বিরোধী। তার বিবেচনায় সামরিক লোকেরা হচ্ছে নীতিবোধহীন কুড়ে, উচ্চাকাঙ্খী কুচক্রি আর জনগনের বিশৃংখলার সুযোগে নিজেদের উন্নতি করায় ওস্তাদ। বুদ্ধিমান, দরদী, লাল, ভোজনরসিক মোরগের লড়াইয়ের ভক্ত এই লোকই কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দী ছিল। উপকুলের এক বিস্তীর্ন অঞ্চলের সামরিক অফিসারদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সমর্থ হয় সে। একবার কৌশলগত কারণে যখন সে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার দলের কাছে প্লাজা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তখন কর্নেল আউরেলিয়ানোর জন্য দুটো চিঠি লিখে রেখে আসে। ওর একটি চিঠির মধ্যে বিস্তারিতভাবে কর্নেলকে আহবান করে যুদ্ধটাকে যৌথভাবে মানবিক করে তোলার, আর অন্য চিঠিটা ছিল উদারপন্থিদের এলাকায় বসবাসরত তার স্ত্রীর জন্য , যেটাকে সে স্ত্রীর হাতে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করে ওই চিঠিতে। সেই সময় থেকে যুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতেও বন্দি বিনিময়ের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতির ব্যাবস্থা করত দুই কমান্ডার। যুদ্ধ বিরতিগুলো ছিল অনেকটা উৎসবের পরিবেশ যেখানে কর্নেল মংকাদা সুযোগ নিত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে দাবা খেলা শেখাবার। ওদের মধ্যে বিশাল বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এমনকি সামরিক বাহিনী আর পেশাদার রাজনীতিকদের প্রভাবমুক্ত করে দুইদলের জনপ্রিয় নেতাদের নিয়ে এক নতুন মানবতাবাদি দল গঠন করার চিন্তাও করে তারা যেখানে তারা দুই মতবাদের শ্রেষ্ঠ অংশগুলো প্রতিষ্ঠা করবে। যুদ্ধ শেষে যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া চিরস্থায়ী অন্তর্ঘাতের সংকীর্নাবস্থায় পিছলে পড়ছিল তখন মংকাদাকে মাকন্দোর ম্যাজিষ্ট্রেটের পদ দেয়া হয়। সৈন্যদের বদলে মোতায়েন করে সে বেসামরিক পোশাক গায়ে নিরস্ত্র পুলিশ, আর সাধারণ ক্ষমার আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে যুদ্ধে মৃত কিছু উদারপন্থিদের পরিবারের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। মাকন্দোকে এক পৌরসভায় প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় সে আর ফলে সে হয় মাকন্দোর প্রথম মেয়র, আর সে এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি করে যাতে করে যুদ্ধকে মনে হয় অতীতের এক অবাস্তব দুঃস্বপ্ন। যকৃতপ্রদাহ জরে শেষ হয়ে যাওয়া ফাদার নিকানোর বদলে আসেন প্রথমে ফেডারেলিষ্ট যুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত ফাদার কর্নেল যাকে ডাকা হতো এল কাচোররো ( ছোট খোকা)। আম্পারো মসকতের সঙ্গে বিবাহিত ব্রুনো ক্রেসপি- যার খেলনা আর বাদ্যযন্ত্রের দোকানটা ক্রমাগতই উন্নতি করতে করতে ক্লান্ত হচ্ছে না, সে এক থিয়েটার স্থাপন করে আর স্পেনের পর্যটন কোম্পানীগুলো তাদের ভ্রমণসুচীতে সেটা যোগ করে। থিয়েটারটা ছিল উন্মুক্ত আকাশের নীচে কাঠের বেঞ্চী পাতা, গ্রীষ্মের বিভিন্ন মুখোশওয়ালা ভেলভেটের পর্দাঅলা বিশাল হল যেটায় সিংহের মাথার আকৃতি দিয়ে বানানো তিনটি টিকিট কাউন্টার ছিল। সিংহের খোলা মুখ দিয়ে দর্শকদের কাছে টিকিট বিক্রি করা হতো। প্রায় একই সময়ে স্কুলটাকেও পূনঃনির্মান করা হয়। জলাভূমি থেকে আসা এক বর্ষীয়ান শিক্ষক, দন মেলতর এস্কালোনা স্কুলটার ভার গ্রহণ করে। সে ক্লাসের নিরুদ্যম ছাত্রদের হাঁটুতে ভরদিয়ে চুন করা উঠানে হাটাতো, আর বাবা মায়ের অনুমতি নিয়ে ক্লাসে বাচাল ছাত্রদের ঝাল মরিচ খেতে বাধ্য করত। সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের যমজ দুই ছেলে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো (দ্বিতীয়) ও হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো (দ্বিতীয়) তাদের শ্লেট চক আর নিজেদের নামাংকিত এলুমিনিয়ামের ছোটা জগ দিয়ে সবার আগে ক্লাসে যোগ দেয়। নিজের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া নিখুঁত সৌন্দর্যের অধিকারী রেমেদিওস পরিচিত হতে শুরু করে সুন্দরী রেমেদিওস হিসেবে। এতটা সময় উপর্যুপরী শোক ও পুঞ্জিভূত যন্ত্রনা পার করার পরও উরসুলা বার্ধক্যকে ঠেকিয়ে রেখেছে। সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের সাহায্য নিয়ে তার বেকারীটাকে এক ধাক্কায় নতুন শক্তি দান করে, যার ফলে শুধু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সেটা যুদ্ধে খরচ হয়ে যাওয়া বিশাল সম্পদ পুনরুদ্ধার করে তাই নয়, বরঞ্চ শোবার ঘড়ের নীচের লাউয়ের খোলগুলোও ভরে ফেলে সম্পূর্নভাবে। “যতদিন ঈশ্বর আমাকে আয়ু দেয়”- সে বলত “এই পাগলে ভরা বাড়িতে টাকাপয়সার অভাব হবে না।” এভাবেই চলছিল সবকিছু যখন আউরেলিয়ানো হোসে নিকারাগুয়ার ফেডারেল বাহিনী ছেড়ে এক জার্মান জাহাজে যোগ দেয় আর আদিবাসীর মত গাঢ় রঙ ও লম্বাচুলসহ ঘোড়ার মত তাগদ নিয়ে আমারান্তাকে বিয়ে করার গোপন সংকল্প নিয়ে হাজির হয় রান্না ঘড়ে। যখন ওকে ঢুকতে দেখে মুখ খুলে না বললেও সঙ্গে সঙ্গেই আমারান্তা বুঝতে পারে তার ফিরে আসবার কারণ। খাবার টেবিলে একে অপরের মুখের দিকে তাকাবার সাহস করে না। কিন্তু ফিরে আসবার দু সপ্তাহ পরে উরসুলার উপস্থিতিতেই আমরান্তার চোখে চোখ রাখে আর বলে “সারাক্ষণই তোমার কথা অনেক ভেবেছি আমি।” আমারান্তা ওকে এড়িয়ে যেতে থাকে। সবসময়ই চ্ষ্টো করত রেমেদিওস, লা বেইয়ার(সুন্দরী) সাথে সাথে থাকার। তার গাল লজ্জায় অপমানে লাল হয়ে যায় যেদিন তার ভাস্তে জিজ্ঞেস করে কতদিন সে তার হাতের কালো ব্যান্ডেজ পরে থাকার কথা ভাবছে, কারণ সে ভাবে যে কথাটা তার কুমারীত্বকে ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে। প্রথম সে আসার পর থেকে আমারান্তা ভাল করে দরজা লাগিয়ে ঘুমাতো কিন্তু রাতের পর রাত পাশের ঘড়ে তার শান্তিপূর্ন নাক ডাকার আওয়াজে অভ্যস্ত হয়ে সেই প্রতিরোধে শিথিলতা আসে। ফিরে আসার প্রায় দুমাস পর এক ভোরে শোবার ঘড়ে ওর উপস্থিতি অনুভব করে আমারান্তা। ফলে পালাবার বদলে, যেমনটি ভেবে রেখেছিল তেমনিভাবে চিৎকার করার বদলে নিজেকে সে সমর্পণ করে এক প্রশান্ত বিশ্রামের অনুভুতির কাছে। তাকে অনুভব করে মশারির নীচে পিছলে ঢুকে যেতে যেমনটি করত শিশুবেলায়, যেমনটি সে সবসময়ই করে এসেছে, তবুও তার শরীরের ঠান্ডা ঘাম আর দাঁতের বাড়ি রোধ করতে পারে না যখন বুঝতে পারে যে ও এসেছে সম্পূর্ন উলঙ্গ হয়ে। “চলে যা”- ফিসফিসায়, উৎসুক্যের মধ্যে খাবি খেতে খেতে, “চলে যা- নতুবা আমি চিৎকার করব”। কিন্তু আউরেলিয়ানো হোসে জানত কি করতে হবে কারণ সে আর অন্ধকারকে ভয় পাওয়া এক শিশু ছিল না বরঞ্চ সে ছিল এক ব্যারাকের পশু। সেই রাত থেকে পুনরায় আরম্ভ হয় পরিণামবিহীন এক বোবা যুদ্ধের যেটা ভোর পর্যন্ত চলত। “আমি তোর ফুপু” ক্লান্ত আমারান্তা ফিসফিসাত “এটা হচ্ছে প্রায় মায়ের সমান, একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে তোকে আমি বুকের দুধ খাওয়াতে পারিনি”। আধো অন্ধকারে পালিয়ে যেত আউরেলিয়ানো আর আমারান্তা খিল লাগাতো না–এই প্রমাণ পেয়ে ফিরে আসতো পরের ঊষায়, প্রতি বারই আরও বেশী উত্তেজিত অবস্থায়। এক মুহূর্তের জন্যও আমারান্তাকে বাসনা করা থেকে বিরত হয়নি সে। ওকে খুঁজে পেতো সে বিজিত গ্রামগুলোর শোবার ঘড়ে, বিশেষ করে সবচেয়ে পরিত্যক্ত গুলোতে, আর রূপদান করত আহতদের ব্যান্ডেজের শুকনো রক্তের গন্ধে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর আতংকে, সবসময় ও সর্বত্র। দুরত্বের সাথে সাথে শুধুমাত্র স্মৃতিগুলোকে উপরে ফেলার জন্যই যে আমারান্তার কাছ থেকে সে পালিয়ে গিয়েছিল তাই নয়, বরঞ্চ পালিয়েছিল এক উন্মত্ত ক্রোধ নিয়ে যেটাকে তার সহযোদ্ধারা তার সাহস বলে ধরে নিত। কিন্তু সে আমারান্তার ছবিকে যতই যুদ্ধের খোঁয়াড়ে সেধিয়ে দিতো ততই যুদ্ধ পরিণত হতো আমারান্তায়। এভাবেই নিজের মুত্যুর মধ্য দিয়ে আমারান্তাকে শেষ করার উপায় খুজতে খুজতে কাটতো তার নির্বাসন, যতদিন না সে এক জনের কাছে পুরোনো এক গল্প শোনে যেখানে এক লোক এমন এক মেয়েকে বিয়ে করে যে তার ফুপুও হয় আবার জ্ঞাতিবোনও হয়। ফলে তার ছেলে নিজেই হয়ে দাড়ায় নিজের দাদা।
-“ ফুফুকে বিয়ে করা যায়?” আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করে সে।
-“শুধু ফুপুর সঙ্গেই নয়”- উত্তর দেয় এক সৈনিক “আমরা পাদ্রিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি যাতে করে নিজের মাকেও বিয়ে করা যায়।”

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
পনের দিন পর সে ব্যারাক ছেড়ে পালায়। তার স্মৃতিতে যেমনটি ছিল তার থেকে নির্জীব অবস্থায় পায় আমারান্তাকে, ওকে পায় আরও বেশী বিষন্ন ও লাজুক, সত্যিকার অর্থে পরিপক্কতার শেষ অধ্যায়ের ভারে অবনত কিন্তু শোবার ঘড়ের অন্ধকারে সবচেয়ে বেশী জ্বরতপ্ত ও প্রতিরোধের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী হুসিয়ার ও কঠোর: “তুই হচ্ছিস এক জানোয়ার”- আউরেলিয়ানোর পশুসুলভ আচরণের শিকার হয়ে বলত- “পোপের বিশেষ অনুমতি না নিয়ে, অভাগা ফুপুর সঙ্গে যে একাজ করা জায়েয, একথা সত্যি নয়”। আউরেলিয়ানো হোসে রোমে গিয়ে হাটুতে ভর দিয়ে হেটে সাড়া ইউরোপ পাড়ি দিয়ে পনটিফের চপ্পলে চুমু খাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে যাতে করে আমারান্তা তার তুলে ফেলা সেতুটা নামিয়ে দেয়। “শুধু তাই নয়” – তর্ক করে আমারান্তা, “বাচ্চা হলে জন্মায় শুয়োরের লেজ নিয়ে।” এইসব যুক্তি আর্কাদিও হোসের কানে ঢোকে না।
“পিঁপড়ে হয়ে জন্মালেও আমার আপত্তি নেই”- আকুতি করে সে।
এক ভোররাতে, অবদমিত কামনার অসহ্য জ্বালায় ভেঙে পড়ে কাতারিনোর দোকানে যায় সে। সেখানে স্তন ঝুলে যাওয়া মমতাময়ী সস্তা এক মেয়েকে পেয়ে পেটের নিচের অংশটাকে শান্ত করে। অবজ্ঞা করার ওষুধটাকে আমারান্তার উপর প্রয়োগ করার চেষ্টা চালায় সে। এতদিনে শিখতে পারা সেলাইকল প্রশংশনীয় দক্ষতায় চালাতে থাকা আমারান্তাকে বারান্দায় দেখতে পেয়েও তার সঙ্গে কোনো কথা বলত না, আমারান্তার মনে হতো বিশাল এক বোঝা থেকে সে মুক্তি পেয়েছে আর তখন সে নিজেও বুঝতে পারে না কেন আবার চিন্তা করে কর্নেল হেরিনাল্দো মার্কেসের কথা, কেনই বা মনে পরে তার সঙ্গে চাইনিজ চেকার খেলার বিকেলগুলোর স্মৃতিকাতরতার কথা, এমনকি বুঝতেও পারে না কেনইবা তাকে কামনা করে শোবার ঘড়ের পুরুষ হিসেবে। আর যে রাতে অবজ্ঞার মিথ্যে প্রহসনটাকে সহ্য না করতে পেরে আবার আমারান্তার ঘড়ে ফিরে যায়, তখন চিন্তাও করতে পারে না কতটুকু অবস্থান সে হারিয়ে ফেলেছে এরই মধ্যে। অনমনীয় নির্ভুল দৃঢ়তার সাথে আমারান্তা প্রত্যাখ্যান করে তাকে আর চির দিনের জন্য আটকে দেয় দরজার খিল।

আউরেলিয়ানো হোসের ফেরার অল্প ক’মাস পর জেসমিনের সুগন্ধি মাখা পাঁচ বছর বয়সী একছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এক উচ্ছল রমনী বাড়িতে এসে হাজির হয়। সে নিশ্চিত করে যে শিশুটা কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার ছেলে আর নিয়ে এসেছে যাতে করে উরসুলা ওকে ব্যাপটাইজ করে। নামবিহীন ছেলেটার জন্মরহস্য নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে না: যে বয়সে কর্নেলকে বরফ চেনাতে নেয়া হয়েছিল ছেলেটা ছিল অবিকল একই রকম দেখতে। মেয়েটা বর্ণনা করে, তার জন্ম হয়েছে খোলা চোখ নিয়ে লোকজনকে বড়দের মত পরখ করতে থাকো অবস্থায় আর ওর পলকহীন চোখে যেভাবে সবকিছুর দিকে তাকাতো তা দেখে ভয় পেয়ে যেত মেয়েটা। “অবিকল একইরকম” বলে উরসুলা- “একমাত্র যা বাকি আছে তা হচ্ছে কেবল দৃষ্টি দিয়ে চেয়ারগুলোকে ঘোরানোর ক্ষমতা।” ওকে ব্যাপ্টাইজ করা হলো আউরোলিয়ানো নামকরণ করে আর মায়ের পদবী দিয়ে কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত না বাবা তাকে ছেলে বলে স্বীকৃতি না দেয় আইনত সে বাবার পদবী ধারণ করতে পারে না। জেনারেল মংকাদা হলো গডফাদার (ধর্মপিতা)। যদিও আমারান্তা চাইছিল তাকে মানুষ করার ভার দিতে কিন্তু ছেলেটার মা তাতে দ্বিমত করে।
যেমনটি করে ভাল জাতের মোরগের সামনে মুরগীগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়, তেমনি করে কুমারী মেয়েদেরকে যোদ্ধাদের শোবার ঘড়ে পাঠাবার রীতিটা উরসুলার জানা ছিল না, কিন্তু ঐ একই বছরের মধ্যে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার আরও নয়টি ছেলেকে নিয়ে যাওয়া হল ব্যাপটাইজ করানোর জন্য। সবচেয়ে বড় জন ছিল গাঢ় বর্ণ সবুজ চোখের অদ্ভুত এক ছেলে যে বাবার বংশের কিছুই পায়নি, তার দশ বছরের বেশী বয়স হয়েছে। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সব বয়সের শিশুদের ও সব বর্নের, কিন্তু সকলেই ছিল ছেলে আর সবার চেহারাতেই ছিল এক নিঃসঙ্গতার ছাপ, ফলে তাদের পিতৃপরিচয় সম্মন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এই দলের মধ্যে শুধু মাত্র দুজনই ছিল সকলের থেকে পৃথক। একজন, বয়সের তুলনায় সে ছিল অনেক বর্ধিষ্ণু, যে নাকি ফুলদানি ও থালাবাটিগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো করে । মনে হয় তার হাত যা ছোঁয় তাই ভেঙে ফেলার এক ক্ষমতা আছে। আর একজন ছিল মায়ের মত বড় বড় চোখের স্বর্নালী চুলের একে ছেলে। যে মেয়েদের মত লম্বা ও কোকড়া চুল রেখে দিয়েছে। সে স্বাভাবিকতার সাথে ঘড়ে ঢোকে যেন এ বাড়িতেই বড় হয়েছে আর সরাসরি উরসুলার শোবার ঘড়ের একসিন্দুকের সামনে দাড়িয়ে দাবি করে “ কলের দম দেয়া নর্তকীটা দাও।” উরসুলা চমকে ওঠে। সিন্দুকটা খুলে প্রাচীন আমলের আর ধুলোমাখা মেলকিয়াদেসের সময়ের জিনিসগুলোর মধ্যে থেকে খুঁজে পায়, একজোড়া লম্বা মোজা দিয়ে মুড়িয়ে রাখা এক কলের নর্তকী যেটা নাকি কোনো এক সময় পিয়েত্রে ক্রেসপি বাড়ি নিয়ে এসেছিল, আর যেটার কথা কারোরই মনে ছিল না। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে মায়ের উপাধি আর আউরেলিয়ানো নামকরণ করে ব্যাপটাইজ করা হয়, লম্বায় যুদ্ধচলাকালিন সময়ে ও চওড়ায় যুদ্ধক্ষেত্রের সমান বিস্তৃতির এলাকার ভিতর বীজ বপন কোরে করনেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যে সকল পুত্র সন্তানদের জন্ম দিয়েছে তাদের: সতেরজন। প্রথমদিকে উরসুলা ওদের পকেটভর্তী করে টাকা দিত, আমারান্তা রেখে দিতে চাইত লালন করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদেরকে তারা সীমিত করে, একটি করে উপহার দিয়ে আর ব্যাপটাইজ করার সময় ধর্মমাতা হয়ে। “ওদেরকে ব্যপটাইজ করে আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করেছি।”- একটা খাতায় তাদের নাম মায়েদের ঠিকানা জন্মস্থান ও জন্ম তারিখ লিখে বলত উরসুলা।

“আউরেলিয়ানো অবশ্যই ভাল করে ওদের হিসেব রেখেছে, সুতরাং সে এসেই যা করার করবে”। দুপুরে খাবার সময় জেনারেল মংকাদার সঙ্গে এই বর্ধিষ্ণু ও বিচলিত হবার মত ব্যাপারটা নিয়ে মন্তব্য করার সময় জানায় যে তার ইচ্ছে কোনো একদিন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যেন ফিরে আসে বাড়িতে; তার সকল পুত্রদের জড়ো করতে।
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


3 Responses

  1. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    দুর্দান্ত। মায়ের অপেক্ষা, পিতা ফিরে এসে পুত্রদের জড়ো করবেন! সতেরো পুত্র।

    এই কিস্তিতেও রয়ে গেলো মুদ্রণপ্রমাদ। একদম কিস্তির দ্বিতীয় পঙ্কতিতেই। “অনিদ্রা রোগের ভয়ে সিংহাসন প্রত্যাখ্যান করে স্বাভাবিক মৃত্যুকে বরণ করার সৌভাগ্য হয় তার, আর তার অন্তিম বাসনা ছিল বিশ বছরের বেশী সময় ধরে জমানো বেতন তার বিছানার নীচ থেকে খুঁড়ে বের করে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিায়াকে পাঠিয়ে দেবার যাতে করে সে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।”

    অনুবাদকের জন্য টুপিখোলা অভিনন্দন।

  2. লোকমান হেকিম says:

    মূল স্প্যানিশ থেকে দুর্দান্ত একটি অনুবাদ হচ্ছে।
    আমি জিএইচ হাবীব কৃত বাংলা অনুবাদ এবং গ্রেগরি রাবাসা কৃত ইংরেজি অনুবাদ দুটোই পড়েছি।
    এবং বুঝতে পারছি যে, বর্তমান অনুবাদটিতে আমরা কিছু পার্থক্য অনুভব করছি।
    তবে, অনুবাদকের প্রতি অনুরোধ থাকবে, তিনি যেন ভাষার প্রবাহ আরেকটু গতিশীল রাখার চেষ্টা করেন।
    এই পরিশ্রম সাধ্য অনুবাদের জন্য বাংলাভাষী সকল পাঠকদের পক্ষ হতে অনুবাদকের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন।

  3. Mostafa Tofayel says:

    The word ‘ solitude’ is the English translation of the Spanish word ‘Soledad’ , which means an environment meant for the blissful life of a certain innocent group of men and women who prefer living in a land of natural abundance, to the busy hum of industries and politics. It is significantly a life of primitive innocence, where there is no sensualist lust for carnal pleasure and sin.
    In the novel, entitled ‘One Hundred Years of Solitude’, Gabriel does not speak of loneliness or arbitrary seclusion in the life of a man or group of men and women. He rather places his main characters in a remote village called Macondo , which has similarity with the biblical heaven or the Eden Garden. It is completely free from the quarrelsome, selfish and greedy life of the self-seeking modern society. It is a place of peace, bliss and magic. It is a place, initially intended to be far away from the common world where there is “the ceremony of innocence” ,told by W.B.Yeats, in his poem, ‘The Second Coming’. In this novel, Macondo is a village situated by the side of the sea, away from the society. Jose Arcadio Buendia is the guardian of a family. He has a wife named Ursula. Jose Arcadio Buendia sets up the placement of the houses in Macondo in such a way that from all of them one could reach the river and draw water with the same effort. Streets there are lined up with such good sense that no house gets more sun than another during hot time of day. It is an ideal village consisting of three hundred inhabitants. It is a truly happy village and an ideal one where no one is over thirty years of age and where no one has died. Jose Arcadio has filled up the village with various singing birds like canaries, bee-eaters and readbreasts.
    The novel can be seen as a parable for the human quest for knowledge. Jose Arcadio represents Adam in this novel. In the Bible, Adam’s job is to name the animals, exercising his power over them. In establishing the village called Macondo, Jose Arcadio Buendia does the same thing. Before the priest’s arrival, shame was unknown in Macondo, like the life-style of Adam and Eve before their fall from heaven. The inhabitants of Macondo, in the novel, are subject to natural laws only. They worship God without a church. Father Nicanor’s arrival disturbs that innocence and life in solitude.
    In the novel, Ursula, the mother-grandmother-great grandmother and great great grandmother lives for about one hundred years with her firm choice for the ancient solitude of the village. Remedios the Beauty symbolizes beautiful innocence as well as absence from anything carnal and sensual. When solitude is lost in Macondo due to the intrusion of the outsiders, politicians, and the priests she simply flies upwards and disappears, as if summoned back to the heaven.
    Macondo , the ideal village in solitude, lives upto one hundred years in the novel. Here lies the significance .We see that the novel speaks of Gabriel Garcia Marquez’s choice for peace and bliss and innocence. External disturbances come and shatter all peace and innocence there.The novel provides the readers with an idea about the initial stage of human civilization.
    Thus, the title-‘One hundred Years of Solitude’ is quite justified and appropriate.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.