অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 1 Jun , 2015  

garcia_marquez.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২২

বাড়িটা তখন শিশুদের দিয়ে ভরে গিয়েছে। আর্কাদিওর মৃত্যুর পাঁচ মাস পর জন্ম দেয়া দুই যমজ ছেলেসহ তার বড় মেয়ে সান্তা সোফিয়া দেলা পিয়েদাদ-কে উরসুলা অনেক আগেই বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতের শেষ ইচ্ছের বিরুদ্ধেই “রেমেদিওস” নাম দিয়ে মেয়েটাকে ব্যাপটাইজ করা হয়। “আমি নিশ্চিত যে এটাই আর্কাদিও বলতে চেয়েছে। তর্ক করে সে, “ওর নাম উরসুলা রাখা হবে না। কারন উরসুলারা জীবনে অনেক কষ্ট ভোগ করে।” যমজ দুজনের নাম রাখা হয় হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ও আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। আমারান্তা ওদেরকে দেখাশুনার দায়িত্ব নেয়। বসবার ঘরে কাঠের ছোট ছোট টুল বসিয়ে প্রতিবেশীদের অন্যান্য বাচ্চাদের নিয়ে সে কিন্ডারগার্টেন স্থাপন করে। যখন কর্নেল আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ফিরে আসে, আতশবাজি, ঘন্টা ধ্বনি আর বাচ্চাদের কোরাস গানের মাধ্যমে স্বাগতম জানানো হয় তাকে। দাদার মত লম্বা, বিপ্লবী আফিসারদের মত পোশাক পরা আউরেলিয়ানো হোসেকে সামরিক কায়দায় সম্মান জানায় তারা।

সব খবরই ভাল খবর ছিল না। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার পালানোর একবছর পর হোসে আর্কাদিও আর রেবেকা আর্কাদিওর বানানো এক বাড়িতে উঠে যায় বাস করার জন্য। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়ে হোসে আর্কাদিওর হস্তক্ষেপের কথা কেউই জানত না। প্লাজার সবচেয়ে ভালো কোনায় তিনটে রবিন পাখী যে আলমন্ড গাছে বাসা বেঁধেছে সে গাছটার ছায়ায় অবস্থিত বাড়িটায় ছিল অতিথিদের জন্য এক বড় দরজা আর আলো আসবার জন্য চারটে জানালা। বাড়িটার দরজা ছিল অতিথিদের জন্য অবারিত। রেবেকার পুরোনো বান্ধবীরা, মসকতেদের চার কুমারী বোনসহ বেগনীয়া ভরা বারান্দায় অনেক বছর আগে ছেদ পড়া এমব্রয়ডারির আসর পুনরায় আরম্ভ করে। রক্ষনশীল সরকার কর্তৃক মালিকানার স্বত্ব অনুমোদিত জোড়পূর্বক দখলকৃত জমিগুলো হোসে আর্কাদিও ভোগ করতে থাকে। ওকে দেখা যেত প্রতি বিকেলেই তার দোনালা শটগানে দড়ি দিয়ে ঝোলানো খরগোশ ঝুলিয়ে, সঙ্গে শিকারী কুকুরগুলো নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি ফিরতে। সেপ্টেম্বরের এক বিকেলে, আসন্ন ঝড়ের হুমকির মুখে অন্যসব দিনের চেয়ে আগেই বাড়ি ফেরে সে। খাবার ঘড়ে রেবেকাকে সম্ভাষণ জানিয়ে, উঠোনে কুকুরগুলোকে বেঁধে, খরগোশগুলোকে পরে লবন মাখানোর জন্য রান্নাঘড়ে ঝোলায় আর কাপড় বদলাতে যায় শোবার ঘড়ে। রেবেকা পরে জানায় যে যখন তার স্বামী শোবার ঘড়ে ঢুকে সে বাথরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিয়েছিল, ফলে সে কিছুই জানতে পারেনি। তার এই উক্তি বিশ্বাস করা কঠিন হলেও এর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য আর কিছু ছিল না। আর তাছাড়া রেবেকাকে যে লোকটা সুখী করেছিল তাকে খুন করার কোনো মোটিভ রেবেকার মধ্যে কেউ খুঁজে পায়নি। এটাই ছিল মাকন্দোতে সম্ভবত একমাত্র রহস্য যার সত্য কখনই উদঘাটিত হয়নি। হোসে আর্কাদিও শোবার ঘড়ের দরজাটা বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলের এক বিকট আওয়াজে বাড়িটা কেঁপে ওঠে। সুতোর মতন রক্তের এক ধারা দরজার নীচ দিয়ে বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে , পরে রাস্তায় বেরিয়ে উচুনিচু চত্বরগুলো সোজা পার হয়ে সিড়ি বেয়ে নীচে নেমে উঠে পরে পাঁচিলের উপর। পরে তুর্কদের সড়ক ধরে এগিয়ে গিয়ে এক কোনায় এসে প্রথমে ডানে পরে বায়ে বাঁক নিয়ে বুয়েন্দিয়ার বাড়ির দিকে সরাসরি এগিয়ে বন্ধ দরজার নীচ দিয়ে ঢোকে যাতে করে কার্পেটে রক্তের দাগ না লাগে। একই কারণে অতিথিদের বসার ঘড়ের দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে অন্য বসার ঘর পার হয়ে, বড় একটা বাঁক নিয়ে খাবার টেবিল এড়িয়ে বারান্দা ধরে এগুতে থাকে আমারান্তার চেয়ারের নীচ দিয়ে, যেখানে আউরেলিয়ানো হোসেকে অংকের এক পাঠ দেয়ায় ব্যাস্ত আমারান্তার অলক্ষে গুদামে ঢুকে হাজির হয় রান্না ঘড়ে, যেখানে উরসুলা পাউরুটি বানানোর জন্য ছত্রিশটি ডিম ভাঙ্গার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

“হায় খোদা”-চিৎকার করে উরসুলা। রক্তের সুতোর উৎপত্তি নির্ণয়ের ইচ্ছেয় ওটা ধরে উল্টোদিকে অনুসরণ করে ভাঁড়ার পেরিয়ে বেগনিয়ার ঘেড়া বারান্দা, যেখানে আউরেলিয়ানো নামতা পড়ছিল তিন আর তিন ছয়, ছয় আর তিন নয় সেটা পেড়িয়ে, খাবার ও বৈঠক ঘড়গুলোর মধ্যে দিয়ে রাস্তায় নেমে সোজা এগিয়ে প্রথমে ডানে পরে বায়ে বাঁক নিয়ে তুর্কদের রাস্তায় গিয়ে নামে, তার গায়ে তখনও বেকিং করার এপ্রন আর হাতে বানানো চপ্পল। এসমস্ত ব্যাপারে গুরুত্ব না দিয়ে সে এগিয়ে প্লাজায় গিয়ে পড়ে আর সেখান থেকে ঢুকে পরে এমন এক বাড়ির দরজা দিয়ে যে বাড়িতে সে কখনই ঢোকেনি; শোবার ঘড়ের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দেয়ায় পোড়া বারুদের গন্ধে তার দম বন্ধ হয়ে আসে আর কেবল মাত্র খুলে রাখা লম্বা মোজার উপর মুখ থুবরে পড়ে থাকা অবস্থায় পায় হোসে আর্কাদিওকে, আর আবিস্কার করে হোসে আর্কাদিওর ডান কান থেকে বের হওয়া রক্তের সুতোর উৎপত্তি। তার শরীরে কোনো ক্ষত খুঁজে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় না অস্ত্রটাও। এমনকি লাশের গা থেকে বারুদের গন্ধটা সরানোও অসম্ভব হয়ে পরে। সাবান আর ছোঁবা দিয়ে তিনবার ধুয়ে প্রথমে লবন আর ভিনিগার ঘষা হয় লাশে, পরে ছাই আর লেবু মেখে তরল ক্ষারের পিপেতে ভরে ছয় ঘন্টা রেখে দেওয়া হয়। লাশটাকে তারা এমনভাবে ঘষে যে তার গায়ের আরবী অক্ষরের উল্কিগুলো বিবর্ন হতে শুরু করে। পড়ে যখন তারা নিরুপায় হয়ে গোল মরিচ, জিরে আর তেজপাতা দিয়ে কম আঁচে সিদ্ধ করার কথা ভাবছে ততক্ষণে লাশে পচন ধরতে শুরু করায় দ্রুত দাফন করতে বাধ্য হয়। এক বায়ুরোধক দুই মিটার দশমিক ত্রিশ সেন্টিমিটার লম্বা এবং এক মিটার দশমিক দশ সেন্টিমিটার চওড়া, ভিতর দিকে লোহার পাত দিয়ে মজবুত করে লোহার বল্টু লাগানো বিশেষভাবে তৈরি কফিনে লাশটাকে বন্ধ করা হলেও যে জায়গায় কবর দেয়া হয়েছে তার রাস্তাগুলোতে গন্ধ পাওয়া যেত বারুদের। যকৃত ফুলে ঢোল হওয়া ফাদার নিকানোর বিছানায় শুয়ে শুয়েই আশির্বাদ করেন। যদিও পরের কয়েক মাসের মধ্যেই শক্ত দেয়াল তুলে কবরটাকে মজবুত করে চাপ ধরা ছাই, কাঠের গুড়া আর চুন ফেলে ওরা , তবুও পরের অনেক বছর গোরস্থানে বারুদের গন্ধ থাকে, যতদিন না কলা কোম্পানীর ইঞ্জিনিয়াররা এসে কংক্রিট দিয়ে সম্পূর্নভাবে সীল করে দেয় কবরটাকে। লাশটা বের করার প্রায় সাথে সাথেই রেবেকা তার ঘড়ের দরজাবন্ধ করে এক ঘৃণার পুরু খোলের মধ্যে ঢোকায় নিজেকে। জ্যান্ত কবর দেয় সে তাকে আর জাগতিক কোন প্রলোভনই সেটাকে কখনোই ভাঙ্গতে পারে নি। শুধুমাত্র একবারই প্রাচীন আমলের রুপোলী জুতো পরে সুক্ষ্ন ফুলের হ্যাট পরে রাস্তায় বেরিয়েছিল সে যেবার গ্রামে এক পর্যটক ইহুদি এসে এমন উত্তপ্ত অবস্থার সৃষ্টি করেছিল যে পাখিরা জানালার তার ভাঙ্গতো ঘড়ে ঢুকে পরার জন্য। শেষবার তাকে কেউ জীবন্ত অবস্থায় দেখতে পায় যখন দরজা ভেঙে চুরি করতে আসা চোরকে সে এক গুলিতে মেরে ফেলে। শুধুমাত্র বিশ্বস্ত চাকরানী আরহেনিদা ছাড়া কেউই তার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখে নি। এক সময় শোনা যাচ্ছিল যে সে নিজের জ্ঞ্যাতিভাই বিবেচনা করা এক বিশপকে চিঠি লিখতো কিন্তু কেউই বলেনি সে উত্তর পেত কিনা। সাড়া গ্রাম তাকে ভুলে যায়।
বিজয়ী হয়ে ফিরে এলে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে খুব একটা উৎসাহ পায় না। কোনরকম প্রতিরোধ ছাড়াই সরকারী সৈন্যদল প্লাজা ছেড়ে চলে যাওয়ায় উদারপন্থী লোকজনের মধ্যে বিজয়ের এক মিথ্যে ভ্রমের সৃষ্টি হয় যাকে ভেঙে দেয়া সঙ্গত মনে করে না সে, কিন্তু বিপ্লবীরা সত্যটা ঠিকই জানতো আর সবচেয়ে বেশী জানতো কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া। যদিও এই সময়ে তার অধীনে পাঁচ হাজারের ও বেশী সৈন্য ছিল আর উপকুলীয় দুটো রাষ্ট্র শাসন করত তবুও ভাল করেই জানত তার পিঠ ঠেকে আছে সমুদ্রে। আর সে এমন এক গোলমেলে রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে ঢুকে পরেছে যে সে যখন সৈন্যদলের গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত গীর্জার চূড়ার পুনঃনির্মানের নির্দেশ দেয় তখন রোগশয্যা থেকে ফাদার নিকানোর মন্তব্য করেন “কি হাস্যকর! খৃষ্টের বিশ্বাসের রক্ষকরাই ধ্বংশ করে গীর্জা আর ম্যাসনরা তা মেরামত করতে পাঠায়।” এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতির এক পথ খুঁজে পেতে ঘন্টার পর ঘন্টা সে কাটিয়ে দিত টেলিগ্রাফ অফিসে অন্যান্য প্লাজার প্রধানদের সঙ্গে আলাপ করে। কিন্তু প্রতিবারই বেরুত আরও নিশ্চিত হয়ে যে যুদ্ধটা স্থবিরাবস্থায় এসে পৌঁছেছে। যখন উদারপন্থিদের নতুন বিজয়ের সংবাদ আসত সেটা খুব উল্লাসের সঙ্গে ঘোষণা করা হলেও মানচিত্রে সে দেখতে পেত সত্যিকার অবস্থা; আর বুঝে যেত যে তার সৈন্যরা জঙ্গলের গভীরে ঢুকে ম্যালেরিয়া আর মশার বিরুদ্ধে যুঝে এগুচ্ছে বাস্তবতার উল্টো দিকে। “ ‘আমরা সময় নষ্ট করছি’- অভিযোগ করত অফিসারদের কাছে। আমরা সময় নষ্ট করছি আর ওদিকে পার্টির হারামীরা এক আসন-এর জন্য ভিক্ষে করেছে। “ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে যে ঘড়ে ছিল সেই একই ঘড়ে নীদ্রাহীন কাটিয়ে দিত ঝোলানো হ্যামকে চিৎ হয়ে শুয়ে। মনের চোখে দেখত বরফ শীতল প্রভাতে কান অবধি ঢাকা কালো কোট পরিহিত উকিলরা রাষ্ট্রপতি ভবন ত্যাগ করছে হাত মর্দন করতে করতে, আর ফিসফিসিয়ে কথা বলতে বলতে আশ্রয় নিচ্ছে ভোরের বিষন্ন ক্যাফেগুলোতে, অনুমান করতো: যখন প্রেসিডেন্ট হ্যাঁ বলেছিলেন তখন কি বলতে চেয়েছেন যখন না বলেছিলেন তখনই বা কি বোঝাতে চেয়েছেন আর যখন সম্পূর্ন অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলেছিলেন তখনই বা কি চিন্তা করছিলেন, আর সেই মুহূর্তে মশা তারাতে তাড়াতে, পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আসন্ন ভীতিপ্রদ ঊষা অনুভব করতে করতে তাকে আদেশ করতে হবে তার লোকদের সমুদ্রে ঝাপ দিতে।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
অনিশ্চয়তার এক রাতে যখন পিলার তেরনেরা উঠোনে বারান্দায় বসে সৈন্যদের সঙ্গে গান গাইছে, সে তাকে তাস দেখে ভবিষ্যত বলতে বলে। “সাবধানে কথা বল”- তিন বার তাস বিছিয়ে আবার গোটানোর পর একমাত্র এটাই স্পষ্টভাবে বের করতে পারে পিলার তেরনেরা। “ জানি না এর মানে কি কিন্তু সংকেতটা খুবই পরিষ্কার যা বলবে খুব সাবধানে বলবে”। দুদিন পর এক আর্দালির হাতে কেউ একজন এক মগ চিনি ছাড়া কফি দেয়। সেই আর্দালী সেটাকে আরেক আর্দালির হাতে দেয় আর সে দেয় আরেকজনকে, এভাবে সেটা এসে পৌঁছায় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার অফিসে। কারও কাছে সে কফি চায় নি, কিন্তু সামনেই ছিল বলে কর্নেল পান করে কফিটা। ওটাতে একটা ঘোড়াকে মেরে ফেলার মত পর্যাপ্ত ন্যক্স ভোমিকা (এক ধরনের বিষ) ছিল। যখন তাকে বাড়ি নেয়া হলো তখন তার শরীর শক্ত আর বাঁকা হয়ে গিয়েছিল আর দুই পাটি দাঁতের মধ্যে পরে জিহ্বা গিয়েছিল কেটে। উরসুলা মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বমি হওয়ার দাওয়াই দিয়ে ওর পাকস্থলী পরিষ্কার করিয়ে শরীরটাকে গরম কম্বল চাপা দেয় সে; আর পান করায় দুদিন ধরে ডিমের সাদা অংশ যতক্ষন পর্যন্ত না শরীর তার স্বাভাবিক তাপমাত্রা ফিরে পায়। চতুর্থদিনে বেরিয়ে আসে সমস্ত বিপদ থেকে। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে উরসুলা আর অন্য অফিসারদের চাপে পরে আরও এক সপ্তাহ বিছানায় কাটায় কর্নেল। শুধুমাত্র তখনই সে জানতে পারে যে তার লিখা পদ্যগুলো পোড়ানো হয় নি। “আমি তাড়াহুড়ো করে কিছুই করতে চাইনি” -ব্যাখ্যা দেয় উরসুলা। “সেই রাতে যখন এগুলো দিয়ে চুলো ধরাতে যাচ্ছিলাম” তখন মনে হলো লাশটা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভাল।” রেমেদিওসের ধুলোভরা পুতুলগুলোর মাঝে, আরোগ্য লাভের কুয়াশা মাখা সময়ে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া নিজের পদ্যগুলোর মধ্যে খুঁজে পায় তার অস্তিত্বের তাৎক্ষনিক নিশ্চয়তা। আবার লিখতে বসে সে। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে এক পরিণতিহীন যুদ্ধের কিনারায় দাড়িয়ে ছন্দোবদ্ধ পদ্যের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রান্তসীমার অভিজ্ঞতাগুলোকে ফুটিয়ে তোলে সে। ফলে তার চিন্তাগুলো এতই পরিস্কার হলো যে সে সেগুলোকে উল্টেপাল্টে খতিয়ে দেখতে পারে। এক রাতে প্রশ্ন করে কর্ণেল হেরিনেল্দো মার্কেজকে:
-“একটা কথা বল তো কম্পাদ্রে (বন্ধু অর্থে): কেন যুদ্ধ করছিস তুই”?
– “কেন নয়, কম্পাদ্রে”- উত্তর দেয় কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেজ-:“ মহান উদার পন্থিদের জন্য” -“ভাগ্যবান তুই, কারণটা জানিস” – উত্তর দেয় সে- “ আমার কথা যদি বলি, আমি যুদ্ধ করছি আত্মসম্ভ্রমের কারণে।” “এটা ভাল নয়” -বলে কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেজ। তার এই উদ্বিগ্নতা উপভোগ করে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, “অবশ্যই” – বলে। “কিন্তু কেন যে যুদ্ধ করছি তা না জানার চাইতে অন্তত এটা ভাল।” ওর চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে যোগ করে: “অথবা তোর মত যুদ্ধ করার চাইতে, যে যুদ্ধটা কারও জন্যই কোনো অর্থ বহন করে না।”
যতক্ষণ পর্যন্ত না দলের নেতারা জনসম্মুখে “সে ডাকাত বৈ কিছু নয়” ঘোষণাটা প্রত্যাহার না করে ততক্ষণ পর্যন্ত তার আত্মমর্যাদা তাকে দেশের অভ্যন্তরের সশস্ত্র দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা থেকে বিরত করে। অবশ্য সে জানতো, যখনই এইসব দ্বিধা একপাশে সরিয়ে রাখবে, তখনই যুদ্ধের দুষ্টচক্রকে ভেঙে ফেলতে পারবে। আরোগ্য লাভের সময়টা তাকে চিন্তা করার অবকাশ দেয়। সুতরাং সে উরসুলাকে রাজী করায় তার মাটির নীচে পুঁতে রাখা উত্তরাধিকারের অবশিষ্টাংশ আর তার সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ তার হাতে তুলে দিতে। মাকন্দোর সামরিক এবং বেসামরিক নেতা হিসেবে কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেজেকে ঘোঘণা করে দেশের অভ্যন্তরস্থ বিদ্রোহীদলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে যায় সে।
কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেজ যে শুধুমাত্র কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ছিল তাই নয়, উরসুলাও তাকে বরণ করত পরিবারের একজন হিসেবে। নরম স্বভাবের ভীরু ভঙ্গুর আর সহজাত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষটি সরকার চালনার চাইতে যুদ্ধের জন্যই ছিল বেশী উপযুক্ত। তার রাজনৈতিক উপদেষ্টারা সহজেই তাকে তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায় জড়িয়ে ফেলত। যেরকমটি কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া স্বপ্ন দেখত: বৃদ্ধ বয়সে সোনার মাছ তৈরী করতে করতে মারা যেতে; মাকন্দোতে ঠিক একই রকম গ্রামীন শান্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয় সে। বাবা মা’র সঙ্গেই বসবাস করলেও উরসুলার কাছেই সপ্তাহে দু তিন বার দুপুরের খাওয়াটা সারত। উরসুলার সম্মতি নিয়ে, আউরেলিয়ানো হোসেকে পুরুষ হিসেবে গঠন করার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় এবং প্রাথমিক সামরিক শিক্ষা দেয় সে আর তাকে নিয়ে যায় ব্যারাকে, সেখানে কয়েক মাসব্যাপী কাটাতে। অনেক বছর আগে যখন হেরিনেল্দো মার্কেজ – ছিল প্রায় এক শিশু, তখন আমান্তার প্রতি তার প্রেম নিবেদন করেছিল। আমারন্তা তখন পিয়েত্র ক্রেসপির প্রতি এক পাক্ষিক প্রেমে এতই আপ্লুত ছিল যে সে তাকে হেসে উরিয়ে দেয় । হেরিনেল্দো মার্কেজ অপেক্ষা করে। একবার জেল থেকে আমরান্তাকে তার বাবার নামের অাদ্যাক্ষর লেখা এক ডজন বাতিস্তা (মিহি সুতী কাপড়) রুমাল বানানোর অনুরোধ করে এক চিরকুট পাঠায়। টাকাও পাঠায় চিরকুটের সঙ্গে। সপ্তাহ খানেক পর আমারান্তা এমব্রয়ডারি করা এক ডজন রুমাল নিয়ে জেলখানায় যায়। টাকাগুলোও সঙ্গে করে নিয়ে যায় ফেরৎ দিতে, আর কয়েক ঘন্টা কাটিয়ে দেয় অতীত দিনের গল্প করতে করতে। “যখন বের হব তোমাকে বিয়ে করব আমি” বিদায়কালে বলে হেরিনেল্দো মার্কেজ। আমরান্তা হেসে ফেলে ঠিকই, কিন্তু বাচ্চাদের পড়ানোর সময় তার কথা ভাবতে থাকে আর কৈশোরে পিয়েত্র ক্রেস্পির প্রতি যে ভালবাসা ছিল, তার প্রতি সেই একই রকম প্রেম জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। শনিবার কারাগারে দর্শনার্থীদের দিনগুলোতে বাড়ির সামনে দিয়ে যেত হেরিনেল্দো মার্কেজের বাবা মা’রা আর আমারান্তা তাদের সঙ্গী হতো। ঐ রকমেরই এক শনিবারে উরসুলার কাছে ধরা পরে যায় রান্না ঘড়ে চুল্লীর সামনে দাড়িয়ে বিস্কুটগুলো বেরিয়ে আসার পর সেখান থেকে সবচেয়ে ভালগুলো বেছে নেয়ার অপেক্ষারত অবস্থায়।
-‘ওকে বিয়ে করে ফেল।” – বলে ওকে- “ওর মত আর একজন খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন হবে।”
আমরান্তা কথাটা ভাল না লাগার ভান করে।
-“পুরুষ শিকারে প্রয়োজন নেই আমার” – উত্তর দেয়- “এগুলো নিয়ে যাচ্ছি, কারণ আজ হোক কাল হোক ওকে গুলি করে মারবে ওরা।”

(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


6 Responses

  1. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    এই অভূতপূর্ব অনুবাদকর্মটির জন্য প্রত্যেক বাংলাভাষাভাষীর উচিত আনিসুজ্জামানকে মাথায় তুলে রাখা। অভিনন্দন হে প্রিয়।

  2. Md Hannan says:

    Nice post .I like this writer .

  3. Mostafa Tofayel says:

    পরে রাস্তায় বেরিয়ে বন্ধুর চত্বরগুলো সোজা পার হয়ে সিড়ি বেয়ে নীচে নেমে উঠে পরে পাঁচিলের উপর; পরে তুর্কদের সড়ক ধরে এগিয়ে গিয়ে এক কোনায় এসে প্রথমে ডানে পরে বায়ে বাঁক নিয়ে বুয়েন্দিয়ার বাড়ির দিকে সরাসরি এগিয়ে বন্ধ দরজার নীচ দিয়ে ঢোকে যাতে করে কার্পেটে রক্তের দাগ না লাগে।

    – পড়লাম।
    বন্ধুর চত্বরগুলোর জায়গায় চরাই উৎরাইগুলো হলে ভালো হতো। আর রক্তের দাগ না লাগে- এখানে দাড়ি ব্যবহার করলে বিরতি আসে, কিন্তু রক্ত গড়িয়ে চলার বিরতিহীনতা বুঝানোর জন্য দাড়ির পরিবর্তে কমা প্রত্যাশা করি।

  4. anisuz zaman says:

    অনেক ধন্যবাদ তোফায়েল সাহেব। আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনার পরামর্শ আমাকে আরও সতর্ক হতে অনুপ্রাণিত করবে। আপনার মূল্যবান পরামর্শের জন্য আবারও ধন্যবাদ।

  5. অংশুমান বিশ্বাস says:

    একদম আলাদা। স্প্যানিশ থেকে সরাসরি অনুবাদ বলেই এতটা আলাদা হতে পারছে। খুব ভাল কাজ হচ্ছে।

  6. Mostafa Tofayel says:

    Many thanks Mr Anis.But I would like to have the issue of your serial as early as possible because I am growing impatient about my in-depth study of the epic that the novel is. So far as I understand it is humorously ironical .Neruda is ironical,too, about the catastrophic effects of civil wars that took place in the Latin American countries,but while others are tough and angry and hardliners, Gabriel is humorous and jocking and polite yet penetrating to as deep as a pen go to. So, I appreciate Anis that he is faithful enough to the spirit of the original in Spanish.I believe,Anis has ability enough to offer us a parallel translation in English.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.