ব্যক্তিত্ব

চিত্তরঞ্জন সাহা : মরণে যাঁর কর্মময় জীবনের বিশ্রাম

আহমাদ মাযহার | 3 Jan , 2008  

chitto-pc1.jpg
চিত্তরঞ্জন সাহা (১৯২৭-২০০৭), ছবি: নাসির আলী মামুন

বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণের বইমেলার পথিকৃৎ হিসাবে তাঁর ভূমিকার কথা আজ হয়তো অনেকেরই অজানা। বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে, এমনকী প্রতি বছরের শিল্পমেলায় একসময় যে একটি মত্র বইয়ের স্টলের উপস্থিতি থাকতো তা কেবল সম্ভব হতো তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘মুক্তধারা’র কারণে। কিশোর বয়সে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিশীল লেখকদের কর্মের সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলাম চিত্তরঞ্জন সাহার ‘মুক্তধারা’র কল্যাণে। আমার বয়সী অনেকেরই অভিজ্ঞতা যে একই রকম তা আজ স্বীকার না করলে অন্যায় হবে। পরিণত বয়সে এসে এখন আমি অনুভব করতে পারি যে, একজন ব্যবসায়ীর পক্ষে দিনের পর দিন এমন অনিশ্চিত অবস্থা নিয়ে কারও পক্ষে বছরের পর বছর এমন ভাবে ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এর জন্য প্রয়োজন সামান্য আর্থিক লাভালাভের চেয়েও বেশি কোনও কিছু। ‘বই কিনে কেউ দেউলে হয় না’ এই শ্লোগান সম্বলিত লিফলেট তিনি সত্তরের ও আশির দশক জুড়ে মানুষের কাছে অন্তত কয়েক লক্ষ কপি বিতরণ করেছেন। অকৃপণ ভাবে বিতরণ করেছেন বইয়ের ক্যাটালগ। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে সেই কিশোর বয়সে একমাত্র বাংলা একাডেমী ছাড়া দেশের আর কোনও প্রকাশনা সংস্থার নাম আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। কারণ আর কোনও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বইকে এমন ব্যাপক ভাবে পরিচিত করবার উদ্যোগ নেয় নি।

অনেক লেখককে বলতে শুনেছি ‘মুক্তধারা’র মতো প্রতিষ্ঠানের উচিত এমন একটা বই প্রকাশ করা কিংবা ‘মুক্তধারা’র মতো প্রতিষ্ঠান কী করে পারল এমন একটা বই প্রকাশ করতে! বাংলা একাডেমী বা সমধর্মী জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দেশের মানুষের যে-রকম প্রত্যাশা একসময় ‘মুক্তধারা’র কাছেও দেশের সারস্বত সমাজ সে-রকম প্রত্যাশা করতো। একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে এ-রকম প্রত্যাশা নিশ্চয় খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সুতরাং আমরা যদি বলি যে, চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের পথিকৃৎ ছিলেন তাহলে তাঁর পরিচয় যথার্থ ও সম্পন্ন হয় না। তিনি ছিলেন সদ্যজাত বাংলাদেশের জাতিগঠন পর্বের সংগঠক-মানুষ। এই পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁকে, তাঁর কর্মকাণ্ডতে বিচার করে দেখা সমীচীন হবে। মুক্তিযুদ্ধ কালে অন্য দেশে আশ্রিত অবস্থায় চিত্তরঞ্জন সাহা শুরু করেছিলেন ‘মুক্তধারা’ নামে তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা। ঐ সময়ে দেশের বাইরের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে থেকে এমন একটি উদ্যোগ নেয়া যে কতটা বীরত্বব্যঞ্জক ব্যাপার তা হয়তো আজকের সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে আমরা যথার্থ ভাবে অনুভব করতে পারব না। কিন্তু এ কথা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, দেশের প্রতি শুধু এইটুকু অবদানের জন্যও চিত্তরঞ্জন সাহা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তিনি জন্মেছিলেন ১৯২৭ সালে নোয়াখালি জেলার বেগমগঞ্জের লতিফপুর গ্রামে। এমন একটি পরিবারে যে পরিবারের ছিল ব্যসায়িক ঐতিহ্য। ঐতিহ্যগত ভাবে তাঁরা ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী। তাঁরা ব্যবসা সূত্রে দীর্ঘকাল ধরে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী পুরোনো ঢাকার বাসিন্দা। সাহা বংশীয় তাঁর জ্ঞাতিদের একটা একটা অংশ এখনও সেখানকার অধিবাসী। চিত্তরঞ্জন সাহার কৈশোর ও তারুণ্যে দিনগুলো কেটেছে নোয়াখালির চৌমুহনীতে। ১৯৪৩ সালে রামেন্দ্র হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং চৌমুহনী কলেজ থেকে বি এ পরীক্ষা পাশ করেন। কর্মজীবনে প্রবেশ করেন ১৯৫১ সালে। ব্যবসায়ের পারিবারিক ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে চৌমুহনীতে বইয়ের দোকান পরিচালনার মধ্য দিয়ে শুরু করেন পুস্তক ব্যবসা। ঐ দোকানে প্রধানত স্কুলপাঠ্য বই ও নোট বই বিক্রি হতো সেখানে। কিছুকাল পরে ‘বাসন্তী প্রেস’ নামে সেখানকার একটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ক্রয় করেন। তিনি এর নাম বদলে রাখেলেন ‘ছাপাঘর’। পাশাপাশি ‘বাঁধাই ঘর’ নামে একটি পুস্তক বাঁধাই প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলেন তিনি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় তার ব্যবসা সম্প্রসারিত করেন। এখানেও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ঢাকা প্রেস’ নামে একটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রন্থঘর’ নামে একটি বইয়ের দোকান। এখানে মূলত বিক্রি হতো হিন্দুধর্ম সংক্রান্ত বইপত্র। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন পাঠ্যপুস্তক ও নোটবইয়ের প্রকাশনা সংস্থা ‘পুঁথিঘর লি.’। তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি ব্যবসায়ে বেশ উন্নতি করতে সক্ষম হন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে নিরীহ বাঙালি জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। আবদুল গাফফার চৌধুরীর পরামশে তিনি আগরতলা হয়ে কলকাতায় যান। আশ্রয় নেন তাঁর জ্ঞাতি ভাই কাপড় ও বইয়ের ব্যবসায়ী অচ্যুতানন্দ সাহার বাড়িতে। বাংলাদেশ থেকে তখন প্রচুর শরণার্থী পশ্চিম বঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল। চিত্তরঞ্জন সাহা চাইলেন কোনও-না-কোনও ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে। কলকাতায় আশ্রিত বাঙালি সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীর কারও কারও সঙ্গে তাঁর আলাপ হল। তাঁদের পরামর্শে তিনি উদ্যোগ নিলেন বাংলাদেশের লেখকদের সৃজনশীল বই প্রকাশের। সূচনা হল ‘স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ ‘মুক্তধারা’র। অল্পসময়ের মধ্যেই প্রকাশ করে ফেলতে সক্ষম হলেন বেশ অনেকগুলো বই।

mu-01.jpg……
মুক্তধারা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের লোগো
……..
অথচ তাঁর ‘মুক্তধারা’ একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাত্র ছিল না। তাঁর এই কার্যক্রমের দৃষ্টি ছিল দেশের বিদ্বৎসমাজের প্রয়োজনের দিকেও। তিনি যখন এই ব্যবসা শুরু করেন তখন তাঁর সামনে জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনও দৃষ্টান্ত ছিল না। আরও একটু নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় যে, তিনি যখন প্রকাশনা শুরু করেন তখন আমাদের দেশের তরুণ-প্রবীণ সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্ম খুব কমই গ্রন্থভুক্ত হবার সুযোগ পেত। শিশুসাহিত্যের বইয়ের সংখ্যা ছিল নিতান্ত অপ্রতুল। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত ছাড়া খুব স্বল্পসংখ্যক কবির কবিতা গ্রন্থবদ্ধ হবার সুযোগ পেত। বলা যেতে পারে যে, ‘মুক্তধারা’ প্রায় দুই যুগ ধরে একাই বাংলাদেশের তরুণ-প্রবীণ কবিদের বই প্রকাশের দায়িত্ব পালন করে এসেছে। কবিতার বই বিক্রি করে ব্যবসায়িক সাফল্য আসবে এ আশা তখন ছিল দুরাশা মাত্র। যদি দেখা যেত যে কোনও একজন কবি বা লেখক দীর্ঘকাল ধরে চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন অথচ তাঁর বই প্রকাশ সম্ভব হচ্ছে না তখন ‘মুক্তধারা’ থেকে ডাক আসতো। অথবা চর্চারত লেখক বা কবি মনে মনে আশা পোষণ করতেন যে একটা যোগ্য পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে ‘মুক্তধারা’য় জমা দিলে হয়তো তাঁর বই আলোর মুখ দেখবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে জানি যে, নাটকের বই প্রকাশ করা সবসময়েই বাংলাদেশে ব্যবসায়িক ভাবে নিশ্চিত অলাভ জনক ব্যাপার। চিত্তরঞ্জন সাহা তাই বলে নাটকের বই প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন নি। নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ‘থিয়েটার’ পত্রিকায় নিয়মিত ভাবে নাটক প্রকাশ করতেন। তাঁর পত্রিকা থেকে অফপ্রিন্ট নিয়ে তিনি প্রকাশ করতেন নাটকের বই। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর কালের নাট্য আন্দোলনের ফসল অনেকগুলো প্রতিনিধিত্বশীল নাটক গ্রন্থরূপ পেয়ে বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা উত্তর কালে ‘মুক্তধারা’ একক ভাবে যতগুলো নাটকের বই প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের অন্য সব প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ একত্রে মিলেও ততগুলো প্রকাশ করতে পেরেছে কি না সন্দেহ। সুতরাং এ কথা বলতে দ্ভিধা নেই যে, বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলন জাতীয় ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল চিত্তরঞ্জন সাহার প্রকাশিত গ্রন্থের সহযোগ পেয়েছিল বলেই। বিক্রি অনিশ্চিত বলে বাংলা একাডেমী ছাড়া মননশীল বইয়ের প্রকাশক এতটাই কম যে যদি ‘মুক্তধারা’ না থাকতো তাহলে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখকের সাহিত্য সংস্কৃতি ইতিহাস বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে সামর্থ্য আমাদের অজানাই থেকে যেতো। লেখকদের উৎসাহিত করবার জন্য তিনি ‘মুক্তধারা পুরস্কার’-এর ব্যবস্থা করেছিলেন। সাহিত্য পত্রিকার আকালের সময় প্রকাশ করেছিলেন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা। এই দুইয়ের কোনওটাই অর্থকরী দিক থেকে সুখকর হয় নি।

‘মুক্তধারা’ নামের প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি চেয়েছিলেন একটি যথার্থ পেশাদার প্রকাশনা সংস্থায় পরিণত করতে। সেজন্য তিনি অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠন করেছিলেন একটি রিভিউয়ার বোর্ড। অনেক নবীন লেখকেরও পাণ্ডুলিপি যে গ্রন্থ হিসাবে প্রকাশের সুযোগ পেয়ে যেত তা সম্ভব হয়েছিল তাঁর এই রকম পেশাদারি মনোভাবের জন্যই। রিভিউয়ারদের তাঁদের নিরপেক্ষ বিবেচনায় তরুণ সেই লেখকদের পাণ্ডুলিপি প্রকাশের ছাড়পত্র পেয়ে যেত। ব্যবসায়িক লাভালাভের ব্যাপার এখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারতো না। কিন্তু যাঁদের সমন্বয়ে এই বোর্ড গঠিত হয়েছিল তাঁদের কেউ কেউ বস্তুনিষ্ঠ ভাবে এই দায়িত্ব পালন করেতে পারেন নি বলে অনেক সময় ‘মুক্তধারা’কে বিতর্কিতও হয়ে পড়তে হয়েছে। প্রতি বছর নিয়ম করে লেখকদের বিক্রিত বইয়ের রয়্যালটি নিজস্ব বাহক মারফত পৌঁছে দিতেন তিনি। এমনও দেখা গেছে যে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি বা দুটি বই প্রকাশ করে লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত না আসায় বিপন্ন অবস্থা থেকে উদ্ধারের আশায় কেউ কেউ তাঁর শরণাপন্ন হয়েছেন। চিত্তরঞ্জন সাহা তাঁদেরও বিমুখ করেন নি।

আশির দশকে সাংগঠনিক কাজের সূত্রে তাঁর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমার দেখা হতো। লক্ষ করেছি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তিনি ব্যবসা করতে চাইলেও ব্যবসার সহজ প্রবণতার পথে তিনি সবসম যেতন না। যেমন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচির প্রয়োজনে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ‘মুক্তধারা’র বই বাকিতে ক্রয় করতে চাইলে তিনি আমাদের বই দিতেন। কল্যাণ ধর্মী প্রতিষ্ঠান – এই অজুহাত দেখিয়ে উচ্চ হারে কমিশন চেয়েও আমরা বিমুখ হই নি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা দীর্ঘকাল টাকা বাকি পড়ে থাকায় রূঢ়ভাবে তাগাদা দিলে আমরা উল্টো তাঁর শরণাপন্ন হতাম। সেখানেও আশ্রয় মিলত আমাদের। তাগাদাকারীর বজ্রচাপ শিথিল তো হতোই অনেক সময় এর ওপর আরও অনির্দিষ্ট কালের বাকিতে বই নিয়ে আসতে পারতাম। বছরের পর বছর তাঁর টাকা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বাকি পড়ে থেকেছে। যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সে ঋণ শোধ হয়েছে তাতে আর যাই হোক ব্যবসা যে খুব একটা হয় নি তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

তাঁর উত্তরসূরী তরুণ প্রকাশনা ব্যবসায়ীরা যখন অনুভব করলেন যে চিত্তরঞ্জন সাহার দেখানো পথে আর্থিক সাফল্য আসবে না তখন তাঁরা সাফল্যের সহজ পথে এগিয়ে চললেন। সাফল্যের নতুন নতুন দৃষ্টন্ত সামনে পেয়েও কিন্তু চিত্তরঞ্জন সাহা সে পথে গেলেন না। তিনি সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশনা ব্যবসাকে আর দশটা ব্যবসায়ের চেয়ে ভিন্ন জাতের বলে মনে করতেন। ব্যবসার সঙ্গে এর যে একটা সামাজিক ভূমিকা রয়েছে তা সব সময় মনে রাখতেন। তাঁর লাভজনক ব্যবসা ছিল পুঁথিঘর লি.-এর পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনা। পাঠ্যপুস্তকের ব্যবসার লাভের টাকা তিনি বিনিয়োগ করতেন ‘মুক্তধারা’র সৃজনশীল বই প্রকাশে। এই বই তাঁকে লাভ তো দেয়ই নি, বরং সর্বস্বান্ত করেছে। বিশাল ঋণের দায় মেটাতে গিয়ে একসময় তাঁর মূল্যবান স্থাবর সম্পদ বিক্রি করে দিতে হয়েছে। তিনিই একমাত্র প্রকাশক যাঁকে নিজের কর্মকাণ্ডের বিশালতার প্রতি ঈর্ষাকাতর দুষ্টলোকের ষড়যন্ত্রে সামরিক সরকারের রোষানলেও পড়তে হয়েছে। আর্থিক সংকটে, দুশ্চিন্তায়, শারীরিক অসুস্থতায় ধীরে ধীরে পর্যুদস্ত হয়ে এক সময় তিনি এগিয়ে গেলেন ধ্বংসের পথে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি আমাকে একদিন বলেছিলেন আমার কোনও সন্তান নেই, প্রকাশিত বইগুলোই আমার এক একটি সন্তান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘মুক্তধারা’ পিছিয়ে পড়লেও তাঁর ‘মুক্তধারা’ থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩০০০ (তিন হাজার)-এর কাছাকাছি। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ লেখকের বইই প্রকাশিত হয়েছে ‘মুক্তধারা’ থেকে। ‘মুক্তধারা’ থেকে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে যার আর কোনও সংস্করণ হয়নি। আবার এমন বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে যার বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা নেই জেনেও তিনি প্রকাশ করেছেন।

অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামের জন্য কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে বসেও লেখকদের কাছে নানা ব্যপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি লিখেছেন একটির পর একটি চিঠি। চিকিৎসকের পরামর্শের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলতেন, ‘এ জীবন কর্মময়, মরিলে বিশ্রাম হয়।’ আজ তাঁর নশ্বর জীবনের অবসানলগ্নে আমরা নিশ্চয়ই বলতে পারি যে, তাঁর কর্মময় জীবন আমাদের সামনে এগিয়ে চলার পথের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ঢাকা, ২৭ ডিসেম্বর ২০০৭

ahmadmazhar01@yahoo.com


2 Responses

  1. রানা আশরাফ says:

    আহমাদ মাযহারের লেখাটি পড়লাম। ভাল লাগল। লেখাটি পড়ে আমার কিছু কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

    মুক্তধারার সঙ্গে আমার পরিচয় ২ যুগের মতো। মুক্তধারার বইই ছিল আমার প্রথম দিকের কেনা প্রায় সবগুলো বই। কারণ তখন এত এত সৃজনশীল ও ব্যবসায়ী প্রকাশকের আবির্ভাব হয়নি বাংলাবাজারে অর্থাৎ বইয়ের বাজারে। কবিতা, নাটক, পল্প, উপন্যাস, অনুবাদ, প্রবন্ধ সব ধরনের বইই বের করতেন চিত্তরঞ্জন সাহা তার মুক্তধারা নামক প্রকাশনী থেকে। লাভ না হওয়ার ব্যাপারে আগে থেকে জেনেও এই সাহিত্যপ্রেমী, লেখকপ্রেমীও বটে, চিত্তদা একের পর এক বই প্রকাশ করেছেন। দেশে আর কোনো বেসরকারি প্রকাশনী সংস্থা থেকে এতো বই প্রকাশ করা হয় নি। হয়তো হবেও না। সদ্যপ্রয়াত চিত্তদার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।
    রানা আশরাফ
    ঢাকা
    rana_ashraf_bd@yahoo.com

  2. মাহবুবুল হক says:

    ধন্যবাদ আহমাদ মাযহার। চিত্তরঞ্জন সাহাকে বাংলা একাডেমী বা রাষ্ট্র কীভাবে স্মরণ করবে বা শ্রদ্ধা জানাবে তা অনুমান করা যায়। বইমেলায় তাঁর আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করার দাবি তোলা দরকার। তার নামে একুশে বইমেলার স্থায়ী চত্তর বা ফটক থাকতে পারে। প্রবর্তিত হতে পারে পদক বা সম্মাননা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.