‘তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা’

সাহানা মৌসুমী | ৯ মে ২০১৫ ৪:২৪ অপরাহ্ন

tagore-alone.jpgবৃষ্টিভেজা কলকাতা সেদিন অন্যরকম স্নিগ্ধ। এসে দাঁড়ালাম আড়াইশ বছরের পুরনো সেই বাড়িটার সামনে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। চোখের সামনে ভেসে উঠল বাঙলার রেনেসাঁর আশ্চর্য সেই অধ্যায়। উনিশ শতকের অবিভক্ত ভারতবর্ষ। ইংরেজ শাসন চলছে। বাঙালি খুঁজছে আত্মপরিচয়। রামমোহন -বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-মাইকেল ভিত্তি গড়ছেন বাঙলার নবজাগরণের। দানা বাঁধছে জাতীয়তাবোধ। হাজার বছরের গোঁড়ামি ভেঙে চলছে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন। প্রতিষ্ঠিত হল উদারপন্থি নিরাকার ঈশ্বর সাধনার ব্রাহ্মসমাজ- রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে। হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান একাসনে বসে ঈশ্বর উপাসনার এমন নজির আগে দেখা যায়নি! মনে পড়ল বাঙলার জাগৃতির সেই মহান শিক্ষক ভিনদেশি ডিরোজিওকে। তাঁর ইয়ং বেঙ্গল বাহিনীর তোলা মুক্ত চিন্তার ঝড়! কুসংস্কার আর সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে।

সিংহদুয়ার পেরিয়ে বাড়ীর ভেতর পা রাখতেই যেন সাদর সম্ভাষণ জানালেন স্বয়ং বিশ্বকবি- ‘আমি তোমাদেরই লোক’। সেঁজুতি কাব্যের ‘পরিচয়’ কবিতার উৎকীর্ণ বাণী। তারপর ভেতর বাড়ি। জীবনস্মৃতি, ছেলেবেলার সেই সাবেকী বাড়িটা। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে সারি সারি ঘর। লাল সিমেন্টের মেঝের বসার ঘরখানি। ভেসে উঠল সেদিনের ছবি- বাড়ি গমগম করছে লোকে। বরেণ্য সব মানুষেরা আসা যাওয়া করছেন। বিরাট যৌথ পরিবার। তেতলার ঘরে মহর্ষি ডেকে পাঠিয়েছেন বালক রবীন্দ্রনাথকে। জানতে চাইছেন- হিমালয়ে যেতে চাও আমার সাথে? বালক কবির মনে তখন খুশির বন্যা! বাগানের সামনে বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন মহর্ষি। পায়ের কাছে বসে কিশোর রবীন্দ্রনাথ গান শোনাচ্ছেন পিতাকে। আর এ দৃশ্যের ছবি আঁকছেন ঠাকুরবাড়িরই আরেক অসামান্য প্রতিভা গগনেন্দ্রনাথ!

দ্বিজেন্দ্রনাথ ‘ভারতী’র সম্পাদনা আর দর্শনচর্চায় নিমগ্ন। জ্যোতিরিন্দ্র ব্যস্ত নাটক নিয়ে। সত্যেন্দ্রনাথ এখন ভারতবর্ষের প্রথম আই সি এস। তাঁর স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী বাঙালি মেয়ের বাইরে বেরোবার উপযোগী শাড়ি ব্লাউজের ডিজাইন করছেন মাথা ঘামিয়ে। আজকের বাঙালি মেয়ের পোশাকের প্রথম রূপকার তিনি। সে সব পরে ঘরের বাইরে- তারপর দেশের বাইরে পা রাখছেন। ব্যস্ত আছেন ছোটদের জন্যে পত্রিকা বের করার কাজ নিয়েও- দেবর রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছেন সম্পাদনার ভার। স্বর্ণকুমারীও ব্যস্ত পত্রিকা সম্পাদনা আর লেখালেখি নিয়ে। তাঁর মেয়ে সরলা লেখাপড়া- শিল্পচর্চা- চাকরি সব মিলিয়ে নারী স্বাধীনতার এক নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করছেন। শিল্প সাহিত্যের একনিষ্ঠ অনুরাগী কাদম্বরী লেখার তাগিদ আর প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন কিশোর রবীন্দ্রনাথকে। ওদিকে একমনে ছবি এঁকে চলেছেন শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর! সারা বাড়িতে বইছে সাহিত্যের হাওয়া। স্বদেশপ্রেমে- বিশ্বপ্রেমে- মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার সুবাতাস। আর আছে অনন্য শিল্পমণ্ডিত এক অধ্যাত্মবোধ।

প্রতিদিন ভোরে এখানে ব্রাহ্মসমাজের উপাসনায় মহর্ষি- তরুণ রবীন্দ্রনাথকে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইবার ভার দিয়েছেন। ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে অন্তর উজাড় করে তিনি গাইছেন -‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে- দেখতে আমি পাইনি…’। এভাবে নিজেকে জানার পথ ধরে ধুলার ধরণীতে নেমে এসেছেন তাঁর পূর্ণ সত্তা ঈশ্বর। মানুষের ভেতর ঈশ্বরের এই সন্ধানই তো ব্রাহ্মধর্মের মূলকথা। সুরের অঞ্জলি দিচ্ছেন পুত্র, মুগ্ধ হয়ে শুনছেন পিতা -‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর- আমার মাঝে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর…’। মানব অস্তিত্বের সীমার মাঝে মধুর রূপে অসীম ঈশ্বর এসে দাঁড়িয়েছেন! ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’ –করুণাধারার মাধুরী চাইছেন সেই পরম পূর্ণতার কাছে। সুরের তরীতে মানবীয় ঈশ্বরপ্রেম যাত্রা করেছে অনন্তলোকে – ‘ধায় যেন মোর সকল ভালবাসা- প্রভু তোমার পানে।’ ভোরের বাতাসে মিশে যাচ্ছে তাঁর প্রার্থনার অমৃত বাণী- ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে…!’

tagore-house.jpgদোতলার ভেতর মহলের সারি সারি ঘর পার হয়ে এসে দাঁড়াই ঠাকুরবাড়ির আঁতুড় ঘরের সামনে। বিশাল বাড়ির তুলনায় ছোট্ট একটা ঘর। এখানে- এই ছোট্ট ঘরটাতে একশ চুয়ান্ন বছর আগে পঁচিশে বৈশাখের গভীর রাতে সারদা দেবী তাঁর এই আশ্চর্য পুত্রটির জন্ম দিয়েছিলেন! থমকে গিয়ে ভাবি- আমরা তো জন্ম গ্রহণ করি আকস্মিকভাবে। সেই আকস্মিকতায় যদি রবীন্দ্রনাথ জীবনের কাছে বাঁধা না পড়তেন! বাঙালির আকাশ কে ভরে দিত এমন সোনালি আলোয়! একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে মেধা মনন সৃষ্টিশীলতার জোয়ার- এমন সাংস্কৃতিক জাগরণের কথা আগে শোনা যায়নি। আর একজন রবীন্দ্রনাথ এতগুলো ক্ষেত্রে এমন বিশ্বমানের প্রতিভা কি করে হতে পারেন সেটাও বিস্ময়ের। সন্দেহ নেই, কবি হিসেবে তিনি জগতসভায় বৃত হয়েছিলেন। কিন্তু শুধু এই একটি পরিচয়েই কি তাঁর বিচিত্র সৃষ্টি-অবদান ও কৃতি ঢাকা পড়ে থাকতে পারে? কতো বহুবর্ণ ফুল-ফসলেই না তিনি ভরিয়ে তুলেছেন মানব- সংস্কৃতির রাজ্যপাট।
বিশ্বের ক্ষণজন্মা মনীষীদের দিকে তাকাই। তাঁদের উপলব্ধি বা অভিজ্ঞানের গভীরতা থাকলেও চর্চার ক্ষেত্র ছিল সীমিত। শুবার্ট, মোৎসার্ট, বিটোফেনের মতো সঙ্গীতজ্ঞরা সুরের জগতেই থেকেছেন। সফোক্লিস, মলিয়ের, ইবসেন, ও’নীলের মতো বিশ্বনন্দিত নাট্যকারেরা নাটক রচনাকেই একক লক্ষ্য করেছেন। দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, হেমিংওয়ে কথাসাহিত্যের বাইরের জগতে খুব একটা পা রাখেন নি। ভ্যান গগ, পিকাসো, মাতিস শুধু ছবি আঁকাকেই ধ্রুব বলে জেনেছেন। দু’ একটি ব্যতিক্রম ছাড়া দার্শনিকেরাও আসেন নি গল্প, কবিতা, গান আর সুরের মোহনীয় ভুবনে । ভাবতে অবাক লাগে, রবীন্দ্রনাথ সেই অসামান্য ব্যক্তিত্ব- যিনি একাধারে ছিলেন- কবি, গল্পকার, নাট্যকার, সঙ্গীতস্রষ্টা, ঔপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী, শিক্ষাবিদ, সমাজ-সংস্কারক এবং দার্শনিক। এই সব পরিচয়েই তিনি দাঁড়াতে পারেন বিশ্বের প্রথম সারির মনীষীদের পাশে- স্বমহিমায়!

মনে পড়ল ক্ষণিকা কাব্যের একটি পঙতি, ‘আমরা দু’জন একটি গাঁয়ে থাকি- সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ’। আর আমাদের সুখ তিনি বাঙালি ছিলেন- তাঁর আর আমাদের মায়ের ভাষা এক। কেবল সুখ নয়- এ আমাদের অশেষ গৌরবের বিষয়। আমাদের চলার পথের প্রতি বাঁক ভ’রে থাকে তাঁর অনিঃশেষ দানে। আমাদের আনন্দে বেদনায় হতাশায় ক্ষুব্ধতায় এসে হাত ধরেন তিনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পেয়েছিলাম তাঁর ‘আমার সোনার বাঙলা- আমি তোমায় ভালবাসি’র দেশপ্রেমের প্রেরণা মন্ত্র। সমাজ- পরিপার্শ্বের অন্যায় আর ভূলুণ্ঠিত মানবতা দেখে যখন দীর্ণ প্রাণে বলেন- ‘সজ্ঞানে নিষ্ঠুর যারা উন্মত্ত হিংসায় মানবের মর্মতন্তু ছিন্ন ভিন্ন করে / তারাও মানুষ বলে গন্য হয়ে আছে’- আমাদের মনের আক্ষেপ আর হাহাকারই উচ্চারিত হয়। চারিদিকে নাগিনীদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলা এতে হয়তো থেমে যায় না ঠিকই- কিন্তু আমরা অন্যায়কে, উন্মত্ত হিংসাকে প্রত্যাখ্যানের শক্তি পাই আমাদের অন্তরে।
এই বাড়িটাতে জন্ম নিলেন তিনি- বালক থেকে কিশোর হলেন। তরুণ থেকে প্রৌঢ়- তারপর বৃদ্ধ। ঠাকুরবাড়ির ঘরে ঘরে তাঁর স্পর্শ যেন লেগে আছে এখনও। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি। তাঁর জীবনের প্রতিমুহূর্তের চিন্তা, কল্পনা, অনুভব তো লিখে রেখে গেছেন আমাদের জন্যে! তাই এই ঠাকুর বাড়িতে কেবল নয় – বাঙালির ‘ঘরে ঘরে ঘর পাতা আছে’ রবীন্দ্রনাথের। তাঁর স্পর্শ পাই আমাদের প্রতিদিনের জীবনে। আমাদের ক্লিষ্ট- দগ্ধ দিনের ধুলোভরা নৈমিত্তিকতা শেষ হলে ক্লান্ত মন খোঁজে একটু শান্তি। শৈল্পিক বোধের এক আশ্চর্য সুন্দর যাত্রায় তখন সঙ্গী করে নেন – চিরসখা রবীন্দ্রনাথ! আমাদের অন্তরাত্মা বলে ওঠে- ‘এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর!’ অধ্যাত্বচেতনার জাদুতে- শিল্পের সম্মোহনী মায়াতে তিনি আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যান ‘আকাশ ভরা সূর্য তারার মাঝে।’ জগতের সেই ‘আনন্দযজ্ঞে যে আমাদের নিমন্ত্রণ’! আমাদের ‘সুদূরের পিয়াসী’ মন তখন ‘বিপুল সুদূরের ব্যাকুল বাঁশরি’তে পৌঁছে যায় অন্য এক লোকে।

‘সভ্যতার সংকট’ এ তিনি বলেছিলেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। আশা করেছিলেন, অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাবে। ফিরে পাবে মানুষের মর্যাদা। মনুষ্যত্বের প্রতিকারহীন পরাজয়কে চরম বলে বিশ্বাস করাকে তিনি অপরাধ মনে করতেন। আর এই বিশ্বাসের পথ ধরে রবীন্দ্রনাথ আজও জড়িয়ে আছেন আমাদের প্রতিদিনের জীবনে। এক সকাল থেকে আরেক সকাল পর্যন্ত কত অনুষঙ্গেই না তাঁকে আমরা পাই। রাত্রি এসে যেখানে দিনের পারাবারে মেশে সেখানে পাই… নিশীথ রাতের বাদল ধারায় পাই…সন্ধ্যার মেঘমালায় পাই আর পাই বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা চলার মুহূর্তে!
রবীন্দ্রনাথের একশ চুয়ান্নতম জন্মদিনে নিবেদন করি অন্তরের শ্রদ্ধা। কবির ভাষায় বলি- ‘তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা কোন খানে রাখব প্রণাম’।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rajib Barua — মে ৯, ২০১৫ @ ৫:২৬ অপরাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ লেখিকাকে এমন সুন্দর লেখাটির জন্য।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com