সাক্ষাৎকার

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

রাজু আলাউদ্দিন | 29 Apr , 2015  

s-ghosh.jpg২৭ মার্চ রাতে পৌঁছেছিলাম কলকাতায়, প্রায় ষোল/সতের বছর পর। তবে সেবার ছিলাম একা, আর এবার দারাপুত্রপরিবারসহ। মূল লক্ষ অবশ্য দিল্লী যাওয়া, নিতান্তই ব্যক্তিগত কাজে। কিন্তু দিল্লী যাব অথচ কলকাতা হয়ে যাব না তা কী করে হয়। আর কলকাতায় গিয়ে প্রিয় লেখক শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে দেখা করবো না, তা-ই বা কী করে ভাবি!।

২৭ তারিখ রাতেই কবি বন্ধু রাহুল পুরকায়স্থকে বললাম, শঙ্খ দার সঙ্গে দেখা করতে চাই, তোমার কাছে তাঁর ফোন নাম্বার আছে? “আছে,” কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিধার মরচেধরা কণ্ঠে সে জানালো, “কিন্তু পাবেন কিনা জানি না। তবু দিচ্ছি।”
ওর দ্বিধার কারণ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা কি পাওনা কখনো?” আমি তার কণ্ঠ থেকে মরচে সরাবার চেষ্টা করলাম।

“পাই, তবে বহু চেষ্টার পর। আমি অবশ্য এখনকার কথা বলছি। উনি এখন নিজের বাসায় নেই, শুনেছি মেয়ের বাসায় আছেন। নিজের বাসায় থাকলে উনি ধরেন।” রাহুল ধীরে ধীরে গোয়েন্দা গল্পের মতো রহস্যের জট খুলতে লাগলো। “যদি আপনার ভাগ্য ভালো থাকে তাহলে পাবেন। বুঝলাম রহস্যের জট খুললেও শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের উপর গিয়েই আমার আকাঙক্ষার ভার ন্যাস্ত হচ্ছে।

পরের দিন ২৮, ২৯ এবং ৩০ তারিখ পর্যন্ত বহুবার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বুঝলাম, রাহুল মিথ্যে বলেনি। অথচ দেখা করাটা জরুরী। হাতে হাতে তাকে আমার দক্ষিণে সূর্যোদয় আর আলাপচারিতা বই দুটি পৌঁছে দেয়ার তাগিদ। প্রথমটার ক্ষেত্রে তাগিদটা এই জন্য যে এই বইটির পেছনে তার কাছে আমার ঋণ, সেই ঋণের কথা রয়েছে ভূমিকায়। আর দ্বিতীয়টায় রয়েছে আমার নেয়া তার একটি সাক্ষাতকার। সুতরাং এটিরও একটি কপি তার প্রাপ্য। অতএব সশরীরে তার হাতে বই দুটি দেয়াই হবে সৌজন্যসম্মত।

দিল্লী যাওয়ার পথে তাকে পাওয়া গেল না বলে আমি অবশ্য হাল ছেড়ে দেইনি। কারণ ফেরার পথেও কল্লোলিনী কলকাতাকে রেখেছি। দিল্লী থেকে কলকাতায় ফিরেছিলাম ৩ এপ্রিল রাতের বেলা। রাতেই আবার ফোন করে না পেয়ে তরুণ কবি অরুনাভ রাহারায়ের কাছ থেকে পাওয়া গেল আরেকটি নাম্বার, এটি তার স্ত্রীর। এই নাম্বারটি পেয়ে কিছুটা আশান্বিত হয়ে কল দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই তিমিরেই পরে থাকতে হলো। তাহলে এ যাত্রায় আর দেখা হচ্ছে না শঙ্খদার সাথে? কতসব প্রশ্ন জমে আছে, কত কী জানবার রয়ে গেছে তার কাছে, আর তার চেয়েও বড় কথা তাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল খুব! দুই বাংলার জীবিত লেখকদের মধ্যে যে দুজনকে আমি সাহিত্যে প্রতিভা, পাণ্ডিত্য ও রুচির পরিচ্ছন্নতার জন্য শীর্ষস্থানীয় মনে করি তারা হলেন শঙ্খ ঘোষ ও অলোকরঞ্জণ দাশগুপ্ত। এদের দুজনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা সীমাহীন। শঙ্খ দাকে না দেখেই দেশে ফিরতে হবে ভেবে বেশ খারাপই লাগছিল। এদিকে, ৫ তারিখেই আমাদের দেশে ফেরার তাড়া।

অতএব হাতে আছে মাত্র একটি দিন। ৪ তারিখে সকালবেলা নাস্তা সেরে দুটো নাম্বারেই ফোন করলাম। অরুনাভর দেয়া নাম্বারটায় আমাকে বিস্মিত করে এক নারী কণ্ঠের সাড়া পাওয়া গেল। বুঝলাম তিনি শঙ্খ দার স্ত্রী। জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কি শঙ্খদার নাম্বার? আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমি কি শঙ্খদার সাথে একটু কথা বলতে পারি?”

“একটু ধরুন, দিচ্ছি।” হাইকুর চেয়েও সংক্ষিপ্ত জবাবে তিনি জানালেন বহু প্রতীক্ষিত আশ্বাসের বিরাট আভাস।
শেষ পর্যন্ত পাওয়ার আনন্দে আমি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম শঙ্খ দার কণ্ঠের জন্য। মিনিট দেড়েক পরেই ভেসে এলো সেই কাঙ্খিত, প্রগাঢ়, কিন্তু ধীরশ্রী কণ্ঠের আভা,
“হ্যাঁ।”
“জ্বী শঙ্খদা, আমাকে হয়তো চিনবেন না। আমার নাম রাজু আলাউদ্দিন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আপনার সাথে দেখা করতে চাই। আপনাকে দুটো বই পৌঁছে দেয়ার তাগিদ রয়েছে। আমি গত কয়েকদিন ধরেই আপনার বাসার নাম্বারে চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু কোনোভাবেই পাচ্ছিলাম না।”

“আমি এক গত এক মাস ধরে মেয়ের বাসায় আছি। আগামীকাল নিজের বাসায় ফিরবো।” মৃদু কণ্ঠে শঙ্খদা তুলে ধরলেন আমার চেষ্টার ব্যর্থতার কারণটি। “আপনি যদি আসতে চান তাহলে কাল সকাল এগারটায় আসতে পারেন।”

আগামীকাল যদিও আমার ফেরার দিন, তারপরেও আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
“অবশ্যই শঙ্খদা, আমি কালই চলে আসবো।”
“আপনি কি উল্টোডাঙা চেনেন?”
“না, চিনি না, তবে চিনে নিতে পারবো। আপনি যদি কাইন্ডলি ঠিকানাটা দেন।”
“লিখবার মতো হাতের কাছে কিছু আছে?”
“জ্বী আছে।”
স্পষ্ট উচ্চারণে ঠিকানাটা দিয়ে দু একটা রেফারেন্সও দিলেন যাতে বাসাটি খুঁজে পেতে সুবিধা হয়।
পরেরদিন এয়ার টিকেট বা ট্রেনের টিকেট পেতে দেরি হবে দেখে আমরা সড়কপথে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম কারণ, ৫ তারিখের মধ্যে দেশে ফেরার তাড়া রয়েছে। শঙ্খদার সাথে দেখা করার সময় নির্ধারিত হওয়ার সাফল্যে সেইদিন ছেলেমেয়ে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ালাম কলকাতার এখানে সেখানে। সারাদিন ঘুরাঘুরি শেষে ক্লান্ত হয়ে রাতে পাথরের মতো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই লক্ষ করলাম শরীর ভরে আছে ভৈরবী রাগে। কন্ঠ থেকে অকারণেই বেরিয়ে আসছে সুরের মুর্ছনা। “শরীর ছুঁয়ে শরীর ছেনে হৃদয় বলাৎকার/ করছে মহামান্য সুরের অখিল টঙ্কার।”
নাস্তা সেরে কলকাতার এলিয়ট রোড থেকে সোজা বনগাঁ পর্যন্ত একটা টেক্সি ভাড়া করে সকাল সাড়ে দশটায় রওয়ানা হয়েছিলাম আমরা। ড্রাইভারকে বললাম, “উল্টোডাঙা হয়ে যেতে হবে কিন্তু, ওখানে আধাঘণ্টা দেরি হবে–কোনো অসুবিধা নেইতো?” ভদ্রলোক আমাকে অবাক করে দিয়ে সহজেই রাজি হয়ে গেলেন। আমি তার জবাবে বেশ অবাক হয়েছিলাম। কারণ এই কয়দিনে দেখেছি এরা নানান ফিকির দেখিয়ে পয়সা খসাবার তালে থাকে কিংবা নানা রকম অজুহাত দেখায়। সেই তুলনায় এই ভদ্রলোককে অনেক সহজ বলেই মনে হলো। এগারটা/সোয়া এগারটার মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিলাম তার বাসার কাছে। স্পষ্ট ঠিকানা দিলেও খুঁজে পেতে একটু সময় লেগেছিল কারণ একই উচ্চতার একই রঙের বহু ভবনের ভিড়ে কোনটা যে তার সেটা কেবল ভবনের নাম ও নাম্বার দিয়েই পাওয়া সম্ভব। ভবনময় জনপদের বিস্তার লক্ষ করে তিনি যা বলেছিলেন মনে পরে গেল এই মুহূর্তে সেই অমোঘ ও অব্যর্থ উক্তিখানি:
যেখানেই যত সবুজ রক্ত সবটুকু শুষে খাবে
নিঃসাড় করে দিয়ে যাবে সব সেগুন শিমুল শাল
আজ যাকে বলো বনভূমি তাকে জনভূমি বলো কাল।

ভবনময় জনভূমিতে তবু হারিয়ে যাননি বা নিখোঁজ হয়ে যাননি স্নিগ্ধ কিন্তু অনমিত এক প্রগাঢ় সবুজ ব্যক্তিত্ব যাকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি এই ভবনারণ্যে।

দু তিনটি অল্পবয়সী ছেলে কী যেন খেলছিল, বললাম “শঙ্খ দার বাসাটা কি চেন, শঙ্খ ঘোষ, লেখক এবং অধ্যাপক।” ঠিকানাটাও বললাম। কিন্তু আমার ঠিকানা শুনবার আগেই আঙুল উঁচিয়ে কোনার দিকের একটা বিল্ডিং দেখিয়ে দিল ওদের একজন।

s-r.jpgশঙ্খদার বাসায় এই প্রথম। আগে দুবার তাকে দেখেছি, কিন্তু এখানে নয়, বাংলাদেশে, তখন তিনি আমাদের অতিথি। আজ আমি তার অতিথি।
বিদেশী ভাষায় কথা বলার মতোন সাবধানতা নিয়ে কলিংবেলের বাটনে চাপ দিয়ে উদাসীন ভঙ্গিতে দাড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করছি কেউ একজন এসে দরজা খুলে দেবেন।
কলিংবেল বাজার একটু পরেই সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা চির-পরিচিত কাঙ্ক্ষিত মানুষটি ‘আসুন’ বলে আমাদেরকে সহাস্যে গ্রহণ করলেন। দরজার সামনে জুতোর সারি দেখে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করার আগেই মনটা একটু দমে গিয়েছিল এই ভেবে যে কথা বলার জন্য আদৌ কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না হয়তো। রাহুল আমাকে আগেই সতর্ক করে দিয়েছিল এই বলে যে, রোববারদিন অনেকেই তার সাথে দেখা করতে আসেন। আর তিনিও নাকি চান এই দিনটি অন্যদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে কাটাতে। ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসার জন্য তিনি আমাদের চারজনকে জায়গা করে দেয়ার আগেই সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কয়েকজন উদ্যোগী হয়ে একটু চেপে বসে আমাদেরকে বসার সুযোগ করে দিলেন। ড্রয়িংরুম ভর্তি সবাই আমাদের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকাতেই নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো এই ভেবে যে আমি অনাহুতের মতো তাদের সুযোগ হরণ করতে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। একটু সংকোচ হলো মনে মনে। কিন্তু এসেই যখন পরেছি তখন সংকোচবোধ করে আর লাভ কি! আর তাছাড়া শঙ্খদাতো সেই কবেই তার ‘ঘর: ১’ নামক কবিতায় বলেইছিলেন যে, “আমার ঘরে উদ্যত বন্ধুতা।” অতএব আর দ্বিধা কেন। বন্ধু না হই, অতিথি হওয়ার সুযোগে নিশ্চয়ই কথা বলা যায়।

“আমার কথা আপনার হয়তো মনে নেই। থাকবার কথাও নয়। অনেক আগে আপনার একটা দীর্ঘ সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। পরে দেখলাম সেই সাক্ষাৎকারটি আপনার সাক্ষাতকার গ্রন্থ কথার পিঠে কথায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।”

“হ্যাঁ, মনে আছে। ১৯৯৭ সালে নিয়েছিলেন।”
“আশ্চর্য, আপনার স্মৃতিশক্তি বিস্ময়কর।” আমার এই অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে তিনি যেন খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পরলেন। যেন এমন একটি খাবার তার সামনে পরিবেশন করা হয়েছে যার জন্য তার কোনো আকাঙক্ষা ছিল না।

তাকে কথার মধ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য বললাম, “আপনার বইটিতে আমার যে সাক্ষাৎকারটি অন্তর্ভুক্ত করেছেন সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ নয়।”

“আমি যে পত্রিকা থেকে পেয়েছি সেখানে অবশ্য এটুকুই ছিল।” স্বভাবসুলভ মিতভাষিতায় তিনি এটুকুই জানালেন। আত্মপ্রসঙ্গ হয়ে যায় বলেই হয়তো তিনি আর বেশি কিছু বললেন না।

তাকে উপহার দেয়ার জন্য সঙ্গে নিয়ে যাওয়া আমার আলাপচারিতা বইটির কপি দিয়ে বললাম, “শঙ্খদা এই বইয়ে পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি আছে। আপনি যে পত্রিকা থেকে পেয়েছেন সেখানে ওরা পুরোটা ছাপেনি স্থানাভাবের কারণে। ওরা অর্ধেকটা ছেপেছিল। বাকি অর্ধেকটা অন্য একটি পত্রিকা ছেপেছিল।” শঙ্খ দা বইটি হাতে নিয়ে কয়েকটি পৃষ্ঠা নেড়েচেড়ে দেখলেন। ঘরময় ছড়িয়ে আছে শঙ্খ ঘোষের উপস্থিতির প্রসন্নতার জলীয় কোমলতা আর তাতে মাঝেমধ্যে খেলা করছে অন্যান্য অভ্যাগতদের ছোট ছোট কথার বুদ্বুদ। আমরা দুজনই কেবল কথার বিস্তারে কল্লোলিত করে তুলছি মধ্যপ্রহরকে। বইটি হাত থেকে নামিয়ে রাখতেই শঙ্খ দার বাদিকে খাটের উপরে বসা সন্দীপন চক্রবর্তী বইটা কৌতূহলবশত তুলে নিতেই আমার দক্ষিণে সূর্যোদয় বইটিও উপহার হিসেবে শঙ্খ দাকে দিয়ে বললাম, “এই বইটির জন্য আপনার প্রতি আমার একটা বিশেষ কৃতজ্ঞতা আছে। আমার এই কাজটির পূর্বসূরী হিসেবে আপনার ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ-এর একটা বিশেষ ভূমিকা আছে।

dsc01367.JPG
দক্ষিণে সূর্যোদয় বইটি নেড়েচেড়ে দেখছেন
কৌতূহল নিয়ে বইটির সূচীপত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই বইটির কথা আমার জানা ছিল না।” ইতিমধ্যে অন্যরাও কৌতূহল প্রকাশ করে জানতে চাইলেন, এটি এখানে পাওয়া যায় কিনা। সূচিপত্র দেখা শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে শঙ্খদা বললেন, “এখানে অনেক তথ্যই এসেছে যেগুলো আগে দেখিনি।” খুব বেশি আত্মপরতা হয়ে যায় ভেবে আমি নিজের বইয়ের প্রসঙ্গ থেকে দ্রুত সরে গিয়ে শঙ্খ দাকে বললাম,
“আয়ওয়া নিয়ে আপনার আরেকটি বই দেখলাম।” আমার কথা শেষ না হতেই তিনি আমাকে সংশোধন করে বললেন, “ওটা ঠিক বই নয়, ওটা আমার আয়ওয়া থাকাকালীন ডায়েরি। ডায়েরিতো আমি সেভাবে কখনো লিখিনি। ওই একবারই লিখেছিলাম।”
তার অন্য একটি বইয়ে, নামটা ঠিক মনে করতে পারছিলাম না, তবে প্রসঙ্গটা মনে ছিল, বললাম, “আপনি বোর্হেসকে একটা চিঠি লিখেছেন দেখে খুবই শিহরিত বোধ করেছিলাম। আগে কোথায়ও সে কথা বলেননি। সে তো অনেক আগের ঘটনা, তবে জানলাম অনেক পরে।” আমি কৌতূহল নিয়ে চিঠির বিষয়টি শেষ করার আগেই তিনি জানালেন,

“সেটা লিখতে হয়েছিল একটা কারণে……।” স্মৃতি থেকে বলতে শুরু করলেন কণ্ঠস্বরকে একই রকম সমতায় ধরে রেখে। “তিনি একটি লেখায় বলেছিলেন যে কোরান শরিফে উটের কোনো উল্লেখ নেই।”



অনুপ্রবেশের ভঙ্গিতে বললাম “আপনার ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ-এ এ প্রসঙ্গটা উল্লেখ করেছিলেন, মনে পড়ছে।”
“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমি তার উল্লেখের অসঙ্গতিটা নিয়ে চিঠি লিখেছিলাম তাকে। কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”
আমি তার কথায় খানিকটা ধৃষ্টতা নিয়েই বাধা দিয়ে বললাম, “তবে তিনি যে প্রসঙ্গে এই উল্লেখ করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গে এই সামান্য অসঙ্গতি তার বক্তব্যকে অসার ও অর্থহীন করে ফেলেনি।” তিনি একটুও বিরোধিতা না করে একমত হয়ে জানালেন, “তা ঠিক। প্রসঙ্গটা বোধহয় ছিল লোকাল কালার নিয়ে।”
“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। কোরানের ঐ উল্লেখ দিয়ে তিনি বলতে চেয়েছিলেন উটের উল্লেখ না থাকলেও বুঝা যায় এটি আরবদেশীয় রচনা।” কিন্তু চিঠিটার কী হলো–আমার আগ্রহ ছিল সেটা জানা। “উনি কি কোনো উত্তর দিয়েছিলেন?”
“না দেননি।”
“আমার ধারণা, চিঠিটা উনি পাননি। ”
“পেলেও দিতেন কিনা সন্দেহ।”

আমি তার সন্দেহের প্রতি সশ্রদ্ধ দ্বিমত জানিয়ে বললাম “আমার ধারণা চিঠি পেলে উনি উত্তর দিতেন। বোর্হেস সম্পর্কে–যদিও বলাটা ঔদ্ধত্য হয়ে যাবে–বিভিন্নজনের সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যক্তি বোর্হেসকে যেভাবে জেনেছি তাতে করে মনে হয়নি এই সামান্য অসঙ্গতি কেউ ধরিয়ে দিয়েছেন বলে উত্তর দেবেন না।” বিনয়ের সঙ্গেই বললাম, “আমার ধারণা যে কেউ-ই তার কাছে প্রবেশাধিকার পেত। এমনকি তার এক অনুবাদক যখন বললেন যে আপনার ‘স্ট্রিট কর্ণারম্যান’ গল্পটি অপেরার মতো মনে হয়–মনে আছে বোর্হেস তার এই গল্পটিকে তার শ্রেষ্ট গল্পগুলোর একটি মনে করতেন– কিন্তু অনুবাদক ঐ মন্তব্য করার পর তিনি নিজের ধারণা বদলে নিয়েছিলেন। আমার ধারণা তিনি আপনার চিঠিটি পাননি।”
“ হতে পারে।” তিনি এ নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না।
“একটা বিষয়ে আমার জানার কৌতূহল ছিল অনেকদিন থেকেই।” তিনি জানার জন্য আমার দিকে তাকাতেই বললাম, “আচ্ছা, বাংলাভাষার বেশ কয়েকজন লেখকের সঙ্গে অক্তাবিও পাসের দেখা হয়েছিল যখন তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে ভারতে ছিলেন। গত পরশুদিনই শুনলাম সুস্মিতা বৌদির( লেখক শিশির কুমার দাশের স্ত্রী) কাছে যে শিশির দার সাথেও নাকি তার দেখা হয়েছিল। আপনার সঙ্গে কি কখনো দেখা হয়েছিল?”

“না, দেখা হয়নি কখনো। হয়তো সে সময় দিল্লীতে থাকলে দেখা হতে পারতো।”

ঘরভর্তি অন্য সবাই কেবল আমাদের দুজনের কথাবার্তা শুনে যাচ্ছেন দেখে আমার নিজের খানিকটা সঙ্কোচ হচ্ছিল তাদের সুযোগ ও অধিকার হরণ করে যাচ্ছি বলে। আবার অতটা খারাপ লাগছিল না এই অজুহাতে যে আমি তো আর যখন তখন চাইলেই আসতে পারবো না, কিন্তু তারা এখানকার বলে আজ বঞ্চিত হলেও শিগগিররই তা পুষিয়ে নেবার সুযোগ পাবেন।

s-m.jpgএরই মধ্যে গরম গরম সিঙ্গারা আর সাদা তবকদেয়া সন্দেশ এসে হাজির। ইতিমধ্যে শঙ্খ দা খোঁজ নিতে শুরু করেছেন আমার দারাপুত্রপরিবারের, “আচ্ছা ওদেরকে দেখছি না তো।”
ওরা মানে আমার স্ত্রী ও মেয়ে। মেয়েটা এই দরবারী রাগে প্রস্তুত ছিল না বলে বিক্ষিপ্ত স্বরের মতো এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছিল। ওর মা ওকে বাইরে নিয়ে সামলাবার চেষ্টা করছিল যাতে আমাদের আলাপে ব্যাঘাত না ঘটে। আমিও তার সঙ্গে কথার নেশায় ওদের এই অনুপস্থিতি একেবারেই খেয়াল করিনি। উঠে গিয়ে ওদেরকে ঢেকে এনে বসালাম। মায়ার অস্থিরতার সঙ্গে ওর মায়ের সামলে ওঠার দৃশ্যগুলো সস্নেহে উপভোগ করছিলেন শঙ্খদা। ইতিমধ্যে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত মায়াকে সুস্নিগ্ধ প্রশ্রয়ের চোখে শঙ্খদার তাকিয়ে দেখা থেকে মনে হচ্ছিল তিনি মোটেই বিরক্ত নন।
আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শঙ্খ দা বললেন, “একটু নিন। কী নাম বলছিলেন যেন?”
“আমার নাম মারিসোল।” আমার স্ত্রী পরিস্কার বাংলা উচ্চারণে নিজেকে স্পষ্ট করে তুললো তার সামনে। মারিসোল কথাবার্তা চালাবার মতো বাংলা ভালোই জানে, তবে উচ্চারণে অবাঙালিসুলভ দূরবর্তী ভাজ লক্ষ্য করে কেউ সন্দেহ করতে পারেন ভেবে আগেভাগেই সতর্ক করে দিয়ে বললাম, “ও কিন্তু বাঙালি নয়। মেক্সিকান।”
“ও আচ্ছা।” শঙ্খ দা যেন এক নমিত কৌতূহলের জবাবটি প্রশ্ন করার আগেই পেয়ে গেছেন বলে মনে হল।

এবার তিনি নিজে থেকেই প্রশ্ন করলেন, “ছেলের নাম কী?”
“নিজার হাবিব।”
শুরু থেকেই ও ক্যামেরা নিয়ে আমাদের ছবি তুলে যাচ্ছিল বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়নি। শঙ্খ দাকে দেখতে পাওয়ার আনন্দে আমি আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রাথমিক কর্তব্যটা।

“আর মেয়ের নাম?” শঙ্খ দার পাশেই বসে থাকা মায়ের কোলে বন্দী মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
“মায়া”
“বাহ, সুন্দর নাম তো।”
মায়ার নামের গোপন গৌরবের অদৃশ্য পতাকাটা বের করে বললাম, “ওর নামটা রেখেছেন আমাদের এক বড় লেখক।”
স্মিত হেসে বললাম তাকে। লেখক বলাতেই বোধহয় তিনি উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন,
“কে রেখেছেন?”
“মুহম্মদ হাবিবুর রহমান।”
“আচ্ছা। তাই নাকি?”

সিঙ্গারা এবং সন্দেশ শেষ না হতেই রং চা এসে হাজির। খুদা তেমন ছিল না বলে সিঙ্গারা আর খেয়ে দেখা হয়নি। সন্দেশটা অবশ্য খেয়েছিলাম। মারিসোলও সন্দেশই খেল। ওর ঠোঁটে রুপালী তবকের ছোট ছোট টুকরো চিকচিক করছিল। মনে মনে বললাম, শঙ্খ ঘোষের আপ্যায়নের পরাগ তোমার ঠোঁটে।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে শঙ্খদাকে বললাম, “একটা বিষয়ে আপনার কাছে জানবার ছিল।”
“হ্যাঁ, বলুন।”
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে স্প্যানিশভাষী এক লেখকের লেখায় নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের উল্লেখ পেয়েছিলাম। সত্যি বলতে কি, এর আগে ওনার সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।”
“হ্যাঁ অনেকেই তার কথা জানে না। কোন লেখক তার কথা উল্লেখ করেছেন?” শঙ্খদা কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন।
“তিনি চিলির লেখক আর্তুরো তররেস রিওসেকো। তার একটি লেখা থেকেই জানতে পারলাম নিমাইবাবু নাকি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত একটি লেখা চেয়ে তাকে চিঠি লিখেছিলেন। পরে আরও খোঁজ নিয়ে জানলাম তিনি নাকি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত একটি সংকলন তৈরি করছিলেন। আপনার এবং অমর্ত্য সেনের বন্ধু ছিলেন তিনি।”
“হ্যাঁ, আমরা বন্ধু ছিলাম। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত কাজটা অনেক দূর গুছিয়ে এনেছিল সে।”

“আর্তুরোর লেখা থেকেই জানলাম যে তিনি বার্ট্রান্ড রাসেল, আর্নল্ড টয়েনবি, ই. এম. ফর্স্টার প্রমুখকে চিঠি লিখে সাড়াও পেয়েছিলেন। এটা শেষ করতে পারলে তো এক বিস্ময়কর সংকলন হতো। পরে আপনার এক সাক্ষাৎকার থেকেই জানতে পারলাম আপনি তার এই অসমাপ্ত কাজটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব পেয়েছেন। এতো এক অসামান্য সংকলন হবে।”
“সে রকমই আশা করা হচ্ছে। তবে এখনও সব তথ্য হাতে আসেনি। সে তো শেষের দিকে একা একা থাকতো। লন্ডনে যে বাড়িটিতে থাকতো ওর চারপাশে বইপত্র ছড়ানো ছিল, এ অবস্থায়ই মারা গিয়েছিল। বোধহয় মৃত্যুর দু’দিন পর লোকজন ওর মৃত্যুর কথা জানতে পেরেছিল।”

“আপনি ঐ সংকলনের কাজ শুরু করেছেন?”
“না, এখনও শুরু করতে পারিনি। সমস্ত তথ্য এখনও হাতে আসেনি। ওর মৃত্যুর পর সেগুলো লন্ডনের ট্যাট গ্যালারিতে জমা আছে। ওরা আমাকে সবগুলো পাঠাবে।”

s-ghosh-1.jpgআমি উৎফুল্ল হয়ে বললাম, “এটা একটা অসাধারণ সংকলন হবে কোনো সন্দেহ নেই। নিশ্চিন্ত বোধ করছি এই ভেবে যে কাজটা আপনার হাত দিয়েই হচ্ছে।” উনি আমার আবেগের তোড়ে ভেসে না গিয়ে শান্তভাবেই বললেন, “হাতে সবটা না আসা পর্যন্ত বুঝা যাচ্ছে না কী রকম হবে।”
“সবইতো প্রস্তুত, এখন তো মনে হয় আর বেশি সময় লাগবার কথা নয়।”
“এসব সাজানো, তারপর ভূমিকা টিকা টিপ্পনী–কাজ কিন্তু কম নয়। সময় তো খানিকটা লাগবেই।”
“অবশ্য এটা ঠিক, আপনার সম্পাদনায় যেহেতু সমস্ত খুঁটিনাটিসহ বেরুবে–তাতে সময় লাগবে বটে। ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ যেমনটা করেছেন। এটা যদিও অনুবাদ, কিন্তু অনুবাদ, ভূমিকা, অনুষঙ্গ, টিকাটিপ্পনী নিয়ে এটি প্রায় গবেষণা গ্রন্থের মতোই হয়ে গেছে। কিন্তু, আমি অবাক হয়েছিলাম এটা জেনে যে আপনি আয়ওয়াতে থাকতেই স্প্যানিশ শিখেছিলেন এই বইটি অনুবাদ করার জন্য। খুব প্রতিভাবান না হলে এটা অসম্ভব।” আমার শেষ বাক্যটি যেন তাকে খানিকটা অস্বস্থিতেই ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই অস্বস্তি আড়াল করার জন্য বললেন, “না, না, এটা তেমন কিছু নয়।” তার স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বললাম, “আপনার অনুবাদে নিকোলাস গিয়েনের চিড়িয়াখানা খুব ভালো লেগেছিল। প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় বলেছিলেন দুএকটি কবিতা অনুবাদে আসছে না বলে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। পরের সংস্করণে কি সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন?”

“না, সেগুলো আর করা হয়নি। মানে সম্ভব ছিল না।” আবারও নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে শঙ্খদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “নিমাই বাবু আর্তুরো তররেসকে চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু তররেস তার জবাবে লেখা পাঠিয়েছিলেন কিনা জানেন কি?”

“মনে হয় সে রকম কিছু দেখেছি। আপনি আমাকে তার নামের বানানটা একটু বলুন তো। আমি খোঁজ নিয়ে জানাবো।” আমার মুখ থেকে নামের বানানটি শুনে নিজ হাতে একটি কাগজে লিখে নিলেন আর্তুরোর নামটি।
“নিমাই বাবু তো সেই রামোন পেরেস দে আইয়ালাকেও চিঠি লিখেছিলেন যিনি স্প্যানিশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাবার আগেই লিখেছিলেন। রামোন পেরেসও কি তার আহবানে সাড়া দিয়েছিলেন?”
“আমি খোঁজ নিয়ে জানাবো আপনাকে।”

গাড়ির ড্রাইভারকে বলেছিলাম আধা ঘন্টা থাকবো, কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছি প্রায় ৫০ মিনিট হয়ে গেছে। বর্ডার বন্ধ হওয়ার আগেই আমাদের পৌঁছুতে হবে। নিশ্চয়ই তা কয়েক ঘন্টার মামলা। তখন পোনে একটার মতো বাজে। বিদায় নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বললাম, “শঙ্খ দা, দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি বেলা দ্বিপ্রহর … এটা বলা যদিও বেয়াদবির শামিল, কারণ আপনার কাছে থেকে বিদায় নিতে চাওয়াটা অশোভন, সত্যি বলতে কি বিদায় নিতে ইচ্ছে করছে না, আপনার মতো গুনী মানুষের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইতে পারে কেবল বিদ্যাবিমুখ জনই। কিন্তু এ মুহূর্তে বিদায় না চেয়ে উপায় নেই। কারণ বর্ডার বন্ধ হওয়ার আগেই পৌঁছুতে হবে।”
“আপনারা কি বনগাঁ হয়ে যাচ্ছেন?”
“জ্বী”।
উপস্থিত অভ্যাগতদের নাম পরিচয় না জেনেই ছোটখাট কথা চালালালি হচ্ছিল মাঝেমধ্যে, এবার তাদের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, “আচ্ছা, আপনারা কি বলতে পারেন কত সময় লাগতে পারে এখান থেকে গাড়িতে বনগাঁ যেতে? “দু’তিন ঘণ্টা লাগতে পারে।” কেউ একজন বললেন।
পাশ থেকে আরেকজন আশ্বস্ত করে বললেন, “বন্ধ হওয়ার আগেই পৌঁছে যেতে পারবেন, চিন্তা করবেন না।”
“বহু আগে আমি একবার বনগাঁ হয়ে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম।” হঠাৎ করেই শঙ্খদা এদের মধ্য থেকে বলে উঠলেন।
“যাক, এবার তাহলে নিশ্চিত হওয়া গেল মহাজনের পথই আমি অনুসরণ করছি।” আমার রসিকতায় অভ্যাগতদের সবাই হেসে উঠলেন। শঙ্খ দার লাজুক হাসিটা ছিলো এই হাসির হুল্লোড়ের পল্লবে ঘেরা ঈষৎ রক্তাভ ফুলের মতো মিষ্টতায় ভরা।
“আচ্ছা তাহলে উঠি আমরা।” মারিসোল বিদায় নেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো, “অনেক ধন্যবাদ আপ্যায়নের জন্য।”
শঙ্খদা আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা এসেছেন, খুব ভালো লাগলো। আবার আসবেন।”
দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন অতিথিদের বিদায় জানাতে, নিজার তাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানাতেই তিনি আদরে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আবার এসো।”

যখন বেড়িয়ে যাচ্ছি তখন মনে হলো, দ্রুত ফেরার তাড়ায় খুব বেশি এলোমেলো কথা বলা হলো কি? আরেকটু কম হলে ভালো হতো নাকি? কিংবা যেমন তিনি বলেছিলেন, তারই এক কবিতায়,
“ঘরে ফিরে মনে হয় বড়ো বেশি কথা বলা হলো?”
আজ এইটুকু লেখার পর মনে পড়ে তারই আরেকটি কবিতার সেই নিবিড় উপলব্ধি:
কথা ব’লে বুঝি ভুল, লিখে বুঝি, হাত রেখে বুঝি
এ রকম নয় ঠিক, এতো আমি চাইনি বোঝাতে।
কাগজের মুখ নিয়ে সভাশেষে ফিরে গেলে লোকে
মনে হয় ডেকে বলি: এইবার ঠিক হবে এসো।

কত কথাই না এলোমেলোভাবে বলে এলাম। তিনিও আতিথ্যপূর্ণ সহিঞ্চুতায় সব মেনে নিলেন বলে মনে হলো। কিন্তু মনে কি নিলেন সব?

Flag Counter


26 Responses

  1. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    দুর্দান্ত বললে কম বলা হয়। খুবই সুখপাঠ্য ভ্রমণালাপচারিতা। আপনার জন্য ঈর্ষা রাজু ভাই।

  2. anisuz zaman says:

    amar shob shomoyei irsha hoy. Great!!!!!

  3. জহিরুল চৌধুরী says:

    পুরো লেখায় রাজু আলাউদ্দিনকে খুঁজে পাওয়া যায় পরতে পরতে। তবে কুড়ি বছর আগের রাজুকে খুঁজে পাওয়া গেল- “সন্দেশটা অবশ্য খেয়েছিলাম। মারিসোলও সন্দেশই খেল। ওর ঠোঁটে সাদা রাঙতার ছোট ছোট টুকরো চিকচিক করছিল। মনে মনে বললাম, শঙ্খ ঘোষের আপ্যায়নের পরাগ তোমার ঠোঁটে।”
    তোমার মেক্সিকান অর্ধাঙ্গিনীকেও দেখা গেল সেই সুবাদে। সে কারনেই জানার ইচ্ছে ছিল- রাজু কেন আমাদের প্রতিবেশি এই দেশটির রাজনীতি-শিল্প কলা নিয়ে এতো মাথা ঘামায়? আর মেয়েটির নাম ‘মায়া’ রেখে মায়ের প্রতি সুবিচার করেছো। এজন্যও তোমাকে ডাবল ধন্যবাদ। ঘুরো, আর লেখো…

  4. Dilwar Hasan says:

    Deeply amazed on reading the conversation.Thank you Razu Bhai…

  5. শামস আরেফিন says:

    ভালো লাগার মতো আলোচনা।সুখপাঠ্য তো বলতেই হয়।

  6. Zakir Zafran says:

    খুব ভালো লাগলো। শঙ্খ ঘোষ আমার খুবই প্রিয় লেখক।

  7. aly zaker says:

    অসাধারণ।

  8. Alok Basu says:

    দারুণ।

  9. kutub hilali says:

    রাজুদা, যাপন এবং উদযাপনে এত স্বল্প সময়কে আনন্দে ভরিয়ে তোলার পারঙ্গমতায় আমি রীতিমত শ্লাঘা অনুভব করছি। শঙ্খ ঘোষ। প্রিয় লেখক। প্রিয় প্রমিত মানুষ। সত্যি, এ সবের মাঝে আমার নিজের জ্ঞাপন-মতামতকে মনে হচ্ছে : ‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়’। ধন্যবাদ আবারো রাজুদা।

  10. shams hoque says:

    I have just finished reading the piece in KL in courtesy of internet. I am hugely unlucky to have lived and worked abroad for about three decades for my survival. I have not been lucky to have read so many literary giants of Bengali literature includingশঙ্খ ঘোষ I Raju Alauddin, somehow, is encouraging me to save some time of my almost 15-hour workday everyday to be able to read শঙ্খ ঘোষ।
    The write-up is amazingly personal and impersonal at the same time. It presents so many episodes involving so many literary giants from home and abroad including Amartya Sen. A rather short piece but very long indeed in regard to its wide range of events, “accidents”and allusions. I congratulate Raju Alauddin, who is on his way to achieve a laurel of another literary giant in the future, on his yet another excellent piece. I loved to see “Rajubhabi” , Marisoul with শঙ্খ ঘোষ in an elegant gesture. Well done, Rajubhai!
    Yours-in-jealousy,
    Shams

  11. ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে জম্পেশ আড্ডা হলো। সন্দেশ খাওয়া হলো। ছবি তোলা হলো। বই দেওয়া হলো। প্রিয় কবি যে সুস্থ আছেন তা জানা গেলো। ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ রাজু আলাউদ্দিন।

  12. Mustafa Mohiuddin says:

    Amazing,Razu. It was really a very informal, informative, yet intimate attempt to unveil the genius of Shankho Gosh ,who by far is one of the best poets of our time.

  13. ইকবাল হাসনু says:

    রাজু আলাউদ্দিনকে অশেষ ধন্যবাদ আলাপচারিতার ভেতর দিয়ে অনন্য রসোত্তীর্ণ এক রচনা উপহার দেওয়ার জন্য।

  14. Tareq Ahmed says:

    wonderful writeup!

  15. omar shams says:

    সহমত – “খুবই সুখপাঠ্য “; “wonderful writeup!”

  16. prokash says:

    চমৎকার ।এত কম সময়ে এত কথা এতট আলাপচারিতা। এত বড় কবির সঙ্গে চমৎকার একটি ক্ষণের বিবরণ, অসাধারণ বটেই।

  17. Mostafa Tofayel says:

    Many thanks Razu Alauddin. A nice travelogue by Razu Alauddun – nice because of the stylish narrative that speaks of Razu Alauddin, the man and writer. He is not everywhere, but only somewhere. We know him as one passionately with Latin American Literature and with Rabindra Literature, and also with modern Bengali Literature. While with Bengali Literature, Razu knows no bounds, no Raddclif. He is facile, fresh, ardent and current.

  18. স ম তুহিন says:

    যারা বাংলা ভাষায় লেখালেখি বা চর্চা করে তারা সবাই দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করবেন, বেঁচে থাকা লেখকদের মধ্যে শঙ্খ ঘোষ তাঁর নামেই উজ্জ্বল, সেই জ্যোতিকে আমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য রাজু ভাইকে ধন্যবাদ।

  19. পড়া হচ্ছে এক ভ্রমণ, এটা তখনই সম্ভব যখন লেখাটা রান্নার মতো সুস্বাদু।
    বাংলার প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের স্মৃতিতে লেখা রাজু আলাউদ্দিন ভাইয়ের লেখাটি তেমন চৎকার একটি লেখা।

  20. পড়া হচ্ছে একটা ভ্রমণ, এটা তখনই হয় যখন লেখাটা রান্নার মতো সুস্বাদু কিছু।
    বাংলার প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের স্মৃতিতে লেখা রাজু আলাউদ্দিন ভাইয়ের লেখাটি তেমন চৎকার একটি।

    খাবার শেষে থালা চেটে খাওয়ার মতো আবার পড়লাম লেখাটি। পড়তে পড়তে লেখার প্রসাদগুণ আরো সুমিষ্ট লাগলো। ‌’এই পথ যদি শেষ হতো’ মতো একটা অনুভূতি নিয়েই শেষ হলো। কিছু কিছু বাক্য তো জ্বল জ্বল করে উঠলো পরক্ষণেই।
    রাজু ভাই দেশ-বিদেশের বহু রান্নাই চেখেছেন। তার রান্নার হাতে এখনো সেই প্রসাদগুণ লেখে আছে। বিশেষত লেখায় দৃশ্য বয়ান, মেটাফোর আমাকে উচ্ছল করে তুলছিল। লেখার চেষ্টা থেকেই ভাষার ভেতর এমন স্বাদ খোঁজ আমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    তেমন কিছু বাক্য এখানে তুলে দিলাম। মনে হয়েছে, গল্পে ডাইলগ উপস্থানের সময় এমন বাক্য বা শব্দের সমাহার যে কোনো লেখাকে সমৃদ্ধ করবে।

    * এই নাম্বার‘টি পেয়ে কিছুটা আশান্বিত হয়ে কল দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই তিমিরেই পরে থাকতে হলো।
    * অরুনাভর দেয়া নাম্বারটায় আমাকে বিস্মিত করে এক নারী কণ্ঠের সাড়া পাওয়া গেল। বুঝলাম তিনি শঙ্খ দার স্ত্রী।
    * শঙ্খদার সাথে দেখা করার সময় নির্ধারিত হওয়ার সাফল্যে সেইদিন ছেলেমেয়ে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ালাম কলকাতার এখানে সেখানে। সারাদিন ঘুরাঘুরি শেষে ক্লান্ত হয়ে রাতে পাথরের মতো ঘুমিয়ে ছিলাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই লক্ষ করলাম শরীর ভরে আছে ভৈরবী রাগে। কন্ঠ থেকে অকারণেই বেরিয়ে আসছে সুরের মুর্ছনা।
    * ভবনময় জনভূমিতে তবু হারিয়ে যাননি বা নিখোঁজ হয়ে যাননি স্নিগ্ধ কিন্তু অনমিত এক প্রগাঢ় সবুজ ব্যক্তিত্ব যাকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি এই ভবনারণ্যে।
    * কিন্তু আমার ঠিকানা শুনবার আগেই আঙুল উঁচিয়ে কোনার দিকের একটা বিল্ডিং দেখিয়ে দিল ওদের একজন।
    * আমার এই অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে তিনি যেন খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পরলেন। যেন এমন একটি খাবার তার সামনে পরিবেশন করা হয়েছে যার জন্য তার কোনো আকাঙক্ষা ছিল না।
    * স্বভাবসুলভ মিতভাষিতায় তিনি এটুকুই জানালেন
    * ঘরময় ছড়িয়ে আছে শঙ্খ ঘোষের উপস্থিতির প্রসন্নতা আর অন্যান্য অভ্যাগতদের ছোট ছোট কথার বুদ্বুদ। আমরা দুজনই কেবল কথার বিস্তারে কল্লোলিত করে তুলছি মধ্যপ্রহরকে।
    * স্মৃতি থেকে বলতে শুরু করলেন কণ্ঠস্বরকে একই রকম সমতায় ধরে রেখে।
    * আমি তার সন্দেহের প্রতি সশ্রদ্ধ দ্বিমত জানিয়ে
    * মেয়েটা এই দরবারী রাগে প্রস্তুত ছিল না বলে বিক্ষিপ্ত স্বরের মতো এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছিল।
    * “আমার নাম মারিসোল।” আমার স্ত্রী পরিস্কার বাংলা উচ্চারণে নিজেকে স্পষ্ট করে তুললো তার সামনে। মারিসোল কথাবার্তা চালাবার মতো বাংলা ভালোই জানে, তবে উচ্চারণে অবাঙালিসুলভ দূরবর্তী ভাজ লক্ষ্য করে কেউ সন্দেহ করতে পারেন ভেবে আগেভাগেই সতর্ক করে দিয়ে বললাম, “ও কিন্তু বাঙালি নয়। মেক্সিকান।”’
    * শঙ্খ দা যেন এক নমিত কৌতূহলের জবাবটি প্রশ্ন করার আগেই পেয়ে গেছেন বলে মনে হল।’
    * মায়ার নামের গোপন গৌরবের অদৃশ্য পতাকাটা বের করে বললাম,
    * মারিসোলও সন্দেশই খেল। ওর ঠোঁটে সাদা রাঙতার ছোট ছোট টুকরো চিকচিক করছিল। মনে মনে বললাম, শঙ্খ ঘোষের আপ্যায়নের পরাগ তোমার ঠোঁটে।
    * উনি আমার আবেগের তোড়ে ভেসে না গিয়ে শান্তভাবেই বললেন
    * শঙ্খ দার লাজুক হাসিটা ছিলো এই হাসির হুল্লোড়ের পল্লবে ঘেরা ঈষৎ রক্তাভ ফুলের মতো মিষ্টতায় ভরা।
    * তিনিও আতিথ্যপূর্ণ সহিঞ্চুতায় সব মেনে নিলেন বলে মনে হলো।

  21. amar mudi says:

    Dui bidoghdo joner Alapcharita khub i bhalo laglo.

  22. SAIKAT HABIB says:

    Razu vai,

    W o n d e f u l!!! very different and interesting. Salute!!!
    বেশ জমে উঠেছিল কিন্তু… এক দমে পড়ে শেষ করলাম। কিন্তু বড়ই অতৃপ্তি রহিয়া গেল, সীমান্ত ভিলেন সব ভণ্ডুল করে দিল..

  23. Debasmita Roychowdhury says:

    Hello,
    Thank you for the wonderful anecdotal recount of the events. I am truly glad that you have been able to spend time with Professor Ghosh. Like you, many among us have been lucky to experience his legendary hospitality and his quiet grace.

    Your wife and your daughter are beautiful.

    Thank you for sharing.
    Debasmita

  24. ML Gani says:

    পুরোটাই পড়েছি | চমত্কার আড্ডা হয়েছে রাজু ভাই | তবে, আমি হলে এ লেখার শিরোনাম দিতাম:
    “ঘরে ফিরে মনে হয় বড়ো বেশি কথা বলা হলো?”

  25. বিলোরা চৌধুরী says:

    মুগ্ধ হলাম। কবির স্নিগ্ধ প্রসন্নতার শান্তি জলডুবি আনারসের সুঘ্রাণের মতো ছড়িয়ে আছে অলিখিত লাইনেও। তবক চিকচিকে ঠোঁটের স্মৃতির জরিঝুরি সৌরভ মনে গেঁথে গেল বহুদিনের জন্যে।

  26. Saif Khan says:

    It was interesting to read the article… it talks about life, literature and the time we live. There was a reference of holy Quran, in a way depict as a book for the Arabs, since there is reference of camel. Because of ignorance, other many animals names are as well there for instance, cow, elephants, bees, to name a few yet a preconceived idea was there to imply that the holy book is for the Arabs, Shonkha gosh myopic thought prompted him to mentioned camel. He should have study/read the whole the holy book and make any myopic statement.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.