অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 24 Apr , 2015  

garcia_marquez.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ২০

খারাপ খবর নিয়ে এসছে সে। তার কথানুযায়ী উদারপন্থিদের শেষ প্রতিরোধগুলো ধসে পরছে। রিওআচার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যুদ্ধরত পিছু হঠতে থাকা কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার কাছ থেকে আর্কাদিওর সঙ্গে কথা বলার মিশন নিয়ে এসেছে সে। “কোন প্রতিরোধ ছাড়াই উদারপন্থিদের জানমালের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে”, এই শর্তে রক্ষনশীলদের হাতে প্লাজা ছেড়ে দিতে হবে। পলাতকা দাদীর মত চেহারার বার্তাবাহককে আর্কাদিও করুণা মাখানো দৃষ্টি দিয়ে পরখ করে।
“তুমি নিশ্চয়ই লিখিত কিছু এনেছ”- বলে।
“অবশ্যই”- উত্তর দেয় “কিছুই লিখিত আনিনি।– এটা খুবই সহজবোধ্য যে এখনকার বিপজ্জনক অবস্থার কারণে কোনো প্রমাণই বহন করা সম্ভব নয়”।
কথা বলতে বলতে অন্তর্বাসের ভিতর থেকে সোনার এক ছোট্ট মাছ বের করে টেবিলের উপর রাখে। “মনে হয় এটাই প্রমাণের জন্য যথেষ্ট”-বলে। আর্কাদিও বুঝতে পারে এটা হচ্ছে কর্ণেল আউরোলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বানানো সোনার মাছগুলোর একটা। কিন্তু কেউ একজন যুদ্ধের আগেই মাছটা কিনে থাকতে পারে অথবা চুরি করতে পারে আর সেজন্য প্রমাণ হিসেবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে বার্তাবাহক যুদ্ধের গোপন কথা ফাঁস করার চুড়ান্তে পৌঁছায়। জানায় যে কুরাসাও থেকে সমস্ত নির্বাসিতদের রিক্রুট করে যথেষ্ট পরিমাণে অস্ত্র আর রসদ কিনে বছরের শেষ দিকে এক আক্রমণের মিশন দিয়ে যাচ্ছে সে। এই পরিকল্পনার উপর আস্থা রেখেই কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুযেন্দিয়া এখন লোকবল নষ্ট করতে চাইছে না। কিন্তু আর্কাদিও অটল থাকে। তার পরিচয়ের প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত বার্তাবাহককে বন্দী করে আর প্লাজা প্রতিরোধের আমৃত্যু সিদ্ধান্ত নেয়। বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয় না তাকে। উদারপন্থিদের পরাজয়ের সংবাদ ক্রমশই আরও দৃঢ় হতে থাকে। মার্চের শেষের দিকে এক অকাল বৃষ্টির মধ্যে ভোরের কিছু আগে, সপ্তাহগুলোর উৎকণ্ঠায় ভরা শান্ত অবস্থাটা হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে এক আনাকাঙিক্ষত রননিনাদে আর তার পশ্চাৎধাবন করে এক কামানের গোলা যা ভেঙে দেয় গির্জার চুঁড়াটা । সত্যিকার অর্থে আর্কাদিওর প্রতিরোধের ইচ্ছেটা ছিল এক পাগলামী। অপ্রতুল অস্ত্রসহ তার ছিল সাকুল্যে পঞ্চাশজন লোক,যাদের একেকজনের কাছে বিশটির বেশী কার্তুজ ছিল না। কিন্তু ঐসব প্রাক্তন ছাত্ররা তার উত্তেজনাকর বক্তৃতায় উত্তেজিত হয়ে এক নিশ্চিত হেরে যাওয়া লক্ষের উদ্দেশ্যে প্রাণ বলী দেবার সংকল্প নেয়। বুটের ঘনঘন আওয়াজ, বৈপরীত্যে ভরা আদেশ, মাটি কাপানো কামানের গোলা, লক্ষহীন গোলাগুলি আর উদ্দেশ্যবিহীন রনশিঙ্গার আওয়াজের মধ্যে তথাকথিত কর্ণেল স্টিভেনসান আর্কাদিওর সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হয়। “এভাবে পায়ে বেড়ীবাঁধা আর মেয়ে মানুষের কাপড় পড়া অবস্থায় অপমানকর মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি দাও”- বলে সে – “মরতেই যদি হয় লড়াই করে মরব”। আর আর্কাদিওকে রাজি করাতে সক্ষম হয়। আর্কাদিও আদেশ দেয় ওকে বিশটি কার্তুজসহ একটি অস্ত্র আর পাঁচজন লোক দিতে, যাতে করে সে ঘাঁটিটা প্রতিরোধ করতে পারে আর যাতে করে আর্কাদিও চলে যেতে পারে তার নিজস্ব আদেশপ্রদানকারীর অবস্থানে, সমরভাগের সামনের শ্রেণীতে। জলাভূমির রাস্তাটা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না সে। ততক্ষণে ব্যারিকেডগুলো গুড়িয়ে গেছে, আর প্রতিরোধকারীরা অরক্ষিত অবস্থায় রাস্তার উপর যুদ্ধ করছে। যতক্ষন পর্যন্ত গুলি আছে ততক্ষন গুলি করে, পরে পিস্তল দিয়ে রাইফেলের বিরুদ্ধে,আর সর্বশেষে হাতাহাতি করে। এই অত্যাসন্ন পরাজয়ের মধ্যে কিছু কিছু মহিলা হাতে লাঠি আর রান্নার ছুড়ি নিয়ে রাস্তায় নামে। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝে রাতপোশাক গায়ে, হোসে আর্কাদিও বুয়োন্দিযার পুরোনো পিস্তল হাতে উন্মাদিনীর মতো তাকে খুঁজতে থাকা আমারান্তাকে দেখতে পায় আর্কাদিও। হাতাহাতির সময় অস্ত্র খোঁয়া যাওয়ায় এক অফিসারের হাতে নিজের রাইফেলটা ধরিয়ে দিয়ে আমারান্তাসহ ঢুকে পরে পাশ্ববর্তী গলির মধ্যে, আমারান্তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য। প্রতিবেশীর বাড়ির সামনের দেয়ালে কামান দিয়ে করা গর্তের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করেই দরজায় অপেক্ষা করছিল উরসুলা। বৃষ্টি ধরে আসছিল কিন্তু রাস্তাগুলো ছিল গলা সাবানের মত পিচ্ছিল, ভেজা আর অন্ধকারের মাঝে দুরত্বটা আন্দাজ করে নিতে হত। আমারান্তাকে উরসুলার কাছে রেখে কোনা থেকে গুলি চালিয়ে যাওয়া দুই সৈনিকের মোকাবেলার চেষ্টা করে আর্কাদিও। কিন্তু অনেক বছর পোশাকের আলমারিতে পড়ে থাকা প্রাচীন পিস্তল কাজ করে না। নিজের শরীর দিয়ে আর্কাদি্ওকে আড়াল করে তাকে বাড়িতে টানার চেষ্টা করে উরসুলা,-“ঈশ্বরের দোহাই ভেতরে আয়, চিৎকার পাগলামি অনেক হয়েছে।”
সৈণ্যরা অস্ত্র তাক করে ওদের দিকে।
“লোকটাকে ছেড়ে দিন ম্যাডাম” এক সৈন্য চিৎকার করে “নইলে কিন্তু আমরা দায়ী হব না।” আর্কাদিও উরসুলাকে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেকে সমর্পন করে। কিছুক্ষণ পর গোলাগুলি থেমে যায় আর ঘন্টা বাজতে শুরু করে। আধঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে সমস্ত প্রতিরোধ ধ্বসে পরে। আর্কাদিওর লোকদের মধ্যে একজনও বেঁচে থাকতে পারল না, কিন্তু মৃত্যুর আগে নিয়ে গেল তিনশত সৈন্যকে ওদের সঙ্গে করে। শেষ প্রতিরোধটা ছিল সেনাছাউনি। আক্রান্ত হবার আগে তথাকথিত কর্ণেল গ্রেগরীয় স্টীভেনসন বন্দীদের মুক্ত করে আদেশ দেয় রাস্তায় বেরিয়ে যুদ্ধ করতে। অসাধারণ গতি আর বিভিন্ন জানালা দিয়ে ছোঁড়া বিশটা কার্তুজের নিখুঁত টিপের জন্য মনে হচ্ছিল সেনা ছাউনিটা খুব ভালভাবে সুরক্ষিত আর ফলে আক্রমনকারীরা পুড়িয়ে দেয় সেটা কামানের গোলা ছুঁড়ে। যে ক্যাপ্টেন দায়িত্বে ছিল সে ধ্বংসস্তুপটার মধ্যে জাঙ্গিঁয়াপরা বাহু থেকে বিছিন্ন হওয়া এক হাতে গুলিহীন রাইফেল ধরা, মৃত মাত্র একজন লোক দেখে অবাক হয়ে যায়। তার মাথায় ছিল খোপা করে বাধা, চিরুনি গোজা মেয়েদের চুল, আর গলায় ছিল সোনার ছোট্ট মাছের একটা হার। মুখ দেখার জন্য বুটের ডগা দিয়ে শরীরটা উল্টাতে ক্যাপ্টেন চলৎশক্তিহীন হয়ে পরে। “খাইছে”-অবাক কণ্ঠে বলে, অন্যান্য অফিসাররা এগিয়ে আসে দেখতে। “দেখ কোথায় নাজেল হতে এসেছে লোকটা”- ক্যাপ্টেন ওদেরকে বলে-” এ হচ্ছে গ্রেগরীয় স্টীভেনসন”

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
ভোরবেলা, এক সংক্ষিপ্ত কোর্টমার্শালের পর সমাধিস্থলের দেয়ালে দাড় করিয়ে গুলি করা হয় আর্কাদিওকে। জীবনের শেষ দুই ঘণ্টায় সে বুঝতে পারে না কি করে শৈশব থেকে জ্বালিয়ে মারা ভয়টা যেন উধাও হয়ে গেছে। বোধশূণ্য, এমনকি তার সাম্প্রতিক সাহসিকতার জন্য উদ্বেগহীনভাবে সে শুনলো তার প্রতি আনিত অশেষ অভিযোগগুলো। সে ভাবছিল উরসুলার কথা, এই সময়ে চেষ্টনাটের নিচে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সঙ্গে তার চা খাবার কথা। ভাবছিল তার আট মাসের ছোট্ট মেয়েটার কথা,যার এখনও নাম নেই, আর সেই সন্তানটার কথা যে আগষ্ট মাসে জন্মাবে। ভাবছিল সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের কথা যাকে গত রাতে দেখেছিল শনিবার দুপুরে খাবার জন্য হরিণের মাংসে লবন মাখাতে। যার হাটু পর্যন্ত নেমে আসা চুলগুলো আর মেকী মনে হওয়া চোখের পাপড়িগুলোর জন্য শূন্যতা বোধ করবে সে। ভাবছিল আবেগহীনভাবে জীবনের নির্মম হিসেব-নিকেশের সময় তার লোকজনদের কথা,আর বুঝতে শুরু করে: যাদেরকে সে ঘৃনা করে ভেবেছিল, বাস্তবে কি ভালই না বাসে তাদেরকে। দুঘন্টা পার হয়ে গেছে সেটা আর্কাদিওর বুঝে ওঠার আগেই কোর্টমাশার্লের বিচারকর্তা তার চরম বক্তৃতা আরম্ভ করে। “যদিও প্রমাণিত অভিযোগগুলো তার মৃত্যুদন্ডের জন্য যথেষ্ট নয়”- বলে চলে বিচার কর্তা- তারপরও যে দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও অপরাধজনকভাবে অভিযুক্ত ব্যাক্তি, তার অধস্তনদের ঠেলে দিয়েছে এক অর্থহীন মৃত্যুর দিকে, তাতে মৃত্যুদন্ডই তার যথার্থ পাওনা”। যেখানে প্রথমবারের মত শ্রম, অকারনে পাওয়া নিরাপত্তার স্বাদ আর যেখানে প্রথমবারের মত ভালবাসার অনিশ্চয়তার আস্বাদ পায় সে, সেই স্কুলের কয়েক মিটার দূরে তার মৃত্যুর এই আনুষ্ঠানিকতা আর্কাদিওর কাছে ছিল হাস্যকর। সত্যিকার অর্থে মৃত্যু তার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল জীবন। ফলে যখন তার শাস্তি উচ্চারণ করা হয় তখন তার ভয়ের অনুভূতি ছিল না, ছিল স্মৃতিকাতরতার। শেষ ইচ্ছের কথা জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত কোনো কথা বলে না সে।
“ আমার স্ত্রীকে বলো”- গম্ভীড় গলায় বলে-
“মেয়ের নাম যেন উরসুলা রাখে”- একটু বিরতি টেনে নিশ্চিত করে; “উরসুলা, দাদীর মতন এবং বলো যার জন্ম হতে যাচ্ছে সে যদি ছেলে হয় তার নাম যেন রাখে হোসে আর্কাদিও, কিন্তু কাকার জন্য নয় বরঞ্চ দাদার জন্য।” দেয়ালের গায়ে ওকে দাঁড় করানোর আগে ফাদার নিকানোর সাহায্য করার চেষ্টা করে। ” অনুতাপ করার মত কিছুই নেই আমার” – বলে আর্কাদিও আর এক কাপ কালো কফি পানের পরে নিজেকে ফায়ারিং স্কোয়াডের কাছে সমর্পন করে। ফায়ারিং স্কোয়াডের নেতা যে সংক্ষিপ্ত বিচারে মৃত্যুদন্ডের ব্যাপারে ছিল দক্ষ তার নামটা ছিল কাকতালীয়র চেয়েও বেশি: ক্যাপ্টেন রোকে কারনিসেরো (স্প্যানিশে কারনিসেরো শব্দের অর্থ হচ্ছে কসাই)। গোরস্থানের পথে একটানা গুড়ি বৃষ্টির ভিতর দিয়ে আর্কাদিও দেখতে পেল দিগন্তরেখায় এক উজ্জল বুধবারের ভোরের আগমন। কুয়াশার সাথে সাথে বিদায় নেয় ওর স্মৃতিকারতাও, আর রেখে যায় তার বদলে প্রবল কৌতূহল। শুধুমাত্র ওরা যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়াতে বলে তখনই দেখতে পায় ভেজা চুলে রেবেকাকে, গোলাপী রংয়ের ফুল ছাপানো জামা পরে বাড়ির দরজা জানালা খুলছে হাট করে। সে চেষ্টা করে যাতে করে রেবেকা তাকে চিনতে পারে। তখন কোনো কারণ ছাড়াই রেবেকা দেয়ালের দিকে তাকায়, আর বিস্ময়ে নিশ্চল হয়ে কোনো রকমে হাত নেড়ে বিদায় জানায় আর্কাদিওকে।একইভাবে আর্কাদিও-ও বিদায় জানায় ওকে। সেই সময়ে ধোঁয়া ওঠা রাইফেলগুলো তাক করা হল ওর দিকে আর সে শুনতে পেল অক্ষরে অক্ষরে মেলকিয়াদেসের সুর করে পড়া ধর্মীয় চিঠি, অনুভব করে ক্লাশ ঘড়ে কুমারী সান্তা সোফিয়া দেলা পিয়েদাদের পথ হারানো পদক্ষেপ, অনুভব করে ওর নিজের নাকে একই কাঠিন্য, যে রকম কাঠিন্য তার মনোযোগ কেড়েছিল মৃত রেমেদিওসের নাকের ফুটো। “আহ, কি বোকা,” ভাবার সময় পেল- “ভুলেই গেছি বলতে যে যদি মেয়ে হয় তাহলে যেন ওর নাম রাখা হয় রেমেদিওস “ সেই সময়ে জড়ো হওয়া আর সারা জীবনব্যাপী জ্বালিয়ে মারা প্রচন্ড আতংকের থাবা ফিরে আসে ওর কাছে। ক্যাপ্টেন গুলির আদেশ দেয়। আর্কাদিও কোন রকমে সময় পায় বুক ফুলিয়ে, মাথা উচুঁ করার। সে বুঝতেই পারে না কোত্থেকে আসে গরম তরল পদার্থ যাতে জ্বলে যাচ্ছে তার উরু। “হারামজাদারা” চিৎকার করে-
“উদারপন্থি দল, জিন্দাবাদ”!

মে মাঝে যুদ্ধ শেষ হয়। সরকার পক্ষের বিদ্রোহীদের কঠিন শাস্তি দেবার অঙ্গীকারে সোচ্চারিত ঘোষণার দুই সপ্তাহ আগেই ধরা পরে যায় কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া। আরেকটু হলেই সে আদিবাসীদের ওমার ছদ্মবেশে পশ্চিম সীমান্তে পৌছে যেত। যে একুশজন ওর সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল তাদের মধ্যে চৌদ্দজন মারা যায় যুদ্ধে, ছয়জন হয় আহত আর চুড়ান্ত পরাজয়ের সময় তাকে সঙ্গ দিয়েছিল শুধু মাত্র একজন, কর্ণেল হেরিনালদো মার্কেস। এই খবর মাকন্দোতে আসে এক বিশেষ ফরমানের মাধ্যমে। ”সে বেঁচে আছে” উরসুলা খবরটা জানায় স্বামীকে-“চল ,ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন শত্রুপক্ষের দয়া হয়। “ তিনদিন কান্নার পর এক বিকেলে রান্নাঘরে যখন দুধের মিষ্টি নাড়া দিচ্ছিল তখন পরিষ্কার ছেলের গলার স্বর তার কানে আসে। ‘‘আউরেলিয়ানোর গলা ছিল ওটা”- চিৎকার করে চেষ্টনাট গাছের দিকে ছুট লাগায় স্বামীকে খবরটা দেবার জন্য- “জানি না কিভাবে অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটল কিন্তু সে বেঁচে আছে এবং খুব শীঘ্রই ওকে আমরা দেখতে পাব” । এটাকে সে নিশ্চিৎ বলে ধরে নেয়। ঘরের মেঝে ধোয়ার ব্যবস্থা করে আর আসবাবপত্রের জায়গা করে। কয়েক সপ্তাহ পর নাটকীয়ভাবে এক অশুভ ইঙ্গিত শোনা যায় যেটার কোনো সরকারী ফরমানের ভিত্তি ছিল না; কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুন্দিয়াকে মৃতুদন্ড দেয়া হয়েছে আর লোকজনকে শিক্ষা দেবার জন্য সেটা সম্পন্ন করা হবে মাকন্দোতেই।

এক সোমবার, সকাল দশটা বিশে উরসুলার “ওকে নিয়ে আসছে।”–এই চিৎকার করে ঘড় ভাঙার এক মুহূর্ত আগে, যখন আমারান্তা আউরেলিয়ানো হোসেকে কাপ পরাচ্ছিল তখন শোনা যায় দূর থেকে আসা এক বনশিঙ্গার আওয়াজ আর সেনাদলের উপস্থিতির শব্দ। বন্দুকের কুদোর ঘায়ে উপড়ে পরা লোকজনকে সামাল দিতে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয় ওদেরকে। উরসুলা আর আমারান্তা ভীড়ের মধ্যে পথ করে নিয়ে রাস্তার বাঁকে পৌঁছায় আর দেখতে পায় আউরেলিয়ানোকে। ভিখাড়ীর মত দেখাচ্ছিল ওকে। পরনে ছেড়া কাপড়, চুল দাড়ি জট পাকানো আর খালি পা ছিল ওর। গরম ধুলার দিকে আমল না দিয়ে হাঁটছিল সে, হাত দুটো ছিল দড়ি দিয়ে পিছমোড়া করে বাধা আর এক অশ্বারোহী অফিসার ঘোড়ার মাথার উপর ধরে রাখছিল দড়িটাকে। একইভাবে ছিন্ন পোশাকে বিধ্বস্ত হেরিনালদো মার্কেসকেও নিয়ে যাচ্ছিল ওরা। কিন্তু ওরা বিমর্ষ ছিল না। বরং ওরা যেন সৈন্যদের উদ্দেশ্যে অকথ্য ভাষায় চিৎকাররত মিছিলের উপরই বিরক্ত। “বাছা আমার ” – সমবেত গর্জনের মধ্যে চিৎকার করে উরসুলা আর এক সৈন্য তাকে থামানোর চেষ্টা করায় এক থাপ্পড় দেয় তাকে। অফিসারের ঘোড়া পিছু হটে। ফলে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া থেমে দাড়িয়ে কেঁপে উঠে মায়ের বাড়িয়ে দেয়া হাত এড়িয়ে মায়ের চোখের উপর এক কঠিন দৃষ্টিতে চোখ রাখে।

-বাড়ি ফিরে যাও, মা” বলে-“কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাও আর পরে আমার সঙ্গে দেখা কর জেলখানায়” । মায়ের দুপা পিছনে ইতস্তত আমারান্তাকে দেখে তখন, আর হেসে জিজ্ঞেস করে তোর হাতের এ অবস্থা হয়েছে কিভাবে? “আমারান্তা কালো ব্যান্ডেজসহ হাতটা উঁচু করে বলে-পুড়ে গিয়েছে আর উরসুলাকে সরিয়ে নেয় যাতে ঘোড়াগুলো তাকে না মাড়ায়। সৈন্যদল এগিয়ে যায় আর বিশেষ এক দল বন্দীদের ঘিড়ে ফেলে দ্রুত নিয়ে যায় কারাগারে।
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


1 Response

  1. Mostafa Tofayel says:

    I have just looked at serial 20 of the translation.Mr Anis has done a translation close to our everyday language,very much of today and so spontaneous in expression.Mr Anis has been In Columbia, Argentina and Mexico for about two dozens of years, comprising half the span of his life as a man and has owned Spanish as if a language of near his mothertongue. As such his translation is sure to bear the fervor, the smell, the touch, the glamor and the accent and the intonation and modulation, the levity and the gravity of Gabo, the original. It is indeed a reward for us. I have my thanks for Mr Anis and for bdnewsarts page. But, can the serial appearance be speeded up ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.