অনুবাদ গল্প, বিশ্বসাহিত্য

তোতাপাখির পুনর্জন্মের গল্প

আলম খোরশেদ | 15 Apr , 2015  

eduardo-galeano.jpegসদ্য প্রয়াত লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো (১৯৪০- ২০১৫): সমকালীন লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন এদুয়ার্দো গালেয়ানো উরুগুয়াই-এর মন্তেবিদেয়ো শহরে ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে ঐতিহাসিক, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সাংবাদিক ও সমাজচিন্তক। অভিনব ভাষা ও ভঙ্গিতে লেখা তাঁর কালজয়ী রচনা ওপেন ভেইনস অভ্ লাতিন আমেরিকা (১৯৭১) এই মহাদেশের সমাজ-ইতিহাস-রাজনীতি-অর্থনীতি বোঝার জন্য একটি অপরিহার্য গ্রন্থ হিসাবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এছাড়া তাঁর অপর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে: (ট্রিলজি) মেমোরি অভ্ ফায়ার (১৯৮২-১৯৮৬), ছোটগল্প গ্রন্থ দ্য বুক অভ্ এমব্রেসেস (১৯৮৯) এবং মিররস: স্টোরিজ অভ্ অলমোস্ট এভরিওয়ান (২০০৮) ইত্যাদি। গত ১৩ এপ্রিল তিনি মারা গেছেন। গালেয়ানোর এই গল্পটি মূল থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্যের অনুবাদক ্ও বিশেষজ্ঞ আলম খোরশেদ। বি.স

তোতাপাখিটি ফুটন্ত পানির পাত্রে পড়ে যায়। সে পাত্রে উঁকি দিয়েছিল, তাতেই মাথা ঘুরে পড়ে যায়। তার কৌতূহলের জন্যই সে পড়ে গিয়ে গরম সুপের ভেতর তলিয়ে যায়। তার বন্ধু ক্ষুদে মেয়েটি এতে কেঁদে ফেলে।
একটি কমলা খোসামুক্ত হয়ে সান্ত¡না স্বরূপ নিজেকে নিবেদন করে।
পাত্রের নিচে যে আগুন জ্বলছিল সেটি অনুতপ্ত হয় এবং নিজেকে নিভিয়ে ফেলে।
দেয়াল থেকে একটি পাথর নিজেকে খসিয়ে নেয়।
দেয়ালে হেলান দিয়ে বেড়ে ওঠা গাছটি শোকে কেঁপে ওঠে এবং তার সবক’টা পাতা ঝরিয়ে দেয়।
প্রতিদিনের মতই বাতাস আসে পাতাভরা গাছের চুল আঁচড়াবে বলে, কিন্তু তাকে সে নগ্ন দেখতে পায়। সে যখন বুঝতে পারে কী ঘটেছে তখন তার একটি ঝাপটা হারিয়ে বসে।
সেই হারানো ঝাপটা জানালা খুলে বেরিয়ে পড়ে এবং পৃথিবীর পথে কিছুক্ষণ এলামেলো ঘুরে আকাশে উঠে যায়।
আকাশ খারাপ খবরটা জানতে পেরে ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
আর ফ্যাকাসে আকাশকে দেখে মানুষটি তার কথা হারিয়ে ফেলে।
সিয়ারার কুমোর তার কারণ জানতে চাইলো।
অবশেষে লোকটি বাক ফিরে পেয়ে বলে যে,
তোতাপাখিটি ডুবে গিয়েছিল
আর ছোট্ট মেয়েটি কেঁদে উঠেছিল
আর কমলালেবু তার খোসা থেকে বেরিয়ে এসেছিল
আর আগুন নিভে গিয়েছিল
আর দেয়াল থেকে একটি পাথর খসে গিয়েছিল
আর গাছ তার পাতা ঝরিয়ে দিয়েছিল
আর বাতাস তার একটি ঝাপটা হারিয়ে ফেলেছিল
আর জানালা খুলে গিয়েছিল
আর আকাশ হয়ে গিয়েছিল ফ্যাকাসে
আর লোকটি তার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল

এরপর কুমোর এইসব দুঃখকে একত্র করে। তার হাতজোড়া সেগুলো দিয়ে মৃতকেও পুনর্জন্ম দিতে পারে।
তোতাপাখিটির শাস্তির মেয়াদ শেষ হলে তার গায়ে গজায়
লাল আগুনের পালক
আর আকাশী নীল পালক
আর গাছের সবুজ পাতার পালক
আর পাথরের মত শক্ত আর কমলার মত সোনালী ঠোঁট
আর কথা বলার জন্য মানুষের ভাষা
আর পান করে শরীর জুড়ানোর জন্য চোখের জল
আর পালিয়ে যাওয়ার জন্য একটা খোলা জানালা
যার ভিতর দিয়ে সে বাতাসের ঝাপটায় ভর করে উড়ে চলে গেলো।

Flag Counter


4 Responses

  1. অরুপ রতন অপু says:

    মন খারাপ করে দেয়া অসম্ভব একটা ভালোলাগায় মনটা ছুয়ে গেল । হঠাৎ করেই তোতাপাখিটার জন্য প্রচণ্ড খারাপ লাগা একটা গুমট কষ্ট এসে মনটাকে ছুয়ে গেল কিন্তু শেষ বাক্যটি পড়ার পর ইচ্ছে করছে একটা খোলা জানালা দিয়ে দূরে কোথাও উড়ে যেতে ।

  2. poliar wahid says:

    mone holo kobita porlam aha darun…..

  3. ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন says:

    প্রিয় আলম খোরশেদ,
    ভারী সুন্দর কবিতার মত তোতাপাখির পুনর্জন্মের গল্পটি। কি অপূর্ব কল্পনা ও দৃশ্যকল্প। এদুয়ার্দো গালেয়ানোর কোন রচনা এই প্রথম পড়লাম মুগ্ধ চিত্তে। একজন শিল্পী (কুমোর) তোতা পাখীটির মৃত্যু এবং সেই শোকে প্রকৃতির নানা জনের কাতরতাকে কল্পনায় রেখে সুন্দর, বর্ণময় তোতা পাখীটির পুনর্জন্ম সম্ভব করলো, তার এমন কাব্যিক বর্ণনা মনকে আনন্দে ভরে দেয়। আপনার নিটোল অনুবাদের গুনেই তা হলো। আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। ভূমিকায় দেয়া গালেয়ানোর লেখাগুলো পড়ব বলে স্থির করেছি। ভাল থাকুন।

    মো. আনোয়ার হোসেন
    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
    hossain.50@gmail.com

  4. farhan says:

    comotkar ekta choto golpo.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.