অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 8 Apr , 2015  

garcia_marquez.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৯
পিয়েত্র ক্রেসপি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে । কাঁদে লজ্জাহীনভাবে, আঙ্গুলগুলোকে প্রায় ভেঙ্গে ফেলে হতাশায়, কিন্তু তার সিদ্ধান্তে ভাঙ্গন ধরাতে পারে না । “সময় নষ্ট করো না” এটাই ছিল আমারান্তার বলা সব কথা- “সত্যিই যদি আমাকে এতই ভালবাস তাহলে এ বাড়িতে আর পা ফেল না” । উরসুলার মনে হচ্ছিল লজ্জায় সে মরে যাবে । পিয়েত্র ক্রেসপি মিনতির ঝুড়ি খালি করে ফেলে । অপমানিতের চরম পর্যায়ে পৌঁছায় সে । পরে যার কোলে মাথা রেখে সারা বিকেল কেঁদে কাটায় সে হচ্ছে উরসুলা। উরসুলা যদি প্রাণটা বিক্রি কর হলেও তাকে সান্ত্বনা দিতে পারত তাহলে তাই করত। বৃষ্টির রাতগুলোতে তাকে দেখা যেত সিল্কের ছাতা মাথায় বাড়ির চারিদিকে ঘুরতে, আমারান্তার শোবার ঘরে জ্বলে ওঠা আলোয় আশ্চর্য হবার অপেক্ষায়। তখনকার মত এত সুন্দর পোশাক সে কখনই পরেনি । ওর রাজসিক সম্রাটের মাথা, যন্ত্রনার ভারে অর্জন করে এক নতুন ধরনের মহিমা । বিরক্ত করে আমারান্তা বান্ধবীদের, যারা আমারান্তার সঙ্গে এমব্রয়ডারি করত তাদের, যাতে করে তারা ওকে রাজি করানোর চেষ্টা করে । ব্যবসায় মনে দেয় না, সারাদিন কাটিয়ে দিত দোকানের পেছনে বসে, প্রলাপেভরা চিরকূট লিখে আমারান্তার কাছে পাঠিয়ে দিত শুকনো ফুলের পাপড়ি আর প্রজাপতির পাখা ভরে, আর আমারান্তা ওগুলো ফেরত দিত না খুলেই । ঘরবন্দি হত ঘণ্টার পর ঘন্টা গিটার বাজাতে । এক রাতে সে গান গায়। মাকন্দো জেগে ওঠে বিস্ময়াহত হয়ে, স্বর্গীয় এই গিটারের বাজনা এই পৃথিবীর হতে পারে না। আর এমন ভালবাসার কণ্ঠ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি থাকতে পারে না। তখন আমারান্তার জানালা ছাড়া গ্রামের সব জানালাতেই আলো দেখতে পায় পিয়েত্র। নভেম্বরের দু তারিখ, মৃতদের দিন। ওর ভাই গুদামঘর খোলে, আর দেখতে পায় সবগুলো বাতি রয়েছে জ্বালানো, সবগুলো মিউজিক বাক্স রয়েছে খোলা, ঘড়িগুলো বেজে চলেছে এক অন্তহীন সময়ের জানান দিয়ে, আর সেই উন্মত্ত ঐকতানের মাঝে দোকানের পিছন দিকের ডেস্কে পিয়েত্র ক্রেস্পিকে পেল ছুরি দিয়ে হাতকাটা অবস্থায়। তার দুটো হাতই বেনজএন ভরা গামলায় ডোবানো।
উরসুলা প্রস্তাব করে বাড়িতেই শোকরাত্রি পালন করার। ধর্মীয় অনুষ্ঠানপর্ব আর পবিত্রভূমিতে লাশ দাফনের বিরোধিতা করে ফাদার নিকানোর। উরসুলা তার মুখোমুখি হয়ে মোকাবেলা করে। “কোনভাবেই না আমি, না আপনি ওকে বুঝতে পারব। লোকটা ছিল এক সন্ত”- বলে উরসুলা- “কাজেই ওকে কবর দিচ্ছি আমরা মেলকিয়াদেসের কবরের পাশে তোমার মতের বিরুদ্ধেই”। আর সেটা করে সে গ্রামের সকলের সমর্থন নিয়ে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। আমারান্তা বিছানা ত্যাগ করে না। নিজের শোবার ঘর থেকে শুনতে পায় উরসুলার আরতি, বাড়ি ভেঙ্গে পরা মানুষের ফিশফিসানি, ভাড়াটে শবানুগামীদের আর্তনাদ আর পরে পায়ে দলিত ফুলের মাঝে এক গভীর নীরবতা। দীর্ঘদিন ধরে সন্ধ্যাবেলায় পিয়েত্র ক্রেস্পির ল্যাভেন্ডারের সুগন্ধিযুক্ত নিঃশ্বাস অনুভব করে সে, কিন্তু অপ্রকৃতিস্থতায় ডুবে না যাওয়ার জন্য শক্তি থাকে তার। উরসুলা বর্জন করে তাকে। যে বিকেলে রান্নাঘরে ঢুকে কয়লার আগুনে হাত ঢুকিয়ে অপেক্ষা করে যতক্ষণ পর্যন্ত না ক্রমশই প্রচণ্ড ব্যথা পেতে পেতে আর কোনো ব্যাথা অনুভব করে না বরঞ্চ পায় নিজের হাতের পোড়া গন্ধ, উরসুলা এমনকি সেদিনও মুখ তুলে তাকায় না ওর দিকে। সেটা ছিল ওর অনুতাপ নিরাময়ের এক নির্বোধ প্রচেষ্টা। এর পরে অনেকদিন পর্যন্ত এক হাত গামলায় ভর্তি ডিমের সাদা অংশে ডুবিয়ে বাড়িময় ঘুরে বেড়ায়। আর যখন পোড়া ক্ষত সেরে ওঠে, মনে হয় যেন ডিমের সাদা অংশ তার হৃদয়ের আলসারটাকেও সাড়িয়ে তুলেছে। এই দুঃখজনক ঘটনা একমাত্র যে বাহ্যিক চিহ্ন রেখে যায় তা হচ্ছে, পুড়ে যাওয়া হাতটার উপরের কালো ব্যান্ডেজ যেটাকে সে আমৃত্যু পরে থাকবে।

আর্কাদিও দেখায় উদারতার এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত। পিয়েত্র ক্রেস্পির মৃত্যুতে সরকারি শোকদিবশ ঘোষণা করে। উরসুলার কাছে এটাকে মনে হয় পথহারা মেষশাবকের ঘড়ে ফেরার মত ব্যাপার। কিন্তু সে ভুল করে। আর্কাদিওকে হারিয়ে ফেলেছে যেদিন সে সামরিক পোশাক পড়েছে সেদিন নয়, বরঞ্চ চিরদিনই সে পথ হারানো ছিল। রেবেকাকে যেমন মানুষ করেছে ভেবেছিল তেমনই করেছে আর্কাদিওকেও, অন্যান্য ছেলেমেয়েদের চেয়ে কম সুবিধে দিয়ে বা বৈষম্য সৃষ্টি করে নয়। কিন্তু অনিদ্রা রোগের সময়, উরসুলার পরহিতকারিতার আতিশয্যের সময়, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার বিকারের সময়, আউরেলিয়ানো যখন সবকিছুই গোপন রাখত, আর যখন রেবেকা আর আমারান্তার মধ্যে ছিল মরণপণ প্রতিদ্বন্দিতা, আর্কাদিও তখন ছিল এক নিঃসঙ্গ ভীত শিশু। আউরেলিয়ানো ওকে লিখতে আর পড়তে শিখিয়েছে নিজের রক্তের কেউ মনে করে নয়, বরঞ্চ সে যেমনটি শেখাত অজ্ঞাত অন্য কাউকেও। ওকে জামাকাপড় উপহার দিত যাতে ভিসিতাছিওন ছোট করে দেয় যখন সেগুলোকে ফেলে দেবার সময় হয়েছে। বড় সাইজের জুতো নিয়ে, তালি দেয়া পান্তালুন নিয়ে আর মেয়েদের মত নিতম্ব নিয়ে আর্কাদিও সবসময়ই ভুগতো। কারও সাথেই ভালভাবে ভাব বিনিময় করতে পারে নি সে, যেমনটি পেরেছিল ভিছিতাসিওন ও কাতাউরের সঙ্গে ওদের নিজস্ব ভাষায়। একমাত্র মেলকিয়াদেসই সত্যিকার অর্থে তার ভার নিয়ে আর্কাদিওকে তার দুর্বোধ্য লেখা শুনতে বাধ্য করত আর দাগেরটাইপ শিল্পের ব্যাপারে জ্ঞানদান করত। কেউ ভাবতেও পারবে না মেলকিয়াদেসের মৃত্যুতে সে গোপনে কত কেঁদেছে, আর মরীয়া হয়ে ওর অকেজো কাগজপত্র পড়ে তাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছে। স্কুলে সকলে তার প্রতি মনোযোগ দিত, তাকে সম্মান করত। আর পরে মহিমাময় উনিফর্ম আর তার কঠোর আদেশগুলো তাকে এনে দেয় ক্ষমতা। আর এগুলোই তাকে তার পুরাতন তিক্ততা থেকে মুক্তি দেয় । এক রাতে কাতাউরের দোকানে একলোক দুঃসাহস করে বলে, “যে পদবী তুমি ব্যবহার করছ তার যোগ্য তুমি নও”। সবাই যার জন্য অপেক্ষা করছিল তা হলো না । লোকটাকে গুলি করার আদেশ দেয় না আর্কাদিও । বরঞ্চ সে বলে “ এটাই হচ্ছে সম্মানকর” – বলে “ যে আমি বুয়েন্দিয়া নই” ।

যারা ওর জন্মের গুপ্ত রহস্য জানত তারা ভাবে যে এই উত্তরের অর্থ হচ্ছে সে ব্যাপারটা সম্বন্ধে অবগত কিন্তু আসলে সে কখনোই তা জানতে পারেনি । ওর মা পিলার তেরনেরা দাগেরটাইপের ঘরে ওর রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, যেটা ছিল এক অপ্রতিরোধ্য আচ্ছন্নতা। যেমনটি হয়েছিল প্রথমে হোসে আর্কাদিওর মধ্যে, আর পড়ে আউরেলিয়ানোতে । যদিও সে তার লাবণ্য আর হাসির জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছিল, তবুও আর্কাদিও খুঁজে বেড়াত আর পেয়েও যেত তার ধোঁয়ার গন্ধ । যুদ্ধের কিছুদিন পুর্বে এক দুপুরে পিলার তেরনেরা তার ছোট ছেলেকে খুঁজতে স্কুলে আসে বরাবরের চেয়ে একটু দেরি করে। আর্কাদিও ওর জন্য অপেক্ষা করছিলো সিয়েস্তার (দিবানিদ্রা) ঘরটাতে, যে ঘরটাতে পরে লোকজনের পায়ে বেড়ি পরিয়েছিল সে । যখন বাচ্চাটা উঠানে খেলছিল উৎকণ্ঠার সাথে হ্যামকে অপেক্ষা করছিল আর্কাদিও । জানত যে পিলার তেরনেরাকে ওখান দিয়েই যেতে হবে । আসে পিলার, আর্কাদিও তার হাতের কব্জি ধরে আর টেনে তুলতে চেষ্টা করে হ্যামকে । “পারব না, পারব না” আতংকের সাথে বলে পিলার তেরনেরা । “তুই চিন্তাও করতে পারবি না, তোকে আমি খুশি করতে পারলে কতো ভাল লাগতো, কিন্তু ঈশ্বর সাক্ষী আমি তা পারবো না । আর্কাদিও তাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া প্রচন্ড শক্তি দিয়ে কোমড় ধরে, আর আর্কাদিওর মনে হয় পৃথিবীটা উধাও হয়ে যাচ্ছে ওর গায়ের ত্বকের স্পর্শে । “সতীপনা দেখাসনে” বলে- “সবাইতো জানে তুই বেশ্যা” । পিলার তেরনেরা ওর জঘন্য নিয়তির ফলে, এসে ফেলা বমি কোনভাবে ঠেকায় । “বাচ্চারা জেনে যাবে” ফিসিফিসিয়ে বলে “তার চেয়ে ভাল হয় যদি আজ রাতে দরজার হুড়কোটা আলগা করে রাখিস” । সেই রাতে জ্বরগ্রস্থ রোগীর মত কাঁপতে কাঁপতে হ্যামকে অপেক্ষা করে আর্কাদিও । অপেক্ষা করে নিদ্রাহীন, অন্তহীন ভোররাতের কামোজ্জিত ঝিঝি পোকার ডাক শুনতে শুনতে, অপেক্ষা করে কাদাখোঁচা পাখিগুলোর অবিশ্রান্ত প্রহর শুনতে শুনতে আর প্রতি মুহুর্তেই আরও নিশ্চিত হয় যে তাকে ঠকানো হয়েছে । এই সময় যখন উৎকন্ঠা পচে গিয়ে ক্রোধে রূপ নিচ্ছে, দরজাটা খুলে যায় । কয়েক মাস পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে আর্কাদিওর মনে পড়ে যায় ক্লাশরুমে হারিয়ে ফেলা পদক্ষেপ গুলোর কথা, বেঞ্চের সঙ্গে হোঁচট খাওয়ার কথা, আর শেষ পর্যন্ত ঘরের অন্ধকারে এবং শরীরের ঘনত্বের কথা আর এক বাতাসের চাবুকের কথা যে বাতাস পাম্প করা হয়েছে তার নয় এমন হৃদপিন্ড থেকে । হাতটা বাড়িয়ে দেয় সে আর নাগাল পায় একই আঙ্গুলে দুটো আংটি পরা এক হাতের । যে হাতটা আরেকটু হলেই অন্ধকারে ডুবে মরতে যাচ্ছিল । অনুভব করে শিরার গঠন প্রকৃতি, দুর্ভাগ্যভরা নাড়ির গতি, আর অনুভব করে ভেজা এক তালু যে তালুর জীবন রেখাটাকে বুড়ো আঙ্গুলে গোড়া থেকেই কেটে দিয়েছে মৃত্যুর থাবা । তখন বুঝতে পারে এ সে নয়, যার জন্য সে অপেক্ষা করছে । কারন এর গায়ে ধোঁয়ার গন্ধ নেই, আছে ফুলের মত গন্ধ ভরা চুলের ক্রীমের সুবাস । এর বুক দুটো ফোলানো, আর বুকের বোঁটা দুটো পুরুষদের মত, অন্ধের চোখের মত ভিতর দিকে দাবানো, পাথরের মত গোলাকার যোনীর মেয়েটা থেকে বেরুচ্ছিল অনাভঙ্গতার বিশৃঙ্খল উদ্দীপিত পেলবতা । মেয়েটা কুমারী ছিল আর তার নাম ছিল বিশ্বাসের অযোগ্য- সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ । পিলার তেরনেরা ওকে দিয়েছে সারা জীবনের সঞ্চয়ের অর্ধেকটা- পঞ্চাশ পেসো । যা সে করছে এখন, এই কাজটা করার জন্য । আর্কাদিও ওকে বহুবার দেখেছে তার বাবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকানে সাহায্য করতে কিন্তু কখনই ভাল করে তাকায়নি কারন সব সময়ে অদৃশ্য থেকে উপযুক্ত সময়ে উপস্থিত হবার এক বিরল গুণ ছিল ওর মধ্যে । কিন্তু সেই দিন থেকে মেয়েটা আর্কাদিওর বগলতলার লোমের মধ্যে বিড়ালের মত গুটি পাকিয়ে রইল । পিলার তেরনেরা ওর বাবা- মাকে তার সঞ্চয়ের বাকি অর্ধেক দিয়ে দেয়ায় তাদের মত নিয়ে মেয়েটা সিয়েস্তার সময়ে স্কুলে যেত, আরও পরে যখন সরকারী বাহিনী স্কুলটাকে তাদের প্রয়োজনে খালি করে ফেলে তখন তারা মিলিত হতো চর্বিভরা ক্যানের বা ভুট্টার বস্তার মাঝের খালি জায়গায়, দোকানটার পিছনে । যখন আর্কাদিওকে সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্ব বলে ঘোষণা করা হয় ঐ সময়ের দিকে তাদের এক মেয়ে জন্মায় ।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে ব্যাপারটা জানতো শুধু হোসে আর্কাদিও আর রেবেকা । আর্কাদিও ওদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখত আত্মীয়তার কারণে নয় বরঞ্চ দুস্কর্মে পরস্পরের যোগসাজসের কারণে । ততদিনে হোসে আর্কাদিওর ঘাড় বাকিয়ে দিয়েছে সংসারের জোয়াল । রেবেকার দৃঢ় চরিত্র, তার জঠরের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা, তার প্রচন্ড উচ্চাশা, শুষে ফেলে তার স্বামীর অসাধারণ শক্তি, ফলে অলস মেয়ে পাগললোকটা পরিণত হয়েছে এক প্রকান্ড কর্মী জন্তুতে । পরিষ্কার এবং সাজানো এক বাড়ি ছিল ওদের । ভোরবেলা রেবেকা হাট করে খুলে দিত দরজা জানালাগুলো আর গোরস্থানের কবর থেকে আসা বাতাস জানালা দিয়ে ঢুকে উঠানের দরজা দিয়ে বের হয়ে যেত। আর চুনকাম করা দেয়াল ও আসবাবগুলোকে তামাটে করে দিত মৃতদের সোরা । তার মাটির খিদে, বাবা মায়ের হাতের ক্লক ক্লক শব্দ; পিয়েত্র ক্রেসপির নিষ্ক্রিয়তার সামনে তার রক্তের উন্মাদনা– এসবই ঠাই নিয়েছে স্মৃতির চিলেকোঠায় । যুদ্ধের আশংকা দূরে রেখে সারাদিন এমব্রয়ডারি করত জানালার পাশে বসে যতক্ষণ না আলমারীর সিরামিক পটগুলো কাঁপতে শুরু করত, আর সে উঠে পরতো খাবার গরম করতে, কৃশ শিকারী কুকুরগুলো হাজির হবার অনেক আগে । তারপর হাজির হতো নোনলা বন্দুক হাতে, মাঝে মাঝে কাঁধে হরিণ ঝুলিয়ে আর প্রায় সবসময়ই দড়িতে ঝোলানো খরগোস আর বুনোহাঁসসহ লম্বা মোজা আর নাল লাগানো বুটপরা মানুষটা । একবার শাসনামলের গোড়ার দিকে আর্কাদিও অসময়ে গিয়ে উপস্থিত হয় ওদের বাড়িতে । বিয়ে করে বাড়ি ত্যাগের পর আর্কাদিওর আর ওদের মধ্যে দেখা হয়নি । কিন্তু ওদের কাছে আর্কাদিওকে এতই আপন আর আদরের বলে মনে হয় যে তাকে ওরা একসাথে খাবারের আমন্ত্রণ জানায় । যখন ওরা কফি নিয়ে বসে একমাত্র তখনই আর্কাদিও তার আগমনের কারণটা জানায়; হোসের বিরুদ্ধে এক অভিযোগ তার কাছে এসেছে । অভিযোগটা হচ্ছে সে নিজের জমি চাষ করতে করতে বলদগুলোর সাহায্যে সোজা প্রতিবেশির বেড়া ভেঙ্গে সবচেয়ে ভাল জমিগুলো জবরদখল করে নিয়েছে । আর যেসব জমির উপর তার কোনো উৎসাহ নেই তাদের মালিকদের সম্পত্তি থেকে বিতাড়ন করেনি । তাদের উপর এক চাঁদা ধরা হয়েছে আর প্রতি শনিবার শিকারী কুকুর আর দোনলা শটগান নিয়ে সে সেই চাঁদা আদায় করে । হোসে আর্কাদিও অস্বীকার করে না। কারণ দেখায় যে- মাকন্দো পত্তনের সময়ে যে সমস্ত জমিগুলো আসলে তার পরিবারের সদস্যদের প্রাপ্য ছিল সেগুলো অন্যদের দিয়ে দেয় বিধায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া তখন থেকেই পাগল ছিল আর সেই কারণেই হোসে আর্কাদিওর জমিগুলোর উপর অধিকার আছে । ওটা ছিল এক অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক কারণ আর্কাদিও সুবিচার করতে আসেনি । একটা রেজিস্ট্রি অফিস স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করে সে যাতে করে হোসে আর্কাদিও দখল করা জমিগুলোর দলিল বৈধ করে নেয় আর খাজনা আদায়ের ভার অর্পন করে স্থানীয় সরকারে উপর । ওরা একমত হয় এ ব্যাপারে । কয়েক বছর পর যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া দলিলগুলোর স্বত্ব পরীক্ষা করে দেখতে পায় যে হোসে আর্কাদিওর বাড়ির উঠান থেকে দিগন্ত পর্যন্ত সব জমি তার নামে রেজিস্ট্রি করা আর এগার মাস ধরে আর্কাদিও শুধুমাত্র খাজনার টাকাই নেয়নি বরঞ্চ গ্রামের লোকদের কাছ থেকে আর্কাদিওর মালিকানাধীন গোরস্থানে মৃতদের কবর দেবার জন্য খাজনা আদায় করে আত্মসাৎও করেছে ।

জনগনের দলিল সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো জানতে উরসুলার দেরি হয় কয়েক মাস কারণ ওর ভোগান্তি যাতে না বাড়ে তার জন্য সবাই এসব তার থেকে লুকিয়ে রাখত । উরসুলা সন্দেহ করতে শুরু করে । স্বামীর মুখে তোতুমো (লাউয়ের আকৃতির এক ধরনের ফল)-র সিরাপ ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে করতে কৃত্রিম অহংকারের সাথে বলে “আর্কাদিও একটা বাড়ি বানাচ্ছে” কিন্তু নিজের অজান্তেই দীর্ঘঃশ্বাসের সঙ্গে যোগ করে: “কিন্তু জানি না কেন যেন এসব কিছুর মধ্যেই বদ গন্ধ পাচ্ছি আমি” । পড়ে যখন জানতে পারে যে আর্কাদিও শুধুমাত্র বাড়িই শেষ করেনি সে ভেনিসিও আসবাবপত্রেরও অর্ডার করেছে তখন সে সন্দেহমুক্ত হয় যে আর্কাদিও জনগনের অর্থ খরচ করেছে । “তুই আমাদের পদবীর কলংক”, মিসার (গীর্জার ধর্মোপদেশ) পরে এক রোববারে চীৎকার করে উরসুলা, যখন দেখে আর্কাদিও নতুন বাড়িতে তার অফিসারদের সঙ্গে তাস খেলছে । আর্কাদিও মনোযোগ দেয় না তার দিকে । একমাত্র তখনই উরসুলা জানতে পারে যে তাদের ছয় মাস বয়সী এক মেয়ে আছে আর সে বিয়ে ছাড়াই বাস করছে, সান্ত মারিয়া দে সোলেদাদের সঙ্গে যে নাকি আবার পোয়াতি । যেখানেই থাকুক না কেন আউরেলিয়ানোকে চিঠি লিখে বর্তমান অবস্থার সব লিখে জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় উরসুলা । কিন্তু দ্রুত ঘটে যাওয়া তখনকার ঘটনাগুলো শুধুমাত্র তার এই পরিকল্পনায় বাধ সাধে তাই-ই নয়, বরঞ্চ পরে এই কথা ভাবার জন্য অনুতপ্ত হয় । যুদ্ধ নামক যে শব্দটা তখন পর্যন্ত বোঝাতো একটা দূরবর্তী অবস্থার পরিস্থিতিকে আর সেটাই হয়ে উঠল এক নাটকীয় বাস্তবতা । ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ঝাড়ুবোঝাই এক গাধার পিঠে চড়ে হাজির হয় এক পান্ডুর চেহারার বৃদ্ধা । তার চেহারা এতই নিরীহদর্শন ছিল যে গ্রাম পাহারার দায়িত্বশীল সেনারা জলাভূমির গ্রামগুলো থেকে আসা যে কোনো ফেরিওয়ালাদের একজন মনে করে কিছু জিজ্ঞেস না করেই ঢুকতে দেয় তাকে । সোজা সৈন্য শিবিরে হাজির হয় সে । আর্কাদিও তাকে অভ্যর্থনা জানায় ক্লাশরুমে যেটা এখন পরিণত হয়েছে এক সৈন্যশিবিরে। যেখানে অংটা থেকে ঝুলছে গুটানো হ্যামক, কোনায় মেঝেতে স্তুপ করা আছে মাদুর, রাইফেল,কারাবাইন এমনকি শিকারের শটগানও । পরিচয় দেবার আগে বৃদ্ধা এক সামরিক কায়দায় স্যালুট দিয়ে বলে:- “আমি কর্নেল গ্রেগরিও স্টীভেনসন” ।
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.