কবিতা

কবিতাগুচ্ছ

tusar_gayen | 5 Apr , 2015  

বৃষ্টি বৃহন্নলা
(উৎর্সগ: ওয়াশিকুর রহমান বাবু)
babu.jpg
কী আছে বাংলায় এই বৃষ্টি ছাড়া?
প্রতিকারহীন পাপ, রক্তধারা, চাপাতির কোপে
ছিট্‌কে পড়া ধূসর মগজ ধুয়ে নিতে দিগন্তরেখায়—
চৈত্রবন্দি গুমোট বিস্ফার কেটে বিদ্যুত ঝলকে নামে
বৃষ্টি বৃহন্নলা(কাপুরুষ সাক্ষী রেখে) সবুজান্ধকারে…

এত জোরে এত আলো মুহুর্মুহু গর্জন কম্পনে
অবিরল ধারাবেগ বাতাসে বাতাস দূর, তর্জনী সংকেত
কেন বাংলা বোবা তুমি, স্তরে স্তরে দ্রোহ, শিলালিপি
ভুলেছ কি সব? অন্ধ, কালো ছাগলের বোট্‌কা গন্ধ ধুয়ে
ফুলের সুগন্ধে ভারী বাতাসের অবশ রেখায়
এবার ঘুমাবে তুমি নিমীলিত চোখ!

স্বীকারোক্তি
(উৎসর্গ: তরিকুল ইসলাম শান্ত)
santo.jpg
তোমার নিঃশব্দ মৃত্যু আমরা সনাক্ত করি বটে, তবে যে আর্তনাদে, প্রবলতায় আমাদের হৃদয়ের পাল্লাগুলো খোলার কথা ছিল তেমন উচ্চকিত আমরা হলাম কই? সহসাই নয়, তিলে তিলে তোমার মৃত্যু নিশ্চিত করে গুপ্তঘাতকের মতো বৃষ্টি তার দীর্ঘ কালোছায়া গুটিয়ে নিল আর আমরা ভাবলাম তোমার মৃত্যু দুঃখজনকভাবে দেহবিকলের ফলাফল, চিৎকৃত আত্মাহুতির মতো প্রবল ও দৃষ্টি আকর্ষণী নয়। অজস্র ধারায় বৃষ্টি তার লুক্কায়িত অস্ত্রে যখন তোমার প্রতিটি রোমকূপে হিম কাঁপুনির আঘাত ছড়িয়ে দিচ্ছিল, তুমি ততটাই সংকল্পবদ্ধ শ্লোগানের আগুনে তাকে বাষ্পীভূত করে দিতে চাইছিলে। আমরা সেই নীরব যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করিনি, যতক্ষণ না পর্যন্ত মৃত্যু এসে জনসমক্ষে সেই ফলাফল ঘোষণা করে। আর্তনাদের মাত্রা যাই হোক না কেন, বাংলা মায়ের জন্য সরবে অথবা নীরবে আত্মদানকারী প্রত্যেকেই শহীদ, সম মর্যাদার!
শান্ত, হে বীর, এই স্বীকারোক্তি তুমি আমাদের শোকগাথার সাথে যুক্ত করে নিয়ো!

সংশপ্তক
(উৎসর্গ: রাজীব হায়দার)
razib.jpg
স্তব্ধতা আরেক বার, ফিরে আসে একাত্তর
কাপুরুষ ঘাতকের অস্ত্রাঘাতে সহোদর
নিহত আমার, সে যে শহীদ প্রজন্ম চত্বরে
আমাদের দাবিগুলো গৃহীত হবার আগে
আমাদের উচ্চারণ সশস্ত্র হবার আগে
তোমার অন্তিম শয্যা বড় চোখে লাগে
হে রাজীব, অভিমন্যু আমাদের
জড়ো করি সমূহ যুদ্ধাস্ত্র আমাদের
চোখে জল আসার আগেই যেন তা
বিদ্ধ করে ঘাতকের দুর্বিনীত শির!

Flag Counter


8 Responses

  1. iqbal hasnu says:

    ধন্যবাদ তুষার গায়েন তিন সহযোদ্ধা বিবেকী কণ্ঠস্বরের প্রতি আপনার শ্রদ্ধার্ঘ্য। কেবল একটি বাক্যে ধন্দে পড়ে যাওয়ার কারণ জানাচিছ। যেখানে অনুপম শব্দ-দ্যোতনা আর বোধের গভীরতায় পাঠকে হিসেবে আমি আরও মানবিক হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছি সেখানে কোনোকিছুর প্রতি অসমর্থন বা বিতৃষ্ণা প্রকাশে “অন্ধ, কালো ছাগলের বোট্‌কা গন্ধ ধুয়ে”-র মতো বাক্যবন্দ কি আমার বোধের ওই উত্তরণ-প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে না?

  2. Firoz, Paris says:

    Dear Tushar Da
    Ami Kobita valo bujhina. Amar dada likhesen tai porlam,valo laglo. Dadar haate aro kobita ashook.

  3. Tushar Gayen says:

    অনেক ধন্যবাদ হাসনু ভাই, কবিতার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাবার জন্য! যে কোনো রচনার মর্মোদ্ধার নির্ভর করে পাঠকের বোধ ও চেতনবিশ্বে কীভাবে তা প্রতিফলিত হচ্ছে তার উপর। পাঠকের সেই স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়েই, এই কবিতার রচয়িতা হিসেবে বলছি যে, “অন্ধ, কালো ছাগলের বোট্‌কা গন্ধ ধুয়ে” বাক্যবন্ধের মাধ্যমে ধর্মান্ধ-ঘাতক-মৌলবাদী শক্তিকে প্রতীকায়িত করা হয়েছে যার উপস্থিতি অসহনীয় ছাগ-গন্ধযুক্ত, যা সমকালে ‘ছাগু’ বিশেষণে ভূষিত। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে আদি ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় জ্ঞান-কর্মের অগ্নিশিখা বহনকারী, সৃষ্টিশীল সমাজ পরিচালকরা তাদের প্রবল প্রতিপক্ষ মৌলবাদী শক্তিকে ‘ছাগল’ অভিধায় (‘ছাগমুণ্ডি দক্ষ’) চিহ্নিত করতেন। “অন্ধ, কালো ছাগলের বোট্‌কা গন্ধ ধুয়ে” বাক্যবন্ধের পরেই রয়েছে “ফুলের সুগন্ধে ভারী বাতাসের” উপস্থিতির কথা যা আমাদের আকাঙ্ক্ষিত সমাজের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও সৌরভের প্রতীক। সমকালীন বাংলাদেশে অগ্রসর মানবিক শক্তির বিপরীতে অন্ধ মৌলবাদী শক্তির দ্বান্দ্বিকতাকে মূর্ত করতেই এইসব ইমেজারী!

  4. matin bairagi says:

    তুষার ভালো কবিতা লেখে। তার কবিতায় এক ধরনের সম্মোহন আছে, আছে শ্রুতিকল্পের গাণিতিক মাপজোঁক এবং শব্দের পরে শব্দের ব্যবহারে দোলায়মানতা । নিবেদিত কবিতা সাধারণত আবদ্ধতায় আটকে থাকে। তুষার তার নিবেদনের ভেতরও একধরনের মিস্টিক ব্যবহারে সার্বজনীন করে তুলতে পেরেছেন, ‘এত জোরে এত আলো মুহুর্মুহু গর্জন কম্পনে
    অবিরল ধারাবেগ বাতাসে বাতাস দূর, তর্জনী সংকেত
    কেন বাংলা বোবা তুমি, স্তরে স্তরে দ্রোহ, শিলালিপি
    ভুলেছ কি সব? অন্ধ, কালো ছাগলের বোট্‌কা গন্ধ ধুয়ে
    ফুলের সুগন্ধে ভারী বাতাসের অবশ রেখায়
    এবার ঘুমাবে তুমি নিমীলিত চোখ!’
    এভাবে তার বিস্তার ও বিন্যাস বলে দেয় সে ভাল কবি, তার কবিতা যে কোনো কবিতা প্রিয় পাঠককে আকৃষ্ট করবে ।

  5. Tushar Gayen says:

    অনেক ধন্যবাদ মতিন ভাই কবিতার পাঠ প্রতিক্রিয়া প্রকাশের জন্য। আমার উপর যখন কোনো কবিতা ভর করে, সেটা যে অনুভব বা বিষয়ের অস্তিত্ব জানান দিয়ে আসে, সেটাই নির্দিষ্ট করে দেয় ঐ কবিতার ভাষা, ছন্দ এবং প্রকরণ কী হবে। নির্দিষ্ট কোনো ছন্দে লিখলে সেটা সঙ্গত কারণেই তার গাণিতিক মাপজোঁক দাবী করে বসে আর ছন্দের বাইরে গিয়ে লিখলেও এক ধরনের অন্তর্গত ছন্দ বা প্রবহমানতা স্থির করে নিতে হয়। কবিতা ও গণিতের সম্পর্ক নিয়ে কবি বিনয় মজুমদারের চির স্মরণীয় প্রবন্ধ রয়েছে। কবিতা সেই গণিতকে ধারণ এবং অতিক্রম করে ক্রমাগত পূর্ণ থেকে পূর্ণতর হয়ে ওঠে।

  6. Reddit says:

    কবিতাটি ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে উৎসর্গ করার জন্য ধন্যবাদ। আমরা চাই না আর কোন ব্লগার এভাবে অকালে প্রাণ হারাক।

  7. কুতুব হিলালী says:

    ধন্যবাদ কবি তুষার গায়েনকে তাঁর সুন্দর ঝাঁঝালো উচ্চারণের জন্যে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রশাসন মনে হয় না আপনার এই কবিতার ভাষা বোঝে। তারা অই অজরামদের নিরাপত্তা দিতে দিনদিন তাদের খামারের পরিধি আরো বাড়াইতেছে বৈকি!

  8. Tushar Gayen says:

    @ Firoz, Reddit, কুতুব হিলালি
    আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানবেন কবিতাগুলো পড়ে আপনাদের মন্তব্য, পাঠ প্রতিক্রিয়া এবং সমর্থন জ্ঞাপনের জন্য।

    কুতুব হিলালি, হ্যাঁ আপনি ঠিকই বলেছেন যে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কবিতার ভাষা বোঝে না, আমাদের উদ্বেগ এবং প্রতিবাদকে গ্রাহ্য করে না আর তাই চারিদিকে ঘোর অমানিশার বলয় তৈরী হচ্ছে। আমরা আমাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকে নিরুপায় কবিতার অক্ষরে লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.