কবিতা, পুনর্মুদ্রণ, সাক্ষাৎকার

মাহবুব উল আলম চৌধুরীর হারিয়ে যাওয়া কবিতা, কবিতার ভ্রান্তি নিরসন ও একটি সাক্ষাৎকার

admin | 28 Dec , 2007  

mahbubul-alam-choudhury-4.jpg
পড়ার টেবিলে মাহবুব উল আলম চৌধুরী।

mahbubul-1953.jpg
১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে একুশে উদযাপন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক মাহবুব উল আলম চৌধুরী

গত ২৩ ডিসেম্বর ঢাকায় মারা গেলেন ভাষাসৈনিক মাহবুব উল আলম চৌধুরী। তিনি জন্মেছিলেন চট্টগ্রামের রাউজানে, ৭ নভেম্বর ১৯২৭ সালে। বায়ান্নোর ২১শে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নাম ঐতিহাসিক ভাবে যুক্ত হয়ে আছে। তিনি একুশের হত্যাকাণ্ডের পরে চট্টগ্রামে জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় মুখে মুখে ‌’কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি রচনা করেন। কবিতাটি প্রকাশের পর পরই বাজেয়াপ্ত হয়। দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ থাকার কারণে এক সময় কবিতাটি হারিয়ে যায়। এই কবিতা নিয়ে নানা সময় লিখেছেন ড. আনিসুজ্জামান, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস (কবিতার প্রথম দুই শ্রোতার একজন), ড. রফিকুল ইসলাম, ড. হায়াৎ মামুদ, বশীর আল হেলাল সহ অনেকে। কারো কাছ থেকেই কবিতাটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় নি। এমনকি কবি নিজেও তা দিতে পারেন নি। দীর্ঘদিন পরে ১৯৯১ সালে অধ্যাপক চৌধুরী জহুরুল হকের গবেষণায় কবিতাটি সম্পূর্ণ রূপ পায়। তিনি এই কবিতা বিষয়ে তার বই প্রসঙ্গ : একুশের প্রথম কবিতা রচনা করেন। উল্লেখ্য, চৌধুরী জহুরুল হক এই কবিতার দুর্লভ কপি উদ্ধার করেন প্যারামাউন্ট প্রসেস এন্ড প্রিন্টিং ওয়র্কসের স্বত্বাধিকারী আবু মোহাম্মদ তবিবুল আলমের কাছ থেকে। তবিবুল আলম সংগ্রহ করেছিলেন কম্পোজিটার নুরুজ্জামান পাটোয়ারীর কাছ থেকে।

কবি, সম্পাদক, রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী মাহবুব উল আলম চৌধুরী নানা পরিচয়ে পরিচিত। তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, এই কবিতা তার একমাত্র পরিচয় হয়ে ওঠায় তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন। এখানে কবিতাটির মুদ্রণপ্রমাদ বিহীন পূর্ণপাঠ, কবিতা নিয়ে তৈরী হওয়া ভ্রান্তি বিষয়ে চৌধুরী জহুরুল হকের তথ্যমূলক রচনা ও ইলু ইলিয়াস-এর নেয়া কবির একটি সাক্ষাৎকার পুনর্মুদ্রিত হলো।

● কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি ।। মাহবুব উল আলম চৌধুরী
● সদয় অবগতির জন্য ।। চৌধুরী জহুরুল হক
● কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর সাক্ষাৎকার ।। ইলু ইলিয়াস

কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি

মাহবুব উল আলম চৌধুরী

ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে—রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়
ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য—বাংলার জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
একটি দেশের মহান সংস্কৃতির মর্যাদার জন্য
আলাওলের ঐতিহ্য
কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের
সাহিত্য ও কবিতার জন্য
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
পলাশপুরের মকবুল আহমদের
পুঁথির জন্য
রমেশ শীলের গাথার জন্য,
জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে
ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল
নজরুলের “খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি।”
এ দুটি লাইনের জন্য
দেশের মাটির জন্য,
রমনার মাঠের সেই মাটিতে
কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর
অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত।
রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সেরা কোনো ছেলের বুকের রক্ত।
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের প্রতিটি রক্তকণা
রমনার সবুজ ঘাসের উপর
আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর জ্বলছে।
এক একটি হীরের টুকরোর মতো
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছেলে চল্লিশটি রত্ন
বেঁচে থাকলে যারা হতো
পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ
যাদের মধ্যে লিংকন, রকফেলার,
আরাগঁ, আইনস্টাইন আশ্রয় পেয়েছিল
যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল
শতাব্দীর সভ্যতার
সবচেয়ে প্রগতিশীল কয়েকটি মতবাদ,
সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে
আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি।
যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে
যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে
আমরা তাদের কাছে
ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ।
আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির দাবি নিয়ে।

আমরা জানি ওদের হত্যা করা হয়েছে
নির্দয়ভাবে ওদের গুলি করা হয়েছে
ওদের কারো নাম তোমারই মতো ওসমান
কারো বাবা তোমারই বাবার মতো
হয়তো কেরানি, কিংবা পূর্ব বাংলার
নিভৃত কোনো গাঁয়ে কারো বাবা
মাটির বুক থেকে সোনা ফলায়
হয়তো কারো বাবা কোনো
সরকারি চাকুরে।
তোমারই আমারই মতো
যারা হয়তো আজকেও বেঁচে থাকতে
পারতো,
আমারই মতো তাদের কোনো একজনের
হয়তো বিয়ের দিনটি পর্যন্ত ধার্য হয়ে গিয়েছিল,
তোমারই মতো তাদের কোনো একজন হয়তো
মায়ের সদ্যপ্রাপ্ত চিঠিখানা এসে পড়বার আশায়
টেবিলে রেখে মিছিলে যোগ দিতে গিয়েছিল।
এমন এক একটি মূর্তিমান স্বপ্নকে বুকে চেপে
জালিমের গুলিতে যারা প্রাণ দিল
সেই সব মৃতদের নামে
আমি ফাঁসি দাবি করছি।

যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে তাদের জন্যে
আমি ফাঁসি দাবি করছি
যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্যে
ফাঁসি দাবি করছি
যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়ে
ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে
সেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্যে।
আমি তাদের বিচার দেখতে চাই।
খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে
শাস্তিপ্রাপ্তদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায়
আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়।

পাকিস্তানের প্রথম শহীদ
এই চল্লিশটি রত্ন,
দেশের চল্লিশ জন সেরা ছেলে
মা, বাবা, নতুন বৌ, আর ছেলে মেয়ে নিয়ে
এই পৃথিবীর কোলে এক একটি
সংসার গড়ে তোলা যাদের
স্বপ্ন ছিল
যাদের স্বপ্ন ছিল আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে
আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার,
যাদের স্বপ্ন ছিল আণবিক শক্তিকে
কী ভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়
তার সাধনা করার,

যাদের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের
‘বাঁশিওয়ালার’ চেয়েও সুন্দর
একটি কবিতা রচনা করার,
সেই সব শহীদ ভাইয়েরা আমার
যেখানে তোমরা প্রাণ দিয়েছ
সেখানে হাজার বছর পরেও
সেই মাটি থেকে তোমাদের রক্তাক্ত চিহ্ন
মুছে দিতে পারবে না সভ্যতার কোনো পদক্ষেপ।

যদিও অগণন অস্পষ্ট স্বর নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ করবে
তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘণ্টা ধ্বনি
প্রতিদিন তোমাদের ঐতিহাসিক মৃত্যুক্ষণ
ঘোষণা করবে।
যদিও ঝঞ্ঝা-বৃষ্টিপাতে—বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিত্তি পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে
তবু তোমাদের শহীদ নামের ঔজ্জ্বল্য
কিছুতেই মুছে যাবে না।

খুনি জালিমের নিপীড়নকারী কঠিন হাত
কোনো দিনও চেপে দিতে পারবে না
তোমাদের সেই লক্ষদিনের আশাকে,
যেদিন আমরা লড়াই করে জিতে নেব
ন্যায়-নীতির দিন
হে আমার মৃত ভাইরা,
সেই দিন নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে
তোমাদের কণ্ঠস্বর
স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চিৎকারে
ভেসে আসবে
সেই দিন আমার দেশের জনতা
খুনি জালিমকে ফাঁসির কাষ্ঠে
ঝুলাবেই ঝুলাবে
তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে
প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।

চট্টগ্রাম, ১৯৫২

[পঞ্চাশ বছর পরে কবির অনুমোদনক্রমে মুদ্রণপ্রমাদ বর্জিত প্রমিত বানান অনুসারে একুশের প্রথম কবিতার সম্পাদিত পূর্ণপাঠ, চৌধুরী জহুরুল হক-এর সৌজন্যে প্রাপ্ত]

●●●

সদয় অবগতির জন্যে

চৌধুরী জহুরুল হক

নিবন্ধটি ‘সদয় অবগতির জন্যে’ শীর্ষক কলামে ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শিরোনামে (দৈনিক আজাদী ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১) প্রথম মুদ্রিত। এই রচনাটির মাধ্যমেই একুশের প্রথম কবিতার সন্ধান-প্রয়াসের সূচনা হয়। টীকা ও তথ্যনির্দেশ গ্রন্থ প্রকাশকালে (এপ্রিল ২০০২) সংযোজিত।

১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমী একুশের কবিতা Poems On 21ST নামে একুশের কবিতার একটি দ্বিভার্ষিক সংকলন প্রকাশ করেছিল। শিরোনাম, ভূমিকা ও কবিতাবলির পাশাপাশি ইংরেজি অনুবাদসহ মুদ্রিত এই গ্রন্থ প্রকাশের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, ‘একটি বিশেষ দিন, একুশে ফেব্রুয়ারি ও সে দিনের ঘটনাবলী’ সম্পর্কিত বিভিন্ন কবির কবিতার সংকলন প্রকাশ এবং সেই সঙ্গে ভাষা-আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ববহতা ও তার মর্যাদা রক্ষার কথা ভিন্নভাষী পাঠকদের অবহিতকরণ।

ভাষা-আন্দোলনের ৩১ বছর পর বাংলা একাডেমী প্রকাশিত এ সংকলনে একুশের প্রথম কবিতা মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ সংকলিত হয় নি। হয় নি তার কারণ তখন পর্যন্ত একুশের পুরো কবিতাটি পাওয়া যায় নি। কবিতাটি সংগৃহীত ও পরে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি (১৯৮৮) কাব্যগ্রন্থ মুদ্রিত হয়েছে আরো পাঁচ বছর পরে। যেটা দুঃখজনক সেটা হচ্ছে, স্মৃতি থেকে উদ্ধারকৃত এ কবিতাটির কিছু অংশ (কার স্মৃতি থেকে তা উল্লেখ করা হয় নি) একুশের কবিতা Poems On 21ST-এর ভূমিকার শেষাংশে স্থান পেলেও রচনাটির ঐতিহাসিকতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। সংকলনের ভূমিকায় লেখা হয়েছে, “একুশের উপর লেখা প্রথম কবিতা সম্ভবত ‘আমরা এখানে কাঁদতে আসিনি’ লিখেছিলেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম। বলা হয়ে থাকে শহীদদের আত্মোৎসর্গের দিনই কবিতাটি লেখা হয়েছিল। এটি একটি বড়ো কবিতা এবং প্রকাশের পরপরই এর প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যবশত কবিতাটি হারিয়ে গেছে।”

‘সম্ভবত’ কেন? ‘বলা হয়ে থাকে’ই বা কেন? সত্যিই কি এ কবিতার প্রথমত্ব নিয়ে কোনো সংশয় আছে? কিংবা বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারির হৃদয়বিদারী নির্মম ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ জ্ঞাপনকারী তাৎক্ষণিক কবিতা রচনার অন্য কোনো দাবিদার পাওয়া গেছে? একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্যে এবং সে শ্রদ্ধার কথা বহির্জগৎকে জানাতে যাঁরা উদগ্রীব তাঁদের মধ্যে এ জাতীয় সংশয় কি বাঞ্ছনীয় ছিল। নাকি এ সংশয় থেকে মুক্ত হওয়া তাঁদের জন্যে কঠিন ছিল? এ কবিতাটির লেখক মাসিক ‘সীমান্ত’-সম্পাদক, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠক মাহবুব উল আলম চৌধুরী কি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে অজ্ঞাত-পরিচয় ব্যক্তি? নাকি যোগাযোগ-বহির্ভূত কোনো অঞ্চলে তিনি বাস করেন? পাণ্ডুলিপি প্রণয়নকারী অনুবাদ বিভাগের ভূমিকায় লেখা হয়েছে, (এ গ্রন্থের কোনো সম্পাদক ও সম্পাদকমণ্ডলী নেই) “এ গ্রন্থের পরিকল্পনা ও প্রকাশনা, এ দুইয়ের ভেতর সময়ের ব্যবধান সামান্যই, মাত্র তিন সপ্তাহ। নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার ভিতর আমাদেরকে কাজ করতে হয়েছে। ফলে আমরা আমাদের দায়িত্ব যথার্থভাবে সম্পাদন করতে পেরেছি কিনা সে সম্পর্কে আমরা নিজেরাই সন্দেহমুক্ত নই।”

জোরদার যুক্তি–পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু এ জাতীয় একটি সংশয়কে দূর করার জন্যে ‘তিন সপ্তাহ’ কি যথেষ্ট ছিল না? সব ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাকে অগ্রাহ্য করা যায়, ইতিহাসের জ্বলন্ত সত্যকে উপেক্ষা করে সংশয়কে বরণ করার শৈথিল্যকে সহ্য করা যায় না। যে কারণেই হোক কবির সঙ্গে যে যোগাযোগ করা হয় নি, তার প্রমাণ উপরে উদ্ধৃত অংশে পাওয়া যায়। একুশের প্রথম কবিতার নাম ‘আমরা এখানে কাঁদতে আসিনি’ নয় ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’। কবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ‘বলা হয়ে থাকে, শহীদদের আত্মোৎসর্গের দিনই কবিতাটি লেখা হয়েছিল’ ধরনের সংশয়াচ্ছন্ন বাক্যের কবল থেকে অন্তত আমরা মুক্তি পেতাম। যে একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষের মধ্যে একটি আপোসহীন প্রতিবাদী চেতনার জন্ম নিয়েছে এবং সে চেতনাকে নির্ভর করে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী জনতার জয়ের মাধ্যমে একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়েছে তার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের মহামুহূর্তকে এমন হেলাফেলার বক্তব্যে রূপান্তরিত করা উচিত হয় নি বলেই আমার ধারণা। ভাষা-আন্দোলন-আশ্রয়ী সৃজনশীল সাহিত্যের সূচনা হয়েছিল যে রচনাটিকে কেন্দ্র করে, সেই রচনা এবং তার লেখক সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। বাংলা একাডেমী সে ধারণা যে সৃষ্টি করতে পারে নি তার প্রমাণ, একুশের কবিতা Poems On 21ST (১৯৮৩)-এর ভূমিকাংশ। এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট বক্তব্য, একুশের প্রথম কবিতা নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। এই কবিতার সৃজনক্রিয়ার পূর্ব মুহূর্ত থেকে এর রচনা-মুদ্রণ-প্রকাশ-জনসভায় পাঠ-প্রচার ও নিষিদ্ধ হওয়া পর্যন্ত বাস্তব ঘটনার যে পর্যায়-ক্রমিক পরম্পরা রয়েছে তা কোনো প্রকার সংশয়ের অবকাশ রাখে না। এ কারণেই কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি গ্রন্থের ভূমিকায় ড. আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘একুশের প্রথম কবিতা যে মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখলেন, তা হয়তো এক আকস্মিক ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কবিতা তাঁকে লিখতেই হতো–তাঁর সমগ্র জীবনাচরণ ও সাহিত্যচর্চার ধারায় তা ছিল অনিবার্য।’

একুশের প্রথম কবিতা রচনাকে আপাত দৃষ্টিতে এক আকস্মিক ঐতিহাসিক ঘটনা মনে হলেও এর সৃষ্টির পেছনে একটা প্রস্তুতি পর্ব ছিল। ভাষা-আন্দোলনের প্রথম অবস্থা থেকেই মাহবুব উল আলম চৌধুরী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চিন্তা-ভাবনা ও আন্দোলনের বিবিধ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সমযের আন্দোলনের সঙ্গে যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তাঁরা জানেন—ড. আনিসুজ্জামান উল্লিখিত গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখও করেছেন—‘মাহবুব উল আলম চৌধুরী সে সময়ে চট্টগ্রাম জেলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন।’ আহ্বায়ক হিসেবে চট্টগ্রামে একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচিকে কার্যকর করার জন্যে মাহবুব উল আলম চৌধুরী রাতদিন যে বিরামহীন শ্রমে নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন, তারই ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আর সেই অসুস্থ অবস্থায় প্রচণ্ড জ্বরের মধ্যে তিনি খবর পেয়েছিলেন একুশের দিনে ঢাকায় গুলি বর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা। এই খবর তাঁকে উত্তেজিত করে তুলেছিল। আবেগে উদ্দীপ্ত মাহবুব উল আলম চৌধুরী জ্বরের ঘোরে কবিতা লেখার জন্যে কাগজ কলম নিয়েছিলেন—উত্তেজনা ও জ্বরের তাপে তিনি কাঁপছিলেন, তাঁর হাত কাঁপছিল—‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ তিনি নিজের হাতে রচনা করতে পারেন নি, আবেগের উত্তাপে তিনি অনর্গল বলে যাচ্ছিলেন কবিতার এক একটি চরণ আর তা লিখে যাচ্ছিলেন তাঁদেরই একজন কর্মচারী—ননী ধর, মার্কসবাদী রাজনীতির একজন নিবেদিত কর্মী, যিনি কাজ করতেন ‘খুরশীদ মহলে’।

কবিতাটি লেখা শেষ হওয়ার পর মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে দেখার জন্যে আসেন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস তখন চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। এসেছিলেন ঢাকা থেকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম জেলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে সহযোগিতা করার জন্যে। একুশের প্রথম কবিতার প্রথম শ্রোতা তিনিই। তাঁর কিছুক্ষণ পর মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে দেখতে আসেন তৎকালীন চলচ্চিত্র মাসিক উদয়ন পত্রিকার সম্পাদক রুহুল আমিন নিজামী। তখনই কবিতাটি মুদ্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়–মুদ্রণের ভার পড়ে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের উপর। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস লিখেছেন, ‘আন্দরকিল্লায় অবস্থিত একটি প্রেসে কবিতাটি পুস্তিকার আকারে প্রকাশের দায়িত্ব পড়ে আমার উপর। ব্যবস্থা হয় সারা রাত প্রেসে কাজ চালিয়ে পর দিন সকাল বেলার মধ্যে গোপনে প্রকাশ করতে হবে অমর একুশের প্রথম সাহিত্য সৃষ্টি প্রথম সাহিত্য সংকলন।’১০

আন্দরকিল্লায় অবস্থিত যে প্রেসটিতে ঝুঁকিপূর্ণ এই দুঃসাহসিক কর্মটি রাতারাতি সম্পন্ন করেছিলেন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস সেই প্রেসটি হচ্ছে, চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লায় অবস্থিত কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস।১১

boi_jahurul.jpgএকুশের প্রথম কবিতাটি মুদ্রণের ক্ষেত্রে কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসের তৎকালীন ম্যানেজার দবির আহমদ চৌধুরী ও প্রেস কর্মচারীদের সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি ও আগ্রহ ও ঐকান্তিকতা রীতিমতো স্মরণযোগ্য। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের বর্ণনায় আমরা সেই সময়ের কথা জানতে পারি, “…রাতের শেষ প্রহরে কম্পোজ ও প্রুফের কাজ যখন সমাপ্তপ্রায়, হঠাৎ একদল সশস্ত্র পুলিশ হামলা করে উক্ত ছাপাখানায়। প্রেসের সংগ্রামী কর্মচারীদের উপস্থিত বুদ্ধি, ক্ষিপ্রতার মধ্যে দ্রুত লুকিয়ে ফেলা হয় আমাকে সহ সম্পূর্ণ কম্পোজ ম্যাটার। তন্নতন্ন করে খোঁজাখুঁজির পর পুলিশ যখন খালি হাতে ফিরে চলে যায় শ্রমিক কর্মচারীরা পুনরায় শুরু করেন তাঁদের অসমাপ্ত কাজ। শ্রমিক শ্রেণী যে ভাষায় যে দেশে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তার সংগ্রামী চেতনা যে অসাধারণ তার প্রমাণ সেদিন হাতে হাতে পেয়েছিলাম চট্টগ্রামে। দুপুরের মধ্যে মুদ্রিত ও বাঁধাই হয়ে প্রকাশিত হয় ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’।”১২

১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি১৩ লালদিঘির ময়দানে বিশাল জনসভায় কবিতাটি পাঠের পর এর লেখক মাহবুব উল আলম চৌধুরী, পাঠক চৌধুরী হারুনর রশীদ, কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসে কবিতাটির মুদ্রণের জন্যে কাগজ সরবরাহকারী কামালউদ্দিন আহমদ বি.এ-র নামে হুলিয়া জারি হয়। জনসভায় কবিতাটির প্রথম পাঠক চৌধুরী হারুনর রশীদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল।১৪ কবিতাটির পাণ্ডুলিপি দেখাতে অসমর্থ হওয়ায় মুদ্রাকর দবির আহমদ চৌধুরীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ জন্যে তাঁকে ছয়মাস জেলও খাটতে হয়।১৫

একুশের প্রথম কবিতা যে চট্টগ্রামেই রচিত হয়েছিল এ বিষয়ে কোন সংশয় নেই। কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি গ্রন্থে মুদ্রিত ‘লেখকের নিবেদন’ থেকে জানা যায়, সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত অবলুপ্ত কবিতাটির মূল অংশটি পাওয়া যায় জনাব মফিদুল হকের সৌজন্যে। আর প্রকাশকের বক্তব্য থেকে জানা যায় যাঁর কাছ থেকে কবিতার এই অংশ পাওয়া গেছে তিনি হচ্ছেন, সেই সময়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী আজকের স্কুল শিক্ষয়িত্রী মনজুরা বেগম।১৬ লেখকের সঙ্গে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে জানা গেছে, ইতোপূর্বে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম কর্তৃক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর স্মৃতি থেকে উদ্ধারকৃত অংশ নয়১৭—লেখকের বর্তমান গ্রন্থভুক্ত কাব্যাংশটিই একুশের প্রথম কবিতাটির অবিকল অংশ১৮ কোনো সংযোজন-বিয়োজন-পরিমার্জন ছাড়াই কাব্যাংশটি গ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে।১৯ এটি পূর্ণাঙ্গ কবিতা নয়।২০ মূল কবিতাটি ছিল দীর্ঘ সতেরো পৃষ্ঠার।২১ সেই সময়ে মুদ্রিত সম্পূর্ণ কবিতাটি না পাওয়া পর্যন্ত কবিতার মূল পাঠ নিয়ে কিছুটা সংশয় এবং অতৃপ্তি থাকলেও গ্রন্থভুক্ত কাব্যাংশকে নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করা যায়।২২ বাংলা একাডেমী প্রকাশিত একুশের কবিতা Poems On 21ST (১৯৮৩) গ্রন্থের ভূমিকাংশের সূত্র ধরে একুশের কবিতা সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার অর্থ বাংলা একাডেমীর কর্মকাণ্ডকে খাটো করা নয়, তথ্য-সত্য সম্পর্কে বিরাজিত সংশয়াচ্ছন্নতা দূর করার চেষ্টা মাত্র। বাংলা একাডেমী প্রকাশিত সংকলনটিতে—যাতে ৩৫ জন২৩ কবির কবিতা ও তার অনুবাদ সন্নিবেশিত হয়েছে, মাতৃভাষাকে ভালোবাসার এবং সেই ভালোবাসার বিষয়টি বহির্জগৎকে জানাবার আন্তরিক যে প্রয়াস রয়েছে তার জন্য বাংলা একাডেমী অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। আশা করি, গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণে একুশের প্রথম কবিতার লেখক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নাম ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুসারে মূল সূচিপত্রে স্থান পাবে।২৪

টীকা ও তথ্য নির্দেশ

১. এই সংকলন-সূচিতে একুশের প্রথম কবিতার রচয়িতা মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সংকলন-সূচির প্রথম কবিতা ছিল জসীমউদদীনের।

২. উল্লেখ্য যে, এই কাব্যাংশটি কবির স্মৃতি থেকে উদ্ধার করেছিলেন অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। একুশের হারিয়ে যাওয়া কবিতার এটিই ছিল প্রথম উদ্ধার প্রয়াস।

৩. দ্র. ‘ভূমিকা’, একুশের কবিতা Poems On 21ST, ১৯৮৩, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৪. যখন সংকলনটির সম্পাদনার কাজ চলছিল তখন তিনি তাঁর ঢাকার বাসভবনেই ছিলেন। কাজেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা অসম্ভব ছিল না।

৫. ‘সম্পাদক ও সম্পাদক মণ্ডলী’ ছাড়া এ জাতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন কী করে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়, তা বোধগম্য নয়।

৬. সন্দেহ প্রবণ অবস্থায় ‘যথার্থভাবে সম্পাদন’—সম্ভব কি?

৭. আনিসুজ্জামান, ‘ভূমিকা’, মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি, প্রথম প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮, সুবর্ণ, ঢাকা।

৮. খুরশীদ মহল ছিল চট্টগ্রামের একটি সিনেমা হল। এটির অবস্থান চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানের পশ্চিমে। বর্তমানে এটি একটি বাণিজ্য বিপণি, নাম মহল মার্কেট।

৯. কবির সঙ্গে সাক্ষাৎকারেই এসব তথ্য আমি জানতে পারি। এসব তথ্য জানিয়েছেন চৌধুরী হারুনর রশীদও। চৌধুরী হারুনর রশীদের সাক্ষাৎকারটি ধারণ করেছিলাম ২৯ জানুয়ারি ১৯৯২ তারিখে আমি আর বিশিষ্ট নাট্যশিল্পী মাহবুব হাসান। উল্লেখ্য যে, চৌধুরী হারুনর রশীদের চট্টগ্রামের বাসভবনে গৃহীত এ সাক্ষাৎকারের মূল প্রশ্নকর্তা ছিলেন মাহবুব হাসান।

১০. আনিসুজ্জামান, ‘ভূমিকা’, পূর্বোক্ত।

১১. একুশের কবিতাটির শেষে ‘কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেস থেকে মুদ্রিত’ কথাটি লেখা আছে।

১২. আনিসুজ্জামান, ‘ভুমিকা’, পূর্বোক্ত।
উল্লেখ্য যে, তখন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮৮, গ্রন্থটি আমার হাতে আসে নি। তাই উদ্ধৃতি গ্রহণ করেছিলাম মাহবুব উল আলম চৌধুরী’র কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি (১৯৮৮) গ্রন্থের আনিসুজ্জামান রচিত ‘ভূমিকা’ থেকে। খোন্দকার ইলিয়াসের গ্রন্থটি আমার হাতে এলে লক্ষ করেছি উভয় ক্ষেত্রে বক্তব্যগত মিল থাকলেও পাঠগত ভিন্নতা রয়েছে।

১৩. লালদিঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশাল প্রতিবাদ সভাটি ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে বহুলভাবে প্রচারিত হলেও ঐ তারিখে বিশাল কোনো প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় নি—হওয়া সম্ভবও ছিল না। কারণ, বহুলোকের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে একুশের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা চট্টগ্রামের অধিকাংশ লোকের কাছে এসে পৌঁছে ২২ তারিখে—কবি সংবাদটি পেয়েছিলেন টেলিফোনে ২১ তারিখে। তবে সরাসরি নয় প্রকৌশলী ফজলুল হকের অফিস থেকে। এ প্রসঙ্গে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস তাঁর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবী নিয়ে এসেছি’ প্রবন্ধে লিখেছেন “ঢাকায় বিকাল ৩টার দিকে গুলী হয়। সে খবর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার কাছে পৌঁছে যায় লালদিঘি ময়দানে সন্নিহিত একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের অফিসের মাধ্যমে (দ্র. বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, পূর্বোক্ত পৃ. ২৬)

উল্লেখ যে, ঐ সময়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এত দ্রুত টেলিফোনে সংবাদ প্রাপ্তি সম্ভব ছিল না। কারণ, চট্টগ্রামে হস্তপরিচালিত টেলিফোনকে স্বয়ংক্রিয় করা হয় ১৯৫২ সালের ১০ মার্চ এবং তা উদ্বোধন করেন পূর্ববঙ্গ গভর্নর মালিক ফিরোজ খান নুন (দ্র. মোহাম্মদ আবদুল খালেক সম্পাদিত সাপ্তাহিক কোহিনূর, ২য় বর্ষ, ৮ম সংখ্যা, ১৪ই মার্চ, ১৯৫২, পৃ. ১৪৬)। একুশের মূল পুস্তিকার ভূমিকাতেও এ কথার উল্লেখ রয়েছে। তবে ঐদিন লালদিঘি ময়দানে দোকান কর্মচারী সমিতির একটি পূর্ব নির্ধারিত সভা ছিল। সেই সভায় একুশের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। একুশের মূল কবিতাটি যাঁর কাছ থেকে আমি পেয়েছি তাঁর কথা থেকেও জানা যায় কবিতাটি মুদ্রণের জন্যে প্রেসে আসে ২২ ফেব্রুয়ারি এবং মুদ্রিত ও বাঁধাই হয়ে প্রকাশিত হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি। চৌধুরী হারুনর রশীদ—যিনি প্রতিবাদ সভায় কবিতাটি সম্পূর্ণ পাঠ করেছিলেন তিনিও সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সম্ভবত তারিখটি ছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি। কবিতাটির প্রকাশ কামালউদ্দিন আহমদ বি.এ. (কবিতার ভূমিকায় লেখা হয়েছে কামালুদ্দিন আহামদ খান)-এর কথায়ও এ সত্য প্রতিভাত হয়।

১৪. চৌধুরী হারুনর রশীদ নিজে বলেছেন, কেবল এই কবিতা পাঠের জন্য নয়, তাঁকে গ্রেপ্তারের পেছনে অন্য রাজনৈতিক কারণও ছিল।

১৫. আবু মোহাম্মদ তবিবুল আলম তাঁর ‘স্মৃতি থেকে’ শীর্ষক রচনায় লিখেছেন, বিচারে ৬ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড হল। পরবর্তী সময়ে নানাভাবে প্রচেষ্টার মাধ্যমে ছয় মাসের কারাবাসের পর তিনি মুক্তি পান। কিন্তু পরবর্তীকালে বহু অনুসন্ধানে প্রাপ্ত মোহাম্মদ আবদুল খালেক সম্পাদিত সাপ্তাহিক কোহিনূর, ২৭ অক্টোবর ১৯৫২তে প্রকাশিত ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের জের’ শীর্ষক একটি সংবাদ থেকে জানা যায় যে ভাষা-আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট গ্রেপ্তারকৃতদের কারো ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় নি। সংবাদটিতে বলঅ হয়েছে “তাঁহাদিগকে জামিন দেওয়া হইয়াছিল। বহু ঘুরা ফেরার পর গত ২৩শে অক্টোবর তারিখ ডেঃ মাঃ জনাব মৌলবী কে রহমান ছাহেবের বিচারে তাঁহারা বেকসুর খালাস পাইয়াছেন।” অবিকল সংবাদটি গ্রন্থের পরিশিষ্টে সংযোজিত।

১৬. দ্র. মাহবুব উল আলম চৌধুরী, কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৬। উল্লেখ্য, এ কবিতা প্রসঙ্গে ধানমণ্ডি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষয়িত্রী মনজুরা বেগম এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, “ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা ঐতিহাসিক কবিতা—‘কাদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ পুনরুদ্ধারের জন্য আমার চেয়ে বেশি কৃতিত্ব আমার বড় ভাবীর। ভাবীই কবিতাটি দিয়েছিলেন আমাকে যত্ন করে রাখার জন্য।” মনজুরা বেগমের এই ভাবী হচ্ছেন মফিদুল হকের মা মিসেস জোবেদা হক। জোবেদা হক কবিতাটি পেয়েছিলেন তাঁর স্বামী পুলিশ কর্মকর্তা জনাব মীর আশরাফুল হকের কাছে। মীর আশরাফুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এস. এম. হল তল্লাশী কালে অন্য কাগজের সাথে কবিতাটি পান। তখন তিনি মনজুরা বেগমের ভাষায়—“কবিতাটি ভালো লাগায় লুকিয়ে রাখলেন এবং বাসায় ফিরে ভাবীকে দিলেন।…ভাবী একদিন একা লক্ষীপুর থেকে চলে এলেন আমাদের বাসায়। কবিতাটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘রেখে দাও যত্ন করে, আমার বাসায় নিরাপদ মনে করছি না।… প্রতিবার ২১শে ফেব্রুয়ারীতে আমরা বোনেরা মিলে কবিতাটি পড়তাম।…কবিতার লেখাগুলো আবছা হয়ে যাচ্ছিল তাই ডাইরীতে লিখে রেখেছিলাম (দ্র. দৈনিক পূর্বকোণ, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩, পৃ. ১ ও ৭)।

১৭. যেটি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি-এর ৩৭ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত রয়েছে।

১৮. এখানে কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি, গ্রন্থে সংকলিত কবিতাটির কথাই বলা হয়েছে। এটি ঠিক অংশ নয়–প্রায় পুরো কবিতা; তবে তা থেকে বাদ পড়েছে ৫ লাইনের একটি অংশ—তা নিম্নরূপ:
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
পলাশ পুরের মকবুল আহমদের
পুঁথির জন্য—
রমেশ শীলের গাথার জন্য,
জসীম উদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য।

১৯. কথাটি সত্য নয়। সামান্য পরিবর্তন ও পরিমার্জনা আছে—আছে বিন্যাসগত পার্থক্যও।

২০. হাতে লেখা যে কাব্যাংশটি থেকে কবিতাটি মুদ্রিত হয়ে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে সে কবিতাটি কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কবিতাই। তবে হাতে লেখার সময় সামান্য ভুল-ভ্রান্তি ঘটেছে। মূল কবিতার সঙ্গে তুলনা করলে তা স্পষ্ট হবে।

২১. কবিতাটি দীর্ঘ সতেরো পৃষ্ঠার নয়—১/৮ ডিমাই সাইজের মলাট সহ (২+৬) আট পৃষ্ঠার। কবিতাটি সতেরো পৃষ্ঠা বলে বারবার উচ্চারিত হওয়ার কারণ বোধ হয় এই যে, হাতের লেখা পাণ্ডুলিপিটি হয়তো সতেরো পৃষ্ঠার ছিল।

২২. কবিতাটি ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদীতে ‘চল্লিশ বছর পরে আরেক ফাল্গুনে একুশের প্রথম কবিতার পূর্ণপাঠ’ শিরোনামে মুদ্রিত হয়েছে। উল্লেখ্য, নানা আলোচনা সূত্রে একদিন তৎকালীন (জানুয়ারি ১৯৯২) দৈনিক আজাদীর তত্ত্বাবধায়ক মাহমুদ নেওয়াজই আমাকে এই কবিতা সম্পর্কিত সংবাদ দেন। মাহমুদ নেওয়াজ জনাব আবু মোহাম্মদ তবিবুল আলমের সন্তান।

২৩. এই পঁয়ত্রিশজন কবির নাম নিম্নরূপ:
জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, আহসান হাবীব, সিকান্দার আবু জাফর, আবুল হোসেন, সানাউল হক, আবদুল লতিফ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, কায়সুল হক, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ফজল শাহাবুদ্দীন, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আল মাহমুদ, ওমর আলী, হুমায়ুন চৌধুরী, শহীদ কাদরী, মোহাম্মদ রফিক, সিকদার আমিনুল হক, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ুন কবির, হুমায়ুন আজাদ, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, দাউদ হায়দার, শিহাব সরকার।

২৪. সুখের বিষয় একুশের দ্বিভাষিক সংকলন একুশের কবিতা Poems On 21ST, প্রথম পুনর্মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২তে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ একুশের প্রথম কবিতা হিসেবে সূচিপত্রের শীর্ষে স্থান পেয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, কবির স্মৃতি থেকে উদ্ধারকৃত কাব্যাংশ ও মূল কবিতাটির পাঠ (কবির কাব্যগ্রন্থে যেটি স্বতন্ত্রভাবে আছে) একাকার হয়ে গেছে। কবিতাটি অনূদিতও হয়েছে সেই ভাবে। তাছাড়া ভূমিকা অংশে পরিবর্তন না করায় একুশের কবিতার বিষয়ে পূর্বেকার যে সংশয় ছিল তা রয়েই গেছে। শুধু তাই নয়, কবিতার নামে ও কবির নামের বানানেও ভুল রয়ে গেছে।

●●●

কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ইলু ইলিয়াস

[চৌধুরী জহুরুল হকের উদ্বারকৃত কবিতাটির নির্ভুল মূল পাঠ দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হওয়ার পরে বাংলা একাডেমীর একুশের কবিতা POEMS 21st(১৯৯২), একুশের কবিতা (১৯৯৯) – তে মুদ্রিত হলো ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে ড. রফিকুল ইসলাম কর্তৃক কবির স্মৃতি থেকে উদ্বারকৃত কবিতাটির কথিত অংশ ও কবির গ্রন্থে মুদ্রিত অংশের মিশেলে আরো ভয়ানক এক ভ্রান্ত পাঠ । এমতাবস্থায় এই বহুমাত্রিক বিকৃতি থেকে ঐতিহাসিক কবিতাটির মূল পাঠ সংরক্ষণ ও সর্বজনের কাছে পৌঁছে দেয়ার সংকল্পে একুশের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে সংশ্লিষ্ট গবেষণাকর্ম সহ কবিতাটির মূল পাঠ গ্রন্থাকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেন গবেষক অধ্যাপক চৌধুরী জহুরুল হক। এ ব্যাপারে কবির প্রতিক্রিয়া ও আরো প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে জানার জন্য ৯/২/২০০২ তারিখে আমি লিপ্ত হই কবির সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায়।]

ইলু ইলিয়াস: আপনি একুশের প্রথম কবিতার রচয়িতা। আজ পঞ্চাশ বছর পর এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কেমন?

মাহবুব উল আলম চৌধুরী: ১৯৫২ সালে আমি যখন এই কবিতাটি রচনা করি তখন আমার বয়স ছিল পঁচিশ বছর। এখন আমি পঁচাত্তর বছরে পদার্পণ করেছি। যে জন্য এ কবিতাটি লিখেছিলাম, যে কারণে ভাষা-আন্দোলন করেছিলাম তার অসম্পূর্ণতা দেখে–এত বছর পরে বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা দেখে আমি ক্ষুব্ধ এবং মনে হচ্ছে আমি যদি যৌবনকে ফিরে পেতাম তাহলে আরেকটি ভাষা-আন্দোলনের সূচনা করতাম।

ইলু ইলিয়াস: কবিতাটির জন্যে আপনি খ্যাতি পেয়েছেন, পেয়েছেন ব্যাপক পরিচিতি। এতে কি আপনি তৃপ্ত?

মাহবুব উল আলম চৌধুরী: খ্যাতির একটি বিড়ম্বনা আছে। ফেব্রুয়ারি মাস আমার জন্য যন্ত্রণার মাস। আগে যখন সংবর্ধনা দেওয়া হতো বিভিন্ন জায়গায় তাতে আমি খুশি হতাম। ইদানিং আমি খুশি হতে পারি না। আমার বয়সের কারণে আমি কোথাও যেতে পারি না। গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। মনের মতো করে কথা বলতে পারি না। স্মৃতিতে বিভ্রম চলে এসেছে। ফলে হয়েছে কি…আমি তৃপ্ত এ কথা বলতে পারছি না এ কারণে কবিতাটি আমার একমাত্র পরিচয় হয়ে যাওয়ার ফলে আমি দীর্ঘ তিরিশ বছর দেশের জন্য, সংস্কৃতির জন্য, সাহিত্যের জন্য—আমি যে সীমান্ত পত্রিকা বের করেছি, বিশ্বশান্তি আন্দোলন করেছি, আমি যে সাংস্কৃতিক সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম চট্টগ্রামে—আমার অন্যান্য কীর্তি এত ঢাকা পড়ে গেছে যে, লোকে আমাকে শুধু ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’র কবি হিসেবে চিহ্নিত করে। কাজেই এ কবিতাটি আমার একাধারে বন্ধু এবং একাধারে শত্রু।

ইলু ইলিয়াস: যে ভাবে আপনি খ্যাতি পেয়েছেন সেইভাবে আপনার কবিতা কি মূল্যায়িত হয়েছে?

মাহবুব উল আলম চৌধুরী: খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কবিতাটি মূল্যায়িত হয়নি। কারণ এই কবিতা যদিও মনে হয়ে আকস্মিকভাবে আমি লিখেছি কিন্তু এটির প্রস্তুতি ছিল প্রায় পঁচিশ বছরের। আমার পঁচিশ বছরের সামাজিক চেতনা এবং রাজনৈতিক চেতনা এতে প্রতিফলিত হয়েছে। যে কারণে আমি এ কবিতার শেষাংশে বলতে পেরেছিলাম—

যে দিন আমরা লড়াই করে জিতে নেব
স্বাধীনতার দিন
সে দিন বিজয়ী হয়ে সে আখড়া থেকে
বের হবো
খুনি জালিমকে
ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাবোই ঝুলাবো।

কাজেই আমার লক্ষ্যে, আমার চেতনার কারণে অবশ্যই স্বাধীনতার কথাটি এ কবিতাতে এসেছে। যারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন, দেখি যে বিষয়টি তারা উপেক্ষা করেছেন। এবং এতে যে বিভিন্ন বিষয়ের আমি অবতারণা করেছি তারা তা উপেক্ষা করেছেন। কাজেই যে ভাবে খ্যাতি পেয়েছি সে ভাবে এ কবিতার মূল্যায়ন হয়নি।

ইলু ইলিয়াস: ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলন। সংকলনটি ভাষা-আন্দোলনের সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সর্বজনের কাছে স্বীকৃত হয়েছে। এই সংকলনটিতে কিন্তু আপনার রচিত একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ সংকলিত হয় নি। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

মাহবুব উল আলম চৌধুরী: ১৯৫২ সালে কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পর পরই সরকার এক নির্দেশবলে এটিকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। ফলে এই কবিতাটি আর প্রকাশ্যে কোনো ভাবে কোনো পত্রিকায় ছাপাবার অবকাশ ছিল না। হাসান হাফিজুর রহমান যখন এই সংকলনটি বের করেন, হাসান হাফিজুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে আমার বন্ধু, সে হয়তো ঐ কারণে এই কবিতাটি তাঁর সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেন নি।

ইলু ইলিয়াস: ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত আপনার কাব্যগ্রন্থটিতে ‘লেখকের নিবেদন’ অংশে মফিদুল হকের সৌজন্যে কবিতাটির মূল অংশ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন আপনি। কিন্তু ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত ‘চল্লিশ বছর পরে আরেক ফাল্গুনে একুশের প্রথম কবিতার পূর্ণপাঠ’ শীর্ষক রচনায় অধ্যাপক চৌধুরী জহুরুল হক দাবি করেছেন, তাঁরই উদ্ধারকৃত—যা আজাদীতে প্রকাশিত হয়েছে সেটিই হলো আপনার কবিতাটির আদি ও মূল পাঠ। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

মাহবুব উল আলম চৌধুরী: আমি চিরকালই সত্যের কাছে মাথা নত করতে অভ্যস্ত। যেটা সত্য সেটাকে আমি মেনে নি। কাজেই যে পাঠটা আমার কাব্যগ্রন্থে গ্রহণ করা হয়েছে সেটা হাতের লেখা এবং সে সম্পর্কে কোনো সঠিক ধারণা আমার ছিল না। ফলে চৌধুরী জহুরুল হক যেটি উদ্ধার করেছেন সেটিই আমি মেনে নিয়েছি।

ইলু ইলিয়াস: দীর্ঘ এক যুগ ধরে নানা অনুসন্ধান ও গবেষণার পর আপনার কবিতাটির আদি ও মূলপাঠ সম্প্রতি গ্রন্থাকারে প্রকাশের একটি উদ্যোগ নিয়েছেন গবেষক অধ্যাপক চৌধুরী জহুরুল হক। তা কি আপনি জানেন? এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া আমাদের জানাবেন কি?

মাহবুব উল আলম চৌধুরী: চৌধুরী জহুরুল হক আমার স্নেহভাজন একজন সাহিত্যিক। তার উপর আমার গভীর আস্থা আছে। দীর্ঘকাল ধরে তার কার্যকলাপ আমার পরিচিত। ফলে সে যে কাজটি হাতে নিয়েছে সেখানে যে সত্য নিষ্ঠার পরিচয় দেবে, বস্তুনিষ্ঠার পরিচয় দেবে এই বিশ্বাস আমার আছে বলে এতে আমার ক্ষুব্ধ হওযার কোনো কারণ নেই, আমার প্রতিক্রিয়া সদর্থক।

ইলু ইলিয়াস: বাংলাদেশের সাহিত্যে একুশের প্রথম কবিতা আপনার রচিত ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’-র প্রভাব নিঃসন্দেহে অনেক। এ রকম উজ্জ্বল ভূমিকার পর উত্তরকালে আপনি আর সাহিত্যে তেমন সক্রিয় থাকেন নি কেন?

মাহবুব উল আলম চৌধুরী: আমি সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং রাজনীতিকে একই ধারায় প্রবাহিত করতে চেয়েছি—প্রবাহিত করেছি আমার কর্মে ও জীবনে। আমার কবিতা পড়লেই বুঝবেন রাজনীতির প্রভাব তাতে খুব বেশি ছিল। এক সময় আমি বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাস করতাম এবং সক্রিয় ছিলাম। কাজেই হতাশার কারণে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার পর আমার যে প্রেরণা সেটা চলে যাওয়ায় আমি আর বেশি কবিতা লিখতে পারিনি।
mahbubul-alam-choudhury-3.jpg
পত্নী জওশন আরা রহমানের সঙ্গে

ইলু ইলিয়াস: আমরা কিন্তু খালাম্মার কাছে জেনেছি আপনি এখনো প্রায়শই প্রতিদিন কবিতা লিখছেন, কিন্তু প্রকাশ করছেন না। কেন?

মাহবুব উল আলম চৌধুরী: আমি প্রকাশ করছি না সেটা ঠিক না। আমি মূলত সব্যসাচীর মতো কবিতা না লিখলেও প্রচুর কবিতা তারপরে লিখেছি। কিন্তু আমার স্বভাবের মধ্যে একটা আলসেমি দেখা দিয়েছে পরবর্তীকালে। ফলে কোনো কবিতা কোনো পত্রিকায় পাঠানো কিংবা সেটা প্রকাশের তেমন তাড়না অনুভব করি না। মনের আনন্দে লিখি, আর মাঝে মাঝে যেগুলো প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোও বিশেষ সংখ্যায়—যেমন সংবাদ ঢাকা বিশেষ সংখ্যায় লেখার জন্য তারা যখন অনুরোধ করে সে অনুরোধেও লিখি—মাঝে মাঝে সেগুলো প্রকাশিত হয়। আর যেগুলো নিজের মনের আনন্দে লিখি সেগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। আমি আমার লেখার প্রতি আমার সৃষ্টির প্রতি, একটু নিষ্ঠুর। কারণ আমার মধ্যে একজন সমালোচকের মন আছে। আমি বিষ্ণুদের কবিতার এক সময় সমালোচনা করেছি। কাজেই যখনই দেখি আমার কবিতা বিশিষ্ট হতে পারছে না, তখন মনে হয় লিখে কী লাভ!

চৌধুরী জহুরুল হকের প্রসঙ্গ : একুশের প্রথম কবিতা (প্রকাশক : আবদুল মালেক, কোহিনূর প্রকাশন, ৩৯৪ নবাব সিরাজউদ্দোলা রোড, আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম। প্রথম প্রকাশ: এপ্রিল ২০০২, প্রচ্ছদ: মুর্তজা বশীর, ৮৭ পৃষ্ঠা, ১০০ টাকা) বই থেকে লেখক ও সাক্ষাৎকারগ্রহীতার অনুমতিক্রমে মুদ্রিত।

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


5 Responses

  1. অমর হয়ে থাকবেন তিনি।

  2. আহমাদ মাযহার says:

    মাহবুব উল আলম চৌধুরীর সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হতো। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি জানি না। জানবার অবকাশও তেমন নেই। এ কথা কেবল তাঁর বেলাতেই প্রযোজ্য নয়, প্রযোজ্য অন্যদের বেলাতেও। কর্মী মানুষদের কর্মপঞ্জী রচনার ব্যাপারে আমাদের সমাজে সচতনতা বাড়াতে হবে। যতটুকু জানি তাতেই আমি তাঁর প্রতি গভীর ভাবে শ্রদ্ধাশীল। তাঁর কর্মজীবন নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া উচিত।

  3. ফয়জুল লতিফ চৌধুরী says:

    মাহবুব উল আলম চৌধুরীর লুপ্তপ্রায় ১৭ পাতা দীর্ঘ কবিতাটির কিয়দংশ উদ্ধার হওয়ার পর সে বিষয়ে ১৯৮৯ খৃস্টাব্দে ইফ্‌ফাত আরা সম্পাদিত দ্বিতীয় চিন্তা নামীয় মাসিক সাহিত্যপত্রে আমি একটি নিবন্ধ লিখি। তাতে উদ্ধৃত অংশটি অন্তর্ভূত ছিল। সুখের কথা তাতে চৌধুরী জহুরুল হক উপস্থাপিত অধিকাংশ তথ্য সন্নিবেশ করা সম্ভব হয়েছিল। উত্তরা-নিবাসী মাহবুব উল আলম চৌধুরী স্বয়ং এই সব তথ্য যুগিয়েছিলেন।

    – ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

  4. খুবই ভালো লাগলো, দেরিতে পড়েছি বলে লজ্জিত।

  5. Noor nehal says:

    এভাবেই কবিতারা বেঁচে থাক হৃদদেয়াল চূর্ণ করে কালের গহীন অরন্যে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.