অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 13 Feb , 2015  

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৬
এটাই ছিল তার জীবিকা । নাম পরিচয়হীন নাবিকদের দলে নাম লিখিয়ে পঁয়ষট্টিবার পাক খেয়েছে পৃথিবীটাকে । কাতারিনোর দোকানে সেই রাতে ওর সাথে বিছানায় যাওয়া মেয়ে দুটো ওকে ন্যাংটো অবস্থায় নাচ ঘরে নিয়ে যায় এটা দেখানোর জন্য যে ওর শরীরের এক মিলিমিটার জায়গাও খালি নেই । সর্বত্রই উল্কি আঁকা আছে: বুকে, পিঠে আর গলা থেকে আরম্ভ করে পায়ের আঙ্গুলের ডগা পর্যন্ত । পরিবারের সংগে মিশতে পারে না সে । সারাদিন ঘুমোত আর রাত কাটাতো সহ্য করে নেয়া এলাকাগুলোতে নিজের শক্তির ভাগ্য পরীক্ষা করে । মাঝে মাঝে উরসুলা যখন ওকে টেবিলে বসাতে সমর্থ হতো তখন সে খুব দরদের পরিচয় দিত, বিশেষ করে দূরদেশগুলোতে তার অভিযানের বর্ণনার সময়। জাপান সাগরের জাহাজডুবিতে দু সপ্তাহ সাগরে বেঁচে ছিল প্রচন্ড সুর্যালোকে দগ্ধ হয়ে মৃত এক সঙ্গীর গায়ের মাংশ খেয়ে । মৃতের গায়ের নোনা মাংশ সাগরের পানিতে আরও লবনাক্ত আর সূর্যকিরণে রান্না হওয়া সেই মাংশের স্বাদ ছিল দানা দানা আর মিষ্টি। এক রৌদ্রদগ্ধ দুপুরে ওর জাহাজ পরাজিত করে এক সমুদ্র ড্রাগনকে আর তার পেট চিরে পায় শিরস্ত্রাণ,বক্লেস আর ক্রুসেডে ব্যবহৃত অস্ত্র। ক্যারিবিয় সাগরে দেখতে পায় ভিক্টর হুগোর জাহাজের অপছায়া, মৃত্যুর হাওয়ায় জাহাজটার পালগুলো ছিল ছেঁড়া, মাস্তুল খেয়ে ফেলেছিল সামুদ্রিক আরশোলা, আর চিরদিনের জন্য হারিয়েছিল গুয়াদালুপের পথ। উরসুলা কাঁদত খাবার টেবিলে, “আর এত বড় বাড়ী এখানে, বাছা আমার” ফোঁপাত সে “ আর এত খাবার ফেলে দেয়া হয় শুয়োরদের জন্য”। কিন্তু ভিতর থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারত না যে, তার যে ছেলেকে জিপসিরা নিয়ে গিয়েছিল সে আর এই লোক একই বর্বর যে নাকি অর্ধেকটা দুধছাড়ানো শূকরছানা এক দুপুরের খাবার বেলায় সাবাড় করে আর যার ঢেঁকুরের গন্ধে শুকিয়ে যায় সব ফুল। পরিবারের অন্য সকলেরও একই অনুভূতি ছিল এ ব্যাপারে। অার জন্তুর মত ঢেঁকুর যে বিরক্তির উদ্রেক করত আমারান্তা তা কিছুতেই চেপে রাখতে পারত না। আর্কাদিও ওদের মধ্যেকার সম্পর্ক কখনই জানতে পারেনি আর সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টায় হোসে আর্কাদিওর করা প্রশ্নগুলির উত্তর কোনরকম দায়সাড়াভাবে দিয়ে শেষ করত। আউরেলিয়ানো, যখন তার সঙ্গে একই কামরায় ঘুমুত, সেই ছেলেবেলার সৃতি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে কিন্তু সমুদ্রের জীবনের এত সমস্ত ঘটনা তার স্মৃতিকে এমনভাবে পূর্ণ করে রেখেছে যে হোসে আর্কাদিও ওসব কথা ভুলে গিয়েছে। একমাত্র রেবেকাই প্রথম থেকে প্রভাবিত হয় তার দ্বারা। সেই বিকেলে যেদিন তাকে তার শোবার ঘড়ের সামনে দিয়ে যেতে দেখে, সেদিনই তার মনে হয় যে, সাড়া বাড়ি শুনতে পায় যার আগ্নেয়গিরির মত নিঃশ্বাস, সেই আদিম পৌরুষের তুলনায় পিয়েত্র ক্রেসপি নেহায়েতই এক রোগা পটকা ফুলবাবু। তখন থেকেই রেবেকা সবসময় অজুহাত খুঁজে বেড়াত তার কাছে ভিড়বার । এক সময় হোসে আর্কাদিত্ত নির্লজ্জ মনযোগ দিয়ে তার দেহে চোখ বুলায় আর বলে, “ছোট বোন, আসলেই তুমি এক রমনী।” রেবেকা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আবার মাটি আর দেয়ালের চুন খাওয়া শুরু করে অন্যসব বারের মতই আগ্রহভরে, আর এতই উৎকণ্ঠা নিয়ে আঙ্গুল চুষতে শুরু করে যে তার বৃদ্ধাঙ্গুলে কড়া পরে যায়। মৃত জোঁকসমেত সবুজ রংয়ের বমি করে সে। জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে বিকারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে হোসে আর্কাদিওর ভোর বেলায় বাড়ি ফেরা পর্যন্ত সে ঘুমহীন রাত কাটায়। এক বিকেলে, সকলেই যখন দিবানিদ্রায় মগ্ন, নিজেকে সামলাতে না পেরে ঢুকে পরে তার শোবার ঘরে। সে হোসে আর্কাদিওকে পায় জাহাজ বাঁধার কেবল দিয়ে করিকাঠ থেকে ঝোলান হ্যামকে জেগে থাকা শুধু মাত্র জাঙ্গিয়া পরে শোয়া অবস্থায়। তার এই বিশাল, চোখ কপালে ওঠানোর মতো নগ্নতা, রেবেকাকে এতই মুগ্ধ করে যে সে ফিরে আসার তাড়া অনুভব করে। “ক্ষমা কর,” দুঃখ প্রকাশ করে সে। “জানতাম না যে তুমি এখানে আছ”। অন্য কেউ যেন জেগে না ওঠে তাই খুব নীচু স্বরে বলে সে, “এদিকে আয়”। রেবেকা তার বাধ্য হয়। বরফ শীতল ঘাম নিয়ে অন্ত্রের মধ্যে গিট অনুভব করতে করতে হ্যামকের পাশে দাড়ায় রেবেকা । ততক্ষণে হোসে আর্কাদিও আঙ্গুলের ডগা দিয়ে আদর করছে তার হাটুতে, পরে পায়ের পেশীতে, তারপর উরু আদর করতে করতে বিড়বিড় করে “ওরে আমার বোনটি, আমার ছোট্ট বোন।“ তার মরে যাওয়া ঠেকাতে এক অপ্রাকৃতিক চেষ্টা চালাতে হয় যখন বিস্ময়করভাবে নিয়ন্ত্রিত এক ঝড়োশক্তি তাকে কোমড় ধরে উঁচু করে ফেলে আর তিন থাবায় হরণ করে তার লজ্জা আর ছিন্নভিন্ন করে ফেলে তাকে ছোট্ট পাখির মত । সে শুধু মাত্র জন্মানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানোর সময় করে উঠতে পারে। অসহ্য যন্ত্রনার অকল্পনীয় সুখানুভবে জ্ঞান হারানোর আগেই বিশাল ভেজা তরলে খাবি খেতে থাকে আর হ্যামকটা টিস্যু পেপারের মত শুষে নেয় সেই রক্তের বিস্ফোরণ।

তিন দিন পর পাঁচ তারিখের প্রার্থনায় বিয়ে করে ওরা। তার আগের দিন হোসে আর্কাদিও গিয়েছিল পিয়েত্র ক্রেসপির দোকানে । পিয়েত্র তখন গিটারের একটা পর্ব শেখাচ্ছে ছাত্রদের। কথা বলার জন্য হোসে আর্কাদিও তাকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যায় না। “রেবেকার সঙ্গে বিয়ে করছি আমি” বলে সে। পিয়েত্র ক্রেসপি পান্ডুর মত হয়ে পরে। সেতারটা এক ছাত্রের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ক্লাস শেষ করে দেয়। বাদ্যযন্ত্র আর দড়ি ও স্প্রিংয়ের খেলনায় ঠাসা ঘরটায় যখন শুধুমাত্র দুজন তখন পিয়েত্র ক্রেসপি বলে,
– “সে হচ্ছে তোমার বোন”
– “আমার কাছে সেটার গুরুত্ব নেই” উত্তর দেয় আর্কাদিও।
ল্যাভেন্ডার মাখা রুমাল দিয়ে কপাল মোছে পিয়েত্র ক্রিসপি।
– “এটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ” ব্যাখ্যা করে- “তাছাড়া, সর্বোপরি আইনবিরুদ্ধ”
অধৈর্য হয়ে পরে হোসে আর্কাদিও যতটা না বিতর্কের কারণে, তার চেয়েও বেশী পিয়েত্র ক্রেসপিকে পান্ডুর হয়ে যেতে দেখে।
– “প্রকৃতির উপর আমি দুবার হাগি” বলে- “আর শুধু মাত্র বলতে এসেছি যে রেবেকাকে কোন কিছুই জিজ্ঞেস করার কষ্টটা যেন তোমাকে না করতে হয়”।
কিন্তু পিয়েত্র ক্রেসপির চোখ ভিজে ওঠায় তার পাশবিক আচরণে ভাঙ্গন ধরে।
– “আর শোন” বলে অন্য স্বরে- “যা তোমার ভাল লাগে, তা যদি আমাদের পরিবারই হয় তাহলে আমারান্তা তো আছেই”।

রেবেকা আর হোসে আর্কাদিও যে সম্পর্কে ভাই বোন নয়, তা রোববারের ধর্মোপদেশের সময় ফাদার নিকানোর সর্বসম্মূখে উন্মোচন করে । উরসুলা এটাকে কখনই ক্ষমা করতে পারে না, কারণ তার বিবেচনায় কাজটা হচ্ছে অসম্মানজনক, আর যখন তারা গীর্জা থেকে ফেরে, তখন নবদম্পতিকে এ বাড়িতে পুনর্বার পা ফেলতে নিষেধ করে। তার কাছে, ওরা যেন আগেই মারা গেছে। যার দরুণ গোরস্থানের সামনে ওরা এক বাড়ি ভাড়া করে, আর শুধু হোসে আর্কাদিওর হ্যামকটাই ছিল ওদের একমাত্র আসবাব । বিয়ের দিন রেবেকাকে চপ্পলের মধ্যে ঢুকে থাকা এক কাকড়া বিছে কামড় দেয়। ফলে তার জিব্বা অবশ হয়ে পড়লেও সেটা ওদের হট্টোগোলপূর্ণ মধুচন্দ্রিমায় বাধার সৃষ্টি করে না। এলাকার প্রতিবেশীরা চমকে যেত যখন এক রাতে আটবার আর দুপুরে ঘুমের সময় তিনবার জেগে উঠত ওদের শীৎকার শুনে আর অনুনয় করত, যেন ওদের বন্ধনহীন যৌনাবেগ মৃতদের শান্তি ভঙ্গ না করে।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
একমাত্র আউরেলিয়ানোই ওদের জন্য উদ্বিগ্ন হয়। ওদের কিছু আসবাব কিনে দেয় আর কিছু টাকা দেয় যতদিন পর্যন্ত না হোসে আর্কাদিও বাস্তববোধ পুনরুদ্ধার করে আর বাড়ির সংলগ্ন মালিকবিহীন জমিতে কাজ শুরু করে। অন্য দিকে আমরান্তা কখনই রেবেকার উপর ঈর্ষাপূর্ণ ঘৃণাকে জয় করতে পারে না, যদিও জীবন তাকে এনে দিয়েছে এমন এক সন্তুষ্টি যা সে স্বপ্নেও দেখেনি । উরসুলার কাছে এই লজ্জা ঢাকার উপায় ছিল সম্পূর্ণ অজানা। তার উদ্যোগেই এক ধীরস্থির আত্মমর্যাদাকে ব্যর্থতার গ্লানির উপরে আসন দিয়ে পিয়েত্র ক্রেসপি প্রতি মঙ্গলবার দুপুরের খাবারটা এ বাড়িতেই খেয়ে চলে একইভাবে। টুপিতে একইভাবে ফিতেটা ব্যবহার করে চলে পরিবারটার প্রতি কৃতজ্ঞতায়। সে উরসুলতার প্রতি দরদ প্রদর্শনের জন্য সবসময় নিয়ে যেত বিচিত্র সব উপহার: পর্তুগিজের সার্ডিন, তুর্কী গোলাপের জ্যাম আর এক বিশেষ উপলক্ষে ম্যানিলায় তৈরী চমৎকার এক শাল। আমারান্তা তাকে আপ্যায়ন করত আদরভরা যত্নশীলতায় । তার পছন্দগুলোকে আগে থেকেই আন্দাজ করত, জামার আস্তিনে সেলাই খুলে যাওয়া সুতো ছিড়ে দিত আর এক জন্মদিন উপলক্ষে তার নামের আদ্যাক্ষর এমব্রয়ডারী করে এক ডজন রুমালে । প্রতি মঙ্গলবার দুপুরের খাবার শেষে যখন সে অলিন্দে এমব্রয়ডারী করত তখন পিয়েত্র ক্রেসপি তাকে এক আনন্দঘন সঙ্গ দিত । যে মেয়েটাকে সবসময় বালিকা হিসেবে গনণ্য করেছে সে হয়ে উঠেছে তার কাছে এক বিস্ময়কর উন্মোচন । আমরান্তার মধ্যে মাধুর্যের অভাব থাকলেও জাগতিক বিষয়বস্তু সমন্ধে এক বিরল সংবেদনশীলতা ছিল আর ছিল এক গোপন কমনীয়তা । ঘটনাটা যে ঘটতে যাচ্ছে এ নিয়ে যখন কারো মনেই কোন সন্দেহ ছিল না, এমনই এক মঙ্গলবার পিয়েত্র ক্রেসপি তাকে বিয়ের প্রস্তাব করে । আমরান্তা তার কাজ বন্ধ করে না । সে অপেক্ষা করে কানের কাছে হয়ে ওঠা লাল ভাবটা ম্লান হবার আর এক ধীরস্থির ও পরিণত স্বর নিয়ে এসে বলে- “অবশ্যই ক্রেসপি” – যোগ করে- “কিন্তু যখন আমরা নিজেদের ভাল করে চিনব । তাড়াহুড়ো করা কোন কিছুতেই ভাল না” । উরসুলা বিভ্রান্ত হয়ে পরে । পিয়েত্র ক্রেসপিকে বিশেষ মর্যাদা দিলেও রেবেকার সঙ্গে তার সুদীর্ঘ সময়ে বাগদানের ঘটনা প্রচারিত হওয়ায় এ বিয়ের ব্যাপারে সে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে না । কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটাকে সে গ্রহণ করে ভাল খারাপ চিন্তা ছাড়াই । কারণ অন্য কেউই ব্যপারটার নৈতিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে না । বাড়ির কর্তা আউরেলিয়ানো তার হেঁয়ালিপূর্ণ চূড়ান্ত মতামত দিয়ে আরও বিভ্রান্ত করে উরসুলাকে ।
-“বিয়ে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার সময় নয় এখন”
এই মন্তব্যটির অর্থ বুঝতে উরসুলার কয়েক মাস লেগে যায় । সত্যিকার অর্থে মন্তব্যটা ছিল যথেষ্ট আন্তরিক । কারণ শুধু বিয়ে নয়, ঐ মুহূর্তে যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কিছু চিন্তা করার সময় আউলিয়ানোর ছিল না । ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাড়িয়ে সে নিজেও ভাল করে বুঝে উঠতে পারবে না কিভাবে সুক্ষ্ন কিন্তু অলংঘনীয় ঘটনাক্রমের ধারাবাহিক বন্ধন তাকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে । রেবেকার মৃত্যু তাকে যে রকম নাড়া দেবে বলে ভয় করছিল, বাস্তবে তা হয় নি । বরঞ্চ তৈরী হয়েছিল এক বোবা ক্রোধের, যা আস্তে আস্তে পরিণত হয়েছিল এক অসাড় নিসঙ্গতার, একই রকম হতাশার, যেমনটা সে অনুভব করেছিল নারীসঙ্গ বর্জন করে । কাজের গভীরে ডুবে গেলেও শ্বশুড়ের সঙ্গে দোমিনো খেলার অভ্যাসটা ঠিক রাখে সে । শোকাচ্ছন্ন এক বাড়িতে দুই পুরুষের রাতের আলাপ ওদের বন্ধুত্বের ভিতটা শক্ত করে তোলে ।
-“আবার বিয়ে কর আউরেলিতো” ওকে বলত শ্বশুড়–“পছন্দমত নির্বাচন করার জন্য আমার আরও ছয়টি মেয়ে আছে।”

সে প্রায়ই সফরে যেত আর তেমনি এক সফর থেকে ভোটের আগে ফিরে আসে দেশের রাজনৈতিক অবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে । উদারপন্থীরা যুদ্ধ আরম্ভের সিদ্ধান্ত নিয়েছে । এই সময়ে উদারপন্থী আর রক্ষণশীলদের নিয়ে আউরেলিয়ানোর ধারণা খুব অস্পষ্ট থাকায় তার শ্বশুড় সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে ওগুলোর পাঠ দিত । “উদারপন্থিরা হচ্ছে ফ্রীম্যাসন, খারাপ ধরনের লোক” বলতো সে, যারা পাদ্রীদের ফাঁসি দিতে চায় সিভিল বিবাহের আর বিবাহ বিচ্ছেদের প্রবর্তন করতে চায়, তারা বৈধ আর অবৈধ সন্তানদের সমান অধিকারে বিশ্বাসী । আর এক ফেডেরাল সিস্টেমের অধীনে দেশটাকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করতে চায় যাতে সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় শাসনকর্তার হাতে ক্ষমতা থাকবে । আর অন্যদিকে রক্ষণশীলরা সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়েছে । তারা জনশৃংখলা পারিবারিক মূল্যবোধের প্রবক্তা । খ্রীষ্টধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিরোধকারী । কেন্দ্রীয় শাসনতন্ত্রে বিশ্বাসী আর তারা দেশটাকে স্বায়ত্তশাসনের অধীনে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে দিতে প্রস্তুত নয় । মানবিক মনোবৃত্তির কারণে আউরোলিয়ানো অবৈধ সন্তানদের অধিকারের ব্যাপারে উদাহরণপন্থিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয় কিন্তু কিছুতেই সে বুঝে উঠতে পারছিল না হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায় না এমন কিছু কিভাবে যুদ্ধের মত এক চূড়ান্ত অবস্থার সৃষ্টি করতে পার । রাজনৈতিক উদ্দীপনা নেই এমন এক শহরে এক সার্জেন্টের নেতৃত্বে যে সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে আসার মত শ্বশুড়ের নেওয়া সিদ্ধান্তকে, বাড়াবাড়ি বলে মনে হয় তার । ওরা শুধু এসেই ক্ষান্ত হয় না, তারা একুশ বছরের বেশী বয়সের পুরুষদের ভিতর রক্ষণশীল প্রার্থীদের নাম নীল রংয়ের কাগজের টুকরায় আর উদারপন্থি প্রার্থীদের নাম লাল রংয়ের কাগজের টুকরায় বিলি করার আগেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাজেয়াপ্ত করে শিকার করার অস্ত্র, মাসেতে, (বড় ধরনের ছুড়ি বা দা) এমনকি রান্না ঘরের ছুড়ি পর্যন্ত । নিজেই এক ফরমান পড়ে শোনায় যেখানে শনিবার মধ্যরাত থেকে পরবর্তী আটচল্লিশ ঘন্টা অ্যালকোহল আছে এমন পানীয় বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়, আর নিষিদ্ধ করা হয় একই পরিবারভুক্ত নয় এমন তিনজন লোকের সমাবেশ । কোন ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয় নির্বাচন । রোববার সকাল আটটা থেকে প্লাজায় সৈন্যদের পাহারায় এক কাঠের ব্যালট বাক্স রাখা হয় । আউরেলিয়ানো নিজেই যাচাই করে যেন সবাই ভোট দেয় স্বাধীনভাবেই, কারণ প্রায় সারাদিন সে শ্বশুড়ের সঙ্গে পাহাড়া দেয় যাতে করে একবারের বেশী কেউ ভোট দিতে না পারে । বিকেল চারটায় প্লাজায় ড্রাম বাজিয়ে নির্বাচিন পর্বের সমাপ্তি ঘোষণা করা হলে দন আপলিনার মসকতে ব্যালট বাক্স শীল করে একটি লেবেল বাক্সের মুখে আড়াআড়িভাবে সেটে দিয়ে তাতে স্বাক্ষর করে । সেই রাতে দন আপলিনার মসকতে যখন আউরেলিয়ানোর সঙ্গে দোমিনো খেলছিল সার্জেন্টকে আদেশ করে ভোট গোনার জন্য ব্যালটের মুখ খোলার । ব্যালট বাক্সে প্রায় যতগুলো লাল কাগজ ছিল একই রকম ছিল নীল কাগজও । কিন্ত সার্জেন্ট মাত্র দশটি লাল কাগজ রেখে বাকী লাল কাগজের বদলে সমানসংখ্যক নীল কাগজ ঢুকিয়ে ব্যালট বাক্সটাকে নতুন করে সীল করে আর পরের দিন প্রথম ঘন্টায় প্রাদেশিক রাজধানীতে নিয়ে যায় সেটা । “উদারপন্থিরা যুদ্ধে যাবে” বলে আউরোলিয়ানো। দন আপলিনার দোমিনোর গুটি থেকে মনোযোগ সরায় না । “যদি কাগজগুলো বদলের জন্য বলে থাক তাহলে বলব যে ওরা যুদ্ধে যাবে না,” বলে “এর জন্যই কিছু লাল কাগজও রেখে দেয়া হয়েছে, যাতে করে কোন প্রতিবাদ না হয়।“

বিরুদ্ধ পক্ষের প্রতিকুলতা বুঝতে পারে আউরোলিয়ানো, “যদি আমি উদারপন্থি হতাম” বলে- “ এই কাগজগুলোর জন্যই যুদ্ধে যেতাম”। তুমি যদি উদারপন্থি হতে তাহলে আমার মেয়েজামাই হয়েও এই কাগজ বদলের ব্যপারটা দেখতে পেতে না” ।
আসলে সারা গ্রামে অসন্তুষ্টি ছড়িয়ে পরে নির্বাচনের ফলাফলের কারণে নয়, বরঞ্চ সৈন্যরা বাজেয়াপ্ত করা অস্ত্রগুলো ফিড়িয়ে না দেয়ায় । আউরোলিয়ানোর সঙ্গে একদল মহিলা কথা বলে যাতে সে তার শ্বশুড়ের সঙ্গে কথা বলে রান্না ঘরের ছুড়িগুলো ফেরতের ব্যবস্থা করে । দন আপলিনার মসকতে কঠিন গোপনীয়তার সঙ্গে জানায় যে উদারপন্থিরা যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারই প্রমাণ হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা অস্ত্রগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে । এই ভাষ্যের লজ্জাহীনতার কারণে সতর্ক হয় আউরোলিয়ানো । কোন মন্তব্যই করে না সে । কিন্তু এক রাতে যখন জেরিনালদো মার্কেস আর ম্যাগালাসকে ডিসবাল তাদের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ছুড়িগুলোর ব্যাপারে আলাপ করছিল । তখন তারা জিজ্ঞেস করে যে, সে উদারপন্থী না রক্ষণশীল? আউরোলিয়ানো হেঁয়ালি করে না যদি কিছু করতে হয় তাহলে উদারপন্থিই হব বলে। কারণ রক্ষণশীলরা হচ্ছে একদল ঠগ ।

(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


2 Responses

  1. Zahed says:

    বুঝলাম না কিস্তি গুলা আর আগের মতো নাই । জানাবেন একটু……

  2. অংশুমান বিশ্বাস says:

    এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়—- অসাধারণ লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.